📄 হিজাবের কার্যকরী কোনো ভূমিকা নেই
ক-আমি আর কক্ষনো সিটবেল্ট বাঁধব না। সিটবেল্ট বাঁধার কোনো মানেই হয় না।
খ-মানে? কী বলছ এসব?!
ক-সিটবেল্ট একটা প্রতীকী জিনিস। একটা অর্থহীন প্রথা। কিছু মানুষ সিটবেল্ট বেঁধে নিজেদের সুনাগরিক প্রমাণ করতে চায়। এটা হলো নিজেকে ভালো প্রমাণ করার ঢং। যারা এসব করে তাদের সিদ্ধান্তকে আমি শ্রদ্ধা করি। কিন্তু আমি এসব করতে পারব না।
খ-এভাবে হয়তো বিষয়টাকে ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু এর জন্য সিটবেল্ট কেন অর্থহীন হয়ে যাবে? সিটবেল্টের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্র্যাকটিকাল ভূমিকা আছে।
ক-আচ্ছা, তাই নাকি! কী সেটা, শুনি?
খ-সিটবেল্ট মানুষকে দুর্ঘটনায় আহত হওয়া থেকে রক্ষা করে
ক-হাস্যকর কথা! সিটবেল্ট বাঁধার পরও অনেক মানুষ দুর্ঘটনায় আহত হয়, এটা জানো? অনেকে তো সিটবেল্ট বাঁধা সত্ত্বেও মারা যায়। কাজেই সিটবেল্ট ইউসলেস। এটা কোনো ধরনের নিরাপত্তা দিতে পারে না।
খ-আরে! সিটবেল্ট তো জাদুমন্ত্র না যে এটা সব ধরনের বিপদ থেকে মানুষকে বাঁচাবে। কিন্তু সিটবেল্ট অনেক ক্ষেত্রেই কাজে লাগে, এটা তো স্পষ্ট।
ক-না, তুমি ভুল বলছ। আমি এমন মানুষকে চিনি সিটবেল্ট বাঁধার পরও যারা আহত হয়েছে। এদের অনেকে আবার এমন দেশের নাগরিক যেখানে সিটবেল্ট বাঁধা বাধ্যতামূলক। তারপরও তারা আহত হয়েছে।
খ-দেখো তুমি একটা লজিকাল ভুল করছ। সিটবেল্ট আমাদের ১০০% সুরক্ষা দিতে পারে না এটা ঠিক। কিন্তু তার মানে তো এটা না যে সিটবেল্ট আমাদের কোনো সুরক্ষাই দিতে পারে না। যদি অন্য সব ফ্যাক্টর অপরিবর্তিত থাকে তাহলে সিটবেল্ট উল্লেখযোগ্য হারে আহত ও নিহত হবার আশঙ্কা কমায়।
ক-এসব ফালতু কথা বাদ দাও তো। আরেকজনকে খারাপ প্রমাণ করে তোমার লাভটা কী? সিটবেল্ট না বেঁধে গাড়ি চালানোর সময় কোনো মাতাল ড্রাইভার যদি আমার গাড়িতে ধাক্কা দেয়, আর আমি যদি আহত হই বা মারা যাই, তাহলে সেটা কি আমার দোষ? নাকি ওই মাতাল ড্রাইভারের দোষ। ভিকটিমকে দোষ দেয়া বন্ধ করো!
খ-আজব! অবশ্যই এটা ওই মাতাল ড্রাইভারের দোষ। কিন্তু এর সাথে সিটবেল্ট বাঁধা-না-বাঁধার কী সম্পর্ক? পৃথিবীতে অনেক দায়িত্বজ্ঞানহীন, পাগল লোক আছে, কিন্তু তাতে তো সিটবেল্টের প্র্যাকটিকাল গুরুত্ব এবং উপকারিতা বাতিল হয়ে যাচ্ছে না; বরং এ ধরনের লোকজন আছে দেখেই আমাদের সিটবেল্ট পরাকে গুরুত্ব দেয়া উচিত।
ক-দেখো, তুমি নিজে সিটবেল্ট পরো তাই অন্য সবাইকে ছোট করে দেখছ। তুমি মনে করছ তুমি অন্য সবার চেয়ে ভালো। অথচ আমরা কেবল আমাদের স্বাধীনতার প্রয়োগ করছি। আমি সিটবেল্ট বাঁধব কি না, সেটা আমার ব্যাপার। এখানে তোমার সমস্যা কী? এই হলো আজকের দুনিয়ার সমস্যা...
খ-শোনো, মাথা ঠান্ডা করো। তোমাকে আক্রমণ করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। তোমার গাড়ির সাথে দেয়া ম্যানুয়ালটা খুলে দেখো। গাড়ি যারা বানিয়েছে, তারাই বলছে দুর্ঘটনায় আহত হবার ঝুঁকি এড়ানোর জন্য সিটবেল্ট বাঁধতে হবে। এরাও কি তোমাকে ছোট করে দেখছে? তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে? জ্ঞান দিচ্ছে?
ক-এটা তোমার নিজস্ব ব্যাখ্যা। ম্যানুয়ালের কথা তুমি নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করছ। তুমি নিজে যেহেতু সিটবেল্ট বাঁধো তাই তুমি ওভাবেই ব্যাখ্যা করছ। কিন্তু ম্যানুয়াল ব্যাখ্যা করার অধিকার তোমার একার না।
খ-আমার তো মনে হয় না, ম্যানুয়ালের বক্তব্য অন্য কোনোভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ আছে...
ক-যথেষ্ট হয়েছে! থামো!। আমার জীবন আমার সিদ্ধান্ত! গাড়ি চালাতে গিয়ে আমাকে কেমন-সব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়ে তুমি জানো? কোন সাহসে তুমি আমাকে সিটবেল্ট বাঁধার কথা বলো? আবার ম্যানুয়ালের কথা টানছ! তোমার নিজের গাড়ি আছে?
খ-না নেই, কিন্তু সেটা এখানে প্রাসঙ্গিক কেন?
ক-বাহ! তোমার নিজের কোনো গাড়ি পর্যন্ত নেই, অথচ তুমি আমাকে সিটবেল্ট বাঁধার লেকচার দিয়ে যাচ্ছ! চুপ থাকো!
***
আর এভাবেই হিজাব আর ধর্ষণ নিয়ে আরেকটা গঠনমূলক আলোচনার সমাপ্তি ঘটল।
আচ্ছা ভালো কথা, ম্যানুয়ালের প্রাসঙ্গিক অংশটা কী জানেন? জানা না থাকলে জানিয়ে দিই-
হে নবী, তুমি তোমার স্ত্রীদের, তোমার কন্যাদের আর মু'মিনদের নারীদের বলে দাও-তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয় (যখন তারা বাড়ির বাইরে যায়), এতে তাদের চেনা সহজতর হবে এবং তাদের উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [তরজমা, সূরা আল-আহযাব, ৫৯]
📄 হিজাব নিষিদ্ধ হবার ব্যাপারে যেভাবে তর্ক করতে হয় না
হিজাব নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মুসলিমরা যখন 'স্বাধীনতার' দোহাই দিয়ে তর্ক করে, তখন সেটা অসংলগ্নতা। পোশাকপরিচ্ছদের ব্যাপারে প্রত্যেক সমাজের কোনো-না-কোনো মাপকাঠি থাকে। প্রতিটি সমাজ কোনো-না-কোনোভাবে মানুষের পোশাককে নিয়ন্ত্রণ করে। এটা সব সময় নির্দিষ্ট কোনো পোশাককে নিষিদ্ধ কিংবা বাধ্যতামূলক ঘোষণা করার মাধ্যমে হয় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটা হয় সামাজিক চাপের মাধ্যমে।
যেমন, পশ্চিমা বিশ্বে বসবাস করা মুসলিম নারীদের অনেকে হিজাব খোলার সিদ্ধান্ত নেয় সামাজিক চাপের কারণে। তারা এমন এক সমাজে থাকে, যেখানে হিজাব পরলে নিজেকে ডাঙায় তোলা মাছের মতো মনে হয়। রাস্তাঘাটে মানুষ তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করে। এতে তারা অস্বস্তি বোধ করে। হয়তো সেক্যুলার আত্মীয়রা হিজাব নিয়ে খোঁটা দেয়। হয়তো বাসা থেকে হিজাব খোলার জন্য চাপ দেয়া হয়। সবকিছু একসাথে জড়ো হতে হতে একসময় সামাজিক প্রথাপ্রচলনের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য নিজের হিজাব সে খুলে ফেলে। অথবা অন্য কোনোভাবে নিজের পোশাককে বদলে নেয়। এভাবে সমাজ মানুষের পোশাককে নিয়ন্ত্রণ করে।
কাজেই এ ধরনের শক্তিশালী সামাজিক চাপের উপস্থিতিতে 'স্বাধীন সিদ্ধান্ত'-এর কথা বলা অর্থহীন। মানুষ নিজের সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি স্বাধীন এবং নিজস্ব মনে করলেও বাস্তবতা হলো সমাজ মানুষের সামনে সীমিত কিছু সুযোগ রাখে, আর মানুষ সেখান থেকে কোনো একটাকে বেছে নেয়।
তবে এটা আমার আলোচনার মূল বিষয় না। আমার পয়েন্ট হলো, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ অর্জন এবং সেই ক্ষমতা প্রয়োগের ইচ্ছা মুসলিমদেরও থাকা উচিত। একটা আদর্শ মুসলিম সমাজে, আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পোশাক পরাটাই হবে স্বাভাবিক। এমন কোনো সমাজে যদি কোনো কারণে পোশাকের ব্যাপারে নির্দিষ্ট আইন নাও থাকে, তবু নির্দিষ্ট ধরনের পোশাক পরার ব্যাপারে সামাজিক চাপ সেখানে থাকবে। এমন সমাজে বিকিনি আর শর্ট স্কার্ট পরা নারীরা অস্বস্তি বোধ করবে। যদি কোনো আইন নাও থাকে, যদি কোনো জরিমানা নাও করা হয়, তবু অন্য সবার মতো পোশাক পরার তীব্র চাপ তারা নিজে থেকেই অনুভব করবে। এভাবে ইসলামী ধর্মীয় রীতি আরোপিত হবে, ঠিক যেভাবে পশ্চিমা ড্রেস কোড আজ আরোপ করা হচ্ছে।
আদর্শ মুসলিম সমাজ কোনটি?
নিঃসন্দেহে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তৈরি করা সমাজ। যদি তর্কের খাতিরে আমরা ধরেও নেই, মদীনাতে নির্দিষ্ট কোনো ড্রেস কোড ছিল না, তবু আমাদের স্বীকার করতে হবে যে মদীনার অধিকাংশ অধিবাসী ইসলামী বিধান অনুযায়ী পোশাক পরত। এতে কি অন্য অধিবাসীদের ওপর একই ধরনের পোশাক পরার চাপ তৈরি হতো না? এটা কি সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং ধর্মীয় বিধিবিধান আরোপ করা না? তাহলে স্বাধীন সিদ্ধান্তের দোহাই দিয়ে আপনি কীভাবে হিজাবের পক্ষে যুক্তি দেবেন? এই অসংলগ্নতা এড়ানোর উপায় হলো,
- হয় ফ্রিডম অফ চয়েসের এই ধারণার বৈধতা অস্বীকার করা এবং এগুলোর সুবিধাবাদী ব্যবহার করা বন্ধ করা, অথবা
- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবাদের (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) সমাজ যে আদর্শের ওপর ছিল তা অস্বীকার করা।
অন্যভাবে বলা যায়, ফ্রিডম অফ চয়েসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সমাজের কোনো অস্তিত্ব থাকতে পারে না। বাস্তবে তো নেই, তাত্ত্বিকভাবেও নেই। আর যদি এমন কোনো সমাজের অস্তিত্ব থাকেও তাহলে সেটা ইসলামী মূল্যবোধ এবং বিধিবিধানের সাথে সংগতিপূর্ণ হবে না। কাজেই যখনই হিজাব কিংবা অন্য কোনো মুসলিম পোশাককে আক্রমণ করা হয় তখন 'স্বাধীন সিদ্ধান্তের' বুলি আঁকড়ে ধরার কোনো অর্থ হয় না। চিন্তা, কথায় ও কাজে কনসিসটেন্ট হওয়া জরুরী।