📄 বাধ্যতামূলক হিজাবের আইন শোষণ কেন?
প্রশ্ন-কিছু মুসলিম দেশে হিজাব করা বাধ্যতামূলক, এ নিয়ে আপত্তি করার কী আছে? এখানে কোন জিনিসটাকে তোমাদের কাছে শোষণ মনে হচ্ছে?
উত্তর-এসব বিধান শোষণমূলক কারণ নারী তার ইচ্ছেমতো পোশাক পরতে পারছে না। নিজের পোশাকটাও স্বাধীনভাবে বেছে নেয়ার সুযোগ তার নেই।
প্রশ্ন-পৃথিবীতে কি এমন কোনো দেশ আছে যেখানে মানুষ যা ইচ্ছে তা-ই পরতে পারে? এমন কোনো দেশ আছে যেখানে সীমাহীন স্বাধীনতা আছে?
উত্তর-আলবৎ আছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে আছে।
প্রশ্ন-পশ্চিমা দেশগুলোতে কেউ কি রাস্তায় নগ্ন হয়ে হাঁটতে পারে? নিজের যৌনাঙ্গ প্রদর্শন করতে পারে?
উত্তর-না, তা পারে না...
প্রশ্ন-তার মানে তাকে তার নগ্নতা ঢাকতে বাধ্য করা হয়। তোমাদের সংজ্ঞা অনুযায়ী এটা শোষণ না? এসব দেশের মানুষও তো ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা পাচ্ছে না, তাই না?
উত্তর-এটা কেন শোষণ হতে যাবে? মানুষের সামনে যৌনাঙ্গ দেখানো সভ্যতা আর শালীনতাবিরোধী। এর সাথে মাথার চুল ঢাকার তুলনা হয় কীভাবে?
প্রশ্ন-শরীরের কোনো অংশ উন্মুক্ত করা সভ্যতা আর শালীনতাবিরোধী আর কোনো অংশ উন্মুক্ত করা সভ্যতা আর শালীনতাসম্মত, সেটা কে ঠিক করল?
উত্তর-আরে! এখানে ঠিক করার কী আছে? এটাই তো স্বাভাবিক।
প্রশ্ন-কোনটা স্বাভাবিক, সেটা কে ঠিক করল? কিসের ভিত্তিতে ঠিক হলো? স্বাভাবিকের এই ধারণাই-বা কোথা থেকে এল?
উত্তর-উম...
প্রশ্ন-অতীত ও বর্তমানের এমন শত শত সংস্কৃতি আছে যেখানে এ সীমারেখাগুলো ভিন্নভাবে টানা হয়। শালীনতা, সভ্যতা, নগ্নতার মাপকাঠি যেখানে আলাদা। এগুলো সব এককথায় উড়িয়ে দেবে?
উত্তর-উম...
প্রশ্ন-সারা পৃথিবীর মানুষকে কেন তোমাদের স্ট্যান্ডার্ডই মেনে নিতে হবে? মুসলিম- বিশ্বের মানুষকে কেন পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড মানতে হবে? তোমাদের এসব আবদার কিসের ভিত্তিতে জাস্টিফাই করা যায়?
উত্তর-...
***
দেখুন, পোশাকের ব্যাপারে ইসলামী মাপকাঠির ভিত্তি হলো আল্লাহর আদেশ। শরীরের কোন অংশ ঢাকতে হবে, কোন অংশ উন্মুক্ত রাখা যাবে, এটা আমরা জেনেছি আল্লাহর কাছ থেকে। আমরা তাঁর আদেশ ও নির্দেশনা মেনে চলি। সাধ্যমতো এসব বিধানের সার্বিক গুরুত্ব এবং হিকমাহ অনুধাবনের চেষ্টা করি। অন্যরা এগুলো বিশ্বাস না করতে পারে, সেটা তাদের ব্যাপার। কিন্তু এটাই আমাদের মাপকাঠি। আর এর ভিত্তি হলো ওয়াহি।
কিন্তু পোশাকের ব্যাপারে পশ্চিমা মাপকাঠির একমাত্র ভিত্তি হলো সাংস্কৃতিক প্রথা ও প্রচলন। আর এগুলোর কোনো মূলনীতি কিংবা উৎস থাকে না। দিনশেষে সাংস্কৃতিক প্রথাপ্রচলনের ভিত্তি হলো-
আমরা এমন করেই অভ্যস্ত
আমাদের বাপ-দাদাকে এমন করতে দেখেছি
আমরা এগুলো মেনে চলি কারণ আমাদের কাছে এগুলো সঠিক মনে হয়
এর বাইরে আর কোনো ভিত্তি তাদের নেই। মজার ব্যাপার হলো পশ্চিমের নিজস্ব অবস্থানের কোনো ভিত্তি না থাকলেও এরা চরম উগ্র আর উদ্ধত হয়ে অন্য সবার ওপর নিজের অবস্থান চাপিয়ে দিতে চায়। অন্যদিকে, আমাদের অবস্থানের ভিত্তি সবচেয়ে মজবুত, সবচেয়ে দৃঢ়। তবু আমরা অল্পতেই পিছিয়ে যাই। আল্লাহর হুকুম আর ওয়াহির কথা না বলে 'চয়েস' আর ফ্রিডমের' মতো অর্থহীন বুলি আঁকড়ে ধরি।
বি.দ্র.- মুসলিম নারী কেন হিজাব পালন করবে তা নিয়ে এখানে আলোচনা করা হয়নি; বরং এটা ইসলাম এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত বহুল-প্রচলিত একটি অভিযোগের (ইসলাম শোষণমূলক, অযৌক্তিক, ইসলাম ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সম্মান করে না...ইত্যাদি) জবাব।
📄 নারীবাদ ও হিজাব (কিংবা ঢালাওভাবে আধুনিক বয়ান গ্রহণের বিপদ)
আমরা কীভাবে পোশাক পরছি (কিংবা খুলছি) তার নেতিবাচক প্রভাব অন্যদের ওপর পড়তে পারে। ইসলামী এবং সেক্যুলার-দু-ধরনের আইনই এটা স্বীকার করে।
ইসলাম আমাদের শেখায়, মন এবং মস্তিষ্ককে দৃষ্টি প্রভাবিত করতে পারে। সমাজ যদি অনাবৃত মানুষ পরিপূর্ণ হয়, রাস্তাগুলো যদি শরীর দেখাতে উন্মুখ নারীপুরুষে ভরে যায়, তাহলে সমাজে ফাহেশা এবং ফাসাদ তৈরি হবে।
নগ্নতা এবং অশালীনতার নেতিবাচক প্রভাবের কথা সেক্যুলার সংস্কৃতিও স্বীকার করে। এ কারণেই স্কুলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট ড্রেস কোড থাকে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে জনসম্মুখে অশালীন আচরণের ব্যাপারে আইন (indecent exposure laws) থাকে।[৬২] আর পর্নোগ্রাফির শারীরিক, মানসিক এবং স্নায়বিক ক্ষতি নিয়ে তো অনেক গবেষণা হয়েছে।
কাজেই আপনি কী পরছেন তার গুরুত্ব আছে। নারী যেভাবে ইচ্ছা, যা ইচ্ছা পরতে পারবে, খুলতে পারবে; এখানে আর কারও কথা বলার অধিকার নেই-নারীবাদীদের এই দাবি ভুল এবং বিপজ্জনক। অবশ্যই এখানে অন্যদের কথা বলার অধিকার আছে। কোন সীমার ভেতরে পোশাক পরতে হবে পশ্চিমা দেশগুলোর সরকার 'indecent exposure' আইনের মাধ্যমে সেটা নারীপুরুষকে জানিয়ে দেয়। পশ্চিমা আইন যদি এমন করতে পারে তাহলে ইসলামী আইন কেন পারবে না?
মৌলিকভাবে নীতি তো একই। পার্থক্য হলো অশালীনতার সংজ্ঞা নিয়ে। অশালীনতার ব্যাপারে পশ্চিমা সমাজের সংজ্ঞা আর ইসলামের সংজ্ঞা এক না। ওদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ন্ত্রিত হয় ক্রমপরিবর্তনশীল সংস্কৃতির দ্বারা। আর অশালীনতার ব্যাপারে ইসলামী মাপকাঠির ভিত্তি হলো মানবজাতির সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে আসা ওয়াহি। যিনি মানুষ এবং তার প্রকৃতি সম্পর্ক সর্বাধিক অবগত। যিনি জানেন কোনটা আসলে আমাদের জন্য উপকারী আর কোনটা ক্ষতিকর।
সূরা ৩৩ এর ৫৯ আয়াতের কথা চিন্তা করুন-
হে নবী, তুমি তোমার স্ত্রীদের, তোমার কন্যাদের আর মু'মিনদের নারীদের বলে দাও-তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয় (যখন তারা বাড়ির বাইরে যায়), এতে তাদের চেনা সহজতর হবে এবং তাদের উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [তরজমা, সূরা আল-আহযাব, ৫৯]
এই আয়াতে পর্দা করার প্রধান একটি কারণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে-নিগ্রহ এবং হয়রানি এড়ানো। হিজাব কেন উপকারী, হিজাব কেন যৌক্তিক এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে ন্যায়বিচারের জন্য সবচেয়ে উপযোগী তা আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন। মডার্নিস্ট মুসলিমরা যদিও মনে করে হিজাব একটা অন্তঃসারহীন প্রথা, একটা প্রতীকী বিধান, কিন্তু আল্লাহর কুরআনের বক্তব্য ভিন্ন।
হিজাবকে গুরুত্বহীন সাংস্কৃতিক ফসিল কিংবা নারীকে পরাধীন রাখার উপকরণ হিসেবে দেখা হলো সেক্যুলার অবস্থান। একইভাবে হিজাবকে বিকিনির সাথে তুলনা করা, দুটোকেই নারী স্বাধীনতা, নারী ক্ষমতায়ন এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার পরিচায়ক হিসেবে সমান মনে করাও সেক্যুলার মানসিকতার ফসল।
না, হিজাব অবশ্যই বিকিনির চেয়ে নৈতিকভাবে, যৌক্তিকভাবে এবং ব্যবহারিকভাবে উত্তম। সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা নিয়ে ফাঁকা বুলি আওড়ানোর বদলে এই সত্য নিয়ে গর্বিত হোন। আল্লাহ কি কোনো কারণ ছাড়া হিজাবের বিধান দিয়েছেন? নাকি এই বিধানের পেছনে হিকমাহ আছে, মানবজাতির কল্যাণ নিহিত আছে?
শরীর উন্মুক্ত করা ভালো, ইচ্ছেমতো নিজের দেহ দেখানোর অধিকার সবার আছে-এই মডার্নিস্ট দাবিগুলো আমাদের প্রত্যাখ্যান করতে হবে। হিজাব আল্লাহর বিধান। মদ, জুয়া, শূকরের মাংস থেকে বিরত থাকাও আল্লাহর বিধান। আমরা বিশ্বাস করি মদ, জুয়া এবং শূকরের মাংস থেকে বিরত থাকা আমাদের জন্য কল্যাণকর। একইভাবে আমাদের বিশ্বাস করতে হবে হিজাব পালন করাও আমাদের জন্য কল্যাণকর। হয়তো আমরা এমন সমাজে বসবাস করছি যেখানে এই বিধান 'আরোপ করা'-র সুযোগ নেই। কিন্তু তার মানে এই না যে আমরা এই বিধানকে সঠিক এবং মানবজাতির জন্য সবচেয়ে কল্যাণকর মনে করব না। এ বিশ্বাসকে ধরে রাখতে হবে। আর কিছু না হোক আমাদের সন্তানরা যেন হিজাবের বিধান পালন করে তা নিশ্চিত করার জন্য হলেও এই বিশ্বাস রাখা জরুরি।
আমরা যদি মনে করি হিজাব প্রতীকী এবং এর কোনো ব্যবহারিক কার্যকারিতা নেই, তাহলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের অনেকেই হিজাবকে অর্থহীন মনে করে ত্যাগ করবে। হিজাবকে তারা দেখবে এক সাংস্কৃতিক ফসিল হিসেবে, প্রতীকী গুরুত্বের বাইরে যার আর কোনো অর্থ নেই। অনেকে তো এখনই এভাবে চিন্তা করছে। মুসলিম নারীদের অধিকাংশই আজ হিজাব করে না। কেন? এই দোষ তো শুধু মুসলিম নারীদের না। আমরা সবাই এর জন্য দায়ী। আমরা সবাই পরীক্ষার কঠিন সময় পার করছি। কিন্তু কঠিন সময়েও চিন্তা বিশুদ্ধ থাকা জরুরি।
ফাঁপা বুলিগুলো ছুড়ে ফেলুন। চোখ খুলুন।
টিকাঃ
[৬২] indecent exposure laws-কেউ যদি স্বেচ্ছায় নিজের শরীরের এমন কোনো অংশ জনসম্মুখে উন্মুক্ত করে যা ওখানকার লোকাল স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী অসংগত বলে বিবেচিত, তবে তা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে। এ ধরনের আইনকে indecent exposure laws বলা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন সেক্যুলার দেশে এ ধরনের আইন আছে। – অনুবাদক
📄 হিজাব যখন অবাধ্যতা
ইসলাম ও নারী নিয়ে বিবিসির একটা ডকুমেন্টারি দেখছিলাম। একজন মুসলিম নারীকে (যে হিজাব পরে) প্রশ্ন করা হলো, 'হিজাব কি একধরনের শোষণ না? জবাবে মহিলা ভয়ংকর এক উত্তর দিলো—
'কেউ যদি আমাকে বলে, 'তোমাকে হিজাব পরতেই হবে', তাহলে আমি হিজাব পরবো না। হিজাব পরতে বাধ্য করা হলে আমি হিজাব খুলে ফেলব। আমি হিজাব পরি ভালোবাসা থেকে। এটা আমার পরিচয়। আমি এটা পরতে ভালোবাসি। এমনকি, আল্লাহ হিজাব পরতে বলেছেন তাই হিজাব পরি, এটাও আমি বলি না। আল্লাহ যা যা করতে বলেছেন, সবকিছুর ব্যাপারে আমাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন। আমি হিজাব পরি, কারণ আমি নিজে এটা পরতে চাই। আমি এটা ভালোবাসি। এটা আমার ধর্মের অংশ এবং আমি এটা ঔন করি।'
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো ওপরের কথাগুলোর মধ্যে সমস্যা কী, অনেক তরুণ মুসলিম সেটা বুঝতে পারে না। এ ধরনের বক্তব্যের ভেতরে থাকা কুফরকে তারা চিনতে পারে না। এটাই হলো লিবারেলিসমের কলুষিত করার ক্ষমতা। মানুষের চিন্তাচেতনাকে লিবারেলিসম খুব সূক্ষ্মভাবে সংক্রমিত করে। ধীরে ধীরে ঈমানকে ক্ষয় করে করে একদম নষ্ট করে ফেলে। কিন্তু মানুষ বুঝতেও পারে না।
আল্লাহও যদি আমাকে কিছু করতে বলেন, আমি করব না—এমন কথা একজন মুসলিম কীভাবে বলে? এমন কথা শুধু তখনই বলা সম্ভব যখন লিবারেলিসমের আদর্শে পুরোপুরিভাবে তার মগজধোলাই হয়ে গেছে।
লিবারেলিসম কী শেখায়? লিবারেলিসম শেখায়—কাউকে কোনো কিছু করতে বাধ্য করার অর্থ তার 'অটোনমি' বা ব্যক্তিস্বাধীনতা ছিনিয়ে নেয়া। তার স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকারে হস্তক্ষেপ করা। আর যা কিছু মানুষের স্বাধীনতা খর্ব করে তা মন্দ। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়ার অর্থ মানুষের পরিচয় ছিনিয়ে নেয়া। এর চেয়ে খারাপ আর কী হতে পারে?
কেউ যখন এভাবে চিন্তা করে তখন ইসলামের বিধি-বিধানের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে তা সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু আল্লাহ কি আমাদের জন্য কিছু কাজ বাধ্যতামূলক করেননি? কিছু কাজ নিষিদ্ধ করেননি? যারা আল্লাহর বিধান মেনে চলবে না, আল্লাহর আনুগত্য করবে না, তাদের জন্য কি আল্লাহর শাস্তির প্রতিশ্রুতি দেননি? এটা কি বলপ্রয়োগ না? হুমকি না?
লিবারেলিসমে আক্রান্ত মুসলিম এই প্রশ্নগুলোর জবাবে দুটো উত্তর দিতে পারে—
১। আল্লাহ খারাপ (নাউযুবিল্লাহ)
২। আল্লাহ খারাপ নন, তবে তিনি আমাদের জন্য কোনো কিছু বাধ্যতামূলক করেননি, কোনো কিছু নিষিদ্ধও করেননি।
দুটো অবস্থানই কুফর।
এই উভয়সংকট থেকে বের হবার উপায় হলো লিবারেলিসমের ক্রিটিক করা। স্বাধীনতা, বলপ্রয়োগের মতো ধারণাগুলোর ব্যবচ্ছেদ করা।
📄 ‘হিজাব আমার চয়েস’, এবং অন্যান্য বিভ্রান্তি
হিজাবের যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য 'চয়েস' বা 'সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা'র কথা বলা অর্থহীন। আধুনিক মানুষ আসলে কোন অর্থে তার পোশাক 'বেছে' নেয়? পশ্চিমা নারী সরলমনে বিশ্বাস করে তার পরনের পোশাক তার নিজের বাছাই করা, সে স্বেচ্ছায় এ পোশাক বেছে নিয়েছে। কিন্তু সে আসলে ঠিক ওই ট্রেন্ডগুলো অনুসরণ করে যেগুলো ভারসাচি, শ্যানেলের মতো ব্র্যান্ড কিংবা টিভি চ্যানেল আর ফ্যাশন ম্যাগাযিনগুলো প্রমোট করে। এটা কি কাকতালীয়? এসব কর্পোরেশানের বেধে দেয়া ফ্যাশনের স্ট্যান্ডার্ড পশ্চিমা নারী যতটা অন্ধভাবে মেনে চলে, সবচেয়ে অন্ধ মুরিদও অত অন্ধভাবে তার পীরের অনুসরণ করে না।
সমাজের নারীদের পোশাক যদি আসলেই তাদের স্বাধীন পছন্দ অনুযায়ী বাছাই করা হতো, তাহলে আমরা বিভিন্ন ধাঁচের পোশাক দেখতাম। শরীরের কোনো অংশ ঢাকা হবে আর কোনো অংশ উন্মুক্ত রাখা হবে সেটা নিয়েও অনেক পার্থক্য দেখা যেত। পোশাকগুলোর উৎসও আলাদা হতো। কিন্তু পশ্চিমা সমাজে আমরা সেটা দেখি না; বরং উল্টোটা দেখি। সমাজের নারীরা (এবং পুরুষরাও) একই ধরনের পোশাক পরে। কারণ, নগ্নতা, শালীনতা, ফ্যাশন ইত্যাদির ব্যাপারে তাদের সবার ধ্যানধারণা মোটামুটি একই। তা ছাড়া অধিকাংশ মানুষ একই ব্র্যান্ডের পোশাক কেনে। এসব পোশাকের রং, ফ্যাব্রিক, কাটিংয়ে অল্পসল্প কিছু পার্থক্য দেখা যায়। কিন্তু মূল থিম এক। অথচ মানুষ মনে করছে তারা স্বাধীনভাবে এসব পোশাক বেছে নিয়েছে।
এটা আসলে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের অতিরঞ্জিত অনুভূতি ছাড়া আর কিছু না। হ্যাঁ, আপনার ব্লাউসের রং আপনি নিজে বাছাই করছেন। কিন্তু বুক যে ঢাকতে হবে, এটা আপনি বেছে নেননি। আপনার আশেপাশে যে দোকানগুলো আছে, সেটা আপনি ঠিক করেননি। দোকানগুলোতে যে ঘুরেফিরে যে একই ডিসাইনগুলো দেখা যায়, সেটাও আপনি ঠিক করেননি।
মানুষকে আপনি যত সীমিত অপশানই দিন না কেন, মানুষ মনে করবে সে স্বাধীন। সে নিজের স্বাধীনতার চর্চা করছে। পশ্চিমা সমাজ যেহেতু 'সিদ্ধান্ত' আর 'ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য' নিয়ে ঘোরের মধ্যে থাকে তাই এমন হওয়া অবধারিত। লক্ষ লক্ষ নারী সেই একই বুট, জ্যাকেট আর ইয়োগা প্যান্টস পরছে। সেই একই ডিসাইনের অলংকার আর পারফিউম ব্যবহার করছে। ফ্যাক্টরিগুলোতে বানানো হচ্ছে একই আইটেমের কোটি কোটি কপি। সবগুলো এক। অথচ এই পশ্চিমা নারী বোরকা পরা মুসলিম নারীকে বলছে তুমি শোষিত, তোমার কোনো স্বাধীনতা নেই, তোমার কোনো স্বকীয়তা নেই ইত্যাদি...।
অন্যদিকে যাদের শোষিত বলা হচ্ছে, সেই মুসলিম নারীদের অনেকে আবার সাক্ষাৎকার কিংবা প্রবন্ধে অনুনয়-বিনয় করে পশ্চিমাদের বোঝানোর চেষ্টা করছে-না না! আমি শোষিত না, আমি তোমাদের মতোই স্বাধীন। হিজাব আমার চয়েস!' কী বিচিত্র!