📄 নারীবাদে সমালোচনার সঠিক পন্থা
আমি নারীবাদের সমালোচনা করি। তবে নারীবাদী ট্যাগ লাগিয়ে কারও মুখ বন্ধ করা বা বক্তব্য উড়িয়ে দেয়া সমর্থন করি না। আমাদের চারপাশে নারীর প্রতি যুলুমের অনেক ঘটনা ঘটে। আমাদের অনেকের পরিবারেও ঘটে। কেউ যখন এসবের বিরুদ্ধে মুখ খোলে, যখন কেউ সাহায্য বা বিচার চায়, তখন নারীবাদী ট্যাগ লাগিয়ে তার অবস্থানকে উড়িয়ে দেয়া উচিত না। এমনকি কোনো নারীবাদীও যদি যুলুম বিরুদ্ধে বলে, বিচারের দাবি করে তাহলে নিছক নারীবাদী হবার কারণে তার কথা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
নারীবাদের বিরোধিতার করার মানে নারীর অধিকারের বিরোধিতা করা না। নারী অধিকারের পক্ষ নেয়ার অর্থ নারীবাদী হওয়া না। কেন যেন এই সহজ বিষয়টা অনেকে বুঝতে চান না। নারীর অধিকার নিয়ে আলোচনা করা নারীবাদের একচেটিয়া অধিকার না। সমাজ ও পরিবারে নারীর কল্যাণ, সুস্বাস্থ্য এবং স্বার্থ নিয়ে চিন্তা করা নারীবাদ না। যদি তাই হয় তাহলে আমি নারীবাদী।
বাস্তবতা হলো, নারীবাদীরা কেবল বাহ্যিক, ভাসাভাসাভাবে নারীর স্বার্থ নিয়ে চিন্তিত। নারীবাদের ইতিহাস এবং আদর্শিক বংশগতির দিকে গভীরভাবে তাকালে বোঝা যায়, নারীবাদের অনেক দিকই নারীর স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক। তাই আমাদের নারীবাদের বিরুদ্ধে বলতে হবে। সেই সাথে এটাও বুঝতে হবে যে কোনো একটা দর্শনের অ্যাকাডেমিক ক্রিটিক করা এক জিনিস আর নারীর ওপর চলা যুলুমের সাফাই গাওয়া ভিন্ন জিনিস।
আমাদের আরও মনে রাখা দরকার যে নির্যাতন কেবল শারীরিক হয় না। মানসিক নির্যাতন অনেক সময় শারীরিক নির্যাতনের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর হয়।
📄 মাতৃত্বের সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি
মাতৃত্বের ধারণা এবং গুরুত্বকে আধুনিক সমাজ মারাত্মকভাবে হেয় করে। অনেক মায়েরাও নিজেদের 'সামান্য গৃহিণী' কিংবা 'বাচ্চার দেখাশোনা করা মহিলা' মনে করেন। 'গৃহিণী-মা', মানেই নেতিবাচক কিছু মনে করা হয়। ঘরে সন্তানের দেখাশোনা করা মা মানেই যেন দুর্বল, অসহায়, পরনির্ভরশীল, ভীরু কোনো ভিকটিম। যে নারী ঘরে থেকে মাতৃত্বের দায়িত্ব পালন করে তার ব্যাপারে ধরে নেয়া হয়, তাকে এমন করতে বাধ্য করা হচ্ছে অথবা সে অজ্ঞতা, পশ্চাৎপদতা কিংবা বোকামির কারণে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নারী নিজে থেকে এই সিদ্ধান্ত নিলে ব্যক্তিস্বাধীনতার জায়গা থেকে আধুনিক সমাজ হয়তো সেটা মেনে নেয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পক্ষে অন্য কোনো যুক্তি বা বৈধতা তাদের চোখে ধরা পড়ে না। আধুনিক পৃথিবীর চোখে অর্থহীন কোনো কাজের পেছনে পুরো জীবন ব্যয় করা লোকের সিদ্ধান্ত, আর একজন মায়ের ঘরে থাকা সিদ্ধান্তের মূল্য সমান।
এর বাইরে মাতৃত্বের আর কোনো মূল্য কিংবা তাৎপর্য আমাদের সমাজে নেই। মানুষ মা-কে ভালোবাসে, ভালোবাসার কথা বলে, মা-দিবস পালন করে। কিন্তু মায়ের ভূমিকা, মাতৃত্বের গুরুত্ব নিয়ে তেমন একটা চিন্তা করা হয় না।
নিচের কথাগুলো একজন খ্রিষ্টান লেখকের লেখা।
'হ্যাঁ, আমার স্ত্রী চাকরি করে না। কোনো রোজগার করে না। ও বাসায় থাকে। ও একজন মা। মামুলি গৃহিণী মা। যে মা জন্ম দেয়। যে মা শিশুর জীবনকে রং দেয়, কাঠামো দেয়। যে মা ঘর সামলায়, সবদিকে খেয়াল রাখে, সেই সাথে তার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল শিশুগুলোকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
হ্যাঁ, আমার স্ত্রী চাকরি করে না। ওর 'ক্যারিয়ার' নেই। ও তো শুধু একজন ঘরে বসে থাকা মা, আর কিছু না। সেই মা যে আমাদের যমজ সন্তানদের বড় করে। ওদের মানুষ হতে শেখায়। আদাব, আচরণ, নৈতিকতা শেখায়। অ-আ-ক-খ থেকে শুরু করে কীভাবে নিজেকে পরিষ্কার করতে হয়-সবকিছু ও-ই শেখায়। সেই মা যে আমার এবং আমাদের পরিবারের নোঙর। সেই ভিত্তিপ্রস্তর, যাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বাকি সবকিছু। সেই মা যে সবার জন্য সবকিছু করে। সব চাহিদার দিকে খেয়াল রাখে। সবাইকে খুশি রাখে। যদি ও আর ওর মতো মায়েরা না থাকে তাহলে ভেঙে পড়বে পরিবার, সমাজ, সবকিছু।
হ্যাঁ, ও তো শুধু মা। মামুলি গৃহিণী মা। যেমন আমাদের মাথার ওপরে উজ্জ্বল সোনালি গোল জিনিসটা, কেবল সূর্যই তো, আর কিছু না।'
মা হিসেবে নারী যে ভূমিকা পালন করে তার গুরুত্ব আমাদের উপলব্ধি করা উচিত। এর কদর করা উচিত। একজন মা ৯-৫টা চাকরি করে না, তাই সমাজের প্রতি তার কোনো অবদান নেই এমন মনে করা মূর্খতা।
মা হিসেবে নারীর গুরুত্ব উপলব্ধি করা এবং মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কিন্তু এটা কেবল একটা দিক। সমাজ ও জাতির ওপর মায়েদের যে তীব্র ও প্রগাঢ় ভূমিকা সেটাও আমাদের বোঝা দরকার। পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তাচেতনার প্রাথমিক কাঠামো গড়ে দেয় মায়েরাই।
তাহলে আধুনিকতা আর নারীবাদ কেন মায়েদের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা স্বীকার করতে চায় না?
কারণ, ওরা বিশ্বাস করে শক্তি, সম্মান, ক্ষমতা, গুরুত্ব পাওয়া যায় শুধু ঘরের বাইরে। চাকরি, ব্যবসা, রাজনীতির মতো কাজে। আর এসব জায়গা নিয়ন্ত্রণ করে পুরুষ। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তিপরিমণ্ডলের শক্তিকে পুরোপুরিভাবে উপেক্ষা করে। (যদি আসলেই পাবলিক ও প্রাইভেটের মধ্যে এমন কোনো বিভাজন করা সম্ভব হয়)
বরং যে নারীরা বাসায় থাকেন অর্থনীতি, সমাজ এবং রাজনীতির ওপর তাদেরও গভীর প্রভাব থাকে। কারণ, পরবর্তী প্রজন্ম তাদেরই হাতে গড়ে ওঠে। তাই মাতৃত্ব নিয়ে হীনম্মন্যতা বোধ করার বদলে নারীর উচিত তার সামনে থাকা পথ দুটো নিয়ে ভালোভাবে চিন্তা করা। নারী যখন চাকরি কিংবা ব্যবসা করে তখন আমরা তার বুদ্ধি, আন্তরিকতা, পরিশ্রম, আর অধ্যবসায়ের প্রশংসা করি। অথচ এই বৈশিষ্ট্যগুলো একজন ভালো মায়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আরও বেশি প্রযোজ্য। যেসব উচ্চশিক্ষিত নারী চাকরি না করে ঘরে থাকেন তাদের ব্যাপারে কীভাবে লোকে বলে তারা নিজেদের শিক্ষা আর মেধা নষ্ট করছে? ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা জলাঞ্জলি দিচ্ছে?
আধুনিক মানুষ কতই-না বিভ্রান্ত!