📄 পুরুষতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক
২০১৫-তে নারীবাদ নিয়ে এক বিতর্কে অংশ নেয়ার প্রস্তাব এসেছিল। বিতর্ক হবার কথা ছিল আমাদের এলাকার এক মসজিদে। অনুষ্ঠানের মাসখানেক আগে সোশ্যাল মিডিয়াতে ঘোষণাও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে অনুষ্ঠান বাতিল করে দেয়া হলো। কেন হলো, তা আজ পর্যন্ত আমাকে জানানো হয়নি। আয়োজকরা কেন এই বিতর্ক বাতিল করেছিলেন, এই সিদ্ধান্ত কাদের ছিল, আমার জানা নেই। এ রকম ঘটনা আগেও হয়েছে। আমার ধারণা সামনে আরও হবে।
বিতর্কের প্রস্তুতি হিসেবে আমি কিছু নোটস তৈরি করেছিলাম। সেই নোটস অনুযায়ী আমার মূল অবস্থান সংক্ষিপ্তভাবে নিচে তুলে ধরছি। এ অবস্থানকে অনেকের কাছে অগ্রহণযোগ্য এমনকি আপত্তিকরও মনে হয়, তা তো বুঝতেই পারছেন। কিন্তু আমি মনে করি এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা দরকার। অনেক প্রশ্নকে আজ অস্বস্তিকর, কিংবা অসুবিধাজনক মনে হয়, কিন্তু ইসলামের এবং মুসলিমদের স্বার্থে এ প্রশ্নগুলো তোলা জরুরি। যেসব ধ্যানধারণার প্রভাবে মুসলিমরা সন্দেহ এবং সংশয়ে পড়ছে- সেগুলো নিয়ে অবশ্যই অ্যাকাডেমিকভাবে আলোচনা করার সুযোগ থাকা উচিত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই আলোচনাগুলো হোক এটা অনেকে চান না। যারা এ প্রশ্নগুলো তোলে, তাদের কথা বলার সুযোগ দেয়া হয় না।
যাই হোক, আমার ইচ্ছা ছিল ওই বিতর্কে নারীবাদের বিপক্ষে ঐতিহাসিক এবং দার্শনিক বিভিন্ন যুক্তিতর্ক তুলে ধরার। বিশেষ করে নারীবাদীদের নিজেদের লেখা থেকে বিভিন্ন বিষয় দেখানো। এ ছাড়া নারীবাদীরা হিংস্রভাবে মুসলিম আলিমদের আক্রমণ করে, তাই আলিমদের সমর্থনেও আমি কিছু কথা প্রস্তুত করেছিলাম।
এমন কিছু পয়েন্ট এখানে তুলে ধরছি।
নারীবাদের দ্বিতীয় পর্যায়ের শুরুর সময় থেকে একটা ধারণা বেশ প্রচার পেয়েছে। ধারণাটা সংক্ষেপে এ রকম-
প্রত্যেক সমাজে কিছু ক্ষমতার সম্পর্ক এবং লেনদেন থাকে। বিভিন্ন আর্থসামাজিক শ্রেণি, বর্ণ এবং গোত্রের মতো দুই লিঙ্গের মধ্যেও থাকে ক্ষমতার বোঝাপড়া। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি এবং রাজনৈতিক শক্তি যেমন একে অপরের সাথে শক্তির জন্য প্রতিযোগিতা করে, তেমনি নারীপুরুষও শক্তির জন্য একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করে। আর এই ক্ষেত্রে প্রত্যেক সমাজে শক্তির একটা ভারসাম্যহীনতা আছে। প্রত্যেক সমাজে পুরুষ নারীর ওপর কর্তৃত্ব করে। নারীর ওপর পুরুষের কর্তৃত্বের এই কাঠামোটা হলো পুরুষতন্ত্র।
নারীবাদের ভাষ্য অনুযায়ী-পুরুষ যে সব সময় সচেতনভাবে নারীকে শোষণ করার চেষ্টা করছে, তা না। যদিও অনেক ক্ষেত্রে এমনটা হয়ে থাকে। পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি। বর্তমানে এই কর্তৃত্ব অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রকাশ্য। পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার ফলে এমন এক অনমনীয় কাঠামো তৈরি হয়েছে, যা নারীদের শোষণ করছে। তাই নারীবাদ বলে, এই পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াই করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
এই কথাগুলো ধর্মের ক্ষেত্রেও খাটে। নারীবাদীরা মনে করে প্রত্যেক ধর্মের ধর্মগুরুরা পুরুষতান্ত্রিক এবং তারা নারীর প্রতি দমনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে।
এ ক্ষেত্রে মুসলিম নারীবাদীরা কিছুটা আপত্তি করে। তারা বলে স্রষ্টা পুরুষতান্ত্রিক নন। নারীকে তিনি পুরুষের অধীন করতে চান না। ইসলাম সাম্যবাদী ধর্ম। ইসলাম নারী ও পুরুষের সমানাধিকারের ধর্ম। সমস্যা হলো, মুসলিম পুরুষরা ইসলামকে পড়েছে পুরুষতান্ত্রিক চোখে। এভাবে তারা ইসলাম পড়েছে, বুঝেছে, শিখেছে এবং শিখিয়েছে। ফলে মুসলিমদের মধ্যে এমন বিভিন্ন বিধান আর প্রথা তৈরি হয়ে গেছে যেগুলোর মাধ্যমে মুসলিম নারীকে শোষণ করা হচ্ছে।
এই অবস্থান থেকে মুসলিম নারীবাদীদের মধ্যে একেকজন একেকদিকে আলোচনা নিয়ে যায়।
বহুবিবাহ কি ইসলামের অংশ নাকি পুরুষতান্ত্রিক সংযোজন?
নারীর ব্যাপারে কিছু কিছু হাদীস কি সত্যিকারের ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে, নাকি এগুলো পুরুষতন্ত্রের বানানো?
নারীদের ব্যাপারে পূর্ববর্তী আলিমগণ যেসব কথা বলেছেন সেগুলোতে কি ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা ফুটে উঠেছে? নাকি পুরুষতন্ত্রের লেন্সের কারণে তাদের বিবেচনাবোধ প্রভাবিত হয়েছে?
ইসলামের এমন শত শত দিক আছে, যা আধুনিক নারীবাদের চোখে সমস্যাজনক। নারীবাদের দর্শন অনুযায়ী ইসলামের এই দিকগুলো প্রমাণ করে ইসলাম নারীকে পরাধীন করে এবং শোষণ করে কিংবা নিদেনপক্ষে বঞ্চিত করে।
এ ধরনের বিষয়গুলো মুসলিম নারীবাদীদের জন্য সংকট তৈরি করে। যেহেতু তারা দাবি করে ইসলাম নারী ও পুরুষকে সমানাধিকার দেয়-তাই এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য করার বিভিন্ন উপায় তাদের বের করতে হয়।
আমার মতে নারীবাদ-সেক্যুলার কিংবা মুসলিম-ভ্রান্ত। লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তিতে সামাজিক সংঘর্ষের এই ধারণা বুদ্ধিবৃত্তিক এবং প্রমাণের দিক থেকে ত্রুটিপূর্ণ। কেবল নারীদের অধীন করে রাখার জন্য পুরুষরা একটা বৈশ্বিক কাঠামো তৈরি করেছে ও টিকিয়ে রেখেছে-এ দাবির কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মানদণ্ডেও এই দাবি টেকে না।
হ্যাঁ, ইতিহাসে প্রায় সব সমাজ ও সভ্যতায় কর্তৃত্ব ছিল পুরুষের হাতে, সত্য। কিন্তু এই কর্তৃত্ব ছিল নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ-সবার কল্যাণের জন্য। নারীকে অধীন করে শুধু পুরুষের স্বার্থসিদ্ধির জন্য না।
নারীবাদীদের যে অবস্থানগুলোর কথা এতক্ষণ বললাম সেগুলো সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক। কেউ যখন বিশ্বাস করে ১৪০০ বছরের ইসলামী ইলমের সিলসিলা পুরুষতন্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং প্রভাবিত, তখন তার ঈমানের ওপর এর প্রভাব কেমন হবে? অতীত ও বর্তমানের সব সমাজ পুরুষতন্ত্র দ্বারা আক্রান্ত, এমন দাবির জ্ঞানতাত্ত্বিক তাৎপর্য কী? এ থেকে মানবপ্রকৃতি এবং মানুষের স্রষ্টার ব্যাপারে কী উপসংহার পাওয়া যায়? নারী ও পুরুষের সম্পর্ক, পারিবারিক সহিংসতাসহ যে সমস্যাগুলো মুসলিম সমাজে আছে, সেগুলোর ব্যাখ্যা হিসেবে নারীবাদের এই পুরুষতন্ত্র তত্ত্ব কতটা উপযুক্ত?
এই প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে আমি যা বোঝাতে চাচ্ছি তা হলো-দুনিয়ার সব পুরুষ মিলে নারীকে শোষণ করার এক বৈশ্বিক কাঠামো তৈরি করেছে-নারীবাদের দেয়া এই পুরুষতান্ত্রিক তত্ত্ব একজন মুসলিমের ঈমানের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই তত্ত্ব সব ধর্ম এবং ধর্মীয় কর্তৃপক্ষকে পুরুষতন্ত্রের অংশ মনে করে। যারা অর্থ দাঁড়ায় ধর্ম হলো নারীকে অধীন বানিয়ে রেখে পুরুষের স্বার্থসিদ্ধির আরেকটা উপকরণমাত্র।
এমন কথা যারা বিশ্বাস করে তারা বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করবে এবং একসময় ইসলাম ত্যাগ করবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই মুসলিম নারীদের মধ্যে এই বিষাক্ত আদর্শের প্রচার হতে দেখা হতাশাজনক। নারীবাদ এবং এর সব সংস্করণ ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। মুসলিম নারীবাদীরা দ্বিমত পোষণ করতে পারে, কিন্তু তাতে বাস্তবতা বদলায় না। এই সাংঘর্ষিকতা খুব সহজে প্রমাণ করা যায়।
নারীবাদ ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ—
ক) দর্শন হিসেবে নারীবাদকে গ্রহণ করতে হলে আগে নারীবাদীদের প্রিয় ‘পুরুষতন্ত্র তত্ত্ব’ (Patriarchal Thesis)-কে মেনে নিতে হবে। পুরুষতন্ত্র তত্ত্ব হলো এই বিশ্বাস যে-সভ্যতার শুরু থেকেই পুরুষরা এমন এক বৈষম্যমূলক সামাজিক কাঠামো গড়ে তুলেছে এবং টিকিয়ে রেখেছে, যার উদ্দেশ্য নারীকে অধীন করা, শোষণ করা, নির্যাতন করা এবং তার ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখা।
খ) ‘পুরুষতন্ত্র তত্ত্ব’ মৌলিকভাবে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। এ দুয়ের মধ্যে কোনোভাবেই সমন্বয় করা সম্ভব না।
গ) সুতরাং নারীবাদ মৌলিকভাবে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক।
পুরুষতান্ত্রিকতার তত্ত্ব কেন ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক এবং ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষাক্ত?
১) পুরুষতান্ত্রিকতার এই তত্ত্ব নবুওয়্যাতের ধারাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে। সব নবী-রাসূল আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম পুরুষ ছিলেন। তবে ইবনু হাযমসহ আরও কয়েকজন আলিম বলেছেন নারীদের মধ্যে কেউ কেউ ওয়াহি পেয়েছিলেন। অল্প কয়েকজনের এ মতকে যদি আমরা গ্রহণও করি তাহলেও উপসংহার হলো, অধিকাংশ, প্রায় ৯৯% নবী-রাসূল ছিল পুরুষ। আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম। যদি পুরুষতন্ত্র তত্ত্বকে আমরা মেনে নিই, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, নবী-রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম) কি নারীর ওপর আধিপত্য ও কর্তৃত্ব করার জন্য তৈরি এই বৈষম্যমূলক পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর অংশ ছিলেন?
২) পুরুষতান্ত্রিকতার তত্ত্ব আলিমদের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ইসলামী ইতিহাসের অধিকাংশ আলিম ছিলেন পুরুষ। তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং সম্মানিতরা ছিলেন পুরুষ। তাদের সবারই এমন অনেক অবস্থান ছিল যেগুলো আধুনিক নারীবাদের দর্শন অনুযায়ী ‘চরম মাত্রার বিষাক্ত নারীবিদ্বেষী পুরুষতান্ত্রিক বাকওয়াস’ ছাড়া আর কিছুই না।
এসব আলিম ও ইমামগণ কি নারীর ওপর আধিপত্য ও কর্তৃত্ব করার জন্য তৈরি বৈষম্যমূলক পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর অংশ ছিলেন?
৩) ‘পুরুষতন্ত্র তত্ত্ব’ ইসলামী আকীদাহকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। পুরুষতন্ত্র যদি মানবজাতির জন্য এত বিপুল পরিমাণ দুঃখ-কষ্টের কারণ হয়ে থাকে, এতই বিষাক্ত, ধ্বংসাত্মক এবং গভীরে প্রোথিত সমস্যা হয়ে থাকে-তাহলে কুর'আনে কেন এ নিয়ে কিছুই বলা হলো না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেন এ বিষয়ে কিছু বললেন না? নারীবাদীদের মতে মানব-ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ শক্তিগুলোর মধ্যে পুরুষতন্ত্র অন্যতম। অথচ এই মারাত্মক বিষয়টার বর্ণনা দেয়ার মতো একটা শব্দও কেন আরবী ভাষায় নেই? মানবজাতিকে এই ভয়ংকর অভিশাপ, শোষণ আর নির্যাতনের ব্যাপারে সতর্ক করে একটি আয়াত, এক লাইন হাদীসও এল না কেন?
এই নিয়মতান্ত্রিক শোষণ ও নির্যাতনের ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহ যদি নিশ্চুপ থাকে, তাহলে কীভাবে কুরআন ও সুন্নাহকে পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা মনে করা সম্ভব?
যৌক্তিকভাবেই একজন ফেমিনিস্টের মনে ইসলামের ব্যাপারে এই প্রশ্নগুলো উদয় হতে বাধ্য। আর এ কারণেই নারীবাদীরা বিভ্রান্তির বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে যেতে থাকে এবং একপর্যায়ে এদের অনেকেই ইসলাম ত্যাগ করে।
শুরুটা হয় 'অশুভ পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি লালনের কারণে' ইসলামী ইতিহাসের আলিমদের ত্যাগ করা দিয়ে। তারপর তারা নবী-রাসূলগণকে (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) আক্রমণ করা শুরু করে। যেমন আমিনা ওয়াদুদ নামের এক মহিলা ইব্রাহিম আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম-কে নিয়ে কটূক্তি করেছে। তারপর তারা খোদ কুরআনের সমালোচনা করা শুরু করে-
* আল্লাহ কেন কুরআনে নিজের ব্যাপারে পুরুষবাচক সর্বনাম ব্যবহার করলেন?
* কেন আল্লাহ প্রথমে আদমকে, একজন পুরুষকে, সৃষ্টি করলেন?
* কেন আল্লাহ সূরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াত নাযিল করলেন?
পুরুষতন্ত্র তত্ত্ব নারীবাদের আদর্শিক ভিত্তিপ্রস্তর। আর এ তত্ত্ব সহজাতভাবেই একজন মুসলিমের মধ্যে বিশ্বাসের বিপর্যয় তৈরি করে। ফলে অনেক মুসলিম নারীবাদী ধাপে ধাপে নানা গোমরাহীপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করা শুরু করে, একসময় তাদের অনেকেই ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদে পরিণত হয়।
যারা দাবি করে ইসলাম ও নারীবাদের মধ্যে সমন্বয় সম্ভব, তারা দয়া করে ওপরের তিনটি পয়েন্টের জবাব দেবেন। আপনাদের হাতে সম্ভাব্য উত্তর সীমিত। ব্যাপারটা আরেকটু সহজ করার জন্য সম্ভাব্য উত্তরগুলোর লিস্ট আমি দিয়ে দিচ্ছি।
আপনি বলতে পারেন-
১) পুরুষতান্ত্রিকতার তত্ত্বে বিশ্বাস না করেও-অর্থাৎ সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই নারীকে অধীন ও শোষণ করার জন্য পুরুষতন্ত্র কাজ করছে-এ তত্ত্বে বিশ্বাসী না হয়েও নারীবাদী হওয়া সম্ভব, অথবা,
২) পুরুষতন্ত্র তত্ত্ব আসলে ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না।
কোনটা বেছে নেবেন?
সংস্কারপন্থী, প্রগতিবাদী এবং হাদীস অস্বীকারকারী জাতীয় যেসব লোক আছে; ইসলামী ইতিহাসের আলিমদের সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করতে যাদের সমস্যা নেই, তারা দু-নম্বরকে বেছে নেবে। কিন্তু সঠিক আকীদাহর ওপর থাকা সাধারণ মুসলিমরা এ সত্য স্বীকার করতে বাধ্য যে পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত ইলমী সিলসিলা ছাড়া আমরা কুরআন পেতাম না, সুন্নাহ পেতাম না, ইসলাম সংরক্ষিত হতো না-যেহেতু সাহাবা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম ওয়া আজমাইন, হাদীস বর্ণনাকারী, আলিম, মুহাদ্দিস, মুফাসসির, এবং ফক্কিহদের প্রায় ৯৯% পুরুষ।
যদি আলিমদের ছুঁড়ে ফেলেন, তাহলে ইসলামকেও ছুঁড়ে ফেলতে হবে। আলিমরা নবীদের (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) ওয়ারিশ। যদি কেউ দাবি করে, সারা বিশ্বজুড়ে ইসলামের আলিমরা সিস্টেম্যাটিকালি নারীর বিরুদ্ধে ছিলেন, তাঁরা নারীদের ব্যাপারে না-ইনসাফি করেছেন-তাহলে সে আলিমদের নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং কার্যত ইসলামকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
আমার মতে এটা নারীবাদ ও ইসলামের সহজাত সংঘর্ষের একটি যৌক্তিক পর্যালোচনা। কেউ দ্বিমত পোষণ করলে যৌক্তিক খণ্ডন উপস্থাপন করতে পারে। তবে আবেগ ও বুলি-সর্বস্ব ন্যাকামি, অ্যাড হমিনেম ঘ্যানঘ্যানানি আর রূপকথার রাজপুত্রসুলভ অভিনয় গ্রাহ্য করা হবে না।
বি.দ্র. কিছু অস্পষ্টতা দূর করা যাক।
***
অবশ্যই পুরুষতন্ত্রের অস্তিত্ব আছে। অ্যানথ্রোপোলজিকাল বা নৃতাত্ত্বিক অর্থে ইসলাম একটি পুরুষতান্ত্রিক ধর্ম। ইসলামী আইনে বংশপরিচয় নির্ধারিত হয় পিতৃপরিচয় দ্বারা। সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর কর্তৃত্ব থাকে পুরুষের হাতে, সেটা গোত্রপতি, স্বামী, পিতা কিংবা অন্য কোনো পুরুষ হতে পারে। কিন্তু নারীবাদের প্রচারিত 'পুরুষতন্ত্র'-এর ধারণা আর অ্যানথ্রোপোলজিকাল বা নৃতাত্ত্বিক অর্থে পুরুষতন্ত্রের ধারণার মধ্যে পার্থক্য আছে। নারীবাদ দাবি করে এ সবগুলো কাঠামো সহজাতভাবে নারীর প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ।
নারীবাদীদের দাবি হলো, পুরুষ এসব পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তুলেছে নারীর স্বার্থের বিনিময়ে পুরুষের সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য। অর্থাৎ, নিষ্পাপ, সাদাসিধে, দুর্ভাগা নারীদের আটকে রেখে শোষণ করার জন্য একদল শয়তান লোক ক্রমাগত চক্রান্ত করে চলেছে। সভ্যতার শুরু থেকে এই চক্রান্ত চলে আসলেও মাত্র কয়েক দশক আগে নারীবাদীদের কল্যাণে এই কাপুরুষোচিত মহা-ষড়যন্ত্রের বাস্তবতা মানবজাতির সামনে প্রকাশিত হয়েছে। সেই থেকে পুরুষতন্ত্র নামের এই শয়তানী চক্রান্ত নস্যাৎ করার জন্যে দুঃসাহসী নারীবাদীরা খেয়ে-না-খেয়ে যুদ্ধ করে যাচ্ছে।
পাগলের প্রলাপ মনে হচ্ছে? হওয়াটাই স্বাভাবিক।
আরেকটা মুসলিম প্রজন্ম যেন এই বিষাক্ত আদর্শের কারণে নষ্ট না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য নারীবাদের আবিষ্কৃত এই পুরুষতন্ত্র তত্ত্বের খণ্ডন করা মুসলিম চিন্তাবিদ, দাঈ এবং আলিমদের দায়িত্ব।
এটা করার বিভিন্ন উপায় আছে। প্রথমত, আমাদের স্বীকার করতে হবে যে এমন অনেক পুরুষ আছে, যারা নারীদের ওপর নির্যাতন চালায়। এমন অনেক সামাজিক প্রথা, আচার আছে, যা নারীর সাথে যুলুম করে। এমন অনেক মানুষ আছে, যারা ইসলামের দোহাই দিয়ে এসব যুলুমকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে। এই বাস্তবতা অস্বীকার করা যাবে না। পারিবারিক সহিংসতা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, নিজ ঘরে এবং সমাজে নারীর মতকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করা, যৌন নিপীড়নসহ বিভিন্ন বিষয় এড়িয়ে যাওয়া বা ধামাচাপা দেয়া-এসবই বাস্তব। এই যুলুম এবং না-ইনসাফীগুলোর অস্তিত্ব আছে এবং সব সমাজেই এগুলোর বিরুদ্ধে কথা হওয়া দরকার। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন করতে হবে এই সমস্যাগুলোর কারণ কি পুরুষতন্ত্র নামের কোনো কাল্পনিক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব? দুনিয়ার সব পুরুষ মিলে গোপনে চক্রান্ত করে এসব করছে? নাকি এগুলোর কারণ হলো কিছু স্বার্থপর, অজ্ঞ, নির্যাতনকারী মানুষ-যারা পুরুষ?
টিকাঃ
[৬১] পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের ওপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজেদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিণী ওই বিষয়ের, যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেন। আর তোমরা যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা করো, তাদের সদুপদেশ দাও, বিছানায় তাদের ত্যাগ করো এবং তাদের (মৃদু) প্রহার করো। এরপর যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পথ অনুসন্ধান কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমুন্নত মহান। [তরজমা, সূরা নিসা, ৩৪]
📄 শরীয়া কি স্বামীর জন্য স্ত্রীকে নির্যাতন করা সহজ করে দেয়?
প্রশ্ন-ইসলামী শরীয়াহ স্ত্রীকে নির্যাতন করা কেন সহজ করে দেয়?
উত্তর-আজকের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো, মুসলিম দেশগুলোতে বিদ্যমান বিভিন্ন আঞ্চলিক কুসংস্কার, প্রথা, জাহেলি সামাজিক সংস্কার এবং আচার মিলে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে যেখানে একজন অত্যাচারী স্বামীর জন্য স্ত্রীর ওপর যুলুম করা, তার হক্ক নষ্ট করা এবং নির্যাতন করা সহজ। এ কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু মুসলিম ইতিহাসের অধিকাংশ সময়ের ক্ষেত্রে এ অভিযোগ সঠিক না।
যখন ইসলামী শাসন ছিল, সমাজে ইসলামী মূল্যবোধ ছিল এবং সামাজিক কাঠামো ভিন্ন ছিল তখন নির্যাতন, যুলুম এবং হক্ক নষ্ট করার ব্যাপারটা এত সহজ ছিল না। অতীতে পরিবার এবং সামাজিক বন্ধন ছিল বিস্তৃত। পরিবারগুলো ছিল একান্নবর্তী। আত্মীয়তার বন্ধনকে মানুষ অনেক বেশি গুরুত্ব দিত। আজ সমাজ বিভক্ত ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন পরিবারে। আগে যখন নির্যাতন হতো তখন নির্যাতিত নারী একাকী থাকত না। তার পেছনে থাকত তার অভিভাবক, তার একান্নবর্তী পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এমনকি পুরো গ্রামের মানুষের সমর্থন। একজন নারী এই সাপোর্ট নেটওয়ার্কগুলোর ওপর ভরসা করতে পারতেন।
অন্যদিকে ঘরের স্ত্রীর সাথে সম্মান ও ইনসাফের সাথে আচরণ করা স্বামী এবং তার পরিবারের স্বার্থের সাথেও যুক্ত ছিল। কারণ, যেসব পরিবারে নির্যাতন হয় সেই পরিবারগুলোতে তীব্র ধরনের পারিবারিক কলহ এবং অস্থিরতা থাকে। অস্থির পরিবারের সন্তান সুস্থির হয় না। পরিবার, বংশ এবং গোত্রকে শক্তিশালী করার জন্য সুস্থিত, মজবুত মানসিক গঠনের সন্তান দরকার। কাজেই অযথা এসব ঝামেলায় না গিয়ে ইনসাফ করাই ছিল বুদ্ধিমানের কাজ। আজকের মতো নারী তখন দুর্বল অবস্থানে ছিল না।
কিন্তু আধুনিক সমাজে নির্যাতনকারী স্বামীর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একাকী নারীকে সহায়তার জন্য তেমন কোনো কাঠামো নেই। সাহায্য ও সমর্থনের জন্য আধুনিক নারীকে নির্ভর করতে হয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর। আর সরকারি প্রতিষ্ঠানও সব সময় সাহায্য করতে পারে না। আগে যেখানে নারী নিজের পরিবার, বংশ, গোত্রের ওপর নির্ভর করতে পারত, সেখানে আজ তাকে নির্ভর করতে হচ্ছে শীতল, অলস এবং অদক্ষ আমলাতন্ত্রের ওপর। আজ তাকে দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় অথচ আগে খুব তাড়াতাড়ি এবং কার্যকরভাবে পারিবারিক সংকটগুলোর সমাধানের চেষ্টা করা যেত। হাজার হাজার বছর ধরে এভাবেই সমস্যাগুলোর সমাধান হয়ে এসেছে।
কিন্তু আধুনিক সমাজ বর্ধিত পরিবার এবং সাপোর্ট সিস্টেমকে ভেঙে দিয়ে সে জায়গায় বসিয়েছে আমলাতন্ত্র, এনজিও আর কর্পোরেশানগুলোকে। ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের জন্য পারিবারিক বন্ধন এবং বর্ধিত পরিবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো। অন্যদিকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন আধুনিক নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি দুর্বল করেছে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ-সবাইকেই। পূর্ব ও পশ্চিমের সমাজগুলোর আজকের দুর্দশা থেকে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির বাস্তবতা এবং বর্ধিত পরিবারের গুরুত্ব বোঝা যায়।
তাই আসল প্রশ্ন হলো, আমারা কি নানান সমস্যায় জর্জরিত, মুমূর্ষু আধুনিক সমাজের সাথে খাপ খাওয়ানোর ইসলামের সংস্কার করব? নাকি ইসলামের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য এই সমাজের সংস্কারের মনোযোগী হব? ওইসব সামাজিক কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠান ফিরিয়ে আনব, যা পূর্ববর্তী সমাজগুলোকে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা দিয়েছিল?
📄 নারীবাদে সমালোচনার সঠিক পন্থা
আমি নারীবাদের সমালোচনা করি। তবে নারীবাদী ট্যাগ লাগিয়ে কারও মুখ বন্ধ করা বা বক্তব্য উড়িয়ে দেয়া সমর্থন করি না। আমাদের চারপাশে নারীর প্রতি যুলুমের অনেক ঘটনা ঘটে। আমাদের অনেকের পরিবারেও ঘটে। কেউ যখন এসবের বিরুদ্ধে মুখ খোলে, যখন কেউ সাহায্য বা বিচার চায়, তখন নারীবাদী ট্যাগ লাগিয়ে তার অবস্থানকে উড়িয়ে দেয়া উচিত না। এমনকি কোনো নারীবাদীও যদি যুলুম বিরুদ্ধে বলে, বিচারের দাবি করে তাহলে নিছক নারীবাদী হবার কারণে তার কথা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
নারীবাদের বিরোধিতার করার মানে নারীর অধিকারের বিরোধিতা করা না। নারী অধিকারের পক্ষ নেয়ার অর্থ নারীবাদী হওয়া না। কেন যেন এই সহজ বিষয়টা অনেকে বুঝতে চান না। নারীর অধিকার নিয়ে আলোচনা করা নারীবাদের একচেটিয়া অধিকার না। সমাজ ও পরিবারে নারীর কল্যাণ, সুস্বাস্থ্য এবং স্বার্থ নিয়ে চিন্তা করা নারীবাদ না। যদি তাই হয় তাহলে আমি নারীবাদী।
বাস্তবতা হলো, নারীবাদীরা কেবল বাহ্যিক, ভাসাভাসাভাবে নারীর স্বার্থ নিয়ে চিন্তিত। নারীবাদের ইতিহাস এবং আদর্শিক বংশগতির দিকে গভীরভাবে তাকালে বোঝা যায়, নারীবাদের অনেক দিকই নারীর স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক। তাই আমাদের নারীবাদের বিরুদ্ধে বলতে হবে। সেই সাথে এটাও বুঝতে হবে যে কোনো একটা দর্শনের অ্যাকাডেমিক ক্রিটিক করা এক জিনিস আর নারীর ওপর চলা যুলুমের সাফাই গাওয়া ভিন্ন জিনিস।
আমাদের আরও মনে রাখা দরকার যে নির্যাতন কেবল শারীরিক হয় না। মানসিক নির্যাতন অনেক সময় শারীরিক নির্যাতনের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর হয়।
📄 মাতৃত্বের সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি
মাতৃত্বের ধারণা এবং গুরুত্বকে আধুনিক সমাজ মারাত্মকভাবে হেয় করে। অনেক মায়েরাও নিজেদের 'সামান্য গৃহিণী' কিংবা 'বাচ্চার দেখাশোনা করা মহিলা' মনে করেন। 'গৃহিণী-মা', মানেই নেতিবাচক কিছু মনে করা হয়। ঘরে সন্তানের দেখাশোনা করা মা মানেই যেন দুর্বল, অসহায়, পরনির্ভরশীল, ভীরু কোনো ভিকটিম। যে নারী ঘরে থেকে মাতৃত্বের দায়িত্ব পালন করে তার ব্যাপারে ধরে নেয়া হয়, তাকে এমন করতে বাধ্য করা হচ্ছে অথবা সে অজ্ঞতা, পশ্চাৎপদতা কিংবা বোকামির কারণে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নারী নিজে থেকে এই সিদ্ধান্ত নিলে ব্যক্তিস্বাধীনতার জায়গা থেকে আধুনিক সমাজ হয়তো সেটা মেনে নেয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পক্ষে অন্য কোনো যুক্তি বা বৈধতা তাদের চোখে ধরা পড়ে না। আধুনিক পৃথিবীর চোখে অর্থহীন কোনো কাজের পেছনে পুরো জীবন ব্যয় করা লোকের সিদ্ধান্ত, আর একজন মায়ের ঘরে থাকা সিদ্ধান্তের মূল্য সমান।
এর বাইরে মাতৃত্বের আর কোনো মূল্য কিংবা তাৎপর্য আমাদের সমাজে নেই। মানুষ মা-কে ভালোবাসে, ভালোবাসার কথা বলে, মা-দিবস পালন করে। কিন্তু মায়ের ভূমিকা, মাতৃত্বের গুরুত্ব নিয়ে তেমন একটা চিন্তা করা হয় না।
নিচের কথাগুলো একজন খ্রিষ্টান লেখকের লেখা।
'হ্যাঁ, আমার স্ত্রী চাকরি করে না। কোনো রোজগার করে না। ও বাসায় থাকে। ও একজন মা। মামুলি গৃহিণী মা। যে মা জন্ম দেয়। যে মা শিশুর জীবনকে রং দেয়, কাঠামো দেয়। যে মা ঘর সামলায়, সবদিকে খেয়াল রাখে, সেই সাথে তার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল শিশুগুলোকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
হ্যাঁ, আমার স্ত্রী চাকরি করে না। ওর 'ক্যারিয়ার' নেই। ও তো শুধু একজন ঘরে বসে থাকা মা, আর কিছু না। সেই মা যে আমাদের যমজ সন্তানদের বড় করে। ওদের মানুষ হতে শেখায়। আদাব, আচরণ, নৈতিকতা শেখায়। অ-আ-ক-খ থেকে শুরু করে কীভাবে নিজেকে পরিষ্কার করতে হয়-সবকিছু ও-ই শেখায়। সেই মা যে আমার এবং আমাদের পরিবারের নোঙর। সেই ভিত্তিপ্রস্তর, যাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বাকি সবকিছু। সেই মা যে সবার জন্য সবকিছু করে। সব চাহিদার দিকে খেয়াল রাখে। সবাইকে খুশি রাখে। যদি ও আর ওর মতো মায়েরা না থাকে তাহলে ভেঙে পড়বে পরিবার, সমাজ, সবকিছু।
হ্যাঁ, ও তো শুধু মা। মামুলি গৃহিণী মা। যেমন আমাদের মাথার ওপরে উজ্জ্বল সোনালি গোল জিনিসটা, কেবল সূর্যই তো, আর কিছু না।'
মা হিসেবে নারী যে ভূমিকা পালন করে তার গুরুত্ব আমাদের উপলব্ধি করা উচিত। এর কদর করা উচিত। একজন মা ৯-৫টা চাকরি করে না, তাই সমাজের প্রতি তার কোনো অবদান নেই এমন মনে করা মূর্খতা।
মা হিসেবে নারীর গুরুত্ব উপলব্ধি করা এবং মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কিন্তু এটা কেবল একটা দিক। সমাজ ও জাতির ওপর মায়েদের যে তীব্র ও প্রগাঢ় ভূমিকা সেটাও আমাদের বোঝা দরকার। পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তাচেতনার প্রাথমিক কাঠামো গড়ে দেয় মায়েরাই।
তাহলে আধুনিকতা আর নারীবাদ কেন মায়েদের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা স্বীকার করতে চায় না?
কারণ, ওরা বিশ্বাস করে শক্তি, সম্মান, ক্ষমতা, গুরুত্ব পাওয়া যায় শুধু ঘরের বাইরে। চাকরি, ব্যবসা, রাজনীতির মতো কাজে। আর এসব জায়গা নিয়ন্ত্রণ করে পুরুষ। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তিপরিমণ্ডলের শক্তিকে পুরোপুরিভাবে উপেক্ষা করে। (যদি আসলেই পাবলিক ও প্রাইভেটের মধ্যে এমন কোনো বিভাজন করা সম্ভব হয়)
বরং যে নারীরা বাসায় থাকেন অর্থনীতি, সমাজ এবং রাজনীতির ওপর তাদেরও গভীর প্রভাব থাকে। কারণ, পরবর্তী প্রজন্ম তাদেরই হাতে গড়ে ওঠে। তাই মাতৃত্ব নিয়ে হীনম্মন্যতা বোধ করার বদলে নারীর উচিত তার সামনে থাকা পথ দুটো নিয়ে ভালোভাবে চিন্তা করা। নারী যখন চাকরি কিংবা ব্যবসা করে তখন আমরা তার বুদ্ধি, আন্তরিকতা, পরিশ্রম, আর অধ্যবসায়ের প্রশংসা করি। অথচ এই বৈশিষ্ট্যগুলো একজন ভালো মায়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আরও বেশি প্রযোজ্য। যেসব উচ্চশিক্ষিত নারী চাকরি না করে ঘরে থাকেন তাদের ব্যাপারে কীভাবে লোকে বলে তারা নিজেদের শিক্ষা আর মেধা নষ্ট করছে? ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা জলাঞ্জলি দিচ্ছে?
আধুনিক মানুষ কতই-না বিভ্রান্ত!