📘 সংশয়বাদী > 📄 ‘নারীবাদী ইসলামের’ ভয়ংকর পরিণতি

📄 ‘নারীবাদী ইসলামের’ ভয়ংকর পরিণতি


আমার স্ত্রীর সাথে আমার পরিচয় ভার্সিটিতে। আমরা দুজনেই তখন হার্ভার্ডে পড়ি। নিজেদের আমরা তখন নারীবাদী ভাবতাম। এর কারণ ছিল। নারীর ওপর পারিবারিক সহিংসতা আর নির্যাতনের প্রভাব কেমন হতে পারে তা নিয়ে দুজনেরই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল। কোনো নারী ঘরের ভেতরে শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতনের শিকার হোক, এটা আমরা চাইতাম না। নির্যাতনের হাত থেকে নারীদের বাঁচানোর একটা শক্ত ইচ্ছা আমাদের মধ্যে কাজ করত। আমরা মনে করতাম, এমন এক পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে যেখানে নারী যথাযথ শ্রদ্ধা, মমতা, সম্মান, ভালোবাসা এবং সহায়তা নিয়ে বাঁচতে পারবে। তার যথাযথ অধিকার পাবে। এখনো আমরা এটা বিশ্বাস করি। তখন মনে হতো, আমাদের কাঙ্ক্ষিত পৃথিবী পাবার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নারীবাদ। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে করলাম নারীবাদ আসলে সমাধান না। নারীবাদ বরং আরও বড় এক সমস্যার অংশ।

নারীবাদী দর্শনের মধ্যে মারাত্মক রকমের সমস্যা আছে। নারীবাদের ধারাগুলোর মধ্যে এক বা দুটো ধারা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক- ব্যাপারটা এমন না; বরং নারীবাদের সূচনাই হয়েছিল ধর্ম-বিরোধী আন্দোলন হিসেবে। বিশ্বাস না হলে ইতিহাসের সবচেয়ে নামিদামি নারীবাদী তাত্ত্বিকদের লেখা পড়ে দেখুন। নারীবাদের প্রথম পর্যায় থেকে শুরু করে তৃতীয় পর্যায়-সবক্ষেত্রে একই উপসংহারে পৌঁছাতে বাধ্য হবেন। নারীবাদের এই দিকটা আমাদের মুসলিমের বোঝা দরকার। আজ অনেক মুসলিম নিজেকে নারীবাদী মনে করে, বা নারীবাদী বলে পরিচয় দেয়। একসময় আমি নিজে যে কারণে নারীবাদের চিন্তা গ্রহণ করেছিলাম, সেই একই কারণে অন্য আরও অনেক মুসলিমও এই চিন্তা গ্রহণ করেছে। কিন্তু এ প্রবণতা বিপজ্জনক। নারীবাদ তার মধ্যে এমন অনেক কিছু ধারণ করে, যা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক এবং ঈমানকে হুমকির মুখে ফেলে। ইসলামের সাথে নারীবাদের সাংঘর্ষিকতার কিছু দিক বাইরে থেকে বোঝা যায়। আবার কিছু সাংঘর্ষিকতা এমন, যার প্রকৃত মাত্রা অনুধাবন করতে হলে আরও গভীরে ঢুকতে হয়। এ সংঘর্ষ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অবশ্যই জরুরি, তবে সেই লম্বা আলোচনায় যাওয়া ছাড়াও নারীবাদের হুমকির বাস্তবতা বোঝার একটা সহজ উপায় আছে। গাছের পরিচয় পাওয়া যায় তার ফল থেকে, নারীবাদের বাস্তবতা বোঝা যাবে নারীবাদীদের দিকে তাকালে।

নারীবাদীদের বিশাল একটা অংশ কেন ইসলামবিদ্বেষী? নারীবাদে দীক্ষিত হবার পর কেন অনেক মুসলিম ইসলাম ত্যাগ করে?

পরিসংখ্যান
এ ব্যাপারে পরিসংখ্যান পরিষ্কার। জনসংখ্যার বাকি অংশের তুলনায় নারীবাদী বলে পরিচয় দেয়া নারীদের মধ্যে ধর্মে বিশ্বাসীর সংখ্যা অনেক কম। পশ্চিমা বিশ্বে প্রতি ১০ জন নারীর ৭ জন কোনো-না-কোনো ধর্ম (খ্রিষ্টধর্ম, ইহুদীধর্ম, ইসলাম) অনুসরণ করে। কিন্তু নারীবাদীদের প্রতি ১০ জনে ধর্মে বিশ্বাসী হয় মাত্র ১ জন।

পাঠক হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, এটুকু তথ্য থেকেই কি এটা প্রমাণিত হয় যে নারীবাদের কারণে মানুষ অবিশ্বাসী হয়? আসুন আরও কিছু তথ্য দেখা যাক।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৯৩ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত দুই দশকে, ধর্মহীন (non-religious) নারীর সংখ্যা অ্যামেরিকাতে তিন গুণ হয়েছে। এ ২০ বছরে সার্বিকভাবেই অ্যামেরিকাতে ধর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু কৌতূহলের ব্যাপারটা হলো ধর্মহীনতা বৃদ্ধির এই হার নারীদের মধ্যে অনেক বেশি। ১৯৯৩ এ নাস্তিক এবং অজ্ঞেয়বাদীদের ১৬% ছিল নারী। ২০১৩ তে সেটা বেড়ে হয়েছে ৪৩%। প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি। নারীদের মধ্যে ধর্মহীনতা এভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ার কারণ কী?

বিশ্লেষকদের মতে এর কারণ হলো গণমাধ্যম, ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নারীবাদী এবং সেক্যুলার আদর্শের বিস্তার। পশ্চিমে থাকা মুসলিমদের মধ্যেও আমরা এ প্রবণতা দেখেছি। আজকালকার মুরতাদরা (ইসলাম ত্যাগ করা নারী ও পুরুষ) তাদের রিদ্দা বা ধর্মত্যাগ নিয়ে অনেক লেখালেখি করে। কোন কারণে তারা ইসলাম ছেড়ে গেছে সেটা জানার জন্য কোনো অনুমানের ওপর নির্ভর করতে হয় না। আর তাদের লেখাতে বারবার যে কথা উঠে আসে তা হলো, তারা বিশ্বাস করে—ইসলাম, কুরআন এবং নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পুরুষতন্ত্র, অত্যাচার আর নিপীড়নের অনুমোদন দেয়।
অর্থাৎ তারা ইসলাম ত্যাগ করেছে, কারণ ইসলাম নারীবাদী না।

প্রতিক্রিয়া
তবে আজকাল এমন অনেক মানুষ পাওয়া যায় যারা একই সাথে নিজেদের মুসলিম এবং নারীবাদী বলে দাবি করে। নারীবাদ মানুষকে রিদ্দার দিকে নিয়ে যায়, এটা তারা মানতে নারাজ। এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করে নিই। নিজেদের মুসলিম নারীবাদী মনে করা সবাই একসময় মুরতাদ হয়ে যাবে, এটা আমি বলছি না। তবে আমাদের মাথায় রাখা উচিত হাঙ্গর ভরা নদীতে কিছু মানুষকে ফেলে দিলে সবাই মারা যাবে না। কেউ কেউ বেঁচে যাবে। কিন্তু তার মানে এই না যে হাঙ্গর নদীতে মানুষকে সাঁতরাতে বলা বুদ্ধিমানের কাজ। খুব চৌকশ সাঁতারু হয়তো ক্ষত-বিক্ষত দেহে জান নিয়ে পালিয়ে আসতে পারবে, কিন্তু বাকিরা হাঙ্গরের পেটে যাবে। ঠিক একইভাবে নারীবাদ দ্বারা প্রভাবিত মুসলিমদের বিশাল একটা অংশ প্রকাশ্য কিংবা গোপনে ইসলাম ত্যাগ করে অথবা ইসলামের সাথে চরমভাবে সাংঘর্ষিক বিশ্বাস লালন করে—এটাই বাস্তবতা। তাই আমাদের ঈমান এবং বিশেষ করে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ঈমানকে বাঁচাতে হলে নারীবাদের হুমকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

যেকোনো সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ হলো, সমস্যার অস্তিত্ব স্বীকার করা। দুঃখজনকভাবে এ জায়গাটাতেই আমরা হোঁচট খাচ্ছি। আমিসহ আরও অনেকে—হতাশার সাথে লক্ষ করেছি—নারীবাদ আমাদের ঈমানের জন্য ক্ষতিকর এবং হুমকি—পশ্চিমে থাকা, বিশেষ করে অ্যামেরিকায় বসবাস করা মুসলিমরা এ ব্যাপারটা স্বীকারই করতে চান না।
কেন?
এই 'কেন'-এর জবাব দেয়া অসুস্বস্তিকর, অসুবিধাজনক। এর আছে নানান রকমের প্রতিক্রিয়া। কারও বক্তব্য নারীবাদের বেঁধে দেয়া সীমার বাইরে গেলেই সামাজিক, রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্টদের দল তার ওপর হামলে পড়ে। কিন্তু যতই অস্বস্তিকর হোক না কেন সত্যকে তুলে ধরতে হবে। সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলা আলিম ইমাম এবং দা'ঈদের দায়িত্ব। তা নাহলে আমাদের অনেক চড়া মূল্য দিতে হবে। এটা আজ আমরা বুঝতে পারছি না, কিন্তু আজ থেকে ৫/১০ বছর পর আজকের নিষ্ক্রিয়তার কথা চিন্তা করে আমরা হয়তো আফসোস করব। কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে যাবে অনেক।

এ লেখায় আমার উদ্দেশ্য হলো নারীবাদ কীভাবে ধাপে ধাপে একজন মুসলিমকে রিদ্দার দিকে নিয়ে যায়, তা তুলে ধরা। আমি আশা করি এ বিষয়টা স্পষ্ট হলে মুসলিমরা বাস্তবতা উপলব্ধি করবে এবং নারীবাদের বিরুদ্ধে নীরবতা ভাঙবে। তাহলে রিদ্দার পথে একজন মুসলিম ফেমিনিস্টের যাত্রার কথা শোনা যাক।

প্রথম ধাপ
শুরুটা হয় যৌক্তিক কিছু অভিযোগ, কিছু ক্ষোভ দিয়ে। এমন অনেক মুসলিম পুরুষ আছে যারা স্ত্রীর হক আদায় করে না, স্ত্রী ওপর যুলুম করে। এমন অনেক মুসলিম প্রতিষ্ঠান আছে যারা এই যুলুমের বিষয়গুলো এড়িয়ে যায়। নারীর প্রয়োজন এবং তাকে উপযুক্ত সহায়তা দেয়ার দিকগুলো তারা উপেক্ষা করে। এমন অনেক মুসলিম দেশ আছে, যেখানে এ ধরনের যুলুমগুলোকে একধরনের সামাজিক বৈধতা দেয়া হয়। অনেক সমাজে কন্যাসন্তানকে অবহেলা করা হয়। সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হলো যারা এই যুলুমগুলো করে অনেক ক্ষেত্রে তারা তাদের যুলুমকে দ্বীন ইসলামের নামে বৈধতা দিতে চায়।

এই সমস্যাগুলো আছে, এটা আমাদের স্বীকার করতে হবে। একইসাথে এটাও বোঝা দরকার যে এই সমস্যাগুলোর সমাধান নারীবাদ না। এর সমাধান হলো ইসলামী জ্ঞানের যে কমতি আছে, শরীয়াহর ব্যাপারে যে অজ্ঞতা আমাদের মধ্যে আছে সেটা দূর করা। এই জ্ঞান মানুষের মধ্যে প্রচারিত হয় হকপন্থী আলিমদের মাধ্যমে। ওইসব আলিম ও দাঈদের মাধ্যমে, যারা মডার্নিসম, লিবারেলিসম এবং নারীবাদের প্রভাব থেকে মুক্ত। দুঃখজনকভাবে, এই ইলম আজ দুর্লভ। ফলে অনেক মুসলিম নারী (এবং পুরুষ) নিজ হতাশা এবং তিক্ত অভিজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে নারীবাদকে।
এভাবেই শুরু হয় নারীবাদের পথে একজন মুসলিমের পথচলা।
নারী নির্যাতন যদি অসুস্থ হয় তাহলে প্রকৃত ইসলামী শিক্ষা হলো এর সহজাত, প্রাকৃতিক চিকিৎসা। অন্যদিকে নারীবাদ হলো এমন এক বিষাক্ত ওষুধ, যার ফলে রোগ হয়তো অল্প কিছুটা দূর হবে কিন্তু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় একদিকে রোগী মরার দশা হবে অন্যদিকে আরও দশটা নতুন অসুখ দেখা দেবে।
নারী নির্যাতনের বিষয়টা নারীবাদ কীভাবে উপস্থাপন করে?
নারীবাদ তারস্বরে চেঁচিয়ে বলে, 'সবকিছুর মূলে হলো পুরুষতন্ত্র'। নারীবাদের বক্তব্য হলো-পুরুষ জাতটাতেই সমস্যা। যেসব নারী পুরুষতন্ত্রকে মেনে নিয়েছে তারাও সমস্যার অংশ। নারীবাদের মতে, পুরুষরা সহজাতভাবে নারীকে শোষণ আর নির্যাতন করতে চায়। চায় নারীর দুর্বলতার সুযোগ নিতে। এটা হলো বাস্তব সমস্যা আর ন্যায্য অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অবৈধ ভাষার ব্যবহার। আর একসময় সমস্যাকে ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে ভাষাই।

দ্বিতীয় ধাপ
প্রথম ধাপে ক্ষোভ এবং অভিযোগের কারণ ছিল কিছু পুরুষ (এবং নারীর) যুলুম। দ্বিতীয় ধাপে অভিযোগ ও ক্ষোভগুলো বাস্তবতা থেকে মোড় নেয় নানা বিমূর্ত, মতাদর্শিক দিকে।
অমুক ইসলামী কনফারেন্সে কোনো নারী বক্তাকে রাখা হয়নি কেন? অনুষ্ঠানের পোস্টারে পুরুষ বক্তাদের ছবি থাকলেও নারী বক্তাদের ছবি নেই কেন? হিজাব নিয়ে পুরুষ ইমামরা কেন লেকচার দিচ্ছে? মুসলিম নারীরা কী পরবে সেটা নিয়ে পুরুষরা কেন কথা বলবে?
নারী ও পুরুষের সালাতের জায়গার মাঝখানে পার্টিশান কেন? আজকের যুগেও নারীপুরুষের মেলামেশায় কেন এত কড়াকড়ি? কেন নারী আর পুরুষের স্থান পৃথক হবে?
পুরুষ হবার কারণে বিশেষ সুবিধা পাবার কথা মুসলিম পুরুষরা কেন স্বীকার করে না?
নারীদের কেন শালীন আর বিনম্র হতে হবে? পুরুষ কেন নারীর বিষয়ে কথা বলবে? পুরুষরা কেন নারীবাদ নিয়ে কথা বলবে?
নারীবাদ ঢালাওভাবে পুরুষের বিরুদ্ধে শোষক ও নিপীড়ক হবার অভিযোগ তোলে। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাওয়া অভিযুক্তের অধিকার। কিন্তু যখনই কোনো পুরুষ সেটা করতে যায় তখন সেটা হয়ে যায় 'পুরুষতান্ত্রিক বয়ান'। নারীবাদের কাছে সব প্রশ্নের মুখস্থ উত্তর একটাই-পুরুষতন্ত্র। সবকিছুর জন্য দায়ী পুরুষতন্ত্র।
প্রথম ধাপে সমস্যাগুলো সংজ্ঞায়িত হয়েছিল ইসলামের অবস্থান অনুযায়ী নারী ও পুরুষের হক এবং যুলুম ও ইনসাফের জায়গা থেকে। দ্বিতীয় ধাপে এসে আলোচনার কাঠামো গড়ে ওঠে এবং চালিত হয় পশ্চিমা নারীবাদী এবং লিবারেল অবস্থানকে কেন্দ্র করে। এর প্রমাণ হলো দ্বিতীয় ধাপের মুসলিম নারীবাদীরা এমন অনেক বিষয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় যেগুলো কুরআন-সুন্নাহ থেকে সুপ্রতিষ্ঠিত এবং ইসলামী আইন ও শরীয়াহর অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেমন: পর্দা, ঘরের বাইরে নারীর চলাফেরা, নারী ও পুরুষের মেলামেশা: বিশেষ করে গাইর-মাহরাম পুরুষের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে শরীয়াহর সীমারেখা, ইত্যাদি।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় দ্বিতীয় ধাপের মুসলিম নারীবাদীরা ইসলাম সম্পর্কে খুব একটা জানে না। যেসব বিষয়ে তারা আপত্তি তোলে সেগুলোর ব্যাপারে ইসলামী আইন এবং কুরআন-সুন্নাহর দলিলের অবস্থান তাদের অজানা। এ বিষয়গুলো যখন জানানো হয় তখন তারা এগিয়ে যায় তৃতীয় ধাপের দিকে।

তৃতীয় ধাপ
এই ধাপে এসে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয় ইসলামী ইলম এবং ইলমের সিলসিলাকে। দ্বিতীয় ধাপে অভিযোগ ছিল মুসলিম সমাজের বিভিন্ন আচার আর বিধিবিধান নিয়ে। তৃতীয় ধাপে এসে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয় মুসলিম উম্মাহ, বিশেষ করে অতীত প্রজন্ম এবং আলিমগণকে।
নারীবাদের দর্শন অনুযায়ী, নারীদের আজ যে নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে তার মূল কারণ পুরুষতন্ত্র। পুরুষতন্ত্র হলো এমন এক অশুভ ব্যবস্থা, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীদের শোষণ করে আসছে। কাজেই নারীবাদের জায়গা থেকে এটা ধরে নেয়া স্বাভাবিক যে অতীত প্রজন্মগুলোর সময়েও পুরুষতন্ত্র ছিল এবং আজকের চেয়ে আরও শক্তিশালী ছিল।

এমন অবস্থায় একজন নারীবাদী নিজেকে প্রশ্ন করে-
ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে যে আলিমরা এসেছেন তাঁরা সবাই কি এই পুরুষতন্ত্রের অধীনেই ছিলেন না? পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা আর নারীবিদ্বেষের লেন্সের আলোকেই কি তাঁরা তাদের ফতোয়াগুলো লেখেননি? যে নারীবিদ্বেষ আজকের আলিমদের মধ্যে আমরা দেখি সেটা কি কয়েকশ কিংবা হাজার বছর আগের আলিমদের মধ্যে আরও বেশি মাত্রায় ছিল না?
ইসলামের ইতিহাসের যেকোনো সময়ের যেকোনো আলিমের বই খুললে আমরা এমন অসংখ্য অবস্থান পাব যেগুলো শরীয়াহর দিক থেকে, কুরআন ও সুন্নাহর মানদণ্ডে সঠিক। কিন্তু নারীবাদের দৃষ্টিতে 'পুরুষতান্ত্রিক' এবং 'নারীবিদ্বেষী'। এ কারণেই তৃতীয় ধাপে এসে এমন অনেক নারীকে দেখা যায়, একসময় যারা খুব আগ্রহ নিয়ে ইলম অর্জনের চেষ্টা করত-হয়তো কোনো আলিমের অধীনে কিংবা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী শিক্ষা নিয়ে পড়ত, কিন্তু তারা যখন আলিমগণের লেখায় এমন কিছু খুঁজে পায়, যা নারীবাদের সংজ্ঞানুযায়ী 'ভুল' বা 'ঘৃণ্য', তখন ইলম থেকেই মুখ ফিরিয়ে নেয়। পুরো মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসের আলিমগণ তাদের চোখে পরিণত হয় পুরুষতন্ত্রের প্রতিভূতে।
মুসলিম নারীবাদী তখন সিদ্ধান্ত নেয় সে কোনো আলিমের (অতীত কিংবা বর্তমান) কথা শুনবে না। সে সরাসরি কুরআন আর সুন্নাহর কাছে যাবে। কেবল কুরআন আর সুন্নাহই পুরুষতন্ত্রের কালো থাবা থেকে মুক্ত।
কিন্তু...

চতুর্থ ধাপ
কুরআন ও সুন্নাহয় তারা এমন অবস্থান দেখতে পায়, যা নারীবাদের মানদণ্ডে টিকে না।
* সূরা নিসার ৩৪ নং আয়াত
* সূরা বাক্বারার ২২৮ নং আয়াত
* দুই জন নারীর সাক্ষ্য একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান
• উত্তরাধিকারের ব্যাপারে শরীয়াহর অবস্থান
• আক্কল ও দ্বীনে নারীর অসম্পূর্ণতা
• জাহান্নামীদের অধিকাংশ হবে নারী
• যদি কোনো মানুষকে সিজদাহ করার অনুমতি থাকত তাহলে স্বামীকে সিজদাহ করার হাদীস...

মুসলিম ফেমিনিস্ট এমন আয়াত ও হাদীসের মুখোমুখি হয়, যেগুলো নারীবাদের অবস্থান থেকে কোনোভাবেই মেনে নেয়া সম্ভব না। কীভাবে সে নারীবাদের আদর্শের সাথে এই আয়াত ও হাদীসগুলোর সমন্বয় করবে? কীভাবে আল্লাহ্ এতগুলো আয়াত এবং হাদীস নাযিল করলেন, যেগুলো নারীবাদের সংজ্ঞানুযায়ী নারীবিদ্বেষ ছাড়া আর কিছুই না?

মরিয়া হয়ে সে সমন্বয়ের চেষ্টা করে-
হয়তো এই সবগুলো আয়াত আর হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। হয়তো চেষ্টা করলে নারীবাদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো-না-কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যাবে। যে ওয়াহিকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্পষ্টভাবে বুঝেছে, যা এখনো পর্যন্ত প্রজ্ঞা, ভাষাগত উৎকর্ষ এবং ন্যায়ের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে-হয়তো সেটাকে গত ১০০ বছরের সেক্যুলার জেন্ডার স্টাডিস প্রফেসরদের অসংলগ্ন প্রলাপের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে!
কিন্তু এই মনোভাব খুব বেশি দিন ধরে রাখা যায় না। চতুর্থ ধাপে পৌঁছানোর পর 'মুসলিম ফেমিনিস্ট' উপলব্ধি করে যে বৃত্তকে কখনো ত্রিভুজ বানানো যায় না। নারীবাদের সাথে ইসলামকে খাপ খাওয়ানোর একমাত্র উপায় হলো কুরআনের ঐশ্বরিক উৎসকে অস্বীকার করা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহর প্রয়োগযোগ্যতা প্রত্যাখ্যান করা।

এই ধাপের নারীবাদীদের মধ্যে এমন অনেককে আপনি পাবেন যারা বলে-
আমাদের কুরআনকে না বলা শিখতে হবে।
এমনকি এমনও মানুষ পাবেন, যারা নবীদের (আলাইহিমুস সালাম) ব্যাপার কুৎসিত-সব শব্দ ব্যবহার করে, কারণ তাঁরা নাকি 'পুরুষতান্ত্রিক'! ইয়াদুবিল্লাহ!।
চতুর্থ ধাপে এসে নারীবাদীরা অবলীলায় এমন-সব কথা বলে, যা স্পষ্ট কুফর। একই সাথে এমন-সব বিষয়ের পক্ষে প্রচারণা শুরু করে যেগুলো ইসলামের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। যেমন: জামাতের সালাতে কোনো মহিলাকে ইমাম বানানো, মুসলিম নারীর সাথে কাফির পুরুষের বিয়ে, সমকামিতার বৈধতা, ট্র্যান্সজেন্ডারিসমের পক্ষে অবস্থান, যিনা এবং ব্যভিচারকে জায়েজ মনে করা, ইত্যাদি।

এটা কীভাবে সম্ভব?
কারণ, চতুর্থ ধাপে পা দেয়া 'মুসলিম' ফেমিনিস্ট এরই মধ্যে ইতিহাসের সব আলিমের অবস্থানকে প্রত্যাখ্যান করেছে। শরীয়াহর চূড়ান্ত, অপরিবর্তনীয় এবং আবশ্যক কোনো অবস্থান থাকতে পারে যা মুসলিমদের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করবে-এটাও সে অস্বীকার করে বসেছে। যখনই কেউ বলে-আল্লাহ্ আমাদের এমনটা করতে নির্দেশ দিয়েছেন- তখনই পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধি সাব্যস্ত করে নারীবাদীরা তাকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়। কারণ, তাদের কাছে কর্তৃত্বের ধারণাটাও পুরুষতন্ত্রের ফসল।
খুব বেশি দিন চতুর্থ ধাপে থাকা যায় না। পরস্পরবিরোধী দুটো অবস্থান (ইসলাম এবং নারীবাদ) একসাথে নিজের মধ্যে ধারণ করা অত্যন্ত ক্লান্তিকর একটা কাজ। এমন অবস্থায় পৌঁছে যাবার পর, এমন-সব অবস্থান গ্রহণ করার পর নিজেকে মুসলিম মনে করাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এর সাথে যুক্ত হয় 'মুসলিম' ফেমিনিস্টদের অদ্ভুত কথাবার্তা এবং কুফরি অবস্থানের কারণে অন্যান্য মুসলিমদের কাছ থেকে আসা যৌক্তিক বিরোধিতা ও সমালোচনা। সবকিছু মিলিয়ে তাদের মধ্যে তিক্ততা বাড়তে থাকে। নিজের মুসলিম পরিচয় নিয়েও তাদের মধ্যে তিক্ততা কাজ করে।
আর তারপর...

পঞ্চম ধাপ
পঞ্চম ধাপে এসে 'মুসলিম' ফেমিনিস্ট প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণার মুখোমুখি হয়। পৌঁছে যায় খাদের কিনারায়।
* আল্লাহ যদি নারী ও পুরুষের ব্যাপারে সাম্যবাদী হন তাহলে নিজের ব্যাপারে কুরআনে কেন পুরুষবাচক শব্দ ব্যবহার করলেন?
* আল্লাহ্ কেন প্রথমে আদমকে (আলাইহিস সালাম); একজন পুরুষকে সৃষ্টি করলেন? কেন প্রথমে নারীকে সৃষ্টি করলেন না?
* শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেন একজন পুরষ? কেন নারী নন?
* কেন আল্লাহর ওয়াহি নারীর মাধ্যমে না এসে পুরুষের মাধ্যমে এল?

জন্ম নেয় একের পর এক প্রশ্ন। এই প্রশ্নের স্রোত একসময় তাকে নিয়ে যায় কুফর ও রিদ্দার অন্ধকারে। আর যে প্রশ্ন দিয়ে এ পথচলা শুরু হয়েছিল সেই প্রশ্নটাই শেষ ধাক্কা দিয়ে তাকে খাঁদে ফেলে দেয়-
আল্লাহ্ কেন পুরুষতন্ত্রকে টিকে থাকতে দিলেন? আল্লাহ্ কেন হাজার হাজার বছর ধরে বিলিয়ন বিলিয়ন নারীকে পরাধীন এবং ধর্ষিত হতে দিলেন?
আর এই ধাপে এবং বাকি সব ধাপে নারীবাদের উত্তর একটাই-
আল্লাহ্ বলে কেউ নেই। ধর্ম হলো পুরুষতন্ত্রের বানানো গল্প, যার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো নারীকে পুরুষের অধীন করে রাখা। সমাপ্তি।

***
নারীবাদের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এটা একটা চেইন রিঅ্যাকশনের মতো। একজন মানুষ যখন সবকিছুকে 'পুরুষতন্ত্র' দিয়ে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে তখন বাকি ধাপগুলোতে যাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সব ধরনের অবিচারকে পুরুষতন্ত্রের দোষ বলে চালিয়ে দেয়ার এই ব্যাখ্যা যদিও ভুল, কিন্তু এটা একটা সর্বগ্রাসী ব্যাখ্যা। আসলে পঞ্চম ধাপে থাকা ফেমিনিস্টরা আগের ৪ ধাপের মুসলিম ফেমিনিস্টদের চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সৎ। পঞ্চম ধাপের নারীবাদী তার আদর্শিক সমীকরণের চূড়ান্ত ধাপ পর্যন্ত গেছে। অন্যরা যায়নি।

নারীবাদ ও ধর্মবিদ্বেষ
পাঠক হয়তো প্রশ্ন তুলতে পারেন-এখানে নারীবাদের কোন পর্যায় নিয়ে কথা বলা হচ্ছে? হয়তো সমস্যা নারীবাদে না; বরং নারীবাদের নির্দিষ্ট কোনো সংস্করণে?
আসলে সমস্যা নারীবাদেই। সমস্যা নারীবাদের মূল আদর্শেই। একটা উদাহরণ দিই। বর্ণবাদ ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। মানুষের গায়ের রং কিংবা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক আচরণ ইসলাম কোনোভাবেই মেনে নেয় না। কিন্তু পৃথিবীর সব বর্ণবাদী দলের আদর্শ কিন্তু একরকম না। ক্যু ক্লাক্স ক্ল্যান, নিও নাৎসি, অলট-রাইট-সবার আদর্শ হুবহু এক না। তাদের চিন্তায় সূক্ষ্ম তারতম্য আছে, ধরন এবং মাত্রায় আছে নানান পার্থক্য। কিন্তু শেষ বিচারে এই পার্থক্যগুলো তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ না, কারণ সবার মূল আদর্শ এক-বর্ণবাদ। একইভাবে নারীবাদের বিভিন্ন পর্যায় আর সংস্করণগুলোর মধ্যে পার্থক্য থাকলেও সবার মূল আদর্শ এক। দয়া করে কেউ আবার এটা ভেবে বসবেন না যে আমি নারীবাদকে বর্ণবাদী বলছি। আমি কেবল উদাহরণ দিচ্ছি।

নারীবাদ এমন এক আদর্শ, যার মূলনীতিগুলো মেনে নিলে এবং সামগ্রিকভাবে গ্রহণ করলে, তা একজন মুসলিমকে ঈমানের সংকট এবং রিদ্দার দিকে নিয়ে যাবে। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। কীভাবে প্রথম ধাপ থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে একজন মানুষ পঞ্চম ধাপের দিকে এগিয়ে যায় সেটা বুঝলে পুরো প্রক্রিয়া আমাদের সামনে স্পষ্ট হবে। আর এতেও যদি পাঠক সন্তুষ্ট না হন তাহলে সরাসরি নারীবাদের শেকড়ের দিকে তাকানো যেতে পারে। নারীবাদের সবচেয়ে নামিদামি তাত্ত্বিকদের বলা কথার দিকে তাকালে বাস্তবতা পরিষ্কার হয়ে যায়। গোড়া থেকেই নারীবাদ ছিল একটা ধর্মবিরোধী মতাদর্শ। নারীবাদের প্রতিটা পর্যায়ের রথীমহারথীরা ছিল তীব্রভাবে ধর্মবিদ্বেষী।

নারীবাদের আনুষ্ঠানিক সূচনা উনবিংশ শতাব্দীতে, সামাজিক আন্দোলন হিসেবে। এ আন্দোলনের মূল লক্ষ ছিল ভোটাধিকার ও সম্পদের মালিকানাসহ বিভিন্ন আইনি অধিকার। এটাকে বলা হয় নারীবাদের ফার্স্ট ওয়েভ বা প্রথম পর্যায়। তখন থেকেই নারীবাদীরা ধর্মকে নারীর পরাধীনতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে। প্রথমদিককার নারীবাদীরা তাত্ত্বিকরা মনে করতেন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল নারীঅধিকার খর্ব করার পেছনে ভূমিকা রাখে না; বরং ধর্মই হলো নারীবিদ্বেষী বিশ্বাস ও আচার-আচরণের মূল উৎস। নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেত্রীদের একজন, সুসান বি অ্যানথনি বলেছিল- 'নারীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট শত্রু হলো গির্জার বেদি'।

সুসান অ্যানথনি নিয়মিত ধর্মের সমালোচনা করত। ঘনিষ্ঠজনদের বক্তব্য অনুযায়ী সে ছিল অজ্ঞেয়বাদী। ধর্মের ব্যাপারে সে বলেছিল- 'একদিকে একের পর ক্ষুধার্ত মুখ পাঠায়, অন্যদিকে সেই মুখে তুলে দেয়ার মতো খাবার দেয় না-তাদের এই ঈশ্বর কতই-না ভয়ংকর এক জীব'!
সুসান বি অ্যানথনি আরও বলেছিল, 'মহাবিশ্বের এমন কোনো স্রষ্টার কথা আমি ভাবতে করতে পারি না, আমার নতজানু হওয়া আর স্তুতিবাক্যের ওপর যার সন্তুষ্টি নির্ভর করে'।

ঊনবিংশ শতাব্দীর আরেক উল্লেখযোগ্য নারীবাদী হেলেন এইচ গার্ডনার। নারীর বিরুদ্ধে খ্রিষ্টধর্মের 'অপরাধ' আর নিপীড়ন' নিয়ে অনেকে লেখাজোখা ছিলেন হেলেনের। সে লিখেছিল- 'এই ধর্ম আর কিতাব (বাইবেল) নারীর কাছে দাবি করে সবকিছু। বিনিময়ে দেয় না কিছুই। এরা নারীর সমর্থন আর ভালোবাসা চায়, বিনিময় দেয় অত্যাচার, নিগ্রহ আর অবজ্ঞা ... খ্রিষ্টধর্মীয় দেশগুলোতে নারীর বিরুদ্ধে যত অত্যাচার আর নিগ্রহ হয়েছে, সেগুলোর বৈধতা দিয়েছে বাইবেল আর টিকিয়ে রেখেছে গির্জার বেদি'। গার্ডনারের ঘৃণা শুধু খ্রিষ্টধর্মের প্রতি ছিল না। Men, Women And Gods বইতে সে লিখেছিল-
'ধর্মগুলো যদিও অতিপ্রাকৃত উৎস থেকে আসার কথা বলে, কিন্তু আমি মনে করি এই দাবিগুলোকে যাচাই করা উচিত মানবীয় বুদ্ধির আলোকে। আমাদের সর্বোচ্চ নীতিবোধ যদি ধর্মের কোনো বিধানকে মেনে নিতে অস্বীকার করে তাহলে সেই বিধান বাদ দিতে হবে। কারণ, ধর্মের একমাত্র ভালো জিনিস হলো নৈতিকতা। আর নৈতিকতার সাথে বিশ্বাসের কোনো সম্পর্ক নেই। নৈতিকতার সম্পর্ক দুনিয়াতে সঠিক কাজ করার সাথে, আর বিশ্বাসের সম্পর্ক পরকালের অজ্ঞাত বিষয় নিয়ে। একটা হলো সময়ের চাহিদা আরেকটা চিরন্তনের স্বপ্ন। নৈতিকতার ভিত্তি হলো সর্বজনীন বিবর্তন। বিশ্বাসের ভিত্তি হলো 'ওয়াহি'। আর আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত 'ওয়াহি' এসেছে তার কোনোটাই নারীর পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব না।

মুসা কিংবা কনফুশিয়াস, মুহাম্মাদ কিংবা পল, ইব্রাহিম কিংবা ব্রিঘাম ইয়াং এসে আমাদের সামনে দাবি করে তার ধর্মমত ঈশ্বরের কাছ থেকে এসেছে। ঈশ্বর এদের কোনো একজনের সাথে বা সবার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে এই ধর্মগুলো দিয়েছে কি না, তার কোনো মূল্য আমাদের কাছে নেই। যদি তাদের ধর্মমত আমাদের নৈতিকতা, সুচিন্তা, উন্নত আদর্শ এবং বিশুদ্ধ জীবনবোধের সাথে খাপ না খায় তাহলে আমাদের ওপর এসব ধর্মের কোনো কর্তৃত্ব নেই। তাদের মধ্যে কে আছে এই পরীক্ষায় পাশ করার মতো? আজ পর্যন্ত যত 'ওয়াহি' এসেছে, তার কোনটা ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে দাবি করতে পারে, “আমি তোমাদের সর্বোত্তম বিকাশের সমকক্ষ, আমি আজও তোমাদের সর্বোন্নত চিন্তার পথ দেখাতে সক্ষম, আমার মধ্যে এমন কোন শিক্ষা নেই, যা তোমাদের ন্যায়বিচারের বোধের সাথে সাংঘর্ষিক?” একটাও না'।

নারীবাদের প্রথম পর্যায়ের প্রথম সারির তাত্ত্বিকদের অনেকের লেখায় ধর্মের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ দেখা যায়। এদের মধ্যে ইলিসাবেথ ক্যাডি স্ট্যান্টন তো চরম উগ্র এবং উসকানিমূলক The Women's Bible রচনার পেছনে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছিল। হাল আমলের কোনো মুসলিম নারীবাদী যদি 'দা উইমেনস কুরআন' লেখা শুরু করে তাহলে সেটা অভিনব কিছু হবে না; বরং তা হবে এক শ বছর আগের সেই ফার্স্ট ওয়েভ নারীবাদের অনুকরণমাত্র। মনে রাখবেন নারীবাদের পর্যায়গুলোর মধ্যে প্রথম পর্যায়কে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম উগ্র এবং আপত্তিকর ধরা হয়। এর পরের প্রতি প্রজন্মে নারীবাদের ধর্মবিদ্বেষ আরও বেড়েছে।

নারীবাদের দ্বিতীয় পর্যায় বা সেকেন্ড ওয়েভের কথাই ধরুন। বলা হয় নারীবাদের সেকেন্ড ওয়েভের শুরু ফরাসী দার্শনিক সিমন দি ব্যুভয়ার হাত ধরে। ধর্মের প্রতি তার বিরোধিতা সিমন প্রকাশ করেছিল এভাবে— 'পুরুষের বড় সুবিধা হলো পুরুষের লেখা নিয়মগুলোকেই ঈশ্বর বৈধতা দিয়েছে। আর পুরুষ যেহেতু নারীর ওপর কর্তৃত্ব করে তাই সার্বভৌম সত্তাও যে ধর্মমতে পুরুষকেই কর্তৃত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে, এটা বিশেষ সৌভাগ্যই বলতে হবে। ইহুদী, মোহাম্মাদান, খ্রিষ্টধর্মসহ অন্যান্য সব ধর্মে ঐশ্বরিক অধিকার বলে পুরুষই কর্তা। নিপীড়িত নারীর বিদ্রোহের যেকোনো চেতনা দমন করার জন্য স্রষ্টার ভীতি বরাবরই পুরুষের পক্ষে আছে'।

সেকেন্ড ওয়েভের আরেক বিখ্যাত নারীবাদী, গ্লোরিয়া স্টাইন্যাম ধর্মের ব্যাপারে বলেছিল— '(ধর্ম) অবিশ্বাস্য মাত্রার জোচ্চুরি। ব্যাপারটা চিন্তা করে দেখুন। মৃত্যুর পরের পুরস্কারের আশায় বর্তমানে একটা বিশ্বাসকে আঁকড়ে থাকা! গ্রাহক ধরে রাখার জন্য কর্পোরেশানগুলো নানা পুরস্কারের অফার দেয়, কিন্তু তারাও মরণোত্তর পুরস্কার দেয়ার বুদ্ধি বের করতে পারেনি'।

সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে স্টাইনেমকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, 'আজকের নারীবাদের সবচেয়ে বড় সংকট কী'? জবাবে স্টেইনেম বলেছিল— 'আজকের নারীবাদীরা ধর্মের বিরুদ্ধে যথেষ্ট সোচ্চার না। আধ্যাত্মিক হওয়া এক জিনিস, ধর্ম আরেক জিনিস। ধর্ম হলো আকাশের রাজনীতি। আমার মনে হয় নারীবাদীদের ধর্মের বিরুদ্ধে আরও কথা বলা দরকার। কারণ, আমাদের নীরবতা ধর্মকে আরও শক্তিশালী করে'।

নারীবাদের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের এ ধর্মবিদ্বেষ আরও তীব্র হয় তৃতীয় পর্যায়ে এসে। এ পর্যায়ে এই বিদ্বেষ আবির্ভূত হয় নানান রূপে। যার একটি হলো বিভিন্ন জগাখিচুড়ি আধ্যাত্মিকতা আর বিকল্প ধর্মবিশ্বাস'-এর প্রতি ভক্তি। উইমেন, জেন্ডার এবং সেক্সুয়ালিটির প্রফেসর সুসান শ'র মতে, বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন, গির্জা, সিনাগগ, মসজিদ) অবস্থার আলোকে বলা যায়, 'পুরুষতন্ত্রই পৃথিবীর কর্তৃত্বশালী ধর্ম।' আর 'ধর্মগুলো লিঙ্গের (gender) যে ধারণা দেয় তাতে সমস্যা আছে। এই সমস্যা পুরো পৃথিবীর সমস্যা। তাই আমাদের এমন এক সংস্কার দরকার (তা বিপ্লবও হতে পারে), যা পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার বেদিগুলো ভেঙে বিশ্বজুড়ে অন্তর্ভুক্তি, সাম্য, ন্যায়বিচার, শান্তি এবং ভালোবাসার এক পবিত্র আশ্রম গড়ে তুলবে।'

র‍্যাডিকাল লেসবিয়ান নারীবাদী দার্শনিক ম্যারি ড্যালির মতে, ধর্ম প্রকৃতিগতভাবেই নারীকে নিগৃহীত করে। তার ওপর যুলুম করে। ড্যালির বক্তব্য অনুযায়ী-
'গির্জার কাছে নারীর সমানাধিকার চাওয়া আর কেকেকে (Ku Klax Klan) এর কাছে কালো মানুষের সমানাধিকার চাওয়া একই কথা'।
তার উসকানিমূলক প্রবন্ধ "Sin Big” এ ড্যালি লিখেছে, 'ইংরেজি সিন (পাপ) শব্দটি এসেছে ইন্দো-ইউরোপীয় "এস/es" ধাতুমূল থেকে। এস/es অর্থ অস্তিত্বমান হওয়া (to be)। সিন শব্দের এই উৎস আবিষ্কার করার পর আমি বুঝতে পারলাম, বর্তমান পৃথিবীর ধর্ম হলো পুরুষতন্ত্র। আর পুরুষতন্ত্রের জাঁতাকলে আটকা পড়া মানুষের জন্য অস্তিত্বমান হবার পূর্ণাঙ্গ অর্থ হলো পাপ করা (to sin)'।

এ লেখায় ড্যালি নারীদের পাপ করায় সাহসী হতে বলছে। কারণ, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যেটাকে পাপ বলা হচ্ছে, সেটাই নাকি পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রতিবাদ। পুরুষতন্ত্র ধ্বংস করতে হলে ধর্মীয় বিধানগুলোকে ধ্বংস করতে হবে। কারণ, ধর্ম হলো পুরুষতন্ত্র আর পুরুষতন্ত্র হলো ধর্ম। এ দুয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। একটাকে ধ্বংস করা মানে অন্যটাকেও ধ্বংস করা।
নারীবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো এ ধরনের কথাবার্তা দিয়ে ভর্তি। এগুলো সব একসাথে করতে গেলে কয়েক ভলিউমেও হয়তো ফুরাবে না। মুসলিম নারীবাদীদের মধ্যেও আমরা এই ধর্মবিদ্বেষ দেখতে পাই, বিশেষ করে পঞ্চম ধাপে গিয়ে। আসলে যত যাই হোক, শিষ্য তার গুরুর কাছ থেকেই শেখে...।
নারীবাদী দর্শনের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে ধর্মের প্রতি তীব্র ঘৃণা এবং শ্লেষাত্মক মন্তব্য। নারীবাদের ইতিহাস থেকে ধর্মবিদ্বেষকে আলাদা করার উপায় নেই। একজন মুসলিম যখন এই আদর্শকে গ্রহণ করবে তখন তা অবশ্যই তার ঈমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং নষ্ট করবে।

বিকল্প
আগেই বলেছি, একসময় আমি ও আমার স্ত্রী নিজেদের নারীবাদী মনে করতাম। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, এই পথ কোন গন্তব্যে নিয়ে যাবে সেটা আমরা বেশ তাড়াতাড়ি ধরতে পেরেছিলাম। তবু কিছু প্রশ্ন রয়ে গিয়েছিল।
অনেক নারীকে তীব্র অবিচার ও যুলুমের মুখোমুখি হতে হয়। এর সমাধান কী?
ইসলামী শরীয়াহতে নারী ও পুরুষের জন্য যে আলাদা বিধানগুলো, সেগুলোর সাথে কীভাবে ইসলামের ন্যায়বিচার এবং ইনসাফের চেতনার সামঞ্জস্য করা যায়?

এ প্রশ্নগুলো নিয়ে আমরা চিন্তা করছিলাম। শুরুতে মনের মধ্যে একটু পচপচানিও ছিল। কিন্তু যখন আমরা উপলব্ধি করলাম-হয়তো ন্যায়বিচার এবং ইনসাফের ব্যাপারে আমাদের ধ্যানধারণাগুলোকে নতুন করে মূল্যায়ন করা দরকার-তখন প্রশ্নগুলোর উত্তর আসতে শুরু করল। আর এ কাজটা করার জন্য ন্যায়বিচার এবং ইনসাফের মালিকের দেয়া কাঠামোর আলোকে আমাদের ধারণাগুলো গড়ে তোলার চেয়ে ভালো উপায় আর কী হতে পারে?

ন্যায়বিচার এবং ইনসাফের মালিক তাঁর কিতাবে আমাদের জানিয়েছেন,
'হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা একজন ঘোষণাকারীকে ঈমানের ঘোষণা করতে শুনেছি যে, 'তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনো।' সে অনুযায়ী আমরা ঈমান এনেছি। সুতরাং হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করো এবং আমাদের থেকে আমাদের মন্দ কাজগুলো বিদূরিত করো আর নেক বান্দাদের সঙ্গে শামিল করে আমাদের মৃত্যু ঘটাও। 'হে আমাদের রব, আর আপনি আমাদের তা প্রদান করুন, যার ওয়াদা আপনি আমাদের দিয়েছেন আপনার রাসূলগণের মাধ্যমে। আর কিয়ামতের দিনে আপনি আমাদের অপমান করবেন না। নিশ্চয় আপনি অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন না।' অতঃপর তাদের রব তাদের ডাকে সাড়া দিলেন যে, 'নিশ্চয় আমি তোমাদের কোনো পুরুষ অথবা মহিলা আমলকারীর আমল নষ্ট করব না। তোমাদের একে অপরের অংশ। সুতরাং যারা হিজরত করেছে এবং যাদের তাদের ঘর থেকে বের করে দেয়া হয়েছে এবং যাদের আমার রাস্তায় কষ্ট দেয়া হয়েছে, আর যারা যুদ্ধ করেছে এবং নিহত হয়েছে, আমি অবশ্যই তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতিসমূহ বিলুপ্ত করে দেবো এবং তাদের প্রবেশ করাব জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে নহরসমূহ; আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদানস্বরূপ। আর আল্লাহর নিকট রয়েছে উত্তম প্রতিদান। দেশে দেশে কাফিরদের সদম্ভ পদচারণা তোমাকে যেন বিভ্রান্ত না করে। সামান্য ভোগ, তারপর জাহান্নাম তাদের আবাস, আর তা কতই-না নিকৃষ্ট বিশ্রামস্থল!' [তরজমা, সূরা আলে-ইমরান, ১৯৩-১৯৭]

এবং তিনি বলেছেন, 'আর আমি তাদের পেছনে মারইয়াম-পুত্র ঈসাকে পাঠিয়েছিলাম তার সম্মুখে বিদ্যমান তাওরাতের সত্যায়নকারীরূপে এবং তাকে দিয়েছিলাম ইনজীল, এতে রয়েছে হিদায়াত ও আলো এবং (তা ছিল) তার সম্মুখে অবশিষ্ট তাওরাতের সত্যায়নকারী, হিদায়াত ও মুত্তাকীদের জন্য উপদেশস্বরূপ। আর ইনজীলের অনুসারীগণ তাতে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার মাধ্যমে যেন ফয়সালা করে আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করে না, তারাই ফাসিক। আর আমি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি যথাযথভাবে, এর পূর্বের কিতাবের সত্যায়নকারী ও এর ওপর তদারককারীরূপে। সুতরাং আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তুমি তার মাধ্যমে ফয়সালা করো এবং তোমার নিকট যে সত্য এসেছে, তা ত্যাগ করে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ কোরো না। তোমাদের প্রত্যেকের জন্য আমি নির্ধারণ করেছি শরীয়াহ ও স্পষ্ট পন্থা এবং আল্লাহ যদি চাইতেন, তবে তোমাদের এক উম্মত বানাতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তাতে তোমাদের পরীক্ষা করতে চান। সুতরাং তোমরা ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করো। আল্লাহরই দিকে তোমাদের সবার প্রত্যাবর্তনস্থল। অতঃপর তিনি তোমাদের অবহিত করবেন, যা নিয়ে তোমরা মতবিরোধ করতে।' [তরজমা, সূরা আল-মায়'ইদা, ৪৬-৪৮]

নারী কিংবা পুরুষ-কারও আমলকেই মহান আল্লাহ বৃথা যেতে দেবেন না এবং আল্লাহ প্রত্যেককে তার নিজের অবস্থা অনুযায়ী বিচার করবেন। নারীর বিচার হবে তাকে যা দেয়া হয়েছে তার ভিত্তিতে এবং পুরুষের বিচার হবে তাকে যা দেয়া হয়েছে সেটার ভিত্তিতে।
এটা হলো আল্লাহর নির্ধারিত ইনসাফের মানদণ্ড, যা তিনি কুরআনে আমাদের জানিয়েছেন। মহান আল্লাহ্ সবক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের জন্য হুবহু একই বিধান দেননি। নারী ও পুরুষকে তিনি একই বৈশিষ্ট্য দেননি, একই দায়িত্বও দেননি। আল্লাহ বিভিন্ন ধরনের সৃষ্টি তৈরি করেছেন-জিন, ফেরেশতা, মেঘ, পাহাড়, পশু ইত্যাদি। প্রত্যেক সৃষ্টির অবস্থান ও ভূমিকা নির্ধারিত করেছেন। একইভাবে আল্লাহ নারী ও পুরুষকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যদিও তারা 'একে অপরের অংশ'। তাই এই পরীক্ষার এ বিপৎসংকুল সময়ে মুসলিম নারী ও পুরুষের দায়িত্ব একে অপরকে সাহায্য করা।

যে বিষয়টি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো নারীর বিরুদ্ধে যে অবিচার এবং অন্যায়ের কারণে একজন মানুষ নারীবাদের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে-কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণের মাধ্যমে তাঁর পরিপূর্ণ সমাধান করা সম্ভব। আর এ ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষার সারাংশ ফুটে উঠেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিচের কথায়-
'তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম, আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার স্ত্রীদের নিকট সর্বোত্তম ব্যক্তি'।
এবং তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, '...মুহাম্মাদের পরিবারে কাছে অনেক মহিলা তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এসেছে। সুতরাং যারা স্ত্রীদেরকে প্রহার করে তারা তোমাদের মধ্যে উত্তম নয়।

তবে নির্যাতন শুধু শারীরিক হয় না। অনেক নারীকে মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনের চেয়েও গুরুতর। অনেক মুসলিম নারী মনে করেন স্বামীরা তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করেন না। তারা উপযুক্ত সম্মান পান না। অনেকের মনে হয় তারা যেন নিজের ঘরে কাজের লোকের মতো। অথচ সূরা মুজাদিলাহয় আল্লাহ্ বলেছেন-
'আল্লাহ অবশ্যই সে রমণীর কথা শুনেছেন যে তার স্বামীর ব্যাপারে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছিল আর আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছিল। আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শোনেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা'। [তরজমা, সূরা মুজাদিলাহ, ১]

সমস্ত সৃষ্টির মালিক আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা একজন নারীর অভিযোগ শুনেছেন এবং কুরআনে তা উল্লেখ করেছেন। তাহলে একজন মুসলিম কীভাবে তার নিজের স্ত্রীর মানসিক চাহিদা উপেক্ষা করতে পারে? তা ছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম এর জীবনীর দিকে তাকালে আমরা দেখি তারা নারীদের তাচ্ছিল্য, অপমান, বিদ্রূপ কিংবা অসম্মান করতেন না। সেটা তাদের স্ত্রী, সন্তান কিংবা বোন হোক। অনেক বর্ণনায় স্ত্রীর অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীল হবার, তাদের অধিকার পূর্ণ করার এবং ইহসানের কথা এসেছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে আরও অনেক লেখা যায় এবং লেখা দরকার। আপাতত আমরা এটুটুকু বলি যে অবিচার দূর করার জন্য আমাদের ইসলামের শক্তির ওপর বিশ্বাস করতে হবে। 'নারীবাদী ইসলাম'-এর ওপর না। নারী ও পুরুষের মধ্যে ইনসাফ এবং আদল প্রতিষ্ঠার উপায় হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শিক্ষা অনুসরণ করা। সুসান অ্যান্থনি, সিমন ডি ব্যুভয়াহ, বেটি ফ্রিডেন, গ্লোরিয়া স্টাইন্যাম, কিংবা বেলা হুকস এর সুন্নাহ অনুসরণ করা না।

সবশেষে আমি ইমাম, আলিম এবং দা'ঈদের অনুরোধ করব নারীবাদের হুমকিকে আরও গুরুত্বের সাথে নেয়ার জন্য। আমি জানি এ বিষয়ে কথা বলা অনেক সময় অস্বস্তিকর, অনেক সময় ঝামেলার। কিন্তু আমরা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছি যখন আমাদের কথা বলতেই হবে। ইন্টারনেট আর সোশ্যাল মিডিয়া আসার আগের যুগে হয়তো এ বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া যেত। কিন্তু ইসলামবিরোধী প্রচারণা আজ এত বেশি বেড়ে গেছে যে এ বিষয়গুলো আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আমরা যদি এগুলো উপেক্ষা করি তাহলে ইসলাম এবং ইসলামী ইলম নিয়ে মানুষের মধ্যে যে অতৃপ্তি এবং বিভ্রান্তি দিন দিন বাড়ছে তা আরও তীব্র হবে।

যে আয়াত ও হাদীসগুলো আধুনিক পশ্চিমের মানদণ্ডে 'বিতর্কিত' কিংবা 'প্রবলেমেটিক' সেগুলো আমরা মানুষের কাছ থেকে লুকাতে পারব না। আমরা চুপ থাকলেও নাস্তিক এবং লিবারেল অ্যাক্টিভিস্টরা-যাদের কাজই হলো ইসলামকে আক্রমণ করা-বিষয়গুলো সামনে নিয়ে আসবে। সাধারণ মুসলিমরা যখন এ বিষয়গুলো সম্পর্কে জানবে তখন বিভ্রান্ত হবে। একই সাথে তারা প্রতারিত বোধ করবে এবং এদের মধ্যে অনেকে তখন ইসলাম ত্যাগ করবে। এটা এখনই ঘটছে। বিখ্যাত মুসলিম নারীবাদীদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট আর ওয়েবসাইটগুলো একনজরে ঘুরে দেখলেই ইসলামের চিরাচরিত অবস্থানের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ তৈরির জন্যে কী ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলছে তা পরিষ্কার বোঝা যায়।

তাই নারীবাদীদের ইচ্ছেমতো বিষ ছড়াতে দেয়ার বদলে আমাদের নারীবাদের ক্রিটিক এবং নারীবাদের ব্যবচ্ছেদের চেষ্টা করতে হবে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এবং অ্যাকাডেমিকভাবে। নারীবাদী দর্শনকে ব্যবচ্ছেদের করার মাধ্যমে মুসলিমরা জেন্ডার রিলেশনের ব্যাপারে ইসলামের শিক্ষাকে আরও পরিষ্কারভাবে বুঝতে শিখবে এবং উপলব্ধি করবে যে অন্য সবকিছুর মতোই ইনসাফ এবং রাহমাহর দিক থেকেও ইসলাম শ্রেষ্ঠ।

টিকাঃ
[৩৪] পশ্চিমা নারীবাদী আন্দোলনের তিনটি পর্যায় বা Wave আছে। প্রথম পর্যায়ের সময়কাল ধরা হয় মোটাদাগে ১৮৫০ এর দশক থেকে শুরু করে ১৯৪০ এর দশক পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্যায়ের সময়কাল ধরা হয় পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত। তৃতীয় পর্যায়ের সূচনাকাল ধরা হয় নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়টা। অনেকে ২০১০ এর দশক থেকে নারীবাদের চতুর্থ পর্যায়ের একটি কথা বলে থাকেন, তবে অধিকাংশ বিশ্লেষক নারীবাদী আন্দোলনকে তিন পর্যায়ে ভাগ করে থাকেন। - অনুবাদক
[৩৫] Aune, Kristin. “Much less religious, A little more spiritual”. Feminist Review, vol. 97, no. 1, Mar. 2011, pp. 32-55
[৩৬] Aune, Kristin. Why feminists are less religious. The Guardian. March 29, 2011.
[৩৭] Marcotte, Amanda. America Is Losing Religion: Why More and More Women Are Embracing Non-Belief. AlterNet. May 14, 2015.
[৩৮] 2015 State of Atheism in America. Barna Group, March 24, 2015
[৩৯] Bolt, Andres. On Leaving Islam. Herald Sun, June 19, 2017
[৪০] পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের ওপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজেদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিণী ওই বিষয়ের, যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেন। আর তোমরা যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা করো তাদের সদুপদেশ দাও, বিছানায় তাদের ত্যাগ করো এবং তাদের (মৃদু) প্রহার করো। এরপর যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পথ অনুসন্ধান কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমুন্নত মহান। [তরজমা, সূরা নিসা, ৩৪]
[৪১] এবং পুরুষদের ওপর নারীদেরও হাক্ক আছে, যেমন নিয়ম অনুযায়ী পুরুষদের নারীদের ওপরও হারু আছে, অবশ্য নারীদের ওপর পুরুষদের বিশেষ মর্যাদা আছে এবং আল্লাহ মহাপরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাশীল। [তরজমা, সূরা বাক্বারাহ, ২২৮]
[৪২] আর তোমরা তোমাদের পুরুষদের মধ্য হতে দুজন সাক্ষী রাখো। অতঃপর যদি তারা উভয়ে পুরুষ না হয়, তাহলে একজন পুরুষ ও দুজন নারী, যাদের তোমরা সাক্ষী হিসেবে পছন্দ করো। যাতে তাদের (নারীদের) একজন ভুল করলে অপরজন স্মরণ করিয়ে দেয়। [তরজমা, সূরা বাকারাহ, ২৮২]
[৪৩] আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন, এক ছেলের জন্য দুই মেয়ের অংশের সমপরিমাণ। তবে যদি তারা দুইয়ের অধিক মেয়ে হয়, তাহলে তাদের জন্য হবে, যা সে রেখে গেছে তার তিন ভাগের দুই ভাগ; আর যদি একজন মেয়ে হয় তখন তার জন্য অর্ধেক।... [তরজমা, সূরা নিসা, ১১]
[৪৪] আবূ সা'ঈদ খুদরী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, একবার ঈদুল আযহা বা ঈদুল ফিতরের সালাত আদায়ের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদগাহের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি মহিলাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন : হে মহিলা-সমাজ, তোমরা সা'দকা করতে থাকো। কারণ, আমি দেখেছি জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে তোমরাই অধিক। তাঁরা আরয করলেন : কী কারণে, ইয়া রাসূলাল্লাহ? তিনি বললেন : তোমরা অধিক পরিমাণে অভিশাপ দিয়ে থাকো আর স্বামীর না-শোকরী করে থাকো। বৃদ্ধি ও দ্বীনের ব্যাপারে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও একজন সদাসতর্ক ব্যক্তির বুদ্ধি হরণে তোমাদের চাইতে পারদর্শী আমি আর কাউকে দেখিনি। তাঁরা বললেন : আমাদের দ্বীন ও বুদ্ধির ত্রুটি কোথায়, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন : একজন মহিলার সাক্ষ্য কি একজন পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেক নয়? তাঁরা উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ।' তখন তিনি বললেন : এ হচ্ছে তাদের বৃদ্ধির ত্রুটি। আর হায়য অবস্থায় তারা কি সালাত ও সিয়াম থেকে বিরত থাকে না? তাঁরা বললেন, 'হাঁ।' তিনি বললেন : এ হচ্ছে তাদের দ্বীনের ত্রুটি। [সহীহ বুখারী]
[৪৫] হযরত মুয়াজ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, 'যদি আমি কোনো ব্যক্তিকে অন্য কাউকে সিজদাহ করার আদেশ দিতাম, তাহলে আমি স্ত্রীদের আদেশ দিতাম তাদের স্বামীকে সিজদাহ দিতে।'-সুনানু আবি দাউদ
[৪৬] "Personally, I have come to places where how the text says what it says is just plain inadequate or unacceptable, however much interpretation is enacted upon it", and where particular articulations in the Qur'an as a text are problematic, there is the "possibility of refuting the text, to talk back, to even say "no". Wadud, Amina. Inside the Gender Jihad, Oxford, Oneworld (2006), p. 209
[৪৭] Micmillen, Sally as cited in: 'Seneca Falls and the Origins of the Women's Rights Movements.'
[৪৮] New York World, February 2, 1896, quoted in Harper (1898-1908), Vol. 2. Pp. 858-60
[৪৯] Ibid
[৫০] Gardener, Helen Hamilton. Men, Women, and Gods. S.I., Forgotten Books. ২০১৭
[৫১] ব্রিঘাম ইয়াং, মৃত্যু ১৮৪৭। মার্কিন ধর্মীয় নেতা এবং রাজনীতিবিদ। মর্মন ধর্মের (চার্চ অফ জিসাস ক্রাইস্ট অফ ল্যাটার ডে সেইন্টস) দ্বিতীয় নেতা। অ্যামেরিকার সল্ট লেক সিটির প্রতিষ্ঠাতা এবং ইউটাহ প্রদেশের প্রথম গভর্নর। - অনুবাদক
[৫২] Gardener, Helen Hamilton. Men, Women, and Gods. S.I., Forgotten Books, 2017.
[৫৩] Beauvoir, Simone de, and H.M. Parshley. The Second Sex. South Yarra, Vic., Louis Braille Productions, ১৯৮৯.
[৫৪] Gloria Steinem. Freedom From Religion Foundation. Ffrf.org/news/day/ dayitems/item/14362-gloria-steinem. Accessed September 12, 2017.
[৫৫] Calloway-Hanauer, Jamie. "Is Religion the 'Biggest Problem' Facing Feminism Today?" Sojourners, May 6, 2015.
[৫৬] Shaw, Susan M. "Is Patriarchy The Religion of the Planet?'. The Huffington Post, October 1, 2015
[৫৭] Daly, Mary. Sin Big. The New Yorker, June 19, 2017.
[৫৮] সূরা আলে ইমরান, ১৯৫
[৫৯] সুনানুত তিরমিযী, ৩৮৯৫
[৬০] আবু দাউদ

📘 সংশয়বাদী > 📄 পুরুষতন্ত্র তন্ত্র

📄 পুরুষতন্ত্র তন্ত্র


নারীবাদ পুরুষতন্ত্রের বিরোধিতা করে। নারীবাদের ভাষ্যমতে পুরুষতন্ত্র এক অশুভ ব্যবস্থা, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীকে শোষণ করে আসছে। সভ্যতার শুরু থেকেই পুরুষরা এমন এক বৈষম্যমূলক সামাজিক কাঠামো গড়ে তুলেছে এবং টিকিয়ে রেখেছে, যার উদ্দেশ্য নারীকে অধীনস্থ করা, শোষণ করা, নির্যাতন করা এবং তাদের ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখা।

কিন্তু একটা বিষয় আমার মাথায় ধরে না, বিভিন্ন জায়গা, সময়, সমাজ ও সভ্যতার পুরুষরা কেন নারীদের পরাধীন করে রাখার জন্য, তাদের ওপর নির্যাতন আর নিপীড়ন চালাবার জন্য ষড়যন্ত্র করবে? পুরুষরা কেন নিজেদের মা, মেয়ে, স্ত্রীদের ওপর নির্যাতন করার জন্যে এত কিছু করবে?
কাউকে নিগৃহীত করার অর্থ কী? সে যা চায় তা থেকে তাকে বঞ্চিত করা। তার প্রাপ্য তাকে না দেয়া, তার ক্ষতি করা। এমন ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে ঘটতে পারে। যেমন অনেক স্বামী তাদের স্ত্রীকে নির্যাতন করে। কিন্তু এটা একটা পুরো সমাজজুড়ে কীভাবে হয়? কীভাবে বৈশ্বিকভাবে হয়? হাজার হাজার বছর ধরে হয়? এটা কীভাবে সম্ভব?
নারী কি এতই বোকা?
পুরুষ কি এতই বোকা?
নিজের পরিবারে এমন একটা নীলনকশা বাস্তবায়ন করা পুরুষের অবস্থান থেকে অযৌক্তিক। নিজ পরিবারের নারীদের নির্যাতন করা, ক্রমাগত তাদের বঞ্চিত করা পুরুষের জন্য লাভজনক না। কোনো পরিবার এভাবে দীর্ঘদিন চলতে পারে না। যেসব পরিবারের কর্তারা স্বৈরাচারের মতো আচরণ করে সেগুলো কখনোই টেকসই হয় না। সবাই পালানোর পথ খোঁজে। পরিবার একটা সামষ্টিক কাঠামো। ক্রমাগত যুলুম করে গেলে এই কাঠামো কার্যকরী রাখা তো যায়ই না, টিকিয়েও রাখা যায় না। এটুকু বোঝার মতো বুদ্ধি কি পুরুষের নেই? নাকি কেবল আধুনিক মানুষ এটা বুঝতে পেরেছে, বাকি সব যুগের মানুষ গর্দভ ছিল?

উল্টো দিক থেকে চিন্তা করুন। নারীবাদীদের বক্তব্য অনুযায়ী, আবহমানকাল থেকে নারী ভিকটিম। শতাব্দীর পর শতাব্দী, সহস্রাব্দের পর সহস্রাব্দ জুড়ে সে কেবল পুরুষের হাতে নির্যাতিত হচ্ছে। এই ধারণা কি নারীজাতির সক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তার প্রতি অপমানজনক না? পুরো মানব-সভ্যতাজুড়ে নারীরা এতই বোকা, এতই মূর্খ এবং এতই দুর্বল ছিল যে তারা এই নির্যাতন সয়ে গেছে। নিজেদের নির্যাতিত মনে করেনি, নির্যাতন বন্ধের চেষ্টাও করেনি। কিন্তু আধুনিক বুদ্ধিমান নারীবাদীরা এসে এই পুরুষতন্ত্রের বাস্তবতা ধরতে পেরেছে।
এ ধরনের ধারণা কি আদৌ যৌক্তিক মনে হয়? মানুষকে শোষণ করা কি খুব সহজ কোনো কাজ? মোটেই না। এটা আসলে বেশ কঠিন একটা প্রক্রিয়া। পুরুষতন্ত্রের অবস্থান থেকে বিষয়টা একবার দেখার চেষ্টা করুন। আজকের আরব বিশ্বের দিকে তাকান। সেখানকার স্বৈরাচার শাসকেরা নিজেদের ক্ষমতা কীভাবে টিকিয়ে রেখেছে?

ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখার জন্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ, সম্পদ, শ্রম, তাদের ব্যবহার করতে হচ্ছে। সামরিক বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ, ক্রমাগত প্রপাগ্যান্ডা, মানুষের ওপর নজরদারি-জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ টিকিয়ে রাখার জন্য করতে হচ্ছে নানান কসরত। আজ প্রায় ৬০-৭০ বছর ধরে এই শাসকেরা ক্ষমতায়। তবু দেখুন কী পরিমাণ প্রতিরোধের মুখোমুখি তাদের হতে হচ্ছে। বিভিন্ন সময় বিক্ষোভ আর অশান্তি হচ্ছে। ওরা জানে একটু ঢিল দিলে, একটু অমনোযোগী হলে প্রাসাদ থেকে ওদের জায়গা হবে সোজা রাস্তার পাশের নর্দমায়। তাই প্রতিনিয়ত এই শোষণ আর যুলুমের কাঠামো তাদের টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। প্রতিনিয়ত সজাগ থাকতে হচ্ছে। পুরো বিশ্বের ইতিহাসজুড়েই এমনটা দেখতে পাবেন। শোষণ এবং নির্যাতন সহজাতভাবে অস্থিতিশীল। একে টিকিয়ে রাখতে খরচ করতে হয় প্রচুর শক্তি ও সম্পদ। তারপরও শেষ রক্ষা হয় না। ক্ষমতা অনির্দিষ্টকাল টিকিয়ে রাখা যায় না। একসময়-না-একসময় মযলুম প্রতিশোধ নেয়ই। কাজেই হাজার হাজার বছর ধরে চলা অত্যাচারী পুরুষতন্ত্রের এই ধারণা বিশ্বাসযোগ্য না।

প্রথমত, পুরুষরা নিজেদের এমন পরিস্থিতিতে কেন ফেলবে? নিজের শয্যাসঙ্গিনীদের সাথে দ্বন্দ্ব চালিয়ে যাওয়া, ক্রমাগত সংঘাতের মাধ্যমে তাদের 'বিদ্রোহ' দমন করে পুরুষতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা-এই কষ্টকর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তারা কেন যাবে?
দ্বিতীয়ত, আসলেই যদি এমন কোনো কাঠামো থেকে থাকে তাহলে সেই কাঠামো টিকিয়ে রাখার মতো সম্পদ, উপকরণ, কোথা থেকে আসবে? পরিবারের অর্থ, সম্পদ, তথ্য, ইত্যাদি স্ত্রী-র কাছ থেকে সব সময় সরিয়ে রাখা তো অনেক কঠিন হবার কথা। বিচ্ছিন্নভাবে এটা হয়তো হতে পারে, কিন্তু সিস্টেম্যাটিকভাবে, বৈশ্বিক মাত্রায় এটা কীভাবে করা সম্ভব?

ঐতিহাসিক সত্য হলো পরিবার ও সমাজে নারীপুরুষ সব সময় ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা পালন করে এসেছে। কিন্তু পরিবারে নারীর ভূমিকা এক প্রাচীন ষড়যন্ত্রের অংশ, যার উদ্দেশ্য নারীকে শোষণ করা-এই বক্তব্য শুধুই আধুনিক নারীবাদের। পরিবারে নারী ও পুরুষের ঐতিহ্যগত ভূমিকা নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক-এ কথা শুধু নারীবাদীরাই এনেছে। কিন্তু তাদের এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। শিশু লালনপালন ও তাদের শিক্ষা দেয়া নারীর ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত ভূমিকার অন্তর্ভুক্ত। ব্যবসা বা কৃষিকাজ করা পুরুষের। এই দুইয়ের মধ্যে একটাকে কেন অন্যটার তুলনায় মৌলিকভাবে দুর্বল গণ্য করা হবে এবং কিসের ভিত্তিতে এই উপসংহার টানা হবে, সেটা পরিষ্কার না।

ব্যাপারটা এভাবে বলা যায়-
নারীবাদীরা বলতে চায় পুরুষরা অন্য পুরুষদের সাথে ষড়যন্ত্র করে নিজের পরিবারের সদস্যদের (মা, মেয়ে, বোন, স্ত্রী) শোষণ করার কাঠামো তৈরি করেছে। কিন্তু মানুষের ব্যাপারে আমাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান এবং আত্মরক্ষার সহজাত প্রবৃত্তির ব্যাপার আমরা যা জানি, তার সাথে এই দাবি মেলে না।
আপনি যদি একজন নারী হন, তাহলে নিজেকে প্রশ্ন করুন তো-আপনার বাবা, ভাই, সন্তান কিংবা স্বামী কি আপনার স্বার্থের ওপর অপরিচিত কিছু পুরুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে কারণ, 'পুরুষরা সব ভাই ভাই?"
উত্তর যদি 'হ্যাঁ' হয়, তাহলে আপনার বাবা, ভাই, সন্তান কিংবা স্বামী সম্ভবত মানসিকভাবে অসুস্থ সাইকোপ্যাথ। কিন্তু বিশ্বের অধিকাংশ পুরুষ এমন না। বাকি পুরুষদের সাথে মিলে দুনিয়ার সব নারীকে শোষণ করার ষড়যন্ত্র তারা করে না; বরং নিজের পরিবারের জন্য, পরিবারকে রক্ষার জন্য, পরিবারের স্বার্থের জন্য তারা জীবনভর কাজ করে যায়।

আপনি যদি পুরুষ হন, তাহলে নিজেকে প্রশ্ন করুন-
কিছু অপরিচিত পুরুষের জন্য আপনি কি নিজের মা, মেয়ে, বোন কিংবা স্ত্রীর স্বার্থ জলাঞ্জলি দেবেন?
উত্তর যদি 'হ্যাঁ' হয়, তাহলে আপনি সম্ভবত মানসিকভাবে অসুস্থ সাইকোপ্যাথ। নারীদের শোষণ করার বৈশ্বিক কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ না।

📘 সংশয়বাদী > 📄 নারীবাদ কি মুসলিম নারীদের ইসলামত্যাগের কারণ?

📄 নারীবাদ কি মুসলিম নারীদের ইসলামত্যাগের কারণ?


নিঃসন্দেহে। এর অসংখ্য প্রমাণ আছে। নারীবাদ কীভাবে মুসলিম নারীদের ধর্মত্যাগের দিকে নিয়ে যায় সেটা বোঝা আসলে কঠিন না। নারীবাদ লিবারেল-সেক্যুলার দর্শনের অংশ। লিবারেল-সেক্যুলারিসম ধর্মকে আক্রমণ করে। নারীবাদও ধর্মকে আক্রমণ করে। ইনফ্যাক্ট, ধর্মকে আক্রমণ করার ক্ষেত্রে লিবারেল-সেক্যুলারিসমের প্রধান হাতিয়ারগুলোর অন্যতম হলো নারীবাদ। যেসব মুসলিমরা নারীবাদী ধ্যানধারণা রাখে তাদের যে ইসলামের ব্যাপারে অনেক, অনেক আপত্তি থাকবে, এতে অবাক হবার কিছু নেই।

কাজেই মুসলিম নারীদের ইসলামত্যাগের পেছনে নারীবাদের ভূমিকা নেই বলাটা হাস্যকর। কালোদের প্রতি শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীদের ঘৃণার পেছনে বর্ণবাদী আদর্শের কোনো ভূমিকা নেই বলাটা কি হাস্যকর না? যে বলে শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীদের আদর্শ আর তাদের বর্ণবাদী ঘৃণার মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই, সে আসলে শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদ কী, তা-ই বোঝে না।

নারীবাদকে সমর্থন করা মুসলিমদের অবস্থাও অনেকটা এ রকম। মুসলিমদের ঈমানের ওপর নারীবাদের ক্ষতিকর প্রভাব তারা অস্বীকার করতে চায় কারণ তারা নারীবাদের ইতিহাস জানে না। যদি তাদের জিজ্ঞেস করেন, নারীবাদ কী? তারা আপনাকে স্কুল-কলেজে শেখা কিংবা পত্রিকার পাতা থেকে মুখস্থ করা কোনো উত্তর শুনিয়ে দেবে। যখন নারীবাদের ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন করবেন, তখন জনপ্রিয় কিছু বই কিংবা গবেষণার কথা তোতাপাখির মত আওড়ে যাবে। এটা অনেকটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আর ব্রিটেনের সরকারি কর্মকর্তাদের লেখাজোখা পড়ে উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কে জানার মতো। সে আপনাকে রেললাইন আর সতীদাহ প্রথার কথা শোনাবে কিন্তু নীলচাষ, গণহত্যা, জালিওয়ানওয়ালাবাগের কথা এড়িয়ে যাবে। বাস্তবতা হলো ধর্মকে, বিশেষ করে ইসলামকে আক্রমণ করার জন্য লিবারেল-সেক্যুলারিসম যেসব অস্ত্র সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে নারীবাদ তার অন্যতম।

নারীবাদী আর তাদের সমর্থক পুরুষরা যেসব মুখস্থ উত্তর দেয় সেগুলো নিয়ে কিছু কথা বলি। ওরা বলে, নারীবাদের কারণে মুসলিম নারীরা ইসলাম ত্যাগ করছে না। তারা ইসলাম ত্যাগ করছে মুসলিম পুরুষদের দুর্ব্যবহার আর অত্যাচারের কারণে। এই ধরনের কথা যারা বলে তারা সাধারণত নিজেদের বক্তব্যের পক্ষে তিন ধরনের প্রমাণ আনে-
১। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কিংবা শোনা কথা। (আমি শুনেছি, আমার চেনা একজন, ইত্যাদি)
২। মসজিদে নারীর কম উপস্থিতি।
৩। মুসলিম সমাজে নেতৃত্বের অবস্থানে নারীদের অনুপস্থিতি।

লক্ষ করুন, মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয়া অনেক নারী আজ কেন ইসলাম নিয়ে হতাশ, তার কোনো ব্যাখ্যা এসব 'প্রমাণ' থেকে পাওয়া যায় না। যেহেতু আজ আগের চেয়ে বেশি নারী ইসলাম ত্যাগ করছে তাই ওপরের যুক্তি অনুযায়ী এখন ১,২,৩ এর পরিমাণ বেশি হবার কথা। অর্থাৎ আগের চেয়ে এখন বেশি মহিলা ঘরে নির্যাতিত হচ্ছে, মসজিদে আগের চেয়ে কম নারী আসতে পারছে এবং নেতৃত্বের অবস্থানে নারীদের সংখ্যা আগের তুলনায় কমছে। কিন্তু এর কোনোটাই সত্য না। ৫,১০, ২০, ৫০ কিংবা ১০০ বছর আগের চেয়ে আজ নারী নির্যাতন বেশি হচ্ছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই; বরং নারীবাদীদের যুক্তি অনুযায়ী নারী নির্যাতন এখন কম হবার কথা। কারণ, 'নারীবাদের আলো' পাবার সৌভাগ্য আগের প্রজন্মগুলোর হয়নি, কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম নারীবাদের মাধ্যমে অনেক কিছু শিখেছে। তাই আজকের চাইতে আমাদের বাপদাদাদের প্রজন্মে নারী নির্যাতন বেশি হবার কথা। আর আমাদের মা-দাদিদের প্রজন্মে ইসলাম ত্যাগের হারও বেশি হবার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাদের প্রজন্মে ইসলাম নিয়ে কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু আজ আছে। কাজেই অত্যাচার বেশি হচ্ছে তাই বেশি নারী ইসলাম ত্যাগ করছে, এই কথার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

একইভাবে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে মসজিদে এবং নেতৃত্বের অবস্থানে আজ নারীদের উপস্থিতি বেশি (এটা ইসলামের দিক থেকে ভালো না মন্দ, সেটা ভিন্ন আলোচনা)। নারীবাদীরাও এটা স্বীকার করে। শুধু স্বীকার করে না, নারীর 'ক্ষমতায়নের' কৃতিত্বও তারা দাবি করে। যদি মসজিদ কিংবা নেতৃত্বের অবস্থানে নারীদের অনুপস্থিতি ইসলাম ত্যাগের কারণ হয় তাহলে আজ সেই হার কি কম হবার কথা না? অথচ সেটা বাড়ছে। কেন?
আমরা বরং দেখছি একদিকে মসজিদে ও নেতৃত্বের অবস্থানে নারীদের উপস্থিতি বাড়ছে অন্যদিকে ইসলাম ত্যাগের হারও বাড়ছে। কেবল সমানুপাতিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই কিন্তু বলা যায়, নারীদের ইসলাম ত্যাগ বন্ধ করার জন্য আমাদের উচিত নারীবাদের আবির্ভাবের আগের সময়টাতে ফিরে যাওয়া।

সত্যি করে বলুন তো, আপনার চেনা কয়জন নারী কয়েক বছর আগে ধার্মিক কিংবা নিদেনপক্ষে ধর্মভীরু ছিল, কিন্তু এখন নারীবাদী বুলি আওড়ায়? শরীয়াহ, উলামা আর ইসলাম নিয়ে সমালোচনা করে?
আলহামদুলিল্লাহ, এমন অনেক বোন আছেন যারা স্রোতের বিপরীতে গিয়ে নারীবাদী চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু সার্বিকভাবে পশ্চিমা বিশ্বে থাকা মুসলিম নারীদের অবস্থান দিন দিন খারাপ হচ্ছে। যে দাবি করে নারীবাদের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই সে কল্পজগতে আছে।

প্রশ্ন হলো, ইসলাম ত্যাগের কারণ তাহলে কী? শালীনতা এবং নম্রতা হারিয়ে যাবার ব্যাখ্যা কী? ঈমান হারানোর কারণ কী?
নারীবাদী তত্ত্বের প্রথম ভিত্তি হলো নারী এবং পুরুষের মধ্যে সবকিছু সম্পূর্ণ এক হতে হবে। এই মূলনীতি মেনে নিলে স্বাভাবিকভাবেই ইসলামের অনেক কিছুই মেনে নেয়া সম্ভব না। কেননা, ইসলামের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষ সমান না। ইসলাম নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা আলাদা ভূমিকা নির্ধারণ করে।

কোন মুসলিম নারী যখন মনে করে নারীর পোশাকের ব্যাপারে বিধিবিধান আসলে নারীকে নিয়ন্ত্রণ করার কূটকৌশল-তখন সে অবশ্যই ওই ধর্মের প্রতি নেতিবাচক ধারণা রাখবে, যে ধর্ম শালীনতা এবং নম্রতার ওপর গুরুত্ব দেয় এবং কঠোরভাবে পর্দার বিধান মেনে চলাকে বাধ্যতামূলক করে। যখন কোনো মুসলিম নারী মেনে নেয়, নারীকে অধীনস্থ করে রাখার জন্য পুরুষরা ইতিহাসজুড়ে পুরুষতন্ত্র নামের এক বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র চালিয়ে আসছে, তখন সে তো ওই ধর্মকে মেনে নিতে পারবে না, যে ধর্ম শিক্ষা দেয়-
পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের ওপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিণী ওই বিষয়ের, যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেন। [তরজমা, সূরা আন-নিসা, ৩৪]

আর অতীত এবং বর্তমানের আলিমদের অধিকাংশ পুরুষ। কাজেই নারীবাদের আদর্শে দীক্ষিত কেউ ইসলামকে মেনে নিতে পারবে না, এটাই স্বাভাবিক।
তবে এর দায় শুধু নারীদের না। যেসব পুরুষ (বিশেষ করে ধার্মিক পুরুষ) নারীবাদী বিভিন্ন ধ্যানধারণা প্রচার এবং সমর্থন করে, তাদের ওপরও এর দায় বর্তায়। এই ধরনের পুরুষরা ক্রমাগত বলে, 'মুসলিম পুরুষরা হলো আবর্জনা।' সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়টা হলো এরা নারীবাদী ধ্যানধারণার একধরনের ধর্মীয় বৈধতা তৈরির চেষ্টা করে। এদের কারণেই নারীবাদের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। যখনই কেউ নারীবাদের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করে, এই পুরুষরা অর্থহীন চেঁচামেচি জুড়ে দেয়। ভুল যুক্তি, ফ্যালাসি আর ব্যক্তি আক্রমণের পসরা খুলে হাজির হয়।
এই ধরনের পুরুষরা, বিশেষ করে পশ্চিমের অনেক দাঈরা, সমস্যার অংশ। এই লোকগুলোর সমর্থন না থাকলে মুসলিম নারীবাদ নামের বস্তু অনেকে আগেই মুখ থুবড়ে পড়ত।

📘 সংশয়বাদী > 📄 পুরুষতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক

📄 পুরুষতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক


২০১৫-তে নারীবাদ নিয়ে এক বিতর্কে অংশ নেয়ার প্রস্তাব এসেছিল। বিতর্ক হবার কথা ছিল আমাদের এলাকার এক মসজিদে। অনুষ্ঠানের মাসখানেক আগে সোশ্যাল মিডিয়াতে ঘোষণাও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে অনুষ্ঠান বাতিল করে দেয়া হলো। কেন হলো, তা আজ পর্যন্ত আমাকে জানানো হয়নি। আয়োজকরা কেন এই বিতর্ক বাতিল করেছিলেন, এই সিদ্ধান্ত কাদের ছিল, আমার জানা নেই। এ রকম ঘটনা আগেও হয়েছে। আমার ধারণা সামনে আরও হবে।

বিতর্কের প্রস্তুতি হিসেবে আমি কিছু নোটস তৈরি করেছিলাম। সেই নোটস অনুযায়ী আমার মূল অবস্থান সংক্ষিপ্তভাবে নিচে তুলে ধরছি। এ অবস্থানকে অনেকের কাছে অগ্রহণযোগ্য এমনকি আপত্তিকরও মনে হয়, তা তো বুঝতেই পারছেন। কিন্তু আমি মনে করি এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা দরকার। অনেক প্রশ্নকে আজ অস্বস্তিকর, কিংবা অসুবিধাজনক মনে হয়, কিন্তু ইসলামের এবং মুসলিমদের স্বার্থে এ প্রশ্নগুলো তোলা জরুরি। যেসব ধ্যানধারণার প্রভাবে মুসলিমরা সন্দেহ এবং সংশয়ে পড়ছে- সেগুলো নিয়ে অবশ্যই অ্যাকাডেমিকভাবে আলোচনা করার সুযোগ থাকা উচিত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই আলোচনাগুলো হোক এটা অনেকে চান না। যারা এ প্রশ্নগুলো তোলে, তাদের কথা বলার সুযোগ দেয়া হয় না।
যাই হোক, আমার ইচ্ছা ছিল ওই বিতর্কে নারীবাদের বিপক্ষে ঐতিহাসিক এবং দার্শনিক বিভিন্ন যুক্তিতর্ক তুলে ধরার। বিশেষ করে নারীবাদীদের নিজেদের লেখা থেকে বিভিন্ন বিষয় দেখানো। এ ছাড়া নারীবাদীরা হিংস্রভাবে মুসলিম আলিমদের আক্রমণ করে, তাই আলিমদের সমর্থনেও আমি কিছু কথা প্রস্তুত করেছিলাম।
এমন কিছু পয়েন্ট এখানে তুলে ধরছি।

নারীবাদের দ্বিতীয় পর্যায়ের শুরুর সময় থেকে একটা ধারণা বেশ প্রচার পেয়েছে। ধারণাটা সংক্ষেপে এ রকম-
প্রত্যেক সমাজে কিছু ক্ষমতার সম্পর্ক এবং লেনদেন থাকে। বিভিন্ন আর্থসামাজিক শ্রেণি, বর্ণ এবং গোত্রের মতো দুই লিঙ্গের মধ্যেও থাকে ক্ষমতার বোঝাপড়া। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি এবং রাজনৈতিক শক্তি যেমন একে অপরের সাথে শক্তির জন্য প্রতিযোগিতা করে, তেমনি নারীপুরুষও শক্তির জন্য একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করে। আর এই ক্ষেত্রে প্রত্যেক সমাজে শক্তির একটা ভারসাম্যহীনতা আছে। প্রত্যেক সমাজে পুরুষ নারীর ওপর কর্তৃত্ব করে। নারীর ওপর পুরুষের কর্তৃত্বের এই কাঠামোটা হলো পুরুষতন্ত্র।

নারীবাদের ভাষ্য অনুযায়ী-পুরুষ যে সব সময় সচেতনভাবে নারীকে শোষণ করার চেষ্টা করছে, তা না। যদিও অনেক ক্ষেত্রে এমনটা হয়ে থাকে। পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি। বর্তমানে এই কর্তৃত্ব অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রকাশ্য। পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার ফলে এমন এক অনমনীয় কাঠামো তৈরি হয়েছে, যা নারীদের শোষণ করছে। তাই নারীবাদ বলে, এই পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াই করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

এই কথাগুলো ধর্মের ক্ষেত্রেও খাটে। নারীবাদীরা মনে করে প্রত্যেক ধর্মের ধর্মগুরুরা পুরুষতান্ত্রিক এবং তারা নারীর প্রতি দমনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে।
এ ক্ষেত্রে মুসলিম নারীবাদীরা কিছুটা আপত্তি করে। তারা বলে স্রষ্টা পুরুষতান্ত্রিক নন। নারীকে তিনি পুরুষের অধীন করতে চান না। ইসলাম সাম্যবাদী ধর্ম। ইসলাম নারী ও পুরুষের সমানাধিকারের ধর্ম। সমস্যা হলো, মুসলিম পুরুষরা ইসলামকে পড়েছে পুরুষতান্ত্রিক চোখে। এভাবে তারা ইসলাম পড়েছে, বুঝেছে, শিখেছে এবং শিখিয়েছে। ফলে মুসলিমদের মধ্যে এমন বিভিন্ন বিধান আর প্রথা তৈরি হয়ে গেছে যেগুলোর মাধ্যমে মুসলিম নারীকে শোষণ করা হচ্ছে।

এই অবস্থান থেকে মুসলিম নারীবাদীদের মধ্যে একেকজন একেকদিকে আলোচনা নিয়ে যায়।
বহুবিবাহ কি ইসলামের অংশ নাকি পুরুষতান্ত্রিক সংযোজন?
নারীর ব্যাপারে কিছু কিছু হাদীস কি সত্যিকারের ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে, নাকি এগুলো পুরুষতন্ত্রের বানানো?
নারীদের ব্যাপারে পূর্ববর্তী আলিমগণ যেসব কথা বলেছেন সেগুলোতে কি ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা ফুটে উঠেছে? নাকি পুরুষতন্ত্রের লেন্সের কারণে তাদের বিবেচনাবোধ প্রভাবিত হয়েছে?
ইসলামের এমন শত শত দিক আছে, যা আধুনিক নারীবাদের চোখে সমস্যাজনক। নারীবাদের দর্শন অনুযায়ী ইসলামের এই দিকগুলো প্রমাণ করে ইসলাম নারীকে পরাধীন করে এবং শোষণ করে কিংবা নিদেনপক্ষে বঞ্চিত করে।
এ ধরনের বিষয়গুলো মুসলিম নারীবাদীদের জন্য সংকট তৈরি করে। যেহেতু তারা দাবি করে ইসলাম নারী ও পুরুষকে সমানাধিকার দেয়-তাই এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য করার বিভিন্ন উপায় তাদের বের করতে হয়।

আমার মতে নারীবাদ-সেক্যুলার কিংবা মুসলিম-ভ্রান্ত। লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তিতে সামাজিক সংঘর্ষের এই ধারণা বুদ্ধিবৃত্তিক এবং প্রমাণের দিক থেকে ত্রুটিপূর্ণ। কেবল নারীদের অধীন করে রাখার জন্য পুরুষরা একটা বৈশ্বিক কাঠামো তৈরি করেছে ও টিকিয়ে রেখেছে-এ দাবির কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মানদণ্ডেও এই দাবি টেকে না।
হ্যাঁ, ইতিহাসে প্রায় সব সমাজ ও সভ্যতায় কর্তৃত্ব ছিল পুরুষের হাতে, সত্য। কিন্তু এই কর্তৃত্ব ছিল নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ-সবার কল্যাণের জন্য। নারীকে অধীন করে শুধু পুরুষের স্বার্থসিদ্ধির জন্য না।

নারীবাদীদের যে অবস্থানগুলোর কথা এতক্ষণ বললাম সেগুলো সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক। কেউ যখন বিশ্বাস করে ১৪০০ বছরের ইসলামী ইলমের সিলসিলা পুরুষতন্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং প্রভাবিত, তখন তার ঈমানের ওপর এর প্রভাব কেমন হবে? অতীত ও বর্তমানের সব সমাজ পুরুষতন্ত্র দ্বারা আক্রান্ত, এমন দাবির জ্ঞানতাত্ত্বিক তাৎপর্য কী? এ থেকে মানবপ্রকৃতি এবং মানুষের স্রষ্টার ব্যাপারে কী উপসংহার পাওয়া যায়? নারী ও পুরুষের সম্পর্ক, পারিবারিক সহিংসতাসহ যে সমস্যাগুলো মুসলিম সমাজে আছে, সেগুলোর ব্যাখ্যা হিসেবে নারীবাদের এই পুরুষতন্ত্র তত্ত্ব কতটা উপযুক্ত?

এই প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে আমি যা বোঝাতে চাচ্ছি তা হলো-দুনিয়ার সব পুরুষ মিলে নারীকে শোষণ করার এক বৈশ্বিক কাঠামো তৈরি করেছে-নারীবাদের দেয়া এই পুরুষতান্ত্রিক তত্ত্ব একজন মুসলিমের ঈমানের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই তত্ত্ব সব ধর্ম এবং ধর্মীয় কর্তৃপক্ষকে পুরুষতন্ত্রের অংশ মনে করে। যারা অর্থ দাঁড়ায় ধর্ম হলো নারীকে অধীন বানিয়ে রেখে পুরুষের স্বার্থসিদ্ধির আরেকটা উপকরণমাত্র।
এমন কথা যারা বিশ্বাস করে তারা বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করবে এবং একসময় ইসলাম ত্যাগ করবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই মুসলিম নারীদের মধ্যে এই বিষাক্ত আদর্শের প্রচার হতে দেখা হতাশাজনক। নারীবাদ এবং এর সব সংস্করণ ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। মুসলিম নারীবাদীরা দ্বিমত পোষণ করতে পারে, কিন্তু তাতে বাস্তবতা বদলায় না। এই সাংঘর্ষিকতা খুব সহজে প্রমাণ করা যায়।

নারীবাদ ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ—
ক) দর্শন হিসেবে নারীবাদকে গ্রহণ করতে হলে আগে নারীবাদীদের প্রিয় ‘পুরুষতন্ত্র তত্ত্ব’ (Patriarchal Thesis)-কে মেনে নিতে হবে। পুরুষতন্ত্র তত্ত্ব হলো এই বিশ্বাস যে-সভ্যতার শুরু থেকেই পুরুষরা এমন এক বৈষম্যমূলক সামাজিক কাঠামো গড়ে তুলেছে এবং টিকিয়ে রেখেছে, যার উদ্দেশ্য নারীকে অধীন করা, শোষণ করা, নির্যাতন করা এবং তার ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখা।
খ) ‘পুরুষতন্ত্র তত্ত্ব’ মৌলিকভাবে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। এ দুয়ের মধ্যে কোনোভাবেই সমন্বয় করা সম্ভব না।
গ) সুতরাং নারীবাদ মৌলিকভাবে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক।

পুরুষতান্ত্রিকতার তত্ত্ব কেন ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক এবং ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষাক্ত?
১) পুরুষতান্ত্রিকতার এই তত্ত্ব নবুওয়্যাতের ধারাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে। সব নবী-রাসূল আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম পুরুষ ছিলেন। তবে ইবনু হাযমসহ আরও কয়েকজন আলিম বলেছেন নারীদের মধ্যে কেউ কেউ ওয়াহি পেয়েছিলেন। অল্প কয়েকজনের এ মতকে যদি আমরা গ্রহণও করি তাহলেও উপসংহার হলো, অধিকাংশ, প্রায় ৯৯% নবী-রাসূল ছিল পুরুষ। আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম। যদি পুরুষতন্ত্র তত্ত্বকে আমরা মেনে নিই, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, নবী-রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম) কি নারীর ওপর আধিপত্য ও কর্তৃত্ব করার জন্য তৈরি এই বৈষম্যমূলক পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর অংশ ছিলেন?
২) পুরুষতান্ত্রিকতার তত্ত্ব আলিমদের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ইসলামী ইতিহাসের অধিকাংশ আলিম ছিলেন পুরুষ। তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং সম্মানিতরা ছিলেন পুরুষ। তাদের সবারই এমন অনেক অবস্থান ছিল যেগুলো আধুনিক নারীবাদের দর্শন অনুযায়ী ‘চরম মাত্রার বিষাক্ত নারীবিদ্বেষী পুরুষতান্ত্রিক বাকওয়াস’ ছাড়া আর কিছুই না।
এসব আলিম ও ইমামগণ কি নারীর ওপর আধিপত্য ও কর্তৃত্ব করার জন্য তৈরি বৈষম্যমূলক পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর অংশ ছিলেন?
৩) ‘পুরুষতন্ত্র তত্ত্ব’ ইসলামী আকীদাহকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। পুরুষতন্ত্র যদি মানবজাতির জন্য এত বিপুল পরিমাণ দুঃখ-কষ্টের কারণ হয়ে থাকে, এতই বিষাক্ত, ধ্বংসাত্মক এবং গভীরে প্রোথিত সমস্যা হয়ে থাকে-তাহলে কুর'আনে কেন এ নিয়ে কিছুই বলা হলো না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেন এ বিষয়ে কিছু বললেন না? নারীবাদীদের মতে মানব-ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ শক্তিগুলোর মধ্যে পুরুষতন্ত্র অন্যতম। অথচ এই মারাত্মক বিষয়টার বর্ণনা দেয়ার মতো একটা শব্দও কেন আরবী ভাষায় নেই? মানবজাতিকে এই ভয়ংকর অভিশাপ, শোষণ আর নির্যাতনের ব্যাপারে সতর্ক করে একটি আয়াত, এক লাইন হাদীসও এল না কেন?

এই নিয়মতান্ত্রিক শোষণ ও নির্যাতনের ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহ যদি নিশ্চুপ থাকে, তাহলে কীভাবে কুরআন ও সুন্নাহকে পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা মনে করা সম্ভব?
যৌক্তিকভাবেই একজন ফেমিনিস্টের মনে ইসলামের ব্যাপারে এই প্রশ্নগুলো উদয় হতে বাধ্য। আর এ কারণেই নারীবাদীরা বিভ্রান্তির বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে যেতে থাকে এবং একপর্যায়ে এদের অনেকেই ইসলাম ত্যাগ করে।
শুরুটা হয় 'অশুভ পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি লালনের কারণে' ইসলামী ইতিহাসের আলিমদের ত্যাগ করা দিয়ে। তারপর তারা নবী-রাসূলগণকে (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) আক্রমণ করা শুরু করে। যেমন আমিনা ওয়াদুদ নামের এক মহিলা ইব্রাহিম আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম-কে নিয়ে কটূক্তি করেছে। তারপর তারা খোদ কুরআনের সমালোচনা করা শুরু করে-
* আল্লাহ কেন কুরআনে নিজের ব্যাপারে পুরুষবাচক সর্বনাম ব্যবহার করলেন?
* কেন আল্লাহ প্রথমে আদমকে, একজন পুরুষকে, সৃষ্টি করলেন?
* কেন আল্লাহ সূরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াত নাযিল করলেন?

পুরুষতন্ত্র তত্ত্ব নারীবাদের আদর্শিক ভিত্তিপ্রস্তর। আর এ তত্ত্ব সহজাতভাবেই একজন মুসলিমের মধ্যে বিশ্বাসের বিপর্যয় তৈরি করে। ফলে অনেক মুসলিম নারীবাদী ধাপে ধাপে নানা গোমরাহীপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করা শুরু করে, একসময় তাদের অনেকেই ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদে পরিণত হয়।
যারা দাবি করে ইসলাম ও নারীবাদের মধ্যে সমন্বয় সম্ভব, তারা দয়া করে ওপরের তিনটি পয়েন্টের জবাব দেবেন। আপনাদের হাতে সম্ভাব্য উত্তর সীমিত। ব্যাপারটা আরেকটু সহজ করার জন্য সম্ভাব্য উত্তরগুলোর লিস্ট আমি দিয়ে দিচ্ছি।
আপনি বলতে পারেন-
১) পুরুষতান্ত্রিকতার তত্ত্বে বিশ্বাস না করেও-অর্থাৎ সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই নারীকে অধীন ও শোষণ করার জন্য পুরুষতন্ত্র কাজ করছে-এ তত্ত্বে বিশ্বাসী না হয়েও নারীবাদী হওয়া সম্ভব, অথবা,
২) পুরুষতন্ত্র তত্ত্ব আসলে ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না।

কোনটা বেছে নেবেন?
সংস্কারপন্থী, প্রগতিবাদী এবং হাদীস অস্বীকারকারী জাতীয় যেসব লোক আছে; ইসলামী ইতিহাসের আলিমদের সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করতে যাদের সমস্যা নেই, তারা দু-নম্বরকে বেছে নেবে। কিন্তু সঠিক আকীদাহর ওপর থাকা সাধারণ মুসলিমরা এ সত্য স্বীকার করতে বাধ্য যে পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত ইলমী সিলসিলা ছাড়া আমরা কুরআন পেতাম না, সুন্নাহ পেতাম না, ইসলাম সংরক্ষিত হতো না-যেহেতু সাহাবা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম ওয়া আজমাইন, হাদীস বর্ণনাকারী, আলিম, মুহাদ্দিস, মুফাসসির, এবং ফক্কিহদের প্রায় ৯৯% পুরুষ।
যদি আলিমদের ছুঁড়ে ফেলেন, তাহলে ইসলামকেও ছুঁড়ে ফেলতে হবে। আলিমরা নবীদের (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) ওয়ারিশ। যদি কেউ দাবি করে, সারা বিশ্বজুড়ে ইসলামের আলিমরা সিস্টেম্যাটিকালি নারীর বিরুদ্ধে ছিলেন, তাঁরা নারীদের ব্যাপারে না-ইনসাফি করেছেন-তাহলে সে আলিমদের নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং কার্যত ইসলামকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
আমার মতে এটা নারীবাদ ও ইসলামের সহজাত সংঘর্ষের একটি যৌক্তিক পর্যালোচনা। কেউ দ্বিমত পোষণ করলে যৌক্তিক খণ্ডন উপস্থাপন করতে পারে। তবে আবেগ ও বুলি-সর্বস্ব ন্যাকামি, অ্যাড হমিনেম ঘ্যানঘ্যানানি আর রূপকথার রাজপুত্রসুলভ অভিনয় গ্রাহ্য করা হবে না।

বি.দ্র. কিছু অস্পষ্টতা দূর করা যাক।
***
অবশ্যই পুরুষতন্ত্রের অস্তিত্ব আছে। অ্যানথ্রোপোলজিকাল বা নৃতাত্ত্বিক অর্থে ইসলাম একটি পুরুষতান্ত্রিক ধর্ম। ইসলামী আইনে বংশপরিচয় নির্ধারিত হয় পিতৃপরিচয় দ্বারা। সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর কর্তৃত্ব থাকে পুরুষের হাতে, সেটা গোত্রপতি, স্বামী, পিতা কিংবা অন্য কোনো পুরুষ হতে পারে। কিন্তু নারীবাদের প্রচারিত 'পুরুষতন্ত্র'-এর ধারণা আর অ্যানথ্রোপোলজিকাল বা নৃতাত্ত্বিক অর্থে পুরুষতন্ত্রের ধারণার মধ্যে পার্থক্য আছে। নারীবাদ দাবি করে এ সবগুলো কাঠামো সহজাতভাবে নারীর প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ।
নারীবাদীদের দাবি হলো, পুরুষ এসব পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তুলেছে নারীর স্বার্থের বিনিময়ে পুরুষের সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য। অর্থাৎ, নিষ্পাপ, সাদাসিধে, দুর্ভাগা নারীদের আটকে রেখে শোষণ করার জন্য একদল শয়তান লোক ক্রমাগত চক্রান্ত করে চলেছে। সভ্যতার শুরু থেকে এই চক্রান্ত চলে আসলেও মাত্র কয়েক দশক আগে নারীবাদীদের কল্যাণে এই কাপুরুষোচিত মহা-ষড়যন্ত্রের বাস্তবতা মানবজাতির সামনে প্রকাশিত হয়েছে। সেই থেকে পুরুষতন্ত্র নামের এই শয়তানী চক্রান্ত নস্যাৎ করার জন্যে দুঃসাহসী নারীবাদীরা খেয়ে-না-খেয়ে যুদ্ধ করে যাচ্ছে।
পাগলের প্রলাপ মনে হচ্ছে? হওয়াটাই স্বাভাবিক।

আরেকটা মুসলিম প্রজন্ম যেন এই বিষাক্ত আদর্শের কারণে নষ্ট না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য নারীবাদের আবিষ্কৃত এই পুরুষতন্ত্র তত্ত্বের খণ্ডন করা মুসলিম চিন্তাবিদ, দাঈ এবং আলিমদের দায়িত্ব।
এটা করার বিভিন্ন উপায় আছে। প্রথমত, আমাদের স্বীকার করতে হবে যে এমন অনেক পুরুষ আছে, যারা নারীদের ওপর নির্যাতন চালায়। এমন অনেক সামাজিক প্রথা, আচার আছে, যা নারীর সাথে যুলুম করে। এমন অনেক মানুষ আছে, যারা ইসলামের দোহাই দিয়ে এসব যুলুমকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে। এই বাস্তবতা অস্বীকার করা যাবে না। পারিবারিক সহিংসতা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, নিজ ঘরে এবং সমাজে নারীর মতকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করা, যৌন নিপীড়নসহ বিভিন্ন বিষয় এড়িয়ে যাওয়া বা ধামাচাপা দেয়া-এসবই বাস্তব। এই যুলুম এবং না-ইনসাফীগুলোর অস্তিত্ব আছে এবং সব সমাজেই এগুলোর বিরুদ্ধে কথা হওয়া দরকার। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন করতে হবে এই সমস্যাগুলোর কারণ কি পুরুষতন্ত্র নামের কোনো কাল্পনিক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব? দুনিয়ার সব পুরুষ মিলে গোপনে চক্রান্ত করে এসব করছে? নাকি এগুলোর কারণ হলো কিছু স্বার্থপর, অজ্ঞ, নির্যাতনকারী মানুষ-যারা পুরুষ?

টিকাঃ
[৬১] পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের ওপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজেদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিণী ওই বিষয়ের, যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেন। আর তোমরা যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা করো, তাদের সদুপদেশ দাও, বিছানায় তাদের ত্যাগ করো এবং তাদের (মৃদু) প্রহার করো। এরপর যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পথ অনুসন্ধান কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমুন্নত মহান। [তরজমা, সূরা নিসা, ৩৪]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00