📘 সংশয়বাদী > 📄 শরিয়াহসম্মত বাকস্বাধীনতা

📄 শরিয়াহসম্মত বাকস্বাধীনতা


বিভিন্ন সময় আমি বাকস্বাধীনতার সমালোচনা করেছি। আমি মনে করি কিছু কিছু ধরনের কথা নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত। কিছু বক্তব্য এতই ক্ষতিকর যে এগুলোর কারণে অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া উচিত। এ ধরনের সীমা এবং আইন ইসলামে আছে। আর আমি বিশ্বাস করি এটা শুধু যৌক্তিক এবং নৈতিকভাবে সঠিক না; বরং এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ এবং আইনের উদাহরণ সেক্যুলার রাষ্ট্রেও আছে। পার্থক্য হলো ইসলামে কিছু বিষয়কে পবিত্র গণ্য করা হয়, আর লিবারেল রাষ্ট্রে অন্য কিছু বিষয়কে পবিত্র গণ্য করা হয়। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই 'পবিত্র বিষয়গুলো' রক্ষার জন্য সামাজিক এবং আইনি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়।

কিন্তু বিষয়গুলোকে আমরা এভাবে দেখি না। দেখি না বলেই পশ্চিমারা আজও ছোট্ট শিশুর মতো বিশ্বাস করে, তাদের সমাজে চূড়ান্ত বাকস্বাধীনতা আছে অন্যদিকে ইসলামী সমাজে-যে সমাজ ও শাসন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম ১৪০০ বছর আগে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন-বাকস্বাধীনতার গলা টিপে ধরা হয়।

যাই হোক, বাকস্বাধীনতার একটি দিক আছে, যা মুসলিমদের গ্রহণ করা উচিত। আর তা হলো, শাসকদের ভুল কিংবা অপরাধের সমালোচনা করার অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। লিবারেল দর্শন (তাত্ত্বিকভাবে হলেও) এই অবস্থানকে সমর্থন করে। আর মুসলিম শাসনের ইতিহাস থেকেও আমরা এমন অনেক উদাহরণ, পাই যা এ অবস্থানকে সমর্থন করে। আমরা এমন উদাহরণ দেখি যেখানে খুলাফায়ে রাশেদীনের (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) প্রত্যেকের প্রকাশ্য সমালোচনা করা হয়েছে। সমালোচনাগুলো ন্যায্য ছিল না, ভুল ছিল। কিন্তু খুলাফায়ে রাশেদীন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) তাঁদের সমালোচকদের মুখ বন্ধ করেননি। সমালোচকদের বন্দী করেননি, নির্যাতন করেননি, হত্যা করেননি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর খুলাফায়ে রাশেদীন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) হলেন ন্যায়পরায়ণ শাসনের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত। তাঁরাও যদি সমালোচিত হন এবং সমালোচকদের সহ্য করেন তাহলে আজকের মুসলিম-বিশ্বের শাসকদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কেমন হবার কথা?

মানবপ্রকৃতির একটা বাস্তবতা হলো, যারা আন্তরিক, সত্যবাদী, সৎ, এবং ন্যায়পরায়ণ-তারা সমালোচিত হলে ক্রুদ্ধ হয় না। একে নেতিবাচকভাবে নেয় না; বরং কেউ সংশোধন করে দিলে তারা কৃতজ্ঞবোধ করে। কারণ, সমালোচনা সঠিক হলে এর দ্বারা নিজের ভুল শোধরানোর সুযোগ পাওয়া যায়।

কিন্তু যারা ন্যায়পরায়ণ না, সমালোচনাকে তারা ঘৃণা করে। তারা কেবল নিজেদের ক্ষমতা আর স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। সত্য ও ন্যায়বিচার নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। তাই সর্বশক্তি দিয়ে তারা সমালোচনা আর সমালোচকদের দমিয়ে রাখতে চায়।

একটি হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম বলেছেন, মুনাফিকের একটি বৈশিষ্ট্য হলো বিবাদে লিপ্ত হলে সে অশ্লীল গালি দেয়। মুনাফিক যখন তর্ক করে তখন সত্য নিয়ে চিন্তা করে না। তার লক্ষ্য যেকোনো মূল্যে তর্কে জেতা, সত্য যা-ই হোক না কেন।

তাহলে ওই সব শাসকদের কী বলা হবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হলে ঠিক-বেঠিক যাচাই করার বদলে তারা সমালোচকদের বন্দী করে, গ্রেপ্তার করে, নির্যাতন করে কিংবা হত্যা করে? আর সমালোচকের ভাগ্য নিতান্ত ভালো হলে সমালোচনা উপেক্ষা করে?

তাই এই ক্ষেত্রে বাকস্বাধীনতার ধারণাকে ইসলাম সমর্থন করে এবং এ ধরনের বাকস্বাধীনতা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো যৌক্তিক এবং বিবেচক ব্যক্তি এই ধরনের বাকস্বাধীনতার গুরুত্ব বুঝতে পারবে। প্রত্যেক সমাজে যা পবিত্র গণ্য করা হয়, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে রক্ষা করা হয়। ইসলামী সমাজ ও শাসনে সত্যিকার অর্থে পবিত্র কী? আল্লাহ্, তাঁর রাসূল এবং দ্বীন ইসলাম। আল্লাহ্, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম এবং দ্বীন ইসলামের ওপর আক্রমণ করা পুরো ইসলামী সমাজের ওপর আক্রমণ করার শামিল। কারণ, এগুলো ইসলামী শাসন ও সমাজের ভিত্তি। কল্যাণ ও ন্যায়বিচারের উৎস। কিন্তু আজ এমন কোনো রাষ্ট্র নেই, যা এই বিষয়গুলোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং পবিত্র মনে করে। আজকের শাসকদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র তাদের ক্ষমতা, তাদের গদি। আর হাতেগোনা অন্য কিছু বিষয়। একদিকে নিজেদের ক্ষমতার বিরুদ্ধে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দকে তারা সর্বশক্তি দিয়ে দমন করার চেষ্টা করে, অন্যদিকে 'বাকস্বাধীনতার' বুলি প্রচার করে।

টিকাঃ
[৩৩] কাবীসা ইবনু 'উকবা (রহ.)... আবদুল্লাহ ইবনু 'আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকে সে হবে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোনো একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। ১. আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে ২. কথা বললে মিথ্যা বলে ৩. চুক্তি করলে ভঙ্গ করে এবং ৪. বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীল গালি দেয়।-সহীহ বুখারী

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00