📄 হুদুদ, দুর্নীতি এবং সাম্য
ইসলামী নৈতিকতায় সাম্যের ধারণা আছে। বেশ গুরুত্বের সাথেই আছে। কিন্তু সাম্যের সব ধারণা এক না। আধুনিক লিবারেলিসম যে সমতার কথা বলে সেটার সাথে ক্লাসিকাল লিবারেলদের, অর্থাৎ প্রথম দিককার লিবারেল দার্শনিকদের দেয়া সমতার সংজ্ঞা মেলে না। অ্যামেরিকার প্রতিষ্ঠাতারা সমতায় বিশ্বাস করত। সেই সাথে আরও বিশ্বাস করত যে কৃষ্ণাঙ্গ ও নারীদের ভোট আর সম্পদের মালিকানার অধিকার নেই। এই দুই বিশ্বাসের মধ্যে তারা কোনো সাংঘর্ষিকতা দেখেনি।
সে যা-ই হোক, ইসলামে কোন ধরনের সাম্যের কথা আছে, তাঁর একটা উদাহরণ দেখা যাক। সহীহ বুখারীতে আছে,
মক্কার কুরাইশ বংশের মাখযুমী গোত্রের এক মহিলা চুরি করে। লোকেরা উসামাহ ইবনু যাইদ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-কে চোরের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সুপারিশ করতে বলে। উসামাহ ইবনু যাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সুপারিশ করতে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আকে বললেন, “তুমি আল্লাহর শাস্তির বিধানের ব্যাপারে সুপারিশ করছ?”
তারপর মিম্বরে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: 'হে মানবমণ্ডলী, নিশ্চয়ই তোমাদের আগের লোকেরা গোমরাহ হয়ে গিয়েছে। কারণ, কোনো সম্মানিত ব্যক্তি যখন চুরি করত তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর যখন কোনো দুর্বল লোক চুরি করত তখন তার ওপর শরীয়াতের শাস্তি কায়েম করত। আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করে তবে অবশ্যই মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর হাত কেটে দেবে।”
আরেক বর্ণনা থেকে আরও বিস্তারিত জানা যায়-
'আয়িশা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহা থেকে বর্ণিত, আল-মাখযুমী সম্প্রদায়ের জনৈকা মহিলার ব্যাপার কুরাইশ বংশের লোকদের খুব দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল, যে কিনা চুরি করেছিল। সাহাবা কিরামগণ বললেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে কে কথা বলতে পারবে? আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়পাত্র উসামা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) ছাড়া কেউ এ সাহস পাবেন না। তখন উসামা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে কথা বললেন: এতে তিনি বললেন, তুমি আল্লাহ তা'আলার দেওয়া শাস্তির বিধানের ক্ষেত্রে সুপারিশ করছ? এরপর তিনি দাঁড়িয়ে খুতবা প্রদান করলেন এবং বললেন, হে মানবমণ্ডলী, নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের লোকেরা পথভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছে। কেননা, কোনো সম্মানিত লোক যখন চুরি করত তখন তারা তাকে রেহাই দিয়ে দিত। আর যখন কোনো দুর্বল লোক চুরি করত তখন তার ওপর শরীয়াহর শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! মুহাম্মদ এর কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করে তবে অবশ্যই মুহাম্মদ তার হাত কেটে দেবে।
হাত কাটা কিংবা শারীরিক শাস্তির ব্যাপারটা হয়তো ঢালাওভাবে অমুসলিমদের কাছে অস্বস্তিকর লাগতে পারে। কিন্তু একজন বিবেচনাসম্পন্ন কাফিরও বুঝতে পারার কথা যে গুরুতর পর্যায়ের চুরির মতো অপরাধ থেকে মানুষকে বিরত রাখার ক্ষেত্রে এ ধরনের শাস্তি কার্যকরী। কাজেই এ ধরনের শাস্তির বিধানকে অটোম্যাটিকভাবে অনুপযোগী ধরে নেয়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই।
আজকের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে দেখুন। বড় বড় কর্পোরেশান আর ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকগুলো বৈশ্বিক পর্যায়ে ফ্রড আর চুরি করে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের পকেট থেকে আক্ষরিক অর্থে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার চুরি করছে। এদের কারণে দেখা দিচ্ছে মন্দাসহ বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়। যখন এদের কেউ ধরা পড়ছে তখন তাকে জেলেও যেতে হচ্ছে না। কিছু টাকা জরিমানা দিয়ে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। দিব্যি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
ব্যাপারটা একটু চিন্তা করুন। আপনি মানুষের হাজার হাজার কোটি টাকা মেরে দিয়েছেন। শাস্তি হিসেবে আপনাকে বলা হলো কয়েক লক্ষ বা বেশি হলে কয়েক কোটি টাকা জরিমানা দিতে। এটাকে কি শাস্তি বলে? নাকি প্রফিট মার্জিন? এমন শাস্তিতে চুরি কি কমবে নাকি বাড়বে?
অন্যদিকে গরিব মানুষ যখন ছোটখাটো অপরাধ করে, তখন আধুনিক সেক্যুলার আইন তার সাথে কেমন আচরণ করে? সামান্য একটা টিভি চুরির কারণে একজন মানুষকে বছরের পর বছর জেল খাটতে হয়। হাজার হাজার কোটি টাকা চুরি করলে লক্ষ টাকা জরিমানা আর কয়েক হাজার টাকা দামের টিভি চুরি করলে কয়েক বছরের জেল? এটা কেমন ইনসাফ? এখানে সাম্য কোথায়? সমানাধিকার কোথায়?
ব্যাংকার আর কর্পোরেশানগুলোর অপরাধের কারণে বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন নষ্ট হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ চাকরি হারিয়েছে, গৃহহারা হয়েছে, পথের ভিখারি হয়েছে। এই অপরাধীদের অবশ্যই হাত কাটার মতো শাস্তি প্রাপ্য।
টিকাঃ
[২৯] সহীহ বুখারী
[৩০] সহীহ মুসলিম
📄 ইসলাম কি স্বাধীনতার ধর্ম?
পশ্চিমা ডানপন্থী আর বামপন্থী, দু-দলই ইসলামের সমালোচনা করে। দু-দলেরই সমালোচনার ভিত্তি লিবারেল দর্শনের বিভিন্ন ধ্যানধারণা-ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, পোশাকের স্বাধীনতা, জেন্ডার সমতা, ধর্ম ও রাষ্ট্রের বিচ্ছেদ ইত্যাদি।
এ ধরনের সমালোচনার মুখোমুখি হলে অনেক মুসলিম বিচিত্র এক স্ট্র্যাটিজি গ্রহণ করে। তারা বোঝানোর চেষ্টা করে লিবারেল এই ধ্যানধারণাগুলো আসলে ইসলামসম্মত। এগুলো নাকি অনেক আগে থেকেই ইসলামে আছে। ইসলাম এগুলো সমর্থন করে ইত্যাদি।
এটা একটা লুসিং স্ট্র্যাটিজি। এভাবে কখনো জেতা সম্ভব না। হ্যাঁ, ইসলামী শরীয়াহ এবং মূল্যবোধের কিছু কিছু দিকের সাথে লিবারেল এসব ধারণার কিছু দিক মেলে। কিন্তু সার্বিকভাবে মিলের চেয়ে অমিল বেশি। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মিলগুলো গৌণ বিষয়ে। অন্যদিকে ইসলামের সাথে এসব মতবাদের সংঘর্ষ মৌলিক জায়গাতে। তাই জোর করে দুটোকে মিলিয়ে দিলে হবে না।
তা ছাড়া স্ট্র্যাটিজি হিসেবে এটা যাচ্ছেতাই।
মুক্তচিন্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, পোশাকের স্বাধীনতা, জেন্ডার সমতা, বৈবাহিক সমতাসহ যাবতীয় লিবারেল ধ্যানধারণা মুসলিমরা মেনে নিলেও শেষ রক্ষা হবে না। পশ্চিমের মন জয় করার জন্য আজ যদি মুসলিমরা মক্কাতে সমকামী বিয়ের আয়োজন করে, তাহলে কাল ওরা বলে বসবে সত্যিকার অর্থে মুক্তমনা হবার জন্য মাসজিদুল হারামে কোনো ট্রান্সজেন্ডার কিংবা নারীর পোশাক পরা পুরুষকে ইমামতিতে দাঁড় করাতে হবে। যদি এই দাবি মানা হয় তাহলে অন্য কোনো অভিযোগ এনে বলবে প্রগতিশীল পশ্চিমের তুলনায় ইসলাম আসলে অনেক বেশি সংকীর্ণ। এটাই প্রগতিবাদের বাস্তবতা। আধুনিক পশ্চিমা চিন্তা ও সংস্কৃতির মূল স্তম্ভ হলো এই প্রগতিবাদ। এই দর্শন অনুযায়ী ক্রমাগত পরিবর্তন ভালো এবং জরুরি। পরিবর্তন না হওয়া মানে পিছিয়ে যাওয়া। ইতিহাসের স্রোতের ভুল দিকে চলা।
প্রগতিবাদের এ দর্শন সরাসরি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। মুসলিম হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি সবচেয়ে ভালো সময় ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সময়। সবচেয়ে উত্তম প্রজন্ম ছিল ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্ম। সবচেয়ে ভালো যুগ ছিল তাঁদের যুগ। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে অবনতি হচ্ছে।
কে বেশি প্রগতিশীল, কে বেশি স্বাধীন, তা প্রমাণে পশ্চিমা দর্শন ক্রমাগত নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে। আমরা মুসলিমরা কখনো এ প্রতিযোগিতায় জিততে পারব না। আর তার দরকারও আমাদের নেই। এমন পাতানো খেলায় যাবারই প্রয়োজন নেই। তাহলে আমাদের স্ট্র্যাটিজি কী হওয়া উচিত?
মুক্তি, স্বাধীনতা, সাম্যের মতো ধারণাগুলো কোন কোন কারণে অসংলগ্ন, সেটা আমাদের তুলে ধরা উচিত। আমাদের পরিষ্কার করা দরকার যে এগুলো অনুসরণ করে কল্যাণ এবং ইনসাফ অর্জিত হয় না; বরং মানবজাতির জন্য সবচেয়ে উত্তম সমাধান দেয় ইসলাম। ইসলামের সমাধান কেন সর্বোত্তম সেটা নিয়েও আলোচনা করা দরকার। মডার্নিস্ট প্রগতিবাদীদের সাথে তর্ক করা উচিত এই ছকে।
📄 আমাদের কি ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সমর্থন করা উচিত না?
প্রশ্ন-ব্যক্তিস্বাধীনতা আর ব্যক্তিঅধিকার লিবারেল দর্শনের মূল ভিত্তির অংশ। কিন্তু এগুলো কোনো ধরাবাঁধা মাপকাঠি নেই। যেহেতু এগুলো লিবারেলিসমের মূল ভিত্তি তাই সংখ্যালঘু হিসেবে পশ্চিমা দেশে থাকা মুসলিমদের কি উচিত না ব্যক্তিস্বাধীনতার আর ব্যক্তিঅধিকারের এই প্যারাডাইম সমর্থন করা?
উত্তর-ব্যক্তিস্বাধীনতা আর অধিকারের কথা শুনতে ভালোই লাগে। কিন্তু আইন এই স্বাধীনতা আর অধিকারকে সীমাবদ্ধ করে। এটা সব সমাজের ক্ষেত্রে সত্য। সব আইনের ক্ষেত্রে সত্য। আইনমাত্রই স্বাধীনতা খর্ব করে, মানুষের সিদ্ধান্তকে একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে ফেলে। প্রত্যেকের ইচ্ছা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ।
কিন্তু লিবারেল-সেক্যুলারিসম বলে, কেউ যেন নিজ স্বার্থ কিংবা সুখের জন্য আরেকজনের ক্ষতি করতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করাই আইনের উদ্দেশ্য। কোনো আইন তখনই বৈধ হবে যখন তা অন্যের ক্ষতিকে নিবারণ করে। তাই ধর্মীয় এবং সেক্যুলার আইন-দুটোই মানুষের অবাধ স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করলেও সেক্যুলার আইন গ্রহণযোগ্য আর ধর্মীয় আইন অগ্রহণযোগ্য। সেক্যুলার আইনের উদ্দেশ্য ক্ষতি নিবারণ করা। আর এটা সর্বজনীনভাবে সব মানুষের স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্যদিকে ধর্মীয় আইনের ভিত্তি হলো ধর্মীয় ভক্তি, যা শুধু ওই নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ; বাকিদের জন্য না।
এটা লিবারেল-সেক্যুলারিসমের বক্তব্য।
সেক্যুলার আর ধর্মীয় আইন এর ব্যাপারে এই যে পার্থক্য দেখানো হচ্ছে, তার মধ্যে বিভিন্ন সমস্যা আছে। ফাঁকফোকর আছে।
প্রথম সমস্যা, ক্ষতির সংজ্ঞা কী? লাভক্ষতির হিসেব কিসের ভিত্তিতে হচ্ছে? এ নিয়ে ব্যাপক মতবিরোধ এবং বিতর্কের জায়গা থাকে। সেক্যুলার দর্শনের দেয়া 'ক্ষতি'র সংজ্ঞাই কি চূড়ান্ত? এটাই কি একমাত্র বৈধ সংজ্ঞা?
কোনটা ক্ষতিকর আর কোনটা ক্ষতিকর না সেটা নির্ভর করে মানবপ্রকৃতি এবং বিশ্বের ব্যাপারে একজন মানুষের মেটাফিযিকাল অবস্থানের ওপর। এই অবস্থানগুলোকে সব সময় ধর্ম হিসেবে ধরা করা হয় না, কিন্তু মৌলিকভাবে এগুলো ধর্মের চেয়ে খুব একটা আলাদা না।
সেক্যুলার লিবারেলিসম আসলে ভালোমন্দ, লাভক্ষতির ব্যাপারে নিজের ধ্যানধারণাকে সর্বজনীন হিসেবে উপস্থাপন করে। সর্বজনীন সত্য বা স্বার্থের নাম দিয়ে নিজস্ব কিছু মেটাফিযিকাল অবস্থান সে চালান করে দেয়।
একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক।
গর্ভপাত নিয়ে তর্ককে বেশির ভাগ সময় দেখানো হয় সেক্যুলার আর ধার্মিকদের মধ্যেকার ঝগড়া হিসেবে।
গর্ভপাত কি নৈতিক নাকি অনৈতিক? একে আইনের আওতায় আনা উচিত কি না? এ ব্যাপারে আইনের অবস্থান কী হওয়া উচিত?
এ প্রশ্নগুলোর ব্যাপারে ব্যক্তির উত্তর নির্ভর করবে ভ্রূণের ব্যাপারে তার ধারণা, ভ্রূণকে 'মানুষ' গণ্য করা হবে কি না, পিতামাতার নৈতিক দায়িত্ব কী- ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে তার বিশ্বাসের ওপর।
যারা গর্ভপাতের বিরোধিতা করে তারা ধর্মীয় মূল্যবোধ দ্বারা চালিত। অন্যদিকে গর্ভপাতের পক্ষে যারা প্রচারণা চালায় তারা চালিত হয় ব্যক্তিস্বাধীনতা আর ব্যক্তিঅধিকারের মতো বিভিন্ন সেক্যুলার চিন্তা দিয়ে। এভাবেই বিতর্কটা উপস্থাপন করা হয়।
কিন্তু ভ্রূণ এবং নারীদেহের ব্যাপারে সেক্যুলারদের অবস্থানও কিন্তু তাদের ধার্মিক প্রতিপক্ষের অবস্থানের মতোই মেটাফিযিকাল। অর্থাৎ বিশ্বাসজাত। কিন্তু এ বিতর্ককে এক মেটাফিযিকাল বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আরেক মেটাফিযিকাল বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখানো হয় না; বরং একে দেখানো হয় ধর্মীয় রক্ষণশীলতা বনাম সেক্যুলার উদারতার লড়াই হিসেবে। ধর্মীয় ভক্তি বনাম স্বাধীনতার দ্বন্দ্ব হিসেবে।
কেন এমন হয়?
কারণ, দুটি মেটাফিযিকাল অবস্থানের দ্বন্দ্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হলে শুরুতেই কেন একটা অবস্থানকে অন্যটার ওপর প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে তা নিয়ে মানুষ প্রশ্ন করবে। মানুষের মাথায় এই প্রশ্নটা আসুক, সেটা লিবারেল সেক্যুলারিস্টরা চায় না। আর সেক্যুলার আইনের ব্যাপারে এ প্রশ্নটাই আমাদের করা উচিত।
সেক্যুলার নৈতিকতা থেকে শুরু করে সেক্যুলার আইন-সবকিছুর ভিত্তি হলো এমন কিছু মেটাফিজিক্যাল বিশ্বাস, যেগুলো ধর্মীয় বিশ্বাসের মতো। মৌলিকভাবে এ বিশ্বাসগুলোর ধরন 'ধর্মীয়'। যদিও এগুলোকে তা মনে করা হয় না। এই বিশ্বাসগুলোর ভিত্তিতে সেক্যুলার আইন প্রণয়ন করা হয়। সেগুলো চাপিয়ে দেয়া হয় বাকি সবার ওপর। তারপর আমাদের বাধ্য করা হয় সেক্যুলারিসমের ধর্ম আর বিধান মেনে চলতে। বাধ্য করা হয় সেক্যুলার ধর্মের শাসন মেনে নিতে।
টিকাঃ
[৩১] মেটাফিযিক্স-বাংলায় অধিবিদ্যা। দর্শনের ওই শাখা, যা প্রাথমিক মূলনীতিসমূহ (first principles) এবং সত্তা, অস্তিত্ব, জানা, পরিচয়, মন, সময়, বস্তু, সময়, স্থান, সম্ভাবনা এর মতো বিভিন্ন বিমূর্ত ধারণা নিয়ে কাজ করে। - অনুবাদক
📄 ইসলাম কি সমতা শেখায়?
ইসলাম কি সমানাধিকার সমর্থন করে? এ প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বড় ধরনের বিভ্রান্তি আছে। এক অর্থে বলা যায়, মুসলিমরা সমতার নীতিতে বিশ্বাসী, কারণ সমতা সব ধরনের মৌলিকতার ভিত্তি।
সব নৈতিকতার কাঠামোতে একটা প্রচ্ছন্ন নীতি থাকে-
একই জাতীয় দুটো বিষয়কে সমানভাবে বিচার করা উচিত।
ব্যক্তি 'ক' দোকান থেকে চুরি করলে সেটাকে যদি অপরাধ গণ্য করা হয়, তাহলে একই কাজ 'খ' কিংবা 'গ' করলে সেটাকেও অপরাধ গণ্য করা উচিত-যদি বাকি সবকিছু অপরিবর্তিত থাকে। 'বাকি সবকিছু অপরিবর্তিত থাকা'র এই শর্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, 'ক' আর 'খ' কখনো হুবহু একইরকম হবে না। দুটো মানুষ কখনো এক হয় না। তাদের পরিস্থিতি, প্রেক্ষাপট, ব্যাকগ্রাউন্ড সবই আলাদা। এসব পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও নৈতিকতার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চুরির ক্ষেত্রে 'ক' ও 'খ' পর্যাপ্ত পরিমাণে একইরকম হওয়া। অর্থাৎ তাদের অবস্থা ওইসব দিক থেকে একইরকম হতে হবে যেগুলো এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। এই কাজের নৈতিকতার প্রশ্নের মীমাংসায় যেগুলো দরকারি।
যেমন ধরুন, 'ক' এর চোখের মণি কালো। 'খ' এর চোখের মণি নীল। এটা একটা পার্থক্য। কিন্তু এই পার্থক্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ না। চুরির প্রশ্নে এই পার্থক্য প্রাসঙ্গিক না। তাই এই পার্থক্য সত্ত্বেও আইনের চোখে তারা সমান গণ্য হবে।
কিন্তু 'ক' যদি কোটিপতি হয় আর 'খ' যদি হয় দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চলের মানুষ, কিংবা অনাহারে থাকা রিফিউজি-তাহলে সেটা প্রাসঙ্গিক। চুরির নৈতিকতার প্রশ্নে এই পার্থক্য তখন বিবেচনা করতে হবে। 'ক' আর 'খ' এর কাজকে তখন মূল্যায়ন ও বিচার করতে হবে আলাদা আলাদাভাবে।
এখান থেকে আমরা কী পেলাম? আমরা বুঝলাম সমানাধিকারের ব্যাপারে আমাদের ধারণা নির্ভর করে 'নৈতিকভাবে 'প্রাসঙ্গিক' কিছু ফ্যাক্টরের ওপর। এই বিষয়টা বোঝা জরুরি।
অনেক মানুষ আছে যারা ইসলামী আইনের দিকে তাকিয়ে বলে, 'দেখো, ইসলাম নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্য করে। মুসলিমরা তো সমানাধিকারে বিশ্বাসী না।' দুঃখজনকভাবে, কাফিরদের পাশাপাশি আজ অনেক মুসলিমও এ ধরনের মনোভাব পোষণ করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো নারী ও পুরুষের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে এমন কিছু পার্থক্য আছে যা নৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক। ইসলামী আইন এই পার্থক্যগুলো আমলে নেয়। তাই ইসলামী আইন বৈষম্যমূলক কিংবা শোষণমূলক না; বরং যেসব আইন বা নৈতিকতার কাঠামো নারী ও পুরুষের বাস্তব পার্থক্যগুলো আমলে নেয় না সেগুলোই অন্যায্য এবং শোষণমূলক।
সমানাধিকারের কথা বলে লিবারেলিসম দেখাতে চায় সমতার ধারণা যেন তারাই আবিষ্কার করেছে। কিন্তু তারা আসলে এমন একটা ধারণার ব্যাপারে ক্রেডিট নিতে চাচ্ছে, যেটা সবার মধ্যেই আছে। সব ধরনের নৈতিকতার কাঠামোর মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে সমতার ধারণা থাকে। সবাই মনে করে একইরকমের দুটো জিনিসকে সমানভাবে বিচার করা উচিত। যে জায়গাটায় গিয়ে নৈতিক কাঠামোগুলোর মধ্যে পার্থক্য হয় তা হলো, কোন কোন ফ্যাক্টরগুলোকে তারা প্রাসঙ্গিক ধরছে, কেন ধরছে, কীভাবে ধরছে। আর এই আলোচনাটা একটা মেটা-এথিকাল, মেটাফিযিকাল আলোচনা।
তাই লিবারেল সেক্যুলারিসম আর ইসলামের মধ্যে সমানাধিকারের মূলনীতির প্রতি কে বেশি শ্রদ্ধাশীল তা নিয়ে অর্থহীন তর্ক বাদ দিয়ে নিচের প্রশ্নগুলো নিয়ে কি চিন্তা করা যায় না-
আদর্শ মানবজীবন কেমন?
একটা আদর্শ সমাজে কী কী থাকবে?
কোন জিনিসগুলো মানবজীবনের সমৃদ্ধির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত?
এগুলো হলো সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে এমন অনেক কিছু সামনে আসবে যেগুলোর আলোচনা সেক্যুলারিসম এড়িয়ে যায়। একই সাথে কোন ফ্যাক্টরগুলো নৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক সেটাও আমরা বুঝতে পারব। কিন্তু লিবারেল-সেক্যুলারিসম এ প্রশ্নগুলোকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করে। এগুলোর আলোচনা থেকে বাঁচার জন্য সে গিয়ে লুকায় স্বাধীনতা আর সমতার ফাঁপা স্লোগানের পেছনে। সে বলে, এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। সঠিক উত্তর নেই, ভুল উত্তরও নেই। মানুষ নিজেই নিজের উত্তর খুঁজে নেবে। আর সে যে উত্তর খুঁজে নেবে সেটাই তার জন্য সঠিক। লিবারেল-সেক্যুলারিসমের এ অবস্থান উন্মাদনা ছাড়া আর কিছুই না।
টিকাঃ
[৩২] মেটা-এথিক্স-বাংলায় পরা-নীতিবিদ্যা। নীতিশাস্ত্রের ওই শাখা যা নৈতিক ধারণা উৎস, বৈশিষ্ট্য, তাৎপর্য, প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করে। নীতিশাস্ত্র প্রশ্ন করে 'মানুষের কী করা উচিত'? পরানীতিবিদা প্রশ্ন করে, 'ভালো হবার অর্থ কী?', 'মন্দ হবার অর্থ কী?', ইত্যাদি। - অনুবাদক