📄 আত্ম-উপাসনা, গোল্ডেন রুল এবং সায়ইটানিসম
স্যাইটানিসমের মূল মন্ত্র কী জানেন?
Do what thou wilt shall be the whole of the law. যা ইচ্ছে তা-ই করো, এই হলো পূর্ণাঙ্গ বিধান।
কথাটা অ্যালিস্টার ক্রউলির 'দা বুক অফ দা ল' থেকে নেয়া। এ বইকে আধুনিক শয়তান উপাসনার প্রধানতম রচনাগুলো অন্যতম ধরা হয়। আর অ্যালিস্টার ক্রউলিকে মনে করা আধুনিক স্যাইটানিসমের গডফাদার।
আচ্ছা বলুন তো, মানুষকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়?
এর নানা পদ্ধতি আছে। তবে ইতিহাস বলে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতির অন্যতম হলো মানুষকে এই কথা বলা-
তুমিই সর্বেসর্বা। তুমি নিজেই নিজের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করো। নিজেই নিজের ভাগ্য গড়ো, তোমার জীবনের নিয়ন্ত্রণ তোমারই হাতে। তুমিই দেবতা, তুমি কেবল তোমারই আরাধনা করো।
মানুষ প্রাণী হিসেবে নির্দিষ্ট কিছু ছকের মধ্যে চলে। মানুষের সিদ্ধান্তগুলো ছক বাঁধা। কামনাবাসনার কাছে মানুষ আত্মসমর্পণ করে। নিজের ইগো আর প্রবৃত্তিকে সে সন্তুষ্ট করতে চায় নানাভাবে। নিজেকে সে সাময়িক সুখে মগ্ন করে। চকচকে জিনিস তার দৃষ্টি আর মন, দুটোই কেড়ে নেয়। এগুলো আমাদের নফসের বৈশিষ্ট্য।
যখন বলা হয়-মনের কথা শোনো, মন যা চায় তা-ই করো-মানুষ তখন নফসের কামনা-বাসনাগুলোর দিকে ফিরে যায়। মন্ত্রমুগ্ধের মতো নফসের চাহিদা মেটানোয় ব্যস্ত থাকে। কামনাবাসনা তার ওপর রাজত্ব করে। সে পরিণত হয় শরীর, নফস, আর চাহিদার দাসে। আর পুরোটা সময় মনে করে সে মুক্ত, স্বাধীন। সে নিজেই তার জীবন নিয়ন্ত্রণ করছে। নিজের ভাগ্য গড়ে নিচ্ছে।
লিবারেল দর্শন, 'মুক্তি-স্বাধীনতা-ক্ষমতায়নের' মুখস্থ বুলি, সেলফহেল্প, পসিটিভ সাইকোলজি, মাই লাইফ মাই রুলস, জাস্ট ডু ইট, ইউ ঔনলি লিভ ওয়ান্স-এই সবকিছুর মূল মন্ত্র হলো নফসের দাসত্ব। খেয়ালখুশির গোলামি।
ব্যাপারটা মাদকাসক্ত হওয়ার মতো। আসক্ত ব্যক্তি মনে করে নিজের চিন্তা আর কাজের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ আছে। মনে করে সে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কথাটা সত্য। মাদকাসক্তরা যা কিছু করার সিদ্ধান্ত নেয় সেটা স্বেচ্ছায়ই তো নেয়। কিন্তু সমস্যা হলো, সিদ্ধান্তগুলো বেশির ভাগ সময় ভুল হয় এবং তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। নফসের গোলামি করা মানুষেরও একই অবস্থা।
এ জন্যই দখল করা অঞ্চলের স্থানীয় অধিবাসীদের নিয়ন্ত্রণের জন্য এবং তাদের স্বাধীনচেতা মনোভাব ধ্বংসের জন্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো বহুদিন ধরে মাদক আর মদ ব্যবহার করে আসছে। মানুষকে তার আদিম, পাশবিক সত্তায় ফিরিয়ে নিতে পারলে তাকে ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করা খুব সহজ হয়ে যায়।
লিবারেলিসম গোল্ডেন রুলের কথা বলে। গোল্ডেন রুলের বক্তব্য হলো-
অন্যের সাথে এমন আচরণ করো, যেমন আচরণ তুমি নিজের জন্য চাও
এটা আসলে অ্যালিস্টার ক্রউলির Do what thou wilt-এর একটা সংস্করণ। কারণ, লিবারেল দর্শনের ভেতরে থাকা অবস্থায় এটা একটা অসার কথা, যার কোনো নির্দিষ্ট অর্থ নেই। এই নীতি কোনো কাজের দিকে মানুষ ধাবিত করে না। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে না।
কারণ, একটা বড় প্রশ্ন থেকে যায়-তুমি নিজের জন্য কেমন আচরণ চাও?
দেখুন, ঘুরেফিরে আবারও বৃত্তের কেন্দ্রে বসানো হচ্ছে নিজেকেই। নিজের ইচ্ছা, নিজের ভালোলাগাই চূড়ান্ত মাপকাঠি। নৈতিকতা হলো পুরো বিশ্বকে আমার অবয়বে দেখা। এটা ন্যায়পরায়ণতা না, এটা আত্ম-উপাসনা। আত্মকেন্দ্রিক লিবারেল দর্শনের প্রধান স্তম্ভ এই 'গ্লোডেন রুল' হওয়াই স্বাভাবিক।
লিবারেলরা অবশ্য এখানে একটা বস্তাপচা যুক্তি দেয়ার চেষ্টা করবে। তারা বলবে- প্রত্যেক ধর্মেই কোনো-না-কোনোভাবে গোল্ডেন রুলের কথা এসেছে। যেমন হাদিসে এসেছে-
'তোমাদের কেউ প্রকৃত মু'মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে।
হ্যাঁ, বিভিন্ন ধর্মে এমন কথা এসেছে, এটা সত্য। কিন্তু বিভিন্ন ধর্মে এটা কীভাবে এসেছে? লিবারেলদের দেয়া এই যুক্তির ত্রুটি হলো, এ কথাটা কোনো ধর্মে স্বতন্ত্র এবং বিচ্ছিন্ন মূলনীতি হিসেবে আসেনি; বরং বিভিন্ন ধর্মীয় বিধান ও অন্যান্য মূলনীতির সাথে যুক্ত হয়ে এসেছে। কাজেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম যখন বলেছেন-... ‘যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে’-তখন সেটাকে ইসলামী শরীয়াহর বেঁধে দেয়া সীমার ভেতরেই বুঝতে হবে। কেউ তার সমকামী যৌনসঙ্গীকে বিয়ে করতে চায়, তাই তার উচিত সমকামী বিয়ে সমর্থন করা—এটা বলা যাবে না। কেউ যিনা করে তাই সে চায় সমাজে যিনা বহুল-প্রচলিত হয়ে যাক, এটাও বলা যাবে না। তখন এই যুক্তি দেয়া যাবে না যে-একজন মুসলিম ‘তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে’!
কল্যাণ, ন্যায়-অন্যায়, ভালোমন্দের সংজ্ঞা নিজে নিজে ঠিক করা যায় না। ভালোমন্দ, হারাম-হালাল আল্লাহ্ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আল্লাহর নির্ধারিত সেই সীমার মধ্যে থাকতে হবে। কিন্তু লিবারেলিসমের ক্ষেত্রে গোল্ডেন রুল স্বতন্ত্র এবং একাকী। এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে শুধু সিদ্ধান্তই নেয়া হয় না; বরং ভালোমন্দ পর্যন্ত ঠিক করা হয়।
এ কাজটা কি আমার কাছে ভালো মনে হয়? যদি হয়, তাহলে আমি চাই অন্য সবাই এই কাজ করার সুযোগ পাক।
সমকামিতা, অজাচার কিংবা মাদক আমার ভালো লাগে। তাই আমি চাই এগুলো বৈধ করে দেয়া হোক। সবাই যেন এই ভালো জিনিসগুলো উপভোগ করতে পারে।
ঘুরেফিরে এটা সেই আত্ম-উপাসনাই। ভালোমন্দের মাপকাঠি আমি। আমার যা ভালো লাগে সেটাই আমি দুনিয়ার জন্য চাই।
প্রশ্ন-কোন সৃষ্টি সর্বপ্রথম নিজেকে ভালোমন্দের কেন্দ্র বানিয়েছিল?
সে বলল, ‘আমি তার চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদামাটি থেকে।
📄 মদ ও স্বাধীনতা
সেক্যুলাররা প্রায়ই বলে ইসলামে ব্যক্তিস্বাধীনতা নেই। মানুষের স্বাধীনভাবে বেছে নেয়ার অধিকারকে ইসলাম সম্মান করে না। যেমন ইসলামে মদ পান অথবা বিক্রি নিষিদ্ধ। অন্যদিকে স্বাধীন পশ্চিমে মদ চলে পানির মতো। যার ইচ্ছে খাবে, যার ইচ্ছে খাবে না। মদ খেলে ক্ষতি যা হবার তার হবে, অন্য কারও না। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিজের ইচ্ছেমতো, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। তার স্বাধীনতায় বাধা দেয়ার কিংবা তার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করার অধিকার ধার্মিক ব্যক্তির নেই।
এই হলো মোটাদাগে সেক্যুলারিসমের বক্তব্য। কথাগুলো আরেকটি খতিয়ে দেখা যাক।
এমন কোনো আইনি ব্যবস্থা নেই, যা মানুষকে যা ইচ্ছে তা-ই করার স্বাধীনতা দেয়। সব আইনি কাঠামো কোনো-না-কোনোভাবে মানুষের সিদ্ধান্তের সীমানাকে সীমিত করে এবং সেই সীমাবদ্ধতাকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে।
যেমন গাড়ি চালাতে হলে লাইসেন্স লাগে। এ নিয়মের কারণে অনেক মানুষের গাড়ি চালানোর স্বাধীনতা কিন্তু খর্ব হচ্ছে। এমন অনেক মানুষ থাকতে পারে যারা গাড়ি চালাতে পারে, কিন্তু তাদের লাইসেন্স নেই। এমন মানুষ থাকতে পারে যাদের গাড়ি চালানো দরকার। হয়তো তার জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে যেতে হবে। কিন্তু লাইসেন্স না থাকার কারণে সে যেতে পারছে না। এই আইনের কারণে মানুষের চলাচলের সুযোগ সীমিত হচ্ছে। তবু এ আইন সবাই মেনে নেয়, কারণ এ আইনকে দরকারি মনে করা হয়। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাতে দেয়া হলে দুর্ঘটনা বেড়ে যাবে। আহত ও নিহতের সংখ্যা বাড়বে। ক্ষয়ক্ষতি বাড়বে। এসব প্র্যাকটিকাল কারণে মানুষ চায় এ আইনটা থাকুক এবং ঠিকঠাকভাবে এর প্রয়োগ হোক। যাতে ক্ষতি এড়ানো যায়।
এখানে আরেকটা প্রশ্ন আসে। 'ক্ষতি' বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে? ক্ষতির সংজ্ঞা কী? মাপকাঠি কী? কোনটাকে ক্ষতি মনে করা হবে, কোনটাকে হবে না? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ভর করে একজন মানুষের সার্বিক মতাদর্শ ও মূল্যবোধের ওপর।
প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তবে আপাতত এগুলো সরিয়ে রাখা যাক। তর্কের খাতিরে ক্ষতির পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড এবং সংজ্ঞাকেই আপাতত আমরা মেনে নিচ্ছি।
আসুন মদের উদাহরণে ফিরে যাওয়া যাক। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে অ্যামেরিকার জনসংখ্যার কমপক্ষে ৫% Fetal Alcohol Spectrum Disorder বা FASD-নামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। কিছু কিছু জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই মাত্রাটা ৪০%। FASD এর কারণে বিভিন্ন মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। লারনিং ডিস্যাবিলিটি তৈরি হয় এবং তীব্র ধরনের অ্যান্টি সোশাল বিভেইভিয়ার-ও তৈরি হতে পারে।
এ রোগে আক্রান্ত শিশুদের বিশেষ পদ্ধতিতে শেখাতে হয়। অনেকে বড় হয়ে জেল খাটে, বেকার থাকে কিংবা জড়িয়ে পড়ে অপরাধ আর মাদকের জীবনে। আর এসব কিছুর শুরু হয় অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের মদ পান থেকে। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মা অল্প পরিমাণ মদ খেলেও সন্তানের মধ্যে FASD দেখা দিতে পারে। প্রেগনেন্সির কথা জানার পর অনেক মহিলা মদ্যপান কমিয়ে দেন বা একেবারে বন্ধ করে দেন। কিন্তু সমস্যা হলো অনেক সময় প্রেগনেন্সির বিষয়টা বুঝে ওঠার আগেই ক্ষতি হয়ে যায়। আর ভুলের কারণে চড়া দাম দিতে হয়।
বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হিসেবে জীবন কাটানো অনেক চড়া মাশুল। সেই সাথে সমাজের ক্ষতি তো আছেই। এ ধরনের শিশুর দায়িত্ব নিতে হয় রাষ্ট্রকে। তাদের জন্য উপযোগী ব্যবস্থা তৈরি করতে হয়। খরচ করতে হয়। সেই টাকা আসে জনগণের দেয়া ট্যাক্সের টাকা থেকে। এই সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব ওই স্বাধীনতা সীমিত করে এবং কমিয়ে আনে, যে স্বাধীনতার কথা বলে বলে পশ্চিমা সংস্কৃতি মুখে ফেনা তোলে।
এই হিসেব সামনে রাখলে মদ বৈধ করার আইনকে খুব একটা স্বাধীনতাবান্ধব মনে হয় না; বরং মদ নিষিদ্ধ করার ইসলামী বিধানকে যৌক্তিক মনে হয়। ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে লিবারেল-সেক্যুলারিসমের অন্তঃসারশূন্য কথাবার্তা নিয়ে এমন আরও অনেক উদাহরণ আর যুক্তি দেয়া যায়। এসব ফাঁকা বুলি দিয়ে ওরা প্রমাণ করতে চায় ইসলামী আইন পশ্চাৎপদ এবং প্রগতিবিরোধী। অন্যদিকে সেক্যুলার আইন মুক্তচিন্তা, প্রগতি আর ব্যক্তির ক্ষমতায়নের সোপান।
মানুষের জীবনে মদ কতটা অবর্ণনীয় কষ্ট নিয়ে আসে সেটা বোঝানোর জন্য একটা খবর কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি-
সুস্যান আর্ল যখন মা হয় তখন ওর বয়স পঁচিশের আশেপাশে। মা হবার আগে ওর বেশির ভাগ রাত কাটত ক্লাব আর বারে। পার্টি আর মদে বুদ হয়ে কেটে যেত প্রত্যেক উইকএন্ড। ওর তখনকার বয়ফ্রেন্ডও ওকে উৎসাহিত করত। সুস্যান যখন জানল ও প্রেগনেন্ট, ততদিনে ছয় সপ্তাহ হয়ে গেছে।
'প্রেগনেন্সির কথা জানামাত্র আমি ড্রিংক করা বন্ধ করে দিই', শান্ত গলায় বলে সুস্যান। কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে গেছে। সুস্যানের ছেলে কুইনটন মিলসের জন্ম হয় ডেলিভারি ডেইট অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের চার সপ্তাহ আগে। জন্মের সময় কুইনটনের মুখে FASD এর পরিষ্কার চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। ও কথা বলা শুরু করে স্বাভাবিকের শিশুদের চেয়ে অনেক পরে। কিন্ডারগার্টেনে পড়ার সময় অন্যদের কামড় দেয়া, লাথি দেয়া আর চিৎকার করা শুরু হয়। ক্লাসমেটরা ওকে বুলি করত। বিছানা ভেজানোর অভ্যাস ছিল ১২ বছর পর্যন্ত'।
এমন অনেক গল্প আছে। তুলনামূলকভাবে কম কষ্টের একটা গল্প বললাম। এই নিষ্পাপ শিশুটিকে জন্ম পর থেকে কষ্টের মধ্যে জীবন কাটাতে হচ্ছে মদের কারণে। তার জীবন অন্য দশটা মানুষের চেয়ে আলাদা—মদের কারণে। হৃদয়ে সামান্য পরিমাণ মায়ামমতা থাকা মানুষমাত্রই বুঝতে পারবে মদ ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। মানুষকে মদ থেকে দূরে রাখা দরকার। হাজার বছর ধরে ইসলামী শাসন সমাজকে মদ থেকে মুক্ত রেখেছে। তবু কেন আধুনিক বিশ্ব ইসলামী শাসনের উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিচ্ছে না? মুসলিম-বিশ্ব দীর্ঘদিন এই বিষ থেকে মুক্ত ছিল। কিন্তু ঔপনিবেশিক যুগে পশ্চিমারা ধীরে ধীরে মুসলিম-বিশ্বে এই বিষ ছড়াতে শুরু করে। একে গ্ল্যামারাইযও করে। আজ তাই করাচি থেকে রাবাত পর্যন্ত মুসলিম তরুণদের বড় একটা অংশ মদ খাওয়াকে মনে করে মুক্তি, স্বাধীনতার আর পরিশীলিত হবার চিহ্ন। অনাগত শিশুর ক্ষতি করা তাদের বুদ্ধি প্রতিবন্ধিত্বের কারণ হওয়া কীভাবে মুক্তি আর স্বাধীনতা হয়?
যদি নিজের স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণের মতো মানবিকতা না থাকে, তাহলে অন্তত নিষ্পাপ শিশুদের এ কষ্ট থেকে রেহাই দেয়ার মতো মানবিক কি হওয়া যায় না?
টিকাঃ
[২৬] অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মদ্যপান করলে গর্ভস্থ শিশুর ফিটাল অ্যালকোহল স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার (FASD) অর্থাৎ 'ভ্রূণের মদ্যজনিত সমস্যারাশি' হতে পারে। এর ফলে সার্বিকভাবে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত। FASD এর কিছু ফলাফল হলো- অয়াভাবিক চেহারা, স্বপ্ন উচ্চতা, শরীরের কম ওজন, ক্ষুদ্র আকৃতির মাথা, সমন্বয়হীনতা, বুদ্ধিমত্তার অভাব, আচরণগত সমস্যা, কানে কম শোনা এবং চোখের সমস্যা। অনুবাদক
[২৭] লার্নিং ডিসেবিলিটি বা শিক্ষাগ্রহণ সংক্রান্ত বিকার একধরনের স্নায়বিক ব্যাধি যা মস্তিষ্কের তথ্য সঞ্চালন এবং তথ্য বিশ্লেষণ করার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। লার্নিং ডিসেবিলিটিতে আক্রান্ত শিশুর পড়তে, লিখতে, কথা বলতে, বলা কথা শুনে তার মানে বুঝতে, গণিতের সমীকরণ বুঝতে অসুবিধে হয় এবং এ ধরনের শিশু বোধশক্তি-সংক্রান্ত সমস্যায় ভোগে। লার্নিং ডিসেবিলিটি অনেক ধরনের হতে পারে যেমন ডিসলেক্সিয়া, ডিসপ্রেক্সিয়া, ডিসক্যালকুলিয়া এবং ডিসগ্রাফিয়া। একই শিশুর বিভিন্ন ধরনের সমস্যা একসাথে হতে পারে।
অ্যান্টি সোশাল বিভেইভিয়ার (Antisocial personality disorder)-সোশিওপ্যাথি। - অনুবাদক
[২৮] This Chicago doctor stumbled on a hidden epidemic of fetal brain damage. May 31, 2016. Pbs.org
📄 হুদুদ, দুর্নীতি এবং সাম্য
ইসলামী নৈতিকতায় সাম্যের ধারণা আছে। বেশ গুরুত্বের সাথেই আছে। কিন্তু সাম্যের সব ধারণা এক না। আধুনিক লিবারেলিসম যে সমতার কথা বলে সেটার সাথে ক্লাসিকাল লিবারেলদের, অর্থাৎ প্রথম দিককার লিবারেল দার্শনিকদের দেয়া সমতার সংজ্ঞা মেলে না। অ্যামেরিকার প্রতিষ্ঠাতারা সমতায় বিশ্বাস করত। সেই সাথে আরও বিশ্বাস করত যে কৃষ্ণাঙ্গ ও নারীদের ভোট আর সম্পদের মালিকানার অধিকার নেই। এই দুই বিশ্বাসের মধ্যে তারা কোনো সাংঘর্ষিকতা দেখেনি।
সে যা-ই হোক, ইসলামে কোন ধরনের সাম্যের কথা আছে, তাঁর একটা উদাহরণ দেখা যাক। সহীহ বুখারীতে আছে,
মক্কার কুরাইশ বংশের মাখযুমী গোত্রের এক মহিলা চুরি করে। লোকেরা উসামাহ ইবনু যাইদ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-কে চোরের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সুপারিশ করতে বলে। উসামাহ ইবনু যাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সুপারিশ করতে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আকে বললেন, “তুমি আল্লাহর শাস্তির বিধানের ব্যাপারে সুপারিশ করছ?”
তারপর মিম্বরে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: 'হে মানবমণ্ডলী, নিশ্চয়ই তোমাদের আগের লোকেরা গোমরাহ হয়ে গিয়েছে। কারণ, কোনো সম্মানিত ব্যক্তি যখন চুরি করত তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর যখন কোনো দুর্বল লোক চুরি করত তখন তার ওপর শরীয়াতের শাস্তি কায়েম করত। আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করে তবে অবশ্যই মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর হাত কেটে দেবে।”
আরেক বর্ণনা থেকে আরও বিস্তারিত জানা যায়-
'আয়িশা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহা থেকে বর্ণিত, আল-মাখযুমী সম্প্রদায়ের জনৈকা মহিলার ব্যাপার কুরাইশ বংশের লোকদের খুব দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল, যে কিনা চুরি করেছিল। সাহাবা কিরামগণ বললেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে কে কথা বলতে পারবে? আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়পাত্র উসামা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) ছাড়া কেউ এ সাহস পাবেন না। তখন উসামা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে কথা বললেন: এতে তিনি বললেন, তুমি আল্লাহ তা'আলার দেওয়া শাস্তির বিধানের ক্ষেত্রে সুপারিশ করছ? এরপর তিনি দাঁড়িয়ে খুতবা প্রদান করলেন এবং বললেন, হে মানবমণ্ডলী, নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের লোকেরা পথভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছে। কেননা, কোনো সম্মানিত লোক যখন চুরি করত তখন তারা তাকে রেহাই দিয়ে দিত। আর যখন কোনো দুর্বল লোক চুরি করত তখন তার ওপর শরীয়াহর শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! মুহাম্মদ এর কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করে তবে অবশ্যই মুহাম্মদ তার হাত কেটে দেবে।
হাত কাটা কিংবা শারীরিক শাস্তির ব্যাপারটা হয়তো ঢালাওভাবে অমুসলিমদের কাছে অস্বস্তিকর লাগতে পারে। কিন্তু একজন বিবেচনাসম্পন্ন কাফিরও বুঝতে পারার কথা যে গুরুতর পর্যায়ের চুরির মতো অপরাধ থেকে মানুষকে বিরত রাখার ক্ষেত্রে এ ধরনের শাস্তি কার্যকরী। কাজেই এ ধরনের শাস্তির বিধানকে অটোম্যাটিকভাবে অনুপযোগী ধরে নেয়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই।
আজকের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে দেখুন। বড় বড় কর্পোরেশান আর ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকগুলো বৈশ্বিক পর্যায়ে ফ্রড আর চুরি করে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের পকেট থেকে আক্ষরিক অর্থে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার চুরি করছে। এদের কারণে দেখা দিচ্ছে মন্দাসহ বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়। যখন এদের কেউ ধরা পড়ছে তখন তাকে জেলেও যেতে হচ্ছে না। কিছু টাকা জরিমানা দিয়ে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। দিব্যি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
ব্যাপারটা একটু চিন্তা করুন। আপনি মানুষের হাজার হাজার কোটি টাকা মেরে দিয়েছেন। শাস্তি হিসেবে আপনাকে বলা হলো কয়েক লক্ষ বা বেশি হলে কয়েক কোটি টাকা জরিমানা দিতে। এটাকে কি শাস্তি বলে? নাকি প্রফিট মার্জিন? এমন শাস্তিতে চুরি কি কমবে নাকি বাড়বে?
অন্যদিকে গরিব মানুষ যখন ছোটখাটো অপরাধ করে, তখন আধুনিক সেক্যুলার আইন তার সাথে কেমন আচরণ করে? সামান্য একটা টিভি চুরির কারণে একজন মানুষকে বছরের পর বছর জেল খাটতে হয়। হাজার হাজার কোটি টাকা চুরি করলে লক্ষ টাকা জরিমানা আর কয়েক হাজার টাকা দামের টিভি চুরি করলে কয়েক বছরের জেল? এটা কেমন ইনসাফ? এখানে সাম্য কোথায়? সমানাধিকার কোথায়?
ব্যাংকার আর কর্পোরেশানগুলোর অপরাধের কারণে বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন নষ্ট হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ চাকরি হারিয়েছে, গৃহহারা হয়েছে, পথের ভিখারি হয়েছে। এই অপরাধীদের অবশ্যই হাত কাটার মতো শাস্তি প্রাপ্য।
টিকাঃ
[২৯] সহীহ বুখারী
[৩০] সহীহ মুসলিম
📄 ইসলাম কি স্বাধীনতার ধর্ম?
পশ্চিমা ডানপন্থী আর বামপন্থী, দু-দলই ইসলামের সমালোচনা করে। দু-দলেরই সমালোচনার ভিত্তি লিবারেল দর্শনের বিভিন্ন ধ্যানধারণা-ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, পোশাকের স্বাধীনতা, জেন্ডার সমতা, ধর্ম ও রাষ্ট্রের বিচ্ছেদ ইত্যাদি।
এ ধরনের সমালোচনার মুখোমুখি হলে অনেক মুসলিম বিচিত্র এক স্ট্র্যাটিজি গ্রহণ করে। তারা বোঝানোর চেষ্টা করে লিবারেল এই ধ্যানধারণাগুলো আসলে ইসলামসম্মত। এগুলো নাকি অনেক আগে থেকেই ইসলামে আছে। ইসলাম এগুলো সমর্থন করে ইত্যাদি।
এটা একটা লুসিং স্ট্র্যাটিজি। এভাবে কখনো জেতা সম্ভব না। হ্যাঁ, ইসলামী শরীয়াহ এবং মূল্যবোধের কিছু কিছু দিকের সাথে লিবারেল এসব ধারণার কিছু দিক মেলে। কিন্তু সার্বিকভাবে মিলের চেয়ে অমিল বেশি। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মিলগুলো গৌণ বিষয়ে। অন্যদিকে ইসলামের সাথে এসব মতবাদের সংঘর্ষ মৌলিক জায়গাতে। তাই জোর করে দুটোকে মিলিয়ে দিলে হবে না।
তা ছাড়া স্ট্র্যাটিজি হিসেবে এটা যাচ্ছেতাই।
মুক্তচিন্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, পোশাকের স্বাধীনতা, জেন্ডার সমতা, বৈবাহিক সমতাসহ যাবতীয় লিবারেল ধ্যানধারণা মুসলিমরা মেনে নিলেও শেষ রক্ষা হবে না। পশ্চিমের মন জয় করার জন্য আজ যদি মুসলিমরা মক্কাতে সমকামী বিয়ের আয়োজন করে, তাহলে কাল ওরা বলে বসবে সত্যিকার অর্থে মুক্তমনা হবার জন্য মাসজিদুল হারামে কোনো ট্রান্সজেন্ডার কিংবা নারীর পোশাক পরা পুরুষকে ইমামতিতে দাঁড় করাতে হবে। যদি এই দাবি মানা হয় তাহলে অন্য কোনো অভিযোগ এনে বলবে প্রগতিশীল পশ্চিমের তুলনায় ইসলাম আসলে অনেক বেশি সংকীর্ণ। এটাই প্রগতিবাদের বাস্তবতা। আধুনিক পশ্চিমা চিন্তা ও সংস্কৃতির মূল স্তম্ভ হলো এই প্রগতিবাদ। এই দর্শন অনুযায়ী ক্রমাগত পরিবর্তন ভালো এবং জরুরি। পরিবর্তন না হওয়া মানে পিছিয়ে যাওয়া। ইতিহাসের স্রোতের ভুল দিকে চলা।
প্রগতিবাদের এ দর্শন সরাসরি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। মুসলিম হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি সবচেয়ে ভালো সময় ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সময়। সবচেয়ে উত্তম প্রজন্ম ছিল ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্ম। সবচেয়ে ভালো যুগ ছিল তাঁদের যুগ। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে অবনতি হচ্ছে।
কে বেশি প্রগতিশীল, কে বেশি স্বাধীন, তা প্রমাণে পশ্চিমা দর্শন ক্রমাগত নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে। আমরা মুসলিমরা কখনো এ প্রতিযোগিতায় জিততে পারব না। আর তার দরকারও আমাদের নেই। এমন পাতানো খেলায় যাবারই প্রয়োজন নেই। তাহলে আমাদের স্ট্র্যাটিজি কী হওয়া উচিত?
মুক্তি, স্বাধীনতা, সাম্যের মতো ধারণাগুলো কোন কোন কারণে অসংলগ্ন, সেটা আমাদের তুলে ধরা উচিত। আমাদের পরিষ্কার করা দরকার যে এগুলো অনুসরণ করে কল্যাণ এবং ইনসাফ অর্জিত হয় না; বরং মানবজাতির জন্য সবচেয়ে উত্তম সমাধান দেয় ইসলাম। ইসলামের সমাধান কেন সর্বোত্তম সেটা নিয়েও আলোচনা করা দরকার। মডার্নিস্ট প্রগতিবাদীদের সাথে তর্ক করা উচিত এই ছকে।