📄 নাস্তিকতার অনভিপ্রেত উপসংহার
জড়বাদী, বস্তুবাদী, এবং নাস্তিকরা বাস্তবতা আর অস্তিত্বের ব্যাপারে খুব সংকীর্ণ এবং সীমিত একটা ধারণা গ্রহণ করে। যা কিছু এই ধারণার সাথে খাপ খায় না, সেটার অস্তিত্ব তারা অস্বীকার করে। এমন অস্বীকারের ইতিহাস লম্বা। এ লিস্টে একদম প্রথমে আছে স্রষ্টা।
কিন্তু যে বিষয়টা সাধারণ মানুষ বোঝে না এবং বস্তুবাদী, জড়বাদী দর্শন সাধারণের সামনে স্বীকার করে না তা হলো-এই দর্শন শুধু স্রষ্টাকে অস্বীকার করায় সীমাবদ্ধ থাকে না, তাদের অস্বীকারের ব্যাপ্তি আরও অনেক বড়। তবে সাধারণ মানুষ এসব জানুক, সেটা নাস্তিকরা চায় না। তাহলে যে তাদের নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তবতা মানুষের সামনে প্রকাশ হয়ে যাবে।
স্যাম হ্যারিস আর রিচার্ড ডকিন্সের মতো নাস্তিকরা কঠোরভাবে বৈজ্ঞানিক এম্পিরিসম (scientific empiricism) অনুসরণের কথা বলে। এই অবস্থান অনুযায়ী, কেবল ওইসব জিনিসের অস্তিত্ব আছে যেগুলো বিজ্ঞান দ্বারা পর্যবেক্ষণ অথবা সনাক্ত করা যায়। যা কিছু বিজ্ঞান সনাক্ত করতে পারে না, যা কিছু পরীক্ষাগারে পর্যবেক্ষণ করা যায় না, তার অস্তিত্ব নেই। কঠোরভাবে এই নীতি অনুসরণ করতে গেলে ‘মন'-এর অস্তিত্বও অস্বীকার করতে হয়। বিশেষ করে অন্যের মন। মনের অস্তিত্ব বিজ্ঞান সনাক্ত করতে পারেনি। ল্যাবরেটরিতে কেউ কোনোদিন কারও ‘মন’ দেখেনি। বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দিয়ে মস্তিষ্কের মধ্যে ইলেক্ট্রিক সিগন্যালের অস্তিত্ব সনাক্ত করা গেছে। কিন্তু সেটা তো মন না।
ভেবে দেখুন তো, আপনি কি কখনো কারও মন দেখেছেন? কারও আবেগ নিজে অনুভব করেছেন?
না। আমরা দেখি মানুষের বাহ্যিক আচরণ। চেহারা, অভিব্যক্তি আর মুখের কথা। অন্য মানুষের চিন্তা; তার মন, আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এখন আমরা কি অন্য মানুষের চৈতন্যকে (consciousness) অস্বীকার করব? অন্য মানুষদেরও যে আমার মতো মন আছে, চৈতন্য আছে—এটা কি আমরা প্রত্যাখ্যান করব?
স্রষ্টার অস্তিত্ব অস্বীকার করার ক্ষেত্রে নাস্তিকদের বহুল-ব্যবহৃত সায়েন্টিফিক এস্পিরিসিসমের মাপকাঠি প্রয়োগ করলে এ উপসংহার এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। কিন্তু আমরা সবাই জানি, এ উপসংহার হাস্যকর। এ কারণেই এ উপসংহারের মতোই সায়েন্টিফিক এম্পিরিসিসমের মাপকাঠি এবং শিশুতোষ নাস্তিকতাকে আমরা অস্বীকার করি।
টিকাঃ
[৬] Empiricism-বাংলায় অভিজ্ঞতাবাদ। একটি জ্ঞানতত্ত্ব বা Epistemology, যা দাবি করে জ্ঞানের একমাত্র অথবা প্রধান উৎস হল ইন্দ্রিয়জাত (অথবা পরীক্ষালব্ধ) অভিজ্ঞতা। - অনুবাদক
📄 স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রমাণ কোথায়?
স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রমাণ কী? ইসলামের সত্যতার প্রমাণ কী? প্রমাণ আছে। অনেক প্রমাণ আছে। কিন্তু কোনটাকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হবে, সেটা বেশ কিছু ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভর করে। প্রমাণের আলাপে যাবার আগে এই ফ্যাক্টরগুলো নিয়ে কথা বলা দরকার। কোন জিনিসকে প্রমাণ ধরা হবে, কোনটাকে ধরা হবে না—কোনটাকে জ্ঞান হিসেবে গণ্য করা হবে, কোনটাকে করা হবে না—সেই মাপকাঠি নিয়ে আলাপ করা জরুরি। বৈজ্ঞানিক কিংবা গাণিতিক দাবির ক্ষেত্রে এটা যেমন সত্য, ধর্মীয় দাবির ক্ষেত্রেও সত্য।
ধরুন, আপনি একজন বিজ্ঞানী। আপনার জন্ম কট্টর বিজ্ঞানবিদ্বেষী এক পৃথিবীতে। এখানে ছোটবেলা থেকে বিজ্ঞানকে অবিশ্বাস করতে আর বিজ্ঞানীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে শেখানো হয়। বেশির ভাগ মানুষ মনে করে বিজ্ঞান হলো একটা উগ্র, সহিংস ডেথ-কাল্ট। যারা তুলনামূলক ভালো তারা মনে করে বিজ্ঞান একধরনের ভণ্ডামি।
স্বাভাবিকভাবেই এ রকম পৃথিবীতে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বিজ্ঞান-শিক্ষা বলে কিছু থাকবে না। বিজ্ঞান নিয়ে বলার মতো তেমন কিছু স্কুল-কলেজ থেকে মানুষ শিখতে পারবে না। সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানের ব্যাপারে তীব্র ধরনের অজ্ঞতা কাজ করবে। এখানেই শেষ না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গভীরভাবে বিজ্ঞানবিরোধী। প্রফেসর, বুদ্ধিজীবী আর বোদ্ধাদের বেশির ভাগ বিজ্ঞানকে চাপা ঘৃণা আর অবজ্ঞা নিয়ে দেখে। বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার একমাত্র উপায় হলো দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট কিছু প্রতিষ্ঠানে যাওয়া। টাকা আর লোকবল সংকটে ভোগা এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি হবার অর্থ নিজের ক্যারিয়ার, সামাজিক মর্যাদা আর লাইফস্টাইল বিসর্জন দেয়া। তাই খুব অল্প মানুষই এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে সত্যিকারের বিজ্ঞানী হবার সিদ্ধান্ত নেয়।
কোনো এক বিচিত্র কারণে, এ পৃথিবীর লোকেরা মনে করে বনজঙ্গল পুড়িয়ে দেয়া পরিবেশের জন্য ভালো। বিজ্ঞানী হিসেবে আপনি জানেন এটা একটা মারাত্মক ভুল ধারণা। আপনি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করলেন, বনজঙ্গল পুড়িয়ে দিলে পরিবেশগত বিপর্যয় তৈরি হবে। কিন্তু মানুষ আপনার কথা শুনল না। কথাগুলো স্রেফ উড়িয়ে দিয়ে উল্টো আপনাকে নিয়ে ঠাট্টাতামাশা শুরু করল। আরে এটা ওই হাবাগোবা বিজ্ঞানীটা না? ও আর কী জানে!
কেউ কেউ একটু ভদ্রতা করে বলল, দেখো, যা ইচ্ছে বিশ্বাস করার অধিকার তোমার আছে। তুমি তোমার মতো বিশ্বাস করো। কিন্তু তোমার বিশ্বাসই সঠিক, এমন জেদ ধরলে হবে না। অন্যের ওপর তুমি নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে পারো না।
আরেক দল বিজ্ঞান নিয়ে সংশয়বাদী। আলোচনার নামে ওরা আপনাকে নিয়ে একটু তামাশা করতে চাইল। প্রথমে প্রমাণ চাইল। আচ্ছা, তুমি যে বলছ বনজঙ্গল পুড়িয়ে দিলে পরিবেশের ক্ষতি হবে-এটার প্রমাণ কী?
আপনি তাদের গ্রীনহাউস গ্যাসের কথা বলতে পারেন। কিন্তু কেমিস্ট্রি, ফিযিক্স, বায়োলজি-কোনো কিছু নিয়েই এরা কিছু জানে না। কার্বনডাইঅক্সাইড কীভাবে তাপ আটকে রাখে, আপনি সেটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু রাসায়নিক মৌলগুলো নিয়ে প্রাথমিক ধারণাও তো এদের নেই। কার্বন ডাইঅক্সাইড কী, সেটা বোঝার তো প্রশ্নই আসে না। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গাছ কার্বনডাইঅক্সাইড গ্রহণ করে এবং অক্সিজেন ত্যাগ করে আর অক্সিজেন আমাদের প্রয়োজন-এটা ব্যাখ্যা করতে পারেন। কিন্তু তখন তারা ওই কথার প্রমাণ চাইবে। সেই প্রমাণ বোঝানোর জন্য তাদের প্রাথমিক পর্যায়ের কেমিস্ট্রি শেখাতে হবে। কিন্তু এতেও কাজ হবে না, কারণ কেমিস্ট্রি বুঝতে হলে আবার মলিকিউলার ফিযিক্স বুঝতে হবে। তার আগে ওদের বোঝাতে হবে যে মলিকিউলার ফিযিক্স জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে নির্ভরযোগ্য। অর্থাৎ মলিকিউলার ফিযিক্সের উপসংহারগুলো গ্রহণযোগ্য, এগুলো কোনো কিচ্ছাকাহিনি না। কিন্তু মলিকিউলার ফিযিক্স বুঝতে গেলে আবার নিউক্লিয়ার ফিযিক্স এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে চলনসই মাপের জ্ঞান থাকতে হবে...।
স্বাভাবিকভাবেই এই সংশয়বাদীরা আপনার কথার তেমন কিছু বুঝতে পারবে না। আপনার দেয়া প্রমাণ মেনে নেয়ার তো প্রশ্নই আসে না। তাদের সন্দেহ তো কমবেই না, উল্টো আরও বাড়তে পারে।
এমন অবস্থায় আপনি বলতে পারেন: দেখো, বনজঙ্গল পোড়ানো কেন খারাপ, সেটা বুঝতে হলে তোমাদের ভালোভাবে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে। তারপর আরও অ্যাডভ্যান্সড পড়াশোনায় যেতে হবে। তারপর তোমরা প্রমাণ পাবে।
কিন্তু এ কথা শুনে নিশ্চিতভাবেই সংশয়বাদীরা হাসতে শুরু করবে। মনে করবে প্রমাণ নেই, তাই অজুহাত দিচ্ছেন।
এত কথা বলার মূল পয়েন্ট হলো, বিশ্বাসের বৈধতার প্রশ্নে প্রমাণ হিসেবে কোন জিনিসটা গৃহীত হবে, সেটা নির্ভর করে ওই প্রমাণের সাথে সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক জ্ঞানের বিশাল এক ভান্ডারের ওপর। আজ সাধারণ মানুষ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে স্রেফ ধরে নেয় যে এই প্রাসঙ্গিক জ্ঞান আছে এবং তা সঠিক। মানুষ বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস করে। তারা মনে করে বিজ্ঞানের ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা যা বলে তা সঠিক। তাই প্রতিটা বিষয়ের ব্যাখ্যা তারা চায় না, খুব বেশি প্রশ্ন করে না।
কিন্তু যখন স্রষ্টাকে নিয়ে প্রশ্ন আসে, তখন সংশয় অন্য একটা পর্যায়ে পৌঁছে যায়। কারণ, আমরা একটা সেক্যুলার পৃথিবীতে বসবাস করি। আর এই সেক্যুলার পৃথিবীতে ধর্মের কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক কর্তৃত্ব নেই।
স্রষ্টার অস্তিত্বের অনেক প্রমাণ আছে যেগুলো গবেষণালব্ধ বিজ্ঞানের চেয়ে অনেক বেশি বস্তুনিষ্ঠ, সংগতিপূর্ণ এবং সন্তোষজনক। তবু দুটো জিনিস মানুষকে এই সত্য উপলব্ধি করা থেকে বিরত রাখে।
প্রথমত, প্রয়োজনীয় প্রাসঙ্গিক জ্ঞান মানুষের হাতের নাগালে নেই। পৃথিবীর বেশির ভাগ জায়গাতে ইসলামী শিক্ষার সুযোগ নেই, থাকলেও সীমিত। এটা মুসলিম-বিশ্বের ক্ষেত্রেও সত্য। মুসলিম-বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ পড়াশোনা করে সেক্যুলার সিস্টেমে। আল্লাহর অস্তিত্ব এবং ইসলামের সত্যতার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাসে পৌঁছানোর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাকে এই সেক্যুলার শিক্ষা প্রভাবিত করে।
দ্বিতীয়ত, আমরা এমন একটা পৃথিবীতে বসবাস করি, যেখানে সংস্কৃতি, মিডিয়া এবং অ্যাকাডেমিয়া তীব্রভাবে ধর্মবিরোধী এবং ইসলামবিরোধী।
এ দুটো ফ্যাক্টরের কারণে মুসলিমদের ঈমান এবং আত্মবিশ্বাস ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসলামের সত্যতা এবং মহান আল্লাহর ব্যাপারে প্রমাণগুলো এমন বিভিন্ন দিক থেকে আসে, যেগুলো একে অপরকে শক্তিশালী করে। বিজ্ঞানসহ জ্ঞানের যেকোনো ধারা এভাবেই কাজ করে। যেমনটা ওপরে উদাহরণের দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু একজন সংশয়বাদী যেকোনো তথ্য বা প্রমাণকে অস্বীকার করার চেষ্টা করতে পারে, কারণ সে ওই তথ্যের সাথে যুক্ত প্রাসঙ্গিক জ্ঞান, প্যারাডিম বা জ্ঞানতত্ত্বের ব্যাপারে অজ্ঞ।