📘 সংশয়বাদী > 📄 নাস্তিক = লিবারেল-সেক্যুলারিস্ট

📄 নাস্তিক = লিবারেল-সেক্যুলারিস্ট


সাধারণত নাস্তিকরা মনে করে তাদের কোনো মতাদর্শ বা বিশ্বাস নেই। দেখবেন নাস্তিকরা প্রায়ই বলছে, নাস্তিকতা হলো বিশ্বাসের অনুপস্থিতি। কথাটা একদিক থেকে সঠিক। তাদের কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস নেই। কিন্তু তার মানে এই না যে নাস্তিকদের কোনো ধরনেরই বিশ্বাসই নেই। এমন অনেক মতাদর্শ আর বিশ্বাস তারা লালন করে, যেগুলোর সমালোচনা করা সম্ভব। যেগুলো অসংগতি এবং পারস্পরিক সাংঘর্ষিকতায় পূর্ণ।

অধিকাংশ নাস্তিক অহংকারী ধরনের হয়। এটা নাস্তিকদের একটা কমন বৈশিষ্ট্য। তাদের মধ্যে একধরনের মিথ্যে আত্মবিশ্বাস আর নিরাপত্তার অনুভূতি কাজ করে। তারা মনে করে, যেহেতু তাদের কোনো বিশ্বাস নেই তাই নিজ বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি দেয়া কিংবা সাফাই গাওয়ার কোনো প্রয়োজনও তাদের নেই। নিশ্চিন্ত মনে তারা শুধু আস্তিকদের আক্রমণ করে যাবে, অন্য ধর্ম বা বিশ্বাসের সমালোচনা করবে, আর প্রতিপক্ষ সব সময় আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে থাকবে।

কেউ যখন মনে করে তার ডিফেন্ড করার কিছু নেই, তখন সে অসতর্ক আর বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এটাই বেশির ভাগ নাস্তিকদের ক্ষেত্রে ঘটে। তাই নাস্তিকদের সাথে বিতর্কের সময় আক্রমণাত্মক হতে হবে, কেবল রক্ষণাত্মক হলে চলবে না।

নাস্তিকরা আসলে লিবারেল সেক্যুলারিস্ট। এটাই তাদের মতাদর্শ, ওয়ার্ল্ডভিউ, বিশ্বাস। নৈতিকতা, মূল্যবোধ, রাজনীতি, শাসন, ইতিহাস ও ইতিহাসের গতিপথ বোঝা—সবকিছুর ব্যাপারে তাদের চিন্তা লিবারেল-সেক্যুলার দর্শন দ্বারা প্রভাবিত। আর লিবারেল-সেক্যুলার দর্শনকে আক্রমণ ও সমালোচনার অনেক দিক আছে। এই মতাদর্শের ইতিহাস রক্তাক্ত এবং জঘন্য। নাস্তিকদের সাথে আলোচনার সময় তাই লিবারেল-সেক্যুলারিসমের কথা নিয়ে আসতে হবে। এ দর্শনকে আক্রমণ করতে হবে।

তবে এখানে একটা জটিলতা আছে। লিবারেল-সেকুলারিসম বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাধান্য বিস্তারকারী মতাদর্শ। এ দর্শন এতই ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছে যে লিবারেল সেক্যুলারিসমের অবস্থানগুলোকে আজ 'কমনসেন্স' হিসেবে গ্রহণ করে নেয়া হয়। অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষও আজ লিবারেল সেক্যুলারিসমের মাপকাঠিকে গ্রহণ করে নিয়েছে। এমন অনেক মুসলিম, খ্রিষ্টান বা ইহুদী আছে, যারা চিন্তাভাবনায় আগাগোড়া সেক্যুলার এবং লিবারেল। এই লেন্সের মধ্য দিয়ে তারা বিশ্বকে দেখতে এবং ব্যাখ্যা করতে অভ্যস্ত।

ইসলাম শুরু থেকেই সম্প্রসারণবাদী আদর্শ। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে এ বিষয়টা স্পষ্ট। সহজ ভাষায় সম্প্রসারণবাদী হবার অর্থ হলো বিভিন্ন ভূমি জয় করা এবং সেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সময় থেকে শুরু করে ইসলামের পুরো ইতিহাসজুড়ে এটা চলে আসছে। এই ব্যাপারটা নিয়ে নাস্তিকরা ইসলামকে আক্রমণ করে। অনেক মুসলিমরা তখন আবার রক্ষণাত্মক হয়ে এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে চায়, অথবা জোড়াতালির ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করে। অথচ কোনো কৈফিয়ত না দিয়েও এ অবস্থানকে সহজেই ডিফেন্ড করা সম্ভব।

বাস্তবতা হলো মানবজাতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সব মতাদর্শই সম্প্রসারণবাদী। আর এমন হওয়াই যৌক্তিক। আমার কাছে যদি ভালোমন্দের চূড়ান্ত মাপকাঠি থাকে, তাহলে আমি চাইব অন্যরাও এই মাপকাঠি মেনে চলুক। এই চিন্তা সর্বজনীন। পৃথিবীর সব প্রধান প্রধান নৈতিক কাঠামো এ ধরনের সম্প্রসারণবাদী মূল্যবোধ লালন করে। তার মানে এই না যে আমার নৈতিকতার প্রতিটা বিষয় সবার ওপর চাপিয়ে দিতে হবে; বরং সম্প্রসারণবাদের অর্থ হলো, আমি মনে করি কিছু মৌলিক নৈতিক সত্য এতই গুরুত্বপূর্ণ যে সবার এগুলো মেনে চলতে হবে।

ভালোর সংজ্ঞা কী? মন্দের সংজ্ঞা কী? বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি, দর্শন নানাভাবে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সব ধর্ম, সংস্কৃতি, দর্শন এই বিষয়ে একমত যে, এমন কিছু খারাপ কাজ আছে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে হলেও যেগুলো থামাতে হয়। এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। এ উপলব্ধি সর্বজনীন। এটা লিবারেল সেক্যুলারিসমের ক্ষেত্রেও সত্য। এই মতাদর্শও সম্প্রসারণবাদী।

লিবারেলিসমে বিশ্বাসীরা কেন যেন মনে করে তাদেরটাই একমাত্র মতাদর্শ, যা অন্যের ওপর নিজেকে চাপিয়ে দেয় না। এটা আসলে হয়তো লিবারেলিসমের আত্মপ্রতারণার অংশ। লিবারেলদের এই বিশ্বাস হাস্যকর। লিবারেলিসম একটা হিংস্র, কর্তৃত্ববাদী এবং সম্প্রসারণবাদী আদর্শ। ইতিহাসে আর কোনো আদর্শ মানুষের ওপর এত বেশি মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেয়নি।

লকডাউনের কথা চিন্তা করুন। করোনা ভাইরাসের প্রকোপের শুরুর দিকে দু-মাসের মতো একটা সময় গেছে, যখন সারা বিশ্বের প্রায় সবাই লকডাউনে ছিল। মানুষ যেন বাড়ি থেকে বের না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য অনেক জায়গায় পুলিশ, মিলিটারি নামানো হয়েছিল। এটা কি চাপিয়ে দেয়া না? এটা কি একধরনের জোর করা না? লকডাউন যৌক্তিক কি না, সেটা আলাদা আলাদা বিষয়। কিন্তু এটা নিশ্চিতভাবেই চাপিয়ে দেয়া এবং চূড়ান্ত পর্যায়ের কর্তৃত্ববাদী আচরণ। কিন্তু পুরো বিশ্ব এই চাপিয়ে দেয়াকে মেনে নিয়েছে। আসলে বলা ভালো, মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। ভিন্নমত পোষণ করার সুযোগ কাউকে দেয়া হয়নি।

নাস্তিকদের সাথে তর্কের সময় আমরা তাই বলতে পারি: মুসলিম হিসেবে আমরা মনে করি ইসলামী শাসন চাপিয়ে দেয়া বৈধ, সঠিক এবং যৌক্তিক। কারণ, আমাদের ভালোমন্দের মাপকাঠি ইসলাম। ইসলাম আমাদের শেখায় শিরক, কুফর, যিনা, রিবা, মদ, ড্রাগসসহ বিভিন্ন জিনিস মন্দ। এগুলো থেকে বিরত থাকতে হবে। একইভাবে কোনো মূল্যবোধ এবং আচরণগুলো ভালো সেটাও আমরা শিখি ইসলাম থেকে। আমাদের সাথে তুমি একমত না হতে পারো। হয়তো তোমার চিন্তাভাবনা অযৌক্তিক, হয়তো তুমি একগুঁয়ে। যা-ই হোক না কেন, সেটা প্রাসঙ্গিক না। তুমি যা-ই মনে করো না কেন, ইসলামের দেয়া নৈতিক কাঠামো আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ, এটা শাশ্বত সত্য।

তা ছাড়া ইতিহাসজুড়ে ইসলামী শাসনের অধীনে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, জাতির মানুষ সহাবস্থান করেছে। এখানে আপত্তি করার তেমন কিছু নেই। ঠিক একই জিনিস বর্তমান পৃথিবীতে ঘটছে এবং তুমি মেনে নিচ্ছ। আজ যা হচ্ছে, নৈতিক, যৌক্তিক এবং কাঠামোগত দিক থেকে তা কিন্তু ঠিক একই ধরনের চাপিয়ে দেয়া; বরং আজ আরও ব্যাপক মাত্রায় এটা করা হচ্ছে। কোভিড-১৯ আসলে কতটা বিপজ্জনক, এর ভ্যাকসিন কতটা নিরাপদ, কিংবা গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর ব্যাপারে তুমি কী বিশ্বাস করো- তাতে কিছু যায়-আসে না। ইন ফ্যাক্ট, কোনো বিষয়েই তোমার মনে করা বা না করায় তেমন কিছু যায়-আসে না। যা আইন, যা গ্লোবাল পলিসি সেটা তোমাকে মানতে হবে। স্বেচ্ছায় না মানলে, মানতে বাধ্য করা হবে। এই আইন তোমার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।

মূল পয়েন্ট হলো, আপনি যখন দেখাবেন লিবারেল-সেক্যুলার ব্যবস্থা আসলে জোরজবরদস্তি করে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, তখন লিবারেল ফ্যান্টাসি ভেঙে যাবে। কোনো নাস্তিক যখন তাত্ত্বিকভাবেও মেনে নেবে যে তার নিজস্ব মতাদর্শ সম্প্রসারণবাদী, তখন বাকি তর্ক সহজ হয়ে যাবে。

📘 সংশয়বাদী > 📄 আল্লাহ ছাড়া সব মানতে রাজি!

📄 আল্লাহ ছাড়া সব মানতে রাজি!


আল্লাহকে অস্বীকার করার জন্য নাস্তিকরা বিচিত্র ধরনের সব তত্ত্ব হাজির করে। মহাবিশ্ব কি ভিনগ্রহের প্রাণীদের তৈরি কম্পিউটার সিমুলেশান? 'সম্ভাবনা আছে'!
আমাদের মহাবিশ্ব কি অসীম-সংখ্যক মহাবিশ্বের মধ্যে একটা? আমাদের মহাবিশ্বের মতো অনেক মহাবিশ্ব মিলে একটা মাল্টিভার্স আছে-যা ছোঁয়া যায় না, দেখা যায় না, প্রমাণ করা যায় না-এমন কি হতে পারে? 'হতে পারে। বেশ যৌক্তিক মনে হচ্ছে।'
মহাবিশ্ব কি এক বিশাল সমন্বিত, সচেতন সত্তা; যে নিজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে? 'কথাটা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না'
মহাবিশ্ব কি অত্যন্ত উন্নত মহাজাগতিক কোনো প্রাণীর অশরীরী বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ? 'চমৎকার বলেছ তো, ব্যাপারটা ভেবে দেখার মতো!'

কিন্তু এই একই মানুষকে যদি আল্লাহর কথা বলা হয়? মহাবিশ্ব কি এক সর্বশক্তিমান স্রষ্টার তৈরি? 'আরে কী-সব অযৌক্তিক কথাবার্তা শুরু করলে। তুমি দেখছি এখনো মধ্য যুগে পড়ে আছ। এখনো এসব গালগল্প বিশ্বাস করো নাকি?'

বিশ্বের প্রথম সারির বিজ্ঞানীরা এমন বিচিত্র-সব থিওরি দিয়ে যাচ্ছে কেন বলুন তো? কারণ, তারা জানে মহাবিশ্বের ব্যাপারে নিরেট জড়বাদী, বস্তুবাদী ব্যাখ্যা যথেষ্ট না। মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় আর গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর বস্তুবাদী ব্যাখ্যা দিতে পারে না। তারা জানে, পরিকল্পিতভাবে সৃষ্ট হবার সব বৈশিষ্ট্য মহাবিশ্বের মধ্যে পাওয়া যায়। সবকিছু থেকে প্রতীয়মান হয় এসব কিছুর পেছনে কোনো ইচ্ছা, কোনো উদ্দেশ্য আছে।

আর এসব কিছু একটা নির্দিষ্ট উত্তরের দিকে আমাদের নিয়ে যায়—আল্লাহ। কিন্তু সেই উত্তর তারা মানতে নারাজ। তারা আল্লাহকে স্বীকার করে চায় না, তাই কম্পিউটার সিমুলেশান থেকে শুরু করে ভিনগ্রহের প্রাণীর মতো নানান আষাঢ়ে গল্পের আসর বসায়। অথচ যে বস্তুবাদী দর্শনে তারা বিশ্বাস করে সেই দর্শন অনুযায়ীই এসব ব্যাখ্যা হাস্যকর। হয়তো একদিন সেই সত্যকে তারা মাটি খুঁড়ে বের করবে যে সত্যকে আজ তারা চাপা দেয়ার চেষ্টা করছে।

টিকাঃ
[৩] ওপরের হাইপোথিসিসগুলোর পক্ষে আধুনিক বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের অনেকের বক্তব্য আছে। আগ্রহী পাঠক দেখুন, যথাক্রমে- Simulation Hypothesis, multiverse hypothesis, Many worlds interpretation, Panpsychism/ Conscious Universe hypothesis ইত্যাদি। অনুবাদক

📘 সংশয়বাদী > 📄 ‘আমি বিজ্ঞান ভালোবাসি!’, এবং অন্যান্য

📄 ‘আমি বিজ্ঞান ভালোবাসি!’, এবং অন্যান্য


২০১৮ সালে প্লুটো নামক বামনগ্রহের কিছু ছবি প্রকাশ করে নাসা। নভোযান ‘নিউ হরাইযন্স’ থেকে তোলা ছবিগুলো দেখে উচ্ছ্বসিত মানুষ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে অনলাইনে।
'আমি বিজ্ঞানকে ভালোবাসি'!-বিস্ময়ভরে ঘোষণা করে অনেকে।
অন্যদের দেখা যায় বিজ্ঞান কত অসাধারণ, আর প্রশংসনীয় তা নিয়ে আবেগঘন মন্তব্য করতে।

বিজ্ঞানের তারিফ করা কিংবা বিজ্ঞানকে ভালোবাসায় কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু প্লুটো তো বিজ্ঞানের তৈরি না। প্লুটোর অস্তিত্ব এবং সৌন্দর্যের পেছনে বিজ্ঞানের কোনো হাত নেই। উচ্ছ্বসিত মানুষগুলো কি এ বিষয়টা বোঝে? যদি বোঝে, তাহলে কি তারা এটা নিয়ে চিন্তা করে?

অনেকে বলতে পারেন বিজ্ঞানকে ভালোবাসা একটা নির্দোষ ব্যাপার, এর সাথে শিরকের কোনো সম্পর্ক নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ কথার সাথে আমি একমত। কিন্তু আমরা আজ এমন এক সময় ও সংস্কৃতিতে বসবাস করছি যখন অসংখ্য মানুষ ধর্মত্যাগ করছে, স্রষ্টার ক্ষমতা আর প্রাসঙ্গিকতা অস্বীকার করছে, নাস্তিক হচ্ছে। এমন একটা অবস্থায় প্লুটোর ছবি দেখে যখন বিজ্ঞানকে ভালোবাসার কথা বলা হয়, তখন সেগুলো আর নিছক উচ্ছ্বসিত মন্তব্য হিসেবে আর দেখা যায় না। আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ মনে হলেও, এ কথাগুলোর গভীর তাৎপর্য আছে।

প্রকৃতির মাঝে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য দেখার পর মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড বিস্ময় কাজ করে। সুন্দরের এই সমারোহ দেখে মানুষ অভিভূত হয়। এই প্রতিক্রিয়া সর্বজনীন। এই সৃষ্টি আর এই সৌন্দর্য যে শূন্য থেকে আসেনি, নিজে নিজে তৈরি হয়নি—এসবের পেছনে একজন স্রষ্টা আছেন—এই উপলব্ধি এবং সেই স্রষ্টার প্রশংসা করার ইচ্ছাও সর্বজনীন।

যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না, এই সহজাত অনুভূতি আর আবেগ তাদের অন্য কোনো দিকে চালিত করতে হয়। তাই মানুষ ভক্তিভরে 'প্রকৃতি' কিংবা বিজ্ঞানের বন্দনা করে। 'প্রকৃতি' বা 'মাদার নেইচার' নামে কোনো সচেতন সত্তা কিংবা দেবতা আছে, এটা আজ তেমন কেউ বিশ্বাস করে না। একইভাবে প্রাকৃতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং এর সংরক্ষণের কৃতিত্ব যে বিজ্ঞানের না, এটাও সবাই বোঝে। বিজ্ঞান কোনো স্বাধীন ইচ্ছা আর বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সত্তা না। বিজ্ঞান মানুষের তৈরি এক শাস্ত্র, জ্ঞানের একটি শাখা। তাহলে প্লুটোর ছবি দেখে বিজ্ঞান নিয়ে এই উচ্ছ্বাস, ভক্তি, বন্দনা, আনন্দ আর ভালোবাসার অনুভূতি তৈরি হবার কারণ কী?

কথাটা অন্যভাবে বলা যায়। বিজ্ঞানের ক্ষমতা হলো সৃষ্টি পর্যবেক্ষণ আর বিশ্বজগতের কাঠামোর খুঁটিনাটি তথ্য অনুসন্ধান করার। এ ক্ষমতা যদি এতটা প্রশংসা আর ভালোবাসার জন্ম দেয়, তাহলে যে মহান সত্তা বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন, তাঁর ব্যাপারে মানুষের অনুভূতি কেমন হওয়া উচিত?

ধরুন, একজন মানুষ প্রকৃতি, সৌন্দর্য, এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। কাঠখোট্টা লোক। সমুদ্র তীরের চোখধাঁধানো সূর্যাস্তের দৃশ্য আর দুপুর বেলার ঘুম তার কাছে একই মাপের জিনিস। প্লুটোর ছবি দেখে সে হাই তোলে, নিরস মুখে বলে— 'এত আহা উহু করার কী আছে? তেমন কোনো বিশেষত্ব আছে বলে তো মনে হচ্ছে না।'

বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে বিজ্ঞানকে ভালোবাসার ঘোষণা দেয়া মানুষদের চেয়ে এই ধরনের মানুষের প্রতিক্রিয়া বেশি সংগতিপূর্ণ। প্রকৃতি, সৌন্দর্য, এসবের বিশেষ কোনো গুরুত্ব যেহেতু তার কাছে নেই, তাই সে এগুলো নিয়ে মাথা ঘামায় না। তেমন কোনো অনুভূতি তার মধ্যে দেখা যায় না।। আবার যে লোক প্লুটোর ছবি দেখে অভিভূত হয়ে প্লুটোরই প্রশংসা শুরু করে, প্লুটোকে ভালোবাসতে শুরু করে, তার প্রতিক্রিয়াও বিজ্ঞানকে ভালোবাসার ঘোষণা দেয়া লোকদের চেয়ে বেশি যৌক্তিক। যুগে যুগে এভাবেই তো মানুষ প্রকৃতির পূজা করেছে। সৌরজগতের গ্রহগুলোর নাম দেয়া হয়েছে রোমান দেবতাদের নামে। ব্যাপারটা তো কাকতালীয় না। কিন্তু আধুনিক বস্তুবাদ অনুযায়ী মহাকাশে ছুটে বেড়ানো প্রাণহীন, চেতনাহীন একটা পাথরের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা কিংবা ভক্তি প্রদর্শনের কোনো মানে হয় না। সেই রাস্তাও বন্ধ হয়ে গেছে। তাই মানুষ এখন বিজ্ঞানের প্রশংসা করে। বিজ্ঞানের প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা প্রকাশ করে। যদিও এর কোনো অর্থ হয় না।

স্রষ্টাকে অস্বীকার করে, বিজ্ঞানের প্রশংসা করা-এ কেমন নির্বোধের মতো আচরণ? বিজ্ঞান একটা লেন্স। এই লেন্সের মধ্য দিয়ে আমরা মহাবিশ্বকে দেখি। এই লেন্সের আরাধনা কেন করা হবে? লোভনীয় খাবারের ছবি দেখলে আমরা কি ফটোগ্রাফারের প্রশংসা করি নাকি রাধুনীর? চমৎকার স্থাপত্যকর্মের ছবি চোখে পড়লে স্থপতির কথা ভুলে আমরা কি ফটোগ্রাফারের প্রশংসা করি? না, আমরা এমন করি না, কারণ এটা অযৌক্তিক। যদি আপনি বিশ্বাস করেন কোনো রাধুনী নেই, কোনো স্থপতি নেই-ওই খাবার, ওই স্থাপত্যকর্ম আপনাআপনি তৈরি হয়ে গেছে-সে ক্ষেত্রে কারও প্রশংসা করারই-বা কী দরকার? ফটোগ্রাফার আর ফটোগ্রাফির তো এখানে কোনো কৃতিত্ব নেই। তাদের প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত হবার কারণ কী? উচ্ছ্বাসের মূল কারণ কী? ক্যামেরায় তোলা ছবি নাকি ছবির বিষয়বস্তু?

সৃষ্টিজগতের সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে বিজ্ঞানের প্রশংসা করে মানুষ আসলে মানবজাতির বুদ্ধিমত্তার তারিফ করছে। অথচ সৃষ্টিজগতের মহান নির্মাতার ব্যাপারে অস্তিত্বের সম্ভাবনা নিয়েও সে চিন্তা করছে না। কী চরম নির্বুদ্ধিতা আর অজ্ঞানতা।

টিকাঃ
[৪] ১৯৩০-এ আবিষ্কৃত হবার পর থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আমাদের সৌরজগতের নবম গ্রহ হিসেবে পরিচিত ছিল প্লুটো। - অনুবাদক
[৫] নিউ হরাইযন্স (New Horizons) একটি আন্তঃগ্রহ মহাকাশ প্রোব, যা জানুয়ারি ১৯, ২০০৬ সালে নাসার নিউ ফ্রন্টিয়ার্স কর্মসূচির অংশ হিসেবে উৎক্ষেপণ করা হয়। অনুবাদক

📘 সংশয়বাদী > 📄 আত্মঘাতী নাস্তিকতা

📄 আত্মঘাতী নাস্তিকতা


স্রষ্টার অস্তিত্ব আছে মনে করার মতো যথেষ্ট কারণ আছে কি? ইতিহাসজুড়ে অধিকাংশ মানুষ কোনো-না-কোনো ধরনের স্রষ্টা কিংবা অতিপ্রাকৃতিক সত্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে এসেছে। এই স্রষ্টার বৈশিষ্ট্য কী, তা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মতপার্থক্য আছে, তবে এমন কোনো সত্তার যে অস্তিত্ব আছে, এ নিয়ে মতপার্থক্য নেই। মতপার্থক্য খুঁটিনাটিতে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সময়ের মানুষ স্বতন্ত্রভাবে এই অবস্থান গ্রহণ করেছে।

যুগে যুগে, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে মানবজাতি কেন এই বিশ্বাস গ্রহণ করল, তা ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব বস্তুবাদী নাস্তিকদের।

যদি এই বিশ্বাসগুলো অবান্তর হয়, তাহলে এগুলো বড় ধরনের কোনো বিভ্রম বা ডিলিউশানের (ভ্রান্তবিশ্বাস) ফল। অর্থাৎ যুগে যুগে মানুষের মধ্যে এমন এক শক্তিশালী বিশ্বাস তৈরি হয়েছে, যার কোনো বাস্তবতা নেই। আর এ ধরনের বিশ্বাস যেহেতু বৈশ্বিক, তাই এই বিভ্রমও বৈশ্বিক। এই বিভ্রম এতটাই শক্তিশালী যে, যুগে যুগে তা মানুষকে ভক্তি আর উপাসনার দিকে চালিত করেছে। তার মানে এটা সাময়িক কোনো বিভ্রম না। এই 'গড ডিলিউশান' এতই গভীর এবং ব্যাপক, যে যারা এ বিভ্রমে আক্রান্ত তারা নিজেদের এই মানসিক রোগের ব্যাপারে কিছুই জানে না। আরেকটা সম্ভাবনা হলো বাস্তবতা নিয়ে-কী আছে আর কী নেই-তা নিয়ে বড় ধরনের ভুল করার প্রবণতা মানুষের আছে।

যদি দাবি করা হয়, স্রষ্টায় বিশ্বাস আসলে ডিলিউশান বা বিভ্রম, তাহলে সত্য চেনার ব্যাপারে মানুষের সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। যে প্রজাতির অধিকাংশ সদস্যের এমন গভীর এবং স্থায়ী ডিলিউশানে ভোগার প্রবণতা আছে, তাদের বিচারবুদ্ধির ওপর তো ভরসা করা যায় না।

কিন্তু এটা মেনে নেয়া হলে নাস্তিকদের বুদ্ধিমত্তা এবং তাদের উপসংহারগুলো নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কারণ, মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর উত্তর জানার জন্যে, মহাবিশ্বে মানুষের অস্তিত্বের তাৎপর্য বোঝার জন্যে বস্তুবাদী নাস্তিকরা ওই মানবীয় বুদ্ধিমত্তার ওপরই নির্ভর করে।

অর্থাৎ স্রষ্টায় বিশ্বাস এতটাই বৈশ্বিক, এতই সহজাত, মানব-মন এবং মানবীয় চিন্তার সাথে এত মৌলিকভাবে জড়িত যে, একে নাকচ করতে গেলে মানবীয় বুদ্ধিমত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হয়। সত্য নির্ধারণ এবং বাস্তবতা অনুধাবনে মানব-মনের সক্ষমতাকে নাকচ করতে হয়। বস্তুবাদী নাস্তিকতা ঠিক এ অবস্থানটাই গ্রহণ করেছে এবং নিজের অজান্তেই নিজেদের পুরো প্রকল্পকে ভুল প্রমাণ করে বসেছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00