📄 স্টিফেন হকিংয়ের আত্ম-উপাসনা
স্টিফেন হকিং-এর ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম (কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস) বইটা পড়েছিলাম ক্লাস সেভেন কিংবা এইটের দিকে। অসাধারণ লেগেছিল। কয়েক বছর পর তার সাথে সামনাসামনি কথা বলার সুযোগ হয়। বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে হকিং এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ফিফিক্স নিয়ে পড়াশোনায় আমার আগ্রহ তৈরি হবার একটি কারণও ছিলেন তিনি। সেই আগ্রহ একসময় 'আমাকে নিয়ে যায় হার্ভার্ডে, যেখান থেকে আমি ফিযিক্সে একটি ডিগ্রি অর্জন করি।
হকিং-এর ব্যাপারে একটা বিষয় সব সময় পরিষ্কার ছিল। তিনি ছিলেন একজন বিশ্বাসী। তবে তার বিশ্বাস স্রষ্টার ওপর ছিল না; হকিং শক্ত নাস্তিক ছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল 'গ্র্যান্ড ইউনিফাইড থিওরি অফ এভরিথিং'-এ। তিনি বিশ্বাস করতেন মানবীয় যুক্তি আর বুদ্ধি একসময় এমন এক তত্ত্ব খুঁজে পাবে, যা সৃষ্টিজগতের সবকিছুকে এক সূত্রে গাঁথবে। এ বিশ্বাসের ওপর ঈমান এনেছিলেন হকিং। কিন্তু এমন কোনো থিওরি কি আসলে আছে? হকিং বিশ্বাস করতেন আছে, এবং আইনস্টাইনসহ অন্যান্য আরও অনেক পদার্থবিজ্ঞানীর মতোই এ থিওরি খুঁজে বের করার পেছনে তিনি নিজের জীবন ব্যয় করেছেন।
কিন্তু এমন কোনো থিওরি যে আছে, তার প্রমাণ কী? এমন কোনো থিওরি যে আবিষ্কার করা সম্ভব, সেটাও-বা আমরা কীভাবে জানছি? পদার্থবিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে এই প্রশ্নগুলো আমাকে ভোগাত। আমার প্রফেসরদের কারও কাছেই এসব প্রশ্নের শক্ত কোনো জবাব ছিল না। তারা বেশি থেকে বেশি যা বলতেন তার সারমর্ম হলো, মহাবিশ্ব এতই সূক্ষ্ম, এমনই জটিল ও অসাধারণ শৃঙ্খলা এতে বিদ্যমান যে এসব কিছুর গোঁড়ায় 'কিছু একটা' থাকতে বাধ্য। নিশ্চয় এর পেছনে গভীর কোনো সত্য আছে। অবিশ্বাস্য জটিল নিয়মতান্ত্রিকতা, এ 'মহাপরিকল্পনা'-এর পেছনে নিশ্চয় কোনো-না- কোনো উদ্দেশ্য আছে, কারণ আছে।
হকিং এর বিশ্বাস ছিল-এ সবকিছুকে ঘিরে আছে একটি থিওরি; এমন কোনো সমীকরণ, যা দিয়ে সবকিছু ব্যাখ্যা করা যায়। অনেক পদার্থবিজ্ঞানী একে 'ঈশ্বর সমীকরণ' (God Equation) বলেন।
এ ধরনের বিশ্বাসে; বিশেষ করে হকিং এর মতো লোকদের ক্ষেত্রে, শিরকের ব্যাপারটা স্পষ্ট। মহাবিশ্ব এবং মহাবিশ্বের উৎসের ব্যাপারে এ ধরনের মেটাফিযিকাল কল্পনাবাজির পাশাপাশি তারা স্রষ্টাকে অস্বীকার করত কট্টর; প্রায় যুদ্ধংদেহীভাবে। প্রচণ্ড সূক্ষ্ম ও জটিল হওয়া সত্ত্বেও এ মহাবিশ্ব নিয়মতান্ত্রিক, এবং মানব-মনের কাছে বোধগম্য-কারণ, মানব-মন ও মহাবিশ্ব, উভয়ের স্রষ্টা এক ও অভিন্ন-এ সুস্পষ্ট সত্যকে মেনে নেয়ার বদলে, হকিং বেছে নেন গোঁয়ারের মতো মুখ ঘুরিয়ে নিজ কল্পনাপ্রসূত এক অলীক ধারণা- 'ঈশ্বর সমীকরণ'-এর পেছনে জীবন ব্যয় করাকে।
হকিং এবং তার মতো নিজের খেয়াল-খুশির উপাসনা করা অন্যান্য মানুষদের মৃত্যুর ব্যাপারে সূরা মুলকের প্রথম দিকের বেশ কিছু আয়াত আমার কাছে বেশ প্রাসঙ্গিক মনে হয়ে। নিজেদের আলোকিত মনে করলেও, আসলে তারা নিজেদের সাথে প্রতারণা করে।
'মহা মহিমান্বিত তিনি, সর্বময় কর্তৃত্ব ও রাজত্ব যাঁর হাতে; তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য-কে তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম? তিনি মহাপরাক্রমশালী, অতিশয় ক্ষমাশীল। তিনি সৃষ্টি করেছেন সপ্তাকাশ, স্তরে স্তরে। আর-রাহমানের সৃষ্টিতে তুমি কোনো অসামঞ্জস্য দেখতে পাবে না; আবার দৃষ্টি ফেরাও, কোনো ত্রুটি দেখতে পাও কি? অতঃপর তোমরা বারবার দৃষ্টি ফিরিয়ে দেখো; ক্লান্ত, শ্রান্ত ও ব্যর্থ হয়ে সেই দৃষ্টি তোমার দিকে ফিরে আসবে। আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দিয়ে সুসজ্জিত করেছি, সেগুলোকে শয়তানদের প্রতি নিক্ষেপের বস্তু বানিয়েছি। এবং তাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছি জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি। আর যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে তাদের জন্য আছে জাহান্নামের শাস্তি; কতই-না নিকৃষ্ট সে প্রত্যাবর্তনস্থল!' [তরজমা, সূরা মূলক, আয়াত ১-৬]
টিকাঃ
[২] মেটাফিযিক্স-বাংলায় অধিবিদ্যা। দর্শনের ওই শাখা, যা প্রাথমিক মূলনীতিসমূহ (first principles) এবং সত্তা, অস্তিত্ব, জানা, পরিচয়, মন, সময়, বস্তু, সময়, স্থান, সম্ভাবনা এর মতো বিভিন্ন বিমূর্ত ধারণা নিয়ে আলোচনা করে। অনুবাদক
📄 নাস্তিক = লিবারেল-সেক্যুলারিস্ট
সাধারণত নাস্তিকরা মনে করে তাদের কোনো মতাদর্শ বা বিশ্বাস নেই। দেখবেন নাস্তিকরা প্রায়ই বলছে, নাস্তিকতা হলো বিশ্বাসের অনুপস্থিতি। কথাটা একদিক থেকে সঠিক। তাদের কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস নেই। কিন্তু তার মানে এই না যে নাস্তিকদের কোনো ধরনেরই বিশ্বাসই নেই। এমন অনেক মতাদর্শ আর বিশ্বাস তারা লালন করে, যেগুলোর সমালোচনা করা সম্ভব। যেগুলো অসংগতি এবং পারস্পরিক সাংঘর্ষিকতায় পূর্ণ।
অধিকাংশ নাস্তিক অহংকারী ধরনের হয়। এটা নাস্তিকদের একটা কমন বৈশিষ্ট্য। তাদের মধ্যে একধরনের মিথ্যে আত্মবিশ্বাস আর নিরাপত্তার অনুভূতি কাজ করে। তারা মনে করে, যেহেতু তাদের কোনো বিশ্বাস নেই তাই নিজ বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি দেয়া কিংবা সাফাই গাওয়ার কোনো প্রয়োজনও তাদের নেই। নিশ্চিন্ত মনে তারা শুধু আস্তিকদের আক্রমণ করে যাবে, অন্য ধর্ম বা বিশ্বাসের সমালোচনা করবে, আর প্রতিপক্ষ সব সময় আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে থাকবে।
কেউ যখন মনে করে তার ডিফেন্ড করার কিছু নেই, তখন সে অসতর্ক আর বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এটাই বেশির ভাগ নাস্তিকদের ক্ষেত্রে ঘটে। তাই নাস্তিকদের সাথে বিতর্কের সময় আক্রমণাত্মক হতে হবে, কেবল রক্ষণাত্মক হলে চলবে না।
নাস্তিকরা আসলে লিবারেল সেক্যুলারিস্ট। এটাই তাদের মতাদর্শ, ওয়ার্ল্ডভিউ, বিশ্বাস। নৈতিকতা, মূল্যবোধ, রাজনীতি, শাসন, ইতিহাস ও ইতিহাসের গতিপথ বোঝা—সবকিছুর ব্যাপারে তাদের চিন্তা লিবারেল-সেক্যুলার দর্শন দ্বারা প্রভাবিত। আর লিবারেল-সেক্যুলার দর্শনকে আক্রমণ ও সমালোচনার অনেক দিক আছে। এই মতাদর্শের ইতিহাস রক্তাক্ত এবং জঘন্য। নাস্তিকদের সাথে আলোচনার সময় তাই লিবারেল-সেক্যুলারিসমের কথা নিয়ে আসতে হবে। এ দর্শনকে আক্রমণ করতে হবে।
তবে এখানে একটা জটিলতা আছে। লিবারেল-সেকুলারিসম বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাধান্য বিস্তারকারী মতাদর্শ। এ দর্শন এতই ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছে যে লিবারেল সেক্যুলারিসমের অবস্থানগুলোকে আজ 'কমনসেন্স' হিসেবে গ্রহণ করে নেয়া হয়। অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষও আজ লিবারেল সেক্যুলারিসমের মাপকাঠিকে গ্রহণ করে নিয়েছে। এমন অনেক মুসলিম, খ্রিষ্টান বা ইহুদী আছে, যারা চিন্তাভাবনায় আগাগোড়া সেক্যুলার এবং লিবারেল। এই লেন্সের মধ্য দিয়ে তারা বিশ্বকে দেখতে এবং ব্যাখ্যা করতে অভ্যস্ত।
ইসলাম শুরু থেকেই সম্প্রসারণবাদী আদর্শ। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে এ বিষয়টা স্পষ্ট। সহজ ভাষায় সম্প্রসারণবাদী হবার অর্থ হলো বিভিন্ন ভূমি জয় করা এবং সেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সময় থেকে শুরু করে ইসলামের পুরো ইতিহাসজুড়ে এটা চলে আসছে। এই ব্যাপারটা নিয়ে নাস্তিকরা ইসলামকে আক্রমণ করে। অনেক মুসলিমরা তখন আবার রক্ষণাত্মক হয়ে এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে চায়, অথবা জোড়াতালির ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করে। অথচ কোনো কৈফিয়ত না দিয়েও এ অবস্থানকে সহজেই ডিফেন্ড করা সম্ভব।
বাস্তবতা হলো মানবজাতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সব মতাদর্শই সম্প্রসারণবাদী। আর এমন হওয়াই যৌক্তিক। আমার কাছে যদি ভালোমন্দের চূড়ান্ত মাপকাঠি থাকে, তাহলে আমি চাইব অন্যরাও এই মাপকাঠি মেনে চলুক। এই চিন্তা সর্বজনীন। পৃথিবীর সব প্রধান প্রধান নৈতিক কাঠামো এ ধরনের সম্প্রসারণবাদী মূল্যবোধ লালন করে। তার মানে এই না যে আমার নৈতিকতার প্রতিটা বিষয় সবার ওপর চাপিয়ে দিতে হবে; বরং সম্প্রসারণবাদের অর্থ হলো, আমি মনে করি কিছু মৌলিক নৈতিক সত্য এতই গুরুত্বপূর্ণ যে সবার এগুলো মেনে চলতে হবে।
ভালোর সংজ্ঞা কী? মন্দের সংজ্ঞা কী? বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি, দর্শন নানাভাবে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সব ধর্ম, সংস্কৃতি, দর্শন এই বিষয়ে একমত যে, এমন কিছু খারাপ কাজ আছে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে হলেও যেগুলো থামাতে হয়। এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। এ উপলব্ধি সর্বজনীন। এটা লিবারেল সেক্যুলারিসমের ক্ষেত্রেও সত্য। এই মতাদর্শও সম্প্রসারণবাদী।
লিবারেলিসমে বিশ্বাসীরা কেন যেন মনে করে তাদেরটাই একমাত্র মতাদর্শ, যা অন্যের ওপর নিজেকে চাপিয়ে দেয় না। এটা আসলে হয়তো লিবারেলিসমের আত্মপ্রতারণার অংশ। লিবারেলদের এই বিশ্বাস হাস্যকর। লিবারেলিসম একটা হিংস্র, কর্তৃত্ববাদী এবং সম্প্রসারণবাদী আদর্শ। ইতিহাসে আর কোনো আদর্শ মানুষের ওপর এত বেশি মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেয়নি।
লকডাউনের কথা চিন্তা করুন। করোনা ভাইরাসের প্রকোপের শুরুর দিকে দু-মাসের মতো একটা সময় গেছে, যখন সারা বিশ্বের প্রায় সবাই লকডাউনে ছিল। মানুষ যেন বাড়ি থেকে বের না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য অনেক জায়গায় পুলিশ, মিলিটারি নামানো হয়েছিল। এটা কি চাপিয়ে দেয়া না? এটা কি একধরনের জোর করা না? লকডাউন যৌক্তিক কি না, সেটা আলাদা আলাদা বিষয়। কিন্তু এটা নিশ্চিতভাবেই চাপিয়ে দেয়া এবং চূড়ান্ত পর্যায়ের কর্তৃত্ববাদী আচরণ। কিন্তু পুরো বিশ্ব এই চাপিয়ে দেয়াকে মেনে নিয়েছে। আসলে বলা ভালো, মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। ভিন্নমত পোষণ করার সুযোগ কাউকে দেয়া হয়নি।
নাস্তিকদের সাথে তর্কের সময় আমরা তাই বলতে পারি: মুসলিম হিসেবে আমরা মনে করি ইসলামী শাসন চাপিয়ে দেয়া বৈধ, সঠিক এবং যৌক্তিক। কারণ, আমাদের ভালোমন্দের মাপকাঠি ইসলাম। ইসলাম আমাদের শেখায় শিরক, কুফর, যিনা, রিবা, মদ, ড্রাগসসহ বিভিন্ন জিনিস মন্দ। এগুলো থেকে বিরত থাকতে হবে। একইভাবে কোনো মূল্যবোধ এবং আচরণগুলো ভালো সেটাও আমরা শিখি ইসলাম থেকে। আমাদের সাথে তুমি একমত না হতে পারো। হয়তো তোমার চিন্তাভাবনা অযৌক্তিক, হয়তো তুমি একগুঁয়ে। যা-ই হোক না কেন, সেটা প্রাসঙ্গিক না। তুমি যা-ই মনে করো না কেন, ইসলামের দেয়া নৈতিক কাঠামো আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ, এটা শাশ্বত সত্য।
তা ছাড়া ইতিহাসজুড়ে ইসলামী শাসনের অধীনে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, জাতির মানুষ সহাবস্থান করেছে। এখানে আপত্তি করার তেমন কিছু নেই। ঠিক একই জিনিস বর্তমান পৃথিবীতে ঘটছে এবং তুমি মেনে নিচ্ছ। আজ যা হচ্ছে, নৈতিক, যৌক্তিক এবং কাঠামোগত দিক থেকে তা কিন্তু ঠিক একই ধরনের চাপিয়ে দেয়া; বরং আজ আরও ব্যাপক মাত্রায় এটা করা হচ্ছে। কোভিড-১৯ আসলে কতটা বিপজ্জনক, এর ভ্যাকসিন কতটা নিরাপদ, কিংবা গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর ব্যাপারে তুমি কী বিশ্বাস করো- তাতে কিছু যায়-আসে না। ইন ফ্যাক্ট, কোনো বিষয়েই তোমার মনে করা বা না করায় তেমন কিছু যায়-আসে না। যা আইন, যা গ্লোবাল পলিসি সেটা তোমাকে মানতে হবে। স্বেচ্ছায় না মানলে, মানতে বাধ্য করা হবে। এই আইন তোমার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।
মূল পয়েন্ট হলো, আপনি যখন দেখাবেন লিবারেল-সেক্যুলার ব্যবস্থা আসলে জোরজবরদস্তি করে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, তখন লিবারেল ফ্যান্টাসি ভেঙে যাবে। কোনো নাস্তিক যখন তাত্ত্বিকভাবেও মেনে নেবে যে তার নিজস্ব মতাদর্শ সম্প্রসারণবাদী, তখন বাকি তর্ক সহজ হয়ে যাবে。
📄 আল্লাহ ছাড়া সব মানতে রাজি!
আল্লাহকে অস্বীকার করার জন্য নাস্তিকরা বিচিত্র ধরনের সব তত্ত্ব হাজির করে। মহাবিশ্ব কি ভিনগ্রহের প্রাণীদের তৈরি কম্পিউটার সিমুলেশান? 'সম্ভাবনা আছে'!
আমাদের মহাবিশ্ব কি অসীম-সংখ্যক মহাবিশ্বের মধ্যে একটা? আমাদের মহাবিশ্বের মতো অনেক মহাবিশ্ব মিলে একটা মাল্টিভার্স আছে-যা ছোঁয়া যায় না, দেখা যায় না, প্রমাণ করা যায় না-এমন কি হতে পারে? 'হতে পারে। বেশ যৌক্তিক মনে হচ্ছে।'
মহাবিশ্ব কি এক বিশাল সমন্বিত, সচেতন সত্তা; যে নিজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে? 'কথাটা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না'
মহাবিশ্ব কি অত্যন্ত উন্নত মহাজাগতিক কোনো প্রাণীর অশরীরী বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ? 'চমৎকার বলেছ তো, ব্যাপারটা ভেবে দেখার মতো!'
কিন্তু এই একই মানুষকে যদি আল্লাহর কথা বলা হয়? মহাবিশ্ব কি এক সর্বশক্তিমান স্রষ্টার তৈরি? 'আরে কী-সব অযৌক্তিক কথাবার্তা শুরু করলে। তুমি দেখছি এখনো মধ্য যুগে পড়ে আছ। এখনো এসব গালগল্প বিশ্বাস করো নাকি?'
বিশ্বের প্রথম সারির বিজ্ঞানীরা এমন বিচিত্র-সব থিওরি দিয়ে যাচ্ছে কেন বলুন তো? কারণ, তারা জানে মহাবিশ্বের ব্যাপারে নিরেট জড়বাদী, বস্তুবাদী ব্যাখ্যা যথেষ্ট না। মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় আর গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর বস্তুবাদী ব্যাখ্যা দিতে পারে না। তারা জানে, পরিকল্পিতভাবে সৃষ্ট হবার সব বৈশিষ্ট্য মহাবিশ্বের মধ্যে পাওয়া যায়। সবকিছু থেকে প্রতীয়মান হয় এসব কিছুর পেছনে কোনো ইচ্ছা, কোনো উদ্দেশ্য আছে।
আর এসব কিছু একটা নির্দিষ্ট উত্তরের দিকে আমাদের নিয়ে যায়—আল্লাহ। কিন্তু সেই উত্তর তারা মানতে নারাজ। তারা আল্লাহকে স্বীকার করে চায় না, তাই কম্পিউটার সিমুলেশান থেকে শুরু করে ভিনগ্রহের প্রাণীর মতো নানান আষাঢ়ে গল্পের আসর বসায়। অথচ যে বস্তুবাদী দর্শনে তারা বিশ্বাস করে সেই দর্শন অনুযায়ীই এসব ব্যাখ্যা হাস্যকর। হয়তো একদিন সেই সত্যকে তারা মাটি খুঁড়ে বের করবে যে সত্যকে আজ তারা চাপা দেয়ার চেষ্টা করছে।
টিকাঃ
[৩] ওপরের হাইপোথিসিসগুলোর পক্ষে আধুনিক বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের অনেকের বক্তব্য আছে। আগ্রহী পাঠক দেখুন, যথাক্রমে- Simulation Hypothesis, multiverse hypothesis, Many worlds interpretation, Panpsychism/ Conscious Universe hypothesis ইত্যাদি। অনুবাদক
📄 ‘আমি বিজ্ঞান ভালোবাসি!’, এবং অন্যান্য
২০১৮ সালে প্লুটো নামক বামনগ্রহের কিছু ছবি প্রকাশ করে নাসা। নভোযান ‘নিউ হরাইযন্স’ থেকে তোলা ছবিগুলো দেখে উচ্ছ্বসিত মানুষ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে অনলাইনে।
'আমি বিজ্ঞানকে ভালোবাসি'!-বিস্ময়ভরে ঘোষণা করে অনেকে।
অন্যদের দেখা যায় বিজ্ঞান কত অসাধারণ, আর প্রশংসনীয় তা নিয়ে আবেগঘন মন্তব্য করতে।
বিজ্ঞানের তারিফ করা কিংবা বিজ্ঞানকে ভালোবাসায় কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু প্লুটো তো বিজ্ঞানের তৈরি না। প্লুটোর অস্তিত্ব এবং সৌন্দর্যের পেছনে বিজ্ঞানের কোনো হাত নেই। উচ্ছ্বসিত মানুষগুলো কি এ বিষয়টা বোঝে? যদি বোঝে, তাহলে কি তারা এটা নিয়ে চিন্তা করে?
অনেকে বলতে পারেন বিজ্ঞানকে ভালোবাসা একটা নির্দোষ ব্যাপার, এর সাথে শিরকের কোনো সম্পর্ক নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ কথার সাথে আমি একমত। কিন্তু আমরা আজ এমন এক সময় ও সংস্কৃতিতে বসবাস করছি যখন অসংখ্য মানুষ ধর্মত্যাগ করছে, স্রষ্টার ক্ষমতা আর প্রাসঙ্গিকতা অস্বীকার করছে, নাস্তিক হচ্ছে। এমন একটা অবস্থায় প্লুটোর ছবি দেখে যখন বিজ্ঞানকে ভালোবাসার কথা বলা হয়, তখন সেগুলো আর নিছক উচ্ছ্বসিত মন্তব্য হিসেবে আর দেখা যায় না। আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ মনে হলেও, এ কথাগুলোর গভীর তাৎপর্য আছে।
প্রকৃতির মাঝে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য দেখার পর মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড বিস্ময় কাজ করে। সুন্দরের এই সমারোহ দেখে মানুষ অভিভূত হয়। এই প্রতিক্রিয়া সর্বজনীন। এই সৃষ্টি আর এই সৌন্দর্য যে শূন্য থেকে আসেনি, নিজে নিজে তৈরি হয়নি—এসবের পেছনে একজন স্রষ্টা আছেন—এই উপলব্ধি এবং সেই স্রষ্টার প্রশংসা করার ইচ্ছাও সর্বজনীন।
যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না, এই সহজাত অনুভূতি আর আবেগ তাদের অন্য কোনো দিকে চালিত করতে হয়। তাই মানুষ ভক্তিভরে 'প্রকৃতি' কিংবা বিজ্ঞানের বন্দনা করে। 'প্রকৃতি' বা 'মাদার নেইচার' নামে কোনো সচেতন সত্তা কিংবা দেবতা আছে, এটা আজ তেমন কেউ বিশ্বাস করে না। একইভাবে প্রাকৃতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং এর সংরক্ষণের কৃতিত্ব যে বিজ্ঞানের না, এটাও সবাই বোঝে। বিজ্ঞান কোনো স্বাধীন ইচ্ছা আর বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সত্তা না। বিজ্ঞান মানুষের তৈরি এক শাস্ত্র, জ্ঞানের একটি শাখা। তাহলে প্লুটোর ছবি দেখে বিজ্ঞান নিয়ে এই উচ্ছ্বাস, ভক্তি, বন্দনা, আনন্দ আর ভালোবাসার অনুভূতি তৈরি হবার কারণ কী?
কথাটা অন্যভাবে বলা যায়। বিজ্ঞানের ক্ষমতা হলো সৃষ্টি পর্যবেক্ষণ আর বিশ্বজগতের কাঠামোর খুঁটিনাটি তথ্য অনুসন্ধান করার। এ ক্ষমতা যদি এতটা প্রশংসা আর ভালোবাসার জন্ম দেয়, তাহলে যে মহান সত্তা বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন, তাঁর ব্যাপারে মানুষের অনুভূতি কেমন হওয়া উচিত?
ধরুন, একজন মানুষ প্রকৃতি, সৌন্দর্য, এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। কাঠখোট্টা লোক। সমুদ্র তীরের চোখধাঁধানো সূর্যাস্তের দৃশ্য আর দুপুর বেলার ঘুম তার কাছে একই মাপের জিনিস। প্লুটোর ছবি দেখে সে হাই তোলে, নিরস মুখে বলে— 'এত আহা উহু করার কী আছে? তেমন কোনো বিশেষত্ব আছে বলে তো মনে হচ্ছে না।'
বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে বিজ্ঞানকে ভালোবাসার ঘোষণা দেয়া মানুষদের চেয়ে এই ধরনের মানুষের প্রতিক্রিয়া বেশি সংগতিপূর্ণ। প্রকৃতি, সৌন্দর্য, এসবের বিশেষ কোনো গুরুত্ব যেহেতু তার কাছে নেই, তাই সে এগুলো নিয়ে মাথা ঘামায় না। তেমন কোনো অনুভূতি তার মধ্যে দেখা যায় না।। আবার যে লোক প্লুটোর ছবি দেখে অভিভূত হয়ে প্লুটোরই প্রশংসা শুরু করে, প্লুটোকে ভালোবাসতে শুরু করে, তার প্রতিক্রিয়াও বিজ্ঞানকে ভালোবাসার ঘোষণা দেয়া লোকদের চেয়ে বেশি যৌক্তিক। যুগে যুগে এভাবেই তো মানুষ প্রকৃতির পূজা করেছে। সৌরজগতের গ্রহগুলোর নাম দেয়া হয়েছে রোমান দেবতাদের নামে। ব্যাপারটা তো কাকতালীয় না। কিন্তু আধুনিক বস্তুবাদ অনুযায়ী মহাকাশে ছুটে বেড়ানো প্রাণহীন, চেতনাহীন একটা পাথরের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা কিংবা ভক্তি প্রদর্শনের কোনো মানে হয় না। সেই রাস্তাও বন্ধ হয়ে গেছে। তাই মানুষ এখন বিজ্ঞানের প্রশংসা করে। বিজ্ঞানের প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা প্রকাশ করে। যদিও এর কোনো অর্থ হয় না।
স্রষ্টাকে অস্বীকার করে, বিজ্ঞানের প্রশংসা করা-এ কেমন নির্বোধের মতো আচরণ? বিজ্ঞান একটা লেন্স। এই লেন্সের মধ্য দিয়ে আমরা মহাবিশ্বকে দেখি। এই লেন্সের আরাধনা কেন করা হবে? লোভনীয় খাবারের ছবি দেখলে আমরা কি ফটোগ্রাফারের প্রশংসা করি নাকি রাধুনীর? চমৎকার স্থাপত্যকর্মের ছবি চোখে পড়লে স্থপতির কথা ভুলে আমরা কি ফটোগ্রাফারের প্রশংসা করি? না, আমরা এমন করি না, কারণ এটা অযৌক্তিক। যদি আপনি বিশ্বাস করেন কোনো রাধুনী নেই, কোনো স্থপতি নেই-ওই খাবার, ওই স্থাপত্যকর্ম আপনাআপনি তৈরি হয়ে গেছে-সে ক্ষেত্রে কারও প্রশংসা করারই-বা কী দরকার? ফটোগ্রাফার আর ফটোগ্রাফির তো এখানে কোনো কৃতিত্ব নেই। তাদের প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত হবার কারণ কী? উচ্ছ্বাসের মূল কারণ কী? ক্যামেরায় তোলা ছবি নাকি ছবির বিষয়বস্তু?
সৃষ্টিজগতের সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে বিজ্ঞানের প্রশংসা করে মানুষ আসলে মানবজাতির বুদ্ধিমত্তার তারিফ করছে। অথচ সৃষ্টিজগতের মহান নির্মাতার ব্যাপারে অস্তিত্বের সম্ভাবনা নিয়েও সে চিন্তা করছে না। কী চরম নির্বুদ্ধিতা আর অজ্ঞানতা।
টিকাঃ
[৪] ১৯৩০-এ আবিষ্কৃত হবার পর থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আমাদের সৌরজগতের নবম গ্রহ হিসেবে পরিচিত ছিল প্লুটো। - অনুবাদক
[৫] নিউ হরাইযন্স (New Horizons) একটি আন্তঃগ্রহ মহাকাশ প্রোব, যা জানুয়ারি ১৯, ২০০৬ সালে নাসার নিউ ফ্রন্টিয়ার্স কর্মসূচির অংশ হিসেবে উৎক্ষেপণ করা হয়। অনুবাদক