📘 সংশয়বাদী > 📄 অনুবাদকের কথা

📄 অনুবাদকের কথা


বিসমিল্লাহির রাহমানীর রাহীম
নিশ্চয় সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ﷺ), তাঁর পরিবার ও তাঁর সাহাবীগণের ওপর।

মুসলিম হিসেবে আধুনিক সময়ে আমাদের একটা সংঘাতের মোকাবিলা করতে হয়। আমরা প্রায় সবাই নিজের মধ্যে একটা পরস্পরবিরোধিতা অনুভব করি। একদিকে আমরা নিজেদের মুসলিম বলে পরিচয় দিই। অন্যদিকে বাস্তবতা, নৈতিকতা ও শাসনের মতো বিষয়গুলোর ব্যাপারে সমাজ, বিজ্ঞান, শিল্প, মিডিয়া থেকে শেখা দৃষ্টিভঙ্গির সাথে ইসলামের অনেক অবস্থান মেলে না। সাম্য, স্বাধীনতা, অধিকারের মতো আধুনিকতার মৌলিক অনেক ধারণার সাথে ইসলামের বিভিন্ন বিধিবিধানের তীব্র সাংঘর্ষিকতা আমাদের চোখে ধরা পড়ে। পর্দা, বহুবিবাহ, ইসলামী দণ্ডবিধি, শরীয়াহ শাসন, জিহাদ, পরিবার ও সমাজে নারী অবস্থানসহ ইসলামের এমন অনেক বিষয় আছে আধুনিকতার মানদণ্ডে বিচার করলে যেগুলোকে 'যৌক্তিক', 'আধুনিক', 'মানবিক' কিংবা 'উপযুক্ত' বলে মনে হয় না। ইসলাম ও আধুনিকতার এই সংঘাত আধুনিক মুসলিমের সামনে আসে বিভিন্ন প্রশ্ন কিংবা সংশয়ের আকারে। হয়তো বিশেষ কোনো বিধানের ব্যাপারে প্রশ্নের উদয় হয়। হয়তো কোনো আয়াত কিংবা হাদীস নিয়ে অন্তরে সংশয় কাজ করে। কিন্তু সমস্যা আসলে দু-একটা বিধান কিংবা কোনো নিদিষ্ট আয়াত বা হাদীস নিয়ে না। সমস্যার শেকড় আরও অনেক গভীরে। এই শেকড়কে চিনতে না পারলে এই প্রশ্ন আর সংশয়গুলোর সন্তোষজনক সমাধান করা সম্ভব না।

আমাদের এই সংঘাতের মুখোমুখি হতে হচ্ছে কারণ, আধুনিকতা এবং ইসলামের মধ্যে মৌলিক দ্বন্দ্ব আছে। ইসলাম আমাদের যে ওয়ার্ল্ডভিউ (worldview) বা বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি দেয় আর আধুনিক দুনিয়ার যে ওয়ার্ল্ডভিউ, তা আলাদা। এ দুই ওয়ার্ল্ডভিউয়ের ভিত্তি হিসেবে যে ধারণাগুলো গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলো আলাদা। অনেক ক্ষেত্রে বিপরীতমুখী। এটাই হলো সমস্যার শেকড়।

ওয়ার্ল্ডভিউ কী? ওয়ার্ল্ডভিউ হলো চিন্তার কাঠামো। ওই কাঠামো, যার সাপেক্ষে, যার মাধ্যমে আমরা বাস্তবতাকে বোঝার চেষ্টা করি। আমাদের ওয়ার্ল্ডভিউ-ই ঠিক করে দেয় বাস্তবতাকে আমরা কীভাবে দেখি, বুঝি, ব্যাখ্যা করি। ওয়ার্ল্ডভিউকে চিন্তার ভাষা মনে করতে পারেন। প্রত্যেকের যেমন নিজস্ব ভাষা থাকে, তেমনিভাবে প্রত্যেকের একটা ওয়ার্ল্ডভিউ থাকে। হয়তো তারা সেটাকে ‘ওয়ার্ল্ডভিউ’-এর মতো গালভরা কোনো শব্দ হিসেবে চেনে না, কিন্তু শব্দের পেছনের জিনিসটা কমবেশি সবার মধ্যেই থাকে। ওয়ার্ল্ডভিউ হলো ওই লেন্স, ওই চশমা যার ভেতর দিয়ে আমরা পৃথিবীকে দেখি।

কী আছে, কী নেই? কোনটা বাস্তব, কোনটা অবাস্তব? জ্ঞান কী, জ্ঞানের উৎসগুলো কী? জ্ঞানের মানদণ্ড কী? মানুষ কী? মানুষ কে? আমরা কোথা থেকে এলাম, কোথায় যাচ্ছি? জীবনের উদ্দেশ্য কী? ভালোমন্দের মাপকাঠি কী? এই মাপকাঠি অনুযায়ী কীভাবে মানুষের বেঁচে থাকা উচিত? কোন নীতির ভিত্তিতে সমাজ চলবে? আইনের উৎস কী হবে? শাসনের ভিত্তি কী হবে?- প্রত্যেক সমাজ আর সভ্যতা এ প্রশ্নগুলো নিয়ে চিন্তা করেছে। হয়তো শব্দ ভিন্ন হয়েছে, উপস্থাপনায় পার্থক্য হয়েছে, কিন্তু মৌলিকভাবে প্রত্যেক সভ্যতা এই জিজ্ঞাসাগুলোর জবাব খুঁজেছে। এগুলো মানবঅস্তিত্বের মৌলিক প্রশ্ন। এই প্রশ্নগুলোর ব্যাপারে প্রত্যেক সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও দর্শনের কিছু নির্দিষ্ট উত্তর এবং মাপকাঠি থাকে। এগুলো নিয়েই গঠিত হয় তার ওয়ার্ল্ডভিউ।

ইসলামের স্বতন্ত্র ওয়ার্ল্ডভিউ আছে। এই ওয়ার্ল্ডভিউ সত্য, সর্বজনীন, অপরিবর্তনীয়। যে আধুনিক সভ্যতার অধীনে আমরা বসবাস করি সেটারও নিজস্ব ওয়ার্ল্ডভিউ আছে। আধুনিকতাও মনে করে তার ওয়ার্ল্ডভিউ সত্য ও সর্বজনীন। এ দুটো ওয়ার্ল্ডভিউ মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক।

ইসলামের ওয়ার্ল্ডভিউয়ের ভিত্তি হলো আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস (কুফর বিত ত্বাগুত, ঈমান বিল্লাহ), রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রিসালাত এবং ওয়াহি (কুরআন, সুন্নাহ)। কিন্তু এই তিনটি ভিত্তিকেই আধুনিকতা অস্বীকার করে। বাস্তবতা, জ্ঞান, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, আইন-কোনো কিছুর ব্যাপারেই জ্ঞানের উৎস হিসেবে ওয়াহিকে আধুনিকতা স্বীকার করে না; বরং সবকিছুর ভিত্তি দাবি করা হয় মানবীয় যুক্তি, বুদ্ধি এবং ধ্যানধারণাকে। ইসলাম মানবীয় যুক্তি, চিন্তা এবং বিজ্ঞানকে জ্ঞানের উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু ইসলামের অবস্থান হলো চূড়ান্ত এবং সুনিশ্চিত জ্ঞানের উৎস একটিই-ওয়াহি। অন্যদিকে বস্তুবাদী সভ্যতা ওয়াহিকে অস্বীকার করে। যদি অস্বীকার নাও করে, তাহলে কমসেকম অপ্রাসঙ্গিক মনে করে। এ দুটো অবস্থান সাংঘর্ষিক। এই সাংঘর্ষিকতার ফলে আধুনিক সময়ের মুসলিম হিসেবে অনেক সংশয় এবং টানাপড়েন আমাদের সামনে উঠে আসে।

আধুনিক মুসলিম একই সাথে এই দুই সাংঘর্ষিক ওয়ার্ল্ডভিউকে ধারণ করার চেষ্টা করে। আমরা একদিকে মুসলিম, অন্যদিকে আমরা এই সভ্যতারই সন্তান। আধুনিকতার মাঝেই আমাদের বেড়ে ওঠা। নিজের অজান্তেই এই সভ্যতার অন্তর্নিহিত চিন্তাগুলো আমাদের প্রভাবিত করেছে। নিশ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে, যাপিত জীবনের সাথে আধুনিক সভ্যতার বস্তুবাদী ধ্যানধারণাগুলো আমরা শুষে নিয়েছি। নিজের অজান্তেই বাস্তবতা, মানবজীবন, জীবনের উদ্দেশ্য, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, শাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে এমন অনেক অবস্থান আমরা গ্রহণ করে নিয়েছি, যা গভীরভাবে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক।

আধুনিকতার এই ওয়ার্ল্ডভিউ মুসলিমরা স্বেচ্ছায় বেছে নেয়নি। ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ অস্ত্রের জোরে আমাদের ওপর তা চাপিয়ে দিয়েছে। ধাপে ধাপে শাসনব্যবস্থা, সমাজ ও শিক্ষা থেকে ইসলামকে তারা মুছে দিয়েছে। তারপর সেখানে বসিয়েছে তাদের নিজস্ব ধ্যানধারণা, মূল্যবোধ, পদ্ধতি, প্রতিষ্ঠান ও মতবাদ। দখলদারিত্বের অধীনে থাকতে থাকতে একসময় আমরাও এগুলোকে অমোঘ বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়েছি। এগুলোকে আমরা এখন আর ইউরোপের ইতিহাসের নির্দিষ্ট সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় প্রেক্ষাপট থেকে বের হয়ে আসা দার্শনিক চিন্তার ফসল মনে করি না; বরং এই ব্যবস্থা, মূল্যবোধ এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে আমরা মনে করি সহজাত, সর্বজনীন ও চিরন্তন।

আধুনিকতার ঠিক করে দেয়া চিন্তার ছক আর কাঠামো থেকে আমরা সহসা বের হতে পারি না। এর ভেতরেই আমাদের চিন্তা। আধুনিকতার মতবাদগুলোর প্রস্তাবনা আর অনুসিদ্ধান্তগুলোকে আমাদের কাছে 'কমনসেন্স', স্বতঃসিদ্ধ অথবা স্বপ্রমাণিত বলে মনে হয়। আমাদের চিন্তা আধুনিকতার ওয়ার্ল্ডভিউয়ের ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে গেছে যে ইসলামের সত্য এবং সৌন্দর্যকেও আধুনিক মুসলিম স্বতন্ত্রভাবে চিনতে পারে না। ইসলামের সত্যকে তার বুঝতে হয় 'মানবতা', 'অধিকার', 'স্বাধীনতা', 'সাম্যের' মতো ধারণার পশ্চিমা সমীকরণের ভেতরে ফেলে। আর ইসলামের কোনো কিছু যখন এই কাঠামোর সাথে মেলে না তখন তার মধ্যে সংকট তৈরি হয়। কিন্তু সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম, সাহাবায়ে কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম কিন্তু এভাবে ইসলামকে বোঝেননি। তাঁরা স্বতন্ত্রভাবে ইসলামকে সৃষ্টিজগতের মালিকের কাছ থেকে আসা দিকনির্দেশনা এবং চিরন্তন সত্য হিসেবে চিনতে পেরেছিলেন। সেই ইসলাম আজও আছে কিন্তু আমরা মুসলিমরা বদলে গেছি।

আমরা জানি মহান আল্লাহ সত্য, আমরা জানি তাঁর দ্বীন সত্য। কিন্তু সামনে ইসলামের স্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও আধুনিক মুসলিম বিনা প্রশ্নে সেটাকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারছে না। সত্য সামনে থাকা সত্ত্বেও যেন তার কাছে অদৃশ্য।

ইসলাম ও আধুনিকতার এ সংঘাত আধুনিক মুসলিমের সামনে হাজির হয় কিছু প্রশ্ন আর সংশয়ের আকারে-
• ইসলাম কি ব্যক্তিস্বাধীনতা সমর্থন করে?
• ইসলাম কি বাকস্বাধীনতা সমর্থন করে?
• ইসলাম কি মুক্তচিন্তা সমর্থন করে?
• ইসলাম কি ধর্মীয় স্বাধীনতা সমর্থন করে?
• ইসলাম কি গণতন্ত্র সমর্থন করে?
• ইসলাম কি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ সমর্থন করে?
• কুরআন-সুন্নাহর সব অবস্থান কি আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
• ইসলাম নারীবাদকে সমর্থন করে?
• ইসলাম কি সর্বজনীন মানবাধিকারকে সমর্থন করে?
• ইসলাম কি সর্বাবস্থায় শান্তি এবং অহিংস পথকে সমর্থন করে?

এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হবার পর আধুনিক মুসলিমদের মধ্যে সাধারণত দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

একদল বলে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নেতিবাচক। ইসলাম এগুলো সমর্থন করে না। কাজেই ইসলাম সত্য ধর্ম হতে পারে না। এরা ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়।

আরেকদল বলে, হ্যাঁ ইসলামে এগুলো সবই আছে। কারণ, যা কিছু ভালো তার সবই ইসলাম সমর্থন করে। কিন্তু এটুকু বললেই তো হবে না, প্রমাণ করতে হবে। এই আরোপিত সামঞ্জস্য প্রমাণের জন্য দ্বিতীয়দল তখন ইসলাম বিকৃত করে। ইসলামী শরীয়াহর যা কিছু আধুনিক মতবাদগুলোর সাথে খাপ খায় না, সেগুলোকে তারা বাদ দেয়ার চেষ্টা করে। কিংবা নতুন কোনোভাবে ব্যাখ্যা করার কসরত করে।

এ দুটো অবস্থানই ভুল। আর দুটো ভুলের শেকড় একই জায়গাতে। দুটো অবস্থানই স্বাধীনতা, নারীবাদ, মুক্তচিন্তা, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা-ইত্যাদি ধারণাকে ধ্রুব এবং সঠিক ধরে নিচ্ছে। আধুনিক ওয়ার্ল্ডভিউয়ের মাপকাঠিকে সঠিক ধরে নিয়ে সেই মাপকাঠিতে তারা ইসলামকে মাপছে কিংবা সত্য প্রমাণ করতে চাচ্ছে। একদল আধুনিকতার মানদণ্ডে 'উত্তীর্ণ' না হবার কারণে ইসলাম ত্যাগ করছে। আরেক দল আধুনিকতার ছাঁচে ইসলামকে বসানোর চেষ্টা করছে। দুটো অবস্থানই পশ্চিমা বিভিন্ন মতবাদকে সত্য এবং ধ্রুব বলে মেনে নিচ্ছে।

কিন্তু এ দুই ভুল পথের বাইরে তৃতীয় একটি পথ আছে-ইসলামের অবস্থানকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে, আধুনিকতার ওয়ার্ল্ডভিউয়ের ব্যাপারে সংশয়বাদের অবস্থান গ্রহণ করা। অর্থাৎ আধুনিকতার মাপকাঠিতে ইসলামকে বিচার করার বদলে আধুনিকতাকে ইসলামের চিরন্তন মাপকাঠিতে যাচাই করা। ইসলামকে পশ্চিমা সভ্যতার অনুগামী করার বদলে পশ্চিমা ওয়ার্ল্ডভিউকে প্রশ্ন করতে শেখা। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, মানবতাবাদ, গণতন্ত্র, নারীবাদ, লিবারেলিসমসহ বিভিন্ন আধুনিক মতবাদের পেছনে থাকা ধারণা এবং পূর্বানুমানগুলোকে চিহ্নিত করা। সেগুলোকে প্রশ্ন করা। এর শেকড়গুলো মাটি খুঁড়ে বের করে আনা। সেগুলোর ব্যবচ্ছেদ করা।

লেখক ও বক্তা ড্যানিয়েল হাক্কিকাতযু ঠিক এ কাজটাই করার চেষ্টা করছেন। দীর্ঘদিন ধরে বক্তব্য এবং লেখালেখির মাধ্যমে লিবারেলিসম, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, নারীবাদসহ পশ্চিমা বিভিন্ন মতবাদগুলোর পেছনের ধারণা ও প্রস্তাবনাগুলোর ব্যবচ্ছেদ তিনি করে আসছেন। 'সংশয়বাদী' বইটি তার এ ধরনের প্রবন্ধগুলোর একটি সংকলন। বইটিকে কিছুদিন আগে ইংরেজিতে প্রকাশিত তার 'The Modernist Menace To Islam' বইয়ের বঙ্গানুবাদও ধরা যেতে পারে। দুটো বইয়ের অধিকাংশ লেখা এবং অধ্যায়ের বিন্যাস একই। তবে মূল বইয়ের কিছু লেখা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক মনে না হওয়ায় বঙ্গানুবাদে বাদ দেয়া হয়েছে।

অনুবাদের ক্ষেত্রে চেষ্টা করা হয়েছে লেখকের মূল বক্তব্য যথাসম্ভব অপরিবর্তিত রাখার। যেসব ইংরেজি শব্দ বহুল-প্রচলিত এবং যেসব ইংরেজি পরিভাষার জুতসই কিংবা পরিচিত বাংলা প্রতিশব্দ নেই, সেগুলোর বাংলা করা হয়নি। বইয়ে বেশ কিছু দার্শনিক পরিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। এর মধ্যে যেগুলোর ব্যাখ্যা লেখকের আলোচনায় আসেনি, সেগুলোর টীকা যুক্ত করা হয়েছে। যেহেতু প্রতিটি অধ্যায়ের আলোচনা স্বতন্ত্র তাই অনেক ক্ষেত্রে টীকার পুনরাবৃত্তি হয়েছে।

ইসলাম ও আধুনিকতার ওয়ার্ল্ডভিউয়ের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের একটি। কিন্তু এই দ্বন্দ্বের প্রকৃতি এবং বাস্তবতা সম্পর্কে দুঃখজনকভাবে আমাদের মধ্যে আজও অনেক বিভ্রান্তি কাজ করে। এখানে যে আদৌ কোনো দ্বন্দ্ব আছে, সেটাই অনেকে বোঝেন না বা বুঝতে চান না। পশ্চিমা লিবারেল ক্রুসেইডের মোকাবিলার জন্য এই দুই ওয়ার্ল্ডভিউয়ের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের বাস্তবতা উপলব্ধি করা এবং এই লড়াইয়ের উপযুক্ত কৌশল বেছে নেয়া অত্যন্ত জরুরি। আমি আশা করি 'সংশয়বাদী' এ ক্ষেত্রে সহায়ক হবে, বিইযনিল্লাহ।

মহান আল্লাহ 'আযযা ওয়া জাল আমাদের দ্বীন ইসলামকে ওইভাবে বোঝার এবং পালন করার তাউফিক দিন, যেভাবে পালন করেছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম-নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবীগণ। তাঁরা নিজেদের ইচ্ছেগুলোকে শরীয়তের অনুগামী করেছিলেন। অন্য সবকিছুকে বিচার করেছিলেন ইসলামের মাপকাঠিতে।
রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম ওয়া রাদু আনহ।

মহান আল্লাহ আমাদের সেই বিশুদ্ধ সরল পথ এবং চূড়ান্ত কষ্টিপাথরের কাছে ফিরে যাবার তাউফিক দিন।
নিশ্চয় সাফল্য কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই। নিশ্চয় সকল প্রশংসাও একমাত্র তাঁরই। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ﷺ), তাঁর পরিবার ও তাঁর সাহাবীগণের ওপর।

আসিফ আদনান
রমাদ্বান ১৪৪২ হিজরি, এপ্রিল ২০২১

📘 সংশয়বাদী > 📄 লেখক পরিচিতি

📄 লেখক পরিচিতি


ড্যানিয়েল হাকিকাতজুর জন্ম হিউস্টন, টেক্সাসে। পড়াশুনা করেছেন হার্ভার্ডে। আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে ফিজিক্স আর গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে পড়েছেন দর্শন নিয়ে। এছাড়া টাফটস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন দর্শনে। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায় তার সুযোগ হয়েছে নোবেল বিজয়ী বিভিন্ন পদার্থবিদ ও দার্শনিকদের অধীনে পড়ার। এছাড়া আলিমগণের তত্ত্বাবধানে তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবে দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে শিখছেন।

ড্যানিয়েল হাক্কিকাতযু আলাসনা ইন্সটিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা। এ ইন্সটিটিউটের উদ্দেশ্য ইসলাম নিয়ে আধুনিক সময়ের বিভিন্ন সংশয় ও সন্দেহের মোকাবেলা করতে মুসলিমদের শেখানো। পশ্চিমা দার্শনিক চিন্তা, ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য এবং মুসলিম ও মডার্নিটির সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি লেখালেখি করে থাকেন। ড্যানিয়েল হাক্কিকাতযু বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মাসজিদ এবং মাদ্রাসায় বক্তব্য রেখেছেন।

লেখকের সাইট: মুসলিম স্কেপটিক - https://muslimskeptic.com/
আলাসনা ইন্সটিটিউট-https://www.alasna.org/

📘 সংশয়বাদী > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর, যিনি সমগ্র সৃষ্টির মালিক ও বাদশাহ। যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়াময় এবং সকল কিছুর ওপর শক্তিশালী। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর পরিবার ও তাঁর সাহাবীগণের ওপর।

মডার্নিটি। মানবজাতির জন্য এবং ইসলামের জন্য হুমকি। কিন্তু মডার্নিটির এ বিপদকে বুঝতে হলে আমাদের কিছুটা পেছনে যেতে হবে। ঐতিহাসিকদের মতে মডার্নিটির শুরু ষোড়শ শতাব্দীতে। এই শতাব্দী ছিল ইউরোপের ইতিহাসের তীব্র উত্থান-পতনের সময়। রিফর্মেশানের মাধ্যমে এ শতাব্দীতে শুরু হয় খ্রিষ্টানদের নিজেদের মধ্যেকার তিক্ত সংঘাত, যার ফলস্বরূপ জন্ম নেয় সেক্যুলারিসম। যুদ্ধ, রক্তপাত ও তীব্র বিভাজন ধর্ম ও বাইবেলের প্রতি ইউরোপের বুদ্ধিজীবীদের মনকে বিষিয়ে তোলে। ধর্ম আর বাইবেলকে মানুষ দেখতে শুরু করে অজ্ঞতা এবং দুর্দশার উৎস হিসেবে।

কিন্তু ঈশ্বর আর বাইবেলকে বাদ দিলে শূন্যস্থানে বসবে কে? নৈতিকতার উৎস কী হবে? অস্তিত্বের প্রকৃতি এবং মানুষের চূড়ান্ত গন্তব্য নিয়ে প্রশ্নের জবাব মিলবে কোথা থেকে?

প্রথমদিকের মডার্নিস্টরা মেটাফিজিক্যাল ও দুনিয়াবি কর্তৃত্বের আসনে বসায় নিজেদের মনকে। তারা মনে করত মানব-মন এবং মানবীয় যুক্তিই পারে মানবজাতিকে পথ দেখাতে। এই ধারণা আরও শক্তিশালী হয় গাণিতিক বিজ্ঞান এবং আইযাক নিউটনের পরীক্ষালব্ধ পদার্থবিজ্ঞানের সফলতা দেখার পর। তারা ধরে নেয়, যুক্তি এবং অভিজ্ঞতাজাত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মানব-মন পরিণত হতে পারে ঈশ্বরে। কারণ মানব-মনের আছে আবিষ্কার এবং যুক্তি ব্যবহারের অসীম ক্ষমতা। মহাবিশ্ব আর মানবপ্রকৃতি নিয়ে সব প্রশ্ন একদিন অঙ্কের মতো সমাধান হয়ে যাবে, এ কেবল সময়ের ব্যাপারমাত্র!

তবে জ্ঞান হলো গল্পের অর্ধেক। মাটির মানুষ শুধু জ্ঞানের বদৌলতে দেবতায় পরিণত হতে পারে না। সমীকরণের বাকি অর্ধেকটা হলো ক্ষমতা। অর্থাৎ নিজের ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করতে পারা। মনের মতো করে পৃথিবীকে বদলে নেয়া। আর এই ক্ষমতা অর্জিত হয় প্রযুক্তির মাধ্যমে। প্রযুক্তির অগ্রগতি এক ক্রমাগত চলমান প্রক্রিয়া। মডার্নিস্টদের কাছে এর অর্থ হলো, প্রযুক্তি মানুষকে অসীম শক্তি এবং দেবত্বের প্রতিশ্রুতি দেয়। জ্ঞান আর প্রযুক্তির মিশেলে অসীম ক্ষমতা অর্জন কেবল সময়ের ব্যাপার।

মডার্নিসমের সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সময়। মডার্নিসমের প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রগতিবাদ। প্রগতিবাদ বলে, যত সময় যাচ্ছে তত মানুষের জ্ঞান ও ক্ষমতার অগ্রগতি হচ্ছে। বুদ্ধি ও নৈতিকতার দিক থেকে সভ্যতার উন্নতি হচ্ছে। আজকের মানুষ অতীতের মানুষের চেয়ে উত্তম। সময়ের সাথে সাথে মানবজাতি ছুটে চলেছে এক নিখুঁত কল্পরাজ্যের দিকে, যার সাথে তুলনা চলে কেবল ধর্মীয় গ্রন্থে বর্ণিত জান্নাতের। প্রগতির ওপর এই অন্ধ বিশ্বাস আধুনিকতাবাদের ভিত্তি। বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সবাই প্রগতিবাদের এই অবস্থানকে মেনে নেয় স্বতঃসিদ্ধ এবং প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে। আর এখান থেকেই মডার্নিটির বিপজ্জনক প্রকৃতির বিষয়টা স্পষ্ট হতে শুরু করে। প্রগতিবাদের অর্থ হলো পরিবর্তন মাত্রই ইতিবাচক। পরিবর্তনই স্বতন্ত্র লক্ষ্য এবং মূল্যবোধ। অন্যদিকে স্থিরতা হলো অনৈতিক। পরিবর্তনের বিরোধিতাকে তাই দেখা হয় আক্ষরিক অর্থেই মানবজাতির ওপর আক্রমণ হিসেবে।

মডার্নিটির প্রধান শত্রু তাই ট্র্যাডিশান। কারণ ট্র্যাডিশানের প্রতি অঙ্গীকারের অর্থ পরিবর্তনকে প্রতিরোধ করা। কিছু নীতিকে অপরিবর্তনীয়, চিরন্তন, ধ্রুব হিসেবে গ্রহণ করা। এগুলোর সংস্কার করা সম্ভব না, এগুলো আপডেট করা সম্ভব না। ট্র্যাডিশানের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ হবার অর্থ অতীতের সাথে সম্পর্ক ধরে রাখা, কোনো-না-কোনোভাবে অতীতের ওপর নির্ভর করা। আর এই বৈশিষ্ট্যই মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় ট্র্যাডিশান আর মডার্নিটিকে। সাংস্কৃতিক, ভাষাতাত্ত্বিক এবং বিশেষ করে ধর্মীয় ট্র্যাডিশান মডার্নিটির প্রবর্তন আর সংস্কারের বুলডোজারের নিচে পিষ্ট হবার নিরন্তর হুমকির মধ্যে থাকে। আধুনিক পৃথিবীতে ধর্মীয় ট্র্যাডিশানের কোনো স্থান নেই।

আধুনিক কিংবা আধুনিকায়িত ধর্ম খাবার টেবিলে সাজিয়ে রাখা ফুলদানির মতো। এই ফুলদানি মূল্যহীন। তার কাজ এক কোনায় পড়ে থাকা। যতক্ষণ সে অন্য কিছুকে প্রভাবিত করছে না, ততক্ষণ তাকে সহ্য করা হবে। মূল আয়োজন মডার্নিটির মতবাদগুলোর। খাবার সময় কেউ বিক্ষিপ্তভাবে ফুলদানির দিকে তাকালে সেটা মেনে নেয়া যায়। কিন্তু কেউ যদি মডার্নিটির মতবাদগুলোকে বাদ দিয়ে ধর্মকেই আঁকড়ে ধরতে চায়, তাহলে সেটা মেনে নেয়া হবে না। যে ধর্ম ফুলদানি হয়ে থাকতে রাজি, মডার্নিটি তাকে টেবিলে জায়গা দেবে। কিন্তু যে ধর্ম এর চেয়ে বেশি কিছু হতে চায়, তাকে মেনে নেয়া হবে না।

আধুনিক চিন্তার পেছনে সব সময় একটা ধারণা কাজ করে-
জীবনের সব মৌলিক প্রশ্নের যদি উত্তর মডার্নিটি এবং আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বগুলো দিতে পারে, তাহলে ধর্মের প্রয়োজন কী?
মানুষ কোথা থেকে এল? মডার্নিটির জবাব: ডারউইনিসম এই প্রশ্নের উত্তর দেয়
মহাবিশ্ব কীভাবে কাজ করে? মডার্নিটির জবাব: বিজ্ঞান এ প্রশ্নের উত্তর দেয়
ভালো কিংবা নৈতিক হবার অর্থ কী? মডার্নিটির জবাব: লিবারেলিসম এ প্রশ্নের উত্তর দেয়-অন্যের সাথে এমন আচরণ করো, যেমন আচরণ তুমি নিজের জন্য চাও। সমতা আর স্বাধীনতাই সর্বশ্রেষ্ঠ মূল্যবোধ।
সবকিছুর অর্থ আসলে কী? মডার্নিটির জবাব: কোনো নির্দিষ্ট অর্থ নেই। আমরা নিজেই নিজেদের মতো করে অর্থ বানিয়ে নিই। আমরা মহাবিশ্বের অসীম শূন্যতায় ইতস্তত ভেসে বেড়ানো পরমাণুর সমষ্টিমাত্র।

আধুনিক মানসিকতা অনুযায়ী তাই ধর্মের কোনো প্রয়োজন নেই। সব প্রশ্নের উত্তর আধুনিক মানুষ আগেই বের করে রেখেছে। মৌলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কিছু ধর্ম দিতে পারে না। আধুনিকতা মনে করে মানুষ ধর্ম পালন করে কালচারাল বায়াসের কারণে অথবা অভ্যস্ততা আর অভ্যাসের বশে। ধর্ম পালনের আর কোনো কারণ, আর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। আধুনিকতার চোখে তাই প্রগতির সবচেয়ে বড় শত্রু হলো সংকীর্ণমনা অন্ধ বিশ্বাসী-যে হাজার বছরের পুরোনো কিতাব আঁকড়ে থাকে। ধর্ম হলো প্রগতির অন্তরায়। আর তাই মিডিয়া, শিক্ষা, আইন, বৈশ্বিক রাজনীতিসহ বিভিন্ন দিক থেকে বহুমাত্রিক আক্রমণ চালিয়ে ধর্মকে ধ্বংস করতে চায় আধুনিকতা। এই আক্রমণ তীব্র এবং ব্যাপক।

ইসলামকে মডার্নিটির প্রতিতত্ত্ব (antithesis) বললে ভুল হবে না। মডার্নিটির দার্শনিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট চিন্তাবিদদের হাতে। তাদের চোখে ইসলাম ছিল খ্রিষ্টবাদের আরও বর্বর এবং পশ্চাৎপদ এক সংস্করণ। বিখ্যাত ফরাসী দার্শনিক এবং নাস্তিক ভলতেয়ার তার লিখিত 'ম্যাহোমেট' শিরোনামের নাটকে নবী সাল্লাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে উপস্থাপন করেছিল উন্মাদ স্বৈরাচার হিসেবে আর কুরাইশ মুশরিকদের চিত্রিত করেছিল মুক্তচিন্তার প্রতিনিধি হিসেবে।

ইসলামের ব্যাপারে অধিকাংশ ইউরোপীয় দার্শনিকদের চিন্তা ছিল তিক্ত ওরিয়েন্টালিসমের (প্রাচ্যবাদ) রঙে রাঙানো। তাদের চোখে ইসলাম স্বৈরাচারী আর আধুনিকতা হলো স্বাধীনতা। ইসলাম অযৌক্তিক আর আধুনিকতা প্রধান স্তম্ভই হলো মানবীয় যুক্তি। ইসলামের অর্থ স্থবিরতা ও ক্ষয়, অন্যদিকে আধুনিকতার অর্থ নিরন্তর পরিবর্তন আর নবায়ন।

বুদ্ধিবৃত্তিক দ্বন্দ্বের এ ইতিহাস ছাড়াও, প্রকৃতিগতভাবেই মডার্নিটি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ, সব ধর্মের মধ্যে ইসলামই আজও অপরিবর্তিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহর সংরক্ষণ ইসলামের মৌলিক শিক্ষার অংশ। প্রথম প্রজন্মের মতো করে দ্বীন পালন করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের পুরো জ্ঞানতত্ত্ব তৈরি হয়েছে অতীতে আসা ইলমের সংরক্ষণ ও হস্তান্তরের ওপর। ইসলামে শুধু ওয়াহি নাযিল হবার সময়কার জ্ঞানের কথা আসেনি; বরং পৃথিবীতে মানব-অস্তিত্বের আগের জ্ঞানের কথাও এসেছে।

মহান আল্লাহ বলেছেন, স্মরণ করো, যখন তোমার প্রতিপালক আদমসন্তানদের পৃষ্ঠ হতে তাদের বংশধরদের বের করলেন আর তাদেরই সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?' তারা বলল, 'হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।' যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা বলতে না পারো যে, নিশ্চয় আমরা এ বিষয়ে অনবহিত ছিলাম। [তরজমা, সূরা আল-আ'রাফ, ১৭২]

মহান আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর একত্ব, তাঁর উপাস্য হবার একক অধিকার-এই জ্ঞান মানুষের সহজাত প্রকৃতি তথা ফিতরাহর মধ্যে সংরক্ষিত। এই সহজাত প্রকৃতিই মানুষকে ধাবিত করে কল্যাণ এবং বিশুদ্ধতার দিকে। দুনিয়ার টানাপড়েন, শিরক, নাফস, কাম, লালসা, খেয়ালখুশি কিংবা শয়তানের ওয়াসওয়াসার ফলে এই ফিতরাহ কলুষিত হয়। ইসলামের আমল ও বিধি-বিধানগুলো মানুষের ফিতরাহকে সংরক্ষণ করে এক আল্লাহর ইবাদতে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে। মনের নিয়ন্ত্রণও একইরকমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মুমিনকে তার খেয়ালখুশি এবং ইচ্ছেকে শরীয়াহর অনুগামী করতে হয়, চেষ্টা করতে হয় সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের। এই মূল্যবোধগুলো এবং চিন্তার এই পুরো কাঠামোই আধুনিকতাবাদ এবং এর সহগামী মতবাদগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক।

তবে ইসলাম ও মডার্নিটির মধ্যে বৈরিতা কেবল তাত্ত্বিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। মুসলিমদের সাথে মডার্নিটির অনুসারীদের সংঘাত শুরু হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে, মুসলিম-বিশ্বে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের সুবাদে। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর প্রথম লক্ষ্য ছিল মুসলিম-বিশ্বের অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ অর্জন। দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল, 'সপ্তম শতাব্দীতে আটকে থাকা বর্বর মুসলিমদের' মডার্নিটি ও প্রগতির আলোতে নিয়ে আসা। এই দুই লক্ষ্য অর্জনের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় ইসলাম। মুসলিম মানসের ওপর ইসলামের প্রভাবকে দুর্বল করার জন্য ইউরোপীয়রা তখন এখন সূক্ষ্ম কৌশল গ্রহণ করে। উপনিশবাদী প্রকল্প উত্তর আফ্রিকা থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত ইসলামী শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান এবং আলিমদের নিশানা বানায়। ধীরে ধীরে তাদের অর্থের উৎসগুলো বন্ধ করে দেয়, সেখানে গড়ে তোলে ইউরোপিয়ান, সেক্যুলার প্রতিষ্ঠান।

ইসলামী জ্ঞানের ভাষা (আরবী) থেকে শুরু করে ইসলামী পোশাক, এমনকি ইসলামী পারিবারিক কাঠামোও শিকার হয় ঔপনিবেশিক আক্রমণের। ধাপে ধাপে ইসলামী পরিচয় ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা হয় মুসলিম-বিশ্বের বিভিন্ন অংশে। আধুনিকতার আগ্রাসনের মুখে মুমূর্ষু অবস্থায় কিছুদিন টিকে থাকার পর ১৯২৪ সালে পুরোপুরিভাবে অবসান ঘটে খিলাফাত-ব্যবস্থার। ইসলামী সমাজের ওপর চাপিয়ে দেয়া এই আগাগোড়া পরিবর্তনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ধ্বংস ও হত্যা। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি জেনোসাইড। 'প্রগতির পথে বাধা' হবার কারণে ইউরোপীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো মুসলিমদের হত্যা করা হয় পাইকারিভাবে। শেষ হিসেবে দেখা গেল, প্রগতি ও এনলাইটেনমেন্টের পশ্চিমা দেবতার বেদিতে বলি দেয়া হয়েছে কয়েক কোটি মুসলিমকে। যেসব মুসলিম প্রাণে বেঁচে গেল তারা এবং তাদের সন্তানেরা মগজধোলাইয়ের শিকার হয়ে একসময় মডার্নিটি এবং এর মতবাদগুলো গ্রহণ করতে শুরু করল। পশ্চিমা শিক্ষা-ব্যবস্থা, মিডিয়া, সাহিত্য এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে মুসলিমদের মনে গেঁথে দেয়া হলো, ‘আধুনিক = ভালো’।

আধুনিকায়িত মুসলিমরা গ্রহণ করল এক প্যারাডক্সিকাল চিন্তা-মুসলিম উম্মাহর হারানো গৌরব ফিরে পাবার চাবিকাঠি হলো আধুনিকতাবাদ। কর্তৃত্বের অবস্থানে ফিরে যেতে হলে অনুসরণ করতে হবে পশ্চিমের। আধুনিক পশ্চিমের মতবাদ, দর্শন, রাজনীতি, লাইফস্টাইল, বিজ্ঞান, অর্থনীতি-অনুকরণ করতে হবে সবকিছু। এই ধারণা আজও অতটাই শক্তিশালী যতটা ছিল ২০০ বছর আগে। আর গতকালের মতো আজও এ ধারণা মিথ্যা।

আধুনিকতাবাদের বিষাক্ত প্রকৃতিকে চিনতে পারলে, মুসলিম মানসে এর ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যায়। একই মনে মডার্নিটির প্রগতিবাদ আর ইসলামের ট্র্যাডিশানালিসম কীভাবে সহাবস্থান করতে পারে? যে মানুষ প্রগতিবাদে বিশ্বাসী-যে মনে করে মানুষ ক্রমেই বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিকভাবে উন্নত হচ্ছে, আজকের মানুষ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক নৈতিক-সে কীভাবে বিশ্বাস করবে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রজন্ম এবং পরবর্তী দুই প্রজন্ম? এ দুই অবস্থান একইসাথে ধারণ করা সম্ভব না। কিন্তু কলোনাইযড মুসলিমের মন এই দুই সাংঘর্ষিক অবস্থানের মধ্যে সমন্বয়ের জন্যে নানান কসরত করতে থাকে।

‘হয়তো সমাধান ইসলামের সংস্কার করার মধ্যে। হয়তো সমাধান ইসলামকে আধুনিকতার মাপকাঠিতে আপডেট করায়। হয়তো ইসলামের যা কিছু লিবারেলিসম, সেক্যুলারিসম, নারীবাদ, বস্তুবাদ, বিজ্ঞানবাদ, ইত্যাদির সাথে সাংঘর্ষিক, সেগুলো মুছে ফেললেই সমাধান হবে!’

মুসলিমরা আজ ব্যাপকভাবে যেসব সংশয়ে আক্রান্ত হচ্ছে, এ ধরনের চিন্তাগুলোই তার উৎস। এই সংকট ও সংশয়গুলোর মুখোমুখি হলে আধুনিকাতাবাদ দ্বারা কলুষিত মুসলিম মন চিন্তা করে আধুনিকতার ছাঁচে ফেলে ইসলামকে কাটছাঁট করার, অর্থাৎ ইসলামকে বিকৃত করার। কিন্তু দ্বীন ইসলামকে বিকৃত করার বদলে তাদের আসলে আধুনিকতাবাদের ছাঁচকে ভাঙার চিন্তা করা উচিত। আর আধুনিকতার ছাঁচকে ভাঙতে হলে ওইসব মতবাদ আর তন্ত্রমন্ত্রের ব্যবচ্ছেদ করতে হবে, যেগুলো আজ মুসলিমদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে।

মুসলিম মন যখন এই বিষাক্ত মতবাদগুলোর আবর্জনা থেকে মুক্ত হবে, সে যখন চিন্তার দাসত্বের শেকলকে ছিঁড়বে, আধুনিকতার মগজধোলাই থেকে বের হয়ে আসবে, যখন তার চিন্তার বি-উপনিবেশিকরণ হবে-তখনই ইসলামের বিশুদ্ধ আলোতে সে স্পষ্টভাবে বাস্তবতাকে বুঝতে শিখতে।

আধুনিকতাবাদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মতবাদের ক্রিটিক করে আমি বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছি। এ বই হলো সেগুলোর সংকলন, আশা করি আগামীতে এ সিরিযের আরও বই প্রকাশিত হবে। বইয়ের লেখাগুলো প্রধানত মুসলিমদের জন্য হলেও যেসব অমুসলিম পাঠক মডার্নিটির কলুষতাকে চিনতে সক্ষম, কিছু ইসলামী পরিভাষা ছাড়া বইয়ের অধিকাংশ বক্তব্য তারাও বুঝতে পারবেন। বইয়ের অধ্যায়গুলো কোনো নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতায় সাজানো হয়নি, প্রতিটি অধ্যায়ে একটি নির্দিষ্ট মতবাদ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পাঠক যেকোনো ক্রমধারায় বইটি পড়তে পারেন। এই বইয়ে আসা ক্রিটিক সর্বাঙ্গীন না, তবে আজকের সর্বাধিক প্রচলিত অন্ধবিশ্বাসগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকরী কিছু হাতিয়ার পাঠক এ বইতে পাবেন ইন শা আল্লাহ। আমি আশা করি বইয়ের আলোচনা পাঠককে চিন্তার খোরাক জোগাবে এবং আল্লাহ চাইলে চিন্তার জগতে প্যারাডাইম শিফট নিয়ে আসবে। মানুষ বুঝতে পারবে মডার্নিটিস্ট সম্রাটের গায়ে আসলে কোনো পোশাক নেই।

আর মহান আল্লাহই হলেন প্রকৃত বাদশাহ, রাজাধিরাজ।
আল্লাহ আমাদের কাজগুলো কবুল করুন এবং আমাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিন। তিনি আমাদের অন্তরকে ইখলাস ও হিদায়াহর আলোতে আলোকিত করে দিন। আমাদের ও আমাদের সন্তানদের মুসলিম না হয়ে, তাঁর একান্ত অনুগত, আত্মসমর্পণকারী দাস না হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া থেকে রক্ষা করুন।

আমীন।

টিকাঃ
[১] মডার্নিটি (Modernity)-লেখক বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় মডার্নিটি ও মডার্নিসম শব্দ দুটো সমার্থকভাবে ব্যবহার করেছেন। অনুবাদে কখনো 'আধুনিকতা' ও 'আধুনিকতাবাদ' ব্যবহার করা হয়েছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে মূল 'মডার্নিটি' রেখে দেয়া হয়েছে। শাব্দিকভাবে 'আধুনিক' বলতে আমরা 'অধুনা', 'সম্প্রতি' বা 'বর্তমানসম্বন্ধীয়' অর্থ গ্রহণ করে থাকি। ধারণা হিসেবে 'আধুনিকতা'কে আমরা কিছু লক্ষণের সাথে যুক্ত করি, যেমন শিল্পায়ন, নগরায়ন, প্রযুক্তিনির্ভরতা, জাতিরাষ্ট্র, গণতন্ত্র, প্রগতিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, লিবারেলিসম ইত্যাদি। কিন্তু পাশ্চাত্য সভ্যতার ইতিহাসে আধুনিকতার একটি বিশেষ প্রেক্ষাপট ও অর্থ আছে। এই 'আধুনিকতা' ব্যক্তি, সমাজ, ধর্ম, শাসন, ইতিহাস, মানুষ, প্রকৃতি, পৃথিবী, মহাবিশ্ব-ইত্যাদির ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যাখ্যা ও দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে। আধুনিকতা এই অর্থে একটি দর্শন এবং বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিও। আধুনিকতাকে অনেক ক্ষেত্রে এনলাইটেনমেন্টের সমার্থকও ধরা হয়। এ বইয়ের আলোচনায় 'মডার্নিটি' এবং 'মডার্নিসম' অর্থাৎ 'আধুনিকতা' এবং 'আধুনিকতাবাদ'-এর মতো শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে এই ব্যাপক অর্থে। বিস্তারিত জানার জন্য, 'মডার্নিটি' অধ্যায় দ্রষ্টব্য। -অনুবাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00