📘 সফল মানব > 📄 প্রকৃত সফল মানব

📄 প্রকৃত সফল মানব


সফল মানব অনেক আছে এ পৃথিবীতে। কিন্তু প্রকৃত দৃষ্টিতে দেখলে দেখা যাবে, আসলে তারা অসফল। বহুমুখী সাফল্যের অধিকারী হয়েও বাস্তবে সে বিফল মনোরথ। অধিকাংশ মানুষের সাফল্য এক শতাব্দীব্যাপী। আসলে তাদের বিশ্বাসই শতাব্দীকালীন। মরণের পরেও যে অন্তহীন শতাব্দীর জীবন আছে, তা তারা বিশ্বাস করে না অথবা বিশ্বাস করলেও সঠিকভাবে করে না অথবা সঠিকভাবে করলেও তার জন্য প্রস্তুতি নেয় না এবং সে জীবনে সাফল্যের জন্য কোন প্রয়াস চালাতে অনুপ্রাণিত হয় না।

আমরা যারা পরকালে বিশ্বাস রাখি, তাদের প্রকৃত সাফল্য হল পরকালে। পরকালের সাফল্যই প্রকৃত সাফল্য। সে সাফল্য কাদের জন্য? মহান আল্লাহ তার উত্তর দিয়েছেন।

যারা মু'মিন অবস্থায় সৎকর্ম সম্পাদন করবে: মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ (۱) الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ (۲) وَالَّذِينَ هُمْ عَنْ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ (۳) وَالَّذِينَ هُمْ لِلزَّكَاةِ فَاعِلُونَ (٤) وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ (٥) إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ (٦) فَمَنْ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُوْلَئِكَ هُمْ الْعَادُونَ (۷) وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ (۸) وَالَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ (۹) أُوْلَئِكَ هُمُ الْوَارِثُونَ (۱۰) الَّذِينَ يَرِثُونَ الْفِرْدَوْسَ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} (۱۱) المؤمنون
"অবশ্যই বিশ্বাসিগণ সফলকাম হয়েছে। যারা নিজেদের নামাযে বিনয়-নম্র। যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ হতে বিরত থাকে। যারা যাকাত দানে সক্রিয়। যারা নিজেদের যৌন অঙ্গকে সংযত রাখে। নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত; এতে তারা নিন্দনীয় হবে না। সুতরাং কেউ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে, তারা হবে সীমালংঘনকারী। এবং যারা তাদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। আর যারা নিজেদের নামাযে যত্নবান থাকে। তারাই হবে উত্তরাধিকারী। উত্তরাধিকারী হবে ফিরদাউসের; যাতে তারা চিরস্থায়ী হবে।" (মু'মিনুনঃ ১-১১)

الم (১) ذَلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ (২) الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ (۳) وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ (٤) أُوْلَئِكَ عَلَى هُدًى مِّن رَّبِّهِمْ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (৫) البقرة
"আলিফ লা-ম মী-ম। এ গ্রন্থ; (কুরআন) এতে কোন সন্দেহ নেই, সাবধানীদের জন্য এ (গ্রন্থ) পথ-নির্দেশক। যারা অদেখা বিষয়ে বিশ্বাস করে, যথাযথভাবে নামায পড়ে ও তাদেরকে যা প্রদান করেছি, তা হতে দান করে। এবং তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে ও তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তাতে যারা বিশ্বাস করে ও পরলোকে যারা নিশ্চিত বিশ্বাসী। তারাই তাদের প্রতিপালকের নির্দেশিত পথে রয়েছে এবং তারাই সফলকাম।” (বাক্বারাহঃ ১-৫)

الم (১) تِلْكَ آيَاتُ الْكِتَابِ الْحَكِيمِ (۲) هُدًى وَرَحْمَةً لِلْمُحْسِنِينَ (۳) الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ بِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ (٤) أُوْلَئِكَ عَلَى هُدًى مِّن رَّبِّهِمْ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (৫) سورة لقمان
"আলিফ, লাম, মীম; এগুলি জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থের বাক্য, সৎকর্মপরায়ণদের জন্য পথনির্দেশ ও করুণা স্বরূপ; যারা যথাযথভাবে নামায পড়ে, যাকাত দেয় ও পরলোকে নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে। ওরাই ওদের প্রতিপালক কর্তৃক নির্দেশিত পথে আছে এবং ওরাই সফলকাম।” (লুকমানঃ ১-৫)

{وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ مَاذَا أَجَبْتُمُ الْمُرْسَلِينَ (٦٥) فَعَمِيَتْ عَلَيْهِمُ الْأَنْبَاءُ يَوْمَئِذٍ فَهُمْ لَا يَتَسَاءَلُونَ (٦٦) فَأَمَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَعَسَى أَن يَكُونَ مِنَ الْمُفْلِحِينَ} (٦٧)
"সেদিন আল্লাহ ওদেরকে ডেকে বলবেন, 'তোমরা রসূলগণকে কী জবাব দিয়েছিলে?' সেদিন তাদের সকল দলীল বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং তারা একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদও করতে পারবে না। তবে যে ব্যক্তি তওবা করে, ঈমান আনয়ন করে ও সৎকাজ করে, সে অবশ্যই সফলকাম হবে।” (ক্বাস্বাস্বঃ ৬৫-৬৭)

যারা আত্মশুদ্ধি করবে: মহান আল্লাহ বলেছেন,
قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَاهَا (۹) وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا } (۱۰) سورة الشمس
"সে সফলকাম হবে, যে তা (আত্মা) কে পরিশুদ্ধ করবে এবং সে ব্যর্থ হবে, যে তাকে কলুষিত করবে।” (শাম্স: ৯-১০)

যারা (লোককে) কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎকার্যের নির্দেশ দেবে ও অসৎ কার্য থেকে নিষেধ করবে: মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (١٠٤) سورة آل عمران
"তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা (লোককে) কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎকার্যের নির্দেশ দেবে ও অসৎ কার্য থেকে নিষেধ করবে। আর এ সকল লোকই হবে সফলকাম।" (আলে ইমরানঃ ১০৪)

যারা সর্বশেষ নবী ও সর্বশেষ গ্রন্থ কুরআনের অনুসারী হবেঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ فَالَّذِينَ آمَنُواْ بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنزِلَ مَعَهُ أُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (١٥٧) سورة الأعراف
"যারা নিরক্ষর রসূল ও নবীর অনুসরণ করে, যার উল্লেখ তওরাত ও ইঞ্জীল যা তাদের নিকট আছে তাতে লিপিবদ্ধ পায়, যে তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎকাজে নিষেধ করে, যে তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহকে বৈধ করে ও অপবিত্র বস্তুসমূহকে অবৈধ করে এবং যে তাদের ভার ও বন্ধন যা তাদের উপর ছিল (তা হতে) তাদেরকে মুক্ত করে। সুতরাং যারা তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং যে আলো তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে তার অনুসরণ করে, তারাই হবে সফলকাম।” (আ'রাফঃ ১৫৭)

যারা আল্লাহর রাস্তায় হিজরত ও জিহাদ করবে: মহান আল্লাহ বলেছেন,
{الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِندَ اللَّهِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ} (٢٠) سورة التوبة
"যারা ঈমান এনেছে, (দ্বীনের জন্য স্বদেশত্যাগ) হিজরত করেছে এবং নিজেদের মাল ও জান দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর নিকট মর্যাদায় বড়। আর তারাই হল সফলকাম।” (তাওবাহঃ ২০)

{لَكِنِ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ جَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ وَأُوْلَئِكَ لَهُمُ الْخَيْرَاتُ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (৮৮) سورة التوبة
"কিন্তু রসূল ও তার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছিল, তারা নিজেদের ধন ও প্রাণ দ্বারা জিহাদ করল; তাদেরই জন্য রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ এবং তারাই হচ্ছে সফলকাম।” (তাওবাহঃ ৮৮)

যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে: মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَن يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (٥١) وَمَن يُطِيعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَخْشَ اللَّهَ وَيَتَّقْهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ } (৫২) سورة النور
"যখন বিশ্বাসীদেরকে তাদের মধ্যে মীমাংসা ক'রে দেওয়ার জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের দিকে আহবান করা হয়, তখন তারা তো কেবল এ কথাই বলে, 'আমরা শ্রবণ করলাম ও মান্য করলাম।' আর ওরাই হল সফলকাম। যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর শাস্তি হতে সাবধান থাকে, তারাই হল কৃতকার্য।” (নূরঃ ৫১-৫২)

যারা আত্মীয়-স্বজন, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরের অধিকার আদায় করবেঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ ذَلِكَ خَيْرٌ لِّلَّذِينَ يُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (৩৮) سورة الروم
"অতএব আত্মীয়-স্বজনকে, অভাবগ্রস্ত এবং মুসাফিরকে তাদের প্রাপ্য দান কর। এ যারা আল্লাহর মুখমন্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) কামনা করে, তাদের জন্য শ্রেয় এবং তারাই সফলকাম।” (রুমঃ ৩৮)

যারা ঈমানী বন্ধনের উপর আত্মীয়তার বন্ধনকে প্রাধান্য দেবে নাঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُوْلَئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ وَأَيَّدَهُم بِرُوحٍ مِّنْهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ أُوْلَئِكَ حِزْبُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (২২) سورة المجادلة
"তুমি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায় পাবে না, যারা ভালবাসে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচারীদেরকে; হোক না এই বিরুদ্ধাচারীরা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা তাদের জাতি-গোত্র। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর পক্ষ হতে রূহ (জ্যোতি ও বিজয়) দ্বারা। তিনি তাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে; যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রেখো যে, আল্লাহর দলই সফলকাম।” (মুজাদালাহঃ ২২)

যারা মহান আল্লাহর তাক্বওয়া অবলম্বন করবে: মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَيُنَجِّي اللَّهُ الَّذِينَ اتَّقَوْا بِمَفَازَتِهِمْ لَا يَمَسُّهُمُ السُّوءُ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ} (٦١) الزمر "আল্লাহ সাবধানীদেরকে তাদের সাফল্য সহ উদ্ধার করবেন; অমঙ্গল তাদেরকে স্পর্শ করবে না এবং তারা দুঃখও পাবে না।" (যুমারঃ ৬১)

{إِنَّ لِلْمُتَّقِينَ مَفَازًا } (۳۱) سورة النبأ "নিশ্চয়ই আল্লাহভীরুদের জন্যই রয়েছে সফলতা।” (নাবাঃ ৩১)

যারা কার্পণ্যমুক্ত হবেঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَالَّذِينَ تَبَوَّؤُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِن قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (9) سورة الحشر
"(মুহাজিরদের আগমনের) পূর্বে যারা এ নগরী (মদীনা) তে বসবাস করেছে ও বিশ্বাস স্থাপন করেছে, তারা মুহাজিরদেরকে ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেওয়া হয়েছে, তার জন্য তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না, বরং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তারা (তাদেরকে) নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয়। আর যাদেরকে নিজ আত্মর কার্পণ্য হতে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম।” (হাশ্রঃ ৯)

{فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَأَنفِقُوا خَيْرًا لِّأَنفُسِكُمْ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (١٦) سورة التغابن
"তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর এবং শোনো, আনুগত্য কর ও ব্যয় কর, তোমাদের নিজেদেরই কল্যাণ হবে। আর যারা অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত, তারাই সফলকাম।” (তাগাবুনঃ ১৬)

কিয়ামতে যাদের নেকীর পাল্লা ভারী হবে : মহান আল্লাহ বলেছেন,

{فَأَمَّا مَن ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (৮) সূরা আল-আ’রাফ
“সেদিন ওজন ঠিকঠাক করা হবে, সুতরাং যাদের ওজন ভারী হবে, তারাই সফলকাম হবে।” (আল আ’রাফ: ৮)

{فَإِذَا نُفِخَ فِي الصُّورِ فَلا أَنسَابَ بَيْنَهُمْ يَوْمَئِذٍ وَلا يَتَسَاءلُونَ (১০১) فَمَن ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (১০২) وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُوْلَئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنفُسَهُمْ فِي جَهَنَّمَ خَالِدُونَ} (১০৩) সূরা মু’মিনুন
“যেদিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে, সেদিন পরস্পরের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না এবং একে অপরের খোঁজ-খবর নেবে না। সুতরাং যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই সফলকাম। আর যাদের পাল্লা হাল্কা হবে, তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে; তারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে।” (মু’মিনুনঃ ১০১-১০৩)

যারা কিয়ামতে হাশরে কাওসারের পানি পান করতে পারবে : যারা ২শ’ হ’তে কাওসারের পানি পান করতে পারবে, তারা অবশ্যই সফল হবে। এ কথা বলেছেন মহানবী ﷺ । (সিহাহ সিত্তাহঃ ৩০৬-৩০৭)

যারা কিয়ামতে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে : মহান আল্লাহ বলেছেন,

{كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلاَّ مَتَاعُ الْغُرُورِ} (১৮৫) সূরা আলে ইমরান
“জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর কিয়ামতের দিনই তোমাদের কর্মফল পূর্নমাত্রায় প্রদান করা হবে। সুতরাং যাকে আগুন (দোযখ) থেকে দূরে রাখা হবে এবং (যা) বেহেস্তে প্রবেশলাভ করবে, সেই হবে সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।” (আলে ইমরানঃ ১৮৫)

{تَلْفَحُ وُجُوهَهُمُ النَّارُ وَهُمْ فِيهَا كَالِحُونَ (১০৪) أَلَمْ تَكُنْ آيَاتِي تُتْلَى عَلَيْكُمْ فَكُنتُم بِهَا تُكَذِّبُونَ (১০৫) قَالُوا رَبَّنَا غَلَبَتْ عَلَيْنَا شِقْوَتُنَا وَكُنَّا قَوْمًا ضَالِّينَ (১০৬) رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْهَا فَإِنْ عُدْنَا فَإِنَّا ظَالِمُونَ (১০৭) قَالَ اخْسَؤُوا فِيهَا وَلا تُكَلِّمُونِ (১০৮) إِنَّهُ كَانَ فَرِيقٌ مِّنْ عِبَادِي يَقُولُونَ رَبَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الرَّاحِمِينَ (১০৯) فَاتَّخَذْتُمُوهُمْ سِخْرِيًّا حَتَّى أَنسَوْكُمْ ذِكْرِي وَكُنتُم مِّنْهُمْ تَضْحَكُونَ (১১০) إِنِّي جَزَيْتُهُمُ الْيَوْمَ بِمَا صَبَرُوا أَنَّهُمْ هُمُ الْفَائِزُونَ} (১১১) সূরা মু’মিনুন

"আগুন তাদের মুখমন্ডলকে দগ্ধ করবে এবং তারা সেখানে থাকবে বীভৎস চেহারায়। তোমাদের নিকট কি আমার আয়াতসমূহ আবৃত্তি করা হতো না? অথচ তোমরা সেগুলিকে মিথ্যা মনে করতে। তারা বলবে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! দুর্ভাগ্য আমাদেরকে পেয়ে বসেছিল এবং আমরা ছিলাম এক বিভ্রান্ত সম্প্রদায়। হে আমাদের প্রতিপালক! এই আগুন হতে আমাদেরকে উদ্ধার কর; অতঃপর আমরা যদি পুনরায় অবিশ্বাস করি, তাহলে অবশ্যই আমরা সীমালংঘনকারী হব।' আল্লাহ বলবেন, 'তোমরা হীন অবস্থায় এখানেই থাক এবং আমার সাথে কোন কথা বলো না। আমার বান্দাদের মধ্যে একদল ছিল যারা বলত, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা বিশ্বাস করেছি; সুতরাং তুমি আমাদেরকে ক্ষমা ক'রে দাও ও আমাদের উপর দয়া কর, তুমি তো দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু। কিন্তু তাদেরকে নিয়ে তোমরা এতো ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে যে, তা তোমাদেরকে আমার কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল; তোমরা তো তাদেরকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টাই করতে। আমি আজ তাদেরকে তাদের ধৈর্যের কারণে এমনভাবে পুরস্কৃত করলাম যে, তারাই হল সফলকাম।' (মু'মিনুনঃ ১০৪-১১১)

{لَا يَسْتَوِي أَصْحَابُ النَّارِ وَأَصْحَابُ الْجَنَّةِ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمُ الْفَائِزُونَ} (২০) "জাহান্নামের অধিবাসী এবং জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতের অধিবাসীরাই সফলকাম।” (হাশ্রঃ ২০)

প্রকৃত সাফল্য লাভের কারণ রয়েছে বহু। তার মধ্যে কতিপয় কারণ নিম্নরূপঃ
১। তাক্বওয়া, পরহেযগারি বা আল্লাহর ভয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,

{يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْأَهِلَّةِ قُلْ هِيَ مَوَاقِيتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجِّ وَلَيْسَ الْبِرُّ بِأَنْ تَأْتُوا الْبُيُوتَ مِن ظُهُورِهَا وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَن اتَّقَى وَأْتُواْ الْبُيُوتَ مِنْ أَبْوَابِهَا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} "লোকে তোমাকে নতুন চাঁদ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে, (কেন তা বাড়ে এবং কমে) বল, তা লোকেদের (কাজ-কারবারের) এবং হজ্জের জন্য সময় নির্দেশক। পিছন দিক দিয়ে ঘরে প্রবেশ করা পুণ্যের কাজ নয়; কিন্তু পুণ্যের কাজ হল সংযম অবলম্বন করে চলা। অতএব তোমরা দরজাসমূহ দিয়েই ঘরে প্রবেশ কর এবং আল্লাহকে ভয় কর, তবেই তোমরা সফলতা পাবে।” (বাক্বারাহঃ ১৮৯)

{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا الرِّبَا أَضْعَافًا مُّضَاعَفَةً وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} "হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ক্রমবর্ধমান হারে (দ্বিগুণ-চতুর্গুণ বা চক্রবৃদ্ধি হারে) সুদ খেয়ো না, এবং আল্লাহকে ভয় কর, তাহলে তোমরা সফলকাম হতে পারবে।” (আলে ইমরানঃ ১৩০)

{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (۲۰۰)

“হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর। ধৈর্য ধারণে প্রতিযোগিতা কর এবং (শত্রুর বিপক্ষে) সদা প্রস্তুত থাক; আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (আলে ইমরানঃ ২০০)

{قُل لَّا يَسْتَوِي الْخَبِيثُ وَالطَّيِّبُ وَلَوْ أَعْجَبَكَ كَثْرَةُ الْخَبِيثِ فَاتَّقُوا اللَّهَ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (১০০) সূরা আল-মায়েদা

“বল, ‘অপবিত্র ও পবিত্র সমান নয়; যদিও অপবিত্রের আধিক্য তোমাকে চমৎকৃত করে। সুতরাং হে বুদ্ধিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (মায়েদাহঃ ১০০)

{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ وَجَاهِدُوا فِي سَبِيلِهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (৩৫) সূরা আল-মায়েদা

“হে বিশ্বাসিগণ! আল্লাহকে ভয় কর, তাঁর নৈকট্য লাভের উপায় অন্বেষণ কর ও তাঁর পথে সংগ্রাম কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (মায়েদাহঃ ৩৫)

২। শয়তানের কর্মকান্ড থেকে দূরে থাকা। মহান আল্লাহ বলেছেন,

{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (৯০) সূরা আল-মায়েদা

“হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (মায়েদাহঃ ৯০)

৩। মহান আল্লাহর অনুগ্রহ ও নেয়ামতরাশি স্মরণ করা (তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা)। তিনি তাঁর নবী -এর কথা উল্লেখ ক'রে বলেছেন,

{أَوَعَجِبْتُمْ أَن جَاءَكُمْ ذِكْرٌ مِّن رَّبِّكُمْ عَلَى رَجُلٍ مِّنكُمْ لِيُنذِرَكُمْ وَاذْكُرُوا إِذْ جَعَلَكُمْ خُلَفَاء مِن بَعْدِ قَوْمِ نُوحٍ وَزَادَكُمْ فِي الْخَلْقِ بَسْطَةً فَاذْكُرُوا آلَاءِ اللَّهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ}

“তোমরা কি আশ্চর্যবোধ করছ যে, তোমাদেরই একজনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে তোমাদের নিকট উপদেশ এসেছে, যাতে সে তোমাদেরকে সতর্ক করে? স্মরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে নূহের সম্প্রদায়ের পরে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন এবং তোমাদেরকে অবয়ব ও শক্তিতে (অন্য লোক অপেক্ষা অধিকতর) সমৃদ্ধ করেছেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর, হয়তো তোমরা সফলকাম হবে।" (আ'রাফঃ ৬৯)

৪। বেশি বেশি মহান আল্লাহর যিক্র করা। তিনি বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمْ فِئَةً فَاثْبُتُوا وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (٤٥)
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা যখন কোন দলের সম্মুখীন হবে, তখন অবিচল থাক এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।” (আনফালঃ ৪৫)

{فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ } (١٠) سورة الجمعة "অতঃপর নামায সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর ও আল্লাহকে অধিকরূপে স্মরণ কর; যাতে তোমরা সফলকাম হও।” (জুমুআহঃ ১০)

৫। ভালো কাজ করা, কল্যাণময় কাজ করা। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ارْكَعُوا وَاسْجُدُوا وَاعْبُدُوا رَبَّكُمْ وَافْعَلُوا الْخَيْرَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} "হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা রুকু কর, সিজদা কর এবং তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত কর ও সৎকর্ম কর; যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (হাজ্জঃ ৭৭)

৬। মহান আল্লাহর দিকে রুজু ও তওবা করা। {وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (۳۱) سورة النور "হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (নূর: ৩১)

📘 সফল মানব > 📄 ইহ-পরকালের সফলতা

📄 ইহ-পরকালের সফলতা


নিশ্চয় মু'মিনের প্রধান লক্ষ্য হল পরকাল ও তার সাফল্য। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সে ইহকাল মোটেই চায় না। সে দুনিয়ার সাফল্য চায়, তবে দুনিয়াকে আখেরাতের উপর প্রাধান্য দেয় না এবং ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার যে সাফল্য চিরস্থায়ী আখেরাতের সাফল্যকে প্রভাবান্বিত করে অথবা নষ্ট করে, সে সাফল্য অবশ্যই সে চায় না।

এ দুনিয়ায় বহু মানুষ আছে, যারা কেবল বর্তমান জীবনে বিশ্বাস রাখে এবং পার্থিব জীবনের সাফল্য ও কল্যাণকেই সকল চাওয়া-পাওয়া ধারণা করে। মহান আল্লাহ তাদের অবস্থা ও পরিণতি বর্ণনা ক'রে বলেছেন, {فَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا وَمَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاق (۲۰۰)
"এমন কিছু লোক আছে যারা বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে পৃথিবীতে (সওয়াব) দান কর।' বস্তুতঃ তাদের জন্য পরকালে কোন অংশ নেই।” (বাক্বারাহঃ ২০০)

কিন্তু পরপরই তাঁর প্রতি বিশ্বাসী ও পরকালের প্রতি ঈমানদার মানুষের অবস্থার বর্ণনা ও তার পরিণতির কথা উল্লেখ ক'রে বলেছেন,
((وَمِنْهُم مَّن يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ (۲۰۱) أُولَئِكَ لَهُمْ نَصِيبٌ مِّمَّا كَسَبُوا وَاللَّهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ} (۲۰۲) سورة البقرة
"পক্ষান্তরে তাদের মধ্যে (এমন কিছু লোক আছে) যারা বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ইহকালে কল্যাণ দান কর এবং পরকালেও কল্যাণ দান কর। আর আমাদেরকে দোযখ-যন্ত্রণা থেকে রক্ষা কর।' তারা যা অর্জন করেছে, তার প্রাপ্ত অংশ তাদেরই। বস্তুতঃ আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর।” (বাক্বারাহঃ ২০১-২০২)

বিশাল ধনবান কারুনকেও উপদেশ দিয়ে তার জাতির সৎ লোকেরা বলেছিল, {لَا تَفْرَحْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ (٧٦) وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسِن كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْعُ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ) (۷۷) سورة القصص
'দম্ভ করো না, আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তার মাধ্যমে পরলোকের কল্যাণ অনুসন্ধান কর। আর তুমি তোমার ইহলোকের অংশ ভুলে যেয়ো না। তুমি (পরের প্রতি) অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না।
আল্লাহ অবশ্যই বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না।' (কাস্বাস্বঃ ৭৬-৭৭)

পার্থিব জীবনের শোভা-সৌন্দর্য মু'মিনদের জন্য ত্যাজ্য ও নিষিদ্ধ নয়। নিষিদ্ধ হল, তাতে মুগ্ধ ও আসক্ত হয়ে পড়া এবং পরকালের জীবনের উপর ইহকালের ক্ষণস্থায়ী জীবনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া অথবা পরকালের জীবন বিস্মৃত হওয়া। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ قُلْ هِي لِلَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ} (৩২)
"বল, 'আল্লাহ স্বীয় দাসদের জন্য যে সব সুশোভন বস্তু ও পবিত্র জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, তা কে নিষিদ্ধ করেছে?' বল, 'পার্থিব জীবনে বিশেষ করে কিয়ামতের দিনে এ সমস্ত তাদের জন্য, যারা বিশ্বাস করে।' এরূপে আমি জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বিবৃত করি।” (আ'রাফঃ ৩২)

এই পার্থিব সৌন্দর্য এবং হালাল ও পবিত্র জিনিসগুলো আসলে আল্লাহ ঈমানদারদের জন্যই সৃষ্টি করেছেন, যদিও কাফেররাও তার দ্বারা উপকারিতা এবং পরিতৃপ্তি লাভ ক'রে থাকে। বরং অনেক সময় পার্থিব সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগ করার ব্যাপারে তাদেরকে মুসলিমদের চেয়েও বেশী সফল দেখা যায়। তবে তা সাধারণ রীতিধারায় এবং সাময়িকভাবে। (অর্থাৎ, তারা তার হকদার বলে নয় এবং চিরস্থায়ীভাবে নয়।) এতে আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিগত ইচ্ছা ও হিকমতও আছে। কিন্তু কিয়ামতের দিন এ নিয়ামতসমূহ কেবল ঈমানদারদের জন্য হবে। কেননা, কাফেরদের উপর যেভাবে জান্নাত হারাম হবে, অনুরূপভাবে জান্নাতের যাবতীয় খাদ্য-পানিও তাদের জন্য হারাম হবে। (আহসানুল বায়ান)

আর প্রকৃত প্রস্তাবে মহান আল্লাহর কাছে পার্থিব জীবনের কোন মূল্য নেই। তাছাড়া এ পৃথিবী হল পরীক্ষাগার। তার জন্যই কাফেররা অস্বীকার ও অমান্য করেও এ জীবনে সাফল্য লাভ ক'রে থাকে। মহানবী বলেছেন,

(( لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ الله جَنَاحَ بَعُوضَةٍ ، مَا سَقَى كَافِراً مِنْهَا شَرْبَةً مَاءٍ )).

"যদি আল্লাহর নিকট মশার ডানার সমান দুনিয়ার (মূল্য বা ওজন) থাকত, তাহলে তিনি কোন কাফেরকে তার (দুনিয়ার) এক ঢোক পানিও পান করাতেন না।” (তিরমিযী ২৩২০, ইবনে মাজাহ ৪১১০, মিশকাত ৫১৭৭ নং)

সুতরাং পার্থিব সাফল্য মুসলিমের কাম্য, তবে তা প্রধান কাম্য নয়। পৃথিবীর এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে সুন্দরভাবে জীবনধারণের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ সামগ্রী পাওয়া গেলে, সেটাই বিরাট সাফল্য। সাময়িকভাবে বসবাস ক'রে ছেড়ে যেতে হবে এমন মুসাফিরখানায় পরিমিত সুখসামগ্রী লাভে ধন্য হওয়াটাই সব কিছু পাওয়া। এই জন্য মহানবী -এর মানবের পার্থিব সাফল্য হল, যথেষ্ট পরিমাণের সামগ্রী লাভ ও তাতে মনের তুষ্টি। তিনি বলেছেন,

(( قَدْ أَفْلَحَ مَنْ أَسْلَمَ ، وَكَانَ رِزْقُهُ كَفَافاً ، وَقَنَّعَهُ اللَّهُ بِمَا آتَاهُ )).

"সে ব্যক্তি সফলকাম, যে ইসলাম গ্রহণ করেছে, তাকে পরিমিত রুযী দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন, তাতে তাকে তুষ্ট করেছেন।” (মুসলিম ২৪৭৩নং)

পার্থিব সাফল্য হল, সার্বিক নিরাপত্তা, শারীরিক সুস্থতা এবং পরিমিত পানাহারের ব্যবস্থা। এ সাফল্য যার লাভ হয়, সে হয় দুনিয়ার রাজা। মহানবী বলেছেন,

((مَنْ أَصْبَحَ مِنْكُمْ آمِنًا فِي سِرْبِهِ مُعَافَى فِي جَسَدِهِ عِنْدَهُ قُوتُ يَوْمِهِ فَكَأَنَّمَا حِيزَتْ لَهُ الدُّنْيا بحذافيرها)).

"তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার ঘরে অথবা গোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপদে ও সুস্থ শরীরে সকাল করেছে এবং তার কাছে প্রতি দিনের খাবার আছে, তাকে যেন পার্থিব সমস্ত সম্পদ দান করা হয়েছে।” (তিরমিযী ২৩৪৬, ইবনে মাজাহ ৪১৪১নং)

শরীয়ত মুসলিমকে বারবার সতর্ক করে, দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। প্রকৃত সাফল্য চিরস্থায়ী সাফল্য, আখেরাতের সাফল্য। তবে পার্থিব সাফল্যকে দৃষ্টিচ্যুত করা যাবে না এবং তাতে পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে পারলৌকিক সাফল্যকে অবজ্ঞা করা যাবে না।

উভয় সাফল্য লাভ হলে তো সোনায় সোহাগা বটেই। কিন্তু দুই সাফল্যের মাঝে সংঘর্ষ বাধলে পারলৌকিক সাফল্য যেন প্রাধান্য পায় মু'মিনের কাছে।

দুনিয়ার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হল একটি পুণ্যময়ী জীবন-সঙ্গিনী। এমন সঙ্গিনী নির্বাচনের ক্ষেত্রে শরীয়তের নির্দেশ হল,

تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لأَرْبَعِ لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَلِجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا فَاظْفَرُ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ».
"মহিলার চারটি জিনিস দেখে বিবাহ করা হয়; তার সম্পদ, উচ্চ বংশ, রূপ ও দ্বীন দেখে। তুমি দ্বীনদার মহিলা পেতে সফল হও, তোমার হাত ধূলিধূসরিত হোক।” (বুখারী ৫০৯০, মুসলিম ৩৭০৮-নং)

((إِذَا أَتَاكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ خُلُقَهُ وَدِينَهُ فَزَوِّجُوهُ ، إِلَّا تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ عريض)).
"তোমাদের নিকট যখন এমন ব্যক্তি (বিবাহের পয়গাম নিয়ে) আসে; যার দ্বীন ও চরিত্রে তোমরা মুগ্ধ, তখন তার সাথে (মেয়ের) বিবাহ দাও। যদি তা না কর তাহলে পৃথিবীতে ফিৎনা ও মহাফাসাদ সৃষ্টি হয়ে যাবে।” (তিরমিযী ১০৮৪, ইবনে মাজাহ ১৯৬৭, মিশকাত ৩০৯০, সিঃ সহীহাহ ১০২২নং)

এ হল দ্বীনদারীর পছন্দ। কিন্তু দুনিয়াদারী পছন্দ হল, দ্বীন থাক, বংশ দেখ, রূপ-সৌন্দর্য দেখ এবং কত কী পাওয়া যাবে দেখ। নামায, চরিত্র, পর্দা, দ্বীনদারী দেখা অপ্রয়োজন।

অনুরূপ জামাই পছন্দের সময়ও দুনিয়াদারীর দৃষ্টিভঙ্গি। দ্বীনদারী বা নামাযাদি দেখার প্রয়োজন নেই। ধনী হলেই হবে। এই ধরনের কনের মন বলে, 'রসের নাগর, রূপের সাগর, যদি ধন পাই, আদর ক'রে করি তারে বাপের জামাই।'

বাচ্চাদেরকে পড়াশোনা করতে দেওয়ার সময়েও লক্ষ্য করতে পারেন। অধিকাংশ বাপ-মা তার পশ্চাতে কী চায়? দ্বীন না দুনিয়া? নাকি উভয়ই? অধিকাংশ চায় দুনিয়া, চাকরি, অর্থোপার্জন।

অনেকে উভয়টাই চায়।

খাঁটিভাবে দ্বীন চায় কয় জন?

অনেকে দুনিয়ার মাথায় পা রেখে দ্বীন শিক্ষা করে। আর এমন কাজের কাজী নেহাতই কম। অধিকাংশ মানুষ দ্বীনের মাথায় পা রেখে দুনিয়া কামাতে চায়, মাদ্রাসায় থেকে-খেয়ে স্কুলের পড়া পড়ে ও পরীক্ষা দেয়। যাকাত-ফিতরা খেয়ে দ্বীনের খাদেম না হয়ে দুনিয়ার খাদেম হয়।

কিন্তু যারা দুনিয়ার সাফল্যের জন্য দ্বীনকে ব্যবহার করে, তাদের পরিণাম স্পষ্ট। মহানবী বলেছেন,

(( مَنْ تَعَلَّمَ عِلْماً مِمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللهِ - عَزَّ وَجَلَّ - لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلَّا لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضاً مِنَ الدُّنْيَا ، لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الجَنَّةِ يَوْمَ القِيَامَةِ )).

"যে বিদ্যা দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়, তা যদি একমাত্র সামান্য পার্থিব স্বার্থ লাভের উদ্দেশ্যে কেউ শিক্ষা করে, তাহলে সে কিয়ামতের দিনে জান্নাতের সুগন্ধটুকুও পাবে না।” (আবু দাউদ ৩৬৬৬নং)

তিনি আরো বলেছেন,

بَشِّرْ هَذِهِ الْأُمَّةَ بِالسَّنَاءِ وَالتَّمْكِينِ فِي الْبَلَادِ وَالنَّصْرِ وَالرِّفْعَةِ فِي الدِّينِ وَمَنْ عَمِلَ مِنْهُمْ بِعَمَلِ الْآخِرَةِ لِلدُّنْيَا فَلَيْسَ لَهُ فِي الْآخِرَةِ نَصِيبٌ)).
"এই উম্মতকে স্বাচ্ছন্দ্য, সমুন্নতি, দ্বীন সহ সুউচ্চ মর্যাদা, দেশসমূহে তাদের ক্ষমতা বিস্তার এবং বিজয়ের সুসংবাদ দাও। কিন্তু যে ব্যক্তি পার্থিব কোন স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে পরকালের কর্ম করবে তার জন্য পরকালে প্রাপ্য কোন অংশ নেই।” (আহমদ ২১২২৪, ইবনে মাজাহ, হাকেম, বাইহাকীর শুআবুল ঈমান ৬৮-৩৩ ইবনে হিব্বান ৪০৫,, সহীহ তারগীব ২ ১নং)

📘 সফল মানব > 📄 প্রকৃত সাফল্য, পরকালের সাফল্য

📄 প্রকৃত সাফল্য, পরকালের সাফল্য


এ ব্যক্তি দুনিয়ায় সফল নয়। মানুষের যে প্রয়োজনীয় জিনিস দুনিয়াতে লাভ করতে হয়, তা সে লাভ করেনি। না সে শিক্ষালাভে সফল, না ধন ও সম্মানলাভে কৃতকার্য। তবে সে এমন একটি জিনিসকে আঁকড়ে ধরে জীবনযাপন করেছে, যার বদৌলতে সে নিশ্চিতরূপে মরণের পর কৃতকার্য হবে।

সে তার ঈমানকে বিশুদ্ধ রেখেছে। মানবমন্ডলীর নানা মতবাদের ঝড়ে তার ঈমান উড়ে যায়নি। ক্ষণিকের এ সংসারের নানা প্রলুব্ধকারী জিনিসে তার ঈমান বিকৃত ও কলুষিত হয়নি।

সে বিশ্বস্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস রেখেছে এবং তাঁর প্রেরিত দ্বীনের উপর যথাসাধ্য অবিচল থেকেছে। ঈমানের সকল আরকানকে সে মনেপ্রাণে শুদ্ধরূপে বিকশিত করেছে। পুনরুত্থানে যথাযথ বিশ্বাস রেখেছে। পরকালের অনন্ত জীবন তথা জান্নাত-জাহান্নামে বিশ্বাস রেখেছে। শির্ক থেকে দূরে থেকেছে। যথাসাধ্য মহান প্রতিপালকের ইবাদত করেছে। ফরযসমূহ পালন করেছে, হারাম বর্জন করেছে এবং যথাসাধ্য অন্যান্য বিধান মেনে চলার চেষ্টা করেছে।

এ মানুষ দুনিয়াতে নামহীন হলেও, দুনিয়াতে তার নাম উচ্চারণকারী কেউ না থাকলেও, পার্থিব সকল ক্ষেত্রে বিফল হলেও, মরণের পর আখেরাতে সে সফল হবে।

দুনিয়ার ধন-সম্মানে অকৃতকার্য এবং আখেরাতে কৃতকার্য ব্যক্তি যে শ্রেষ্ঠ, সে কথা পরিষ্কার হয় নিম্নের হাদীস দ্বারা, সাহল ইবনে সা'দ সায়েদী বলেন, এক ব্যক্তি নবী -এর পাশ দিয়ে পার হয়ে গেল, তখন তিনি তাঁর নিকট উপবিষ্ট একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, "এ ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার মন্তব্য কী?” সে বলল, 'এ ব্যক্তি তো এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক। আল্লাহর কসম! সে কোথাও বিয়ের প্রস্তাব দিলে তা গ্রহণযোগ্য হবে এবং কারো জন্য সুপারিশ করলে তা কবুল করা হবে।' তখন রাসূলুল্লাহ নীরব থাকলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে আর এক ব্যক্তি পার হয়ে গেল। তিনি ঐ (উপবিষ্ট) লোকটিকে বললেন, "এ লোকটির ব্যাপারে তোমার অভিমত কী?” সে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! এ তো একজন গরীব মুসলমান। সে এমন ব্যক্তি যে, সে বিয়ের প্রস্তাব দিলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না, কারো জন্য সুপারিশ করলে তা কবুল করা হবে না এবং সে কোন কথা বললে, তার কথা শ্রবণযোগ্য হবে না।' তখন রাসূলুল্লাহ বললেন,

(( هَذَا خَيْرٌ مِنْ مِلءِ الأَرْضِ مِثْلَ هَذَا )) .

"এ ব্যক্তি দুনিয়া ভর্তি ঐরূপ লোকদের চাইতে বহু উত্তম।” (বুখারী ৫০৯১, ৬৪৪৭, ইবনে মাজাহ ৪১২০নং)
তিনি আরো বলেছেন,

(( رُبَّ أَشْعَتَ أَغْبَرَ مَدْفُوعِ بِالأَبْوابِ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لأَبَرَّهُ.

"বহু এমন লোকও আছে যার মাথা উষ্কখুষ্ক ধুলোভরা, যাদেরকে দরজা থেকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। (কিন্তু সে আল্লাহর নিকট এত প্রিয় যে,) সে যদি আল্লাহর উপর কসম খায়, তাহলে আল্লাহ তা পূর্ণ ক'রে দেন।” (মুসলিম ৬৮৪৮, ৭৩৬৯নং)

দুনিয়ায় অধিকাংশ অসফল ব্যক্তিবর্গ পরকালে মহাসাফল্য লাভ করবে, সে কথা মহানবী-এর একটি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়। তিনি বলেছেন,

(( قُمْتُ عَلَى بَابِ الجَنَّةِ ، فَإِذَا عَامَّةُ مَنْ دَخَلَهَا المَسَاكِينُ ، وَأَصْحَابُ الجَدِّ مَحْبُوسُونَ ، غَيْرَ أَنَّ أَصْحَابَ النَّارِ قَدْ أُمِرَ بِهِمْ إِلَى النَّارِ ، وَقُمْتُ عَلَى بَابِ النَّارِ فَإِذَا عَامَّةُ مَنْ دَخَلَهَا النِّسَاءُ )).

"আমি জান্নাতের দরজায় দাঁড়ালাম। অতঃপর দেখলাম যারা জান্নাতে প্রবেশ করেছে তাদের অধিকাংশ গরীব-মিসকীন মানুষ। আর ধনবানদেরকে (তখনও হিসাবের জন্য) আটকে রাখা হয়েছে। পক্ষান্তরে (অন্যান্য) জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আর আমি জাহান্নামের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলাম যে, যারা তাতে প্রবেশ করেছে তাদের বেশীর ভাগই নারীর দল। (বুখারী ৫১৯৬, ৬৫৪৭, মুসলিম ৭১১৩নং)

বাহ্য দৃষ্টিতে অনেক মানুষকে সফল মনে করা হয়, অথচ প্রকৃত দৃষ্টিতে সে তা নয়। অনেক পিতামাতাই আছে, যারা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দিয়ে সন্তানের পার্থিব জীবনকে উজ্জ্বল ও সফল করতে চায় এবং পরকালের অনন্ত জীবন সম্বন্ধে উদাসীন থাকে অথবা দুনিয়ার জীবনকে তারা আখেরাতের জীবনের ওপর প্রাধান্য ও গুরুত্ব দেয়।

সেই জন্য তারা বিনামূল্যেও দ্বীন শিক্ষা দেয় না, যেহেতু তাতে দুনিয়া নেই, চাকরি নেই, অর্থ নেই। বরং দুনিয়া শিক্ষা দেয় এবং তার জন্য পরিশ্রম করে ও অর্থ ব্যয় করে, যেহেতু তাতে নোট আছে এবং জাগতিক মান-মর্যাদা আছে। সে ক্ষেত্রে তারা মুনাফিকদের মতো কাফেরদেরকেও অভিভাবক ও বন্ধু মানতে রাজি,

যেহেতু তাদের কাছে ধন ও মান আছে। অথচ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{بَشِّرِ الْمُنَافِقِينَ بِأَنَّ لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا (۱۳۸) الَّذِينَ يَتَّخِذُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاء مِن دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَيَبْتَغُونَ عِندَهُمُ الْعِزَّةَ فَإِنَّ العِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا} (۱۳۹) سورة النساء
"কপট (মুনাফিক) দেরকে শুভ সংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তদ শাস্তি! যারা বিশ্বাসীদের পরিবর্তে অবিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে। তারা কি তাদের নিকট সম্মান অনুসন্ধান করে? অথচ সমস্ত সম্মান তো আল্লাহরই।" (নিসাঃ ১৩৮-১৩৯)

কিন্তু যাদের ঈমানী দৃষ্টি আছে, তারা প্রকৃতত্ব বুঝে প্রকৃত সফলতা অনুধাবন করে এবং তার জন্য চেষ্টা ও প্রার্থনা করে।

বনী ইস্রাঈলের এক শিশু তার মায়ের দুধ পান করছিল। এমন সময় তার পাশ দিয়ে উৎকৃষ্ট সওয়ারীতে আরোহী এক সুদর্শন পুরুষ চলে গেল। তার মা দুআ ক'রে বলল, 'হে আল্লাহ! আমার ছেলেটিকে ওর মত করো।' শিশুটি তখনি মায়ের দুধ ছেড়ে দিয়ে সেই আরোহীর দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, 'হে আল্লাহ আমাকে ওর মত করো না।' তারপর মায়ের দুধের দিকে ফিরে দুধ চুষতে লাগল। আবু হুরাইরা বলেন, রাসূলুল্লাহ নিজের তর্জনী আঙ্গুলকে নিজ মুখে চুষে শিশুটির দুধ পান দেখাতে লাগলেন। আমি যেন তা এখনো দেখতে পাচ্ছি। পুনরায় (তাদের) পাশ দিয়ে একটি দাসীকে লোকেরা মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছিল। তারা বলছিল, 'তুই ব্যভিচার করেছিস, চুরি করেছিস!' আর দাসীটি বলছিল, 'হাসবিয়াল্লাহু অনি'মাল অকীল।' (আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট ও তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।) তা দেখে মহিলাটি দুআ করল, 'হে আল্লাহ! তুমি আমার ছেলেকে ওর মত করো না।' ছেলেটি সাথে সাথে মায়ের দুধ ছেড়ে দাসীটির দিকে তাকিয়ে বলল, 'হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ওর মত করো।' অতঃপর মা-বেটায় কথোপকথন করল। মা বলল, 'একটি সুন্দর আকৃতির লোক পার হলে আমি বললাম, হে আল্লাহ! তুমি আমার ছেলেকে ওর মত করো। তখন তুমি বললে, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ওর মত করো না। আবার ওরা ঐ দাসীকে নিয়ে পার হলে আমি বললাম, হে আল্লাহ! তুমি আমার ছেলেকে ওর মত করো না। কিন্তু তুমি বললে, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ওর মত করো! (এর কারণ কি?)' শিশুটি বলল, '(তুমি বাহির দেখে বলেছ, আর আমি ভিতর দেখে বলেছি।) ঐ লোকটি স্বৈরাচারী, তাই আমি বললাম, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ওর মত করো না। আর ঐ দাসীটির জন্য ওরা বলছে, তুই ব্যভিচার করেছিস, চুরি করেছিস, অথচ ও এ সব কিছুই করেনি। তাই আমি বললাম, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ওর মত করো।' (বুখারী ৩৪৩৬, ৬৬৭৩নং)

দুনিয়াদার মানুষ জাগতিক চাকচিক্য ও বিলাস-ব্যসনকে প্রাধান্য দেয়। সাফল্যের পুরস্কার-বিজয়ী হয়ে নিজেকে ধন্য মনে করে। বিজয়ের গ্লাস নিয়ে গর্বিত হয়। কিন্তু মনে রাখে না যে, কিয়ামতের এক গ্লাস হওয়ে কওসারের পানি পেয়ে বিজয়ী না হলে আসল জীবনের কোন আনন্দ নেই, বরং লাঞ্ছনা ও কষ্টে চিরজীবন অতিবাহিত হবে।

এ পৃথিবীর বহু বিঘা জমি লাভ ক'রে জমিদার হয়ে গর্ব লাভ করার কথা। কিন্তু বেহেশতের এক ইঞ্চি জমি যদি কেনা না হয়ে থাকে অথবা অনুদানে না পাওয়া যায়, তাহলে অবশিষ্ট অনন্তকালের জীবনে পা রাখার জন্য আগুন ছাড়া অন্য কোন জমি থাকবে না।

দুনিয়াদার ৭০-১০০ বছর বসবাস করার জন্য বাড়িটিকে বেশ সুন্দর ক'রে সাজায়-গোছায়। কিন্তু যে বাড়িতে তাকে কোটি-কোটি বছর বরং অনন্তকালের জন্য বসবাস করতে হবে, তা বানানো ও সুসজ্জিত করার প্রতি কোন ভ্রূক্ষেপ করে না। সুতরাং

تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ وَعَبْدُ الدَّرْهَم وَعْبَدُ الْخَمِيصَةِ إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ وَإِنْ لَمْ يُعْطَ سَخِطَ تَعِسَ وَانْتَكَسَ وَإِذَا شِيكَ فَلَا انْتَقَشَ طُوبَى لِعَبْدِ آخِذِ بِعِنَانِ فَرَسِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَشْعَتَ رَأْسُهُ مُغْبَرَّةٍ قَدَمَاهُ إِنْ كَانَ فِي الْحِرَاسَةِ كَانَ فِي الْحِرَاسَةِ وَإِنْ كَانَ فِي السَّاقَةِ كَانَ فِي السَّاقَةِ إِنْ اسْتَأْذَنَ لَمْ يُؤْذِنْ لَهُ وَإِنْ شَفَعَ لَمْ يُشَفَعْ)).
"ধ্বংস হোক দীনারের গোলাম, দিরহামের গোলাম ও উত্তম পোশাকের গোলাম (দুনিয়াদার)! যদি তাকে দেওয়া হয়, তাহলে সে সন্তুষ্ট হয়। আর না দেওয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়। সে ধ্বংস হোক, লাঞ্ছিত হোক! তার পায়ে কাঁটা বিঁধলে তা বের করতে না পারুক।

পক্ষান্তরে ঐ বান্দার জন্য সুসংবাদ, যে আল্লাহর পথে নিজের ঘোড়ার লাগাম ধরে প্রস্তুত থাকে। যার মাথার কেশ আলুথালু, যার পদযুগল ধূলিমলিন। তাকে পাহারার কাজে নিযুক্ত করলে, পাহারার কাজে নিযুক্ত থাকে। আর তাকে সৈন্যদলের পশ্চাতে (দেখাশোনার কাজে) নিয়োজিত করলে, সৈন্যদলের পশ্চাতে থাকে। যদি সে কারো সাক্ষাতের অনুমতি চায়, তাহলে তাকে অনুমতি দেওয়া হয় না এবং কারো জন্য সুপারিশ করলে, তার সুপারিশ গ্রহণ করা হয় না।” (বুখারী ২৮৮৭, মিশকাত ৫১৬১নং)

তার দুনিয়ার বাড়ি সুন্দর না হলেও আখেরাতের বাড়িটি বেশ সুন্দর হয়। তার এ সংসারে কোন সম্মান না থাকলেও পরকালে সম্মানিত ও আপ্যায়িত হয়।

সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ অত্যন্ত দুবলা-পাতলা দেহের মানুষ ছিলেন। লোকেরা তাঁর পায়ের সরু নলা দেখে হাসত। কিন্তু মহানবী বলেছিলেন,
(والذي نفسي بيده لهما أثقل في الميزان من جبل أحد)).

অর্থাৎ, সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! নিঃসন্দেহে ওই নলা দুটি মীযানে উহুদ পাহাড় অপেক্ষা বেশি ভারী হবে! (সিঃ সহীহাহ ২৭৫০, ৩১৯২নং)

হ্যাঁ, প্রকৃত সফলতা, পরকালের সফলতা। আসল পুরস্কার, পরকালের পুরস্কার। পরকালের সফলতা লাভের মূল কারণ হল, মহান আল্লাহর বিধান পালনে সক্ষমতা। তবে কিছু আমলের ব্যাপারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ এসেছে যে, তা সাফল্য ও পরিত্রাণ লাভের কারণ হবে। যেমন মহানবী বলেছেন,

لِكُلِّ عَمَلٍ شِرَّةٌ وَلِكُلِّ شِرَّةٍ فَتْرَةٌ فَمَنْ كَانَتْ فَتْرَتُهُ إِلَى سُنَّتِي فَقَدْ أَفْلَحَ وَمَنْ كَانَتْ إِلَى غَيْرِ ذَلِكَ فَقَدْ هَلَكَ)).

"প্রত্যেক কর্মের উদ্যম আছে এবং প্রত্যেক উদ্যমের আছে নিরুদ্যমতা। সুতরাং যার নিরুদ্যমতা আমার সুন্নাহর গন্ডির ভিতরেই থাকে, সে সফলকাম হয় এবং যার নিরুদ্যমতা এ ছাড়া অন্য কিছুতে (সুন্নত বর্জনে) অতিক্রম করে, সে ধ্বংস হয়ে যায়।” (ইবনে আবী আসেম, ইবনে হিব্বান ১১, আহমাদ ৬৯৫৮, ত্বাহাবী, সহীহ তারগীব ৫৬নং)

ত্বালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ বলেন, একদা নাজদ (রিয়ায এলাকার) অধিবাসীদের একজন আলুলায়িত কেশী ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ-এর নিকট উপস্থিত হল। আমরা তার ভন্ড শব্দ শুনছিলাম, আর তার কথাও বুঝতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ-এর কাছে আসল এবং (তখন বুঝলাম,) সে ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন করছে। (উত্তরে) রাসূলুল্লাহ বললেন, "(ইসলাম হল,) দিবা- রাত্রিতে পাঁচ অক্তের নামায (প্রতিষ্ঠা করা)।" সে বলল, 'তা ছাড়া আমার উপর অন্য নামায আছে কি?' তিনি বললেন, “না, কিন্তু যা কিছু তুমি নফল হিসাবে পড়বে।” রাসূলুল্লাহ আবার বললেন, "এবং রমযান মাসের রোযা।” লোকটি বলল, 'তা ছাড়া আমার উপর অন্য রোযা আছে কি?' তিনি বললেন, “না, তবে তুমি যা নফল হিসাবে করবে।” বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ তাকে যাকাতের কথা বললেন। সে বলল, 'তাছাড়া আমার উপর অন্য দান আছে কি?' তিনি বললেন, "না, তবে তুমি যা নফল হিসাবে করবে।" তারপর লোকটি পিঠ ফিরিয়ে এ কথা বলতে বলতে যেতে লাগল, 'আল্লাহর কসম! আমি এর চাইতে বেশী কিছু করব না এবং এর চেয়ে কমও করব না।' তখন রাসূলুল্লাহ বললেন,

(( أَفْلَحَ إِنْ صَدَقَ )).

"লোকটি সত্য বলে থাকলে সফলকাম হবে।” (বুখারী ৪৬, ২৬৭৮, মুসলিম ১০৯নং)

ইসলামের দ্বিতীয় রুকন দ্বীনের খুঁটি নামাযের গুরুত্ব অনেক। সঠিক নামায পরকালের সাফল্য লাভের নিদর্শন। মহানবী বলেছেন,

(( إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ بِهِ العَبْدُ يَوْمَ القِيَامَةِ مِنْ عَمَلِهِ صَلَاتُهُ ، فَإِنْ صَلَحَتْ ، فَقَدْ أَفْلَحَ وَأَنْجَحَ ، وَإِنْ فَسَدَتْ ، فَقَدْ خَابَ وَخَسِرَ ، فَإِنِ انْتَقَصَ مِنْ فَرِيضَتِهِ شَيْءٌ، قَالَ الرَّبُّ - عَزَّ وَجَلَّ : انْظُرُوا هَلْ لِعْبَدِي مِن تَطَوُّعِ، فَيُكَمَّلُ مِنْهَا مَا انْتَقَصَ مِنَ الفَرِيضَةِ ؟ ثُمَّ تَكُونُ سَائِرُ أَعْمَالِهِ عَلَى هَذَا )) .

“নিশ্চয় কিয়ামতের দিন বান্দার (হকুকুল্লাহর মধ্যে) যে কাজের হিসাব সর্বপ্রথম নেওয়া হবে তা হচ্ছে তার নামায। সুতরাং যদি তা সঠিক হয়, তাহলে সে পরিত্রাণ পাবে ও সফল হবে। আর যদি (নামায) পণ্ড ও খারাপ হয়, তাহলে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি তার ফরয (ইবাদতের) মধ্যে কিছু কম পড়ে যায়, তাহলে প্রভু বলবেন, 'দেখ তো! আমার বান্দার কিছু নফল (ইবাদত) আছে কি না, যা দিয়ে ফরযের ঘাটতি পুরণ ক'রে দেওয়া হবে?' অতঃপর তার অবশিষ্ট সমস্ত আমলের হিসাব ঐভাবে গৃহীত হবে। (তিরমিযী ৪১৩, আবু দাউদ ৮-৬৪নং)

ধন্য হন নামাযী হয়ে, ধন্য হন 'সফল মানব' হয়ে। প্রকৃত সাফল্যলাভের জন্য মোবারকবাদ আপনাকে।

আবু যার হতে বর্ণিত, একদা নবী বললেন, "কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির সঙ্গে আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না। আর তাদের জন্য হবে মর্মন্তুদ শাস্তি।” বর্ণনাকারী বলেন, এরূপ তিনি তিনবার বললেন। তখন আবু যার বললেন, 'ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তারা কারা হে আল্লাহর রসূল?' রাসূলুল্লাহ বললেন,

(( المُسْبِلُ ، وَالمَنَّانُ ، وَالمُنْفِقُ سِلْعَتَهُ بِالحَلِفِ الكَاذِبِ )) .
"যে (পায়ের) গাঁটের নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরে, দান ক'রে যে প্রচার ক'রে বেড়ায় এবং মিথ্যা কসম খেয়ে নিজের পণ্যদ্রব্য বিক্রি করে।” (মুসলিম ৩০৬নং)

মহান আল্লাহ আমাদেরকে কিয়ামতের সকল ক্ষতি থেকে রক্ষা করুন এবং সেই মানুষদের দলভুক্ত করুন, যাঁরা পরিত্রাণ পাবেন ও সফল হবেন। আমীন।

وصلى الله على نبينا محمد وعلى آله وصحبه ومن تبعهم بإحسان إلى يوم الدين।

📘 সফল মানব > 📄 প্রকৃত অসফল ও ক্ষতিগ্রস্ত মানব

📄 প্রকৃত অসফল ও ক্ষতিগ্রস্ত মানব


মহান সৃষ্টিকর্তা বলেছেন, {وَالْعَصْرِ (۱) إِنَّ الإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ (۲) إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ} (۳) "মহাকালের শপথ। মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয়। আর উপদেশ দেয় ধৈর্য ধারণের।” (আসরঃ ১-৩)

মানুষের ক্ষতি ও ধ্বংস সুস্পষ্ট। যেহেতু যতক্ষণ সে জীবিত থাকে, ততক্ষণ তার দিনরাত কোন না কোন কষ্ট, মেহনত ও পরিশ্রমের সাথে অতিবাহিত হয়। অতঃপর সে যখন মৃত্যুবরণ করে, তখনও তার আরাম ও শান্তি নসীব হয় না। বরং সে জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত হয়।

তবে এমন ক্ষতি হতে সেই ব্যক্তিরা নিরাপত্তা লাভ করবে, যারা ঈমান এনে নেক আমল করবে। কেননা, তার পার্থিব জীবন যেমনভাবেই অতিবাহিত হোক না কেন, মৃত্যুর পর সে চিরস্থায়ী নিয়ামত এবং জান্নাতের চিরসুখ লাভে ধন্য হবে। এমন ক্ষতি হতে সেই ব্যক্তিরা নিরাপত্তা লাভ করবে, যারা একে অপরকে আল্লাহ পাকের শরীয়তের আনুগত্য করার এবং নিষিদ্ধ বস্তু এবং পাপাচার হতে দূরে থাকার উপদেশ দেবে।

মসীবত ও দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য, শরীয়তের হুকুম-আহকাম ও ফরযসমূহ পালন করতে ধৈর্য, পাপাচার বর্জন করতে ধৈর্য, কামনা-বাসনা ও কুপ্রবৃত্তিকে দমন করতে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেবে। যদিও ধৈর্যধারণের উপদেশ সত্যের উপদেশেরই অন্তর্ভুক্ত, তবুও তা বিশেষ ক'রে উল্লেখ করা হয়েছে। আর তাতে ধৈর্যধারণ ও তার উপদেশের মর্যাদা, মাহাত্ম্য এবং সুচরিত্রতায় তার পৃথক বৈশিষ্ট্য থাকার কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায়। (আহসানুল বায়ান)

বলা বাহুল্য, যারা মু'মিন নয়, যারা কাফের, তারা আসলেই ক্ষতিগ্রস্ত; দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত।

এ ব্যাপারে কুরআন কারীম থেকে আরও কিছু উদ্ধৃতি প্রণিধানযোগ্য। মহান আল্লাহ বলেছেন, {قُل لِّمَن مَّا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ قُل لِلَّهِ كَتَبَ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ لَيَجْمَعَنَّكُمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ لَا رَيْبَ فِيهِ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنفُسَهُمْ فَهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ } (১২) سورة الأنعام "বল, 'আকাশ ও ভূমন্ডলে যা আছে তা কার?' বল, 'তা আল্লাহরই।' দয়া করা তিনি নিজ কর্তব্য বলে স্থির করেছেন। কিয়ামতের দিন তিনি তোমাদেরকে অবশ্যই সমবেত করবেন, এতে কোনই সন্দেহ নেই। যারা নিজেই নিজেদের ক্ষতি করেছে, তারা ঈমান আনবে না।" (আনআমঃ ১২)

الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءهُمُ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنفُسَهُمْ فَهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ} (۲۰) سورة الأنعام
"যাদেরকে আমি কিতাব (ঐশীগ্রন্থ) দিয়েছি, তারা তাকে সেইরূপ চেনে; যেরূপ তাদের সন্তানদেরকে চেনে। যারা নিজেদের ক্ষতি করেছে, তারা ঈমান আনবে না।" (আনআমঃ ২০)

যারা কাফের, তারা নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের ক্ষতিগ্রস্ততার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,

{هُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ فِي الْأَرْضِ فَمَن كَفَرَ فَعَلَيْهِ كُفْرُهُ وَلَا يَزِيدُ الْكَافِرِينَ كُفْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ إِلَّا مَقْتًا وَلَا يَزِيدُ الْكَافِرِينَ كُفْرُهُمْ إِلَّا خَسَارًا} (۳۹) سورة فاطر
"তিনিই পৃথিবীতে তোমাদেরকে প্রতিনিধি করেছেন। সুতরাং কেউ অবিশ্বাস করলে তার অবিশ্বাসের জন্য সে নিজেই দায়ী হবে। অবিশ্বাসীদের অবিশ্বাস কেবল ওদের প্রতিপালকের ক্রোধই বৃদ্ধি করে এবং ওদের অবিশ্বাস ওদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে।” (ফাত্বিরঃ ৩৯)

كَالَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ كَانُوا أَشَدَّ مِنكُمْ قُوَّةً وَأَكْثَرَ أَمْوَالاً وَأَوْلَادًا فَاسْتَمْتَعُوا بِخَلاقِهِمْ فَاسْتَمْتَعْتُم بِخَلاقِكُمْ كَمَا اسْتَمْتَعَ الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ بِخَلاقِهِمْ وَخُضْتُمْ كَالَّذِي خَاضُوا أَوْلَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ} (٦٩) سورة التوبة
"(তোমরাও) তোমাদের পূর্ববর্তীদের মতো, যারা শক্তি, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে ছিল তোমাদের চেয়ে অনেক বেশী; ফলতঃ তারা নিজেদের (পার্থিব) অংশ উপভোগ করেছে। অতঃপর তোমরাও তোমাদের (পার্থিব) অংশ উপভোগ করেছ, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীগণ নিজেদের অংশ উপভোগ করেছে। আর তোমরাও সেইরূপ (অন্যায়) আলাপ-আলোচনায় নিমগ্ন হয়েছ, যেরূপ তারা হয়েছিল। দুনিয়াতে ও আখেরাতে ওদের (নেক) কর্মসমূহ বিনষ্ট হয়ে গেছে, আর ওরাই হল ক্ষতিগ্রস্ত।” (তাওবাহঃ ৬৯)

{قُلْ كَفَى بِاللَّهِ بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ شَهِيدًا يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالَّذِينَ آمَنُوا بالْبَاطِل وَكَفَرُوا بِاللَّهِ أُوْلَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ} (٥٢) سورة العنكبوت
"বল, 'আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা তিনি অবগত এবং যারা অসত্যে বিশ্বাস করে ও আল্লাহকে অবিশ্বাস করে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।” (আনকাবুতঃ ৫২)

{وَأَصْبَحَ الَّذِينَ تَمَنَّوْا مَكَانَهُ بِالْأَمْسِ يَقُولُونَ وَيْكَأَنَّ اللَّهَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَن يَشَاء مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَوْلَا أَن مَّنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا لَخَسَفَ بِنَا وَيْكَأَنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ} (৮২) সূরা কাসাস
"পূর্বদিন যারা (কাফের কারুনের মতো) তার মর্যাদা কামনা করেছিল তারা বলতে লাগল, 'দেখ, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা তার রুযী বর্ধিত করেন এবং যার জন্য ইচ্ছা তা হ্রাস করেন। যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করতেন, তবে আমাদেরকেও তিনি মাটিতে ধসিয়ে দিতেন। দেখ, (অকৃতজ্ঞ) কাফেররা সফলকাম হয় না।” (ক্বাস্বাস্বঃ ৮২)

মহান আল্লাহর একমাত্র দ্বীন হল ইসলাম। আদম থেকে মুহাম্মাদ পর্যন্ত প্রেরিত সকল নবী-রসূলের দ্বীন হল ইসলাম। এই দ্বীনকে যারা অবলম্বন করবে না, তারা অস্বীকারকারী কাফের ও ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের ক্ষতিগ্রস্ততার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,

{وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الإِسْلامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ} (৮৫)
"যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম অন্বেষণ করবে, তার পক্ষ হতে তা কখনও গ্রহণ করা হবে না। আর সে হবে পরলোকে ক্ষতিগ্রস্তদের দলভুক্ত।” (আলে ইমরান:৮৫)

কাফের বহু ধরনের হয়ে থাকে। এক ধরনের কাফের হল, যে কুরআনকে আল্লাহর কিতাব হিসাবে অবিশ্বাস করে। অথবা তাঁর কোন নিদর্শনকে অবিশ্বাস করে। তাদের ক্ষতিগ্রস্ততার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,

{وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُوْلَئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنفُسَهُم بِمَا كَانُوا بِآيَاتِنَا يَظْلِمُونَ} (৯)
“যাদের ওজন হালকা হবে, তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে, যেহেতু তারা আমার আয়াত বা নিদর্শনাবলীকে মিথ্যাজ্ঞান করত।” (আ'রাফঃ ৯)

{وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاء وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ وَلَا يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إِلَّا خَسَارًا }
"আমি অবতীর্ণ করি কুরআন, যা বিশ্বাসীদের জন্য আরোগ্য ও করুণা, কিন্তু তা সীমালংঘনকারীদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে।” (বানী ইস্রাঈল: ৮২)

الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَتْلُونَهُ حَقَّ تِلاوَتِهِ أُوْلَئِكَ يُؤْمِنُونَ بِهِ وَمِن يَكْفُرْ بِهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ) (১২১) সূরা বাকারা
"আমি যাদেরকে কিতাব (ধর্মগ্রন্থ) দান করেছি, তারা যথাযথভাবে তা (ধর্মগ্রন্থ) পাঠ করে থাকে। তারাই তাতে (ধর্মগ্রন্থ) বিশ্বাস করে। আর যারা তা অমান্য করে, তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত।” (বাক্বারাহঃ ১২১)

{وَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِ اللَّهِ فَتَكُونَ مِنَ الْخَاسِرِينَ } (৯৫) ইউনুস

"তুমি অবশ্যই ঐসব লোকদেরও অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা আল্লাহর আয়াতগুলোকে মিথ্যা মনে করেছে, নচেৎ তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (ইউনুসঃ ৯৫)

{لَهُ مَقَالِيدُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِ اللَّهِ أُوْلَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ}
"আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর চাবিসমূহ তাঁরই নিকট। যারা আল্লাহর আয়াতকে (বাক্যকে) অস্বীকার করে, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।” (যুমার: ৬৩)

আর এক ধরনের কাফেরদল হল, যারা মহান আল্লাহর প্রেরিত দূতগণকে অবিশ্বাস ও অস্বীকার করে। তারা তাঁদের দাবীকে মিথ্যাজ্ঞান করে, তাঁদের আদেশ-নিষেধ অমান্য করে। তাদের ক্ষতিগ্রস্ততার সম্বন্ধে মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلًا مِّن قَبْلِكَ مِنْهُم مَّن قَصَصْنَا عَلَيْكَ وَمِنْهُم مَّن لَّمْ تَقْصُصْ عَلَيْكَ وَمَا كَانَ لِرَسُولٍ أَنْ يَأْتِيَ بِآيَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ فَإِذَا جَاء أَمْرُ اللَّهِ قُضِيَ بِالْحَقِّ وَخَسِرَ هُنَالِكَ الْمُبْطِلُونَ} (৭৮) সূরা গাফির

"আমি তো তোমার পূর্বে অনেক রসূল প্রেরণ করেছিলাম; তাদের কারো কারো কথা তোমার নিকট বিবৃত করেছি এবং কারো কারো কথা তোমার নিকট বিবৃত করিনি। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোন নিদর্শন উপস্থিত করা কোন রসূলের কাজ নয়। আল্লাহর আদেশ এলে ন্যায়সঙ্গতভাবে ফায়সালা হয়ে যাবে। আর তখন মিথ্যাশ্রয়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” (মু'মিনঃ ৭৮)

{فَلَمْ يَكُ يَنفَعُهُمْ إِيمَانُهُمْ لَمَّا رَأَوْا بَأْسَنَا سُنَّتَ اللَّهِ الَّتِي قَدْ خَلَتْ فِي عِبَادِهِ وَخَسِرَ هُنَالِكَ الْكَافِرُونَ} (৮৫) সূরা গাফির

"কিন্তু ওরা যখন আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করল, তখন ওদের বিশ্বাস ওদের কোন উপকারে এল না। আল্লাহর এ বিধান (পূর্ব হতেই) তাঁর দাসদের মধ্যে অনুসৃত হয়ে আসছে। আর তখন অবিশ্বাসীরা ক্ষতিগ্রস্ত হল।” (মু'মিনঃ ৮৫)

الَّذِينَ كَذَّبُوا شُعَيْبًا كَأَن لَّمْ يَغْنَوْا فِيهَا الَّذِينَ كَذَّبُوا شُعَيْبًا كَانُوا هُمُ الْخَاسِرِينَ}
"মনে হল শুআইবকে যারা মিথ্যাজ্ঞান করেছিল, তারা যেন কখনো সেখানে বসবাসই করেনি। শুআইবকে যারা মিথ্যা ভেবেছিল, তারাই ছিল ক্ষতিগ্রস্ত।” (আ'রাফঃ ৯২)

قَالَ نُوحٌ رَّبِّ إِنَّهُمْ عَصَوْنِي وَاتَّبَعُوا مَن لَّمْ يَزِدْهُ مَالُهُ وَوَلَدُهُ إِلَّا خَسَارًا} (২১) নূহ
"নূহ বলেছিল, 'হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় তো আমাকে অমান্য করেছে এবং অনুসরণ করেছে এমন লোকের যার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তার ক্ষতি ব্যতীত আর কিছুই বৃদ্ধি করেনি।” (নূহঃ ২১)

আর এক ধরনের কাফেরদল, যারা মহান স্রষ্টার সাক্ষাৎ, পুনরুত্থান, বিচার- দিবস, পরকাল ও জান্নাত-জাহান্নামকে মিথ্যাজ্ঞান করে, বিশেষ ক'রে তাদের ক্ষতিগ্রস্ততার ব্যাপারে তিনি বলেছেন,

الَّذِينَ يَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَيَبْغُونَهَا عِوَجاً وَهُمْ بِالآخِرَةِ هُمْ كَافِرُونَ (١٩) أُوْلَئِكَ لَمْ يَكُونُوا مُعْجِزِينَ فِي الْأَرْضِ وَمَا كَانَ لَهُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ مِنْ أَوْلِيَاءَ يُضَاعَفُ لَهُمُ الْعَذَابُ مَا كَانُوا يَسْتَطِيعُونَ السَّمْعَ وَمَا كَانُوا يُبْصِرُونَ (٢٠) أُوْلَئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنفُسَهُمْ وَضَلَّ عَنْهُم مَّا كَانُوا يَفْتَرُونَ (٢١) لَا جَرَمَ أَنَّهُمْ فِي الآخِرَةِ هُمُ الأَخْسَرُونَ} (٢٢) سورة هود

"যারা অপরকে আল্লাহর পথে (মানুষকে) বাধা প্রদান করে এবং তাতে বক্রতা অন্বেষণ করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। আর তারাই পরকাল সম্বন্ধেও অবিশ্বাসী। তারা (সমগ্র) ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহকে ব্যর্থ করতে পারত না, আর তাদের জন্য আল্লাহ ছাড়া কোন সাহায্যকারীও ছিল না। ওদের শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে। ওরা শুনতে সক্ষম ছিল না এবং দেখতও না। এরা সেই লোক, যারা নিজেরা নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আর যেসব (উপাস্য) তারা মিথ্যা কল্পনা ক'রে রেখেছিল, তাদের থেকে তারা সবাই উধাও হয়ে গেছে। এটা সুনিশ্চিত যে, পরকালে তারাই হবে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত।” (হূদঃ ১৯-২২)

{قَدْ خَسِرَ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِلِقَاءِ اللهِ حَتَّى إِذَا جَاءَتْهُمُ السَّاعَةُ بَغْتَةً قَالُوا يَا حَسْرَتَنَا عَلَى مَا فَرَّطْنَا فِيهَا وَهُمْ يَحْمِلُونَ أَوْزَارَهُمْ عَلَى ظُهُورِهِمْ أَلا سَاء مَا يَزْرُونَ} (٣١) الأنعام

"যারা আল্লাহর সাক্ষাৎকে মিথ্যা মনে করেছে, তারা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন কি অকস্মাৎ যখন তাদের নিকট কিয়ামত উপস্থিত হবে, তখন তারা বলবে, 'হায় আফশোস! এ (কিয়ামত) কে আমরা অবজ্ঞা করেছি।' তারা তাদের পৃষ্ঠে নিজেদের পাপভার বহন করবে। দেখ, তারা যা বহন করবে, তা কত নিকৃষ্ট!” (আনআমঃ ৩১)

{وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ كَأَن لَّمْ يَلْبَثُواْ إِلَّا سَاعَةً مِّنَ النَّهَارِ يَتَعَارَفُونَ بَيْنَهُمْ قَدْ خَسِرَ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِلِقَاءِ اللهِ وَمَا كَانُوا مُهْتَدِينَ} (٤٥) سورة يونس

"যেদিন তিনি তাদেরকে একত্রিত করবেন, (সেদিন ওদের মনে হবে যে, দুনিয়ায়) যেন তারা দিবসের মুহূর্তকাল মাত্র অবস্থান করেছিল। তারা পরস্পর একে অপরকে চিনবে। বাস্তবিকই ক্ষতিগ্রস্ত হবে ঐসব লোক, যারা আল্লাহর সাক্ষাৎকে মিথ্যা মনে করেছিল এবং তারা সৎপথপ্রাপ্ত ছিল না।” (ইউনুসঃ ৪৫)

{إِنَّ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالآخِرَةِ زَيَّنَّا لَهُمْ أَعْمَالَهُمْ فَهُمْ يَعَهُونَ (٤) أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَهُمْ سُوءُ الْعَذَابِ وَهُمْ فِي الْآخِرَةِ هُمُ الْأَخْسَرُونَ} (٥) سورة النمل

“নিশ্চয় যারা পরলোকে বিশ্বাস করে না, তাদের দৃষ্টিতে তাদের কর্মকে আমি শোভন করেছি, ফলে ওরা বিভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়ায়; এদের জন্য আছে নিকৃষ্ট শান্তি এবং এরাই পরকালে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত।” (নাম্লঃ ৪-৫)

যারা শয়তানের আনুগত্য করে, তাদের ক্ষতিগ্রস্ততার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,

{وَلَا ضِلَّنَّهُمْ وَلَا مَنْيَنَّهُمْ وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُبَتِّكُنَّ آذَانَ الأَنْعَامِ وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللَّهِ وَمَن يَتَّخِذِ الشَّيْطَانَ وَلِيًّا مِّن دُونِ اللَّهِ فَقَدْ خَسِرَ خُسْرَانًا مُّبِينًا} (۱۱۹) سورة النساء

“তাদেরকে পথভ্রষ্ট করবই; তাদের হৃদয়ে মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করবই, আমি তাদেরকে নিশ্চয় নির্দেশ দেব ফলে তারা পশুর কর্ণচ্ছেদ করবেই এবং তাদেরকে নিশ্চয় নির্দেশ দেব ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টি বিকৃত করবেই।' আর যে আল্লাহর পরিবর্তে শয়তানকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে, নিশ্চয় সে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” (নিসাঃ ১১৯)

{اسْتَحْوَذْ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ فَأَنسَاهُمْ ذِكْرَ اللَّهِ أُوْلَئِكَ حِزْبُ الشَّيْطَانِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ الشَّيْطَانِ هُمُ الْخَاسِرُونَ } (۱۹) سورة المجادلة

“শয়তান তাদের উপর প্রভুত্ব বিস্তার করেছে, ফলে তাদেরকে ভুলিয়ে দিয়েছে আল্লাহর স্মরণ। তারা হল শয়তানের দল। জেনে রেখো যে, নিশ্চয় শয়তানের দলই ক্ষতিগ্রস্ত।” (মুজাদালাহঃ ১৯)

মুসলিম হওয়ার পরেও যারা অমুসলিম হয়ে যায়, ঈমান আনার পরেও যারা ঈমানকে অবজ্ঞায় হারিয়ে ফেলে, তাদের ক্ষতিগ্রস্ততার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَن يَكْفُرْ بِالإِيمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ وَهُوَ فِي الآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ} (٥) المائدة
“যে কেউ ঈমানকে অস্বীকার করবে, তার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।” (মায়িদাহঃ ৫)

মু'মিন যুবকদল আসহাবে কাহফ তাদের কিছু সঙ্গীকে কাফেরদের ব্যাপারে সাবধান ক'রে বলেছিল,

{إِنَّهُمْ إِن يَظْهَرُوا عَلَيْكُمْ يَرْجُمُوكُمْ أَوْ يُعِيدُوكُمْ فِي مِلَّتِهِمْ وَلَن تُفْلِحُوا إِذًا أَبَدًا }
“তারা যদি তোমাদের বিষয় জানতে পারে, তবে তোমাদেরকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করবে অথবা তোমাদেরকে তাদের ধর্মে ফিরিয়ে নেবে। আর সে ক্ষেত্রে তোমরা কখনই সাফল্য লাভ করবে না।” (কাহফঃ ২০)

মুনাফিক ও কপটচারীদের ক্ষতিগ্রস্ততার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَى أَنْ تُصِيبَنَا دَائِرَةٌ فَعَسَى اللَّهُ أَنْ يَأْتِيَ بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرٍ مِنْ عِنْدِهِ فَيُصْبِحُوا عَلَى مَا أَسَرُّوا فِي أَنْفُسِهِمْ نَادِمِينَ (٥٢) وَيَقُولُ الَّذِينَ آمَنُوا أَهَؤُلاءِ الَّذِينَ أَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ إِنَّهُمْ لَمَعَكُمْ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فَأَصْبَحُوا خَاسِرِينَ} (٥٣) سورة المائدة
"যাদের অন্তঃকরণে ব্যাধি রয়েছে তুমি তাদেরকে সত্বর এ বলে তাদের সাথে মিলিত হতে দেখবে যে, আমাদের আশংকা হয় আমাদের ভাগ্য-বিপর্যয় ঘটবে। হয়তো আল্লাহ বিজয় অথবা তাঁর নিকট হতে এমন কিছু দেবেন যাতে তারা তাদের অন্তরে যা গোপন রেখেছিল তার জন্য অনুতপ্ত হবে। আর বিশ্বাসিগণ বলবে, এরাই কি তারা, যারা আল্লাহর নামে দৃঢ়ভাবে শপথ ক'রে বলেছিল যে, 'তারা তোমাদের সঙ্গেই আছে?' তাদের কাজ নিষ্ফল হয়েছে ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।” (মায়িদাহঃ ৫২-৫৩)

যারা মহান প্রতিপালকের চক্রান্ত ও আচমকা শাস্তির ব্যাপারে নিজেদেরকে নিরাপদ ভাবে, তাদের ক্ষতিগ্রস্ততার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
{أَفَأَمِنُوا مَكْرَ اللَّهِ فَلَا يَأْمَنُ مَكْرَ اللهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْخَاسِرُونَ} (۹۹) سورة الأعراف
"তারা কি আল্লাহর চক্রান্তের ভয় রাখে না? বস্তুতঃ ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় ব্যতীত কেউই আল্লাহর চক্রান্ত হতে নিরাপদ বোধ করে না।” (আ'রাফঃ ৯৯)

যারা সরল পথ হতে বিচ্যুত ও পথভ্রষ্ট, তাদের ক্ষতিগ্রস্ততার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
{مَنْ يَهْدِ اللَّهُ فَهُوَ الْمُهْتَدِي وَمَنْ يُضْلِلْ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ} (۱۷۸) الأعراف
"আল্লাহ যাকে পথ দেখান সেই পথ পায় এবং যাদেরকে তিনি বিপথগামী করেন, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।” (আ'রাফঃ ১৭৮)

যারা মুশরিক ও অংশীবাদী, যারা মহান প্রতিপালকের আসনে অন্য উপাস্যকে আসীন করে, যারা তাঁর সাথে তাঁর ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক করে, তাদের ক্ষতিগ্রস্ততার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,

{وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ} (٦٥) سورة الزمر
"তোমার প্রতি ও তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই অহী (প্রত্যাদেশ) করা হয়েছে যে, যদি তুমি আল্লাহর অংশী স্থির কর, তাহলে অবশ্যই তোমার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্তদের শ্রেণীভুক্ত।” (যুমার: ৬৫)

{وَمَن يَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهَا آخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِندَ رَبِّهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ} (۱۱۷) سورة المؤمنون

"যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে আহবান করে, (অথচ) ঐ বিষয়ে তার নিকট কোন প্রমাণ নেই; তার হিসাব তার প্রতিপালকের নিকট আছে, নিশ্চয়ই অবিশ্বাসীরা সফলকাম হবে না।” (মু'মিনুনঃ ১১৭)

যারা নিজ সন্তানকে হত্যা করে এবং আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ ক'রে হালাল রুযীকে হারাম করে, এমন পথভ্রষ্টদের ক্ষতিগ্রস্ততার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,

{قَدْ خَسِرَ الَّذِينَ قَتَلُوا أَوْلَادَهُمْ سَفَهَا بِغَيْرِ عِلْمٍ وَحَرَّمُوا مَا رَزَقَهُمُ اللَّهُ افْتِرَاءِ عَلَى اللَّهِ قَدْ ضَلُّوا وَمَا كَانُوا مُهْتَدِينَ} (١٤٠) سورة الأنعام

"যারা নির্বুদ্ধিতার জন্য ও অজ্ঞানতাবশতঃ নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করে এবং আল্লাহ প্রদত্ত জীবিকাকে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করার উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধ গণ্য করে, তারা তো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা অবশ্যই বিপথগামী এবং তারা সৎপথপ্রাপ্ত ছিল না।” (আনআমঃ ১৪০)

{وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلَالٌ وَهَذَا حَرَامٌ لِّتَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ لَا يُفْلِحُونَ} (١١٦) سورة النحل

"তোমাদের জিহ্বা মিথ্যা আরোপ করে বলে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করবার জন্য তোমরা বলো না, 'এটা হালাল এবং এটা হারাম।' যারা আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করবে, তারা সফলকাম হবে না।” (নাহলঃ ১১৬)

যারা দ্বিধার সাথে মহান আল্লাহর ইবাদত করে, তাঁর দ্বীনের ব্যাপারে যারা সংশয় ও সন্দেহে ভোগে, তাদের ক্ষতিগ্রস্ততার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,

{وَمِنَ النَّاسِ مَن يَعْبُدُ اللَّهَ عَلَى حَرْفٍ فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرٌ اطْمَأَنَّ بِهِ وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةٌ انقَلَبَ عَلَى وَجْهِهِ خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةَ ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ} (۱۱) الحج

"মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর ইবাদত করে দ্বিধার সাথে; তার কোন মঙ্গল হলে তাতে সে প্রশান্তি লাভ করে এবং কোন বিপর্যয় ঘটলে সে তার পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়; সে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইহকালে ও পরকালে; এটাই তো সুস্পষ্ট ক্ষতি।” (হাজ্জঃ ১১)

উক্ত আয়াতে উল্লিখিত 'হার্ফ' শব্দের অর্থ কিনারা। কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি স্থিতিশীল ও নির্বিচল হয় না। এ রকমই যে ব্যক্তি দ্বীনের ব্যাপারে সন্দেহ, সংশয় ও অমূলক ধারণার শিকার, সেও বিচলিত ও অস্থির হয়; দ্বীনের উপর দৃঢ়তা অবলম্বন তার ভাগ্যে জোটে না। কারণ তার উদ্দেশ্য হয় শুধু পার্থিব স্বার্থ। যদি তা অর্জিত হয়, তাহলে ভাল। নচেৎ পূর্বধর্মে, অর্থাৎ কুফরী ও শির্কের দিকে

ফিরে যায়। এর বিপরীত যারা সত্যিকার মুসলিম, ঈমান ও ইয়াকীনে সুদৃঢ়, তারা সুখ-দুঃখ না দেখেই দ্বীনের উপর অটল থাকে। আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং দুঃখ-দুর্দশায় ধৈর্য ধারণ করে।

কোন কোন ব্যক্তি মদীনায় হিজরত ক'রে আসত। অতঃপর তার পরিবারের সন্তান হলে অথবা গৃহপালিত পশুর মধ্যে বরকত হলে সে বলত, 'ইসলাম ভালো ধর্ম।' আর বিপরীত হলে বলত, 'এ ধর্ম ভালো নয়।' কিছু কিছু বর্ণনায় এ আচরণ মরুবাসী নও-মুসলিমদের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। (ফাতহুল বারী দ্রঃ, আহসানুল বায়ান)

বলা বাহুল্য, সত্যিকার অর্থে এরা সুস্পষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত।

শেষ বিচারের দিন মীযান বা দাঁড়িপাল্লা দ্বারা মানুষ ওজন হবে, ওজন হবে তার আমল ও আমলনামা। সুতরাং যার ওজন হাল্কা হবে, সে নিশ্চয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,

{فَإِذَا نُفِخَ فِي الصُّورِ فَلَا أَنسَابَ بَيْنَهُمْ يَوْمَئِذٍ وَلَا يَتَسَاءَلُونَ (۱۰۱) فَمَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (۱۰۲) وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُوْلَئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنفُسَهُمْ فِي جَهَنَّمَ خَالِدُونَ} (۱۰۳) سورة المؤمنون

“যেদিন শিংগায় ফুৎকার দেওয়া হবে, সেদিন পরস্পরের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না এবং একে অপরের খোঁজ-খবর নেবে না। সুতরাং যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই হবে সফলকাম। আর যাদের পাল্লা হাল্কা হবে, তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে; তারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে।” (মু'মিনুনঃ ১০১-১০৩)

যারা মহান প্রতিপালকের সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করে এবং পৃথিবীর বুকে অশাস্তি ছড়িয়ে বেড়ায়, তাদের ক্ষতিগ্রস্ততার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,

الَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ} (۲۷) سورة البقرة

"যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন, তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।” (বাক্বারাহঃ ২৭)

অশান্তি সৃষ্টি করেছিল আদমপুত্র কাবীল। মানুষের ইতিহাসে সেই সর্বপ্রথম খুনের অপরাধ সংঘটিত করেছিল। তাই সে হল ক্ষতিগ্রস্ত। মহান আল্লাহ বলেছেন,

فَطَوَّعَتْ لَهُ نَفْسُهُ قَتْلَ أَخِيهِ فَقَتَلَهُ فَأَصْبَحَ مِنَ الْخَاسِرِينَ) (۳۰) سورة المائدة
"অতঃপর তার চিত্ত ভ্রাতৃ-হত্যায় তাকে উত্তেজিত করল, সুতরাং সে (কাবীল) তাকে (হাবীলকে) হত্যা করল, ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হল।” (মায়িদাহঃ৩০)

যারা কাফেরদের আনুগত্য করে, তাদের ক্ষতিগ্রস্ততার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,

{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تُطِيعُوا الَّذِينَ كَفَرُوا يَرُدُّوكُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ فَتَنقَلِبُوا خَاسِرِينَ} "হে বিশ্বাসিগণ! যদি তোমরা অবিশ্বাসীদের অনুগত হও, তাহলে তারা তোমাদেরকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেবে, ফলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে।” (আলে ইমরানঃ ১৪৯)

যারা মহান প্রতিপালকের স্মরণ ও যিক্র থেকে উদাসীন থাকে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের ক্ষতিগ্রস্ততার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,

{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ} (৯) সূরা মুনাফিকুন "হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের ধন-সম্পত্তি ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ হতে উদাসীন না করে, যারা উদাসীন হবে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।” (মুনাফিকুন: ৯)

অপরাধের পর মহান আল্লাহ ক্ষমা ও দয়া না করলে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই আদম ও হাওয়া (আলাইহিমাস সালাম) অপরাধের পর ক্ষমাপ্রার্থনায় বলেছিলেন,

{رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ} (২৩)
'হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি। যদি তুমি আমাদেরকে ক্ষমা না কর, তাহলে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।' (আ'রাফঃ ২৩)

আর নূহ নবী অপরাধের পর ক্ষমাপ্রার্থনায় বলেছিলেন,

{رَبِّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَسْأَلَكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ وَإِلا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُن مِّنَ الْخَاسِرِينَ} (৪৭) সূরা হুদ 'হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার নিকট এমন বিষয়ে আবেদন করা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি, যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই, আর তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না কর এবং আমার প্রতি দয়া না কর, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের দলভুক্ত হয়ে যাব।' (হুদঃ ৪৭)

যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে, তারা সফল হয় না, তারাই প্রকৃতপক্ষে বিফল ও ক্ষতিগ্রস্ত। মহান আল্লাহ বলেছেন,

{ وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِآيَاتِهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ } "যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে অথবা তাঁর আয়াতসমূহকে মিথ্যাজ্ঞান করে, তার থেকে অধিক যালেম (অত্যাচারী) আর কে? যালেমরা অবশ্যই সফলকাম হবে না।" (আনআমঃ ২১)

{فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِآيَاتِهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْمُجْرِمُونَ } "অতএব সে ব্যক্তির চেয়ে অধিক অত্যাচারী কে হবে, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে অথবা তাঁর আয়াতসমূহকে মিথ্যা মনে করে? নিঃসন্দেহে এমন অপরাধিগণ সফলকাম হবে না।” (ইউনুসঃ ১৭)

{قُلْ إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ لَا يُفْلِحُونَ} (٦٩) سورة يونس "তুমি বলে দাও, যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রচনা করে, তারা সফলকাম হবে না।” (ইউনুসঃ ৬৯)

{ قَالَ لَهُم مُّوسَى وَيْلَكُمْ لَا تَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ كَذِبًا فَيُسْحِتَكُمْ بِعَذَابٍ وَقَدْ خَابَ مَن افْتَرَى} (٦١) سورة طه "মূসা নিজ জাতিকে বলল, 'দুর্ভোগ তোমাদের! তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করো না, করলে তিনি তোমাদেরকে শাস্তি দ্বারা সমূলে ধ্বংস করবেন; আর যে মিথ্যা উদ্ভাবন করবে সে অবশ্যই ব্যর্থ হবে।' (ত্বা-হাঃ ৬১)

যারা সীমালংঘনকারী, যারা যালেম ও অত্যাচারী, পাপিষ্ঠ ও পাপাচারী, তারা সফল হয় না, তারাও ক্ষতিগ্রস্ত। মহান আল্লাহ বলেছেন,

{قُلْ يَا قَوْمِ اعْمَلُوا عَلَى مَكَانَتِكُمْ إِنِّي عَامِلٌ فَسَوْفَ تَعْلَمُونَ مَن تَكُونُ لَهُ عَاقِبَةُ الدَّارِ إِنَّهُ لا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ } (١٣٥) سورة الأنعام "বল, 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যা করছ করতে থাক, আমিও আমার কাজ করছি। তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে, কার পরিণাম মঙ্গলময়। নিশ্চয় যালেমরা সফলকাম হবে না।" (আনআমঃ ১৩৫)

{وَقَالَ مُوسَى رَبِّي أَعْلَمُ بِمَن جَاء بِالْهُدَى مِنْ عِندِهِ وَمَن تَكُونُ لَهُ عَاقِبَةُ الدَّارِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ} (۳۷) سورة القصص "মুসা বলল, 'আমার প্রতিপালক সম্যক অবগত কে তাঁর নিকট থেকে পথনির্দেশ এনেছে এবং (পরকালে) কার পরিণাম শুভ হবে। নিশ্চয় সীমালংঘনকারীরা সফলকাম হবে না।” (কাস্বাস্বঃ ৩৭)

{وَرَاوَدَتْهُ الَّتِي هُوَ فِي بَيْتِهَا عَن نَّفْسِهِ وَغَلَقَتِ الأَبْوَابَ وَقَالَتْ هَيْتَ لَكَ قَالَ مَعَادَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ} (۲۳) سورة يوسف "ইউসুফ যে স্ত্রীলোকের গৃহে ছিল, সে তার কাছে (উপযাচিকা হয়ে) যৌন-মিলন কামনা করল এবং দরজাগুলি বন্ধ ক'রে দিয়ে বলল, 'এস! (আমরা কাম-প্রবৃত্তি চরিতার্থ করি।)' ইউসুফ বলল, 'আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তিনি (আযীয) আমার প্রভু! তিনি আমাকে সম্মানজনকভাবে স্থান দিয়েছেন। নিশ্চয় সীমালংঘনকারীরা সফলকাম হয় না।” (ইউসুফঃ ২৩)

এক শ্রেণীর যালেম, যারা নবীগণের সাথে হঠকারিতা করেছিল, তাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَاسْتَفْتَحُوا وَخَابَ كُلُّ جَبَّارٍ عَنِيدٍ} (১৫) সূরা ইব্রাহীম "তারা ফায়সালা কামনা করল এবং প্রত্যেক উদ্ধত হঠকারী ব্যর্থকাম হল।" (ইব্রাহীমঃ ১৫)

আর কিয়ামতের দিন যালেমরা অবশ্যই ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেছেন, {وَعَنَتِ الْوُجُوهُ لِلْحَيِّ الْقَيُّومِ وَقَدْ خَابَ مَنْ حَمَلَ ظُلْمًا} (১১১) সূরা ত্বাহা "সকল মুখমন্ডলই সেই চিরঞ্জীব, সব কিছুর ধারক (আল্লাহর) জন্য অবনমিত হবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে যুলুমের ভার বহন করবে।” (ত্বা-হাঃ ১১১)

যাদুকররা কাফের, যাদু করা শির্ক। যাদুকররা সফল হয় না। মূসা -এর বৃত্তান্তে মহান আল্লাহ বলেছেন, {قَالَ مُوسَى أَتَقُولُونَ لِلْحَقِّ لَمَّا جَاءَكُمْ أَسِحْرٌ هَذَا وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُونَ} (৭৭) "মূসা বলল, 'সত্য যখন তোমাদের কাছে পৌঁছল, তখন সে সম্পর্কে তোমরা কি বলছ, এটা কি যাদু? অথচ যাদুকররা তো সফলকাম হয় না!" (ইউনুসঃ ৭৭)

{وَأَلْقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلْقَفْ مَا صَنَعُوا إِنَّمَا صَنَعُوا كَيْدُ سَاحِرٍ وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أتى} (৬৯) সূরা ত্বাহা “(হে মুসা!) তোমার ডান হাতে যা আছে তা নিক্ষেপ কর, এটি ওরা যা করেছে তা গ্রাস ক'রে ফেলবে। ওরা যা করেছে তা তো জাদুকরের কৌশলমাত্র, এবং যেখান হতেই সে আগমন করুক, জাদুকর কখনই কৃতকার্য হবে না।” (ত্বা-হাঃ৬৯)

সে দেশের লোক সফলকাম হতে পারে না, যে দেশের লোক উপযুক্ত পুরুষ থাকতে নিজেদের নেতৃত্ব ও ক্ষমতা নারীর হাতে তুলে দেয়। আবূ বাকরাহ বলেন, আল্লাহর রসূল -এর নিকট যখন এ খবর পৌঁছল যে, পারস্যবাসিগণ তাদের রাজক্ষমতা কায়সরা (রাজ) কন্যার হাতে তুলে দিয়েছে, তখন তিনি বললেন, لَنْ يُفْلِحَ قَوْمٌ وَلَّوْا أَمْرَهُمْ امْرَأَةً)). "সে জাতি কোন দিন সফলকাম হতে পারে না, যে জাতি তাদের শাসন ক্ষমতা একজন নারীর হাতে তুলে দেয়।” (বুখারী ৪৪২৫, ৭০৯৯নং)

যারা আত্মশুদ্ধি করবে না, তারা অসফল ও ক্ষতিগ্রস্ত। মহান আল্লাহ বলেছেন,

{ قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا (۹) وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا } (۱۰) سورة الشمس
"সে সফলকাম হবে, যে তা (আত্মা)কে পরিশুদ্ধ করবে এবং সে ব্যর্থ হবে, যে তাকে কলুষিত করবে।” (শামস: ৯-১০)

রিজাল্টের দিনে যারা ফেল, তারাই আসল ক্ষতিগ্রস্ত। প্রতিফল দিবসে যারা বিফল, তারাই প্রকৃত প্রস্তাবে বিফল। রোজ কিয়ামতের ক্ষতিগ্রস্ততার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,

{هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا تَأْوِيلَهُ يَوْمَ يَأْتِي تَأْوِيلُهُ يَقُولُ الَّذِينَ نَسُوهُ مِن قَبْلُ قَدْ جَاءَتْ رُسُلُ رَبِّنَا بِالْحَقِّ فَهَل لَّنَا مِن شُفَعَاء فَيَشْفَعُوا لَنَا أَوْ تُرَدُّ فَتَعْمَلَ غَيْرَ الَّذِي كُنَّا نَعْمَلُ قَدْ خَسِرُوا أَنفُسَهُمْ وَضَلَّ عَنْهُم مَّا كَانُوا يَفْتَرُونَ} (٥٣) سورة الأعراف
“তারা শুধু ওর পরিণাম (সংবাদ-সত্যতা বা কিয়ামতের) প্রতীক্ষা করছে। যেদিন ওর পরিণাম বাস্তবায়িত হবে, সেদিন যারা পূর্বে ওর কথা ভুলে গিয়েছিল, তারা বলবে, 'আমাদের প্রতিপালকের রসূলগণ তো সত্য এনেছিলেন, আমাদের কি এমন কোন সুপারিশকারী আছে, যে আমাদের জন্য সুপারিশ করবে অথবা আমাদেরকে কি পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়া হবে, যাতে আমরা পূর্বে যা করতাম, তা হতে ভিন্ন কিছু করতে পারি?' তারা নিজেরা নিজেদের ক্ষতি করেছে এবং তারা যে মিথ্যা রচনা করত তাও অন্তর্হিত হয়েছে।” (আ'রাফঃ ৫৩)

{قُلْ إِنَّ الْخَاسِرِينَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنفُسَهُمْ وَأَهْلِيهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَلَا ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ} (١٥) سورة الزمر
"বল, 'আসল ক্ষতিগ্রস্ত তো তারাই; যারা কিয়ামতের দিন নিজেদেরকে ও নিজেদের পরিজনবর্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জেনে রাখ, এটিই সুস্পষ্ট ক্ষতি।” (যুমার: ১৫)

{وَتَرَاهُمْ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا خَاشِعِينَ مِنَ الذُّلِّ يَنظُرُونَ مِن طَرْفِ خَفِي وَقَالَ الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ الْخَاسِرِينَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنفُسَهُمْ وَأَهْلِيهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَلَا إِنَّ الظَّالِمِينَ فِي عَذَابٍ مُّقِيمٍ}
"জাহান্নামের নিকট উপস্থিত করা হলে তুমি ওদেরকে দেখতে পাবে অপমানে অবনত হয়ে ওরা চোরা দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। আর যারা বিশ্বাস করেছে তারা বলবে, 'আসল ক্ষতিগ্রস্ত তো তারাই; যারা কিয়ামতের দিন নিজেদেরকে ও নিজেদের পরিজনবর্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জেনে রেখো, সীমালংঘনকারীরা অবশ্যই স্থায়ী শাস্তি ভোগ করবে।” (শূরাঃ ৪৫)

{وَلَلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ يَوْمَئِذٍ يَخْسَرُ الْمُبْطِلُونَ } (۲۷)
"আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন মিথ্যাশ্রয়ীরা হবে ক্ষতিগ্রস্ত।” (জাশিয়াঃ ২৭)

{وَيَوْمَ يُحْشَرُ أَعْدَاءُ اللَّهِ إِلَى النَّارِ فَهُمْ يُوزَعُونَ (۱۹) حَتَّى إِذَا مَا جَاءُوهَا شَهِدَ عَلَيْهِمْ سَمْعُهُمْ وَأَبْصَارُهُمْ وَجُلُودُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (۲۰) وَقَالُوا لِجُلُودِهِمْ لِمَ شَهِدْتُمْ عَلَيْنَا قَالُوا أَنطَقَنَا اللَّهُ الَّذِي أَنطَقَ كُلَّ شَيْءٍ وَهُوَ خَلَقَكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ (۲۱) وَمَا كُنْتُمْ تَسْتَتِرُونَ أَنْ يَشْهَدَ عَلَيْكُمْ سَمْعُكُمْ وَلا أَبْصَارُكُمْ وَلا جُلُودُكُمْ وَلَكِنْ ظَنَنْتُمْ أَنَّ اللَّهَ لَا يَعْلَمُ كَثِيراً مِمَّا تَعْمَلُونَ (۲۲) وَذَلِكُمْ ظَنُّكُمُ الَّذِي ظَنَنتُم بِرَبِّكُمْ أَرْدَاكُمْ فَأَصْبَحْتُم مِّنْ الْخَاسِرِينَ} (২৩) সূরা ফুস্সিলাত

“(স্মরণ কর,) যেদিন আল্লাহর শত্রুদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার জন্য সমবেত করা হবে এবং ওদেরকে বিভিন্ন দলে বিন্যস্ত করা হবে, পরিশেষে যখন ওরা জাহান্নামের সন্নিকটে পৌঁছবে, তখন ওদের কান, চোখ ও দেহের চামড়া ওদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে সাক্ষ্য দেবে। জাহান্নামীরা ওদের চামড়াকে জিজ্ঞাসা করবে, 'তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে কেন?' উত্তরে চামড়া বলবে, 'আল্লাহ যিনি সমস্ত কিছুকে বাকশক্তি দিয়েছেন তিনি আমাদেরও বাকশক্তি দিয়েছেন।' তিনি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। তোমাদের কান, চোখ ও চামড়া তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে না---এ বিশ্বাসে তোমরা এদের নিকট কিছু গোপন করতে না; উপরন্তু তোমরা মনে করতে যে, তোমরা যা করতে তার অনেক কিছুই আল্লাহ জানেন না! তোমাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে তোমাদের এ ধারণাই তোমাদেরকে ধ্বংসে ফেলেছে। ফলে, তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছ।” (হা-মীম সাজদাহঃ ১৯-২৩)

সেদিন যারা তিরস্কৃত হয়ে জাহান্নামে স্থানলাভ করবে, তারাই আসল ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের ক্ষতিগ্রস্ততার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,

{لِيَمِينَ اللهُ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ وَيَجْعَلَ الْخَبِيثَ بَعْضَهُ عَلَى بَعْضٍ فَيَرْكُمَهُ جَمِيعاً فَيَجْعَلَهُ فِي جَهَنَّمَ أُوْلَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ} (৩৭) সূরা আল-আনফাল

"এ জন্যই যে, আল্লাহ কুজনকে সুজন হতে পৃথক করবেন এবং কুজনের এককে অপরের উপর রাখবেন, অতঃপর সকলকে স্তুপীকৃত করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন, এরাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।” (আনফালঃ ৩৭)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00