📄 সার্বিক সাফল্যের জন্য অনুসরণীয় নীতিমালা
কিছু নীতি আছে, যা অবলম্বন করলে সাফল্য অর্জন সহজ হয়ে যায়। নিম্নে তার কিছু উল্লিখিত হল।
১। মনছবি
সাফল্যের জন্য প্রয়োজন ব্যক্তির সাধ। সাধ-সাধ্য-সাধনা, তবেই পুরবে বাসনা। সাফল্য লাভের আকাঙ্ক্ষা, বাসনা ও স্পৃহা মনের মধ্যে জাগরূক না থাকলে সাফল্যের নাগাল পাওয়া সুকঠিন।
মনের মাঝে সাফল্যের মনছবি প্রস্তুত থাকতে হবে। আমি ক্লাশের ফার্স্ট হতে চাই। আমি প্রসিদ্ধ ডাক্তার হতে চাই। আমি বড় আলেম হতে চাই। আমি বড় সাহিত্যিক হতে চাই। আমি বড় ধনী হতে চাই। ইত্যাদি
মনের ভিতরে সেই সাধের ছবি তৈরি থাকলে সেই অনুযায়ী সাধনা কাজ করবে এবং সাধ্যাধীন হলে অবশ্যই সাফল্যকে শিকার করা যাবে।
সাফল্যের লক্ষ্যস্থল নির্ণয় করতে হবে। নচেৎ লক্ষ্যহীন সাধনায় ফললাভ সম্ভব নয়। যেমন অজানা গন্তব্যস্থলের দিকে পদযাত্রা নিরুদ্দেশ বা উন্মাদের আচরণ। কবি বলেছেন,
'এসেছি, তবে জানি না আমি এসেছি কোথা হতে,
চোখের সামনে পথ দেখেছি চলিতেছি সেই পথে।
এমনি ভাবে চলতে র’ব ইচ্ছে আমার যত,
কোথায় যাব তাও জানিনে পথই বা আর কত?’
মনের গতি যদি এমন হয়, তাহলে সাফল্যের রাজ্যে পদার্পণ করার স্বপ্ন কেবল নিদ্রার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
হ্যাঁ, যে জিনিসের স্বপ্ন আপনি দেখতে পারেন, সে জিনিসকে বাস্তবে আপনি লাভ করতে পারেন। সুতরাং শুরু করার আগে প্রত্যেক কর্মের মনছবি প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন।
মনছবি তৈরি করুন। মনের মাঝে সাফল্যের বিরাট আকাঙ্ক্ষা জাগরিত রাখুন। মনকে প্রতিশ্রুতি দিন যে, আপনি সাফল্য পাবেনই। সফলতা অবশ্যই আপনার পদচুম্বন করবে।
আর খবরদার! মনের ভিতরে দুর্বলতা আনবেন না, সন্দেহ, সংশয় ও দ্বিধা আনবেন না, ব্যর্থতার আশঙ্কা এনে মনকে শঙ্কিত করবেন না। নচেৎ সাফল্য আপনাকে ধরা দেবে না।
আপনি মনের মাঝে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল করতে পারেন যে, আপনি সফল, তাহলে আপনি সফল। আর যদি আপনার মন আপনাকে বলে, আপনি বিফল, তাহলে আপনি বিফল।
'এই সংসার সুখের কুটী, যার যেমন মন তেমি ধন, মনকে কর পরিপাটী।'
মানুষের মন অনুযায়ী মহান সৃষ্টিকর্তা ফল দিয়ে থাকেন। মানুষ যে নিয়ত করে, সে নিয়ত অনুযায়ী নিজ কর্মের ফলাফল প্রাপ্ত হয়। মহান আল্লাহ বলেন,
{وَمَن يُرِدْ ثَوَابَ الدُّنْيَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَن يُرِدْ ثَوَابَ الآخِرَةِ نُؤْتِهِ مِنْهَا وَسَنَجْزِي الشَّاكِرِينَ} (١٤٥) سورة آل عمران
অর্থাৎ, যে কেউ পার্থিব পুরস্কার চাইবে আমি তাকে তা হতে (কিছু) প্রদান করব এবং যে কেউ পারলৌকিক পুরস্কার চাইবে আমি তাকে তা হতে প্রদান করব। আর শীঘ্রই আমি কৃতজ্ঞদেরকে পুরস্কৃত করব। (আলে ইমরানঃ ১৪৫)
তিনি অন্যত্র বলেন, {وَمَنْ أَرَادَ الْآخِرَةَ وَسَعَى لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَئِكَ كَانَ سَعْيُهُم مَّشْكُورًا }
অর্থাৎ, যারা বিশ্বাসী হয়ে পরলোক কামনা করে এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে, তাদেরই চেষ্টা স্বীকৃত হয়ে থাকে। (সূরা ইসরা' ১৯ আয়াত)
{وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى} (۳۹) سورة النجم
অর্থাৎ, মানুষ তাই পায় যা সে চেষ্টা করে। (সূরা নাজম ৩৯ আয়াত)
মহানবী বলেছেন, "মহান আল্লাহ বলেন, আমি আমার বান্দার ধারণার কাছে থাকি। সে আমাকে ভালো ধারণা করলে ভালো পাবে। আর মন্দ ধারণা করলে মন্দ পাবে।” (সহীহুল জামে' ১৯০৫নং)
সে ছাত্র কোনদিন সফল ছাত্র হতে পারে না, যতদিন না তার মনে সফলতার প্রবল ইচ্ছা বাসা বেঁধেছে। সে ব্যক্তি কোনদিন সফল হতে পারে না, যতদিন না সাফল্য লাভের লোভ তার মনকে লোভাতুর ক'রে তুলেছে।
পঞ্চম খলীফা উমার বিন আব্দুল আযীয (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'আমার আছে উচ্চাকাঙ্ক্ষী মন। আমীর হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করলে আমীর হয়ে গেলাম। রাজকন্যা লাভ করার আকাঙ্ক্ষা করলে ফাতেমা বিন্তে আব্দুল মালেককে স্ত্রীরূপে লাভ করলাম। খলীফা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করলে খলীফা হলাম। এখন আমি জান্নাতী হওয়ার আকাঙ্ক্ষী। আশা করি আমি তাও হতে পারব।' (উয়নুল আখবার ১/৯৯, অফিয়াতুল আ'য়ান ২/৩০১)
২। লক্ষ্য স্থির করা
আপনি আপনার জীবনের লক্ষ্য স্থির করুন। আপনার জানা থাকা দরকার, আপনি কে? আপনি কোথায় ছিলেন? আপনি এ ধরাধামে কেন এসেছেন? আপনি কি নিজে এসেছেন, নাকি আপনাকে পাঠানো হয়েছে? আপনার জীবন কি ইহকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি মরণের পরেও অনন্তকালের জীবন আছে?
আপনি মুসলিম হলে অবশ্যই বিশ্বাস করেন, মরণের পর অনন্তকালের একটি জীবন আছে। ইহকালের জীবনে কেউ দ্বিতীয়বার ফিরে আসে না। আর পরকালের জীবনকে সুন্দর ও সুখের করার ব্যবস্থা ইহকালেই নিতে হবে। তাহলে আপনার লক্ষ্য হবে, পরকালের সুখী জীবন। আর সেই সাথে ইহকালেরও সুখী জীবন। আমরা প্রার্থনায় নিত্য কামনা ক'রে থাকি, رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ} 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ইহকালে কল্যাণ দান কর এবং পরকালেও কল্যাণ দান কর। আর আমাদেরকে দোযখ-যন্ত্রণা থেকে রক্ষা কর।'
পরন্তু যদি দুটি জীবনের মধ্যে একটি জীবনে সফল হতে হয়, তাহলে আপনি কোন্টিকে প্রাধান্য দেবেন? সত্তর-একশ' বছরের জীবনকে, নাকি অনন্ত কালের জীবনকে?
একটাকে বিক্রয় ক'রে যদি অন্যটাকে ক্রয় করতে হয়, তাহলে নিশ্চয় আপনি জ্ঞানী হলে দুনিয়াকে বিক্রয় ক'রে আখেরাতকে ক্রয় করবেন। দুটোর মধ্যে একটার এখতিয়ার দেওয়া হলে, নিশ্চয় আপনি ক্ষণস্থায়ী জীবনকে বর্জন ক'রে চিরসুখের জীবনকে প্রাধান্য দেবেন। তবুও আপনার টার্গেট হোক, উভয় জীবনের সুখ। লক্ষ্যস্থল হোক, উভয় জীবনের সাফল্য।
পার্থিব জীবনে সুখী হতে হলে মানবের পঞ্চপ্রয়োজনে আপনাকে অভাবমুক্ত থাকতে হবে। আর পঞ্চপ্রয়োজন সঠিকভাবে সংরক্ষিত হলে আপনি পারলৌকিক জীবন সুখের হবে।
সুতরাং আপনার জীবনের প্রথম লক্ষ্য হোক সাফল্যের জন্য পড়াশোনা করা। আর তাতে সাফল্য লাভ ক'রে আপনি কী হতে চান, তা নির্ধারণ করুন। দুনিয়ার সাফল্যমূলক কোন্ কর্ম আপনার লক্ষ্য, তা নির্ণয় করুন। আপনি ডাক্তার হয়ে, নাকি আলেম হয়ে, নাকি ইঞ্জিনিয়ার হয়ে সফল হতে চান, তা ঠিক করুন এবং আপনি আপনার মনের খাতায় সে কথা লিপিবদ্ধ করুন।
অভিজ্ঞগণ বলেছেন, কাগজের খাতায় লিপিবদ্ধ উদ্দেশ্য ৯০ শতাংশ পূর্ণ হয়। উদ্দেশ্য লেখা থাকলে তা পূরণের জন্য মানুষ বেশি সচেষ্ট ও উদ্যোগী হয়। লেখা দেখে ও পড়ে উদ্দেশ্য সাধনে মানুষ বেশি মনোযোগী হয়।
আপনি আপনার জীবনের মহান লক্ষ্য স্থির করুন। তাহলে আপনি আপনার জীবনের অর্থ বুঝতে পারবেন। আপনার সম্মুখে চলার পথ স্পষ্ট হয়ে যাবে। জীবনে বেঁচে থাকার স্বাদ অনুভব করবেন এবং জীবন আপনার কাছে তুচ্ছ মনে হবে না।
লক্ষ্যই আপনার সেই চ্যানেল, যার মাধ্যমে আপনি লাভ করবেন অনুপ্রেরণা, উৎসাহ ও উদ্যম।
লক্ষ্যই আপনাকে প্রত্যহ সকালে ঘুম থেকে উঠতে তাকীদ করবে, বিছানা ত্যাগ ক'রে কর্মস্থলে যেতে উদ্বুদ্ধ করবে এবং যথেষ্ট সময়ই তাতে ব্যয় করতে বাধ্য করবে।
লক্ষ্যই হল আপনার সেই ইন্ধন, যেখান থেকে আপনি আপনার কর্মে শক্তি, সামর্থ্য, স্ফূর্তি, সক্রিয়তা ও সজীবতা লাভ করতে থাকবেন।
লক্ষ্যহীন মানুষ জীবজন্তুর মতো জীবনধারণ করে। যেহেতু তার লক্ষ্য কেবল আহার করা ও নিদ্রা যাওয়া। লক্ষ্যহীন জীবন অনুর্বর ভূমির মতো, যাতে কোন উদ্ভিদ জন্মে না।
লক্ষ্যস্থল ঠিক রেখে তাতে প্রচেষ্টার তীর অবিরাম নিক্ষেপ করতে থাকুন। জিত আপনার হবেই।
বল খেলার ময়দানে খেলতে নেমে গোলপোস্টটা খেয়াল রেখে বলে কিক করতে থাকুন। অবশ্যই আপনি গোল করতে পারবেন।
লক্ষ্য স্থির হলে তবেই আপনি আপনার সাফল্য অর্জনে সাহস পাবেন, বীরত্ব ও দুর্দমনীয়তা পাবেন। নির্ভিক পদক্ষেপ করবেন।
লক্ষ্যস্থল একাধিক হওয়াতে দোষ নেই। সকল সম্ভাব্য লক্ষ্যেই আপনি পৌঁছতে সক্ষম হবেন।
পরকালের জীবনের সাথে ইহকালের লক্ষ্য, উভয় জগতে জান্নাত পাওয়ার লক্ষ্য আপনার স্থির থাক। তবে পরকালের উপর ইহকালকে প্রাধান্য দেবেন না। পরকাল যেন আপনার গৌণ বিষয় না হয়ে দাঁড়ায়।
লক্ষ্যস্থলে পৌঁছতে আপনি আপনার পেশাকে নেশায় পরিণত করুন। ঠিক একদিন আপনি আপনার গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাবেন।
সামাজিক কর্মের লক্ষ্যস্থল ঠিক রাখুন, যাতে আপনি আপনার পরিবার, পরিবেশ, সমাজ ও দেশ গড়তে সক্ষম ও সফল নাগরিক হন।
মানব-জীবনের লক্ষ্য বহুমুখী হতে পারে। আশার কি কোন শেষ আছে? যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। লক্ষ্যস্থলই জীবনকে গতিশীল ও কর্মময় ক'রে তোলে।
জীবনের বিভিন্ন স্তরে লক্ষ্য পরিবর্তনে দোষ নেই। কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব ও বার্ধক্য---প্রত্যেক স্তরে ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য হতে পারে।
মহান লক্ষ্যই আপনাকে আপনার জীবনের সকল পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে ফলদান করতে পারে।
লক্ষ্য ঠিক থাকলে সাফল্য একদিন আসবেই। শত বিফলতার পরেও সাফল্য অর্জন করা কোন উপকথা বা রূপকথার কাহিনী নয়।
৩। পরিকল্পনা ও সুকৌশল
সাফল্যের লক্ষ্য স্থির হয়ে তার মনছবি প্রস্তুত হলে তা বাস্তবায়নের জন্য সঠিক পরিকল্পনা চাই। বিনা পরিকল্পনায় যেমন একটি নির্মাণকাজ সুদৃঢ় ও সফল হতে পারে না, তেমনি যে কোনও সাফল্য লাভের কাজ পরিকল্পনাবিহীন হলে মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য।
জীবনের লক্ষ্যপথে চলার পরিকল্পনা, কীভাবে চললে অভীষ্ট লাভ হবে, কীভাবে করলে সাফল্য অর্জন হবে, তার সুচিন্তিত পদ্ধতি গ্রহণ এবং কর্ম-প্রণালীর নকশা তৈরি করা কাজ শুরু করার পূর্বে জরুরী। নচেৎ পরিকল্পনাহীন কাজে ব্যর্থতা অনিবার্য।
অভিজ্ঞগণ বলেছেন, 'বিফল মানুষ দুই শ্রেণীর; এক শ্রেণীর মানুষ করার ভাবনা-চিন্তা করে কাজ না ক'রে বিফল হয়। আর অন্য শ্রেণীর মানুষ চিন্তা-ভাবনা না ক'রে কাজ করার ফলে বিফল হয়।'
'পরিকল্পনার অসফলতা, অসফলতারই এক পরিকল্পনা।'
'কোন কাজে যার নিজস্ব পরিকল্পনা নেই, তার সাফল্য অনিশ্চিত।'
পরিকল্পনার সাথে সাথে কৌশল অবলম্বনও আবশ্যক। ঠিক সেই পথ ও মাধ্যম অবলম্বন করা জরুরী, যাতে সাফল্যের নিশ্চয়তা আছে। যেমন হরিণ শিকার করতে জঙ্গলে যেতে হবে, মাছ শিকার করতে পানিতে। ডাঙায় বসে কুমীর দর্শন হয়, শিকার হয় না।
আরবী কবি বলেছেন, ترجو النجاة ولم تسلك مسالكها . إن السفينة لا تجري على اليبس
পরিত্রাণ পেতে চাহ, চল না তার পথে, পানির জাহাজ কভু চলে না ডাঙ্গাতে।
৪। অনুরাগ ও আসক্তি যে কাজ আপনি করবেন, তার প্রতি আপনার অনুরাগ ও আসক্তি চাই। সে কাজ যেন আপনার ঘাড়ে চাপানো কোন দায়িত্ব না হয়। অতঃপর যখন সেটা আপনি করবেন, তখন এক প্রকার তৃপ্তি অনুভব করবেন। সে কাজ করতে কোন কষ্ট হলেও আপনি তাতে কোন প্রকার কষ্টবোধ করবেন না। কারণ, আপনি সে কাজকে খুব ভালোবাসেন।
জ্ঞানিগণ বলেছেন, 'যে কর্তব্য আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়, তা শেষ পর্যন্ত আনন্দের উৎস হয়। তাই কোন কাজ শুরু করতে হলে শুরু করতে হয় একটি জ্বলন্ত আকাঙ্ক্ষা দিয়ে। অল্প আগুন যেমন অনেক উত্তাপ দিতে পারে না, তেমনি দুর্বল ইচ্ছাশক্তি দ্বারা কোন মহৎ সিদ্ধিলাভ করা যেতে পারে না।
জীবনের রহস্য এই নয় যে, আপনি আপনার পছন্দনীয় কাজটি করবেন; বরং যে কাজই করবেন, তা পছন্দ করবেন। জীবনে যেটা চেয়েছেন, সেটা যদি না পান, তাহলে যেটা পেয়েছেন, সেটাকেই জীবনের চাহিদা বানিয়ে নিন।'
পক্ষান্তরে যে কাজ আপনি করেন, তা করতে যদি নিজেকে ছোট বোধ করেন, তাহলে তাতে কোন প্রকার উন্নতির সম্ভাবনা নেই। বরং মনে রাখতে হবে, 'জীবিকার নাই উচ্চ বা নীচ, কোন কাজ নয় হীন, আলস্য পাপ, তাই সঞ্চিত পুণ্যেও করে ক্ষীণ।' ওই দেখুন না,
'জাল কহে, পঙ্ক আমি উঠাব না আর, জেলে কহে, মাছ তবে পাওয়া হবে ভার।'
সুতরাং সকলের উচিত, সাফল্যের জন্য নিজ নিজ কর্ম, জীবিকা ও পেশাকে খুব ক'রে ভালোবাসা।
'অন্নের লাগি মাঠে লাঙলে মানুষ মাটিতে আঁচড় কাটে কলমের মুখে আঁচড় কাটিয়া খাতার পাতার তলে মনের ফসল ফলে।'
৫। বাস্তবিকতা
সাফল্য লাভের বাস্তব পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। কেবল খেয়াল ও কল্পনার জগতে সাফল্যের রঙিন স্বপ্ন নিয়ে পড়ে থাকায় লাভ নেই। বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও সংকল্প মানুষকে সাফল্যের পথে অগ্রসর হতে সহযোগিতা করে। আকাশ-কুসুম অবাস্তব কল্পনার জগতে থেকে সাফল্যের সোনার হরিণ ধরা যায় না। খেয়ালী পোলাও খাওয়া যায়, কিন্তু তাতে তৃপ্তি হয় না, পেট ভরে না, ক্ষুধা যায় না। অসম্ভব আশা ও দুরাশা নিরাশা ছাড়া আর কী দিতে পারে?
যার বাসনা ও কামনা অবাস্তব দীর্ঘ ও বিশাল হয়, তার কর্ম মন্দ হয়। আর যার কর্ম মন্দ হয়, তার সকল চেষ্টাই ব্যর্থ ও পন্ড হয়।
৬। নমনীয়তা বা নম্যতা
সাফল্য লাভের পথে বহু জায়গায় নমনীয়তা স্বীকার করার প্রয়োজন পড়বে। সে ক্ষেত্রে নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে তা স্বীকার করার জন্য। কারণ আপনি আপনার মতো পথ চলবেন, তা নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ত্যাগ স্বীকার করতে হলে করতে হবে, তবেই সাফল্যের নাগাল পাবেন।
না না, আমি ঈমান ও দ্বীনের ব্যাপারে ত্যাগ স্বীকার করার কথা বলছি না, এটা তো সম্ভবই নয়। আপনার অর্থ, আরাম-আয়েশ, প্রেম-ভালোবাসা ইত্যাদির ব্যাপারে কিছু ত্যাগ স্বীকার তো করতেই হবে। কিছু পেতে হলে কিছু তো দিতেই হবে---এ রীতি তো চিরন্তন। সুতরাং ব্যথা-বেদনা ও বিপদ-দুর্ঘটনার সময় নিজেকে স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রাখতে হবে।
সাফল্য অর্জনের পথে যে কোন পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক জ্ঞান করতে হবে। পথ পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়লে পরিবর্তন করতে হবে। আর সে নতুন পথকেও সাফল্যের পথ বলেই অবলম্বন করতে হবে। প্রাপ্তিতে টক এলেও তা মিঠা শরবতে দিয়ে পান করতে হবে।
পথ চলতে শুধু সামনেই তাকালে হয় না, প্রয়োজনে পিছন ফিরেও দেখতে হয়। জীবনে উচুতে উঠতে হলে একটু নিচুতে নামতে হয়।
পিঠ বাঁকানো ছাড়া পাহাড়ে ওঠা সম্ভবই নয়। মহৎ কিছু করতে গেলে কখনো কখনো এক-আধটুকু আঘাত সহ্য করতে হয় বৈকি। জীবন-ঝড়ে কখনো কখনো নুয়ে পড়তে হয়। আবার সোজা হয়ে দাঁড়াতে হয় সাফল্যের আশায়। মহানবী বলেছেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِ كَمَثَلِ الْخَامَةِ مِنَ الزَّرْعِ تُفَيِّتُهَا الرِّيَاحُ تَصْرَعُهَا مَرَّةً وَتَعْدِلُهَا حَتَّى يَأْتِيَهُ أَجَلُهُ وَمَثَلُ الْمُنَافِقِ مَثَلُ الْأَرْزَةِ الْمُجْنِيَةِ الَّتِي لَا يُصِيبُهَا شَيْءٌ حَتَّى يَكُونَ انْجِعَافُهَا مَرَّةً وَاحِدَةً ..
"মু'মিনের উদাহরণ হল নরম ফসলের মত, বাতাস তা হিলাতে-দুলাতে থাকে। মু'মিন বিপদগ্রস্ত হয় (আবার উঠে দাঁড়ায়)। পক্ষান্তরে (কাফের) মুনাফিকের উদাহরণ হল 'আরযা' (বিশাল সীডার) গাছের মত। তা বাতাসে হিলে না। কিন্তু (ঝড়ে) ভেঙ্গে ধ্বংস হয়ে যায়।” (বুখারী ৭৪৬৬, মুসলিম ৭২৭৩নং)
৭। ঝুঁকি
সাফল্যের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। ফুল-বিছানো পথ কাউকে মর্যাদার উচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে না। জীবন চলার পথে পড়ে আছে অসংখ্য পাথর। এতে আপনার চলার গতি যেন থেমে না যায়। বরং পাথরগুলি কুড়িয়ে নিয়ে তৈরি করুন সাফল্যের সিঁড়ি।
আপনি সাফল্য অর্জনের পথে চলবেন, আর তাতে ঝুঁকি থাকবে না? কোন বাধা আসবে না, এমন হতে পারে না। অতএব আপনি হবেন সেই অদম্য উৎসাহী মানুষের মতো, যে 'আসুক যত বাধা পথে, হারবে না সে কোন মতে।' আর 'একটি কথা ভেবে বলুন, কোন্ পথে নেই ঝুঁকি? জীবন চলার পথে ঝুঁকি সবখানে দেয় উকি।'
যে জাহাজ মহাসমুদ্রে যাত্রা করে, তার ঝড়ের মুখে পড়ার ঝুঁকি আছে। কিন্তু যে জাহাজ বন্দরে থাকে, সে জাহাজেরও ধীরে ধীরে মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে যাবার ঝুঁকি থাকে। ঝুঁকি না নিয়ে বিজয় লাভ হয় না। বাস দুর্ঘটনায় লোক মরছে দেখে যদি কেউ বাসে না চড়ে, ট্রেন দুর্ঘটনায় মানুষ মরছে দেখে যদি কেউ ট্রেনে না চড়ে, সে চালাক হতে পারে। কিন্তু বহু লোক বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় মারা যেতে দেখে যদি কেউ বিছানায় না শোয়, তাহলে তাকে আপনি কী বলবেন?
লোকে বলে, 'কামার লোহা চুরি করে' তবুও অস্ত্র গড়তে হবে। বলে, 'স্বর্ণকার স্বর্ণ চুরি করে' তবুও অলংকার গড়াতে হবে।
প্রত্যেক ব্যবসাতে যে লাভই হবে এবং নোকসান হবে না, সে কথার নিশ্চয়তা নেই। সাফল্য অনুসন্ধানের পথে ঝুঁকি আসবেই, দুঃখ-কষ্ট আসবেই। কিন্তু গৌরবলাভের পথে কষ্ট বড় মিষ্ট।
সাফল্য লাভ করতে হবে ঝুঁকির মধ্য দিয়েই, বিপদ ও বাধা উল্লংঘন করেই। শান্ত সমুদ্রে কখনো সুদক্ষ নাবিক হওয়া যায় না।
মধু পেতে হলে মৌমাছির হুল খেতে হয়। যারা মধুচোর, তারা মৌমাছিকে বশ করেই মধু আহরণ করে।
'বিফলতা আমাদের অকেজো করে, কিন্তু জীবনে যারা জয়ী হয়েছে, বিফলতার উপর ভিত্তি করেই তাদের সৌভাগ্যের প্রাসাদ রচিত।'
নিশ্চয় শুনে থাকবেন, বিদ্যুতের আলো ইত্যাদি আবিষ্কারকারী বিজ্ঞানী ১৮০০ বার তাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তবুও তিনি নিরাশ হননি, পিছু হটেননি। পরিশেষে এই বিশাল উপকারী জিনিসটি আবিষ্কার করতে সফল হয়েছিলেন।
ব্যর্থতার ঝুঁকি মাথায় রেখেই চেষ্টার পর চেষ্টা চালিয়ে গেলে তবেই সাফল্যের তালা খোলা যায়। মনে রাখবেন, একমাত্র সেই ব্যর্থ হয় না, যে কর্ম করে না। আপনি ব্যর্থ না হলে কখনই সফল হবেন না। ব্যর্থতা হল সফলতার সুযোগ ও অভিজ্ঞতা। ব্যর্থতাকে ভয় পাবেন না। ব্যর্থ প্রয়াসকে পুনরায় সফল করতে পিছপা হবেন না। ব্যর্থতা হল সাময়িক পরাজয়, যা সাফল্য সৃষ্টি করে।
ব্যর্থতাকে ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। ব্যর্থ লোকেরাই ব্যর্থতাকে ভয় পায়। ব্যর্থতার সিঁড়ি বেয়েই সফলতার চূড়ায় পৌঁছনো সম্ভব হয়।
যে পতনকে ভয় করে, সে কোন দিন জয়লাভ করতে পারে না। কোন কোন অসফলতা সফলতার দ্বার উদ্ঘাটন করে এবং সফলতার চাইতে অসফলতাই মানুষকে অধিক শিক্ষা দিয়ে থাকে। অতএব নির্ভয়ে কবির ভাষায় বলুন,
'আমি ভয় করব না, ভয় করব না দুবেলা মরার আগে মরব না ভাই মরব না। তরীখানা বাইতে গেলে, মাঝে মাঝে তুফান মেলে--- তাই বলে হাল ছেড়ে দিয়ে কান্নাকাটি করব না।'
সৎ লোক ৭ বার বিপদে পড়লেও আবার ওঠে, কিন্তু অসৎ লোক বিপদে পড়লে একেবারেই নিপাত হয়।
মহানবী বলেছেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِ كَمَثَلِ الْخَامَةِ مِنَ الزَّرْعِ تُفِيئُهَا الرِّيَاحُ تَصْرَعُهَا مَرَّةً وَتَعْدِلُهَا حَتَّى يَأْتِيَهُ أَجَلُهُ وَمَثَلُ الْمُنَافِقِ مَثَلُ الْأَرْزَةِ الْمُجْذِيَةِ الَّتِي لا يُصِيبُهَا شَيْءٌ حَتَّى يَكُونَ انْجِعَافُهَا مَرَّةً وَاحِدَةً
"মু'মিনের উদাহরণ হল নরম ফসলের মত, বাতাস তা হিলাতে-দুলাতে থাকে। মু'মিন বিপদগ্রস্ত হয় (আবার উঠে দাঁড়ায়)। পক্ষান্তরে (কাফের) মুনাফিকের উদাহরণ হল 'আরযা' (বিশাল সীডার) গাছের মত। তা বাতাসে হিলে না। কিন্তু (ঝড়ে) ভেঙ্গে ধ্বংস হয়ে যায়।” (বুখারী ৭৪৬৬, মুসলিম ৭২৭৩নং)
তিনি আরো বলেছেন,
الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِن الضَّعِيفِ وَفِي كُلِّ خَيْرٌ احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ وَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ وَلَا تَعْجَزْ وَإِنْ أَصَابَكَ شَيْءٌ فَلا تَقُلْ لَوْ أَنِّي فَعَلْتُ كَانَ كَذَا وَكَذَا. وَلَكِنْ قُلْ قَدَرُ اللَّهِ وَمَا شَاءَ فَعَلَ فَإِنَّ لَوْ تَفْتَحُ عَمَلَ الشَّيْطَانِ ..
"সবল মু'মিন আল্লাহর নিকট দুর্বল মু'মিন অপেক্ষা প্রিয়তর ও ভালো। অবশ্য উভয়ের মাঝেই কল্যাণ রয়েছে। তোমার যাতে উপকার আছে তাতে তুমি যত্নবান হও। আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর, আর অক্ষম হয়ে বসে পড়ো না। কোন মসীবত এলে এ কথা বলো না যে, '(হায়) যদি আমি এরূপ করতাম, তাহলে এরূপ হতো। (বা যদি আমি এরূপ না করতাম, তাহলে এরূপ হতো না।)' বরং বলো, 'আল্লাহ তকদীরে লিখেছিলেন। তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন।' (আর তিনি যা করেন, তা বান্দার মঙ্গলের জন্যই করেন; যদিও তুমি তা বুঝতে না পার।) পক্ষান্তরে 'যদি-যদি না' (বলে আক্ষেপ) করায় শয়তানের কর্মদ্বার খুলে যায়।” (আহমাদ ৮-৭৯১, ৮৮২৯, মুসলিম ৬৯৪৫, ইবনে মাজাহ ৭৯, সহীহুল জামে' ৬৬৫০ নং)
অসফলতা মানে ঘুরে দাঁড়াবার প্রস্তুতি। বিফলতা দুর্বলদের পথ-সমাপ্তি, কিন্তু সবলদের পথের শুরু।
পরাজয় মানেই সমাপ্তি নয়, যাত্রা একটু দীর্ঘ হওয়া মাত্র। ব্যর্থতা একটু ঘুর-পথ। পথের শেষ নয়। এর ফলে সাফল্যে বিলম্ব ঘটে, কিন্তু পরাজয় ঘটে না। আমাদের ভুলগুলি আমাদের অভিজ্ঞতাকেই সমৃদ্ধ করে।
'আসছে পথে আঁধার নেমে
তাই বলে কি রইবি থেমে
বারে বারে জ্বালবি বাতি
হয়তো বাতি জ্বলবে না,
তাই বলে তোর ভীরুর মত
বসে থাকা চলবে না।'
বলা বাহুল্য, পথ চলতে চলতে পড়ে যাওয়াটা মানুষের বিফলতা নয়, বিফলতা হল যেখানে সে পড়ে যায়, সেখানেই পড়ে থাকাটা।
'যে মাটিতে পড়ে লোক ওঠে তাই ধরে,
বারেক হতাশ হয়ে কে কোথায় মরে?
বিপদে পতিত তবু ছাড়িব না হাল,
আজিকে বিফল হলে হতে পারে কাল।'
নিশ্চয় আপনি সকল বিপদ ও বাধায় আশায় বুক বেঁধে বলতে পারেন, 'আমার সকল কাঁটা ধন্য করে ফুটবে গো ফুল ফুটবে, আমার সকল ব্যথা রঙিন হয়ে গোলাপ হয়ে উঠবে।'
নিশ্চয়ই অন্ধকার স্থায়ী হয় না। অন্ধকারের পর আলো আসে। তাই রাত-দিন হয়। সূর্য ডোবে বলেই সকাল হয়। সুতরাং রাত্রির অন্ধকার দেখে আপনি ভয় করবেন না, কারণ রাত্রির অন্ধকারের পর আপনার জন্য একটি সুন্দর দিন অপেক্ষা করছে। আকাশের মেঘের ঘনঘটা দেখে আমাদের ভয় পাওয়া উচিত নয়। কারণ সময় হলে মেঘ সরে যাবে।
'মেঘ দেখে কেউ করিনে ভয়
আড়ালে তার সূর্য হাসে,
হারা শশীর হারা হাসি
অন্ধকারেই ফিরে আসে।'
অনেক সময় এমনও হতে পারে, সাফল্যের নাগাল দূর মনে হয়ে আপনি নিরাশ হয়ে যাবেন। দুর্নাম রটেছে বলে অথবা অন্য কোন সাময়িক কারণে হয়তো আপনি আর সংগ্রাম চালিয়ে যেতে পারবেন না, হয়তো আপনি আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারবেন না ধারণা হবে। হয়তো আপনি ঘুরপথে ফিরে আসতে চাইবেন, বিফলতা লক্ষ্য ক'রে হয়তো আপনি আপনার বই-পত্র বিক্রয় করতে চাইবেন, আপনার যন্ত্রাদি ও গবেষণাগার বিক্রয় করতে চাইবেন, আপনার সাফল্যের সকল মাধ্যম থেকে নিষ্কৃতি পেতে চাইবেন। কিন্তু কবি আপনাকে আশা দিয়ে বলেছেন,
'শীতে ফুলের গাছ গেছে শুকাইয়া,
পাতাগুলি সমুদয় পড়েছে ঝরিয়া।
করো না করো না ভাই তাহারে ইন্ধন,
ভিতরে দেখহ তার মধুর কেমন।
বহিবে অচিরে যবে বসন্তের বায়,
হাসিবে গোলাপ তার শাখায় শাখায়।
গৌরবে তাহার হবে কানন উজ্জ্বল,
ভাবিও না আজি তার জীবন বিফল।
অন্তর নয়নে দেখ, ভিতরের রূপ।
বাহির দেখিয়া শুধু হয়ো না বিরূপ।'
৮। অগ্রাধিকার
সফল ব্যক্তিবর্গ কেবল একটাই কাজ করেন না। সুতরাং বিভিন্ন কাজের ভিড় জমলে তাঁরা সেই কাজটাকে আগে করেন, যেটা আগে করা দরকার। সেই কাজটা তাঁদের কাছে গুরুত্ব পায় না, যেটা করলে লাভ আছে। বরং তাঁরা সেই কাজকে অগ্রাধিকার দেন, যা না করলে ক্ষতির আশঙ্কা আছে। তাঁরা সর্বদা অপেক্ষাকৃত লাভ-ক্ষতির খতিয়ান দেখে কাজ করেন। যে কাজটা আগে করা জরুরী সে কাজটা আগে করেন, তারপর তার পরেরটা, তারপর তার পরেরটা।
জীবনের একাধিক লক্ষ্য হলে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যে সর্বপ্রথম পৌছতে সচেষ্ট হন। বড় লক্ষ্যের আগে ছোটগুলির দিকে মন দেবেন না। নচেৎ বড় ছেড়ে ছোট লক্ষ্যের পিছনে দৌড় দিলে এমনও হতে পারে, তাতেই আপনার জীবন ফুরিয়ে যাবে।
বিদ্বানগণ বলেন, 'যে ব্যক্তি ছোট ছোট লক্ষ্যগুলির প্রতি নিজ মনোযোগিতা ব্যয় করে, সে ব্যক্তি সেই সব উল্লেখযোগ্য কোন লক্ষ্যে পৌঁছনোর পূর্বেই নিজের আয়ু ক্ষয় ক'রে বসে। যেমন তিমি সমুদ্রের ছোট ছোট সার্ডিন মাছের পিছনে মনোযোগ রেখে ছুটতে থাকে। যে মাছের দল ছুটতে থাকে উপকূলের দিকে। অবশেষে উপকূলের বালিতেই আটকে পড়ে জীবন নষ্ট ক'রে ফেলে।
বলা বাহুল্য, একটার পর একটা সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যে পৌঁছনোর চেষ্টায় নিরত হন। ছোটগুলির প্রতি মন দিলে পরে দিতে পারেন।
অনেক সময় কোন কাজ অসম্ভব মনে হলে সফল ব্যক্তি যা অতি প্রয়োজনীয় কাজ তা দিয়ে শুরু করেন, তারপর যা সম্ভবপর তা শুরু করেন, অবশেষে দেখা যায় যে, অসম্ভব কাজও সম্ভব হয়ে যাচ্ছে।
'এক পা দুই পা করি ধীরে ধীরে অগ্রসরি
করে নর অতি উচ্চ গিরি উল্লঙ্ঘন।'
সফল ব্যক্তি আজকে যে কাজ করা জরুরী, সে কাজ কালকের জন্য অবশিষ্ট রাখেন না। দীর্ঘসূত্রতা তাঁর কাজে বাধ সাধতে পারে না। কারণ দীর্ঘসূত্রতা ও অলসতা বিফলতার সিংহদ্বার।
৯। উন্নতির আগ্রহ
করণীয় কাজের জন্য গর্ববোধ থাকলে সেই কাজের উৎকর্ষ বৃদ্ধি পায়। নিজ কর্মে ভালোবাসা থাকলে উৎপাদন ভালো হয়। প্রত্যেক কর্মের মধ্যে কর্মীর দক্ষতা ও মনোভাবের ছায়া থাকে। তা দেখলেই অনুমান করা যাবে, কর্মীর কাজে আগ্রহ ছিল কি না?
যে কাজই করুন, তার মধ্যে আপনার আগ্রহ থাকা উচিত। মনকে বাধ্য ক'রে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে কাজে মনোযোগ দেওয়া সম্ভব নয়, সম্ভব নয় তাতে সাফল্য লাভ।
সাফল্যের মান যেমনই হোক, যদি তাতে আপনার আগামী কাল আজকের মতো হয়, তাহলে আপনি ক্ষতিগ্রস্ত। যদি আপনার আগামী কাল গতকালের মতো হয়, তাহলে আপনি ব্যর্থ, আর যদি আপনার আগামী কাল অধিক ভালো হয়, তাহলে আপনি আপনার কর্মকে ভালোবাসেন, আপনি অগ্রগতি ও উন্নতি পছন্দ করেন এবং আপনি সফল।
কবি বলেছেন, 'আগে চল্ আগে চল্ ভাই, পড়ে থাকা পিছে মরে থাকা মিছে বেঁচে কী ফল ভাই।'
মনে রাখবেন, কাজের ভিতরে উন্নতির লোভ থাক। কিন্তু তাতে যেন 'রিয়া' এসে বাসা না বাঁধে। তাতে যেন সুখ্যাতি, সুনাম ও প্রসিদ্ধির লোভ না থাকে। নচেৎ জানেন তো, কর্মটাই আপনার বিফল যাবে।
১০। আত্মবিশ্বাস, সাহসিকতা
প্রত্যেক যুদ্ধের জন্য বীরত্ব আবশ্যক। সফলতার জীবন-যুদ্ধ তার থেকে আলাদা কিছু নয়। তাতেও প্রয়োজন প্রচন্ড সাহস ও বীরত্বের। দরকার আত্মবিশ্বাস ও সকল ভয়কে জয় করার সুদৃঢ় সংকল্প।
একজন মু'মিন মানুষের মাঝে থাকে মহাশক্তিমান আল্লাহর প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বাস ও পরিপূর্ণ ভরসা। এই ভরসাই তাকে পথ দেখায়, এই ভরসাই তার চলার পথে আলো দেখায়, এই ভরসাই তাকে শক্তি ও সাহস যোগায়।
আত্মবিশ্বাস মানুষকে সাফল্যের স্বপ্ন দেখায়। কর্ম তা বাস্তবে পরিণত করে। আত্মবিশ্বাসই গাড়ির ইন্ধন, যা সফলতার গন্তব্যের দিকে দ্রুত অগ্রসর করে।
সুতরাং সাফল্যের জন্য আত্মবিশ্বাস ও তার অনুভব একান্ত জরুরী জিনিস। সকল বাধাকে উল্লংঘন করার সাহসিকতা ও মানসিক প্রস্তুতি অবশ্যই প্রয়োজন। জীবন-সফরে ভয় আসতে পারে, মনে ভয় হতে পারে, সেটা ভীরুতা নয়। ভীরুতা হল আমরণ অশ্বারোহী না থেকে বিজয়ের আশা ত্যাগ করা।
আপনি হয়তো জানেন না, আপনার মাঝে কী কল্যাণ আছে? আপনিও কোন বিষয়ে চরম সাফল্য অর্জন করতে পারেন। আপনি নিজেকে চিনুন এবং সে সুপ্ত শক্তিকে জাগ্রত করুন এবং সাফল্যের দুয়ারের কড়া নাড়ুন।
আপনার মধ্যে যে প্রতিভাগুলি আছে, তার লালন করুন। যে পরিবেশে তার যথার্থ প্রতিপালন ও বাড়-বাড়ন্ত হতে পারে সেখানে গিয়ে বাসা বাঁধুন। সাফল্যের পাখি আপনার জীবন-বৃক্ষে বাসা বাঁধবে।
অবশ্য কর্মের শুরুতে সবচেয়ে কঠিন কাজ হল, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। তার জন্য সৎ সাহসের প্রয়োজন আছে। প্রয়োজন আছে আল্লাহ-ভরসা ও অন্যের অনুপ্রেরণার।
পথ চলতে চলতে অন্ধকারে আপনি সাহস হারিয়ে ফেলবেন না। বিশ্বাস রাখুন, আলোর সন্ধান পাবেনই।
দুর্বল হয়ে বসে যাবেন না বা ভেঙ্গে পড়বেন না। কারণ মনের দিক দিয়ে যে দুর্বল, কর্মক্ষেত্রেও সে দুর্বল।
আর আপনি যদি জ্ঞানী হন, তাহলে মনে রাখুন, জ্ঞানী লোকেরা কখনো পরাজয়ের পর নিরাশ হয়ে অলসভাবে বসে থাকে না। তারা চেষ্টা করে পরাজয়ের ফলে যে ক্ষতিটা হয়ে গেছে, তা পূরণ করতে।
অবশ্য এ কথা ঠিক যে, 'সাধ থাকলে সাহস এসে যায়।' সুতরাং সাফল্যের প্রতি আপনার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকলে অবশ্যই সাহসশূন্য ও নিরুৎসাহ হয়ে ঝিমিয়ে যাবেন না। আর বিজ্ঞদের পরামর্শ মনে রাখবেন, 'পরাজয়কে মেনে নিলে তুমি পরাজিত। মনে যদি তোমার সাহস না থাকে, তবে জেতার আশা করো না। যদি মনে দ্বিধা থাকে তুমি পারবে কি না, তাহলে মনে রেখো তুমি হেরেই গেছ। হারবে ভাবলে, হার তোমার হবেই। কারণ সাফল্য থাকে মনের ইচ্ছা শক্তিতে, মনের কাঠামোতে। যদি ভাব অন্যদের তুলনায় তোমার কাজের মান নিচু, তাহলে তুমি নিচেই থাকবে। যদি তুমি ওপরে উঠতে চাও, তাহলে নিজের মনে সংশয় রেখো না। জীবনযুদ্ধে সব সময় বলবান ও দ্রুতগামীরা জেতে না, যে আত্মবিশ্বাসে অটল, সে আজ হোক, কাল হোক, জিতবেই। আত্মবিশ্বাসই প্রত্যেক সফলতার প্রধান কারণ।'
১১। আশাবাদিতা
আশাবাদী মানুষ চারিদিক অন্ধকারের মাঝে আলো দেখতে পায়। পক্ষান্তরে যে আশাবাদী নয়, সে চারিদিক আলোর মাঝে অন্ধকার দেখতে পায়। জীবনে সাফল্য, হৃদয়ে প্রশান্তি ও সুখলাভের একমাত্র মাধ্যম হল আশাবাদিতা। আশাই মানুষকে বাঁচার প্রেরণা দেয়, আশাই মানুষকে উচ্চতার দিকে উড্ডীন করে।
পক্ষান্তরে নিরাশাবাদিতা হল বুদ্ধির ক্ষয়রোগ। মনের মাটিতে সাফল্যের চারা গাছকে ধীরে ধীরে নষ্ট ক'রে ফেলে।
অবশ্য আশাবাদিতার মানে এই নয় যে, আপনি বাস্তবকে অগ্রাহ্য ও অস্বীকার করবেন; বরং আশাবাদিতা হল হতাশার অন্ধকার অগ্রাহ্য ক'রে আশার আলো জ্বালিয়ে আপনি কাজের পথে অগ্রসর হবেন। আশাবাদিতা মানে সর্বদা ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করা। আশাবাদিতা মানে ঘটনার নেতিবাচক ব্যাখ্যা না করা।
'আমি পারব না। আমার দ্বারা হবে না। আমি ধ্বংস হয়ে যাব। আমার ভাগ্য মন্দ। আমার কপালে সাফল্য নেই। আমার কষ্ট ঘুচবে না।' ইত্যাদি নেতিবাচক কথা মাথায় না রেখে এর বিপরীত কথাকে মনে-মগজে স্থান দিতে হবে। 'আমি পারব। আমার দ্বারা হবে। আমি ধ্বংস হয়ে যাব না। আমার ভাগ্য মন্দ নয়। আমার কপালে সাফল্য আছে। আমার কষ্ট ঘুচবে ইন শাআল্লাহ।'
একটি উদাহরণ দ্বারা বিষয়টি স্পষ্ট করা যাক। এক সংসারে জমজ ভাই ছিল। তাদের মধ্যে একজন কিশোর ছিল আশাবাদী, সর্বদা ইতিবাচক চিন্তা করত, ইতিবাচক কথা বলত। দুনিয়ার প্রত্যেক জিনিসকে সুন্দর বলত। কোন জিনিসের মধ্যে সুন্দর-অসুন্দর উভয়ই থাকলেও সে তার সুন্দর দিকটা দেখে মুগ্ধ হতো।
পক্ষান্তরে অপর কিশোরটি ছিল সহোদরের বিপরীত। সে ছিল নিরাশাবাদী এবং সর্বদা নেতিবাচক চিন্তা করত ও নেতিবাচক কথা বলত। দুনিয়ার প্রত্যেক জিনিসকে অসুন্দর বলত। কোন জিনিসের মধ্যে সুন্দর-অসুন্দর উভয়ই থাকলেও সে তার অসুন্দর দিকটা দেখে বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হতো।
একদা তাদের পিতামাতা উভয়কে একটি ক'রে উপহার দিল। নিরাশাবাদী তার উপহারের প্যাকেট খুলে দেখল, তাতে রয়েছে ল্যাপটপ। তা দেখে তার খুশী হওয়ার কথা। কিন্তু না। সে তার নেতিবাচক চিন্তাধারা নিয়ে বলতে লাগল, 'এটা ভালো নয়। এর রঙটা বিশ্রী। এটা ভেঙ্গে যাবে। এটা দামী নয়। আমি এ উপহার পছন্দ করি না। অমুকের বাবা এর থেকে ভালো উপহার আনে।' ইত্যাদি।
আশাবাদী কিশোরটি তার উপহারের প্যাকেট খুলে দেখল, তাতে রয়েছে ঘোড়ার খাবার। সে তা হাতে নিয়ে খুশীতে বাতাসে উড়াতে লাগল এবং সহাস্যে বলতে লাগল, 'আমি জানি, তোমরা আমাকে ধোঁকা দেবে না। নিশ্চয় ছোট্ট ঘোড়ার বাচ্চা আমার জন্য লুকিয়ে রেখেছ।'
নিঃসন্দেহে আশাবাদী ও ইতিবাচক ব্যক্তিত্বরাই সুখের সন্ধান পায়, সাফলের নাগাল পায়। মন্দের ভালো দিকটা দেখে তার মাধ্যমেই বিজয়ের সুসংবাদ শোনার চেষ্টা করে এবং পরিশেষে সে বিজয়ী রূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
আশাবাদী নিজের শক্তি ও বুদ্ধিমত্তার প্রতি সুধারণা রাখে। আর সুধারণা রাখলে সেই মতো সুফল লাভ করে। যেমন মহান আল্লাহর প্রতি যে সুধারণা রাখে, সে তাঁকে সেই রূপ পায় এবং যে কুধারণা রাখে, সে ধ্বংস হয়। হাদীসে কুদসীতে আছে, মহান আল্লাহ বলেন,
(أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي ، وَأَنَا مَعَهُ حَيْثُ يَذْكُرُنِي)).
'আমি সেইরূপ, যেরূপ বান্দা আমার প্রতি ধারণা রাখে। আমি তার সাথে থাকি, যখন যে আমাকে স্মরণ করে।' (বুখারী ৭৮০৫ নং, মুসলিম ৭১২৮নং)
'বান্দা যদি আমাকে ভালো ধারণা করে, তাহলে আমি (তার জন্য) ভালো। আর সে যদি আমাকে মন্দ ধারণা করে, তাহলে আমি (তার জন্য) মন্দ।' (সিঃ সহীহাহ ১৬৬৩নং)
বলা বাহুল্য, আশাবাদী হয়ে কর্মের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। প্রথম স্থান অধিকার করার আশায় পড়াশোনায় মন দিতে হবে পড়ুয়াকে। বেশী লাভের আশায় ব্যবসায় মন দিতে হবে ব্যবসায়ীকে। জয়ী হওয়ার আশায় নেমে পড়তে হবে জীবন-যুদ্ধে।
একজন মু'মিন কোন জিনিসে অশুভ ধারণা করে না। কারণ তা শির্ক। অবশ্য শুভ ধারণা ক'রে কর্মে অগ্রসর হয়। তাঁর ভরসা থাকে নিজ প্রতিপালকের উপর। তাঁর কাছেই আস্থা রাখে সকল সাফল্যের।
অতএব আল্লাহর কাছে আশা রেখে, তাঁর উপর পরিপূর্ণ ভরসা রেখে, সকল বাধা লংঘন ক'রে সাফল্যের রাজ্য জয়লাভ করতেই হবে আপনাকে। অবশ্যই আপনি সফল হবেন। অবশ্যই আপনি 'সফল মানব'।
১২। ভালোবাসা ও সম্প্রীতি
সাফল্যের একটি প্রাসঙ্গিক বিষয় ভালোবাসা। মানুষকে ভালোবাসা। অবশ্য অবৈধ প্রণয়ের কথা বলছি না। মানুষের মাঝে পারস্পরিক সম্প্রীতির কথা বলছি। পরিবেশের মানুষকে ভালোবাসলে সুপরামর্শ পাওয়া যায়। পরিমন্ডলের মানুষকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করলে উৎসাহ পাওয়া যায়। চারিপাশের মানুষকে ভালোবাসলে সহযোগিতা পাওয়া যায়। আর যে কোন সাফল্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন অপরের সুপরামর্শ, উৎসাহ ও সহযোগিতার। আর তা ভালোবাসা ছাড়া অর্জন করা সম্ভব নয়। আমাদের মহানবী বলেছেন,
(( لَا تَدْخُلُوا الجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا ، وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا ، أَوَلَا أَدُلُّكُمْ عَلَى شَيْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ ؟ أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ )).
"তোমরা ঈমানদার না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর যতক্ষণ না তোমাদের পারস্পরিক ভালোবাসা গড়ে উঠবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা প্রকৃত ঈমানদার হতে পারবে না। আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি কাজ বলে দেব না, যা করলে তোমরা একে অপরকে ভালবাসতে লাগবে? (তা হচ্ছে) তোমরা আপোসের মধ্যে সালাম প্রচার কর।” (মুসলিম ২০৩নং)
সে সাফল্যের লাভ কী, যে সাফল্যের কথা শুনে অপরে আনন্দ পাবে না। যে সাফল্যের খুশীতে অন্যে শরীক হবে না?
১৩। উদ্যম ও সাধনা
মহান প্রতিপালক বলেছেন,
{وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى} (৩৯) سورة النجم
"আর এই যে, মানুষ তাই পায়, যা সে চেষ্টা করে।” (নাজমঃ ৩৯)
সাধ-সাধ্য-সাধনা, তবেই পুরবে বাসনা। সাফল্য অর্জনের পথে অবিরাম সাধনা চাই। সাধ ১ শতাংশ থাকলেও সাধনা চাই ৯৯ শতাংশ। আরবী কবি বলেছেন,
لا تحسبن المجد تمرا أنت أكله لن تبلغ المجد حتى تلعق الصبرا
অর্থাৎ, তুমি গৌরবকে খেজুর ভেবো না, যা তুমি ভক্ষণ করবে। তুমি মুসব্বর (ঘৃতকুমারী) না চাঁটলে গৌরবে পৌঁছতেই পারবে না।
নৌকা ডাঙ্গায় সাজিয়ে রাখার জন্য নয়, পানিতে নামিয়ে তরঙ্গের সাথে যুদ্ধের জন্য। জীবনটাও তাই। জীবনে যুদ্ধ আছে। কর্মচেষ্টাই তার যুদ্ধ। তার জন্য লেখাপড়া করাও যুদ্ধ।
জীবনটাই কষ্ট দিয়ে ঘেরা। আশা তা চাপা রাখে। আর কর্ম আশা পূরণ করে। যে কষ্ট করে, সে একদিন ইষ্টলাভ করে। যে তার পালঙ্কের কষ্ট সহ্য করতে পারে, সে আরামে ঘুমায়।
পারবেন না কষ্ট স্বীকার করতে? পারবেন না সাফল্য অর্জনের পথে আঘাত ও লাঞ্ছনা সহ্য করতে? না, অসম্ভব কিছু নয়। আঘাত-খাওয়া মানুষই পারে অসম্ভবকে সম্ভব করতে। যে মানুষ দিনের পর দিন আঘাত খেয়ে অপমান সহ্য ক'রেও জীবন-যুদ্ধে নির্বিচল থাকে, অসম্ভবকে সম্ভব সেই করতে পারে।
একদা সম্ভব অসম্ভবকে জিজ্ঞাসা করল, 'তুমি কোথায় বাস কর?' অসম্ভব উত্তরে বলল, 'অক্ষমের স্বপ্নে।'
শিকারী কষ্ট আপনাকে তাড়া করে, আপনাকে তার চাইতে বেশি দৌড় দিতে হবে। যেহেতু 'শিকার শিকারীর চাইতে বেশি জোরে দৌড় দেয়। কারণ শিকারী দৌড়ে খাদ্যের প্রয়োজনে। আর শিকার দৌড়ে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে।'
কষ্ট করলে দুর্ভাগ্যকে সৌভাগ্যে পরিণত করা যায়। কারণ পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি।
পরিশ্রম ছাড়া ধূলির ধরায় সুখ লাভ হয় না। আমরা যা কিছু ভোগ করি, তা কারো না কারোর কঠিন পরিশ্রমের ফল। এত শত-সহস্র বিলাস সামগ্রী ব্যবহার ক'রে আজ আমরা কত সুখে আছি, তার আবিষ্কার ও উৎপাদনে অনেক জ্ঞানীগুণী কঠোর পরিশ্রম ক'রে গেছেন। তাঁরা যদি অলস হয়ে আরামে বসে থাকতেন, তাহলে আমরা আজ কষ্টভোগ করতাম।
'পরিশ্রমে ধন আনে পুণ্যে আনে সুখ, আলস্যে দারিদ্র আনে পাপে আনে দুখ।'
খবরদার কর্মবিমুখ হবেন না। কারণ 'কর্মবিমুখতা মরিচার মতো, তা সবচেয়ে উজ্জ্বল ধাতুকেও মলিন ও ক্ষয় করে।'
আমরা অভিযোগ করি, সমাজে দুষ্কৃতীদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে।
নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব তাদের হাতে।
পরিচালনা ও পরিবেশন তাদের হাতে।
ব্যবসা ও বাণিজ্য তাদের হাতে।
এমনকি উপাসনালয় এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও তাদেরই হাতে!
কেন হবে না? পুণ্যাচারীরা যদি কর্মবিমুখ হন, তাহলে কি পাপাচারীরা সমাজে সক্রিয়রূপে প্রকাশ পাবে না? তাদের হাতে ডোর ছেড়ে দিলে তারা তো খেলা দেখাবেই। আর তার ফলে সমাজ তো ধ্বংস হবেই। আসলেই 'দুষ্ট প্রকৃতির মানুষের জন্য সমাজ ধ্বংস হয় না; সৎ মানুষের অকর্মণ্যতার জন্য সমাজের ক্ষতি হয় বেশি। যদি সৎ ব্যক্তিরা কিছুই না করেন, তাহলে সমাজে দুষ্কৃতীরাই প্রাধান্য লাভ করে।'
বহু মানুষ আছে, যারা পরগাছা আলোকলতার মতো অপরের গলগ্রহ হয়ে জীবনযাপন করতে চায়। অনেকে বাঘের মতো শিকার করতে আলস্য প্রদর্শন করে এবং শিয়ালের মতো উচ্ছিষ্ট ও অবশিষ্টাংশ খেয়ে গর্ববোধ করে। তারা আসলে সমাজ ও সংসারের পরগাছা। 'এ সংসারে কিছু মানুষ আছে, যাদের জন্য এ জীবন বড় বোঝা। পক্ষান্তরে আর এক শ্রেণীর মানুষ আছে যারা এ জীবনের জন্য বড় বোঝা।'
শ্রমবিমুখতার কারণেই অভাব আসে। শ্রমবিমুখতাই অপরাধ সৃষ্টি করে। 'আলস্য বা পরিশ্রম-বিমুখতা হল মা, তার ছেলের নাম ক্ষুধা এবং মেয়ের নাম চুরি।' জ্ঞানিগণ বলেন, 'তোমার উন্নতির পথে ৫টি প্রতিবন্ধক আছে; আলস্য, নারী-প্রেম, অসুস্থতা, দেশের টান এবং আত্মগর্ব।'
সুতরাং (১) আলস্য দূর ক'রে পরিশ্রম ও কাজ করুন। (২) স্ত্রীর বৈধ অতিরিক্ত প্রেম বা অবৈধ নারী-প্রেম থাকলে তা বর্জন করুন। নচেৎ আঁচলধরা অথবা প্রেম-পাগলা হলে না পড়াশোনা হবে, না জ্ঞান-গবেষণা, আর না চাকরির উন্নতি। (৩) শরীরটাকে সুস্থ রাখার চেষ্টা করুন। তাছাড়া পরিশ্রম করবেন কাকে নিয়ে? (৪) মা ও মাটির টান কার না আছে বলুন? সাফল্য অর্জনের তাকীদে বিদেশ যাত্রা করতে হলেও সেই টান ছিঁড়ে বেরিয়ে যেতে হবে। বিদেশের মাটি কামড়ে মা-কে যদি সুখী দেখতে পারেন, তাহলে তার পাশে থেকে অভাব-পীড়নে তাকে কষ্ট দেওয়ার চাইতে কি তা ভালো নয়?
পক্ষান্তরে মা-বাপ বলুন, আর বউ-সন্তানই বলুন, এ দুনিয়ায় এবং সে দুনিয়ায়ও কেউ কারো নয়। অধিকাংশ আত্মীয়তা কমার্সিয়াল লেনদেনের মতো টিকে আছে। দিতে না পারলে কেউ আপনাকে ভালোবাসা বা স্নেহ দেবে না। যতদিন দিতে পারবেন, ততদিন আপনি ভালো মানুষ। দেওয়া বন্ধ হলেই আপনি কালো মানুষ। তাই ভালোবাসার বন্ধন সুদৃঢ় করতে অর্থের প্রয়োজন, আয়-উন্নতির প্রয়োজন।
'মামা বল, চাচা বল কেহ কারো নহে, স্বার্থের সম্পর্ক শুধু তার তরে রহে।'
সুতরাং ভেবে দেখুন,
'আপন কেউ নয় সবাই তোমার পর, উন্নতি করিতে চাও হও ধুরন্ধর।'
স্বপ্ন সেটা নয়, যেটা মানুষ ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে দেখে, বরং সেটাই হল স্বপ্ন যার বাস্তবায়নের প্রত্যাশা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না। নিশ্চয় তেমন কোন স্বপ্ন আপনার থাকবে। আর আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সবচেয়ে সুন্দর উপায় হল, ঘুম ছেড়ে জেগে ওঠা।
কর্মই মানুষকে বড় করে। কর্মের মাধ্যমেই মানুষ উন্নত হয়। কর্ম-দক্ষতাই মানুষের সর্বাপেক্ষা বড় বন্ধু। আর কর্মোজ্জ্বল দিনগুলিই প্রকৃতপক্ষে সোনালী দিন। জীবন হচ্ছে কর্ম এবং কর্ম করতে না চাওয়া মরণ। কর্ম না ক'রে সুন্দর জীবনের অপেক্ষা করা ভুল।
সুন্দর দিন সবার জন্য অপেক্ষা করে। কেউ চেষ্টা ক'রে তা আনে, কেউ আনে না। নিরাশার কিছু নেই, আকাশে যেমন তারা আছে, জীবনে তেমনি সম্ভাবনা আছে। তবে সচেষ্ট হয়ে তাকে জাগিয়ে তুলতে হয়।
জ্ঞানিগণ বলেছেন, 'জীবন হল সাইকেল চালানোর মত। তুমি যতক্ষণ প্যাডেলে পা রেখে চালাতে থাকবে, ততক্ষণ সাইকেল হতে পড়ে যাবে না। কিন্তু প্যাডেল থামালেই পড়ে যাবে।'
সুতরাং অকর্মণ্য হয়ে বসে থাকা জীবন নয়। কর্মময় জীবনই প্রকৃত জীবন। জেনে রাখুন, ভাগ্য বলে একটা জিনিস আছে, তা মানতেই হবে। তবে 'যে শুইয়া থাকে, তাহার ভাগ্যও শুইয়া থাকে।'
'সুখ চাই, সুখ চাই' কেবল মুখে বললেই চলবে না। 'চিনি-চিনি' বললেই মুখ মিষ্টি হবে না। সুখ অর্জনের জন্য চেষ্টার প্রয়োজন আছে। সুখ অর্জনের পথে দুঃখ-কষ্ট বরণ করতে হবে। কষ্ট দেখে পিছপা হলে কি সুখলাভ হবে? 'কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে, দুখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহিতে?'
শেখ সা'দী বলেছেন, 'সমুদ্র-গর্ভে মূল্যবান রত্ন বর্তমান। কিন্তু আরাম ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাইলে সমুদ্র-তীরে বসে থাক।'
যে সয়, সে রয়। যে কাঁটার আঘাত সইবে, সে ফুল লাভ করবে। সুতরাং দৃঢ় সংকল্প হতে হবে, 'পথের কাঁটা মানব না নীরবে যাব, হৃদয়-ব্যথায় কাঁদব না নীরবে যাব।'
অবশ্যই যাদের সত্যিকারের সুখ ও সাফল্য লাভের উদ্যম ও আগ্রহ আছে, আন্তরিকতা ও প্রচেষ্টা আছে, তারা পিছনের দিকে পা ফেলবে না। 'পুণ্য-পিয়াসী যাবে যারা ভাই মক্কার পূত তীর্থ লভে, কন্টক ভয়ে ফিরবে না তারা বরং পথেই জীবন সঁপবে।'
আমাদের জেনে রাখা দরকার যে, 'সাফল্যের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়, উদ্যমের সাথে ব্যর্থতা অতিক্রমের পরই আসে সফলতা।'
সফলতার পথ মই-এর মতো, যা পকেটে হাত রেখে চড়া যায় না। বিনা কষ্টে ও পরিশ্রমে সুখ লাভ হয় না।
সাফল্য অর্জনের পথে বাধা আসতে পারে, তা উল্লংঘন করতে হবে। সে পথে চলতে গিয়ে সঙ্গের সঙ্গী সঙ্গ ছাড়তে পারে, তা মেনে নিতে হবে। সংকল্প হতে হবে, 'বিশ্ব যদি চলে যায় কাঁদিতে কাঁদিতে তবু একা বসে রব উদ্দেশ্য সাধিতে।'
সুখলাভে তাড়াহুড়া ক'রে লাভ নেই। যথাসময়েই সুখের আগমন ঘটে। বিলম্ব হতে দেখে হতোদ্যম ও ভগ্নোৎসাহ হওয়াও জ্ঞানীর কাজ নয়। 'কেন পান্থ ক্ষান্ত হও হেরি দীর্ঘ পথ, উদ্যম বিহনে কার পুরে মনোরথ?'
কবির কথায় মনে প্রেরণা সৃষ্টি করুন এবং সুখ ও সাফল্য লাভের পথে অগ্রসর হতে থাকুন।
'ভাঙ রে হৃদয়, ভাঙ রে বাঁধন,
সাধ রে আজিকে প্রাণের সাধন,
লহরীর 'পরে লহরী তুলিয়া
আঘাতের পর আঘাত কর।
মাতিয়া যখন উঠেছে পরান
কিসের আঁধার, কিসের পাষাণ!
উথলি যখন উঠেছে বাসনা
জগতে তখন কিসের ডর!'
১৪। অপরের দেখে শিক্ষা গ্রহণ
সাফল্য অর্জনের জন্য অপরের দেখে শিক্ষা নেওয়া অবশ্যই জরুরী। অপরের অভিজ্ঞতা থেকে চয়ন করা, অপরের জ্ঞানভান্ডার থেকে জ্ঞানমধু আহরণ করা কর্তব্য।
অপরের সাফল্যের কারণসমূহ অধ্যয়ন ক'রে তার দ্বারা উপকৃত হওয়া উচিত। অপরের বিফলতার ভুল ইত্যাদি থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজে সতর্ক হওয়া উচিত। আমাদের কেউ কেউ তার বুদ্ধিমত্তার বলে সফলতা লাভ করে, আর কেউ সফলতা লাভ করে অপরের বোকামি দেখে।
কোন সফল ব্যক্তির যদি ভালোমন্দ উভয়ই থাকে, তাহলে তার ভালোটা গ্রহণ ও মন্দটা বর্জন করা উচিত।
গোবরে মানিক পড়ে থাকতে দেখে তুচ্ছ ক'রে বর্জন করা জ্ঞানীর কাজ নয়। মানিক তুলে নিয়ে পরিষ্কার ক'রে নেওয়া এবং তার দ্বারা উপকৃত হওয়া অবশ্যই জ্ঞানী মানুষের কাজ।
মানুষ হিসাবে সাফল্যের পথে পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার প্রয়োজন আছে। তা ছাড়া অনেক সময় মানুষ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়।
একবার অভিজ্ঞতা ছাড়াই সফল হলে সত্বর দ্বিতীয়বার অভিজ্ঞদের সহযোগিতা নিলে সফলতা আরো সুনিশ্চিত ও পাকাপোক্ত হবে।
সফল জ্ঞানীদের পরিশ্রমের কথা স্মরণ রাখতে হবে এবং আমাদেরকেও তাদের মতো পরিশ্রম করতে হবে। তাহলে আমরাও হব সফল মানব---ইন শাআল্লাহ।
১৫। ফললাভে ধৈর্যশীলতা
প্রচেষ্টা ও ধৈর্য সফলতার জনক-জননী। সাফল্য অর্জনের পথে ধৈর্যহারা হলে এবং ফললাভে বিলম্ব দেখে হাল ছেড়ে দিলে সাফল্য ধরা দেবে না।
ফল পাওয়ার জন্য শেষ সময় পর্যন্ত প্রতীক্ষাই হল সফলতার রহস্য। মুসা -কে আল্লাহ পাক নির্দেশ করেছিলেন যে, সমুদ্র সঙ্গমস্থলে এক বড় আলেম বান্দা আছে, তার নিকট উপস্থিত হয়ে ইল্ম অনুসন্ধান কর। মূসা তাঁর সন্ধানে বের হলেন। সফরে সঙ্গীকে বললেন, {لَا أَبْرَحُ حَتَّى أَبْلُغَ مَجْمَعَ الْبَحْرَيْنِ أَوْ أَمْضِيَ حُقُبًا} (٦٠) سورة الكهف 'দুই সমুদ্রের মধ্যস্থলে না পৌঁছনো পর্যন্ত আমি থামব না, আমি যুগ যুগ ধরে চলতে থাকব।' (কাহফঃ ৬০)
সুতরাং 'সফলতা এক বিরামহীন সফরের নাম। সফলতা কোন গন্তব্যস্থল নয়। সফলতা গন্তব্যে পৌঁছনোর একটি পথ। সফলতার পথে কোন ট্রাফিক সিগন্যাল নেই, যা তার গতি নির্দিষ্ট করতে পারে।'
আপনি ফললাভে তাড়াহুড়া করবেন না। শোনা যায়, চীনে এক ধরনের বাঁশ আছে, যা লাগানোর পর প্রথম চার বছর পানি, সার দেওয়ার পরেও বাড়ে না। কিন্তু পঞ্চম বছরে বাঁশ গাছটি হঠাৎ ছয় সপ্তাহে ৯০ ফুট লম্বা হয়ে যায়। আমাদেরও কোন কোন কাজের ফল দেরীতে এবং পূর্ণমাত্রায় লাভ হয়। আপনারও তাই হতে পারে। সুতরাং সতর্ক থাকুন।
পক্ষান্তরে ফল পাকার পূর্বে যদি তা পেতে বা খেতে চান, তাহলে নিশ্চয়ই আপনি জ্ঞানী মানুষ নন। আরবী প্রবাদে আছে, مَنْ اسْتَعْجَلَ شَيْئًا قَبْلَ أَوَانِهِ عُوقِبَ بِحِرْمَانِهِ. অর্থাৎ, যে কেউ সময় আসার আগে কিছু পেতে চাইবে, তাকে তা হতে বঞ্চিত ক'রে শাস্তি দেওয়া হবে।
আর সেই সোনার ডিম-পাড়া হাঁস-ওয়ালার গল্প অবশ্যই আপনার শোনা থাকবে, যে এক সাথে সকল ডিম পেতে চেয়েছিল এবং অবশেষে তার কী আফসোস ও হায়-পস্তানি হয়েছিল।
১৬। সময়ের কদর করুন
জীবনে সাফল্য লাভ করতে চাইলে সময়ের কদর করুন। সময়কে ফালতু বয়ে যেতে দেবেন না। সময়ের অপচয় ঘটাবেন না। জীবনের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত আপনার জন্য ফলপ্রসূ হোক। যথাসময়ে আপনার সকল কাজ সমাধা হোক।
সময় নষ্টকারী সকল ব্যক্তি ও বিষয়কে বর্জন করুন। সময়-চোর থেকে সর্বদা সাবধানে থাকুন।
আপনি নিশ্চয়ই জানেন, সময়ের হিসাব দিতে হবে। সুতরাং আপনিও হিসাবমতো সময়কে ব্যয় করুন। বিনা লাভে সময়কে মোটেই অতিক্রম করতে দেবেন না।
সময় হল তরবারির মতো। আপনি তাকে কাটতে না পারলে, সে আপনাকে কেটে ফেলবে।
সময় অত্যন্ত মূল্যবান। কিন্তু এ মূল্য থেকে টাকা-পয়সার মূল্যের পার্থক্য আছে। টাকা-পয়সা সঞ্চয় করা যায়, ধার দেওয়া যায় এবং প্রয়োজনে ধার নেওয়া যায়। কিন্তু সময় ধার দেওয়াও যায় না এবং ধার নেওয়াও যায় না।
সময় আমাদের বন্ধু নয়; বরং শত্রু। সে তার নিজের মতো বয়ে চলে। আর আমাদের জীবনের পরিসরকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর ক'রে তোলে।
সুতরাং সময়ের অপব্যয় না ঘটিয়ে অবসরকে কাজে লাগান। অবকাশকে উপকারী কিছু দিয়ে পরিপূর্ণ করুন। সাফল্য আপনাকে স্বাগত জানাবে।
📄 সাফল্যের রহস্য
এ জগতে বহু সফল মানুষের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, অনেকে অতি সহজে সাফল্য লাভ করেছেন, অনেকে করেছেন অতি কষ্টে। অবশ্য প্রত্যেকের সাফল্যের পিছে একাধিক কারণ থাকতে পারে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রধান যে কারণে মানুষ সফল হয়, তাকে তার সাফল্যের রহস্য বলা যেতে পারে।
তার মধ্যে একটি হল সততা ও সত্যবাদিতা।
অভিজ্ঞগণ বলেন, 'কোনও কাজ নিষ্পত্তি করার দৃঢ় অঙ্গীকার করতে হয় দুটি স্তম্ভের উপর। সে দুটি হল: সততা ও বিজ্ঞতা। যদি তোমার আর্থিক ক্ষতিও হয়, তবু তোমার অঙ্গীকারে দৃঢ় থাকার নামই সততা। আর বিজ্ঞতা হচ্ছে, যেখানে ক্ষতি হবে সেই রকম বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ না হওয়া।'
প্রতিশ্রুতি পালনে বদ্ধপরিকর হলে মানুষের সততা প্রকাশ পায়। আর তারই উর্বর মাটিতে উদ্গত হয় সাফল্যের কচি কিশলয়।
পক্ষান্তরে মিথ্যাবাদিতা, ধোঁকাবাজি, প্রতারণা, দুর্নীতি প্রভৃতি মানুষকে সাফল্যের পথ প্রদর্শন করে না।
প্রাচীন কালে প্রাচ্যের এক দেশের রাজা অতি বৃদ্ধ হয়ে পড়লে তিনি ঠিক করলেন, এবার দেশের পরবর্তী রাজা তিনি নিজেই নির্বাচন ক'রে যাবেন। কিন্তু তিনি এ নির্বাচনে একটি অভিনব পন্থা অবলম্বন করলেন।
তিনি রাজ-পরিবারের কাউকে নির্বাচন করলেন না। নৈকট্যপ্রাপ্ত কোন মানুষকেও না।
তিনি তাঁর দেশের বাছাই করা যোগ্য তরুণদেরকে রাজদরবারে উপস্থিত করলেন। তাদেরকে আপ্যায়ন ক'রে বললেন, 'আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি। এখন এ দেশের একটি নতুন রাজা নির্বাচনের সময় এসেছে। আমি আশা করব, সে রাজা হবে তোমাদেরই মধ্য হতে একজন। তবে আমি একটি পরীক্ষার মাধ্যমে তাকে এখতিয়ার করব।'
অতঃপর রাজা তাদের প্রত্যেকের হাতে একটি ক'রে কোন গাছের বীজ দিয়ে বললেন, 'এই বীজটি তোমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ টবে রোপণ করবে। অতঃপর রীতিমতো তার সিঞ্চন ও পরিচর্যা করবে। তারপর এক বছর পরে তোমরা আমার সাথে ঠিক এই জায়গায় দেখা করবে। আমি তোমাদের মধ্যে যার গাছ সুন্দর ও ফুল-ফলে সুশোভিত দেখব, তাকে এ রাজ্যের রাজা নির্বাচন করব।'
তরুণদের মধ্যে একজনের নাম ছিল লঞ্জ। খুশীতে মাতোয়ারা হয়ে বীজ নিয়ে বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে সব কথা খুলে বলল। মা কাজটিকে অতি সহজ মনে করল। যেহেতু তার বাড়িতে এমনিই কত গাছ টবে লাগানো আছে এবং ফুল-ফলে সুশোভিত আছে। বড় আনন্দের সাথে ছেলেকে আশা প্রদান করল। ছেলের গাছ লাগানোতে পরিপূর্ণ সহযোগিতা করল। প্রত্যহ তার যথাযথ সিঞ্চন করতে ও যত্ন নিতে লাগল। যাতে তার ছেলে দেশের পরবর্তী রাজা হয় এবং সে হয় রাজমাতা।
কিন্তু কোথায়? রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে দেখতে তিন সপ্তাহ অতিবাহিত হয়ে গেল। লঞ্জের টবে রোপিত বীজ অঙ্কুরিত হল না। মা ও ছেলে অবাক হল। ওদিকে অন্যান্যদের খবর নিতে শোনা গেল সকলের গাছ সুন্দরভাবে যথা নিয়মে বৃদ্ধিলাভ করছে। কেবল লঞ্জেরই চারা এখনও মাটি ঠেলে পৃথিবীর মুখ দেখল না। কেন? কী ব্যাপার? লঞ্জ নিজেকে বিফল ও ব্যর্থ মনে ক'রে হতাশায় ভেঙ্গে পড়ল।
আরো কিছুদিন অতিবাহিত হলে সে ও তার মা নিশ্চিত হল যে, তাদের সেই বীজ থেকে কোন গাছ হবে না। যেহেতু পচে মাটির সাথে তা মিশে গেছে।
দেখতে দেখতে রাজার সাথে সাক্ষাতের দিন এসে উপস্থিত হল। সকলেই তাদের নিজ নিজ টবে সুন্দর সুন্দর ফুল-ফলে সুশোভিত গাছ নিয়ে রাজদরবারে উপস্থিত হল। সকলের গাছ ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতার মতো। কিন্তু লঞ্জের টবে কোন গাছ ছিল না।
সবাই আগেভাগে নিজ নিজ গাছ রাজার সম্মুখে পেশ করল। আর লঞ্জ ভর্ৎসনা ও লাঞ্ছনার ভয়ে সকলের পিছনে লুকোচুরি খেলছিল।
একটার পর একটা তরুণ নিজ নিজ গাছ প্রদর্শন ক'রে দরবারের এক পাশে আসন গ্রহণ করল।
পরিশেষে লঞ্জকে দেখা দিতেই হল। না জানি রাজা কী হুকুম ক'রে বসেন, এই ভয়ে সে ভীত-সন্ত্রস্ত ছিল। হয়তো-বা তার গর্দানই কাটা যায়। তবুও সে নিজেকে প্রকৃতিস্থ ক'রে রাজার সম্মুখে দন্ডায়মাণ হল।
রাজা তার দিকে এক নজর তাকিয়ে মুখ নামিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কী নাম তোমার?'
লঞ্জ তার নাম বললে রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমার গাছ কোথায়?' সে বলল, 'মহাশয়! আমার বীজটি সম্ভবতঃ খারাপ ছিল। তাই অঙ্কুরিত হয়নি।'
সভাস্থ সকলেই হো-হো শব্দে হেসে উঠল। কিন্তু রাজা মশায় সকলকে চুপ থাকতে আদেশ ক'রে বললেন, 'তোমরা তোমাদের দেশের নতুন রাজাকে মোবারকবাদ জানাও।'
সকলেই অবাক, হতবাক। খোদ লঞ্জও। কেউই এ কথা বিশ্বাস করতে পারছিল না। ব্যাপার কী?
রাজা মশায় রহস্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন, 'আমি এক বছর আগে তোমাদের প্রত্যেককে একটি ক'রে বীজ দিয়ে বিশেষ প্রযত্নে গাছ ফলিয়ে দেখানোর কথা বলেছিলাম। কিন্তু এ কথা বলিনি যে, বীজগুলি গরম পানিতে সিদ্ধ করা এবং অঙ্কুরিত হওয়ার অযোগ্য। কিন্তু তোমরা আমাকে প্রতারিত করার জন্য মিথ্যা ও ছলনার আশ্রয় নিয়ে অন্য বীজ দিয়ে গাছ লাগিয়ে তা ফুলফলে সুশোভিত ক'রে এনে দেখিয়েছ। তোমরা ধারণা করেছ, ধোঁকাবাজি ও ছলনা তোমাদেরকে রাজা বানিয়ে দেবে!
কিন্তু লঞ্জ তা করেনি। ইছা করলে সেও তোমাদের মতো কিছুদিন পরে বীজ অঙ্কুরিত হতে না দেখে অন্য বীজ বপন ক'রে গাছ এনে দেখাতে পারত। কিন্তু সে রাজাকে প্রতারিত করতে চায়নি। আশা করি সে আমার প্রজাদেরকেও প্রতারিত করবে না। অতএব আমার নিকট তার আমানতদারি, সততা ও সাহসিকতা প্রমাণিত হওয়ার ফলে আমি তাকে এ দেশের ভাবী রাজা নির্বাচন করলাম।'
হ্যাঁ, রাজা সঠিকভাবে সঠিক প্রতিনিধিই নির্বাচন করলেন। নচেৎ আমরা যদি মিথ্যাবাদিতা ও প্রতারণার বীজ বপন করি, তাহলে যথাসময়ে বিফলতা ও ব্যর্থতার কাঁটাই কর্তন করব। আর আমরা যদি যথাসময়ে সততা, সত্যবাদিতা ও আন্তরিকতার বীজ বপন করি, তাহলে যথাসময়ে আমরা ভালোবাসা ও সাফল্যের ফসল কর্তন করব।
সাফল্যকামীর সর্বদা মনে রাখা উচিত, আমরা আজ যা বপন করব, আগামী কাল তাই কর্তন করব। নিম গাছ লাগিয়ে আঙুর ফলের আশা করা ভুল।
সাফল্যের অন্যতম রহস্য হল আশাবাদিতা। তার মানে বিফলতার মাঝেও সফলতার আলো খুঁজে নেওয়া এবং ব্যর্থতায় নিরাশ না হওয়া। অপ্রিয় কিছু সামনে এলেও তাকে প্রিয় বানিয়ে নিতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। কোনও ঘটন-অঘটনের নেতিবাচক ফল না নিয়ে ইতিবাচক ফল নিতে চেষ্টা করা।
একজন সফল ব্যক্তিকে তাঁর সাফল্যের কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন, 'নিয়মানুবর্তিতা বা সময়ানুবর্তিতা।'
আর একজন বলেছেন, 'আমার সাফলের রহস্য হল অবিরাম প্রচেষ্টা।'
একজন সফল চিন্তাবিদ বলেছেন, 'সাফল্য কেবল সৌভাগ্যই নয়। তা পরিপূর্ণ প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হয়।'
সাফল্য লাভের চেষ্টায় এক সাথে সব কিছুতে সাফল্য লাভ করতে চাওয়াটা ভুল পদক্ষেপ হবে। সুতরাং যেটা সহজ ও সাধ্যাধীন তা দিয়েই শুরু করা কর্তব্য। নচেৎ এমনও হতে পারে যে, সবগুলি এক সাথে পেতে গিয়ে সবগুলিই হারিয়ে যাবে।
📄 দুনিয়ার সাফল্য
দুনিয়ার সাফল্য আমরা হাতে হাতে প্রত্যক্ষ করতে পারি। নিজ পেশায় অনেকেই সফল মানব। নিজ বৈবাহিক জীবনে অনেকে সফল দম্পতি। সংসার জীবনে অনেকেই সফল পিতামাতা। ধনোপার্জনে অনেকেই সফল ধনী। অনেকে লেবু বেচতে বেচতে কোটিপতি, পেপার বেচতে বেচতে দেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। অনেকে রাজনৈতিক জীবনে খুদে কমরেড থেকে প্রধান মন্ত্রী হতে সফল হয়েছেন। অল্প পড়াশোনা ক'রে সাহিত্য চর্চায় সফল হয়ে অনেকে কবি, সাহিত্যিক ও লেখক হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন।
জ্ঞান-গবেষণায় সাফল্য লাভ ক'রে অনেকে বিজ্ঞানী হয়েছেন। চিকিৎসায় অভিজ্ঞতা লাভ ক'রে অনেকে সফল চিকিৎসক হয়েছেন। অনেকে অবৈধ পথে মানুষের কাছে সফল মানুষ রূপে প্রসিদ্ধ হয়েছেন। অনেকে দুনিয়ার বাদশা, আমীর বা রাষ্ট্রনেতা হয়ে সফল মানব হয়েছেন। অনেকেই দুনিয়ায় বিলাসবহুল বাড়ি ও গাড়ি, রকমারি পানাহার, রকমারি লেবাস-পোশাক, নানা বর্ণের নারী সম্ভোগ ক'রে সাফল্যের দাবীদার হয়েছে। অনেকেই কারুনের মতো সাফল্যের পাহাড়-চূড়ায় আরোহন করেছে। তার ঘটনা ছিল,
{فَخَرَجَ عَلَى قَوْمِهِ فِي زِينَتِهِ قَالَ الَّذِينَ يُرِيدُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا يَا لَيْتَ لَنَا مِثْلَ مَا أُوتِيَ قَارُونُ إِنَّهُ لَذُو حَظٍّ عَظِيمٍ} (۷۹) سورة القصص "কারূন তার সম্প্রদায়ের সম্মুখে জাঁকজমক সহকারে বের হল। যারা পার্থিব জীবন কামনা করত তারা বলল, 'আহা! কারুনকে যা দেওয়া হয়েছে, সেরূপ যদি আমাদেরও থাকত; প্রকৃতই সে মহা ভাগ্যবান।' (ক্বাসাস্বঃ ৭৯)
অনেকেই দুনিয়াদারি দৃষ্টিতে পার্থিব জীবনের ভোগ-বিলাস কামনা করে। হয়তো-বা তারা পরকালের জীবনে বিশ্বাসটুকুও রাখে না। সুতরাং তাদের অবস্থা হল এই যে,
يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِّنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ } (۷) سورة الروم "ওরা পার্থিব জীবনের বাহ্য দিক সম্বন্ধে অবগত, অথচ পারলৌকিক জীবন সম্বন্ধে ওরা উদাসীন।” (রুমঃ ৭)
তারা জানে না অথবা মানে না যে,
زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَابِ} “নারী, সন্তান-সন্ততি, জমাকৃত সোনা-রূপার ভান্ডার, পছন্দসই (চিহ্নিত) ঘোড়া, চতুষ্পদ জন্তু ও ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তি মানুষের নিকট লোভনীয় করা হয়েছে। এ সব ইহজীবনের ভোগ্য বস্তু। আর আল্লাহর নিকটেই উত্তম আশ্রয়স্থল রয়েছে।” (আলে ইমরানঃ ১৪)
اللَّهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاء وَيَقْدِرُ وَفَرِحُوا بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إلا مَتَاعٌ } (٢٦) سورة الرعد
"আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন, তার জীবনোপকরণ বর্ধিত করেন এবং সংকুচিত করেন। কিন্তু তারা পার্থিব জীবন নিয়েই উল্লসিত; অথচ ইহজীবন তো পরজীবনের তুলনায় নগণ্য ভোগ মাত্র।” (রা'দঃ ২৬)
{وَمَا أُوتِيتُم مِّن شَيْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَزِينَتُهَا وَمَا عِندَ اللَّهِ خَيْرٌ وَأَبْقَى أَفَلَا تَعْقِلُونَ} (٦٠) سورة القصص "তোমাদেরকে যা কিছু দেওয়া হয়েছে, তা তো পার্থিব জীবনের ভোগ ও সৌন্দর্য এবং যা আল্লাহর নিকট আছে, তা উত্তম এবং স্থায়ী। তোমরা কি অনুধাবন করবে না?” (ক্বাস্বাস্বঃ ৬০)
{فَمَا أُوتِيتُم مِّن شَيْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَا عِندَ اللَّهِ خَيْرٌ وَأَبْقَى لِلَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ} (٣٦) سورة الشورى “বস্তুতঃ তোমাদেরকে যা কিছু দেওয়া হয়েছে, তা পার্থিব জীবনের ভোগ; কিন্তু আল্লাহর নিকট যা আছে, তা উত্তম ও চিরস্থায়ী তাদের জন্য, যারা বিশ্বাস করে ও তাদের প্রতিপালকের ওপর নির্ভর করে।” (শূরাঃ ৩৬)
{يَا قَوْمِ إِنَّمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا مَتَاعٌ وَإِنَّ الْآخِرَةَ هِيَ دَارُ الْقَرَارِ} (۳۹) سورة غافر "হে আমার সম্প্রদায়! এ পার্থিব জীবন তো অস্থায়ী উপভোগের বস্তু। আর নিশ্চয় পরকাল হচ্ছে চিরস্থায়ী আবাস।” (মু'মিনঃ ৩৯)
اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُونُ حُطَامًا وَفِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَغْفِرَةٌ مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانٌ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ}
"তোমরা জেনে রেখো যে, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক গর্ব প্রকাশ, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ব্যতীত আর কিছুই নয়। এর উপমা বৃষ্টি; যার দ্বারা উৎপন্ন ফসল কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, অতঃপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি তা পীতবর্ণ দেখতে পাও, অবশেষে তা টুকরা-টুকরা (খড়-কুটায়) পরিণত হয় এবং পরকালে রয়েছে কঠিন শান্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।” (হাদীদঃ ২০)
পক্ষান্তরে যারা প্রকৃতত্ব জানে, তারা অপরের পার্থিব সাফল্য দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ وَقَالَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ وَيْلَكُمْ ثَوَابُ اللَّهِ خَيْرٌ لِّمَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا وَلَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الصَّابِرُونَ} (۸۰) سورة القصص
"যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল তারা (কারুনের ধন-সাফল্য দেখে) বলল, 'ধিক তোমাদের! যারা ঈমান রাখে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ। আর ধৈর্যশীল ব্যতীত তা অন্য কেউ পায় না।' (ক্বাস্বাস্বঃ ৮০)
📄 প্রকৃত সফল মানব
সফল মানব অনেক আছে এ পৃথিবীতে। কিন্তু প্রকৃত দৃষ্টিতে দেখলে দেখা যাবে, আসলে তারা অসফল। বহুমুখী সাফল্যের অধিকারী হয়েও বাস্তবে সে বিফল মনোরথ। অধিকাংশ মানুষের সাফল্য এক শতাব্দীব্যাপী। আসলে তাদের বিশ্বাসই শতাব্দীকালীন। মরণের পরেও যে অন্তহীন শতাব্দীর জীবন আছে, তা তারা বিশ্বাস করে না অথবা বিশ্বাস করলেও সঠিকভাবে করে না অথবা সঠিকভাবে করলেও তার জন্য প্রস্তুতি নেয় না এবং সে জীবনে সাফল্যের জন্য কোন প্রয়াস চালাতে অনুপ্রাণিত হয় না।
আমরা যারা পরকালে বিশ্বাস রাখি, তাদের প্রকৃত সাফল্য হল পরকালে। পরকালের সাফল্যই প্রকৃত সাফল্য। সে সাফল্য কাদের জন্য? মহান আল্লাহ তার উত্তর দিয়েছেন।
যারা মু'মিন অবস্থায় সৎকর্ম সম্পাদন করবে: মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ (۱) الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ (۲) وَالَّذِينَ هُمْ عَنْ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ (۳) وَالَّذِينَ هُمْ لِلزَّكَاةِ فَاعِلُونَ (٤) وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ (٥) إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ (٦) فَمَنْ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُوْلَئِكَ هُمْ الْعَادُونَ (۷) وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ (۸) وَالَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ (۹) أُوْلَئِكَ هُمُ الْوَارِثُونَ (۱۰) الَّذِينَ يَرِثُونَ الْفِرْدَوْسَ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} (۱۱) المؤمنون
"অবশ্যই বিশ্বাসিগণ সফলকাম হয়েছে। যারা নিজেদের নামাযে বিনয়-নম্র। যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ হতে বিরত থাকে। যারা যাকাত দানে সক্রিয়। যারা নিজেদের যৌন অঙ্গকে সংযত রাখে। নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত; এতে তারা নিন্দনীয় হবে না। সুতরাং কেউ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে, তারা হবে সীমালংঘনকারী। এবং যারা তাদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। আর যারা নিজেদের নামাযে যত্নবান থাকে। তারাই হবে উত্তরাধিকারী। উত্তরাধিকারী হবে ফিরদাউসের; যাতে তারা চিরস্থায়ী হবে।" (মু'মিনুনঃ ১-১১)
الم (১) ذَلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ (২) الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ (۳) وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ (٤) أُوْلَئِكَ عَلَى هُدًى مِّن رَّبِّهِمْ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (৫) البقرة
"আলিফ লা-ম মী-ম। এ গ্রন্থ; (কুরআন) এতে কোন সন্দেহ নেই, সাবধানীদের জন্য এ (গ্রন্থ) পথ-নির্দেশক। যারা অদেখা বিষয়ে বিশ্বাস করে, যথাযথভাবে নামায পড়ে ও তাদেরকে যা প্রদান করেছি, তা হতে দান করে। এবং তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে ও তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তাতে যারা বিশ্বাস করে ও পরলোকে যারা নিশ্চিত বিশ্বাসী। তারাই তাদের প্রতিপালকের নির্দেশিত পথে রয়েছে এবং তারাই সফলকাম।” (বাক্বারাহঃ ১-৫)
الم (১) تِلْكَ آيَاتُ الْكِتَابِ الْحَكِيمِ (۲) هُدًى وَرَحْمَةً لِلْمُحْسِنِينَ (۳) الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ بِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ (٤) أُوْلَئِكَ عَلَى هُدًى مِّن رَّبِّهِمْ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (৫) سورة لقمان
"আলিফ, লাম, মীম; এগুলি জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থের বাক্য, সৎকর্মপরায়ণদের জন্য পথনির্দেশ ও করুণা স্বরূপ; যারা যথাযথভাবে নামায পড়ে, যাকাত দেয় ও পরলোকে নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে। ওরাই ওদের প্রতিপালক কর্তৃক নির্দেশিত পথে আছে এবং ওরাই সফলকাম।” (লুকমানঃ ১-৫)
{وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ مَاذَا أَجَبْتُمُ الْمُرْسَلِينَ (٦٥) فَعَمِيَتْ عَلَيْهِمُ الْأَنْبَاءُ يَوْمَئِذٍ فَهُمْ لَا يَتَسَاءَلُونَ (٦٦) فَأَمَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَعَسَى أَن يَكُونَ مِنَ الْمُفْلِحِينَ} (٦٧)
"সেদিন আল্লাহ ওদেরকে ডেকে বলবেন, 'তোমরা রসূলগণকে কী জবাব দিয়েছিলে?' সেদিন তাদের সকল দলীল বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং তারা একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদও করতে পারবে না। তবে যে ব্যক্তি তওবা করে, ঈমান আনয়ন করে ও সৎকাজ করে, সে অবশ্যই সফলকাম হবে।” (ক্বাস্বাস্বঃ ৬৫-৬৭)
যারা আত্মশুদ্ধি করবে: মহান আল্লাহ বলেছেন,
قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَاهَا (۹) وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا } (۱۰) سورة الشمس
"সে সফলকাম হবে, যে তা (আত্মা) কে পরিশুদ্ধ করবে এবং সে ব্যর্থ হবে, যে তাকে কলুষিত করবে।” (শাম্স: ৯-১০)
যারা (লোককে) কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎকার্যের নির্দেশ দেবে ও অসৎ কার্য থেকে নিষেধ করবে: মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (١٠٤) سورة آل عمران
"তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা (লোককে) কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎকার্যের নির্দেশ দেবে ও অসৎ কার্য থেকে নিষেধ করবে। আর এ সকল লোকই হবে সফলকাম।" (আলে ইমরানঃ ১০৪)
যারা সর্বশেষ নবী ও সর্বশেষ গ্রন্থ কুরআনের অনুসারী হবেঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ فَالَّذِينَ آمَنُواْ بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنزِلَ مَعَهُ أُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (١٥٧) سورة الأعراف
"যারা নিরক্ষর রসূল ও নবীর অনুসরণ করে, যার উল্লেখ তওরাত ও ইঞ্জীল যা তাদের নিকট আছে তাতে লিপিবদ্ধ পায়, যে তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎকাজে নিষেধ করে, যে তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহকে বৈধ করে ও অপবিত্র বস্তুসমূহকে অবৈধ করে এবং যে তাদের ভার ও বন্ধন যা তাদের উপর ছিল (তা হতে) তাদেরকে মুক্ত করে। সুতরাং যারা তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং যে আলো তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে তার অনুসরণ করে, তারাই হবে সফলকাম।” (আ'রাফঃ ১৫৭)
যারা আল্লাহর রাস্তায় হিজরত ও জিহাদ করবে: মহান আল্লাহ বলেছেন,
{الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِندَ اللَّهِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ} (٢٠) سورة التوبة
"যারা ঈমান এনেছে, (দ্বীনের জন্য স্বদেশত্যাগ) হিজরত করেছে এবং নিজেদের মাল ও জান দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর নিকট মর্যাদায় বড়। আর তারাই হল সফলকাম।” (তাওবাহঃ ২০)
{لَكِنِ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ جَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ وَأُوْلَئِكَ لَهُمُ الْخَيْرَاتُ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (৮৮) سورة التوبة
"কিন্তু রসূল ও তার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছিল, তারা নিজেদের ধন ও প্রাণ দ্বারা জিহাদ করল; তাদেরই জন্য রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ এবং তারাই হচ্ছে সফলকাম।” (তাওবাহঃ ৮৮)
যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে: মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَن يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (٥١) وَمَن يُطِيعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَخْشَ اللَّهَ وَيَتَّقْهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ } (৫২) سورة النور
"যখন বিশ্বাসীদেরকে তাদের মধ্যে মীমাংসা ক'রে দেওয়ার জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের দিকে আহবান করা হয়, তখন তারা তো কেবল এ কথাই বলে, 'আমরা শ্রবণ করলাম ও মান্য করলাম।' আর ওরাই হল সফলকাম। যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর শাস্তি হতে সাবধান থাকে, তারাই হল কৃতকার্য।” (নূরঃ ৫১-৫২)
যারা আত্মীয়-স্বজন, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরের অধিকার আদায় করবেঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ ذَلِكَ خَيْرٌ لِّلَّذِينَ يُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (৩৮) سورة الروم
"অতএব আত্মীয়-স্বজনকে, অভাবগ্রস্ত এবং মুসাফিরকে তাদের প্রাপ্য দান কর। এ যারা আল্লাহর মুখমন্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) কামনা করে, তাদের জন্য শ্রেয় এবং তারাই সফলকাম।” (রুমঃ ৩৮)
যারা ঈমানী বন্ধনের উপর আত্মীয়তার বন্ধনকে প্রাধান্য দেবে নাঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُوْلَئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ وَأَيَّدَهُم بِرُوحٍ مِّنْهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ أُوْلَئِكَ حِزْبُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (২২) سورة المجادلة
"তুমি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায় পাবে না, যারা ভালবাসে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচারীদেরকে; হোক না এই বিরুদ্ধাচারীরা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা তাদের জাতি-গোত্র। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর পক্ষ হতে রূহ (জ্যোতি ও বিজয়) দ্বারা। তিনি তাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে; যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রেখো যে, আল্লাহর দলই সফলকাম।” (মুজাদালাহঃ ২২)
যারা মহান আল্লাহর তাক্বওয়া অবলম্বন করবে: মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَيُنَجِّي اللَّهُ الَّذِينَ اتَّقَوْا بِمَفَازَتِهِمْ لَا يَمَسُّهُمُ السُّوءُ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ} (٦١) الزمر "আল্লাহ সাবধানীদেরকে তাদের সাফল্য সহ উদ্ধার করবেন; অমঙ্গল তাদেরকে স্পর্শ করবে না এবং তারা দুঃখও পাবে না।" (যুমারঃ ৬১)
{إِنَّ لِلْمُتَّقِينَ مَفَازًا } (۳۱) سورة النبأ "নিশ্চয়ই আল্লাহভীরুদের জন্যই রয়েছে সফলতা।” (নাবাঃ ৩১)
যারা কার্পণ্যমুক্ত হবেঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَالَّذِينَ تَبَوَّؤُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِن قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (9) سورة الحشر
"(মুহাজিরদের আগমনের) পূর্বে যারা এ নগরী (মদীনা) তে বসবাস করেছে ও বিশ্বাস স্থাপন করেছে, তারা মুহাজিরদেরকে ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেওয়া হয়েছে, তার জন্য তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না, বরং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তারা (তাদেরকে) নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয়। আর যাদেরকে নিজ আত্মর কার্পণ্য হতে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম।” (হাশ্রঃ ৯)
{فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَأَنفِقُوا خَيْرًا لِّأَنفُسِكُمْ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (١٦) سورة التغابن
"তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর এবং শোনো, আনুগত্য কর ও ব্যয় কর, তোমাদের নিজেদেরই কল্যাণ হবে। আর যারা অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত, তারাই সফলকাম।” (তাগাবুনঃ ১৬)
কিয়ামতে যাদের নেকীর পাল্লা ভারী হবে : মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَأَمَّا مَن ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (৮) সূরা আল-আ’রাফ
“সেদিন ওজন ঠিকঠাক করা হবে, সুতরাং যাদের ওজন ভারী হবে, তারাই সফলকাম হবে।” (আল আ’রাফ: ৮)
{فَإِذَا نُفِخَ فِي الصُّورِ فَلا أَنسَابَ بَيْنَهُمْ يَوْمَئِذٍ وَلا يَتَسَاءلُونَ (১০১) فَمَن ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (১০২) وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُوْلَئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنفُسَهُمْ فِي جَهَنَّمَ خَالِدُونَ} (১০৩) সূরা মু’মিনুন
“যেদিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে, সেদিন পরস্পরের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না এবং একে অপরের খোঁজ-খবর নেবে না। সুতরাং যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই সফলকাম। আর যাদের পাল্লা হাল্কা হবে, তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে; তারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে।” (মু’মিনুনঃ ১০১-১০৩)
যারা কিয়ামতে হাশরে কাওসারের পানি পান করতে পারবে : যারা ২শ’ হ’তে কাওসারের পানি পান করতে পারবে, তারা অবশ্যই সফল হবে। এ কথা বলেছেন মহানবী ﷺ । (সিহাহ সিত্তাহঃ ৩০৬-৩০৭)
যারা কিয়ামতে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে : মহান আল্লাহ বলেছেন,
{كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلاَّ مَتَاعُ الْغُرُورِ} (১৮৫) সূরা আলে ইমরান
“জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর কিয়ামতের দিনই তোমাদের কর্মফল পূর্নমাত্রায় প্রদান করা হবে। সুতরাং যাকে আগুন (দোযখ) থেকে দূরে রাখা হবে এবং (যা) বেহেস্তে প্রবেশলাভ করবে, সেই হবে সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।” (আলে ইমরানঃ ১৮৫)
{تَلْفَحُ وُجُوهَهُمُ النَّارُ وَهُمْ فِيهَا كَالِحُونَ (১০৪) أَلَمْ تَكُنْ آيَاتِي تُتْلَى عَلَيْكُمْ فَكُنتُم بِهَا تُكَذِّبُونَ (১০৫) قَالُوا رَبَّنَا غَلَبَتْ عَلَيْنَا شِقْوَتُنَا وَكُنَّا قَوْمًا ضَالِّينَ (১০৬) رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْهَا فَإِنْ عُدْنَا فَإِنَّا ظَالِمُونَ (১০৭) قَالَ اخْسَؤُوا فِيهَا وَلا تُكَلِّمُونِ (১০৮) إِنَّهُ كَانَ فَرِيقٌ مِّنْ عِبَادِي يَقُولُونَ رَبَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الرَّاحِمِينَ (১০৯) فَاتَّخَذْتُمُوهُمْ سِخْرِيًّا حَتَّى أَنسَوْكُمْ ذِكْرِي وَكُنتُم مِّنْهُمْ تَضْحَكُونَ (১১০) إِنِّي جَزَيْتُهُمُ الْيَوْمَ بِمَا صَبَرُوا أَنَّهُمْ هُمُ الْفَائِزُونَ} (১১১) সূরা মু’মিনুন
"আগুন তাদের মুখমন্ডলকে দগ্ধ করবে এবং তারা সেখানে থাকবে বীভৎস চেহারায়। তোমাদের নিকট কি আমার আয়াতসমূহ আবৃত্তি করা হতো না? অথচ তোমরা সেগুলিকে মিথ্যা মনে করতে। তারা বলবে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! দুর্ভাগ্য আমাদেরকে পেয়ে বসেছিল এবং আমরা ছিলাম এক বিভ্রান্ত সম্প্রদায়। হে আমাদের প্রতিপালক! এই আগুন হতে আমাদেরকে উদ্ধার কর; অতঃপর আমরা যদি পুনরায় অবিশ্বাস করি, তাহলে অবশ্যই আমরা সীমালংঘনকারী হব।' আল্লাহ বলবেন, 'তোমরা হীন অবস্থায় এখানেই থাক এবং আমার সাথে কোন কথা বলো না। আমার বান্দাদের মধ্যে একদল ছিল যারা বলত, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা বিশ্বাস করেছি; সুতরাং তুমি আমাদেরকে ক্ষমা ক'রে দাও ও আমাদের উপর দয়া কর, তুমি তো দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু। কিন্তু তাদেরকে নিয়ে তোমরা এতো ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে যে, তা তোমাদেরকে আমার কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল; তোমরা তো তাদেরকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টাই করতে। আমি আজ তাদেরকে তাদের ধৈর্যের কারণে এমনভাবে পুরস্কৃত করলাম যে, তারাই হল সফলকাম।' (মু'মিনুনঃ ১০৪-১১১)
{لَا يَسْتَوِي أَصْحَابُ النَّارِ وَأَصْحَابُ الْجَنَّةِ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمُ الْفَائِزُونَ} (২০) "জাহান্নামের অধিবাসী এবং জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতের অধিবাসীরাই সফলকাম।” (হাশ্রঃ ২০)
প্রকৃত সাফল্য লাভের কারণ রয়েছে বহু। তার মধ্যে কতিপয় কারণ নিম্নরূপঃ
১। তাক্বওয়া, পরহেযগারি বা আল্লাহর ভয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْأَهِلَّةِ قُلْ هِيَ مَوَاقِيتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجِّ وَلَيْسَ الْبِرُّ بِأَنْ تَأْتُوا الْبُيُوتَ مِن ظُهُورِهَا وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَن اتَّقَى وَأْتُواْ الْبُيُوتَ مِنْ أَبْوَابِهَا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} "লোকে তোমাকে নতুন চাঁদ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে, (কেন তা বাড়ে এবং কমে) বল, তা লোকেদের (কাজ-কারবারের) এবং হজ্জের জন্য সময় নির্দেশক। পিছন দিক দিয়ে ঘরে প্রবেশ করা পুণ্যের কাজ নয়; কিন্তু পুণ্যের কাজ হল সংযম অবলম্বন করে চলা। অতএব তোমরা দরজাসমূহ দিয়েই ঘরে প্রবেশ কর এবং আল্লাহকে ভয় কর, তবেই তোমরা সফলতা পাবে।” (বাক্বারাহঃ ১৮৯)
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا الرِّبَا أَضْعَافًا مُّضَاعَفَةً وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} "হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ক্রমবর্ধমান হারে (দ্বিগুণ-চতুর্গুণ বা চক্রবৃদ্ধি হারে) সুদ খেয়ো না, এবং আল্লাহকে ভয় কর, তাহলে তোমরা সফলকাম হতে পারবে।” (আলে ইমরানঃ ১৩০)
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (۲۰۰)
“হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর। ধৈর্য ধারণে প্রতিযোগিতা কর এবং (শত্রুর বিপক্ষে) সদা প্রস্তুত থাক; আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (আলে ইমরানঃ ২০০)
{قُل لَّا يَسْتَوِي الْخَبِيثُ وَالطَّيِّبُ وَلَوْ أَعْجَبَكَ كَثْرَةُ الْخَبِيثِ فَاتَّقُوا اللَّهَ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (১০০) সূরা আল-মায়েদা
“বল, ‘অপবিত্র ও পবিত্র সমান নয়; যদিও অপবিত্রের আধিক্য তোমাকে চমৎকৃত করে। সুতরাং হে বুদ্ধিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (মায়েদাহঃ ১০০)
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ وَجَاهِدُوا فِي سَبِيلِهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (৩৫) সূরা আল-মায়েদা
“হে বিশ্বাসিগণ! আল্লাহকে ভয় কর, তাঁর নৈকট্য লাভের উপায় অন্বেষণ কর ও তাঁর পথে সংগ্রাম কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (মায়েদাহঃ ৩৫)
২। শয়তানের কর্মকান্ড থেকে দূরে থাকা। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (৯০) সূরা আল-মায়েদা
“হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (মায়েদাহঃ ৯০)
৩। মহান আল্লাহর অনুগ্রহ ও নেয়ামতরাশি স্মরণ করা (তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা)। তিনি তাঁর নবী -এর কথা উল্লেখ ক'রে বলেছেন,
{أَوَعَجِبْتُمْ أَن جَاءَكُمْ ذِكْرٌ مِّن رَّبِّكُمْ عَلَى رَجُلٍ مِّنكُمْ لِيُنذِرَكُمْ وَاذْكُرُوا إِذْ جَعَلَكُمْ خُلَفَاء مِن بَعْدِ قَوْمِ نُوحٍ وَزَادَكُمْ فِي الْخَلْقِ بَسْطَةً فَاذْكُرُوا آلَاءِ اللَّهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ}
“তোমরা কি আশ্চর্যবোধ করছ যে, তোমাদেরই একজনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে তোমাদের নিকট উপদেশ এসেছে, যাতে সে তোমাদেরকে সতর্ক করে? স্মরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে নূহের সম্প্রদায়ের পরে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন এবং তোমাদেরকে অবয়ব ও শক্তিতে (অন্য লোক অপেক্ষা অধিকতর) সমৃদ্ধ করেছেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর, হয়তো তোমরা সফলকাম হবে।" (আ'রাফঃ ৬৯)
৪। বেশি বেশি মহান আল্লাহর যিক্র করা। তিনি বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمْ فِئَةً فَاثْبُتُوا وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (٤٥)
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা যখন কোন দলের সম্মুখীন হবে, তখন অবিচল থাক এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।” (আনফালঃ ৪৫)
{فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ } (١٠) سورة الجمعة "অতঃপর নামায সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর ও আল্লাহকে অধিকরূপে স্মরণ কর; যাতে তোমরা সফলকাম হও।” (জুমুআহঃ ১০)
৫। ভালো কাজ করা, কল্যাণময় কাজ করা। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ارْكَعُوا وَاسْجُدُوا وَاعْبُدُوا رَبَّكُمْ وَافْعَلُوا الْخَيْرَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} "হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা রুকু কর, সিজদা কর এবং তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত কর ও সৎকর্ম কর; যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (হাজ্জঃ ৭৭)
৬। মহান আল্লাহর দিকে রুজু ও তওবা করা। {وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (۳۱) سورة النور "হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (নূর: ৩১)