📘 সফল মানব > 📄 জ্ঞান-সাফল্য

📄 জ্ঞান-সাফল্য


বহু মানুষ বুদ্ধি ও জ্ঞানে সাফল্য লাভ ক’রে থাকে। তাছাড়া এই জ্ঞান-বুদ্ধির কারণেই তো মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ জীব। এই জন্যই ইসলামে জ্ঞানের লালন করতে বলা হয়েছে এবং জ্ঞানশূন্য ক’রে দেয় এমন সকল বস্তু ভক্ষণ করাকে হারাম করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالأَزْلامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (٩٠) سورة المائدة

"হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (মায়িদাহঃ ৯০)

আর মহানবী বলেছেন, ((الْخَمْرُ أُمُّ الْفَوَاحِشَ وَأَكْبَرُ الْكَبَائِرِ مَنْ شَرِبَهَا وَقَعَ عَلَى أُمِّهِ وَخَالَتِهِ وَعَمَّتِهِ)). "মদ হল যাবতীয় অশ্লীলতার প্রধান এবং সবচেয়ে বড় পাপ। যে ব্যক্তি তা পান করে, সে (নেশার ঘোরে) নিজ মা, খালা ও ফুফুর সাথে ব্যভিচার করে!” (ত্বাবারানী, সঃ জামে' ৩৩৪৫নং)

((الْخَمْرُ أُمُّ الْخَبَائِثِ ، فَمَنْ شَرِبَهَا لَمْ تُقْبَلْ مِنْهُ صَلَاتُهُ أَرْبَعِينَ يَوْمًا، فَإِنْ مَاتَ وَهِيَ فِي بَطْنِهِ مَاتَ مَيْتَةً جَاهِلِيَّةً)). "মদ যাবতীয় নোংরামির মূল। যে কেউ তা পান করবে, তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। (যে ব্যক্তি তার মূত্রথলিতে ঐ মদের কিছু পরিমাণ রাখা অবস্থায় মারা যাবে, তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যাবে এবং) যে কেউ তা নিজ পেটে রেখে মারা যাবে, সে জাহেলী যুগের মরণ মরবে।” (ত্বাবারানী ১৫৪৩, দারাকুত্বনী ৪/২৪৭, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৬৯৫নং)

আবু দারদা বলেন, আমাকে আমার বন্ধু বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন যে, ((لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ شَيْئًا ، وَإِنْ قُطَّعْتَ وَحُرِّقْتَ ، وَلَا تَتْرُكْ صَلَاةً مَكْتُوبَةً مُتَعَمِّدًا ، فَمَنْ تَرَكَهَا مُتَعَمِّدًا ، فَقَدْ بَرئَتْ مِنْهُ الدَّمَّةُ ، وَلَا تَشْرَبِ الْخَمْرَ ، فَإِنَّهَا مِفْتَاحُ كُلِّ شَ). "তুমি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না---যদিও (এ ব্যাপারে) তোমাকে হত্যা করা হয় অথবা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ইচ্ছাকৃত ফরয নামায ত্যাগ করো না। কারণ যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নামায ত্যাগ করে, তার উপর থেকে (আল্লাহর)
দায়িত্ব উঠে যায়। আর মদ পান করো না, কারণ মদ হল প্রত্যেক অমঙ্গলের (পাপাচারের) চাবিকাঠি।” (ইবনে মাজাহ ৪০৩৪, সহীহ ইবনে মাজাহ ৩২৫৯নং)

হৃদয়ের দরজায় যখন ক্রোধ অথবা আবেগ প্রবেশ করে, তখন বিবেক-বুদ্ধি তার জানালা দিয়ে পলায়ন করে। ক্রোধ হল এমন ঝড়, যা জ্ঞানের বাতি নিভিয়ে ফেলে। এই জন্য মহানবী ﷺ-এর বিশেষ উপদেশ হল, "তুমি রাগ করো না।” (বুখারী ৬১১৬নং)

আবেগ নিয়ন্ত্রণ ক'রে বিবেক প্রয়োগ করা জ্ঞানীর কাজ। যেহেতু বিবেক মানুষকে সত্যের পথ দেখায় আর আবেগ পথভ্রষ্ট করে।

খেয়ালখুশী মানুষকে হক পথ থেকে বিচ্যুত করে, হক গ্রহণে বাধাদান করে এবং ন্যায় বিচারে অন্তরায় সৃষ্টি করে। সেই জন্য মহান সৃষ্টিকর্তা দাউদ কে বলেছিলেন,

{يَا دَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُم بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلُّكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّ الَّذِينَ يَضِلُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ بِمَا نَسُوا يَوْمَ الْحِسَابِ} (٢٦) سورة ص

"হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, অতএব তুমি লোকদের মধ্যে সুবিচার কর এবং খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না, করলে এ তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করবে। নিশ্চয় যারা আল্লাহর পথ পরিত্যাগ করে, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি, কারণ তারা বিচার দিনকে ভুলে থাকে।" (স্বাদঃ ২৬)

শেখ সা'দী বলেছেন, "বুদ্ধি প্রবৃত্তির হাতে সেই মতো বন্দী, যে মতো কোন পুরুষ থাকে বেশ্যার হাতে।"

ফিরিশ্তার জ্ঞান আছে, প্রবৃত্তি নেই। জন্তুর জ্ঞান নেই, প্রবৃত্তি আছে। মানুষের জ্ঞান আছে, প্রবৃত্তিও আছে। সুতরাং যার প্রবৃত্তি সংযত ও জ্ঞান আলোকিত, সে ফিরিশ্তার ন্যায়। পক্ষান্তরে যার জ্ঞান পরাভূত এবং প্রবৃত্তি উচ্ছৃঙ্খল, সে পশুর ন্যায়। (তাফসীর কুশাইরী ৫/৩৭৮)

ইবনে আত্বা বলেছেন, 'যে ব্যক্তির প্রবৃত্তি তার জ্ঞান-বুদ্ধিকে এবং অস্থিরতা ধৈর্যশীলতাকে পরাজিত করে, সে লাঞ্ছিত হয়।' (যাম্মুল হাওয়া ২৭পৃঃ)

অন্ধ ভালোবাসা ও অন্ধভক্তি মানুষকে ন্যায়-অন্যায় দেখার ও বেছে নেওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নেয়। অনুরূপ কুপ্রবৃত্তি ও মনের খেয়ালখুশী মানুষকে অন্ধ ও গোঁড়া ক'রে তোলে। আর তা হলে সে নিজ জ্ঞান-বুদ্ধি দ্বারা সাফল্যের পাহাড়-চূড়ায় পৌঁছতে সক্ষম হয় না।
জ্ঞানিগণ বলেছেন, 'প্রবৃত্তি জ্ঞান-বুদ্ধিকে প্রবঞ্চিত করে, সঠিকতা থেকে দূরে রাখে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সুস্থতা থেকে পীড়া-দুর্বলতার দিকে এবং স্বচ্ছতা থেকে অস্বচ্ছতার দিকে বের ক'রে নিয়ে যায়। সুতরাং তখন সে অন্ধাবস্থায় দর্শন করে এবং বধিরাবস্থায় শ্রবণ করে।'

অনেকে বলেছেন, 'বুদ্ধিমত্তার আলোকে মানুষ সব কিছু দর্শন ক'রে থাকে। সুতরাং যার বুদ্ধিমত্তা খেয়ালখুশী থেকে নিরাপদ থাকে, সে প্রত্যেক জিনিসকে তার প্রকৃত অবস্থায় দর্শন করতে পারে। পক্ষান্তরে যার মন খেয়ালখুশীর অনুসারী, সে প্রত্যেক জিনিসকে নিজের মতো ক'রে দর্শন করে।'

ইবনে দুরাইদ বলেছেন, 'বুদ্ধিমত্তার আপদ হল কুপ্রবৃত্তি। সুতরাং যার বুদ্ধিমত্তা তার কুপ্রবৃত্তির উপর বিজয়ী হয়, সে পরিত্রাণ লাভ করে।' (সাবীলুল হুদা ৩/৩৪)

মানুষের কুপ্রবৃত্তি ও খেয়ালখুশী যখন তার জ্ঞানের মাথা খায়, তখন কোন দলীল-প্রমাণ কাজে আসে না, কোন যুক্তি তাকে প্রভাবিত করতে পারে না। আর তখন সে নিজেরটা ছাড়া অন্যেরটা ভালো মনে করে না, নিজের বুঝটাকেই সঠিক ধারণা করে এবং তার ফলে সে সত্য ও সরল পথ থেকে দূরে সরে যায়। মহান আল্লাহ বলেছেন,

{فَإِن لَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ} (৫০) سورة القصص

"অতঃপর ওরা যদি তোমার আহবানে সাড়া না দেয়, তাহলে জানবে ওরা তো কেবল নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে। আল্লাহর পথনির্দেশ অমান্য ক'রে যে ব্যক্তি নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে, তার অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত আর কে? নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়কে পথনির্দেশ করেন না।” (কাসাস্ব :৫০)

প্রকৃত জ্ঞানী ও সফল বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যার বুদ্ধিমত্তা তার প্রবৃত্তির উপর এবং যার ধৈর্যশীলতা তার অস্থিরতার উপর বিজয়ী হয়। কোন অন্ধ প্রেম ও প্রলোভন তাকে প্রলুব্ধ করতে এবং তুচ্ছ কোন কাজ তাকে ব্যস্ত করতে পারে না।

📘 সফল মানব > 📄 সম্মান-সাফল্য

📄 সম্মান-সাফল্য


মানুষের ইজ্জত-সম্মান লাভে সফলতা একটি বড় সফলতা। এমনিতে মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ জীব।

'শোনো মানুষের বাণী, জন্মের পর মানব জাতির থাকে না ক' কোন গ্লানি!'

কিন্তু মানুষ নিজ কর্মদোষে নিজের মধ্যে গ্লানি আনয়ন করে এবং নিজেকে কলুষিত করে। নিজের সম্মান নিজে নষ্ট করে।

তাই ইসলাম বিধান দিয়েছে আত্মশুদ্ধির। আত্মশুদ্ধির মাঝে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ ক'রে সম্মানের মহাসাফল্য লাভ করতে পারে।

তদনুরূপ বিবাহের মাধ্যমে নিজেকে চারিত্রিক অপবিত্রতা ও নোংরামি থেকে নির্মল রাখতে পারে।

মহানবী বলেছেন, (( مَنْ تَزَوَّجَ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ نِصْفَ الإِيمَانِ فَلْيَتَّقِ اللَّهُ فِي النَّصْفِ الْبَاقِي)). "যে ব্যক্তি বিবাহ করে, সে তার অর্ধেক ঈমান পূর্ণ করে, অতএব বাকী অর্ধেকে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।” (ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৭৬৪৭, ৮৭৯৪, সঃ জামে' ৬১৪৮-নং)

এ ছাড়া অনৈতিক কোন কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়লে মানুষ নিজের মান-সম্ভ্রম হারিয়ে বসে। চরিত্র হারিয়ে মানুষ নিম্নগামী হয়।

এই জন্য ইসলাম বলেছে, 'তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না।' কারণ তাতে মানুষের চরিত্রে দাগ পড়ে। তার শাস্তি ভোগ ক'রেও মানহারা হয়। জনগণের সামনে অবিবাহিত ব্যভিচারী যুবক-যুবতীকে ১০০ বেত্রাঘাত করা হয়। আর তাতে অপমানে তারা প্রচন্ড লাঞ্ছিত হয়। আর বিবাহিত হলে তো সরকার তাদেরকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করে।

মান রক্ষার তাকীদেই ইসলাম মুসলিমকে ব্যভিচারের কোন ভূমিকায় পদক্ষেপ করতে নিষেধ করেছে।
* নারী-পুরুষ যেন নিজেদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে।
* তারা যেন একে অপরের প্রতি সকাম দৃষ্টিপাত না করে।
* মহিলা যেন যথার্থ পর্দানশীন হয়। মাথায় খোঁপা না বাঁধে।
* গোপন অলঙ্কারের শব্দ যেন প্রকাশ না করে।
* মোহনীয় কণ্ঠে পরপুরুষের সাথে বাক্যালাপ না করে।
* বেগানা নারীপুরুষে যেন একাকিত্ব বা নির্জনতা অবলম্বন না করে।
* তারা যেন একে অন্যের দেহ স্পর্শ বা মুসাফাহাহ না করে।

মহিলা যেন স্বামী বা এগানা পুরুষ ছাড়া একাকিনী সফর না করে। বেগানা পুরুষদের মাঝে যেন নিজের দেহ বা পোশাকের সুবাস বিতরণ না করে। গোসলের আম জায়গায় (সমুদ্র, নদী বা পুকুর ঘাটে) যেন গোসল না করে। পরস্ত্রীর রূপ-সৌন্দর্য অথবা দেহাঙ্গ-সৌষ্ঠবের কথা যেন নিজ স্বামীর কাছে না বলে।

হ্যাঁ, ব্যভিচারের এ সকল ভূমিকা থেকে দূরে থাকতে পারলে মহিলা ইভটিজিং ও ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পেতে পারে। ব্যভিচারের অবতরণিকায় পা না রাখলে অবৈধ প্রেম-ভালোবাসা-ঘটিত নানা মান-সম্মান নষ্টকারী কর্মকান্ড থেকে রক্ষা পেয়ে প্রত্যেক নারী-পুরুষ চারিত্রিক সাফল্যলাভ করতে পারে।

যে বিকৃত যৌনাচারী সমকামিতা অথবা পশুগমনে অভ্যাসী, তারা এত নিকৃষ্ট যে, তাদের তো এ সুন্দর ধরাতে বেঁচে থাকার অধিকারই নেই। মহানবী বলেছেন,

مَنْ وَجَدْتُمُوهُ وَقَعَ عَلَى بَهِيمَةٍ فَاقْتُلُوهُ وَاقْتُلُوا الْبَهِيمَةَ مَعَهُ ..

"যে ব্যক্তিকে কোন পশু-সঙ্গমে লিপ্ত পাবে, সে ব্যক্তি ও সে পশুকে তোমরা হত্যা করে ফেলবে।” (তিরমিযী ১৪৫৫, ইবনে মাজাহ ২৫৬৪, হাকেম ৮০৪৯, বাইহাক্বী ১৭৪৯১, ১৭৪৯২, সহীহুল জামে' ৬৫৮৮নং)

চরিত্রহীন সমকামীদের ব্যাপারে নির্দেশ হল,

مَنْ وَجَدْتُمُوهُ يَعْمَلُ عَمَلَ قَوْمٍ لُوطٍ فَاقْتُلُوا الْفَاعِلَ وَالْمَفْعُولَ بِهِ ..

"তোমরা যে ব্যক্তিকে লুত নবীর উম্মতের মত সমকামে লিপ্ত পাবে, সে ব্যক্তি ও তার সহকর্মীকে হত্যা করে ফেলো।” (আহমদ ২৭৩২, আবু দাউদ ৪৪৬৪, তিরমিযী ১৪৫৬, ইবনে মাজাহ ২৫৬১, বাইহাকী ১৭৪৭৫, সহীহুল জামে' ৬৫৮৯নং)

লম্পট তো চরিত্রহীনই, তার আবার মান-সম্মান কিসের? তেমনি মান-সম্মান নেই মেড়া পুরুষের, যে পরকালে জান্নাতী হতেও পারবে না। মহানবী ﷺ বলেছেন, ((ثَلَاثَةٌ لَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْعَاقُ وَالِدَيْهِ وَالْمَرْأَةُ الْمُتَرَجِّلَةُ الْمُتَشَبِّهَةُ بِالرِّجَالِ وَالدَّيُّوتُ ...... "তিন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং তাদের প্রতি আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকিয়েও দেখবেন না; পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, পুরুষবেশিনী বা পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বনকারিণী মহিলা এবং দাইয়ুস (মেড়া) পুরুষ; (যে তার স্ত্রী, কন্যা ও বোনের চরিত্রহীনতা ও নোংরামিতে চুপ থাকে এবং বাধা দেয় না।) (আহমাদ ৬১৮০, নাসাঈ ২৫৬২, সহীহুল জামে' ৩০৭১নং)

ইসলামে মান-সম্মানের গুরুত্ব আছে বলেই পর চরিত্রে মিথ্যা কলঙ্কের কালিমা লেপন করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে এবং ৮০ চাবুক তার শাস্তি নির্ধারণ করেছে।

মহান আল্লাহ বলেছেন, { وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاء فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ} (٤) سورة النور

"যারা সাধুী রমণীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর স্বপক্ষে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশি বার কশাঘাত করবে এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না; এরাই তো সত্যত্যাগী।” (নূরঃ ৪)

আর মহানবী বলেছেন, الربا) اثنان وَسَبْعُونَ بَاباً أَدْنَاهَا مِثْلُ إتيان الرَّجُل أُمَّهُ ، وَإِنَّ أَرْبَى الرِّبَا اسْتِطَالَةُ الرَّجُلِ فِي عَرْضِ أَخِيهِ)).

"সূদ (খাওয়ার পাপ হল) ৭২ প্রকার। যার মধ্যে সবচেয়ে ছোট পাপ হল মায়ের সাথে ব্যভিচার করার মতো! আর সবচেয়ে বড় (পাপের) সূদ হল নিজ (মুসলিম) ভাইয়ের সম্ভ্রম নষ্ট করা।” (ত্বাবারানীর আউসাত্ব ৭১৫১, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৮৭১নং)

নিশ্চয়ই, এ সংসারে যার মান-সম্ভ্রম উচ্চ, যার চরিত্রে কলঙ্কের কোন দাগ নেই, সমাজের মানুষ যাকে সচ্চরিত্রতার কারণে শ্রদ্ধা ও সম্মান করে, সে একজন সফল মানব।

📘 সফল মানব > 📄 ধন-সাফল্য

📄 ধন-সাফল্য


মানুষের অতি প্রয়োজনীয় জিনিস এই মাল। দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণের জন্য ব্যয় করা হয় এই জিনিসকে। ইসলামে রয়েছে এই ধনরক্ষার নানা বিধান। বলা বাহুল্য ধন-সাফল্য বিশাল সাফল্য। তবে তাতে কিছু শর্ত আছে। যেমনঃ-

১। ধন হালাল পথে উপার্জিত হতে হবে।

যেহেতু মহানবী সাহাবী কা'ব-কে বলেছিলেন,

يا كعب بن عجرة ! إنه لن يدخل الجنة لحم نبت من سحت)).

"হে কা'ব বিন উজরাহ! সে মাংস কোন দিন বেহেশ্তে প্রবেশ করতে পারবে না, যার পুষ্টিসাধন হারাম খাদ্য দ্বারা করা হয়েছে।” (দারেমী ২৭৭৬নং)

"--- হে কা'ব বিন উজরাহ! যে মাংস হারাম খাদ্য দ্বারা প্রতিপালিত হবে, তার জন্য জাহান্নামই উপযুক্ত।” (সহীহ তিরমিযী ৫০১নং)

অতএব যে ধনী হারাম উপায়ে ধনোপার্জন করেছে, চুরি-ডাকাতি ক'রে, সুদ-ঘুস খেয়ে, আমানতে খিয়ানত ক'রে, অবৈধ ব্যবসা ক'রে, মাদকদ্রব্য বা নারীদেহের ব্যবসা ক'রে ধনপতি হয়েছে অথবা অন্য কোন নিষিদ্ধ উপায়ে অর্থোপার্জন ক'রে বড়লোক হয়েছে, তাকে সফল ধনী বা ধন-সাফল্য বলা যায় না।

২। যথানিয়মে তার হক আদায় করতে হবে। অর্থাৎ, যেভাবে সেই ধন ব্যয় করতে ধনী আদিষ্ট, তা ব্যয় করতে হবে। পরিজনের যথাযথ হক আদায় করতে হবে। নিয়মিত ওশর-যাকাত আদায় করতে হবে। তা না করলে সে ধন অবৈধ ধনে পরিণত হয়ে যাবে।

৩। বিধেয় ও বৈধ পথে তা ব্যয় করতে হবে। অর্থাৎ, কোন অবৈধ পথে ব্যয় করা যাবে না এবং বৈধ পথেও তাতে অপচয় বা অপব্যয় করা যাবে না।

৪। ধনদাসে পরিণত হওয়া যাবে না। ডঃ মুস্তফা সিবাঈ বলেন, 'যার জীবন অপেক্ষা তার মালধন অধিক প্রাধান্যযোগ্য সে একজন আহাম্মক। যার মান-সম্মান অপেক্ষা তার মালধন অধিক প্রাধান্যযোগ্য সে একজন নিকৃষ্ট। যার জাতি ও দেশ অপেক্ষা তার মালধন অধিক প্রাধান্যযোগ্য সে একজন সমাজ-বিরোধী। আর যার ধর্ম অপেক্ষা তার মালধন অধিক প্রাধান্যযোগ্য সে একজন এমন লোক যার হৃদয়কে আকৃষ্ট করার জন্য যাকাত দেওয়া যাবে।'

মহানবী বলেছেন,

((تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ وَعَبْدُ الدِّرْهَم وَعْبَدُ الْخَمِيصَةِ إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ وَإِنْ لَمْ يُعْطَ سَخِطَ تَعِسَ وَانْتَكَسَ وَإِذَا شِيكَ فَلَا انْتَقَشَ)).

"ধ্বংস হোক দীনারের গোলাম, দিরহামের গোলাম ও উত্তম পোশাকের গোলাম (দুনিয়াদার)! যদি তাকে দেওয়া হয়, তাহলে সে সন্তুষ্ট হয়। আর না দেওয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়। সে ধ্বংস হোক, লাঞ্ছিত হোক! তার পায়ে কাঁটা বিঁধলে তা বের করতে না পারুক।” (বুখারী ২৮৮৭, মিশকাত ৫১৬১নং)

📘 সফল মানব > 📄 সার্বিক সাফল্যের জন্য অনুসরণীয় নীতিমালা

📄 সার্বিক সাফল্যের জন্য অনুসরণীয় নীতিমালা


কিছু নীতি আছে, যা অবলম্বন করলে সাফল্য অর্জন সহজ হয়ে যায়। নিম্নে তার কিছু উল্লিখিত হল।

১। মনছবি

সাফল্যের জন্য প্রয়োজন ব্যক্তির সাধ। সাধ-সাধ্য-সাধনা, তবেই পুরবে বাসনা। সাফল্য লাভের আকাঙ্ক্ষা, বাসনা ও স্পৃহা মনের মধ্যে জাগরূক না থাকলে সাফল্যের নাগাল পাওয়া সুকঠিন।
মনের মাঝে সাফল্যের মনছবি প্রস্তুত থাকতে হবে। আমি ক্লাশের ফার্স্ট হতে চাই। আমি প্রসিদ্ধ ডাক্তার হতে চাই। আমি বড় আলেম হতে চাই। আমি বড় সাহিত্যিক হতে চাই। আমি বড় ধনী হতে চাই। ইত্যাদি
মনের ভিতরে সেই সাধের ছবি তৈরি থাকলে সেই অনুযায়ী সাধনা কাজ করবে এবং সাধ্যাধীন হলে অবশ্যই সাফল্যকে শিকার করা যাবে।
সাফল্যের লক্ষ্যস্থল নির্ণয় করতে হবে। নচেৎ লক্ষ্যহীন সাধনায় ফললাভ সম্ভব নয়। যেমন অজানা গন্তব্যস্থলের দিকে পদযাত্রা নিরুদ্দেশ বা উন্মাদের আচরণ। কবি বলেছেন,
'এসেছি, তবে জানি না আমি এসেছি কোথা হতে,
চোখের সামনে পথ দেখেছি চলিতেছি সেই পথে।
এমনি ভাবে চলতে র’ব ইচ্ছে আমার যত,
কোথায় যাব তাও জানিনে পথই বা আর কত?’

মনের গতি যদি এমন হয়, তাহলে সাফল্যের রাজ্যে পদার্পণ করার স্বপ্ন কেবল নিদ্রার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

হ্যাঁ, যে জিনিসের স্বপ্ন আপনি দেখতে পারেন, সে জিনিসকে বাস্তবে আপনি লাভ করতে পারেন। সুতরাং শুরু করার আগে প্রত্যেক কর্মের মনছবি প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন।
মনছবি তৈরি করুন। মনের মাঝে সাফল্যের বিরাট আকাঙ্ক্ষা জাগরিত রাখুন। মনকে প্রতিশ্রুতি দিন যে, আপনি সাফল্য পাবেনই। সফলতা অবশ্যই আপনার পদচুম্বন করবে।
আর খবরদার! মনের ভিতরে দুর্বলতা আনবেন না, সন্দেহ, সংশয় ও দ্বিধা আনবেন না, ব্যর্থতার আশঙ্কা এনে মনকে শঙ্কিত করবেন না। নচেৎ সাফল্য আপনাকে ধরা দেবে না।
আপনি মনের মাঝে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল করতে পারেন যে, আপনি সফল, তাহলে আপনি সফল। আর যদি আপনার মন আপনাকে বলে, আপনি বিফল, তাহলে আপনি বিফল।

'এই সংসার সুখের কুটী, যার যেমন মন তেমি ধন, মনকে কর পরিপাটী।'

মানুষের মন অনুযায়ী মহান সৃষ্টিকর্তা ফল দিয়ে থাকেন। মানুষ যে নিয়ত করে, সে নিয়ত অনুযায়ী নিজ কর্মের ফলাফল প্রাপ্ত হয়। মহান আল্লাহ বলেন,
{وَمَن يُرِدْ ثَوَابَ الدُّنْيَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَن يُرِدْ ثَوَابَ الآخِرَةِ نُؤْتِهِ مِنْهَا وَسَنَجْزِي الشَّاكِرِينَ} (١٤٥) سورة آل عمران

অর্থাৎ, যে কেউ পার্থিব পুরস্কার চাইবে আমি তাকে তা হতে (কিছু) প্রদান করব এবং যে কেউ পারলৌকিক পুরস্কার চাইবে আমি তাকে তা হতে প্রদান করব। আর শীঘ্রই আমি কৃতজ্ঞদেরকে পুরস্কৃত করব। (আলে ইমরানঃ ১৪৫)
তিনি অন্যত্র বলেন, {وَمَنْ أَرَادَ الْآخِرَةَ وَسَعَى لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَئِكَ كَانَ سَعْيُهُم مَّشْكُورًا }

অর্থাৎ, যারা বিশ্বাসী হয়ে পরলোক কামনা করে এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে, তাদেরই চেষ্টা স্বীকৃত হয়ে থাকে। (সূরা ইসরা' ১৯ আয়াত)

{وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى} (۳۹) سورة النجم
অর্থাৎ, মানুষ তাই পায় যা সে চেষ্টা করে। (সূরা নাজম ৩৯ আয়াত)

মহানবী বলেছেন, "মহান আল্লাহ বলেন, আমি আমার বান্দার ধারণার কাছে থাকি। সে আমাকে ভালো ধারণা করলে ভালো পাবে। আর মন্দ ধারণা করলে মন্দ পাবে।” (সহীহুল জামে' ১৯০৫নং)

সে ছাত্র কোনদিন সফল ছাত্র হতে পারে না, যতদিন না তার মনে সফলতার প্রবল ইচ্ছা বাসা বেঁধেছে। সে ব্যক্তি কোনদিন সফল হতে পারে না, যতদিন না সাফল্য লাভের লোভ তার মনকে লোভাতুর ক'রে তুলেছে।

পঞ্চম খলীফা উমার বিন আব্দুল আযীয (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'আমার আছে উচ্চাকাঙ্ক্ষী মন। আমীর হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করলে আমীর হয়ে গেলাম। রাজকন্যা লাভ করার আকাঙ্ক্ষা করলে ফাতেমা বিন্তে আব্দুল মালেককে স্ত্রীরূপে লাভ করলাম। খলীফা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করলে খলীফা হলাম। এখন আমি জান্নাতী হওয়ার আকাঙ্ক্ষী। আশা করি আমি তাও হতে পারব।' (উয়নুল আখবার ১/৯৯, অফিয়াতুল আ'য়ান ২/৩০১)

২। লক্ষ্য স্থির করা

আপনি আপনার জীবনের লক্ষ্য স্থির করুন। আপনার জানা থাকা দরকার, আপনি কে? আপনি কোথায় ছিলেন? আপনি এ ধরাধামে কেন এসেছেন? আপনি কি নিজে এসেছেন, নাকি আপনাকে পাঠানো হয়েছে? আপনার জীবন কি ইহকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি মরণের পরেও অনন্তকালের জীবন আছে?

আপনি মুসলিম হলে অবশ্যই বিশ্বাস করেন, মরণের পর অনন্তকালের একটি জীবন আছে। ইহকালের জীবনে কেউ দ্বিতীয়বার ফিরে আসে না। আর পরকালের জীবনকে সুন্দর ও সুখের করার ব্যবস্থা ইহকালেই নিতে হবে। তাহলে আপনার লক্ষ্য হবে, পরকালের সুখী জীবন। আর সেই সাথে ইহকালেরও সুখী জীবন। আমরা প্রার্থনায় নিত্য কামনা ক'রে থাকি, رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ} 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ইহকালে কল্যাণ দান কর এবং পরকালেও কল্যাণ দান কর। আর আমাদেরকে দোযখ-যন্ত্রণা থেকে রক্ষা কর।'

পরন্তু যদি দুটি জীবনের মধ্যে একটি জীবনে সফল হতে হয়, তাহলে আপনি কোন্টিকে প্রাধান্য দেবেন? সত্তর-একশ' বছরের জীবনকে, নাকি অনন্ত কালের জীবনকে?

একটাকে বিক্রয় ক'রে যদি অন্যটাকে ক্রয় করতে হয়, তাহলে নিশ্চয় আপনি জ্ঞানী হলে দুনিয়াকে বিক্রয় ক'রে আখেরাতকে ক্রয় করবেন। দুটোর মধ্যে একটার এখতিয়ার দেওয়া হলে, নিশ্চয় আপনি ক্ষণস্থায়ী জীবনকে বর্জন ক'রে চিরসুখের জীবনকে প্রাধান্য দেবেন। তবুও আপনার টার্গেট হোক, উভয় জীবনের সুখ। লক্ষ্যস্থল হোক, উভয় জীবনের সাফল্য।

পার্থিব জীবনে সুখী হতে হলে মানবের পঞ্চপ্রয়োজনে আপনাকে অভাবমুক্ত থাকতে হবে। আর পঞ্চপ্রয়োজন সঠিকভাবে সংরক্ষিত হলে আপনি পারলৌকিক জীবন সুখের হবে।

সুতরাং আপনার জীবনের প্রথম লক্ষ্য হোক সাফল্যের জন্য পড়াশোনা করা। আর তাতে সাফল্য লাভ ক'রে আপনি কী হতে চান, তা নির্ধারণ করুন। দুনিয়ার সাফল্যমূলক কোন্ কর্ম আপনার লক্ষ্য, তা নির্ণয় করুন। আপনি ডাক্তার হয়ে, নাকি আলেম হয়ে, নাকি ইঞ্জিনিয়ার হয়ে সফল হতে চান, তা ঠিক করুন এবং আপনি আপনার মনের খাতায় সে কথা লিপিবদ্ধ করুন।

অভিজ্ঞগণ বলেছেন, কাগজের খাতায় লিপিবদ্ধ উদ্দেশ্য ৯০ শতাংশ পূর্ণ হয়। উদ্দেশ্য লেখা থাকলে তা পূরণের জন্য মানুষ বেশি সচেষ্ট ও উদ্যোগী হয়। লেখা দেখে ও পড়ে উদ্দেশ্য সাধনে মানুষ বেশি মনোযোগী হয়।

আপনি আপনার জীবনের মহান লক্ষ্য স্থির করুন। তাহলে আপনি আপনার জীবনের অর্থ বুঝতে পারবেন। আপনার সম্মুখে চলার পথ স্পষ্ট হয়ে যাবে। জীবনে বেঁচে থাকার স্বাদ অনুভব করবেন এবং জীবন আপনার কাছে তুচ্ছ মনে হবে না।

লক্ষ্যই আপনার সেই চ্যানেল, যার মাধ্যমে আপনি লাভ করবেন অনুপ্রেরণা, উৎসাহ ও উদ্যম।

লক্ষ্যই আপনাকে প্রত্যহ সকালে ঘুম থেকে উঠতে তাকীদ করবে, বিছানা ত্যাগ ক'রে কর্মস্থলে যেতে উদ্বুদ্ধ করবে এবং যথেষ্ট সময়ই তাতে ব্যয় করতে বাধ্য করবে।

লক্ষ্যই হল আপনার সেই ইন্ধন, যেখান থেকে আপনি আপনার কর্মে শক্তি, সামর্থ্য, স্ফূর্তি, সক্রিয়তা ও সজীবতা লাভ করতে থাকবেন।

লক্ষ্যহীন মানুষ জীবজন্তুর মতো জীবনধারণ করে। যেহেতু তার লক্ষ্য কেবল আহার করা ও নিদ্রা যাওয়া। লক্ষ্যহীন জীবন অনুর্বর ভূমির মতো, যাতে কোন উদ্ভিদ জন্মে না।

লক্ষ্যস্থল ঠিক রেখে তাতে প্রচেষ্টার তীর অবিরাম নিক্ষেপ করতে থাকুন। জিত আপনার হবেই।

বল খেলার ময়দানে খেলতে নেমে গোলপোস্টটা খেয়াল রেখে বলে কিক করতে থাকুন। অবশ্যই আপনি গোল করতে পারবেন।

লক্ষ্য স্থির হলে তবেই আপনি আপনার সাফল্য অর্জনে সাহস পাবেন, বীরত্ব ও দুর্দমনীয়তা পাবেন। নির্ভিক পদক্ষেপ করবেন।

লক্ষ্যস্থল একাধিক হওয়াতে দোষ নেই। সকল সম্ভাব্য লক্ষ্যেই আপনি পৌঁছতে সক্ষম হবেন।

পরকালের জীবনের সাথে ইহকালের লক্ষ্য, উভয় জগতে জান্নাত পাওয়ার লক্ষ্য আপনার স্থির থাক। তবে পরকালের উপর ইহকালকে প্রাধান্য দেবেন না। পরকাল যেন আপনার গৌণ বিষয় না হয়ে দাঁড়ায়।

লক্ষ্যস্থলে পৌঁছতে আপনি আপনার পেশাকে নেশায় পরিণত করুন। ঠিক একদিন আপনি আপনার গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাবেন।

সামাজিক কর্মের লক্ষ্যস্থল ঠিক রাখুন, যাতে আপনি আপনার পরিবার, পরিবেশ, সমাজ ও দেশ গড়তে সক্ষম ও সফল নাগরিক হন।

মানব-জীবনের লক্ষ্য বহুমুখী হতে পারে। আশার কি কোন শেষ আছে? যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। লক্ষ্যস্থলই জীবনকে গতিশীল ও কর্মময় ক'রে তোলে।

জীবনের বিভিন্ন স্তরে লক্ষ্য পরিবর্তনে দোষ নেই। কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব ও বার্ধক্য---প্রত্যেক স্তরে ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য হতে পারে।

মহান লক্ষ্যই আপনাকে আপনার জীবনের সকল পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে ফলদান করতে পারে।

লক্ষ্য ঠিক থাকলে সাফল্য একদিন আসবেই। শত বিফলতার পরেও সাফল্য অর্জন করা কোন উপকথা বা রূপকথার কাহিনী নয়।

৩। পরিকল্পনা ও সুকৌশল

সাফল্যের লক্ষ্য স্থির হয়ে তার মনছবি প্রস্তুত হলে তা বাস্তবায়নের জন্য সঠিক পরিকল্পনা চাই। বিনা পরিকল্পনায় যেমন একটি নির্মাণকাজ সুদৃঢ় ও সফল হতে পারে না, তেমনি যে কোনও সাফল্য লাভের কাজ পরিকল্পনাবিহীন হলে মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য।

জীবনের লক্ষ্যপথে চলার পরিকল্পনা, কীভাবে চললে অভীষ্ট লাভ হবে, কীভাবে করলে সাফল্য অর্জন হবে, তার সুচিন্তিত পদ্ধতি গ্রহণ এবং কর্ম-প্রণালীর নকশা তৈরি করা কাজ শুরু করার পূর্বে জরুরী। নচেৎ পরিকল্পনাহীন কাজে ব্যর্থতা অনিবার্য।

অভিজ্ঞগণ বলেছেন, 'বিফল মানুষ দুই শ্রেণীর; এক শ্রেণীর মানুষ করার ভাবনা-চিন্তা করে কাজ না ক'রে বিফল হয়। আর অন্য শ্রেণীর মানুষ চিন্তা-ভাবনা না ক'রে কাজ করার ফলে বিফল হয়।'

'পরিকল্পনার অসফলতা, অসফলতারই এক পরিকল্পনা।'

'কোন কাজে যার নিজস্ব পরিকল্পনা নেই, তার সাফল্য অনিশ্চিত।'

পরিকল্পনার সাথে সাথে কৌশল অবলম্বনও আবশ্যক। ঠিক সেই পথ ও মাধ্যম অবলম্বন করা জরুরী, যাতে সাফল্যের নিশ্চয়তা আছে। যেমন হরিণ শিকার করতে জঙ্গলে যেতে হবে, মাছ শিকার করতে পানিতে। ডাঙায় বসে কুমীর দর্শন হয়, শিকার হয় না।

আরবী কবি বলেছেন, ترجو النجاة ولم تسلك مسالكها . إن السفينة لا تجري على اليبس

পরিত্রাণ পেতে চাহ, চল না তার পথে, পানির জাহাজ কভু চলে না ডাঙ্গাতে।

৪। অনুরাগ ও আসক্তি যে কাজ আপনি করবেন, তার প্রতি আপনার অনুরাগ ও আসক্তি চাই। সে কাজ যেন আপনার ঘাড়ে চাপানো কোন দায়িত্ব না হয়। অতঃপর যখন সেটা আপনি করবেন, তখন এক প্রকার তৃপ্তি অনুভব করবেন। সে কাজ করতে কোন কষ্ট হলেও আপনি তাতে কোন প্রকার কষ্টবোধ করবেন না। কারণ, আপনি সে কাজকে খুব ভালোবাসেন।

জ্ঞানিগণ বলেছেন, 'যে কর্তব্য আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়, তা শেষ পর্যন্ত আনন্দের উৎস হয়। তাই কোন কাজ শুরু করতে হলে শুরু করতে হয় একটি জ্বলন্ত আকাঙ্ক্ষা দিয়ে। অল্প আগুন যেমন অনেক উত্তাপ দিতে পারে না, তেমনি দুর্বল ইচ্ছাশক্তি দ্বারা কোন মহৎ সিদ্ধিলাভ করা যেতে পারে না।

জীবনের রহস্য এই নয় যে, আপনি আপনার পছন্দনীয় কাজটি করবেন; বরং যে কাজই করবেন, তা পছন্দ করবেন। জীবনে যেটা চেয়েছেন, সেটা যদি না পান, তাহলে যেটা পেয়েছেন, সেটাকেই জীবনের চাহিদা বানিয়ে নিন।'

পক্ষান্তরে যে কাজ আপনি করেন, তা করতে যদি নিজেকে ছোট বোধ করেন, তাহলে তাতে কোন প্রকার উন্নতির সম্ভাবনা নেই। বরং মনে রাখতে হবে, 'জীবিকার নাই উচ্চ বা নীচ, কোন কাজ নয় হীন, আলস্য পাপ, তাই সঞ্চিত পুণ্যেও করে ক্ষীণ।' ওই দেখুন না,

'জাল কহে, পঙ্ক আমি উঠাব না আর, জেলে কহে, মাছ তবে পাওয়া হবে ভার।'

সুতরাং সকলের উচিত, সাফল্যের জন্য নিজ নিজ কর্ম, জীবিকা ও পেশাকে খুব ক'রে ভালোবাসা।

'অন্নের লাগি মাঠে লাঙলে মানুষ মাটিতে আঁচড় কাটে কলমের মুখে আঁচড় কাটিয়া খাতার পাতার তলে মনের ফসল ফলে।'
৫। বাস্তবিকতা

সাফল্য লাভের বাস্তব পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। কেবল খেয়াল ও কল্পনার জগতে সাফল্যের রঙিন স্বপ্ন নিয়ে পড়ে থাকায় লাভ নেই। বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও সংকল্প মানুষকে সাফল্যের পথে অগ্রসর হতে সহযোগিতা করে। আকাশ-কুসুম অবাস্তব কল্পনার জগতে থেকে সাফল্যের সোনার হরিণ ধরা যায় না। খেয়ালী পোলাও খাওয়া যায়, কিন্তু তাতে তৃপ্তি হয় না, পেট ভরে না, ক্ষুধা যায় না। অসম্ভব আশা ও দুরাশা নিরাশা ছাড়া আর কী দিতে পারে?

যার বাসনা ও কামনা অবাস্তব দীর্ঘ ও বিশাল হয়, তার কর্ম মন্দ হয়। আর যার কর্ম মন্দ হয়, তার সকল চেষ্টাই ব্যর্থ ও পন্ড হয়।

৬। নমনীয়তা বা নম্যতা

সাফল্য লাভের পথে বহু জায়গায় নমনীয়তা স্বীকার করার প্রয়োজন পড়বে। সে ক্ষেত্রে নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে তা স্বীকার করার জন্য। কারণ আপনি আপনার মতো পথ চলবেন, তা নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ত্যাগ স্বীকার করতে হলে করতে হবে, তবেই সাফল্যের নাগাল পাবেন।

না না, আমি ঈমান ও দ্বীনের ব্যাপারে ত্যাগ স্বীকার করার কথা বলছি না, এটা তো সম্ভবই নয়। আপনার অর্থ, আরাম-আয়েশ, প্রেম-ভালোবাসা ইত্যাদির ব্যাপারে কিছু ত্যাগ স্বীকার তো করতেই হবে। কিছু পেতে হলে কিছু তো দিতেই হবে---এ রীতি তো চিরন্তন। সুতরাং ব্যথা-বেদনা ও বিপদ-দুর্ঘটনার সময় নিজেকে স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রাখতে হবে।

সাফল্য অর্জনের পথে যে কোন পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক জ্ঞান করতে হবে। পথ পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়লে পরিবর্তন করতে হবে। আর সে নতুন পথকেও সাফল্যের পথ বলেই অবলম্বন করতে হবে। প্রাপ্তিতে টক এলেও তা মিঠা শরবতে দিয়ে পান করতে হবে।

পথ চলতে শুধু সামনেই তাকালে হয় না, প্রয়োজনে পিছন ফিরেও দেখতে হয়। জীবনে উচুতে উঠতে হলে একটু নিচুতে নামতে হয়।

পিঠ বাঁকানো ছাড়া পাহাড়ে ওঠা সম্ভবই নয়। মহৎ কিছু করতে গেলে কখনো কখনো এক-আধটুকু আঘাত সহ্য করতে হয় বৈকি। জীবন-ঝড়ে কখনো কখনো নুয়ে পড়তে হয়। আবার সোজা হয়ে দাঁড়াতে হয় সাফল্যের আশায়। মহানবী বলেছেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِ كَمَثَلِ الْخَامَةِ مِنَ الزَّرْعِ تُفَيِّتُهَا الرِّيَاحُ تَصْرَعُهَا مَرَّةً وَتَعْدِلُهَا حَتَّى يَأْتِيَهُ أَجَلُهُ وَمَثَلُ الْمُنَافِقِ مَثَلُ الْأَرْزَةِ الْمُجْنِيَةِ الَّتِي لَا يُصِيبُهَا شَيْءٌ حَتَّى يَكُونَ انْجِعَافُهَا مَرَّةً وَاحِدَةً ..

"মু'মিনের উদাহরণ হল নরম ফসলের মত, বাতাস তা হিলাতে-দুলাতে থাকে। মু'মিন বিপদগ্রস্ত হয় (আবার উঠে দাঁড়ায়)। পক্ষান্তরে (কাফের) মুনাফিকের উদাহরণ হল 'আরযা' (বিশাল সীডার) গাছের মত। তা বাতাসে হিলে না। কিন্তু (ঝড়ে) ভেঙ্গে ধ্বংস হয়ে যায়।” (বুখারী ৭৪৬৬, মুসলিম ৭২৭৩নং)

৭। ঝুঁকি

সাফল্যের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। ফুল-বিছানো পথ কাউকে মর্যাদার উচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে না। জীবন চলার পথে পড়ে আছে অসংখ্য পাথর। এতে আপনার চলার গতি যেন থেমে না যায়। বরং পাথরগুলি কুড়িয়ে নিয়ে তৈরি করুন সাফল্যের সিঁড়ি।

আপনি সাফল্য অর্জনের পথে চলবেন, আর তাতে ঝুঁকি থাকবে না? কোন বাধা আসবে না, এমন হতে পারে না। অতএব আপনি হবেন সেই অদম্য উৎসাহী মানুষের মতো, যে 'আসুক যত বাধা পথে, হারবে না সে কোন মতে।' আর 'একটি কথা ভেবে বলুন, কোন্ পথে নেই ঝুঁকি? জীবন চলার পথে ঝুঁকি সবখানে দেয় উকি।'

যে জাহাজ মহাসমুদ্রে যাত্রা করে, তার ঝড়ের মুখে পড়ার ঝুঁকি আছে। কিন্তু যে জাহাজ বন্দরে থাকে, সে জাহাজেরও ধীরে ধীরে মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে যাবার ঝুঁকি থাকে। ঝুঁকি না নিয়ে বিজয় লাভ হয় না। বাস দুর্ঘটনায় লোক মরছে দেখে যদি কেউ বাসে না চড়ে, ট্রেন দুর্ঘটনায় মানুষ মরছে দেখে যদি কেউ ট্রেনে না চড়ে, সে চালাক হতে পারে। কিন্তু বহু লোক বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় মারা যেতে দেখে যদি কেউ বিছানায় না শোয়, তাহলে তাকে আপনি কী বলবেন?

লোকে বলে, 'কামার লোহা চুরি করে' তবুও অস্ত্র গড়তে হবে। বলে, 'স্বর্ণকার স্বর্ণ চুরি করে' তবুও অলংকার গড়াতে হবে।

প্রত্যেক ব্যবসাতে যে লাভই হবে এবং নোকসান হবে না, সে কথার নিশ্চয়তা নেই। সাফল্য অনুসন্ধানের পথে ঝুঁকি আসবেই, দুঃখ-কষ্ট আসবেই। কিন্তু গৌরবলাভের পথে কষ্ট বড় মিষ্ট।

সাফল্য লাভ করতে হবে ঝুঁকির মধ্য দিয়েই, বিপদ ও বাধা উল্লংঘন করেই। শান্ত সমুদ্রে কখনো সুদক্ষ নাবিক হওয়া যায় না।

মধু পেতে হলে মৌমাছির হুল খেতে হয়। যারা মধুচোর, তারা মৌমাছিকে বশ করেই মধু আহরণ করে।

'বিফলতা আমাদের অকেজো করে, কিন্তু জীবনে যারা জয়ী হয়েছে, বিফলতার উপর ভিত্তি করেই তাদের সৌভাগ্যের প্রাসাদ রচিত।'

নিশ্চয় শুনে থাকবেন, বিদ্যুতের আলো ইত্যাদি আবিষ্কারকারী বিজ্ঞানী ১৮০০ বার তাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তবুও তিনি নিরাশ হননি, পিছু হটেননি। পরিশেষে এই বিশাল উপকারী জিনিসটি আবিষ্কার করতে সফল হয়েছিলেন।

ব্যর্থতার ঝুঁকি মাথায় রেখেই চেষ্টার পর চেষ্টা চালিয়ে গেলে তবেই সাফল্যের তালা খোলা যায়। মনে রাখবেন, একমাত্র সেই ব্যর্থ হয় না, যে কর্ম করে না। আপনি ব্যর্থ না হলে কখনই সফল হবেন না। ব্যর্থতা হল সফলতার সুযোগ ও অভিজ্ঞতা। ব্যর্থতাকে ভয় পাবেন না। ব্যর্থ প্রয়াসকে পুনরায় সফল করতে পিছপা হবেন না। ব্যর্থতা হল সাময়িক পরাজয়, যা সাফল্য সৃষ্টি করে।

ব্যর্থতাকে ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। ব্যর্থ লোকেরাই ব্যর্থতাকে ভয় পায়। ব্যর্থতার সিঁড়ি বেয়েই সফলতার চূড়ায় পৌঁছনো সম্ভব হয়।

যে পতনকে ভয় করে, সে কোন দিন জয়লাভ করতে পারে না। কোন কোন অসফলতা সফলতার দ্বার উদ্‌ঘাটন করে এবং সফলতার চাইতে অসফলতাই মানুষকে অধিক শিক্ষা দিয়ে থাকে। অতএব নির্ভয়ে কবির ভাষায় বলুন,
'আমি ভয় করব না, ভয় করব না দুবেলা মরার আগে মরব না ভাই মরব না। তরীখানা বাইতে গেলে, মাঝে মাঝে তুফান মেলে--- তাই বলে হাল ছেড়ে দিয়ে কান্নাকাটি করব না।'

সৎ লোক ৭ বার বিপদে পড়লেও আবার ওঠে, কিন্তু অসৎ লোক বিপদে পড়লে একেবারেই নিপাত হয়।

মহানবী বলেছেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِ كَمَثَلِ الْخَامَةِ مِنَ الزَّرْعِ تُفِيئُهَا الرِّيَاحُ تَصْرَعُهَا مَرَّةً وَتَعْدِلُهَا حَتَّى يَأْتِيَهُ أَجَلُهُ وَمَثَلُ الْمُنَافِقِ مَثَلُ الْأَرْزَةِ الْمُجْذِيَةِ الَّتِي لا يُصِيبُهَا شَيْءٌ حَتَّى يَكُونَ انْجِعَافُهَا مَرَّةً وَاحِدَةً

"মু'মিনের উদাহরণ হল নরম ফসলের মত, বাতাস তা হিলাতে-দুলাতে থাকে। মু'মিন বিপদগ্রস্ত হয় (আবার উঠে দাঁড়ায়)। পক্ষান্তরে (কাফের) মুনাফিকের উদাহরণ হল 'আরযা' (বিশাল সীডার) গাছের মত। তা বাতাসে হিলে না। কিন্তু (ঝড়ে) ভেঙ্গে ধ্বংস হয়ে যায়।” (বুখারী ৭৪৬৬, মুসলিম ৭২৭৩নং)

তিনি আরো বলেছেন,
الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِن الضَّعِيفِ وَفِي كُلِّ خَيْرٌ احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ وَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ وَلَا تَعْجَزْ وَإِنْ أَصَابَكَ شَيْءٌ فَلا تَقُلْ لَوْ أَنِّي فَعَلْتُ كَانَ كَذَا وَكَذَا. وَلَكِنْ قُلْ قَدَرُ اللَّهِ وَمَا شَاءَ فَعَلَ فَإِنَّ لَوْ تَفْتَحُ عَمَلَ الشَّيْطَانِ ..

"সবল মু'মিন আল্লাহর নিকট দুর্বল মু'মিন অপেক্ষা প্রিয়তর ও ভালো। অবশ্য উভয়ের মাঝেই কল্যাণ রয়েছে। তোমার যাতে উপকার আছে তাতে তুমি যত্নবান হও। আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর, আর অক্ষম হয়ে বসে পড়ো না। কোন মসীবত এলে এ কথা বলো না যে, '(হায়) যদি আমি এরূপ করতাম, তাহলে এরূপ হতো। (বা যদি আমি এরূপ না করতাম, তাহলে এরূপ হতো না।)' বরং বলো, 'আল্লাহ তকদীরে লিখেছিলেন। তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন।' (আর তিনি যা করেন, তা বান্দার মঙ্গলের জন্যই করেন; যদিও তুমি তা বুঝতে না পার।) পক্ষান্তরে 'যদি-যদি না' (বলে আক্ষেপ) করায় শয়তানের কর্মদ্বার খুলে যায়।” (আহমাদ ৮-৭৯১, ৮৮২৯, মুসলিম ৬৯৪৫, ইবনে মাজাহ ৭৯, সহীহুল জামে' ৬৬৫০ নং)

অসফলতা মানে ঘুরে দাঁড়াবার প্রস্তুতি। বিফলতা দুর্বলদের পথ-সমাপ্তি, কিন্তু সবলদের পথের শুরু।

পরাজয় মানেই সমাপ্তি নয়, যাত্রা একটু দীর্ঘ হওয়া মাত্র। ব্যর্থতা একটু ঘুর-পথ। পথের শেষ নয়। এর ফলে সাফল্যে বিলম্ব ঘটে, কিন্তু পরাজয় ঘটে না। আমাদের ভুলগুলি আমাদের অভিজ্ঞতাকেই সমৃদ্ধ করে।

'আসছে পথে আঁধার নেমে
তাই বলে কি রইবি থেমে
বারে বারে জ্বালবি বাতি
হয়তো বাতি জ্বলবে না,
তাই বলে তোর ভীরুর মত
বসে থাকা চলবে না।'

বলা বাহুল্য, পথ চলতে চলতে পড়ে যাওয়াটা মানুষের বিফলতা নয়, বিফলতা হল যেখানে সে পড়ে যায়, সেখানেই পড়ে থাকাটা।

'যে মাটিতে পড়ে লোক ওঠে তাই ধরে,
বারেক হতাশ হয়ে কে কোথায় মরে?
বিপদে পতিত তবু ছাড়িব না হাল,
আজিকে বিফল হলে হতে পারে কাল।'

নিশ্চয় আপনি সকল বিপদ ও বাধায় আশায় বুক বেঁধে বলতে পারেন, 'আমার সকল কাঁটা ধন্য করে ফুটবে গো ফুল ফুটবে, আমার সকল ব্যথা রঙিন হয়ে গোলাপ হয়ে উঠবে।'

নিশ্চয়ই অন্ধকার স্থায়ী হয় না। অন্ধকারের পর আলো আসে। তাই রাত-দিন হয়। সূর্য ডোবে বলেই সকাল হয়। সুতরাং রাত্রির অন্ধকার দেখে আপনি ভয় করবেন না, কারণ রাত্রির অন্ধকারের পর আপনার জন্য একটি সুন্দর দিন অপেক্ষা করছে। আকাশের মেঘের ঘনঘটা দেখে আমাদের ভয় পাওয়া উচিত নয়। কারণ সময় হলে মেঘ সরে যাবে।

'মেঘ দেখে কেউ করিনে ভয়
আড়ালে তার সূর্য হাসে,
হারা শশীর হারা হাসি
অন্ধকারেই ফিরে আসে।'

অনেক সময় এমনও হতে পারে, সাফল্যের নাগাল দূর মনে হয়ে আপনি নিরাশ হয়ে যাবেন। দুর্নাম রটেছে বলে অথবা অন্য কোন সাময়িক কারণে হয়তো আপনি আর সংগ্রাম চালিয়ে যেতে পারবেন না, হয়তো আপনি আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারবেন না ধারণা হবে। হয়তো আপনি ঘুরপথে ফিরে আসতে চাইবেন, বিফলতা লক্ষ্য ক'রে হয়তো আপনি আপনার বই-পত্র বিক্রয় করতে চাইবেন, আপনার যন্ত্রাদি ও গবেষণাগার বিক্রয় করতে চাইবেন, আপনার সাফল্যের সকল মাধ্যম থেকে নিষ্কৃতি পেতে চাইবেন। কিন্তু কবি আপনাকে আশা দিয়ে বলেছেন,

'শীতে ফুলের গাছ গেছে শুকাইয়া,
পাতাগুলি সমুদয় পড়েছে ঝরিয়া।
করো না করো না ভাই তাহারে ইন্ধন,
ভিতরে দেখহ তার মধুর কেমন।
বহিবে অচিরে যবে বসন্তের বায়,
হাসিবে গোলাপ তার শাখায় শাখায়।
গৌরবে তাহার হবে কানন উজ্জ্বল,
ভাবিও না আজি তার জীবন বিফল।
অন্তর নয়নে দেখ, ভিতরের রূপ।
বাহির দেখিয়া শুধু হয়ো না বিরূপ।'

৮। অগ্রাধিকার

সফল ব্যক্তিবর্গ কেবল একটাই কাজ করেন না। সুতরাং বিভিন্ন কাজের ভিড় জমলে তাঁরা সেই কাজটাকে আগে করেন, যেটা আগে করা দরকার। সেই কাজটা তাঁদের কাছে গুরুত্ব পায় না, যেটা করলে লাভ আছে। বরং তাঁরা সেই কাজকে অগ্রাধিকার দেন, যা না করলে ক্ষতির আশঙ্কা আছে। তাঁরা সর্বদা অপেক্ষাকৃত লাভ-ক্ষতির খতিয়ান দেখে কাজ করেন। যে কাজটা আগে করা জরুরী সে কাজটা আগে করেন, তারপর তার পরেরটা, তারপর তার পরেরটা।

জীবনের একাধিক লক্ষ্য হলে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যে সর্বপ্রথম পৌছতে সচেষ্ট হন। বড় লক্ষ্যের আগে ছোটগুলির দিকে মন দেবেন না। নচেৎ বড় ছেড়ে ছোট লক্ষ্যের পিছনে দৌড় দিলে এমনও হতে পারে, তাতেই আপনার জীবন ফুরিয়ে যাবে।

বিদ্বানগণ বলেন, 'যে ব্যক্তি ছোট ছোট লক্ষ্যগুলির প্রতি নিজ মনোযোগিতা ব্যয় করে, সে ব্যক্তি সেই সব উল্লেখযোগ্য কোন লক্ষ্যে পৌঁছনোর পূর্বেই নিজের আয়ু ক্ষয় ক'রে বসে। যেমন তিমি সমুদ্রের ছোট ছোট সার্ডিন মাছের পিছনে মনোযোগ রেখে ছুটতে থাকে। যে মাছের দল ছুটতে থাকে উপকূলের দিকে। অবশেষে উপকূলের বালিতেই আটকে পড়ে জীবন নষ্ট ক'রে ফেলে।

বলা বাহুল্য, একটার পর একটা সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যে পৌঁছনোর চেষ্টায় নিরত হন। ছোটগুলির প্রতি মন দিলে পরে দিতে পারেন।

অনেক সময় কোন কাজ অসম্ভব মনে হলে সফল ব্যক্তি যা অতি প্রয়োজনীয় কাজ তা দিয়ে শুরু করেন, তারপর যা সম্ভবপর তা শুরু করেন, অবশেষে দেখা যায় যে, অসম্ভব কাজও সম্ভব হয়ে যাচ্ছে।

'এক পা দুই পা করি ধীরে ধীরে অগ্রসরি
করে নর অতি উচ্চ গিরি উল্লঙ্ঘন।'

সফল ব্যক্তি আজকে যে কাজ করা জরুরী, সে কাজ কালকের জন্য অবশিষ্ট রাখেন না। দীর্ঘসূত্রতা তাঁর কাজে বাধ সাধতে পারে না। কারণ দীর্ঘসূত্রতা ও অলসতা বিফলতার সিংহদ্বার।

৯। উন্নতির আগ্রহ

করণীয় কাজের জন্য গর্ববোধ থাকলে সেই কাজের উৎকর্ষ বৃদ্ধি পায়। নিজ কর্মে ভালোবাসা থাকলে উৎপাদন ভালো হয়। প্রত্যেক কর্মের মধ্যে কর্মীর দক্ষতা ও মনোভাবের ছায়া থাকে। তা দেখলেই অনুমান করা যাবে, কর্মীর কাজে আগ্রহ ছিল কি না?

যে কাজই করুন, তার মধ্যে আপনার আগ্রহ থাকা উচিত। মনকে বাধ্য ক'রে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে কাজে মনোযোগ দেওয়া সম্ভব নয়, সম্ভব নয় তাতে সাফল্য লাভ।

সাফল্যের মান যেমনই হোক, যদি তাতে আপনার আগামী কাল আজকের মতো হয়, তাহলে আপনি ক্ষতিগ্রস্ত। যদি আপনার আগামী কাল গতকালের মতো হয়, তাহলে আপনি ব্যর্থ, আর যদি আপনার আগামী কাল অধিক ভালো হয়, তাহলে আপনি আপনার কর্মকে ভালোবাসেন, আপনি অগ্রগতি ও উন্নতি পছন্দ করেন এবং আপনি সফল।

কবি বলেছেন, 'আগে চল্ আগে চল্ ভাই, পড়ে থাকা পিছে মরে থাকা মিছে বেঁচে কী ফল ভাই।'

মনে রাখবেন, কাজের ভিতরে উন্নতির লোভ থাক। কিন্তু তাতে যেন 'রিয়া' এসে বাসা না বাঁধে। তাতে যেন সুখ্যাতি, সুনাম ও প্রসিদ্ধির লোভ না থাকে। নচেৎ জানেন তো, কর্মটাই আপনার বিফল যাবে।

১০। আত্মবিশ্বাস, সাহসিকতা

প্রত্যেক যুদ্ধের জন্য বীরত্ব আবশ্যক। সফলতার জীবন-যুদ্ধ তার থেকে আলাদা কিছু নয়। তাতেও প্রয়োজন প্রচন্ড সাহস ও বীরত্বের। দরকার আত্মবিশ্বাস ও সকল ভয়কে জয় করার সুদৃঢ় সংকল্প।

একজন মু'মিন মানুষের মাঝে থাকে মহাশক্তিমান আল্লাহর প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বাস ও পরিপূর্ণ ভরসা। এই ভরসাই তাকে পথ দেখায়, এই ভরসাই তার চলার পথে আলো দেখায়, এই ভরসাই তাকে শক্তি ও সাহস যোগায়।

আত্মবিশ্বাস মানুষকে সাফল্যের স্বপ্ন দেখায়। কর্ম তা বাস্তবে পরিণত করে। আত্মবিশ্বাসই গাড়ির ইন্ধন, যা সফলতার গন্তব্যের দিকে দ্রুত অগ্রসর করে।

সুতরাং সাফল্যের জন্য আত্মবিশ্বাস ও তার অনুভব একান্ত জরুরী জিনিস। সকল বাধাকে উল্লংঘন করার সাহসিকতা ও মানসিক প্রস্তুতি অবশ্যই প্রয়োজন। জীবন-সফরে ভয় আসতে পারে, মনে ভয় হতে পারে, সেটা ভীরুতা নয়। ভীরুতা হল আমরণ অশ্বারোহী না থেকে বিজয়ের আশা ত্যাগ করা।

আপনি হয়তো জানেন না, আপনার মাঝে কী কল্যাণ আছে? আপনিও কোন বিষয়ে চরম সাফল্য অর্জন করতে পারেন। আপনি নিজেকে চিনুন এবং সে সুপ্ত শক্তিকে জাগ্রত করুন এবং সাফল্যের দুয়ারের কড়া নাড়ুন।

আপনার মধ্যে যে প্রতিভাগুলি আছে, তার লালন করুন। যে পরিবেশে তার যথার্থ প্রতিপালন ও বাড়-বাড়ন্ত হতে পারে সেখানে গিয়ে বাসা বাঁধুন। সাফল্যের পাখি আপনার জীবন-বৃক্ষে বাসা বাঁধবে।

অবশ্য কর্মের শুরুতে সবচেয়ে কঠিন কাজ হল, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। তার জন্য সৎ সাহসের প্রয়োজন আছে। প্রয়োজন আছে আল্লাহ-ভরসা ও অন্যের অনুপ্রেরণার।

পথ চলতে চলতে অন্ধকারে আপনি সাহস হারিয়ে ফেলবেন না। বিশ্বাস রাখুন, আলোর সন্ধান পাবেনই।

দুর্বল হয়ে বসে যাবেন না বা ভেঙ্গে পড়বেন না। কারণ মনের দিক দিয়ে যে দুর্বল, কর্মক্ষেত্রেও সে দুর্বল।

আর আপনি যদি জ্ঞানী হন, তাহলে মনে রাখুন, জ্ঞানী লোকেরা কখনো পরাজয়ের পর নিরাশ হয়ে অলসভাবে বসে থাকে না। তারা চেষ্টা করে পরাজয়ের ফলে যে ক্ষতিটা হয়ে গেছে, তা পূরণ করতে।

অবশ্য এ কথা ঠিক যে, 'সাধ থাকলে সাহস এসে যায়।' সুতরাং সাফল্যের প্রতি আপনার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকলে অবশ্যই সাহসশূন্য ও নিরুৎসাহ হয়ে ঝিমিয়ে যাবেন না। আর বিজ্ঞদের পরামর্শ মনে রাখবেন, 'পরাজয়কে মেনে নিলে তুমি পরাজিত। মনে যদি তোমার সাহস না থাকে, তবে জেতার আশা করো না। যদি মনে দ্বিধা থাকে তুমি পারবে কি না, তাহলে মনে রেখো তুমি হেরেই গেছ। হারবে ভাবলে, হার তোমার হবেই। কারণ সাফল্য থাকে মনের ইচ্ছা শক্তিতে, মনের কাঠামোতে। যদি ভাব অন্যদের তুলনায় তোমার কাজের মান নিচু, তাহলে তুমি নিচেই থাকবে। যদি তুমি ওপরে উঠতে চাও, তাহলে নিজের মনে সংশয় রেখো না। জীবনযুদ্ধে সব সময় বলবান ও দ্রুতগামীরা জেতে না, যে আত্মবিশ্বাসে অটল, সে আজ হোক, কাল হোক, জিতবেই। আত্মবিশ্বাসই প্রত্যেক সফলতার প্রধান কারণ।'

১১। আশাবাদিতা

আশাবাদী মানুষ চারিদিক অন্ধকারের মাঝে আলো দেখতে পায়। পক্ষান্তরে যে আশাবাদী নয়, সে চারিদিক আলোর মাঝে অন্ধকার দেখতে পায়। জীবনে সাফল্য, হৃদয়ে প্রশান্তি ও সুখলাভের একমাত্র মাধ্যম হল আশাবাদিতা। আশাই মানুষকে বাঁচার প্রেরণা দেয়, আশাই মানুষকে উচ্চতার দিকে উড্ডীন করে।

পক্ষান্তরে নিরাশাবাদিতা হল বুদ্ধির ক্ষয়রোগ। মনের মাটিতে সাফল্যের চারা গাছকে ধীরে ধীরে নষ্ট ক'রে ফেলে।

অবশ্য আশাবাদিতার মানে এই নয় যে, আপনি বাস্তবকে অগ্রাহ্য ও অস্বীকার করবেন; বরং আশাবাদিতা হল হতাশার অন্ধকার অগ্রাহ্য ক'রে আশার আলো জ্বালিয়ে আপনি কাজের পথে অগ্রসর হবেন। আশাবাদিতা মানে সর্বদা ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করা। আশাবাদিতা মানে ঘটনার নেতিবাচক ব্যাখ্যা না করা।

'আমি পারব না। আমার দ্বারা হবে না। আমি ধ্বংস হয়ে যাব। আমার ভাগ্য মন্দ। আমার কপালে সাফল্য নেই। আমার কষ্ট ঘুচবে না।' ইত্যাদি নেতিবাচক কথা মাথায় না রেখে এর বিপরীত কথাকে মনে-মগজে স্থান দিতে হবে। 'আমি পারব। আমার দ্বারা হবে। আমি ধ্বংস হয়ে যাব না। আমার ভাগ্য মন্দ নয়। আমার কপালে সাফল্য আছে। আমার কষ্ট ঘুচবে ইন শাআল্লাহ।'

একটি উদাহরণ দ্বারা বিষয়টি স্পষ্ট করা যাক। এক সংসারে জমজ ভাই ছিল। তাদের মধ্যে একজন কিশোর ছিল আশাবাদী, সর্বদা ইতিবাচক চিন্তা করত, ইতিবাচক কথা বলত। দুনিয়ার প্রত্যেক জিনিসকে সুন্দর বলত। কোন জিনিসের মধ্যে সুন্দর-অসুন্দর উভয়ই থাকলেও সে তার সুন্দর দিকটা দেখে মুগ্ধ হতো।

পক্ষান্তরে অপর কিশোরটি ছিল সহোদরের বিপরীত। সে ছিল নিরাশাবাদী এবং সর্বদা নেতিবাচক চিন্তা করত ও নেতিবাচক কথা বলত। দুনিয়ার প্রত্যেক জিনিসকে অসুন্দর বলত। কোন জিনিসের মধ্যে সুন্দর-অসুন্দর উভয়ই থাকলেও সে তার অসুন্দর দিকটা দেখে বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হতো।

একদা তাদের পিতামাতা উভয়কে একটি ক'রে উপহার দিল। নিরাশাবাদী তার উপহারের প্যাকেট খুলে দেখল, তাতে রয়েছে ল্যাপটপ। তা দেখে তার খুশী হওয়ার কথা। কিন্তু না। সে তার নেতিবাচক চিন্তাধারা নিয়ে বলতে লাগল, 'এটা ভালো নয়। এর রঙটা বিশ্রী। এটা ভেঙ্গে যাবে। এটা দামী নয়। আমি এ উপহার পছন্দ করি না। অমুকের বাবা এর থেকে ভালো উপহার আনে।' ইত্যাদি।

আশাবাদী কিশোরটি তার উপহারের প্যাকেট খুলে দেখল, তাতে রয়েছে ঘোড়ার খাবার। সে তা হাতে নিয়ে খুশীতে বাতাসে উড়াতে লাগল এবং সহাস্যে বলতে লাগল, 'আমি জানি, তোমরা আমাকে ধোঁকা দেবে না। নিশ্চয় ছোট্ট ঘোড়ার বাচ্চা আমার জন্য লুকিয়ে রেখেছ।'

নিঃসন্দেহে আশাবাদী ও ইতিবাচক ব্যক্তিত্বরাই সুখের সন্ধান পায়, সাফলের নাগাল পায়। মন্দের ভালো দিকটা দেখে তার মাধ্যমেই বিজয়ের সুসংবাদ শোনার চেষ্টা করে এবং পরিশেষে সে বিজয়ী রূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

আশাবাদী নিজের শক্তি ও বুদ্ধিমত্তার প্রতি সুধারণা রাখে। আর সুধারণা রাখলে সেই মতো সুফল লাভ করে। যেমন মহান আল্লাহর প্রতি যে সুধারণা রাখে, সে তাঁকে সেই রূপ পায় এবং যে কুধারণা রাখে, সে ধ্বংস হয়। হাদীসে কুদসীতে আছে, মহান আল্লাহ বলেন,
‎(أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي ، وَأَنَا مَعَهُ حَيْثُ يَذْكُرُنِي)).

'আমি সেইরূপ, যেরূপ বান্দা আমার প্রতি ধারণা রাখে। আমি তার সাথে থাকি, যখন যে আমাকে স্মরণ করে।' (বুখারী ৭৮০৫ নং, মুসলিম ৭১২৮নং)

'বান্দা যদি আমাকে ভালো ধারণা করে, তাহলে আমি (তার জন্য) ভালো। আর সে যদি আমাকে মন্দ ধারণা করে, তাহলে আমি (তার জন্য) মন্দ।' (সিঃ সহীহাহ ১৬৬৩নং)

বলা বাহুল্য, আশাবাদী হয়ে কর্মের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। প্রথম স্থান অধিকার করার আশায় পড়াশোনায় মন দিতে হবে পড়ুয়াকে। বেশী লাভের আশায় ব্যবসায় মন দিতে হবে ব্যবসায়ীকে। জয়ী হওয়ার আশায় নেমে পড়তে হবে জীবন-যুদ্ধে।

একজন মু'মিন কোন জিনিসে অশুভ ধারণা করে না। কারণ তা শির্ক। অবশ্য শুভ ধারণা ক'রে কর্মে অগ্রসর হয়। তাঁর ভরসা থাকে নিজ প্রতিপালকের উপর। তাঁর কাছেই আস্থা রাখে সকল সাফল্যের।

অতএব আল্লাহর কাছে আশা রেখে, তাঁর উপর পরিপূর্ণ ভরসা রেখে, সকল বাধা লংঘন ক'রে সাফল্যের রাজ্য জয়লাভ করতেই হবে আপনাকে। অবশ্যই আপনি সফল হবেন। অবশ্যই আপনি 'সফল মানব'।

১২। ভালোবাসা ও সম্প্রীতি

সাফল্যের একটি প্রাসঙ্গিক বিষয় ভালোবাসা। মানুষকে ভালোবাসা। অবশ্য অবৈধ প্রণয়ের কথা বলছি না। মানুষের মাঝে পারস্পরিক সম্প্রীতির কথা বলছি। পরিবেশের মানুষকে ভালোবাসলে সুপরামর্শ পাওয়া যায়। পরিমন্ডলের মানুষকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করলে উৎসাহ পাওয়া যায়। চারিপাশের মানুষকে ভালোবাসলে সহযোগিতা পাওয়া যায়। আর যে কোন সাফল্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন অপরের সুপরামর্শ, উৎসাহ ও সহযোগিতার। আর তা ভালোবাসা ছাড়া অর্জন করা সম্ভব নয়। আমাদের মহানবী বলেছেন,

(( لَا تَدْخُلُوا الجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا ، وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا ، أَوَلَا أَدُلُّكُمْ عَلَى شَيْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ ؟ أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ )).

"তোমরা ঈমানদার না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর যতক্ষণ না তোমাদের পারস্পরিক ভালোবাসা গড়ে উঠবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা প্রকৃত ঈমানদার হতে পারবে না। আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি কাজ বলে দেব না, যা করলে তোমরা একে অপরকে ভালবাসতে লাগবে? (তা হচ্ছে) তোমরা আপোসের মধ্যে সালাম প্রচার কর।” (মুসলিম ২০৩নং)

সে সাফল্যের লাভ কী, যে সাফল্যের কথা শুনে অপরে আনন্দ পাবে না। যে সাফল্যের খুশীতে অন্যে শরীক হবে না?

১৩। উদ্যম ও সাধনা

মহান প্রতিপালক বলেছেন,

{وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى} (৩৯) سورة النجم
"আর এই যে, মানুষ তাই পায়, যা সে চেষ্টা করে।” (নাজমঃ ৩৯)

সাধ-সাধ্য-সাধনা, তবেই পুরবে বাসনা। সাফল্য অর্জনের পথে অবিরাম সাধনা চাই। সাধ ১ শতাংশ থাকলেও সাধনা চাই ৯৯ শতাংশ। আরবী কবি বলেছেন,

لا تحسبن المجد تمرا أنت أكله لن تبلغ المجد حتى تلعق الصبرا
অর্থাৎ, তুমি গৌরবকে খেজুর ভেবো না, যা তুমি ভক্ষণ করবে। তুমি মুসব্বর (ঘৃতকুমারী) না চাঁটলে গৌরবে পৌঁছতেই পারবে না।

নৌকা ডাঙ্গায় সাজিয়ে রাখার জন্য নয়, পানিতে নামিয়ে তরঙ্গের সাথে যুদ্ধের জন্য। জীবনটাও তাই। জীবনে যুদ্ধ আছে। কর্মচেষ্টাই তার যুদ্ধ। তার জন্য লেখাপড়া করাও যুদ্ধ।

জীবনটাই কষ্ট দিয়ে ঘেরা। আশা তা চাপা রাখে। আর কর্ম আশা পূরণ করে। যে কষ্ট করে, সে একদিন ইষ্টলাভ করে। যে তার পালঙ্কের কষ্ট সহ্য করতে পারে, সে আরামে ঘুমায়।

পারবেন না কষ্ট স্বীকার করতে? পারবেন না সাফল্য অর্জনের পথে আঘাত ও লাঞ্ছনা সহ্য করতে? না, অসম্ভব কিছু নয়। আঘাত-খাওয়া মানুষই পারে অসম্ভবকে সম্ভব করতে। যে মানুষ দিনের পর দিন আঘাত খেয়ে অপমান সহ্য ক'রেও জীবন-যুদ্ধে নির্বিচল থাকে, অসম্ভবকে সম্ভব সেই করতে পারে।

একদা সম্ভব অসম্ভবকে জিজ্ঞাসা করল, 'তুমি কোথায় বাস কর?' অসম্ভব উত্তরে বলল, 'অক্ষমের স্বপ্নে।'

শিকারী কষ্ট আপনাকে তাড়া করে, আপনাকে তার চাইতে বেশি দৌড় দিতে হবে। যেহেতু 'শিকার শিকারীর চাইতে বেশি জোরে দৌড় দেয়। কারণ শিকারী দৌড়ে খাদ্যের প্রয়োজনে। আর শিকার দৌড়ে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে।'

কষ্ট করলে দুর্ভাগ্যকে সৌভাগ্যে পরিণত করা যায়। কারণ পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি।

পরিশ্রম ছাড়া ধূলির ধরায় সুখ লাভ হয় না। আমরা যা কিছু ভোগ করি, তা কারো না কারোর কঠিন পরিশ্রমের ফল। এত শত-সহস্র বিলাস সামগ্রী ব্যবহার ক'রে আজ আমরা কত সুখে আছি, তার আবিষ্কার ও উৎপাদনে অনেক জ্ঞানীগুণী কঠোর পরিশ্রম ক'রে গেছেন। তাঁরা যদি অলস হয়ে আরামে বসে থাকতেন, তাহলে আমরা আজ কষ্টভোগ করতাম।

'পরিশ্রমে ধন আনে পুণ্যে আনে সুখ, আলস্যে দারিদ্র আনে পাপে আনে দুখ।'

খবরদার কর্মবিমুখ হবেন না। কারণ 'কর্মবিমুখতা মরিচার মতো, তা সবচেয়ে উজ্জ্বল ধাতুকেও মলিন ও ক্ষয় করে।'

আমরা অভিযোগ করি, সমাজে দুষ্কৃতীদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে।
নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব তাদের হাতে।
পরিচালনা ও পরিবেশন তাদের হাতে।
ব্যবসা ও বাণিজ্য তাদের হাতে।
এমনকি উপাসনালয় এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও তাদেরই হাতে!
কেন হবে না? পুণ্যাচারীরা যদি কর্মবিমুখ হন, তাহলে কি পাপাচারীরা সমাজে সক্রিয়রূপে প্রকাশ পাবে না? তাদের হাতে ডোর ছেড়ে দিলে তারা তো খেলা দেখাবেই। আর তার ফলে সমাজ তো ধ্বংস হবেই। আসলেই 'দুষ্ট প্রকৃতির মানুষের জন্য সমাজ ধ্বংস হয় না; সৎ মানুষের অকর্মণ্যতার জন্য সমাজের ক্ষতি হয় বেশি। যদি সৎ ব্যক্তিরা কিছুই না করেন, তাহলে সমাজে দুষ্কৃতীরাই প্রাধান্য লাভ করে।'

বহু মানুষ আছে, যারা পরগাছা আলোকলতার মতো অপরের গলগ্রহ হয়ে জীবনযাপন করতে চায়। অনেকে বাঘের মতো শিকার করতে আলস্য প্রদর্শন করে এবং শিয়ালের মতো উচ্ছিষ্ট ও অবশিষ্টাংশ খেয়ে গর্ববোধ করে। তারা আসলে সমাজ ও সংসারের পরগাছা। 'এ সংসারে কিছু মানুষ আছে, যাদের জন্য এ জীবন বড় বোঝা। পক্ষান্তরে আর এক শ্রেণীর মানুষ আছে যারা এ জীবনের জন্য বড় বোঝা।'

শ্রমবিমুখতার কারণেই অভাব আসে। শ্রমবিমুখতাই অপরাধ সৃষ্টি করে। 'আলস্য বা পরিশ্রম-বিমুখতা হল মা, তার ছেলের নাম ক্ষুধা এবং মেয়ের নাম চুরি।' জ্ঞানিগণ বলেন, 'তোমার উন্নতির পথে ৫টি প্রতিবন্ধক আছে; আলস্য, নারী-প্রেম, অসুস্থতা, দেশের টান এবং আত্মগর্ব।'

সুতরাং (১) আলস্য দূর ক'রে পরিশ্রম ও কাজ করুন। (২) স্ত্রীর বৈধ অতিরিক্ত প্রেম বা অবৈধ নারী-প্রেম থাকলে তা বর্জন করুন। নচেৎ আঁচলধরা অথবা প্রেম-পাগলা হলে না পড়াশোনা হবে, না জ্ঞান-গবেষণা, আর না চাকরির উন্নতি। (৩) শরীরটাকে সুস্থ রাখার চেষ্টা করুন। তাছাড়া পরিশ্রম করবেন কাকে নিয়ে? (৪) মা ও মাটির টান কার না আছে বলুন? সাফল্য অর্জনের তাকীদে বিদেশ যাত্রা করতে হলেও সেই টান ছিঁড়ে বেরিয়ে যেতে হবে। বিদেশের মাটি কামড়ে মা-কে যদি সুখী দেখতে পারেন, তাহলে তার পাশে থেকে অভাব-পীড়নে তাকে কষ্ট দেওয়ার চাইতে কি তা ভালো নয়?

পক্ষান্তরে মা-বাপ বলুন, আর বউ-সন্তানই বলুন, এ দুনিয়ায় এবং সে দুনিয়ায়ও কেউ কারো নয়। অধিকাংশ আত্মীয়তা কমার্সিয়াল লেনদেনের মতো টিকে আছে। দিতে না পারলে কেউ আপনাকে ভালোবাসা বা স্নেহ দেবে না। যতদিন দিতে পারবেন, ততদিন আপনি ভালো মানুষ। দেওয়া বন্ধ হলেই আপনি কালো মানুষ। তাই ভালোবাসার বন্ধন সুদৃঢ় করতে অর্থের প্রয়োজন, আয়-উন্নতির প্রয়োজন।

'মামা বল, চাচা বল কেহ কারো নহে, স্বার্থের সম্পর্ক শুধু তার তরে রহে।'
সুতরাং ভেবে দেখুন,

'আপন কেউ নয় সবাই তোমার পর, উন্নতি করিতে চাও হও ধুরন্ধর।'

স্বপ্ন সেটা নয়, যেটা মানুষ ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে দেখে, বরং সেটাই হল স্বপ্ন যার বাস্তবায়নের প্রত্যাশা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না। নিশ্চয় তেমন কোন স্বপ্ন আপনার থাকবে। আর আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সবচেয়ে সুন্দর উপায় হল, ঘুম ছেড়ে জেগে ওঠা।

কর্মই মানুষকে বড় করে। কর্মের মাধ্যমেই মানুষ উন্নত হয়। কর্ম-দক্ষতাই মানুষের সর্বাপেক্ষা বড় বন্ধু। আর কর্মোজ্জ্বল দিনগুলিই প্রকৃতপক্ষে সোনালী দিন। জীবন হচ্ছে কর্ম এবং কর্ম করতে না চাওয়া মরণ। কর্ম না ক'রে সুন্দর জীবনের অপেক্ষা করা ভুল।

সুন্দর দিন সবার জন্য অপেক্ষা করে। কেউ চেষ্টা ক'রে তা আনে, কেউ আনে না। নিরাশার কিছু নেই, আকাশে যেমন তারা আছে, জীবনে তেমনি সম্ভাবনা আছে। তবে সচেষ্ট হয়ে তাকে জাগিয়ে তুলতে হয়।

জ্ঞানিগণ বলেছেন, 'জীবন হল সাইকেল চালানোর মত। তুমি যতক্ষণ প্যাডেলে পা রেখে চালাতে থাকবে, ততক্ষণ সাইকেল হতে পড়ে যাবে না। কিন্তু প্যাডেল থামালেই পড়ে যাবে।'

সুতরাং অকর্মণ্য হয়ে বসে থাকা জীবন নয়। কর্মময় জীবনই প্রকৃত জীবন। জেনে রাখুন, ভাগ্য বলে একটা জিনিস আছে, তা মানতেই হবে। তবে 'যে শুইয়া থাকে, তাহার ভাগ্যও শুইয়া থাকে।'

'সুখ চাই, সুখ চাই' কেবল মুখে বললেই চলবে না। 'চিনি-চিনি' বললেই মুখ মিষ্টি হবে না। সুখ অর্জনের জন্য চেষ্টার প্রয়োজন আছে। সুখ অর্জনের পথে দুঃখ-কষ্ট বরণ করতে হবে। কষ্ট দেখে পিছপা হলে কি সুখলাভ হবে? 'কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে, দুখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহিতে?'

শেখ সা'দী বলেছেন, 'সমুদ্র-গর্ভে মূল্যবান রত্ন বর্তমান। কিন্তু আরাম ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাইলে সমুদ্র-তীরে বসে থাক।'

যে সয়, সে রয়। যে কাঁটার আঘাত সইবে, সে ফুল লাভ করবে। সুতরাং দৃঢ় সংকল্প হতে হবে, 'পথের কাঁটা মানব না নীরবে যাব, হৃদয়-ব্যথায় কাঁদব না নীরবে যাব।'

অবশ্যই যাদের সত্যিকারের সুখ ও সাফল্য লাভের উদ্যম ও আগ্রহ আছে, আন্তরিকতা ও প্রচেষ্টা আছে, তারা পিছনের দিকে পা ফেলবে না। 'পুণ্য-পিয়াসী যাবে যারা ভাই মক্কার পূত তীর্থ লভে, কন্টক ভয়ে ফিরবে না তারা বরং পথেই জীবন সঁপবে।'

আমাদের জেনে রাখা দরকার যে, 'সাফল্যের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়, উদ্যমের সাথে ব্যর্থতা অতিক্রমের পরই আসে সফলতা।'

সফলতার পথ মই-এর মতো, যা পকেটে হাত রেখে চড়া যায় না। বিনা কষ্টে ও পরিশ্রমে সুখ লাভ হয় না।

সাফল্য অর্জনের পথে বাধা আসতে পারে, তা উল্লংঘন করতে হবে। সে পথে চলতে গিয়ে সঙ্গের সঙ্গী সঙ্গ ছাড়তে পারে, তা মেনে নিতে হবে। সংকল্প হতে হবে, 'বিশ্ব যদি চলে যায় কাঁদিতে কাঁদিতে তবু একা বসে রব উদ্দেশ্য সাধিতে।'

সুখলাভে তাড়াহুড়া ক'রে লাভ নেই। যথাসময়েই সুখের আগমন ঘটে। বিলম্ব হতে দেখে হতোদ্যম ও ভগ্নোৎসাহ হওয়াও জ্ঞানীর কাজ নয়। 'কেন পান্থ ক্ষান্ত হও হেরি দীর্ঘ পথ, উদ্যম বিহনে কার পুরে মনোরথ?'

কবির কথায় মনে প্রেরণা সৃষ্টি করুন এবং সুখ ও সাফল্য লাভের পথে অগ্রসর হতে থাকুন।

'ভাঙ রে হৃদয়, ভাঙ রে বাঁধন,
সাধ রে আজিকে প্রাণের সাধন,
লহরীর 'পরে লহরী তুলিয়া
আঘাতের পর আঘাত কর।
মাতিয়া যখন উঠেছে পরান
কিসের আঁধার, কিসের পাষাণ!
উথলি যখন উঠেছে বাসনা
জগতে তখন কিসের ডর!'

১৪। অপরের দেখে শিক্ষা গ্রহণ

সাফল্য অর্জনের জন্য অপরের দেখে শিক্ষা নেওয়া অবশ্যই জরুরী। অপরের অভিজ্ঞতা থেকে চয়ন করা, অপরের জ্ঞানভান্ডার থেকে জ্ঞানমধু আহরণ করা কর্তব্য।

অপরের সাফল্যের কারণসমূহ অধ্যয়ন ক'রে তার দ্বারা উপকৃত হওয়া উচিত। অপরের বিফলতার ভুল ইত্যাদি থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজে সতর্ক হওয়া উচিত। আমাদের কেউ কেউ তার বুদ্ধিমত্তার বলে সফলতা লাভ করে, আর কেউ সফলতা লাভ করে অপরের বোকামি দেখে।

কোন সফল ব্যক্তির যদি ভালোমন্দ উভয়ই থাকে, তাহলে তার ভালোটা গ্রহণ ও মন্দটা বর্জন করা উচিত।

গোবরে মানিক পড়ে থাকতে দেখে তুচ্ছ ক'রে বর্জন করা জ্ঞানীর কাজ নয়। মানিক তুলে নিয়ে পরিষ্কার ক'রে নেওয়া এবং তার দ্বারা উপকৃত হওয়া অবশ্যই জ্ঞানী মানুষের কাজ।

মানুষ হিসাবে সাফল্যের পথে পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার প্রয়োজন আছে। তা ছাড়া অনেক সময় মানুষ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়।

একবার অভিজ্ঞতা ছাড়াই সফল হলে সত্বর দ্বিতীয়বার অভিজ্ঞদের সহযোগিতা নিলে সফলতা আরো সুনিশ্চিত ও পাকাপোক্ত হবে।

সফল জ্ঞানীদের পরিশ্রমের কথা স্মরণ রাখতে হবে এবং আমাদেরকেও তাদের মতো পরিশ্রম করতে হবে। তাহলে আমরাও হব সফল মানব---ইন শাআল্লাহ।

১৫। ফললাভে ধৈর্যশীলতা

প্রচেষ্টা ও ধৈর্য সফলতার জনক-জননী। সাফল্য অর্জনের পথে ধৈর্যহারা হলে এবং ফললাভে বিলম্ব দেখে হাল ছেড়ে দিলে সাফল্য ধরা দেবে না।

ফল পাওয়ার জন্য শেষ সময় পর্যন্ত প্রতীক্ষাই হল সফলতার রহস্য। মুসা -কে আল্লাহ পাক নির্দেশ করেছিলেন যে, সমুদ্র সঙ্গমস্থলে এক বড় আলেম বান্দা আছে, তার নিকট উপস্থিত হয়ে ইল্‌ম অনুসন্ধান কর। মূসা তাঁর সন্ধানে বের হলেন। সফরে সঙ্গীকে বললেন, {لَا أَبْرَحُ حَتَّى أَبْلُغَ مَجْمَعَ الْبَحْرَيْنِ أَوْ أَمْضِيَ حُقُبًا} (٦٠) سورة الكهف 'দুই সমুদ্রের মধ্যস্থলে না পৌঁছনো পর্যন্ত আমি থামব না, আমি যুগ যুগ ধরে চলতে থাকব।' (কাহফঃ ৬০)

সুতরাং 'সফলতা এক বিরামহীন সফরের নাম। সফলতা কোন গন্তব্যস্থল নয়। সফলতা গন্তব্যে পৌঁছনোর একটি পথ। সফলতার পথে কোন ট্রাফিক সিগন্যাল নেই, যা তার গতি নির্দিষ্ট করতে পারে।'

আপনি ফললাভে তাড়াহুড়া করবেন না। শোনা যায়, চীনে এক ধরনের বাঁশ আছে, যা লাগানোর পর প্রথম চার বছর পানি, সার দেওয়ার পরেও বাড়ে না। কিন্তু পঞ্চম বছরে বাঁশ গাছটি হঠাৎ ছয় সপ্তাহে ৯০ ফুট লম্বা হয়ে যায়। আমাদেরও কোন কোন কাজের ফল দেরীতে এবং পূর্ণমাত্রায় লাভ হয়। আপনারও তাই হতে পারে। সুতরাং সতর্ক থাকুন।

পক্ষান্তরে ফল পাকার পূর্বে যদি তা পেতে বা খেতে চান, তাহলে নিশ্চয়ই আপনি জ্ঞানী মানুষ নন। আরবী প্রবাদে আছে, مَنْ اسْتَعْجَلَ شَيْئًا قَبْلَ أَوَانِهِ عُوقِبَ بِحِرْمَانِهِ. অর্থাৎ, যে কেউ সময় আসার আগে কিছু পেতে চাইবে, তাকে তা হতে বঞ্চিত ক'রে শাস্তি দেওয়া হবে।

আর সেই সোনার ডিম-পাড়া হাঁস-ওয়ালার গল্প অবশ্যই আপনার শোনা থাকবে, যে এক সাথে সকল ডিম পেতে চেয়েছিল এবং অবশেষে তার কী আফসোস ও হায়-পস্তানি হয়েছিল।

১৬। সময়ের কদর করুন

জীবনে সাফল্য লাভ করতে চাইলে সময়ের কদর করুন। সময়কে ফালতু বয়ে যেতে দেবেন না। সময়ের অপচয় ঘটাবেন না। জীবনের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত আপনার জন্য ফলপ্রসূ হোক। যথাসময়ে আপনার সকল কাজ সমাধা হোক।

সময় নষ্টকারী সকল ব্যক্তি ও বিষয়কে বর্জন করুন। সময়-চোর থেকে সর্বদা সাবধানে থাকুন।

আপনি নিশ্চয়ই জানেন, সময়ের হিসাব দিতে হবে। সুতরাং আপনিও হিসাবমতো সময়কে ব্যয় করুন। বিনা লাভে সময়কে মোটেই অতিক্রম করতে দেবেন না।

সময় হল তরবারির মতো। আপনি তাকে কাটতে না পারলে, সে আপনাকে কেটে ফেলবে।

সময় অত্যন্ত মূল্যবান। কিন্তু এ মূল্য থেকে টাকা-পয়সার মূল্যের পার্থক্য আছে। টাকা-পয়সা সঞ্চয় করা যায়, ধার দেওয়া যায় এবং প্রয়োজনে ধার নেওয়া যায়। কিন্তু সময় ধার দেওয়াও যায় না এবং ধার নেওয়াও যায় না।

সময় আমাদের বন্ধু নয়; বরং শত্রু। সে তার নিজের মতো বয়ে চলে। আর আমাদের জীবনের পরিসরকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর ক'রে তোলে।

সুতরাং সময়ের অপব্যয় না ঘটিয়ে অবসরকে কাজে লাগান। অবকাশকে উপকারী কিছু দিয়ে পরিপূর্ণ করুন। সাফল্য আপনাকে স্বাগত জানাবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00