📘 সফল মানব > 📄 ঈমান অমূল্য ধন

📄 ঈমান অমূল্য ধন


মহান স্রষ্টা মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে জ্ঞান ও ইচ্ছা-স্বাধীনতা দিয়ে সম্মানিত করেছেন। এ ছাড়া তাকে প্রকৃতিগতভাবে এমন কিছু যোগ্যতা দান করেছেন, যা দ্বারা সে ভাল-মন্দ, সুন্দর-অসুন্দর, উপকারী-অপকারী ইত্যাদি বস্তুর মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম হয়। এই পার্থক্য করার ক্ষমতার নামই হল ঈমান। এই পার্থক্যের অনুভূতি এবং সেই অনুভূতি অনুসারে চলার নামই হল ইসলাম। এই অনুভূতির শক্তি যার মাঝে যত বেশী থাকে, সে তত বেশী সফল মানুষে পরিণত হয়। আর যার মধ্যে এ অনুভূতি নেই, সে মানুষ হলেও পশুর শামিল। যার ফলশ্রুতিতে সে ইহকাল ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ঈমানের ফলে মানুষের কত উপকার সাধিত হয়, তার কিছু নমুনা নিম্নরূপঃ

১। ঈমান মানুষকে শির্ক, কুফর, বিদআত ও পাপাচরণ থেকে বিরত রাখে। আর এ থেকে বিরত থাকতে পারাই হল মানুষের ইহ-পরকালের মহা সাফল্য। মহান আল্লাহ বলেন,

وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَخْشَ اللَّهَ وَيَتَّقْهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ } (৫২) سورة النور “যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর অবাধ্যতা হতে বেঁচে থাকে, তারাই সফলকাম।” (নূরঃ ৫২)

অন্যত্র তিনি বলেছেন,

قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّى (١٤) وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّىٰ (١٥) سورة الأعلى “সেই সফলকাম হয়েছে, যে আত্মশুদ্ধি লাভ করেছে এবং তার প্রতিপালকের নাম স্মরণ ক’রে নামায আদায় করেছে।” (আ’লাঃ ১৪-১৫)

পক্ষান্তরে যারা শির্ক ও কুফ্রীতে লিপ্ত হয়ে নিজের আত্মাকে কলুষিত করেছে, তারাই বিফল।
{وَقَدْ خَابَ مَنْ حَمَلَ ظُلْمًا} (১১১) سورة طه “আর সেই ব্যর্থ হবে, যে যুলুমের ভার বহন করবে।” (ত্বাহাঃ ১১১)

আর সব চাইতে বড় যুলুম হল আল্লাহর সাথে শির্ক করা।

ঈমান মানুষকে কুপ্রবৃত্তি ও শয়তানের প্ররোচনা থেকে বাঁচিয়ে রাখে। যার ফলে সে উভয় জগতের সাফল্য লাভ করে। তিনি বলেন, {وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (٩) سورة الحشر

“আর যাদেরকে তাদের অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম।” (হাশ্রঃ ৯)

মহান আল্লাহ বলেন, {وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا (۷) فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا (۸) قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا (۹) وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا } (۱۰) سورة الشمس

“শপথ মানুষের এবং তাঁর, যিনি তাকে সুঠাম করেছেন, অতঃপর তাকে তার অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। সে সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সে ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষিত করবে।” (শামসঃ ৭-১০)

অন্যত্র তিনি বলেন, {إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْمُجْرِمُونَ} “অপরাধীরা সফলকাম হয় না।” (ইউনুসঃ ১৭)

আর এ কথা সুস্পষ্ট যে, অপরাধ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হল ঈমান। ঈমান এমন এক জ্যোতি ও শক্তি, যা অপরাধীর অপরাধ-প্রবণতাকে দুর্বল ক’রে দেয়।

ঈমান মানুষের জীবনকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের ক’রে নিয়ে আসে। তাই তো ঈমানদারের জীবনটা হয় আলোকময়। আর যার জীবন আলোয় ভরা, তার জীবনে সফলতা অবশ্যম্ভাবী। পক্ষান্তরে বেঈমানের জীবন অন্ধকারময়। যার সারা জীবনটাই অন্ধকার, তার জীবনে আর সাফল্য কোথায়? আল্লাহ তাআলা বলেন,

اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَوْلِيَاؤُهُمُ الطَّاغُوتُ يُخْرِجُونَهُم مِّنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَاتِ أُوْلَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

“আল্লাহ তাদের অভিভাবক যারা বিশ্বাস স্থাপন করে, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের ক’রে আলোকে নিয়ে যান। আর যারা অবিশ্বাস করে, তাগূত (শয়তান) তাদের অভিভাবক, সে তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। এরাই হল জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।” (বাকারাহঃ ২৫৭)

ঈমানদার আল্লাহর হিদায়াতপ্রাপ্ত হয় এবং তার হিদায়াত বৃদ্ধি পায়। {وَالَّذِينَ اهْتَدَوْا زَادَهُمْ هُدًى وَآتَاهُمْ تَقْواهُمْ} (۱۷) سورة محمد

“আর যারা সৎপথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তাদের সৎপথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেন এবং তাদেরকে সংযমশীলতা দান করেন।” (মুহাম্মাদঃ ১৭)

তিনি আরও বলেন, {إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ آمَنُوا بِرَبِّهِمْ وَزِدْنَاهُمْ هُدًى} (۱۳) سورة الكهف

“ওরা ছিল কয়েকজন যুবক, ওরা ওদের প্রতিপালকের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল এবং আমি ওদের সৎপথে চলার শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।” (কাহ্‌ফঃ ১৩)

আর আল্লাহ যাকে সৎপথ প্রদর্শন করেন, সে কোন দিন পথভ্রষ্ট হয় না। আর পথভ্রষ্ট না হওয়াটাই তো হল সফলতা। পক্ষান্তরে কাফেররা তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহর সাহায্য ও পথনির্দেশ থেকে বঞ্চিত হয়। তিনি বলেন,
{إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ} “নিশ্চয়ই আল্লাহ যালেম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।” (বাক্বারাহঃ ২৫৮)

{إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ } “নিশ্চয় আল্লাহ তাকে সৎপথে পরিচালিত করেন না, যে মিথ্যাবাদী, অবিশ্বাসী।” (যুমারঃ ৩)

{إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ كَذَّابٌ} “আল্লাহ সীমালংঘনকারী ও মিথ্যাবাদীকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।” (মু’মিনঃ ২৮)

{ذَلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ لَمْ يَكُ مُغَيِّرًا نِعْمَةً أَنْعَمَهَا عَلَى قَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ وَأَنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ} (٥٣) سورة الأنفال

“এটা এই জন্য যে, আল্লাহ কোন সম্প্রদায়কে যে সম্পদ দান করেন, তিনি তা পরিবর্তন করেন না; যতক্ষণ না তারা নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করে। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (আনফালঃ ৫৩)

ঈমানদারের অন্তর প্রশান্ত থাকে। আল্লাহ তাআলার প্রতি ভরসা স্থাপন করে সে নিশ্চিন্ত ও দুশ্চিন্তা মুক্ত জীবন-যাপন করতে পারে। তাই তো তার জীবন হয় সফল ও সার্থক। তিনি বলেন,
{الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ اللَّهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ} “যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” (রা’দঃ ২৮)

মহান আল্লাহ মু’মিনদেরকে অশেষ নিয়ামত দ্বারা ধন্য করেন। সেই নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা প্রত্যেক মু’মিনের কর্তব্য। শুকরিয়া আদায় করলে আল্লাহ তাআলা তাদের নিয়ামতকে আরো বাড়িয়ে দেন। তিনি বলেন,
{لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ} (۷) سورة إبراهيم “তোমরা কৃতজ্ঞ হলে তোমাদেরকে অবশ্যই বেশী ক’রে দেব আর অকৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমার শাস্তি হবে কঠোর।” (ইব্রাহীমঃ ৭)

আর অকৃতজ্ঞ কাফেররা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মহান আল্লাহ বলেন, {إِنَّمَا يَأْمُرُكُمْ بِالسُّوءِ وَالْفَحْشَاءِ وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ} (١٦٩) سورة البقرة

“সে (শয়তান) তো কেবল তোমাদেরকে মন্দ ও অশ্লীল কার্যের এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন সব বিষয় বলার নির্দেশ দেয়, যা তোমরা জান না।” (বাকারাহঃ ১৬৯)

{الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِالْفَحْشَاء وَاللّهُ يَعِدُكُم مَّغْفِرَةً مِّنْهُ وَفَضْلاً وَاللّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ} (٢٦٨) سورة البقرة

“শয়তান তোমাদেরকে দরিদ্রতার ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর ক্ষমা ও করুণার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়।” (বাকারাহঃ ২৬৮)

ঈমানের প্রভাবে মানুষ পরস্পরের ভাই-ভাই হয়ে যায় এবং তাদের মাঝে কোন ভেদাভেদ থাকে না। তিনি বলেন,

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ } (١٠) الحجرات “মুমিনগণ তো পরস্পর ভাই-ভাই। অতএব তোমাদের ভাইদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও, আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা করুণা প্রাপ্ত হও।” (হুজুরাতঃ ১০)

আল্লাহর রসূল ﷺ বলেছেন, “এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার উপর অত্যাচার করবে না এবং তাকে শত্রুর হাতে সোপর্দও করবে না। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের অভাব মোচন করবে, আল্লাহ তার অভাব মোচন করবেন। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের বিপদ দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার বিপদ দূর করবেন। আর যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।” (বুখারী, মুসলিম, রিয়াদুস স্বালেহীন ২৪২নং)

ঈমানই হল মানুষের মাঝে বন্ধুত্ব স্থাপনকারী। আল্লাহ তাআলা বলেন, {وَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ لَوْ أَنفَقْتَ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعاً مَّا أَلَّفْتَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ أَلَّفَ بَيْنَهُمْ إِنَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ} (٦٣) سورة الأنفال

“(হে নবী!) তিনিই তোমাকে স্বীয় সাহায্য ও মু’মিনদের দ্বারা শক্তিশালী করেছেন এবং তিনি তাদের পরস্পরের হৃদয়ে প্রীতি স্থাপন করেছেন। তুমি যদি পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদও ব্যয় করতে, তবুও তাদের হৃদয়ে প্রীতি স্থাপন করতে পারতে না। কিন্তু আল্লাহই তাদের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করেছেন। নিশ্চয় তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (আনফালঃ ৬২-৬৩)

আর এই সৌভাতৃত্ব ও সম্প্রীতিই এক সফল সমাজের মূল ভিত্তি।

ঈমান একটি শক্তি। সেই শক্তির বলে মু’মিন একাই একশ’। মহান আল্লাহ বলেন, {يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ حَرِّضِ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى الْقِتَالِ إِن يَكُن مِّنكُمْ عِشْرُونَ صَابِرُونَ يَغْلِبُوا مِائَتَيْنِ وَإِن يَكُن مِّنكُم مِّئَةٌ يَغْلِبُواْ أَلْفًا مِّنَ الَّذِينَ كَفَرُواْ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لاَّ يَفْقَهُونَ} (٦٥) الأنفال

“হে নবী! তুমি বিশ্বাসীগণকে জিহাদের জন্য উদ্ধুদ্ধ কর। তোমাদের মধ্যে বিশজন ধৈর্যশীল থাকলে তারা দু’শ জনের উপর বিজয়ী হবে এবং একশ’ জন থাকলে এক হাজার অবিশ্বাসীর উপর বিজয়ী হবে। কারণ, তারা এমন এক সম্প্রদায় যাদের বোধশক্তি নেই।” (আনফালঃ ৬৫)

ঈমান মানুষকে মর্যাদা দান করে। মহান আল্লাহ বলেন, {وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ} (۱۳۹) سورة آل عمران

“আর তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না, তোমরাই হবে সর্বোপরি (বিজয়ী); যদি তোমরা মু’মিন হও।” (আলে ইমরানঃ ১৩৯)

এই ঈমানের জোরেই নবী মূসা (عليه السلام) ফিরআওন ও তার বিশাল সৈন্যদলের সামনে একা দাঁড়িয়ে বলতে পেরেছিলেন,

{قَالَ أَصْحَابُ مُوسَى إِنَّا لَمُدْرَكُونَ (٦١) قَالَ كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ} (٦٢) الشعراء

“মূসার সঙ্গীরা বলল, ‘আমরা তো ধরা পড়েই গেলাম।’ মূসা বলল, ‘কখনোই না, আমার সঙ্গে আমার প্রতিপালক রয়েছেন। তিনি আমাকে অবশ্যই পথ প্রদর্শন করবেন।” (শুআরাঃ ৬১-৬২)

ঈমানদার ব্যক্তি তাঁর রবের সাহায্যের সুসংবাদ প্রাপ্ত হয়। তিনি বলেন, {إِنَّا لَنَنصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ} (٥١) سورة غافر

“আমি অবশ্যই আমার রসূলদেরকে ও বিশ্বাসীদেরকে পার্থিব জীবনে ও যেদিন সাক্ষীগণ দণ্ডায়মান হবে, সেদিন সাহায্য করব।” (মু’মিনঃ ৫১)

{وَكَانَ حَقًّا عَلَيْنَا نَصْرُ الْمُؤْمِنِينَ} (٤٧) سورة الروم

“আর বিশ্বাসীদেরকে সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।” (রূমঃ ৪৭)

ঈমানদারের জন্য রয়েছে ইহকাল ও পরকালের সুসংবাদ। তিনি বলেন, {أَلا إِنَّ أَوْلِيَاء اللّهِ لاَ خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلاَ هُمْ يَحْزَنُونَ (٦٢) الَّذِينَ آمَنُواْ وَكَانُواْ يَتَّقُونَ (٦٣) لَهُمُ الْبُشْرَى فِي الْحَياةِ الدُّنْيَا وَفِي الآخِرَةِ لاَ تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللّهِ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ} (٦٤) سورة يونس

“জেনে রাখ! আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং সাবধান হয়ে চলে, তাদের জন্য আছে সুসংবাদ পার্থিব জীবনে ও পরলোকে। আল্লাহর বাক্যের কোন পরিবর্তন নেই। এটাই হল মহাসাফল্য।” (ইউনুসঃ ৬২-৬৪)

ঈমানদাররা আল্লাহর প্রিয়পাত্র। মহান আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন। তিনি বলেন, {يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ} “তিনি তাদেরকে ভালবাসেন এবং তারাও তাঁকে ভালবাসে।” (মায়িদাহঃ ৫৪)

মহানবী (সাঃ) বলেন, “যখন আল্লাহ কোন বান্দাকে ভালবাসেন, তখন জিবরীলকে ডেকে বলেন, ‘আমি অমুক বান্দাকে ভালবাসি, তুমিও তাকে ভালবাস।’ তখন জিবরীলও তাকে ভালবাসতে শুরু করেন। অতঃপর তিনি আকাশবাসীদের মধ্যে ঘোষণা ক’রে দেন যে, ‘আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালবাসেন। সুতরাং তোমরাও তাকে ভালবাস।’ তখন আকাশবাসীরাও তাকে ভালবাসতে থাকে। অতঃপর পৃথিবীতেও তাকে জনপ্রিয় ক’রে তোলা হয়।” (বুখারী ৩২০৯, মুসলিম ৬৮২৯নং)

আর আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তার জীবন তো ধন্য ও সফল হবেই।

মহান আল্লাহ মু’মিনদের সহায় ও অভিভাবক। তিনি বলেন, {ذَلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ مَوْلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَأَنَّ الْكَافِرِينَ لَا مَوْلَى لَهُمْ} (১১) سورة محمد

“এটা এই জন্য যে, আল্লাহ বিশ্বাসীদের অভিভাবক এবং অবিশ্বাসীদের কোন অভিভাবক নেই।” (মুহাম্মাদঃ ১১) {اللّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُواْ يُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوُرِ} (٢٥٧) سورة البقرة

“আল্লাহ তাদের অভিভাবক যারা বিশ্বাস স্থাপন করে, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোকে নিয়ে যান।” (বাক্বারাহঃ ২৫৭)

ঈমানদারের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও বিরাট প্রতিদান। তিনি বলেন, {وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ} (٩) سورة المائدة

“যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।” (মায়িদাহঃ ৯)

{وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا} (٢٩) الفتح

“ওদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ক্ষমা ও মহা পুরস্কারের।” (ফাত্‌হঃ ২৯)

পরিশেষে একটি কথা যে, ঈমান থাকলে ছোট আমলও অনেক বড় হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, {إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمَنُ وُدًّا} (٩٦) سورة مريم

“যারা বিশ্বাস করেছে এবং সৎকর্ম করেছে, পরম দয়াময় তাদের জন্য (পারস্পরিক) সম্প্রীতি সৃষ্টি করবেন।” (মারয়্যামঃ ৯৬)

সুতরাং কোন নেকীকেই ছোট মনে করা উচিত নয়। নেকীর ফলে প্রাপ্ত প্রতিদান ও সওয়াবকে সামনে রেখে কাজ ক’রে যাওয়া উচিত। সামান্যতম নেকীর ফলও কিয়ামতে পাওয়া যাবে।

পক্ষান্তরে বেঈমানি অবস্থায় কোন নেক আমল কাজে আসে না।

১। ঈমান দ্বারা দুনিয়া ও আখেরাতের প্রভূত কল্যাণ লাভ হয়। ঈমান হল সবচেয়ে বড় নেয়ামত। মহান আল্লাহ এই নেয়ামত দ্বারা তাঁর মু'মিন বান্দাদেরকে সম্মানিত ক'রে থাকেন।

{بَلِ اللَّهُ يَمُنُّ عَلَيْكُمْ أَنْ هَدَاكُمْ لِلإِيمَانِ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ} (۱۷) سورة الحجرات “বরং আল্লাহই তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তোমাদেরকে ঈমানের পথে পরিচালিত করেছেন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” (হুজুরাতঃ ১৭)

ঈমানের ফলে মু'মিন আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। তাঁর সাথে সম্পর্ক কায়েম হয়। ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে এবং ঈমানের মিষ্টতা উপভোগ করতে পারে। মহানবী বলেছেন,
(( ثَلاثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلاوَةَ الإيمانِ : أَنْ يَكُونَ اللهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا ، وَأَنْ يُحِبَّ المَرْءَ لا يُحِبُّهُ إِلا للهِ ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ في الكُفْرِ بَعْدَ أَنْ أَنْقَذَهُ اللهُ مِنْهُ ، كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ في النَّارِ )).

“তিনটি জিনিস যার মধ্যে থাকবে, সে ঈমানের স্বাদ পাবেঃ (১) তার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অন্য সব কিছু থেকে অধিক প্রিয় হওয়া, (২) কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা, এবং (৩) কুফরী থেকে আল্লাহ তাকে উদ্ধার করার পর পুনরায় কুফরীতে ফিরে যাওয়াকে এমন অপছন্দ করা, যেমন আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে।” (বুখারী ও মুসলিম)

ঈমানদার ব্যক্তিই প্রকৃত সফলকাম। সফলতার বহু উপকারিতার মধ্যে কয়েকটি নিচে তুলে ধরা হলঃ

১। ঈমানের কারণে মু'মিনের সকল কাজ সহজ হয়ে যায়। সে সব কাজে মহান আল্লাহর সাহায্য ও সহযোগিতা পেয়ে থাকে। আর আল্লাহ যার সাহায্য করেন, তাকে কে পরাজিত করতে পারে? তিনি বলেন, {وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا} “যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার কাজকে সহজ করে দেন।” (ত্বালাকঃ ৪)

আল্লাহ বলেন, {إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ} (٦٢) سورة الشعراء

“আমার সঙ্গে আমার প্রতিপালক রয়েছেন। তিনি আমাকে অবশ্যই পথ প্রদর্শন করবেন।” (শুআরাঃ ৬২)

আল্লাহ আরো বলেন, {وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ} (۳) سورة الطلاق

“এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।” (ত্বালাকঃ ৩)

আর আল্লাহ যার জন্য যথেষ্ট, সে তো সফলকাম হবেই। তার জীবন ধন্য হবে। সে পাবে তার প্রভুর সুরক্ষা ও অভিভাবকত্ব। মহান আল্লাহ বলেন, {اللّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُواْ يُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوُرِ} (٢٥٧) سورة البقرة

“আল্লাহ তাদের অভিভাবক যারা বিশ্বাস স্থাপন করে, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোকে নিয়ে যান।” (বাক্বারাহঃ ২৫৭)

অন্ধকার বলতে বহু কিছু বুঝানো যেতে পারে; যেমনঃ কুফরের অন্ধকার, ভ্রষ্টতার অন্ধকার, মূর্খতার অন্ধকার, মন-পূজার অন্ধকার, প্রবৃত্তিপূজার অন্ধকার, কুসংস্কারের অন্ধকার ইত্যাদি। ঈমানদারেরা এই সমস্ত অন্ধকার হতে মুক্ত। মহান আল্লাহ তাদেরকে এই সকল অন্ধকার থেকে বের ক’রে ঈমানের আলো, ইলমের আলো, হিদায়াতের আলো এবং সুন্নতের আলো দ্বারা আলোকিত করেছেন। আর যার জীবন ঈমানের আলোয় আলোকিত, সেই তো সফল মানুষ।

আর যারা আল্লাহকে অমান্যকারী, তারা আলোর পথে চলতে পারে না। তারা থাকে অন্ধকারে। সেই অন্ধকারের কারণে সত্য ও সরল পথ তাদের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় এবং তারা নানা ভুল পথে হেঁটে জীবনটাকে ধ্বংস ক'রে ফেলে।

{وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَوْلِيَاؤُهُمُ الطَّاغُوتُ يُخْرِجُونَهُم مِّنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَاتِ} “আর যারা অবিশ্বাস করে, তাদের অভিভাবক হল তাগূত। সে তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়।” (বাক্বারাহঃ ২৫৭)

তারা প্রকৃতিগতভাবে যে সত্যের আলো পেয়েছিল, সে আলোকে শয়তানরা কেড়ে নিয়ে তাদেরকে কুফরীর অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। ফলে তারা সত্যকে চিনতে পারে না, জানতে পারে না, বুঝতে পারে না এবং অনুসরণও করতে পারে না।

অবশ্য এ কথার অর্থ এমনও হতে পারে যে, তারা ইসলামে প্রবেশ করে আবার মুরতাদ হয়ে কুফরীতে ফিরে যায়। এর ফলে তারা ঈমানের আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে কুফরের অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যায়।

ঈমান দ্বারা মানুষ সম্মান লাভ করে থাকে। তিনি বলেন, {وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ} “ইয্যত-সম্মান তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মু'মিনদের জন্যই।” (মুনাফিকুনঃ ৮)

{فَلاَ تَهِنُوا وَلاَ تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ} (۱۳۹) سورة آل عمران

“আর তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না, তোমরাই হবে সর্বোপরি (বিজয়ী); যদি তোমরা মু’মিন হও।” (আলে ইমরানঃ ১৩৯)

{مَن كَانَ يُرِيدُ الْعِزَّةَ فَلِلَّهِ الْعِزَّةُ جَمِيعًا} “কেউ যদি সম্মান চায়, তবে সকল সম্মান তো আল্লাহরই।” (ফাত্বিরঃ ১০) অর্থাৎ সম্মান তো আল্লাহর হাতে। যে তাঁর আনুগত্য করবে, তিনি তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মানিত করবেন।

ঈমান মানুষের ঈমানদারের প্রতি ভালোবাসার সৃষ্টি করে। মহান আল্লাহ বলেন, {وَجَعَلْنَا بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً} “তিনি তোমাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” (রূমঃ ২১) অন্যত্র বলেন,

{وَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ لَوْ أَنفَقْتَ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعاً مَّا أَلَّفْتَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ أَلَّفَ بَيْنَهُمْ} (٦٣) سورة الأنفال

“(হে নবী!) তিনিই তোমাকে স্বীয় সাহায্য ও মু’মিনদের দ্বারা শক্তিশালী করেছেন এবং তিনি তাদের পরস্পরের হৃদয়ে প্রীতি স্থাপন করেছেন। তুমি যদি পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদও ব্যয় করতে, তবুও তাদের হৃদয়ে প্রীতি স্থাপন করতে পারতে না। কিন্তু আল্লাহই তাদের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করেছেন।” (আনফালঃ ৬২-৬৩)

ঈমানদারদের আল্লাহ তাআলা সুসংবাদ দিয়েছেন। আর এ সুসংবাদ উভয় জাহানের জন্য। তিনি বলেন, {وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ} “আর মু'মিনদেরকে সুসংবাদ দাও।” (বাক্বারাহঃ ২২৩)

{لَهُمُ الْبُشْرَى فِي الْحَياةِ الدُّنْيَا وَفِي الآخِرَةِ} (٦٤) سورة يونس

“তাদের জন্য সুসংবাদ রয়েছে পার্থিব জীবনে এবং পরকালেও।” (ইউনুসঃ ৬৪)

এই আয়াতে উল্লিখিত সুসংবাদ বলতে পার্থিব জীবনে উত্তম ও পবিত্র জীবন, আল্লাহর সন্তুষ্টি, নেককার লোকদের মহব্বত এবং ভালো স্বপ্ন। আর পরকালের সুসংবাদ বলতে জান্নাত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। আর এটা হল মহা সাফল্য।

ঈমানের ফলে দুনিয়া ও আখেরাতে নিরাপত্তা লাভ হয়। তিনি বলেন, {الَّذِينَ آمَنُواْ وَلَمْ يَلْبِسُواْ إِيمَانَهُم بِظُلْمٍ أُوْلَئِكَ لَهُمُ الأَمْنُ وَهُمْ مُّهْتَدُونَ} (۸۲) سورة الأنعام

“যারা ঈমান এনেছে এবং নিজ ঈমানকে যুলুম (শির্ক) দ্বারা কলুষিত করেনি, নিরাপত্তা তাদেরই জন্য এবং তারাই সৎপথপ্রাপ্ত।” (আনআমঃ ৮২)

এই নিরাপত্তা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জাহানেই। দুনিয়াতে এমন নয় যে, তাদেরকে কোন ভয় গ্রাস করে না। বরং ভয়ের সময় তারা হতাশ হয় না এবং আল্লাহর উপর ভরসা রেখে মানসিক শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করে। পরন্তু আল্লাহ তাদেরকে তাদের দুশমনদের উপর বিজয় দান করেন। আর আখেরাতে জাহান্নামের চিরস্থায়ী আযাব থেকে নিরাপত্তা লাভ করে থাকে। পক্ষান্তরে কাফেররা উভয় জগতে এই নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত।

মহান আল্লাহ বলেন, {وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُم فِي الأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لاَ يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا} (٥٥) سورة النور

“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে অবশ্যই প্রতিনিধিত্ব দান করবেন; যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য তাদের ধর্মকে---যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন---সুদৃঢ় করবেন এবং তাদের ভয় ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার উপাসনা করবে, আমার কোন অংশী করবে না।” (নূরঃ ৫৫)

আল্লাহ তাআলা মুমিনকে কুপ্রবৃত্তির তাড়না থেকে হিফাযত করেন। ফলে সে পাপকর্মে লিপ্ত হওয়া থেকে সুরক্ষিত থাকে। আর এ কথা সুস্পষ্ট যে, মানুষ যত বেশী পাপাচারে লিপ্ত হয়, তার জীবন তত বেশী সংকীর্ণ ও জটিল হয়ে যায় এবং সে তত বেশী অশান্তি ভোগ করে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি যত বেশী সৎ ও পুণ্যবান হয়, তার জীবন ততবেশী সুখময় ও শান্তিদায়ক হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, {فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلا يَضِلُّ وَلا يَشْقَى} (۱۲۳) سورة طه

“যে আমার পথনির্দেশ অনুসরণ করবে, সে বিপথগামী হবে না এবং দুঃখ-কষ্টও পাবে না।” (ত্বাহাঃ ১২৩)

আল্লাহ তাআলা ঈমানদারকে বিপদাপদ থেকে উদ্ধার করেন। যেমন তিনি তাঁর নবী ইউনুস (আঃ) কে মাছের পেট থেকে উদ্ধার করে বলেছিলেন,

{فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ نُنجِي الْمُؤْمِنِينَ} (۸۸) سورة الأنبياء

“অতঃপর আমি তার (ইউনুসের) ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিয়েছিলাম। আর এভাবেই আমি বিশ্বাসীদেরকে মুক্তি দিয়ে থাকি।” (আম্বিয়াঃ ৮৮)

ঈমানের ফলে মানুষ দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা লাভ করে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ} (١) سورة المؤمنون

“অবশ্যই মু’মিনরা সফলকাম হয়েছে।” (মু’মিনূনঃ ১)

ঈমানের ফলে মানুষ জান্নাত লাভ করবে, যা সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। মহান আল্লাহ বলেন, {وَالَّذِينَ آمَنُواْ وَعَمِلُواْ الصَّالِحَاتِ أُولَئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} (۸۲) سورة البقرة

“আর যারা ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে, তারাই জান্নাতের অধিবাসী হবে এবং সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।” (বাক্বারাহঃ ৮২)

ঈমানের ফলে মু’মিন ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে ধন্য হবে। মহান আল্লাহ বলেন, {وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ أَكْبَرُ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ} (۷۲) سورة التوبة

“আর আল্লাহর সন্তুষ্টি হচ্ছে সর্বাপেক্ষা বড় (নিয়ামত)। এটাই হচ্ছে অতি বড় সফলতা।” (তওবাহঃ ৭২)

ঈমান হল সমস্ত আমল কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত। ঈমান ছাড়া কোন আমলই কবুল হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,

{وَمَن يَعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتِ مِن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُوْلَـئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلاَ يُظْلَمُونَ نَقِيراً} (١٢٤) سورة النساء

“পুরুষই হোক অথবা নারীই হোক, যে কেউ বিশ্বাসী হয়ে সৎকাজ করবে, তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি (খেজুরের অাঁটির পিঠে) বিন্দু পরিমাণও যুলুম করা হবে না।” (নিসাঃ ১২৪)

আল্লাহ তাআলা বলেন, {مَنْ عَمِلَ صَالِحاً مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُواْ يَعْمَلُونَ} (۹۷) سورة النحل

“পুরুষ ও নারী যে কেউই মু’মিন হয়ে সৎকর্ম করবে, তাকে আমি নিশ্চয়ই সুখী জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের কর্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।” (নাহলঃ ৯৭)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, {وَمَنْ أَرَادَ الآخِرَةَ وَسَعَى لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَئِكَ كَانَ سَعْيُهُم مَّشْكُوراً} (۱۹) سورة الإسراء

“আর যারা বিশ্বাসী হয়ে পরলোক কামনা করে এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে, তাদেরই চেষ্টা স্বীকৃত হয়ে থাকে।” (বানী ইসরাঈলঃ ১৯)

ঈমান ছাড়া কোন আমলই গ্রহণীয় নয়; যদিও তা ভাল আমল হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,

{وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاء مَّنثُوراً} (۲۳) سورة الفرقان

“আমি তাদের কৃতকর্মের প্রতি লক্ষ্য করব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব।” (ফুরক্বানঃ ২৩) তিনি আরো বলেন,

{مَّثَلُ الَّذِينَ كَفَرُواْ بِرَبِّهِمْ أَعْمَالُهُمْ كَرَمَادٍ اشْتَدَّتْ بِهِ الرِّيحُ فِي يَوْمٍ عَاصِفٍ لاَّ يَقْدِرُونَ مِمَّا كَسَبُواْ عَلَى شَيْءٍ ذَلِكَ هُوَ الضَّلاَلُ الْبَعِيدُ} (۱۸) سورة إبراهيم

“যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে, তাদের উপমা হল, তাদের কর্মসমূহ ভস্মসদৃশ, যা ঝড়ের দিনে বাতাস প্রচন্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। যা তারা উপার্জন করে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারে না। এটাই তো ঘোর বিভ্রান্তি।” (ইব্রাহীমঃ ১৮)

অতএব জানা গেল যে, ঈমান ছাড়া নাজাত পাওয়া সম্ভব নয়। দুনিয়ার ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি কোন কিছুই কাজে আসবে না। মহান আল্লাহ বলেন, {يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ (۸۸) إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ} (۸۹) سورة الشعراء

“যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে না; সে দিন উপকৃত হবে কেবল সে, যে আল্লাহর নিকট সুস্থ অন্তঃকরণ নিয়ে উপস্থিত হবে।” (শুআরাঃ ৮৮-৮৯)

আর সুস্থ অন্তঃকরণ হল, শিরক-বিদআত এবং পাপ ও সন্দিগ্ধতা থেকে পবিত্র অন্তঃকরণ।

ঈমান, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। ঈমানের একটি ক্ষুদ্রতম অংশ, যার অন্তরে বিদ্যমান থাকবে সেও এক সময় জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।

ঈমানের মর্যাদা ও উপকারিতা অপরিসীম। ঈমান মানুষের ইহকাল ও পরকালের সৌভাগ্যের চাবিকাঠি। ঈমানের কল্যাণেই একজন মানুষ দুনিয়াতে উন্নত ও সুন্দর জীবন-যাপন করে এবং পরকালেও লাভ করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও চিরশান্তির জায়গা জান্নাত।

📘 সফল মানব > 📄 প্রাণরক্ষার সফলতা

📄 প্রাণরক্ষার সফলতা


মহান সৃষ্টিকর্তা সারা সৃষ্টি রচনার পর মানব সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য। তাঁর সেই উদ্দেশ্য সফল হতে হলে অবশ্যই মানবের প্রাণ রক্ষার অতি প্রয়োজন আছে, প্রয়োজন আছে তার বংশ রক্ষার।

প্রাণই তো আসল। তা না হলে ঈমান-জ্ঞান-মান-ধন কিসের ভিত্তিতে অবশিষ্ট থাকবে? সুতরাং প্রাণ রক্ষার তাকীদে বিধান এসেছে ইসলামে।

{مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ كَتَبْنَا عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنَّهُ مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الأرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا وَلَقَدْ جَاءَتْهُمْ رُسُلُنَا بِالبَيِّنَاتِ ثُمَّ إِنَّ كَثِيرًا مِّنْهُم بَعْدَ ذَلِكَ فِي الْأَرْضِ لَمُسْرِفُونَ} (۳۲) سورة المائدة
"এ কারণেই বনী ইস্রাঈলের প্রতি এ বিধান দিলাম যে, যে ব্যক্তি নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করার দন্ডদান উদ্দেশ্য ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষকেই হত্যা করল। আর কেউ কারো প্রাণরক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করল। তাদের নিকট তো আমার রসূলগণ স্পষ্ট প্রমাণ এনেছিল, কিন্তু এর পরও অনেকে পৃথিবীতে সীমালংঘনকারীই রয়ে গেল।” (মায়িদাহঃ ৩২)

মহানবী বলেছেন, لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّى رَسُولُ اللَّهِ إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ الثَّيِّبُ الزَّانِ وَالنَّفْسُ بِالنَّفْسِ وَالتَّارِكُ لِدِينِهِ الْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ .. "তিন ব্যক্তি ছাড়া 'আল্লাহ ব্যতীত কেউ সত্য উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর রসূল' এ কথায় সাক্ষ্যদাতা কোন মুসলিমের খুন (কারো জন্য) বৈধ নয়; বিবাহিত ব্যভিচারী, খুনের বদলে হত্যাযোগ্য খুনী এবং দ্বীন ও জামাআত ত্যাগী।” (বুখারী ৬৮-৭৮, মুসলিম ৪৪৬৮-৪৪৭০নং আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ)

একান্ত অনিবার্য কারণ ব্যতীত মায়ের পেটে ভ্রূণ হত্যা করাও নিষিদ্ধ ইসলামে। প্রাণ ও দ্বীন বাঁচানোর তাকীদেই জিহাদ ফরয করা হয়েছে ইসলামে। যেমন খুনের বদলে খুন (কিস্বাস) এ রয়েছে মানুষের জীবন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ يَا أُولِي الأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ} (۱۷۹) سورة البقرة "হে বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! তোমাদের জন্য ক্বিস্বাসে (প্রতিশোধ গ্রহণের বিধানে) জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা সাবধান হতে পার।” (বাক্বারাহঃ ১৭৯)

জীবনের ব্যথা-বেদনা যতই হোক, আত্মহত্যাকে ইসলাম বৈধ করেনি। যেহেতু প্রাণ দেওয়ার ক্ষমতা যার নেই, প্রাণ নষ্ট করার অধিকারও তার নেই।

মহানবী বলেছেন,

((مَنْ تَرَدَّى مِنْ جَبَلٍ فَقَتَلَ نَفْسَهُ فَهُوَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ يَتَرَدَّى فِيهِ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا وَمَنْ تَحَسَّى سُمَّا فَقَتَلَ نَفْسَهُ فَسُمُّهُ فِي يَدِهِ يَتَحَسَّاهُ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا وَمَنْ قَتَلَ نَفْسَهُ بِحَدِيدَةٍ فَحَدِيدَتُهُ فِي يَدِهِ يَجَأْ بِهَا فِي بَطْنِهِ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا)).

“যে ব্যক্তি কোন পাহাড় হতে নিজেকে ফেলে আত্মহত্যা করবে, সে ব্যক্তি জাহান্নামেও সর্বদা ও চিরকালের জন্য নিজেকে ফেলে অনুরূপ শাস্তিভোগ করবে। যে ব্যক্তি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করবে, সে ব্যক্তি জাহান্নামেও সর্বদা চিরকালের জন্য বিষ পান করে যাতনা ভোগ করবে। আর যে ব্যক্তি কোন লৌহখন্ড (ছুরি ইত্যাদি) দ্বারা আত্মহত্যা করবে, সে ব্যক্তি জাহান্নামেও ঐ লৌহখন্ড দ্বারা সর্বদা ও চিরকালের জন্য নিজেকে আঘাত করে যাতনা ভোগ করতে থাকবে।” (বুখারী ৫৭৭৮, মুসলিম ৩/১৩নং প্রমুখ)

প্রাণ রক্ষার তাকীদেই এমন সকল জিনিস ভক্ষণ নিষিদ্ধ হয়েছে ইসলামে যার ফলে বিলম্বে বা অবিলম্বে মানুষকে মরণের দিকে টেনে নিয়ে যায়। মাদকদ্রব্যাদি সেবন নিষিদ্ধ হওয়ার অন্যতম কারণ হল প্রাণ বাঁচানোর পরোক্ষ তাকীদ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا} (২৯) سورة النساء "তোমরা আত্মহত্যা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।" (নিসাঃ ২৯)

প্রাণকে হিফাযত করার তাকীদেই ইসলাম মুসলিমকে সংক্রামক ব্যধিগ্রস্ত রোগীর কাছে যেতে বারণ করে। মহানবী বলেছেন,

...... وَفِرَّ مِنْ الْمَجْدُّومِ كَمَا تَفِرُّ مِنْ الْأَسَدِ)). "তোমরা কুষ্ঠরোগী হতে দূরে থেকো; যেমন বাঘ হতে দূরে পলায়ন কর।” (বুখারী ৫৭০৭নং)

তিনি আরো বলেছেন,

((لَا يُورِدَنَّ مُمْرِضْ عَلَى مُصِح)). "চর্মরোগাক্রান্ত উটের মালিক যেন সুস্থ উট দলে তার উট না নিয়ে যায়।” (বুখারী ৫৭৭১, মুসলিম ৫৯২২নং)

আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ} (১৯৫) سورة البقرة "তোমরা নিজেরা নিজেদের সর্বনাশ করো না।” (বাক্বারাহঃ ১৯৫)

ব্যভিচার নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে যেমন রয়েছে সম্ভ্রম বাঁচানোর তাকীদ, তেমনিই তাতে রয়েছে প্রাণ বাঁচানোর তাকীদ। যেহেতু তাতে নানা সর্বনাশী রোগ হয়।

তালাক ও বৈধব্যের জন্য ইদ্দত পালনে রয়েছে তারই তাকীদ। নচেৎ সাথে সাথে বিবাহ ও স্বামী-সহবাস হলে নারীর ক্ষতির আশঙ্কা আছে।

মহিলার জন্য একাধিক স্বামী নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে রয়েছে তারই তাকীদ। অনেকটা যেন কম্পিউটারের মতো; তার ইউএসবিতে অপরিচিত ফ্লাশ দিলেই ভাইরাস-আক্রান্ত হয়!

প্রাণ রক্ষার তাকীদেই ইসলাম নিষিদ্ধ বস্তু ভক্ষণ করাকেও বৈধতা দান করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,

{وَمَا لَكُمْ أَلا تَأْكُلُوا مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللهِ عَلَيْهِ وَقَدْ فَصَّلَ لَكُم مَّا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ إِلَّا مَا اضْطُرِرْتُمْ إِلَيْهِ وَإِنَّ كَثِيرًا لَّيُضِلُّونَ بِأَهْوَائِهِم بِغَيْرِ عِلْمٍ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِالْمُعْتَدِينَ}
"তোমাদের কী হয়েছে যে, যার যবেহকালে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে, তোমরা তা ভক্ষণ করবে না? অথচ তোমরা নিরুপায় না হলে যা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ, তা তিনি বিশদভাবেই তোমাদের নিকট বিবৃত করেছেন। অনেকে অজ্ঞানতাবশতঃ নিজেদের খেয়াল-খুশী দ্বারা অবশ্যই অন্যকে বিপথগামী করে। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক সীমা লংঘনকারীদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।” (আনআমঃ ১১৯)

{إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَالدَّمَ وَلَحْمَ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ بِهِ لِغَيْرِ اللَّهِ فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغِ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ} (۱۷۳) سورة البقرة

"নিশ্চয় (আল্লাহ) তোমাদের জন্য শুধু মৃত জীব, রক্ত, শূকরের মাংস এবং যে সব জন্তুর উপরে (যবেহ কালে) আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম উচ্চারণ করা হয়ে থাকে তা তোমাদের জন্য অবৈধ করেছেন। কিন্তু যে অনন্যোপায় অথচ অন্যায়কারী কিংবা সীমালংঘনকারী নয়, তার কোন পাপ হবে না। আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।” (বাক্বারাহঃ ১৭৩)

কেবল প্রাণ রক্ষাই বিরাট সাফল্য নয়। বরং সুস্থ ও নিরাপদ জীবন লাভ করাই বিরাট সাফল্য。

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, مَنْ أَصْبَحَ مِنْكُمْ آمِنًا فِي سِرْبهِ مُعَافَى فِي جَسَدِهِ عِنْدَهُ قُوتُ يَوْمِهِ فَكَأَنَّمَا حِيزَتْ لَهُ الدُّنْيَا (بحذافيرها).

“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার ঘরে অথবা গোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপদে ও সুস্থ শরীরে সকাল করেছে এবং তার কাছে প্রতি দিনের খাবার আছে, তাকে যেন পার্থিব সমস্ত সম্পদ দান করা হয়েছে।” (তিরমিযী ২৩৪৬, ইবনে মাজাহ ৪১৪১নং)

নিরাপদ জীবন না হলে, সে জীবনের সুখ কোথায়? নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়, এমন জীবনের সাফল্য কোথায়? তাই প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যে অন্য মুসলিমকে নিরাপদে বাস করতে দেয়। মহানবী বলেছেন,

((أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِالْمُؤْمِنِ؟ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ عَلَى أَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ، وَالْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ، وَالْمُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ فِي طَاعَةِ اللَّهِ، وَالْمُهَاجِرُ مَنْ هَجَرَ الْخَطَايَا وَالذُّنُوبَ)).
"আমি কি তোমাদেরকে 'মুমিন' কে---তা বলে দেব না? (প্রকৃত মুমিন হল সেই), যার (অত্যাচার) থেকে লোকেরা নিজেদের জান-মালের ব্যাপারে নিরাপত্তা লাভ করতে পারে। (প্রকৃত) মুসলিম হল সেই ব্যক্তি, যার জিব ও হাত হতে লোকেরা শান্তি লাভ করতে পারে। (প্রকৃত) মুজাহিদ হল সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর আনুগত্য করতে নিজের মনের বিরুদ্ধে জিহাদ করে। আর (প্রকৃত) মুহাজির (হিজরতকারী) হল সেই ব্যক্তি, যে সমস্ত পাপাচরণকে হিজরত (বর্জন) করে।” (আহমাদ ৬/২১, হাকেম ২৪, ত্বাবারানী ১৫১৯১, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান, সিলসিলাহ সহীহহাহ ৫৪৯নং)

প্রাণটা রক্ষা না পেলে ঈমানই বা থাকবে কোত্থেকে? জ্ঞান, মান, ধনই বা আসবে কোন কাজে?

উল্লেখ্য যে, দীর্ঘ জীবন লাভ করাই সাফল্য নয়। সাফল্য হল কল্যাণময় নিরাপদ দীর্ঘ জীবন লাভ করা। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,

(( خَيْرُ النَّاسِ مَنْ طَالَ عُمُرهُ ، وَحَسُنَ عَمَلُهُ )).
"সর্বোত্তম মানুষ সেই ব্যক্তি, যার বয়স দীর্ঘ হয় এবং আমল সুন্দর হয়।” (তিরমিযী ২৩২৯নং)

📘 সফল মানব > 📄 জ্ঞান-সাফল্য

📄 জ্ঞান-সাফল্য


বহু মানুষ বুদ্ধি ও জ্ঞানে সাফল্য লাভ ক’রে থাকে। তাছাড়া এই জ্ঞান-বুদ্ধির কারণেই তো মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ জীব। এই জন্যই ইসলামে জ্ঞানের লালন করতে বলা হয়েছে এবং জ্ঞানশূন্য ক’রে দেয় এমন সকল বস্তু ভক্ষণ করাকে হারাম করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالأَزْلامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (٩٠) سورة المائدة

"হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (মায়িদাহঃ ৯০)

আর মহানবী বলেছেন, ((الْخَمْرُ أُمُّ الْفَوَاحِشَ وَأَكْبَرُ الْكَبَائِرِ مَنْ شَرِبَهَا وَقَعَ عَلَى أُمِّهِ وَخَالَتِهِ وَعَمَّتِهِ)). "মদ হল যাবতীয় অশ্লীলতার প্রধান এবং সবচেয়ে বড় পাপ। যে ব্যক্তি তা পান করে, সে (নেশার ঘোরে) নিজ মা, খালা ও ফুফুর সাথে ব্যভিচার করে!” (ত্বাবারানী, সঃ জামে' ৩৩৪৫নং)

((الْخَمْرُ أُمُّ الْخَبَائِثِ ، فَمَنْ شَرِبَهَا لَمْ تُقْبَلْ مِنْهُ صَلَاتُهُ أَرْبَعِينَ يَوْمًا، فَإِنْ مَاتَ وَهِيَ فِي بَطْنِهِ مَاتَ مَيْتَةً جَاهِلِيَّةً)). "মদ যাবতীয় নোংরামির মূল। যে কেউ তা পান করবে, তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। (যে ব্যক্তি তার মূত্রথলিতে ঐ মদের কিছু পরিমাণ রাখা অবস্থায় মারা যাবে, তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যাবে এবং) যে কেউ তা নিজ পেটে রেখে মারা যাবে, সে জাহেলী যুগের মরণ মরবে।” (ত্বাবারানী ১৫৪৩, দারাকুত্বনী ৪/২৪৭, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৬৯৫নং)

আবু দারদা বলেন, আমাকে আমার বন্ধু বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন যে, ((لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ شَيْئًا ، وَإِنْ قُطَّعْتَ وَحُرِّقْتَ ، وَلَا تَتْرُكْ صَلَاةً مَكْتُوبَةً مُتَعَمِّدًا ، فَمَنْ تَرَكَهَا مُتَعَمِّدًا ، فَقَدْ بَرئَتْ مِنْهُ الدَّمَّةُ ، وَلَا تَشْرَبِ الْخَمْرَ ، فَإِنَّهَا مِفْتَاحُ كُلِّ شَ). "তুমি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না---যদিও (এ ব্যাপারে) তোমাকে হত্যা করা হয় অথবা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ইচ্ছাকৃত ফরয নামায ত্যাগ করো না। কারণ যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নামায ত্যাগ করে, তার উপর থেকে (আল্লাহর)
দায়িত্ব উঠে যায়। আর মদ পান করো না, কারণ মদ হল প্রত্যেক অমঙ্গলের (পাপাচারের) চাবিকাঠি।” (ইবনে মাজাহ ৪০৩৪, সহীহ ইবনে মাজাহ ৩২৫৯নং)

হৃদয়ের দরজায় যখন ক্রোধ অথবা আবেগ প্রবেশ করে, তখন বিবেক-বুদ্ধি তার জানালা দিয়ে পলায়ন করে। ক্রোধ হল এমন ঝড়, যা জ্ঞানের বাতি নিভিয়ে ফেলে। এই জন্য মহানবী ﷺ-এর বিশেষ উপদেশ হল, "তুমি রাগ করো না।” (বুখারী ৬১১৬নং)

আবেগ নিয়ন্ত্রণ ক'রে বিবেক প্রয়োগ করা জ্ঞানীর কাজ। যেহেতু বিবেক মানুষকে সত্যের পথ দেখায় আর আবেগ পথভ্রষ্ট করে।

খেয়ালখুশী মানুষকে হক পথ থেকে বিচ্যুত করে, হক গ্রহণে বাধাদান করে এবং ন্যায় বিচারে অন্তরায় সৃষ্টি করে। সেই জন্য মহান সৃষ্টিকর্তা দাউদ কে বলেছিলেন,

{يَا دَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُم بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلُّكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّ الَّذِينَ يَضِلُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ بِمَا نَسُوا يَوْمَ الْحِسَابِ} (٢٦) سورة ص

"হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, অতএব তুমি লোকদের মধ্যে সুবিচার কর এবং খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না, করলে এ তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করবে। নিশ্চয় যারা আল্লাহর পথ পরিত্যাগ করে, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি, কারণ তারা বিচার দিনকে ভুলে থাকে।" (স্বাদঃ ২৬)

শেখ সা'দী বলেছেন, "বুদ্ধি প্রবৃত্তির হাতে সেই মতো বন্দী, যে মতো কোন পুরুষ থাকে বেশ্যার হাতে।"

ফিরিশ্তার জ্ঞান আছে, প্রবৃত্তি নেই। জন্তুর জ্ঞান নেই, প্রবৃত্তি আছে। মানুষের জ্ঞান আছে, প্রবৃত্তিও আছে। সুতরাং যার প্রবৃত্তি সংযত ও জ্ঞান আলোকিত, সে ফিরিশ্তার ন্যায়। পক্ষান্তরে যার জ্ঞান পরাভূত এবং প্রবৃত্তি উচ্ছৃঙ্খল, সে পশুর ন্যায়। (তাফসীর কুশাইরী ৫/৩৭৮)

ইবনে আত্বা বলেছেন, 'যে ব্যক্তির প্রবৃত্তি তার জ্ঞান-বুদ্ধিকে এবং অস্থিরতা ধৈর্যশীলতাকে পরাজিত করে, সে লাঞ্ছিত হয়।' (যাম্মুল হাওয়া ২৭পৃঃ)

অন্ধ ভালোবাসা ও অন্ধভক্তি মানুষকে ন্যায়-অন্যায় দেখার ও বেছে নেওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নেয়। অনুরূপ কুপ্রবৃত্তি ও মনের খেয়ালখুশী মানুষকে অন্ধ ও গোঁড়া ক'রে তোলে। আর তা হলে সে নিজ জ্ঞান-বুদ্ধি দ্বারা সাফল্যের পাহাড়-চূড়ায় পৌঁছতে সক্ষম হয় না।
জ্ঞানিগণ বলেছেন, 'প্রবৃত্তি জ্ঞান-বুদ্ধিকে প্রবঞ্চিত করে, সঠিকতা থেকে দূরে রাখে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সুস্থতা থেকে পীড়া-দুর্বলতার দিকে এবং স্বচ্ছতা থেকে অস্বচ্ছতার দিকে বের ক'রে নিয়ে যায়। সুতরাং তখন সে অন্ধাবস্থায় দর্শন করে এবং বধিরাবস্থায় শ্রবণ করে।'

অনেকে বলেছেন, 'বুদ্ধিমত্তার আলোকে মানুষ সব কিছু দর্শন ক'রে থাকে। সুতরাং যার বুদ্ধিমত্তা খেয়ালখুশী থেকে নিরাপদ থাকে, সে প্রত্যেক জিনিসকে তার প্রকৃত অবস্থায় দর্শন করতে পারে। পক্ষান্তরে যার মন খেয়ালখুশীর অনুসারী, সে প্রত্যেক জিনিসকে নিজের মতো ক'রে দর্শন করে।'

ইবনে দুরাইদ বলেছেন, 'বুদ্ধিমত্তার আপদ হল কুপ্রবৃত্তি। সুতরাং যার বুদ্ধিমত্তা তার কুপ্রবৃত্তির উপর বিজয়ী হয়, সে পরিত্রাণ লাভ করে।' (সাবীলুল হুদা ৩/৩৪)

মানুষের কুপ্রবৃত্তি ও খেয়ালখুশী যখন তার জ্ঞানের মাথা খায়, তখন কোন দলীল-প্রমাণ কাজে আসে না, কোন যুক্তি তাকে প্রভাবিত করতে পারে না। আর তখন সে নিজেরটা ছাড়া অন্যেরটা ভালো মনে করে না, নিজের বুঝটাকেই সঠিক ধারণা করে এবং তার ফলে সে সত্য ও সরল পথ থেকে দূরে সরে যায়। মহান আল্লাহ বলেছেন,

{فَإِن لَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ} (৫০) سورة القصص

"অতঃপর ওরা যদি তোমার আহবানে সাড়া না দেয়, তাহলে জানবে ওরা তো কেবল নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে। আল্লাহর পথনির্দেশ অমান্য ক'রে যে ব্যক্তি নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে, তার অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত আর কে? নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়কে পথনির্দেশ করেন না।” (কাসাস্ব :৫০)

প্রকৃত জ্ঞানী ও সফল বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যার বুদ্ধিমত্তা তার প্রবৃত্তির উপর এবং যার ধৈর্যশীলতা তার অস্থিরতার উপর বিজয়ী হয়। কোন অন্ধ প্রেম ও প্রলোভন তাকে প্রলুব্ধ করতে এবং তুচ্ছ কোন কাজ তাকে ব্যস্ত করতে পারে না।

📘 সফল মানব > 📄 সম্মান-সাফল্য

📄 সম্মান-সাফল্য


মানুষের ইজ্জত-সম্মান লাভে সফলতা একটি বড় সফলতা। এমনিতে মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ জীব।

'শোনো মানুষের বাণী, জন্মের পর মানব জাতির থাকে না ক' কোন গ্লানি!'

কিন্তু মানুষ নিজ কর্মদোষে নিজের মধ্যে গ্লানি আনয়ন করে এবং নিজেকে কলুষিত করে। নিজের সম্মান নিজে নষ্ট করে।

তাই ইসলাম বিধান দিয়েছে আত্মশুদ্ধির। আত্মশুদ্ধির মাঝে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ ক'রে সম্মানের মহাসাফল্য লাভ করতে পারে।

তদনুরূপ বিবাহের মাধ্যমে নিজেকে চারিত্রিক অপবিত্রতা ও নোংরামি থেকে নির্মল রাখতে পারে।

মহানবী বলেছেন, (( مَنْ تَزَوَّجَ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ نِصْفَ الإِيمَانِ فَلْيَتَّقِ اللَّهُ فِي النَّصْفِ الْبَاقِي)). "যে ব্যক্তি বিবাহ করে, সে তার অর্ধেক ঈমান পূর্ণ করে, অতএব বাকী অর্ধেকে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।” (ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৭৬৪৭, ৮৭৯৪, সঃ জামে' ৬১৪৮-নং)

এ ছাড়া অনৈতিক কোন কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়লে মানুষ নিজের মান-সম্ভ্রম হারিয়ে বসে। চরিত্র হারিয়ে মানুষ নিম্নগামী হয়।

এই জন্য ইসলাম বলেছে, 'তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না।' কারণ তাতে মানুষের চরিত্রে দাগ পড়ে। তার শাস্তি ভোগ ক'রেও মানহারা হয়। জনগণের সামনে অবিবাহিত ব্যভিচারী যুবক-যুবতীকে ১০০ বেত্রাঘাত করা হয়। আর তাতে অপমানে তারা প্রচন্ড লাঞ্ছিত হয়। আর বিবাহিত হলে তো সরকার তাদেরকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করে।

মান রক্ষার তাকীদেই ইসলাম মুসলিমকে ব্যভিচারের কোন ভূমিকায় পদক্ষেপ করতে নিষেধ করেছে।
* নারী-পুরুষ যেন নিজেদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে।
* তারা যেন একে অপরের প্রতি সকাম দৃষ্টিপাত না করে।
* মহিলা যেন যথার্থ পর্দানশীন হয়। মাথায় খোঁপা না বাঁধে।
* গোপন অলঙ্কারের শব্দ যেন প্রকাশ না করে।
* মোহনীয় কণ্ঠে পরপুরুষের সাথে বাক্যালাপ না করে।
* বেগানা নারীপুরুষে যেন একাকিত্ব বা নির্জনতা অবলম্বন না করে।
* তারা যেন একে অন্যের দেহ স্পর্শ বা মুসাফাহাহ না করে।

মহিলা যেন স্বামী বা এগানা পুরুষ ছাড়া একাকিনী সফর না করে। বেগানা পুরুষদের মাঝে যেন নিজের দেহ বা পোশাকের সুবাস বিতরণ না করে। গোসলের আম জায়গায় (সমুদ্র, নদী বা পুকুর ঘাটে) যেন গোসল না করে। পরস্ত্রীর রূপ-সৌন্দর্য অথবা দেহাঙ্গ-সৌষ্ঠবের কথা যেন নিজ স্বামীর কাছে না বলে।

হ্যাঁ, ব্যভিচারের এ সকল ভূমিকা থেকে দূরে থাকতে পারলে মহিলা ইভটিজিং ও ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পেতে পারে। ব্যভিচারের অবতরণিকায় পা না রাখলে অবৈধ প্রেম-ভালোবাসা-ঘটিত নানা মান-সম্মান নষ্টকারী কর্মকান্ড থেকে রক্ষা পেয়ে প্রত্যেক নারী-পুরুষ চারিত্রিক সাফল্যলাভ করতে পারে।

যে বিকৃত যৌনাচারী সমকামিতা অথবা পশুগমনে অভ্যাসী, তারা এত নিকৃষ্ট যে, তাদের তো এ সুন্দর ধরাতে বেঁচে থাকার অধিকারই নেই। মহানবী বলেছেন,

مَنْ وَجَدْتُمُوهُ وَقَعَ عَلَى بَهِيمَةٍ فَاقْتُلُوهُ وَاقْتُلُوا الْبَهِيمَةَ مَعَهُ ..

"যে ব্যক্তিকে কোন পশু-সঙ্গমে লিপ্ত পাবে, সে ব্যক্তি ও সে পশুকে তোমরা হত্যা করে ফেলবে।” (তিরমিযী ১৪৫৫, ইবনে মাজাহ ২৫৬৪, হাকেম ৮০৪৯, বাইহাক্বী ১৭৪৯১, ১৭৪৯২, সহীহুল জামে' ৬৫৮৮নং)

চরিত্রহীন সমকামীদের ব্যাপারে নির্দেশ হল,

مَنْ وَجَدْتُمُوهُ يَعْمَلُ عَمَلَ قَوْمٍ لُوطٍ فَاقْتُلُوا الْفَاعِلَ وَالْمَفْعُولَ بِهِ ..

"তোমরা যে ব্যক্তিকে লুত নবীর উম্মতের মত সমকামে লিপ্ত পাবে, সে ব্যক্তি ও তার সহকর্মীকে হত্যা করে ফেলো।” (আহমদ ২৭৩২, আবু দাউদ ৪৪৬৪, তিরমিযী ১৪৫৬, ইবনে মাজাহ ২৫৬১, বাইহাকী ১৭৪৭৫, সহীহুল জামে' ৬৫৮৯নং)

লম্পট তো চরিত্রহীনই, তার আবার মান-সম্মান কিসের? তেমনি মান-সম্মান নেই মেড়া পুরুষের, যে পরকালে জান্নাতী হতেও পারবে না। মহানবী ﷺ বলেছেন, ((ثَلَاثَةٌ لَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْعَاقُ وَالِدَيْهِ وَالْمَرْأَةُ الْمُتَرَجِّلَةُ الْمُتَشَبِّهَةُ بِالرِّجَالِ وَالدَّيُّوتُ ...... "তিন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং তাদের প্রতি আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকিয়েও দেখবেন না; পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, পুরুষবেশিনী বা পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বনকারিণী মহিলা এবং দাইয়ুস (মেড়া) পুরুষ; (যে তার স্ত্রী, কন্যা ও বোনের চরিত্রহীনতা ও নোংরামিতে চুপ থাকে এবং বাধা দেয় না।) (আহমাদ ৬১৮০, নাসাঈ ২৫৬২, সহীহুল জামে' ৩০৭১নং)

ইসলামে মান-সম্মানের গুরুত্ব আছে বলেই পর চরিত্রে মিথ্যা কলঙ্কের কালিমা লেপন করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে এবং ৮০ চাবুক তার শাস্তি নির্ধারণ করেছে।

মহান আল্লাহ বলেছেন, { وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاء فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ} (٤) سورة النور

"যারা সাধুী রমণীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর স্বপক্ষে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশি বার কশাঘাত করবে এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না; এরাই তো সত্যত্যাগী।” (নূরঃ ৪)

আর মহানবী বলেছেন, الربا) اثنان وَسَبْعُونَ بَاباً أَدْنَاهَا مِثْلُ إتيان الرَّجُل أُمَّهُ ، وَإِنَّ أَرْبَى الرِّبَا اسْتِطَالَةُ الرَّجُلِ فِي عَرْضِ أَخِيهِ)).

"সূদ (খাওয়ার পাপ হল) ৭২ প্রকার। যার মধ্যে সবচেয়ে ছোট পাপ হল মায়ের সাথে ব্যভিচার করার মতো! আর সবচেয়ে বড় (পাপের) সূদ হল নিজ (মুসলিম) ভাইয়ের সম্ভ্রম নষ্ট করা।” (ত্বাবারানীর আউসাত্ব ৭১৫১, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৮৭১নং)

নিশ্চয়ই, এ সংসারে যার মান-সম্ভ্রম উচ্চ, যার চরিত্রে কলঙ্কের কোন দাগ নেই, সমাজের মানুষ যাকে সচ্চরিত্রতার কারণে শ্রদ্ধা ও সম্মান করে, সে একজন সফল মানব।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00