📄 মানবতা ও মানবাধিকার
(১) মহান কৃপাময় স্রষ্টা মানব সৃষ্টি ক’রে তাকে সম্মানিত করেছেন। তাঁর বংশধরকেও তিনি সম্মান ও মর্যাদা দান করেছেন। তিনি বলেছেন,
{ وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلاً) (۷۰) سورة الإسراء
"আমি তো আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি; তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ দান করেছি এবং যাদেরকে আমি সৃষ্টি করেছি, তাদের অনেকের উপর তাদেরকে যথেষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” (বানী ইস্রাঈল: ৭০)
এই মর্যাদা ও অনুগ্রহ মানুষ হিসাবে প্রত্যেক মানুষ পেয়েছে; তাতে সে মুমিন হোক অথবা কাফের। কেননা, এ মর্যাদা অন্য সৃষ্টিকূল; জীবজন্তু, জড়পদার্থ ও উদ্ভিদ ইত্যাদির তুলনায়। আর এ মর্যাদা বিভিন্ন দিক দিয়ে।
(২) যে সুন্দর অবয়ব, আকার-আকৃতি এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ শারীরিক গঠন ও ধরন মহান আল্লাহ মানুষকে দান করেছেন, তা অন্য কোন সৃষ্টিকে দান করেননি। তিনি বলেছেন, {لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْويمِ} (٤) سورة التين
"নিশ্চয় আমি সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতম গঠনে।” (তীনঃ ৪) মহানবী সর্বোচ্চ সুমহান আল্লাহর জন্য সর্বনিম্নে মাথা রেখে সিজদায় বলতেন, (اللَّهُمَّ لَكَ سَجَدْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَلَكَ أَسْلَمْتُ وَأَنْتَ رَبِّي سَجَدَ وَجْهِيَ لِلَّذِي خَلَقَهُ وَصَوَّرَهُ فَأَحْسَنَ صُوَرَهُ وَشَقَّ سَمْعَهُ وَبَصَرَهُ ، فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ).
অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আমি তোমারই জন্য সিজদাবনত, তোমাতেই বিশ্বাসী, তোমার নিকটেই আত্মসমর্পণকারী, তুমি আমার প্রভু। আমার মুখমন্ডল তাঁর উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হল, যিনি তা সৃষ্টি করেছেন, ওর আকৃতি দান করেছেন এবং আকৃতি সুন্দর করেছেন। ওর চক্ষু ও কর্ণকে উদ্গত করেছেন। সুতরাং সুনিপুণ স্রষ্টা আল্লাহ কত মহান! (মুসলিম ১৮৪৮নং)
(৩) মানুষের সম্মানের জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, মহান স্রষ্টা নিজ দুই হাত দ্বারা আদি মানবকে সৃষ্টি করেছেন। আদমকে সিজদা করার আদেশ দেওয়া হলে এবং সে আদেশ ইবলীস অমান্য করলে মহান আল্লাহ তাকে বলেছিলেন, {يَا إِبْلِيسُ مَا مَنَعَكَ أَن تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ أَسْتَكْبَرْتَ أَمْ كُنتَ مِنَ الْعَالِينَ}
'হে ইবলীস! আমি যাকে নিজ দুই হাত দিয়ে সৃষ্টি করেছি তাকে সিজদা করতে তোমাকে কে বাধা দিল? তুমি কি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলে, না তুমি উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন?' (স্বাদঃ ৭৫)
(৪) মহান স্রষ্টা তার মধ্যে তাঁর 'রূহ' ফুঁকেছেন। এটাও আদম ও আদমীর জন্য বিশাল মর্যাদার ব্যাপার। মহান আল্লাহ বলেছেন,
الَّذِي أَحْسَنَ كُلَّ شَيْءٍ خَلَقَهُ وَبَدَأَ خَلْقَ الْإِنسَانِ مِن طِين (۷) ثُمَّ جَعَلَ نَسْلَهُ مِن سُلَالَةٍ مِّن مَّاء مَّهِينٍ (۸) ثُمَّ سَوَّاهُ وَنَفَخَ فِيهِ مِن رُّوحِهِ وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ قَلِيلًا مَّا تَشْكُرُونَ} (9) سورة السجدة
"যিনি তাঁর প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে উত্তমরূপে সৃজন করেছেন এবং মাটি হতে মানব-সৃষ্টির সূচনা করেছেন। অতঃপর তুচ্ছ তরল পদার্থের নির্যাস হতে তার বংশ উৎপন্ন করেছেন। পরে তিনি ওকে সুঠাম করেছেন এবং তাঁর নিকট হতে ওতে জীবন সঞ্চার করেছেন (রূহ ফুঁকেছেন) এবং তোমাদেরকে দিয়েছেন চোখ, কান ও অন্তর। তোমরা অতি সামান্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।" (সাজদাহঃ ৭-৯)
(৫) সুমহান স্রষ্টা পুতপবিত্র ফিরিস্তা কর্তৃক আদি মানবকে সিজদা করিয়ে মানবের সম্মানের কথা প্রমাণিত করেছেন। তিনি বলেছেন,
وَلَقَدْ خَلَقْنَاكُمْ ثُمَّ صَوَّرْنَاكُمْ ثُمَّ قُلْنَا لِلْمَلائِكَةِ اسْجُدُوا لآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ لَمْ يَكُنْ مِنْ السَّاجِدِينَ (۱۱) سورة الأعراف
"আমিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করি, অতঃপর তোমাদেরকে (মানবাকারে) রূপদান করি এবং তারপর ফিরিশতাদেরকে বলি, 'তোমরা আদমকে সিজদাহ কর।' তখন ইবলীস ব্যতীত সকলেই সিজদাহ করল। সে সিজদাহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হল না। (আ'রাফঃ ১১)
(৬) তাকে যথাযথ জ্ঞান দান ক'রে ধন্য করেছেন। যে জ্ঞান মানুষকে দেওয়া হয়েছে, যার দ্বারা তারা নিজেদের আরাম ও আয়েশের জন্য অসংখ্য জিনিস আবিষ্কার করেছে, জীবজন্তু ইত্যাদি তা থেকে বঞ্চিত।
এ ছাড়া এই জ্ঞান দ্বারা তারা ঠিক-বেঠিক, উপকারী-অপকারী এবং ভাল-মন্দের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম।
এই জ্ঞান দ্বারা তারা আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্টিকূল থেকে উপকৃত হয় এবং তাদেরকে নিজেদের বশীভূত ক'রে রাখে।
এই জ্ঞান ও মেধারই মাধ্যমে তারা এমন অট্টালিকা নির্মাণ করে, এমন পোশাক আবিষ্কার করে এবং এমন সব জিনিস বানায় যা তাদেরকে গ্রীষ্মের তাপ, শীতের ঠান্ডা এবং মৌসমের অন্যান্য ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে।
প্রকৃতপক্ষে মানুষ অজ্ঞ। মহান স্রষ্টাই তাকে শিক্ষাদান করেন।
الرَّحْمَنُ (1) عَلَّمَ الْقُرْآنَ (۲) خَلَقَ الإِنسَانَ (۳) عَلَّمَهُ الْبَيَانَ} (٤) سورة الرحمن "অনন্ত করুণাময় (আল্লাহ); তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন। তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ। তিনিই তাকে শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে।” (রাহমানঃ ১-৪) তিনিই মানুষকে পড়তে-লিখতে শিখিয়েছেন। সর্বপ্রথম যে নির্দেশ মহানবী- এর নিকট আসে, তা হল, 'পড়।'
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ (۱) خَلَقَ الإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ (۲) اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ (۳) الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ (٤) عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ} (٥) سورة العلق "তুমি পড় তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে রক্তপিন্ড হতে। তুমি পড়। আর তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।” (আলাক্বঃ ১-৫)
অবশ্য অতিরিক্ত জ্ঞান ও প্রজ্ঞা তিনি কোন কোন মানুষকে দান ক'রে থাকেন। يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَن يَشَاء وَمَن يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُوا الألباب) (٢٦٩) سورة البقرة "তিনি যাকে ইচ্ছা প্রজ্ঞা দান করেন, আর যাকে প্রজ্ঞা প্রদান করা হয়, তাকে নিশ্চয় প্রভূত কল্যাণ দান করা হয়। বস্তুতঃ শুধু জ্ঞানীরাই উপদেশ গ্রহণ ক'রে থাকে।” (বাক্বারাহঃ ২৬৯)
(৭) মহান স্রষ্টা মানুষের সম্মান, মর্যাদা ও বিকাশলাভের ক্ষেত্রে যে যত্ন প্রকাশ করেছেন, তা অন্য কোন জীবের ক্ষেত্রে করেননি। তার পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা, সুখ- শান্তি, শৃঙ্খলতা ও জীবনধারণের সুষ্ঠু ব্যবস্থার প্রতি যে খেয়াল রাখা হয়েছে, তা অন্য প্রাণীর জন্য রাখা হয়নি। তাকে খলীফা বানিয়ে যে গুরু-দায়িত্ব তার উপর অর্পণ করা হয়েছে, তা অন্য কোন সৃষ্টির উপর করা হয়নি। মানুষকে সংশুদ্ধ ও চিরসুখের ঠিকানা জান্নাতের উপযোগী করার জন্য নবী- রসূল প্রেরিত হয়েছেন এবং আসমানী কিতাবসমূহ অবতীর্ণ হয়েছে।
(৮) অনুরূপ বিশ্বজাহানের সমস্ত জিনিসকে মহান আল্লাহ মানুষের সেবায় লাগিয়ে রেখেছেন। চাঁদ, সূর্য, হাওয়া, পানি এবং অন্যান্য অসংখ্য জিনিস রয়েছে যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হচ্ছে।
স্থলে ঘোড়া, খচ্চর, গাধা, উট এবং মহান আল্লাহর দেওয়া মেধা ও বুদ্ধি দ্বারা নিজেদের তৈরী করা (উড়োজাহাজ, জলজাহাজ, ট্রেন, মোটরগাড়ী, সাইকেল এবং মোটর সাইকেল ইত্যাদি) বাহনে আরোহণ করে এবং সমুদ্রে রয়েছে নৌকা ও জলজাহাজ, যাতে তারা আরোহণ করে এবং বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী আমদানি- রফতানি করে।
মানুষের পানাহারের জন্য যে সব খাদ্যদ্রব্য, শস্য ও ফল-মূলাদি তিনি উৎপন্ন করেছেন এবং তাতে যে স্বাদ, তৃপ্তি এবং শক্তি নিহিত রেখেছেন, রকমারি এই খাদ্য, সুস্বাদু ও মজাদার ফলমূল, শক্তিবর্ধক ও পরিতৃপ্তিকর উপাদেয় নানা যৌগিক খাদ্য ও পানীয়, চূর্ণিত, পিষ্ট ও খামির জাতীয় কত শত রকমের খাবার মানুষ ব্যতীত অন্য আর কোন্ সৃষ্টি পেয়েছে? মহান আল্লাহ বলেছেন,
{اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَأَنزَلَ مِنَ السَّمَاء مَاء فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَّكُمْ وَسَخَّرَ لَكُمُ الْفُلْكَ لِتَجْرِيَ فِي الْبَحْرِ بِأَمْرِهِ وَسَخَّرَ لَكُمُ الأَنْهَارَ (۳۲) وَسَخَّرَ لَكُمُ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ دَائِبَينَ وَسَخَّرَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ (۳۳) وَآتَاكُم مِّن كُلِّ مَا سَأَلْتُمُوهُ وَإِن تَعُدُّوا نِعْمَتَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا إِنَّ الإِنسَانَ لَظَلُومٌ كَفَّارٌ} (৩৪) ইব্রাহীম
“আল্লাহ; যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, যিনি আকাশ হতে পানি বর্ষণ ক'রে তার দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফল-মূল উৎপাদন করেছেন, যিনি নৌযানকে তোমাদের অধীন করেছেন; যাতে তাঁর নির্দেশে তা সমুদ্রে বিচরণ করে এবং যিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন নদীসমূহকে। তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন সূর্য ও চন্দ্রকে; যারা অবিরাম একই নিয়মের অনুবর্তী এবং তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন রাত্রি ও দিবসকে। আর তিনি তোমাদেরকে প্রত্যেকটি সেই জিনিস দিয়েছেন যা তোমরা তাঁর নিকট চেয়েছ। তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করলে ওর সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না; মানুষ অবশ্যই অতি মাত্রায় সীমালংঘনকারী অকৃতজ্ঞ।” (ইব্রাহীমঃ ৩২-৩৪)
(৯) মহান প্রতিপালক মানুষকে সম্মানদান করেছেন এবং তিনি ছাড়া অন্য কারো দাসত্ব ও উপাসনা ক'রে নিজেকে অপমান করতে নিষেধ করেছেন। যুগে যুগে নবী-রসূল ও কিতাব প্রেরণ ক'রে মানুষকে সৃষ্টির দাসত্ব ও উপাসনা থেকে মুক্ত ক'রে কেবল তাঁরই দাসত্ব ও উপাসনার দিকে আহবান করেছেন।
(১০) যিনি সবার সৃষ্টিকর্তা ও মালিক, তাঁর দাস হওয়া বড় মর্যাদার বিষয়। তিনি মানুষকে তাঁরই দাসত্ব ও উপাসনার জন্য সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেছেন,
{وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُون} (৫৬) সূরা আয-যারিয়াত
"আমি সৃষ্টি করেছি জ্বিন ও মানুষকে কেবল এ জন্য যে, তারা আমারই উপাসনা করবে।” (যারিয়াতঃ ৫৬)
(১১) মহান আল্লাহ মানুষকে মর্যাদাদান করেছেন। সুতরাং তিনি তার প্রাণহত্যাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন,
{أَنَّهُ مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا} (৩২) সূরা আল-মায়েদাহ
“যে ব্যক্তি নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করার দন্ডদান উদ্দেশ্য ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষকেই হত্যা করল। আর কেউ কারো প্রাণরক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করল।" (মায়িদাহঃ ৩২)
কেউ অন্যায়ভাবে তাকে হত্যা করলে বিনিময়ে তাকেও হত্যা করা হবে। তিনি বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ والأُنثَى بالأُنثَى فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتَّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَأَدَاءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ ذَلِكَ تَخْفِيفٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ فَمَنِ اعْتَدَى بَعْدَ ذَلِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ (১৭৮) وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةً يَا أُولِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ} (১৭৯) সূরা আল-বাক্বারাহ
"হে বিশ্বাসিগণ! নরহত্যার ব্যাপারে তোমাদের জন্য ক্বিস্বাসের (প্রতিশোধ গ্রহণের বিধান) বিধিবদ্ধ করা হল; স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাস ও নারীর বদলে নারী। কিন্তু তার ভাইয়ের পক্ষ হতে কিছুটা ক্ষমা প্রদর্শন করা হলে, প্রচলিত প্রথার অনুসরণ করা ও সদয়ভাবে তার দেয় পরিশোধ করা উচিত। এ তো তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ভার লাঘব ও অনুগ্রহ। এর পরও যে সীমালংঘন করে, তার জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে। (হে বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! তোমাদের জন্য ক্বিস্বাসে (প্রতিশোধ গ্রহণের বিধানে) জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা সাবধান হতে পার।” (বাক্বারাহঃ ১৭৮-১৭৯)
(১২) মানুষের সম্মান দিয়ে মহান স্রষ্টা তাকে অপমান করতে নিষেধ করেছেন। তার মান-সম্ভ্রম বহাল রাখার জন্য বিভিন্ন বিধি-বিধান দিয়েছেন। আর মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ لَمْ يُجِلَّ كَبِيرَنَا وَيَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيَعْرِفْ لِعَالِمِنَا حَقَّهُ.
"সে ব্যক্তি আমার উম্মতের দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি আমাদের বড়দেরকে সম্মান দেয় না, ছোটদেরকে স্নেহ করে না এবং আলেমের অধিকার চেনে না।" (আহমাদ ২২৭৫৫, ত্বাবারানী, হাকেম, সহীহ তারগীব ৯৫ নং)
الرِّبَا اثْنَانِ وَسَبْعُونَ بَاباً أَدْنَاهَا مِثْلُ إتيان الرَّجُل أُمَّهُ ، وَإِنَّ أَرْبَى الرِّبَا اسْتِطَالَةُ الرَّجُل فِي عَرْض أَخِيهِ)).
“সূদ (খাওয়ার পাপ হল) ৭২ প্রকার। যার মধ্যে সবচেয়ে ছোট পাপ হল মায়ের সাথে ব্যভিচার করার মতো! আর সবচেয়ে বড় (পাপের) সুদ হল নিজ (মুসলিম) ভাইয়ের সম্ভ্রম নষ্ট করা।” (ত্বাবারানীর আউসাত্ব ৭১৫১, হাকেম ২২৫৯, শুআবুল ঈমান বাইহাকী ৫৫১৯, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৮৭১নং)
একদা আব্দুল্লাহ বিন উমার রা. কা'বার প্রতি দৃকপাত ক'রে বললেন, "কী মহান তুমি! তোমার মর্যাদা কত মহান! কিন্তু মু'মিন তোমার চাইতেও অধিক মর্যাদাপূর্ণ।” (গা-য়াতুল মারাম ৪৩৫ নং)
(১৩) সুমহান স্রষ্টা মানুষকে নানা বর্ণ ও জাতিতে বিভক্ত করেছেন। কিন্তু মর্যাদায় কাউকে ছোট করেননি। তিনি মর্যাদার মানদন্ড নির্ণয় করেছেন আল্লাহ- ভীতিকে। সুতরাং তিনি বলেছেন, {يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ} (۱۳) سورة الحجرات "হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরেরর সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক আল্লাহ-ভীরু। আল্লাহ সবকিছু জানেন, সব কিছুর খবর রাখেন।” (হুজুরাতঃ ১৩)
(১৪) মহান স্রষ্টা মানুষকে কেবল তার জীবদ্দশাতেই সম্মানিত করেননি, বরং তিনি তার মরণের পরেও তাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দান করেছেন। তাই মর্যাদা- সহকারে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মৃত্যুর পর গোসল দিয়ে তাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে বলা হয়েছে।
ভালো কাপড় দিয়ে কাফন দিতে বলা হয়েছে।
তার লাশকে সুগন্ধিত করতে বলা হয়েছে।
মুসলিম সমাজকে তার জানাযায় অংশগ্রহণ করতে এবং তার জন্য প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে।
যদিও মৃত কোন অপরাধের শাস্তিপ্রাপ্ত হয়ে নিহত হয়েছে, তবুও তার যথানিয়মে জানাযা ও দাফন-কাফন করতে বলা হয়েছে।
সম্মানের সাথে তাকে কবরস্থ করতে বলা হয়েছে।
মহানবী বলেছেন,
كَسْرُ عَظْمِ الْمَيِّتِ كَكَسْرِهِ حَيًّا ..
"মৃত (মুসলিমের) হাড় ভাঙ্গা জীবিত (মুসলিমের) হাড় ভাঙ্গার সমান।" (অর্থাৎ উভয়ের পাপ সমান।) (আবু দাউদ ৩২০৯, ইবনে মাজাহ ১৬১৬, ইবনে হিব্বান, আহমাদ, সহীহুল জামে' ৪৪৭৯নং)
কবরের উপর বেয়ে চলা অথবা তার ফাঁকে-ফাঁকে জুতা পরে চলা, কবরের উপর বসা, কবরের উপর দিয়ে সাধারণ রাস্তা তৈরী করা, কবরের উপর কোন প্রকার নোংরাদি ফেলা, কবরের মাটিতে ফসল উৎপাদন করা, নিজের কাজে ব্যবহার করা, তার উপর কোন প্রকার খেলা, পুরানো কবর স্থানকে খেলার মাঠ করা ইত্যাদি নিষিদ্ধ হয়েছে ইসলামে। মহানবী বলেছেন,
(( لَأَنْ يَجْلِسَ أَحَدُكُمْ عَلَى جَمْرَةٍ ، فَتُحْرِقَ ثِيَابَهُ فَتَخْلُصَ إِلَى جِلْدِهِ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَجْلِسَ عَلَى قَبْرٍ).
"কারো অঙ্গারের উপর বসা---যা তার কাপড় জ্বালিয়ে তার চামড়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়---কবরের উপর বসা অপেক্ষা তার জন্য উত্তম।” (মুসলিম ২২৯২, আবু দাউদ ৩২২৮নং, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, আহমাদ, ইবনে হিব্বান)
তবে তাকে বা তার কবরকে নিয়ে সম্মানে অতিরঞ্জন করতে বারণ করা হয়েছে। যেহেতু একজন মানবকে অতি সম্মান দানে রয়েছে মানবেরই অপমান।
বলা বাহুল্য, উল্লিখিত আলোচনা থেকে বহু সৃষ্টির উপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের কথা পরিষ্কার হয়ে যায়।
জন্মের পর মানব-জাতির কোন গ্লানি থাকে না। অর্থাৎ, শত পাপী হলেও কোন সমস্যা নেই। মানুষ হলেই সে সম্মানীয়, আদরণীয়। কবির মতে এ হল 'মানুষের বাণী'।
'শোনো মানুষের বাণী, জন্মের পর মানব জাতির থাকে না ক' কোন গ্লানি!'
এটা কিছু মানুষের বাণী হলে হতে পারে, কিন্তু মহামানবদের বাণী অথবা সৃষ্টিকর্তার বাণী তা নয়। মানবের মাঝে যদি মানবতা না থাকে, তাহলে সে নামে মানব থাকলেও কামে মানব থাকে না। মনুষ্যের মাঝে যদি মনুষ্যত্বের বৈশিষ্ট্য অবশিষ্ট না থাকে, তাহলে সে মানুষ থাকে কীভাবে?
একই পিতার দুটি সন্তান। যে পিতাকে চেনে এবং তার অধিকার আদায় ও আনুগত্য করে, সে সুসন্তান। আর যে পিতাকে অস্বীকার করে এবং তার অধিকার আদায় ও আনুগত্য করে না, সে হয় কুসন্তান। নিশ্চয় গ্লানি থাকে কুসন্তানের মাঝে। অনুরূপই বিভেদ সৃষ্টি হয় মানুষে-মানুষে। 'জাতের নামে বজ্জাত' হয় অনেকে।
মহান আল্লাহ সে বিভেদের কথা মানব-সৃষ্টির সূচনাতেই বলে দিয়েছেন এবং মানুষকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন,
{قُلْنَا اهْبِطُوا مِنْهَا جَمِيعاً فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَن تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ (۳۸) وَالَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِآيَاتِنَا أُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ}
অর্থাৎ, আমি (আদম-হাওয়া ও শয়তানকে) বললাম, তোমরা সকলেই এ স্থান (জান্নাত) হতে নেমে যাও, পরে যখন আমার পক্ষ হতে তোমাদের নিকট সৎপথের কোন নির্দেশ আসবে, তখন যারা আমার সৎপথের নির্দেশ অনুসরণ করবে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না। আর যারা (কাফের) অবিশ্বাস করে ও আমার নিদর্শনকে মিথ্যাজ্ঞান করে, তারাই অগ্নিবাসী সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। (সূরা বাক্বারাহ ৩৮-৩৯ আয়াত)
মানুষের মাঝে গ্লানি আসে, মানুষ কলঙ্কিত হয়। পাপ ক'রে পাপী হয়। এটাও মানুষের প্রকৃতি। মহানবী বলেছেন,
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ)).
"প্রত্যেক আদম সন্তান ত্রুটিশীল ও অপরাধী, আর অপরাধীদের মধ্যে উত্তম লোক তারা যারা তওবা করে।” (আহমাদ ১৩০৪৯, তিরমিযী ২৪৯৯, ইবনে মাজাহ ৪২৫১, দারেমী ২৭২৭, আবু য়্যা'লা ২৯২২, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৭১২৭নং)
যে অপরাধ করে, সে অপরাধী। যে পাপ করে, সে পাপী। তার শাস্তি আছে। মানুষ বলেই সে গ্লানিশূন্য ও পাপহীন নয়, পাপ করলেও সে শাস্তির অনুপযুক্ত নয়। অপরাধ করলেও সে আদরণীয় নয়।
হ্যাঁ, মানুষ তার কর্মের জন্য দায়ী, জন্মের জন্য নয়---এ কথা ঠিক। যেমন কবির এ কথাও ঠিক,
'মান আছে হুঁশ আছে সেই তো মানুষ, মানুষের মুখোশ পরে কত অমানুষ!'
নিশ্চয়ই মানুষ হয়ে যদি মানুষের পাশে কেউ না দাঁড়ায়, তাহলে তার নিজেকে মানুষ বলে পরিচয় দেওয়াটা বড় লজ্জাকর।
একজন হাকীম দিবালোকে হাতে বাতি নিয়ে কী যেন খুঁজছিলেন। কেউ তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, 'এই দিনের বেলায় আলো নিয়ে আপনি কী খুঁজছেন?' উত্তরে তিনি বললেন, 'একটি মানুষ!' তার মানে, মানুষের মতো মানুষ, প্রকৃত মানুষ। হ্যাঁ, প্রাণ থাকলে প্রাণী হয়, কিন্তু মন না থাকলে মানুষ হয় না। মানুষ হওয়ার জন্য মন ও মনুষ্যত্ব চাই।
তরুলতা সহজেই তরুলতা, পশুপক্ষী সহজেই পশুপক্ষী, কিন্তু মানুষ প্রাণপণ চেষ্টায় তবে মানুষ।
প্রসিদ্ধ আছে যে, 'সঙ্কটের মধ্যেই প্রকৃত মানুষ সৃষ্টি হয়। আর প্রাচুর্যের মধ্যে (অধিকাংশ) জন্ম নেয় অমানুষ।'
'ধনের মানুষ মানুষ নয়, মনের মানুষই মানুষ।' 'নাম মানুষকে বড় করে না, মানুষই নামকে বড় করে।'
মানবের মাঝেও তারতম্য আছে, যে মানব একটি জাতির মনে শান্তি দিতে পারে, সে নিঃসন্দেহে মহামানব।
মানবের পাঁচটি অধিকার: ঈমান, প্রাণ, জ্ঞান, মান ও ধন রক্ষার জন্যই ইসলামের আবির্ভাব। অতএব মানবের এই পাঁচটির মধ্যে যে কোনও একটি কোন মানব কোনভাবে নষ্ট করলে সে মানবাধিকার লাভের যোগ্য থাকতে পারে না। ইসলাম মানবকে বাঁচার অধিকার দিয়েছে। কিন্তু যে মানব অন্য মানবকে বাঁচতে দিতে চায় না, তাকে বাঁচার অধিকার দেয়নি।
ইসলাম মানবকে সম্মান লাভের অধিকার দিয়েছে। কিন্তু যে মানব অপর মানবের সম্মান নষ্ট করে, তার সে অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ইসলাম মানবকে দ্বীনদারীর অধিকার দিয়েছে। কিন্তু যে মানব 'দ্বীনে হক' অবলম্বন করে না অথবা তার পথে বাধা সৃষ্টি করে, তার নিকট থেকে মানবের কিছু অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ইসলাম মানবকে স্বাধীনতার অধিকার দিয়েছে। কিন্তু যে মানব নিজের স্বাধীনতা প্রয়োগে অপরের স্বাধীনতা নষ্ট করে, সে মানবের সে অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
ইসলামে প্রত্যেক মানুষের রুযী-রুটি, বস্ত্র ও বাসস্থানের অধিকার দিয়েছে। অধিকার দিয়েছে চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মের। ইসলাম এসেছে মানবের মানবতার পরিপূর্ণতা দানের জন্য। ইসলামে কোন যুলম নেই। আসলে মানবমন্ডলী নিজেরা নিজেদের প্রতি যুলম ক'রে থাকে।
মানবাধিকার মানে স্বেচ্ছাচারিতা বা অবাধ স্বাধীনতার অধিকার নয়। মানবাধিকার মানে যে কোন অপরাধ ও পাপ করার অধিকার নয়। ইচ্ছামতো অবৈধ প্রেম-ভালোবাসা, ব্যভিচার, লাম্পট্য ও বিকৃত যৌনাচার নয়। মানবাধিকার হল সুশৃঙ্খলিত ও বৈধ স্বাদ ও স্বাধীনতা ভোগের অধিকার।
সমলিঙ্গী ব্যভিচার বা সমকাম, পশুগমন, বেশ্যাগমন অথবা বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের ব্যভিচারে মানবাধিকার নেই, বৈধ বিবাহে মানবাধিকার আছে। যার স্বামী নেই অথবা যার স্ত্রী নেই, তাকে যে বৈধ বিবাহে বাধা দেয়, সেই আসলে মানবাধিকার লংঘন করে।
মহান স্রষ্টার অনুগত যে মানব, সেই প্রকৃত মানব, সেই 'সফল মানব'।
📄 পশুবৎ মানব
এ জগতে বহু মানুষ আছে, যারা মনুষ্যত্বের বৈশিষ্ট্য রক্ষা ক'রে চলে না। ফলে তাদেরকে পশুর সাথে তুলনা করা হয়। সর্বদিক দিয়ে নয়, বরং কোন এক প্রকার সাদৃশ্য থাকলে তার উপমা উপস্থাপন করা হয়।
যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ اللَّهَ يُدْخِلُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَالَّذِينَ كَفَرُوا يَتَمَتَّعُونَ وَيَأْكُلُونَ كَمَا تَأْكُلُ الْأَنْعَامُ وَالنَّارُ مَثْوًى لَّهُمْ} (১২) محمد
"যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত। কিন্তু যারা অবিশ্বাস করে তারা ভোগ-বিলাসে লিপ্ত থাকে এবং জন্তু-জানোয়ারের মত উদর-পূর্তি করে। আর তাদের নিবাস হল জাহান্নাম।” (মুহাম্মাদঃ ১২)
'রাজ্যভোগের মধুর স্বপ্ন কেউ-বা চরম ভাবে,
কেউ ভাবে চিরকাম্য স্বর্গ কবে এ জীবনে পাবে।
হাতে হাতে নাও নগদ যা পাও শূন্য বাকির খাতা,
আহা! সুদূরের ঢাকের বাদ্য সুদূরেই ভেসে যাবে।'
'এই বেলা ভাই মদ খেয়ে নাও কাল নিশিথের ভরসা কই,
চাঁদনী জাগিবে যুগ-যুগ ধরে আমরা তো আর রব না সই!'
'মিশে ধুলায় তার আগেতে সময়টুকুর সদ্-ব্যভার,
স্ফূর্তি ক'রে নাই করি কেন দিন কয়েকেই সব কাবার?'
যেভাবে জীব-জন্তুদের উদর এবং প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ ছাড়া আর কোন কাজ থাকে না, অনুরূপ অবস্থা হল কাফেরদের। তাদের জীবনের উদ্দেশ্যও (ইহকালে) খাওয়া-পরা ছাড়া আর কিছুই নয়। পরকালের ব্যাপারে তারা একেবারে উদাসীন। আর এই সাদৃশ্যের কারণে তাদেরকে জীব-জন্তুর সাথে তুলনা করা হয়েছে। পরন্তু জীব-জন্তুরা দোযখে যাবে না, কিন্তু তার মতো মানুষেরা দোযখে যাবে!
মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন,
{وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِّنَ الْجِنِّ وَالإِنسِ لَهُمْ قُلُوبٌ لا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا أُوْلَئِكَ كَالأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُوْلَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ}
"আমি তো বহু জ্বিন ও মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি; তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চক্ষু আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দর্শন করে না এবং তাদের কর্ণ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শ্রবণ করে না।
এরা চতুস্পদ জন্তুর ন্যায়; বরং তা অপেক্ষাও অধিক বিভ্রান্ত! তারাই হল উদাসীন।" (আ'রাফঃ ১৭৯)
অন্তর, চোখ, কান এগুলি মহান আল্লাহ এই জন্য দান করেছেন, যাতে মানুষ তার দ্বারা উপকৃত হয়ে নিজ স্রষ্টা, প্রতিপালক ও প্রভুকে চিনতে পারে, তার নিদর্শনসমূহ লক্ষ্য করে এবং সত্যের বাণী মন দিয়ে শ্রবণ করে। কিন্তু যে ব্যক্তি ঐ সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা উপকার নেয় না, সে ব্যক্তি উপকার না নেওয়ার কারণে পশুর মতো; বরং তার থেকেও অধম। কারণ পশুরা নিজের লাভ-নোকসান কিছুটা বোঝে। উপকারী জিনিস হতে উপকার নেয় এবং ক্ষতিকারক জিনিস হতে দূরে থাকে। কিন্তু আল্লাহর হিদায়াত হতে বিমুখতা প্রকাশকারী ব্যক্তির মধ্যে এই পার্থক্য করার শক্তিই এমনভাবে শেষ হয়ে যায় যে, কোল্টি তার জন্য লাভদায়ক, আর কোনটি ক্ষতিকারক, তা নির্ণয় করতে পারে না। আর সেই কারণেই আয়াতের শেষাংশে তাদেরকে গাফিল বা উদাসীন বলা হয়েছে।
মহান আল্লাহ আরো বলেছেন, {أَمْ تَحْسَبُ أَنَّ أَكْثَرَهُمْ يَسْمَعُونَ أَوْ يَعْقِلُونَ إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ سَبِيلًا} "তুমি কি মনে কর যে, ওদের অধিকাংশ শোনে ও বোঝে? ওরা তো পশুরই মতো; বরং ওরা আরও অধম।" (ফুরক্বানঃ ৪৪)
চতুষ্পদ জীব যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে, তারা তা বোঝে। কিন্তু মানুষ, যাদেরকে শুধুমাত্র এক আল্লাহর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তারা নবীগণের মাধ্যমে তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর সাথে শির্ক করে এবং বিভিন্ন স্থানে নিজেদের (তুলনায় উত্তম অথবা অধম সৃষ্টির সামনে) মাথা নত করে। এই দিক দিয়ে তারা অবশ্যই জীবজন্তুর চেয়েও অধিক নিকৃষ্ট এবং পথভ্রষ্ট। তিনি অন্যত্র বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَوَلَّوْا عَنْهُ وَأَنْتُمْ تَسْمَعُونَ (۲۰) وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ قَالُوا سَمِعْنَا وَهُمْ لَا يَسْمَعُونَ (۲۱) إِنَّ شَرَّ الدَّوَابَّ عِنْدَ اللَّهِ الصُّمُّ الْبُكْمُ الَّذِينَ لَا يَعْقِلُونَ} (۲২) سورة الأنفال
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহ ও তার রসূলের আনুগত্য কর এবং (তার কথা) শ্রবণ করার পরেও তার (আনুগত্য) হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। আর তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা বলে, 'শ্রবণ করলাম' অথচ তারা শ্রবণ করে না। নিশ্চয় আল্লাহর নিকট নিকৃষ্টতম জীব কালা ও বোবা; যারা কিছুই বোঝে না।” (আনফালঃ ২০-২২)
শোনার পরও আমল না করা, এটি কাফেরদের অভ্যাস। এই শ্রেণীর অভ্যাস থেকে তোমরা বিরত থাক। পরবর্তী আয়াতে তাদেরকে কালা, বোবা, বিবেকহীন ও
নিকৃষ্টতম জীব বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এরা সকল জীব হতে নিকৃষ্ট, যারা সত্যের ব্যাপারে কালা, বোবা ও বিবেকহীন। তিনি আরো বলেছেন,
{إِنَّ شَرَّ الدَّوَابِّ عِندَ اللَّهِ الَّذِينَ كَفَرُوا فَهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ (٥٥) الَّذِينَ عَاهَدتَّ مِنْهُمْ ثُمَّ يَنقُضُونَ عَهْدَهُمْ فِي كُلِّ مَرَّةٍ وَهُمْ لَا يَتَّقُونَ} (٥৬) سورة الأنفال
"নিশ্চয় আল্লাহর নিকট নিকৃষ্টতম জীব তারাই, যারা সত্য প্রত্যাখ্যান (কুফরী) করেছে। সুতরাং তারা বিশ্বাস (ঈমান আনয়ন) করবে না। ওদের মধ্যে তুমি যাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ, তারা প্রত্যেকবার তাদের চুক্তি ভঙ্গ করে এবং তারা সাবধান হয় না।” (আনফালঃ ৫৫-৫৬)
'নিকৃষ্টতম মানুষ' না বলে তার পরিবর্তে তাদেরকে 'নিকৃষ্টতম জীব' বলা হয়েছে; যা আভিধানিক অর্থ হিসাবে এটা মানুষ ও চতুষ্পদ জন্ত প্রভৃতির ক্ষেত্রেও ব্যবহার হয়। কিন্তু সাধারণতঃ এর ব্যবহার চতুষ্পদ জন্তুর ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। বুঝা যায় যে, কাফেরদের সম্পর্ক মানুষের সাথে নয়। (বরং জন্তুর সাথে। নিজের সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার ও অমান্য ক'রে) কুফরে পতিত হয়ে তারা চতুষ্পদ জন্তু; বরং তার থেকেও নিকৃষ্ট জীব হয়ে গেছে। আল-কুরআনের অন্যত্র আছে,
{وَمَثَلُ الَّذِينَ كَفَرُوا كَمَثَلِ الَّذِي يَنْعِقُ بِمَا لَا يَسْمَعُ إِلَّا دُعَاء وَنِدَاء صُمٌّ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَعْقِلُونَ } (১৭১) سورة البقرة
"এই অমান্যকারীদের দৃষ্টান্ত হল এরূপ, যেমন কোন ব্যক্তি এমন কিছুকে (পশুকে) ডাকে, যা ডাক-হাঁক ছাড়া আর কিছুই শোনে (বোঝে) না, তারা বধির, বোবা ও অন্ধ। তাই তো (তারা) কিছুই বুঝতে পারে না।” (বাক্বারাহঃ ১৭১)
যে কাফেররা পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণে নিজেদের জ্ঞান-বুদ্ধিকে অকেজো ক'রে রেখেছে, তাদের দৃষ্টান্ত সেই পশুদের মত, যাদেরকে রাখাল ডাকে ও আওয়াজ দেয় এবং তারা সেই ডাক ও আওয়াজ তো শোনে, কিন্তু বোঝে না যে, তাদেরকে কেন ডাকা ও আওয়াজ দেওয়া হচ্ছে? অনুরূপ এই অন্ধ অনুকরণকারীরা বধির, তাই সত্যের ডাক শোনে না। বোবা, তাই হক কথা তাদের জবান থেকে বের হয় না। অন্ধ, তাই সত্য দেখতে তারা অক্ষম এবং জ্ঞানশূন্য, তাই সত্যের দাওয়াত এবং তাওহীদ ও সুন্নতকে তারা বুঝতে পারে না।
ফিরিশ্তার জ্ঞান আছে, প্রবৃত্তি নেই। জন্তুর জ্ঞান নেই, প্রবৃত্তি আছে। মানুষের জ্ঞান আছে, প্রবৃত্তিও আছে। সুতরাং যে মানুষের প্রবৃত্তি সংযত ও জ্ঞান আলোকিত, সে ফিরিশ্তার ন্যায়। পক্ষান্তরে যার জ্ঞান পরাভূত এবং প্রবৃত্তি উচ্ছৃঙ্খল, সে পশুর ন্যায়। (তফসীর কুশাইরী ৫/৩৭৮)
বিশেষ বিশেষ আচরণের জন্য বিশেষ বিশেষ পশুর সাথে তুলনা করা হয়েছে কিছু মানুষকে। যেমন আল্লাহর কিতাবের জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তার নির্দেশানুযায়ী আমল না করা, পরকাল আছে জানা সত্ত্বেও তার উপর ইহকালকে প্রাধান্য ও গুরুত্ব দেওয়া ইত্যাদি। এমন জ্ঞানপাপী ও বেআমল আলেম শ্রেণীর মানুষেরা কুকুরের মতো। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ الَّذِي آتَيْنَاهُ آيَاتِنَا فَانسَلَخَ مِنْهَا فَأَتْبَعَهُ الشَّيْطَانُ فَكَانَ مِنَ الْغَاوِينَ (۱۷٥) وَلَوْ شِئْنَا لَرَفَعْنَاهُ بِهَا وَلَكِنَّهُ أَخْلَدَ إِلَى الأَرْضِ وَاتَّبَعَ هَوَاهُ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ الْكَلْبِ إِن تَحْمِلْ عَلَيْهِ يَلْهَثْ أَوْ تَتْرُكْهُ يَلْهَثْ ذَلِكَ مَثَلُ الْقَوْمِ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا فَاقْصُصِ الْقَصَصَ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ (١٧٦) سَاء مَثَلاً الْقَوْمُ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَأَنفُسَهُمْ كَانُوا يَظْلِمُونَ} (۱۷۷)
“তাদেরকে ঐ ব্যক্তির বৃত্তান্ত পড়ে শোনাও, যাকে আমি আমার আয়াতসমূহ দান করেছিলাম, অতঃপর সে সেগুলিকে বর্জন করে, তারপর শয়তান তার পিছনে লাগে, ফলে সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়। আমি ইচ্ছা করলে ঐ (আয়াতসমূহ) দ্বারা তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করতাম, কিন্তু সে দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয় এবং নিজ কামনা-বাসনার অনুসরণ করে। তার উদাহরণ কুকুরের মত, ওকে তুমি তাড়া করলে সে জিভ বের করে হাঁপায় এবং তুমি ওকে এমনি ছেড়ে দিলেও সে জিভ বের করে হাঁপাতে থাকে। যে সম্প্রদায় আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা মনে করে, তাদের উদাহরণ এটা। সুতরাং তুমি কাহিনী বিবৃত কর, যাতে তারা চিন্তা করে। যে সম্প্রদায় আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যাজ্ঞান করে ও নিজেদের প্রতি অনাচার করে, তাদের উদাহরণ কত নিকৃষ্ট!” (আ'রাফঃ ১৭৫-১৭৭)
তফসীরকারগণ এটিকে এক নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য বলেছেন, যে আল্লাহর কিতাবের জ্ঞান রাখত; কিন্তু পরে পার্থিব ভোগ-বিলাস ও শয়তানের পিছে পড়ে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। তবে নির্দিষ্ট ব্যক্তি কে ছিল? তা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। অতএব এ ব্যাপারে কষ্টকল্পনার কোন প্রয়োজন নেই। এটি সাধারণ ব্যাপার, এমন মানুষ প্রত্যেক জাতি ও প্রত্যেক যুগে জন্ম নেয়। যে ব্যক্তিই অনুরূপ প্রকৃতির হবে, তাকে এর দলভুক্ত করা হবে।
সাধারণতঃ ক্লান্তি ও পিপাসার তাড়নায় জিহ্বা বের হয়ে আসে। কিন্তু কুকুরের অভ্যাস এই যে, তাকে আপনি ধমক দিন, তাড়িয়ে দিন অথবা তাকে নিজ অবস্থায় ছেড়ে দিন, সকল অবস্থাতেই সে ঘেউ ঘেউ করতে থাকবে। অনুরূপ তার পেট পূর্ণ থাক বা খালি, সুস্থ থাক বা অসুস্থ, ক্লান্ত থাক বা তাজা, সব সময় সে জিভ বের ক'রে হাঁপাতে থাকবে। অনুরূপ অবস্থা ঐ ব্যক্তির; তাকে উপদেশ দিন বা না দিন, তার অবস্থা একই থাকবে এবং পৃথিবীর সুখ-সম্পদের জন্য সে লালায়িত থাকবে। আখেরাতের উপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দেবে।
দ্বীন বিক্রয় ক'রে দুনিয়া ক্রয় করবে। আল্লাহর আয়াতের বিনিময়ে ভোগ-বিলাস ক্রয় করবে। নিকৃষ্ট সেই জ্ঞানী, নিকৃষ্ট সে আলেম।
অনুরূপ কাছাকাছি আরও এক শ্রেণীর মানুষ, যাদেরকে মহান আল্লাহ কিতাববাহী গাধার সাথে তুলনা করেছে। তিনি বলেছেন,
{مَثَلُ الَّذِينَ حُمِّلُوا التَّوْرَاةَ ثُمَّ لَمْ يَحْمِلُوهَا كَمَثَلِ الْحِمَارِ يَحْمِلُ أَسْفَارًا بِئْسَ مَثَلُ الْقَوْمِ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِ اللَّهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ} (٥) سورة الجمعة
"যাদেরকে তাওরাতের দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়েছিল, অতঃপর তা তারা বহন করেনি, তাদের দৃষ্টান্ত পুস্তক বহনকারী গর্দভ। কত নিকৃষ্ট সেই সম্প্রদায়ের দৃষ্টান্ত, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে মিথ্যাজ্ঞান করে। আর আল্লাহ অত্যাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।" (জুমুআহঃ ৫)
উক্ত আয়াতে আমলবিহীন ইয়াহুদীদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে। তা হল একটি কিতাববাহী গাধা; তার পিঠে যে কিতাবগুলো বোঝাই করা আছে, তাতে কী লেখা আছে অথবা তার উপর যা বোঝাই করা হয়েছে তা কিতাব, না ঘাস-ভুসি তা জানে না। অনুরূপ এই ইয়াহুদীরাও; তাদের কাছে তওরাত আছে। তা পড়া ও মুখস্থ করার দাবীও করে, কিন্তু তারা না তা বোঝে, আর না তার নির্দেশ অনুযায়ী আমল করে। বরং তার অপব্যাখ্যা এবং তাতে হেরফের, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সাধন করে। কাজেই প্রকৃতপক্ষে এরা গাধার থেকেও বেশী নিকৃষ্ট। কারণ, গাধা জন্মগতভাবেই বিবেক ও বোধশক্তি থেকে বঞ্চিত হয়, আর এদের মধ্যে বিবেক-বুদ্ধি বিদ্যমান, কিন্তু এরা তার সঠিক ব্যবহার করে না। এই জন্য পরে বলা হয়েছে যে, এদের দৃষ্টান্ত বড়ই নিকৃষ্ট।
হুবহু দৃষ্টান্ত সেই মুসলিমদের---বিশেষ ক'রে হাফেয-ক্বারী ও আলেমদেরও, যারা কুরআন পড়ে ও মুখস্থ করে, কিন্তু তার মানে বোঝে না এবং বুঝলেও তার নির্দেশ অনুযায়ী আমল করে না। অংশীবাদী মুশরিকদের উপমা হল মাকড়সা। মহান আল্লাহ তার বর্ণনা দিয়ে বলেছেন,
{مَثَلُ الَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِ اللَّهِ أَوْلِيَاء كَمَثَلِ الْعَنكَبُوتِ اتَّخَذَتْ بَيْتًا وَإِنَّ أَوْهَنَ الْبُيُوتِ لَبَيْتُ الْعَنكَبُوتِ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ} (٤١) سورة العنكبوت
"যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সা; যে নিজের জন্য ঘর তৈরী করে। আর ঘরের মধ্যে মাকড়সার ঘরই তো সবচেয়ে দুর্বলতম; যদি ওরা জানত।” (আনকাবুতঃ ৪১)
যেমন মাকড়সার জাল নিতান্ত দুর্বল, ক্ষীণ ও অস্থায়ী হয়; যা হাতের সামান্য ছোঁয়ায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, তেমনই আল্লাহ ছাড়া অন্যকে মাবুদ (উপাস্য) মানা, দুঃখ-দুর্দশা দূরকারী মনে করা হুবহু মাকড়সার জালের মতো, যাতে মুশরিকের কোন লাভ নেই। কারণ, তার সেই উপাস্য কোন প্রকার উপকার করতে পারে না। এই জন্য আল্লাহ ছাড়া অন্যের উপর ভরসা করা মাকড়সার জালের মতোই দুর্বল ও নিষ্ফল। যদি সে সকল মাবুদ স্থায়ী হতো বা কোন উপকার করার ক্ষমতা রাখত, তাহলে পূর্বের জাতিসমূহকে ধ্বংসের হাত হতে বাঁচাতে পারত। কিন্তু পৃথিবীর মানুষ সাক্ষী যে, তারা তাদেরকে বাঁচাতে পারেনি।
কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, মানুষকে পশুর সাথে তুলনা কেন? উত্তরে বলি, আমরাও আমাদের কথাবার্তায় ভালো-মন্দে মানুষকে পশুর সাথে তুলনা ক'রে থাকি। যেমন বলি, 'লোকটা বাঘের মতো। বাঘের যোগ্য বাঘিনী। মোগল-পাঠান হদ্দ হল ফারসী পড়ে তাঁতী, বাঘ পালাল বিড়াল এল শিকার করতে হাতী!
শকুনের মন ভাগাড়ের দিকে। দুই বিড়ালের ঝগড়াতে কুকুর পালায় মাংস নিয়ে। ঘরের ভাত দিয়ে শকুনি পোষে, গোয়ালের গরু টেকে বসে। আদার গাঁয়ে শিয়াল বাঘ। দেখতে খেঁকশিয়ালি, যুদ্ধের সময় বাঘ। শিয়ালের গু কাজে লাগে, শিয়াল গিয়ে পর্বতে হাগে। সব শিয়ালে খেল কাঁঠাল, বকের ঠোঁটে আঠা। ইঁদুরে দর করে, সাপে ভোগ করে। উদ্-বিড়ালে মাছ ধরে, খটাশে তিন ভাগ করে। ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাগডাসে। নরমের বাঘ, গরমের বিড়াল।' ইত্যাদি। যেমন হাদীসে এসেছে,
((الْمُؤْمِنُونَ هَيِّنُونَ لَيِّنُونَ كَالجَمَلِ الأَنفِ إِنْ قِيدَ انْقَادَ ، وَإِذَا أُنِيخَ عَلَى صَخْرَةِ اسْتَنَاخَ)). "মুমিনগণ সরল-বিনম্র হয়। ঠিক লাগাম দেওয়া উটের মতো; তাকে টানা হলে চলতে লাগে এবং পাথরের উপরে বসতে ইঙ্গিত করলে বসে যায়।” (বাইহাকীর শুআবুল ঈমান ৪-১২৯, সহীহুল জামে ৬৬৬৯নং)
تَجِدُونَ النَّاسَ كَابَل مِائَةٍ لَا يَجِدُ الرَّجُلُ فِيهَا رَاحِلَةً ..
“মনুষ্য-সমাজ হল শত উটের মতো; যার মধ্যে একটা ভালো সওয়ার-যোগ্য উট খুঁজে পাওয়া মুশকিল।” (আহমাদ, বুখারী ৬৪৯৮, মুসলিম ৬৬৬৩, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, সহীহুল জামে' ২৩৩২ নং)
(( يَدْخُلُ الجَنَّةَ أَقْوامُ أَفْئِدَتُهُمْ مِثْلُ أَفْئِدَةِ الطَّيرِ )). "জান্নাতে এমন লোক প্রবেশ করবে, যাদের অন্তর হবে পাখীর অন্তরের মতো।” (মুসলিম ৭৩৪১নং)
(( الَّذِي يَعُودُ فِي هِبَتِهِ كَالكَلْبِ يَرْجِعُ فِي قَيْنِهِ )) . متفق عَلَيْهِ . وفي رواية : (( مَثَلُ الَّذِي يَرْجِعُ فِي صَدَقَتِهِ ، كَمَثَلِ الكَلْبِ يَقِي، ثُمَّ يَعُودُ فِي قَيْنِهِ فَيَأْكُلُهُ )) . "যে ব্যক্তি নিজের দান ফিরিয়ে নেয়, সে ঐ কুকুরের মতো, যে বমি করে, তারপর তা আবার খেয়ে ফেলে।"
অন্য এক বর্ণনায় আছে, “যে ব্যক্তি সাদকার মাল ফেরৎ নেয় তার উদাহরণ ঠিক ঐ কুকুরের ন্যায়, যে বমি করে তারপর আবার তা ভক্ষণ করে।” (বুখারী ২৫৮৯, ২৬২২, ৬৯৭৫, মুসলিম ৪২৫৫, ৪২৫৮, ৪২৬১নং)
((إِنَّمَا مَثَلُ الْمُنَافِقِ مَثَلُ الشَّاةِ الْعَائِرَةِ بَيْنَ الْغَنَمَيْنِ تَعِيرُ إِلَى هَذِهِ مَرَّةً وَإِلَى هَذِهِ مَرَّةً لَا تَدْرِي أَيُّهُمَا تَتْبَعُ)). "মুনাফিকের উদাহরণ যেমন দুই ছাগপালের মাঝে যাতায়াতকারী বিপথগামী ছাগ। যা এ পালে একবার আসে আবার ও পালে একবার যায়। স্থির করতে পারে না যে সে কোন পালের অনুসরণ করবে।” (আহমদ ৫৭৯০, মুসলিম ৭২২০, নাসাঈ ৫০৩৭নং)
কেবল পশুই নয়, মানুষকে গাছ ও ফসলের মতোও বলে উপমা দেওয়া হয়েছে। মহানবী বলেছেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِ كَمَثَلِ الْخَامَةِ مِنَ الزَّرْعِ تُفِيتُهَا الرِّيَاحُ تَصْرَعُهَا مَرَّةً وَتَعْدِلُهَا حَتَّى يَأْتِيَهُ أَجَلُهُ وَمَثَلُ الْمُنَافِقِ مَثَلُ الْأَرْزَةِ الْمُجْذِيَةِ الَّتِي لَا يُصِيبُهَا شَيْءٌ حَتَّى يَكُونَ انْجِعَافُهَا مَرَّةً وَاحِدَة .. "মু'মিনের উদাহরণ হল নরম ফসলের মত, বাতাস তা হিলাতে-দুলাতে থাকে। মু'মিন বিপদগ্রস্ত হয় (আবার উঠে দাঁড়ায়)। পক্ষান্তরে (কাফের) মুনাফিকের উদাহরণ হল 'আরযা' (বিশাল সীডার) গাছের মত। তা বাতাসে হিলে না। কিন্তু (ঝড়ে) ভেঙ্গে ধ্বংস হয়ে যায়।” (বুখারী ৭৪৬৬, মুসলিম ৭২৭৩নং)
📄 ঈমান অমূল্য ধন
মহান স্রষ্টা মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে জ্ঞান ও ইচ্ছা-স্বাধীনতা দিয়ে সম্মানিত করেছেন। এ ছাড়া তাকে প্রকৃতিগতভাবে এমন কিছু যোগ্যতা দান করেছেন, যা দ্বারা সে ভাল-মন্দ, সুন্দর-অসুন্দর, উপকারী-অপকারী ইত্যাদি বস্তুর মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম হয়। এই পার্থক্য করার ক্ষমতার নামই হল ঈমান। এই পার্থক্যের অনুভূতি এবং সেই অনুভূতি অনুসারে চলার নামই হল ইসলাম। এই অনুভূতির শক্তি যার মাঝে যত বেশী থাকে, সে তত বেশী সফল মানুষে পরিণত হয়। আর যার মধ্যে এ অনুভূতি নেই, সে মানুষ হলেও পশুর শামিল। যার ফলশ্রুতিতে সে ইহকাল ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঈমানের ফলে মানুষের কত উপকার সাধিত হয়, তার কিছু নমুনা নিম্নরূপঃ
১। ঈমান মানুষকে শির্ক, কুফর, বিদআত ও পাপাচরণ থেকে বিরত রাখে। আর এ থেকে বিরত থাকতে পারাই হল মানুষের ইহ-পরকালের মহা সাফল্য। মহান আল্লাহ বলেন,
وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَخْشَ اللَّهَ وَيَتَّقْهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ } (৫২) سورة النور “যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর অবাধ্যতা হতে বেঁচে থাকে, তারাই সফলকাম।” (নূরঃ ৫২)
অন্যত্র তিনি বলেছেন,
قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّى (١٤) وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّىٰ (١٥) سورة الأعلى “সেই সফলকাম হয়েছে, যে আত্মশুদ্ধি লাভ করেছে এবং তার প্রতিপালকের নাম স্মরণ ক’রে নামায আদায় করেছে।” (আ’লাঃ ১৪-১৫)
পক্ষান্তরে যারা শির্ক ও কুফ্রীতে লিপ্ত হয়ে নিজের আত্মাকে কলুষিত করেছে, তারাই বিফল।
{وَقَدْ خَابَ مَنْ حَمَلَ ظُلْمًا} (১১১) سورة طه “আর সেই ব্যর্থ হবে, যে যুলুমের ভার বহন করবে।” (ত্বাহাঃ ১১১)
আর সব চাইতে বড় যুলুম হল আল্লাহর সাথে শির্ক করা।
ঈমান মানুষকে কুপ্রবৃত্তি ও শয়তানের প্ররোচনা থেকে বাঁচিয়ে রাখে। যার ফলে সে উভয় জগতের সাফল্য লাভ করে। তিনি বলেন, {وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} (٩) سورة الحشر
“আর যাদেরকে তাদের অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম।” (হাশ্রঃ ৯)
মহান আল্লাহ বলেন, {وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا (۷) فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا (۸) قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا (۹) وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا } (۱۰) سورة الشمس
“শপথ মানুষের এবং তাঁর, যিনি তাকে সুঠাম করেছেন, অতঃপর তাকে তার অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। সে সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সে ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষিত করবে।” (শামসঃ ৭-১০)
অন্যত্র তিনি বলেন, {إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْمُجْرِمُونَ} “অপরাধীরা সফলকাম হয় না।” (ইউনুসঃ ১৭)
আর এ কথা সুস্পষ্ট যে, অপরাধ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হল ঈমান। ঈমান এমন এক জ্যোতি ও শক্তি, যা অপরাধীর অপরাধ-প্রবণতাকে দুর্বল ক’রে দেয়।
ঈমান মানুষের জীবনকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের ক’রে নিয়ে আসে। তাই তো ঈমানদারের জীবনটা হয় আলোকময়। আর যার জীবন আলোয় ভরা, তার জীবনে সফলতা অবশ্যম্ভাবী। পক্ষান্তরে বেঈমানের জীবন অন্ধকারময়। যার সারা জীবনটাই অন্ধকার, তার জীবনে আর সাফল্য কোথায়? আল্লাহ তাআলা বলেন,
اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَوْلِيَاؤُهُمُ الطَّاغُوتُ يُخْرِجُونَهُم مِّنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَاتِ أُوْلَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
“আল্লাহ তাদের অভিভাবক যারা বিশ্বাস স্থাপন করে, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের ক’রে আলোকে নিয়ে যান। আর যারা অবিশ্বাস করে, তাগূত (শয়তান) তাদের অভিভাবক, সে তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। এরাই হল জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।” (বাকারাহঃ ২৫৭)
ঈমানদার আল্লাহর হিদায়াতপ্রাপ্ত হয় এবং তার হিদায়াত বৃদ্ধি পায়। {وَالَّذِينَ اهْتَدَوْا زَادَهُمْ هُدًى وَآتَاهُمْ تَقْواهُمْ} (۱۷) سورة محمد
“আর যারা সৎপথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তাদের সৎপথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেন এবং তাদেরকে সংযমশীলতা দান করেন।” (মুহাম্মাদঃ ১৭)
তিনি আরও বলেন, {إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ آمَنُوا بِرَبِّهِمْ وَزِدْنَاهُمْ هُدًى} (۱۳) سورة الكهف
“ওরা ছিল কয়েকজন যুবক, ওরা ওদের প্রতিপালকের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল এবং আমি ওদের সৎপথে চলার শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।” (কাহ্ফঃ ১৩)
আর আল্লাহ যাকে সৎপথ প্রদর্শন করেন, সে কোন দিন পথভ্রষ্ট হয় না। আর পথভ্রষ্ট না হওয়াটাই তো হল সফলতা। পক্ষান্তরে কাফেররা তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহর সাহায্য ও পথনির্দেশ থেকে বঞ্চিত হয়। তিনি বলেন,
{إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ} “নিশ্চয়ই আল্লাহ যালেম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।” (বাক্বারাহঃ ২৫৮)
{إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ } “নিশ্চয় আল্লাহ তাকে সৎপথে পরিচালিত করেন না, যে মিথ্যাবাদী, অবিশ্বাসী।” (যুমারঃ ৩)
{إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ كَذَّابٌ} “আল্লাহ সীমালংঘনকারী ও মিথ্যাবাদীকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।” (মু’মিনঃ ২৮)
{ذَلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ لَمْ يَكُ مُغَيِّرًا نِعْمَةً أَنْعَمَهَا عَلَى قَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ وَأَنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ} (٥٣) سورة الأنفال
“এটা এই জন্য যে, আল্লাহ কোন সম্প্রদায়কে যে সম্পদ দান করেন, তিনি তা পরিবর্তন করেন না; যতক্ষণ না তারা নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করে। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (আনফালঃ ৫৩)
ঈমানদারের অন্তর প্রশান্ত থাকে। আল্লাহ তাআলার প্রতি ভরসা স্থাপন করে সে নিশ্চিন্ত ও দুশ্চিন্তা মুক্ত জীবন-যাপন করতে পারে। তাই তো তার জীবন হয় সফল ও সার্থক। তিনি বলেন,
{الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ اللَّهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ} “যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” (রা’দঃ ২৮)
মহান আল্লাহ মু’মিনদেরকে অশেষ নিয়ামত দ্বারা ধন্য করেন। সেই নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা প্রত্যেক মু’মিনের কর্তব্য। শুকরিয়া আদায় করলে আল্লাহ তাআলা তাদের নিয়ামতকে আরো বাড়িয়ে দেন। তিনি বলেন,
{لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ} (۷) سورة إبراهيم “তোমরা কৃতজ্ঞ হলে তোমাদেরকে অবশ্যই বেশী ক’রে দেব আর অকৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমার শাস্তি হবে কঠোর।” (ইব্রাহীমঃ ৭)
আর অকৃতজ্ঞ কাফেররা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মহান আল্লাহ বলেন, {إِنَّمَا يَأْمُرُكُمْ بِالسُّوءِ وَالْفَحْشَاءِ وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ} (١٦٩) سورة البقرة
“সে (শয়তান) তো কেবল তোমাদেরকে মন্দ ও অশ্লীল কার্যের এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন সব বিষয় বলার নির্দেশ দেয়, যা তোমরা জান না।” (বাকারাহঃ ১৬৯)
{الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِالْفَحْشَاء وَاللّهُ يَعِدُكُم مَّغْفِرَةً مِّنْهُ وَفَضْلاً وَاللّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ} (٢٦٨) سورة البقرة
“শয়তান তোমাদেরকে দরিদ্রতার ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর ক্ষমা ও করুণার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়।” (বাকারাহঃ ২৬৮)
ঈমানের প্রভাবে মানুষ পরস্পরের ভাই-ভাই হয়ে যায় এবং তাদের মাঝে কোন ভেদাভেদ থাকে না। তিনি বলেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ } (١٠) الحجرات “মুমিনগণ তো পরস্পর ভাই-ভাই। অতএব তোমাদের ভাইদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও, আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা করুণা প্রাপ্ত হও।” (হুজুরাতঃ ১০)
আল্লাহর রসূল ﷺ বলেছেন, “এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার উপর অত্যাচার করবে না এবং তাকে শত্রুর হাতে সোপর্দও করবে না। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের অভাব মোচন করবে, আল্লাহ তার অভাব মোচন করবেন। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের বিপদ দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার বিপদ দূর করবেন। আর যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।” (বুখারী, মুসলিম, রিয়াদুস স্বালেহীন ২৪২নং)
ঈমানই হল মানুষের মাঝে বন্ধুত্ব স্থাপনকারী। আল্লাহ তাআলা বলেন, {وَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ لَوْ أَنفَقْتَ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعاً مَّا أَلَّفْتَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ أَلَّفَ بَيْنَهُمْ إِنَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ} (٦٣) سورة الأنفال
“(হে নবী!) তিনিই তোমাকে স্বীয় সাহায্য ও মু’মিনদের দ্বারা শক্তিশালী করেছেন এবং তিনি তাদের পরস্পরের হৃদয়ে প্রীতি স্থাপন করেছেন। তুমি যদি পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদও ব্যয় করতে, তবুও তাদের হৃদয়ে প্রীতি স্থাপন করতে পারতে না। কিন্তু আল্লাহই তাদের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করেছেন। নিশ্চয় তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (আনফালঃ ৬২-৬৩)
আর এই সৌভাতৃত্ব ও সম্প্রীতিই এক সফল সমাজের মূল ভিত্তি।
ঈমান একটি শক্তি। সেই শক্তির বলে মু’মিন একাই একশ’। মহান আল্লাহ বলেন, {يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ حَرِّضِ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى الْقِتَالِ إِن يَكُن مِّنكُمْ عِشْرُونَ صَابِرُونَ يَغْلِبُوا مِائَتَيْنِ وَإِن يَكُن مِّنكُم مِّئَةٌ يَغْلِبُواْ أَلْفًا مِّنَ الَّذِينَ كَفَرُواْ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لاَّ يَفْقَهُونَ} (٦٥) الأنفال
“হে নবী! তুমি বিশ্বাসীগণকে জিহাদের জন্য উদ্ধুদ্ধ কর। তোমাদের মধ্যে বিশজন ধৈর্যশীল থাকলে তারা দু’শ জনের উপর বিজয়ী হবে এবং একশ’ জন থাকলে এক হাজার অবিশ্বাসীর উপর বিজয়ী হবে। কারণ, তারা এমন এক সম্প্রদায় যাদের বোধশক্তি নেই।” (আনফালঃ ৬৫)
ঈমান মানুষকে মর্যাদা দান করে। মহান আল্লাহ বলেন, {وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ} (۱۳۹) سورة آل عمران
“আর তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না, তোমরাই হবে সর্বোপরি (বিজয়ী); যদি তোমরা মু’মিন হও।” (আলে ইমরানঃ ১৩৯)
এই ঈমানের জোরেই নবী মূসা (عليه السلام) ফিরআওন ও তার বিশাল সৈন্যদলের সামনে একা দাঁড়িয়ে বলতে পেরেছিলেন,
{قَالَ أَصْحَابُ مُوسَى إِنَّا لَمُدْرَكُونَ (٦١) قَالَ كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ} (٦٢) الشعراء
“মূসার সঙ্গীরা বলল, ‘আমরা তো ধরা পড়েই গেলাম।’ মূসা বলল, ‘কখনোই না, আমার সঙ্গে আমার প্রতিপালক রয়েছেন। তিনি আমাকে অবশ্যই পথ প্রদর্শন করবেন।” (শুআরাঃ ৬১-৬২)
ঈমানদার ব্যক্তি তাঁর রবের সাহায্যের সুসংবাদ প্রাপ্ত হয়। তিনি বলেন, {إِنَّا لَنَنصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ} (٥١) سورة غافر
“আমি অবশ্যই আমার রসূলদেরকে ও বিশ্বাসীদেরকে পার্থিব জীবনে ও যেদিন সাক্ষীগণ দণ্ডায়মান হবে, সেদিন সাহায্য করব।” (মু’মিনঃ ৫১)
{وَكَانَ حَقًّا عَلَيْنَا نَصْرُ الْمُؤْمِنِينَ} (٤٧) سورة الروم
“আর বিশ্বাসীদেরকে সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।” (রূমঃ ৪৭)
ঈমানদারের জন্য রয়েছে ইহকাল ও পরকালের সুসংবাদ। তিনি বলেন, {أَلا إِنَّ أَوْلِيَاء اللّهِ لاَ خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلاَ هُمْ يَحْزَنُونَ (٦٢) الَّذِينَ آمَنُواْ وَكَانُواْ يَتَّقُونَ (٦٣) لَهُمُ الْبُشْرَى فِي الْحَياةِ الدُّنْيَا وَفِي الآخِرَةِ لاَ تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللّهِ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ} (٦٤) سورة يونس
“জেনে রাখ! আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং সাবধান হয়ে চলে, তাদের জন্য আছে সুসংবাদ পার্থিব জীবনে ও পরলোকে। আল্লাহর বাক্যের কোন পরিবর্তন নেই। এটাই হল মহাসাফল্য।” (ইউনুসঃ ৬২-৬৪)
ঈমানদাররা আল্লাহর প্রিয়পাত্র। মহান আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন। তিনি বলেন, {يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ} “তিনি তাদেরকে ভালবাসেন এবং তারাও তাঁকে ভালবাসে।” (মায়িদাহঃ ৫৪)
মহানবী (সাঃ) বলেন, “যখন আল্লাহ কোন বান্দাকে ভালবাসেন, তখন জিবরীলকে ডেকে বলেন, ‘আমি অমুক বান্দাকে ভালবাসি, তুমিও তাকে ভালবাস।’ তখন জিবরীলও তাকে ভালবাসতে শুরু করেন। অতঃপর তিনি আকাশবাসীদের মধ্যে ঘোষণা ক’রে দেন যে, ‘আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালবাসেন। সুতরাং তোমরাও তাকে ভালবাস।’ তখন আকাশবাসীরাও তাকে ভালবাসতে থাকে। অতঃপর পৃথিবীতেও তাকে জনপ্রিয় ক’রে তোলা হয়।” (বুখারী ৩২০৯, মুসলিম ৬৮২৯নং)
আর আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তার জীবন তো ধন্য ও সফল হবেই।
মহান আল্লাহ মু’মিনদের সহায় ও অভিভাবক। তিনি বলেন, {ذَلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ مَوْلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَأَنَّ الْكَافِرِينَ لَا مَوْلَى لَهُمْ} (১১) سورة محمد
“এটা এই জন্য যে, আল্লাহ বিশ্বাসীদের অভিভাবক এবং অবিশ্বাসীদের কোন অভিভাবক নেই।” (মুহাম্মাদঃ ১১) {اللّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُواْ يُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوُرِ} (٢٥٧) سورة البقرة
“আল্লাহ তাদের অভিভাবক যারা বিশ্বাস স্থাপন করে, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোকে নিয়ে যান।” (বাক্বারাহঃ ২৫৭)
ঈমানদারের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও বিরাট প্রতিদান। তিনি বলেন, {وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ} (٩) سورة المائدة
“যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।” (মায়িদাহঃ ৯)
{وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا} (٢٩) الفتح
“ওদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ক্ষমা ও মহা পুরস্কারের।” (ফাত্হঃ ২৯)
পরিশেষে একটি কথা যে, ঈমান থাকলে ছোট আমলও অনেক বড় হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, {إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمَنُ وُدًّا} (٩٦) سورة مريم
“যারা বিশ্বাস করেছে এবং সৎকর্ম করেছে, পরম দয়াময় তাদের জন্য (পারস্পরিক) সম্প্রীতি সৃষ্টি করবেন।” (মারয়্যামঃ ৯৬)
সুতরাং কোন নেকীকেই ছোট মনে করা উচিত নয়। নেকীর ফলে প্রাপ্ত প্রতিদান ও সওয়াবকে সামনে রেখে কাজ ক’রে যাওয়া উচিত। সামান্যতম নেকীর ফলও কিয়ামতে পাওয়া যাবে।
পক্ষান্তরে বেঈমানি অবস্থায় কোন নেক আমল কাজে আসে না।
১। ঈমান দ্বারা দুনিয়া ও আখেরাতের প্রভূত কল্যাণ লাভ হয়। ঈমান হল সবচেয়ে বড় নেয়ামত। মহান আল্লাহ এই নেয়ামত দ্বারা তাঁর মু'মিন বান্দাদেরকে সম্মানিত ক'রে থাকেন।
{بَلِ اللَّهُ يَمُنُّ عَلَيْكُمْ أَنْ هَدَاكُمْ لِلإِيمَانِ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ} (۱۷) سورة الحجرات “বরং আল্লাহই তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তোমাদেরকে ঈমানের পথে পরিচালিত করেছেন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” (হুজুরাতঃ ১৭)
ঈমানের ফলে মু'মিন আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। তাঁর সাথে সম্পর্ক কায়েম হয়। ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে এবং ঈমানের মিষ্টতা উপভোগ করতে পারে। মহানবী বলেছেন,
(( ثَلاثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلاوَةَ الإيمانِ : أَنْ يَكُونَ اللهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا ، وَأَنْ يُحِبَّ المَرْءَ لا يُحِبُّهُ إِلا للهِ ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ في الكُفْرِ بَعْدَ أَنْ أَنْقَذَهُ اللهُ مِنْهُ ، كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ في النَّارِ )).
“তিনটি জিনিস যার মধ্যে থাকবে, সে ঈমানের স্বাদ পাবেঃ (১) তার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অন্য সব কিছু থেকে অধিক প্রিয় হওয়া, (২) কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা, এবং (৩) কুফরী থেকে আল্লাহ তাকে উদ্ধার করার পর পুনরায় কুফরীতে ফিরে যাওয়াকে এমন অপছন্দ করা, যেমন আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে।” (বুখারী ও মুসলিম)
ঈমানদার ব্যক্তিই প্রকৃত সফলকাম। সফলতার বহু উপকারিতার মধ্যে কয়েকটি নিচে তুলে ধরা হলঃ
১। ঈমানের কারণে মু'মিনের সকল কাজ সহজ হয়ে যায়। সে সব কাজে মহান আল্লাহর সাহায্য ও সহযোগিতা পেয়ে থাকে। আর আল্লাহ যার সাহায্য করেন, তাকে কে পরাজিত করতে পারে? তিনি বলেন, {وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا} “যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার কাজকে সহজ করে দেন।” (ত্বালাকঃ ৪)
আল্লাহ বলেন, {إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ} (٦٢) سورة الشعراء
“আমার সঙ্গে আমার প্রতিপালক রয়েছেন। তিনি আমাকে অবশ্যই পথ প্রদর্শন করবেন।” (শুআরাঃ ৬২)
আল্লাহ আরো বলেন, {وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ} (۳) سورة الطلاق
“এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।” (ত্বালাকঃ ৩)
আর আল্লাহ যার জন্য যথেষ্ট, সে তো সফলকাম হবেই। তার জীবন ধন্য হবে। সে পাবে তার প্রভুর সুরক্ষা ও অভিভাবকত্ব। মহান আল্লাহ বলেন, {اللّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُواْ يُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوُرِ} (٢٥٧) سورة البقرة
“আল্লাহ তাদের অভিভাবক যারা বিশ্বাস স্থাপন করে, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোকে নিয়ে যান।” (বাক্বারাহঃ ২৫৭)
অন্ধকার বলতে বহু কিছু বুঝানো যেতে পারে; যেমনঃ কুফরের অন্ধকার, ভ্রষ্টতার অন্ধকার, মূর্খতার অন্ধকার, মন-পূজার অন্ধকার, প্রবৃত্তিপূজার অন্ধকার, কুসংস্কারের অন্ধকার ইত্যাদি। ঈমানদারেরা এই সমস্ত অন্ধকার হতে মুক্ত। মহান আল্লাহ তাদেরকে এই সকল অন্ধকার থেকে বের ক’রে ঈমানের আলো, ইলমের আলো, হিদায়াতের আলো এবং সুন্নতের আলো দ্বারা আলোকিত করেছেন। আর যার জীবন ঈমানের আলোয় আলোকিত, সেই তো সফল মানুষ।
আর যারা আল্লাহকে অমান্যকারী, তারা আলোর পথে চলতে পারে না। তারা থাকে অন্ধকারে। সেই অন্ধকারের কারণে সত্য ও সরল পথ তাদের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় এবং তারা নানা ভুল পথে হেঁটে জীবনটাকে ধ্বংস ক'রে ফেলে।
{وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَوْلِيَاؤُهُمُ الطَّاغُوتُ يُخْرِجُونَهُم مِّنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَاتِ} “আর যারা অবিশ্বাস করে, তাদের অভিভাবক হল তাগূত। সে তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়।” (বাক্বারাহঃ ২৫৭)
তারা প্রকৃতিগতভাবে যে সত্যের আলো পেয়েছিল, সে আলোকে শয়তানরা কেড়ে নিয়ে তাদেরকে কুফরীর অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। ফলে তারা সত্যকে চিনতে পারে না, জানতে পারে না, বুঝতে পারে না এবং অনুসরণও করতে পারে না।
অবশ্য এ কথার অর্থ এমনও হতে পারে যে, তারা ইসলামে প্রবেশ করে আবার মুরতাদ হয়ে কুফরীতে ফিরে যায়। এর ফলে তারা ঈমানের আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে কুফরের অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যায়।
ঈমান দ্বারা মানুষ সম্মান লাভ করে থাকে। তিনি বলেন, {وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ} “ইয্যত-সম্মান তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মু'মিনদের জন্যই।” (মুনাফিকুনঃ ৮)
{فَلاَ تَهِنُوا وَلاَ تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ} (۱۳۹) سورة آل عمران
“আর তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না, তোমরাই হবে সর্বোপরি (বিজয়ী); যদি তোমরা মু’মিন হও।” (আলে ইমরানঃ ১৩৯)
{مَن كَانَ يُرِيدُ الْعِزَّةَ فَلِلَّهِ الْعِزَّةُ جَمِيعًا} “কেউ যদি সম্মান চায়, তবে সকল সম্মান তো আল্লাহরই।” (ফাত্বিরঃ ১০) অর্থাৎ সম্মান তো আল্লাহর হাতে। যে তাঁর আনুগত্য করবে, তিনি তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মানিত করবেন।
ঈমান মানুষের ঈমানদারের প্রতি ভালোবাসার সৃষ্টি করে। মহান আল্লাহ বলেন, {وَجَعَلْنَا بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً} “তিনি তোমাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” (রূমঃ ২১) অন্যত্র বলেন,
{وَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ لَوْ أَنفَقْتَ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعاً مَّا أَلَّفْتَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ أَلَّفَ بَيْنَهُمْ} (٦٣) سورة الأنفال
“(হে নবী!) তিনিই তোমাকে স্বীয় সাহায্য ও মু’মিনদের দ্বারা শক্তিশালী করেছেন এবং তিনি তাদের পরস্পরের হৃদয়ে প্রীতি স্থাপন করেছেন। তুমি যদি পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদও ব্যয় করতে, তবুও তাদের হৃদয়ে প্রীতি স্থাপন করতে পারতে না। কিন্তু আল্লাহই তাদের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করেছেন।” (আনফালঃ ৬২-৬৩)
ঈমানদারদের আল্লাহ তাআলা সুসংবাদ দিয়েছেন। আর এ সুসংবাদ উভয় জাহানের জন্য। তিনি বলেন, {وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ} “আর মু'মিনদেরকে সুসংবাদ দাও।” (বাক্বারাহঃ ২২৩)
{لَهُمُ الْبُشْرَى فِي الْحَياةِ الدُّنْيَا وَفِي الآخِرَةِ} (٦٤) سورة يونس
“তাদের জন্য সুসংবাদ রয়েছে পার্থিব জীবনে এবং পরকালেও।” (ইউনুসঃ ৬৪)
এই আয়াতে উল্লিখিত সুসংবাদ বলতে পার্থিব জীবনে উত্তম ও পবিত্র জীবন, আল্লাহর সন্তুষ্টি, নেককার লোকদের মহব্বত এবং ভালো স্বপ্ন। আর পরকালের সুসংবাদ বলতে জান্নাত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। আর এটা হল মহা সাফল্য।
ঈমানের ফলে দুনিয়া ও আখেরাতে নিরাপত্তা লাভ হয়। তিনি বলেন, {الَّذِينَ آمَنُواْ وَلَمْ يَلْبِسُواْ إِيمَانَهُم بِظُلْمٍ أُوْلَئِكَ لَهُمُ الأَمْنُ وَهُمْ مُّهْتَدُونَ} (۸۲) سورة الأنعام
“যারা ঈমান এনেছে এবং নিজ ঈমানকে যুলুম (শির্ক) দ্বারা কলুষিত করেনি, নিরাপত্তা তাদেরই জন্য এবং তারাই সৎপথপ্রাপ্ত।” (আনআমঃ ৮২)
এই নিরাপত্তা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জাহানেই। দুনিয়াতে এমন নয় যে, তাদেরকে কোন ভয় গ্রাস করে না। বরং ভয়ের সময় তারা হতাশ হয় না এবং আল্লাহর উপর ভরসা রেখে মানসিক শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করে। পরন্তু আল্লাহ তাদেরকে তাদের দুশমনদের উপর বিজয় দান করেন। আর আখেরাতে জাহান্নামের চিরস্থায়ী আযাব থেকে নিরাপত্তা লাভ করে থাকে। পক্ষান্তরে কাফেররা উভয় জগতে এই নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত।
মহান আল্লাহ বলেন, {وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُم فِي الأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لاَ يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا} (٥٥) سورة النور
“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে অবশ্যই প্রতিনিধিত্ব দান করবেন; যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য তাদের ধর্মকে---যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন---সুদৃঢ় করবেন এবং তাদের ভয় ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার উপাসনা করবে, আমার কোন অংশী করবে না।” (নূরঃ ৫৫)
আল্লাহ তাআলা মুমিনকে কুপ্রবৃত্তির তাড়না থেকে হিফাযত করেন। ফলে সে পাপকর্মে লিপ্ত হওয়া থেকে সুরক্ষিত থাকে। আর এ কথা সুস্পষ্ট যে, মানুষ যত বেশী পাপাচারে লিপ্ত হয়, তার জীবন তত বেশী সংকীর্ণ ও জটিল হয়ে যায় এবং সে তত বেশী অশান্তি ভোগ করে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি যত বেশী সৎ ও পুণ্যবান হয়, তার জীবন ততবেশী সুখময় ও শান্তিদায়ক হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, {فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلا يَضِلُّ وَلا يَشْقَى} (۱۲۳) سورة طه
“যে আমার পথনির্দেশ অনুসরণ করবে, সে বিপথগামী হবে না এবং দুঃখ-কষ্টও পাবে না।” (ত্বাহাঃ ১২৩)
আল্লাহ তাআলা ঈমানদারকে বিপদাপদ থেকে উদ্ধার করেন। যেমন তিনি তাঁর নবী ইউনুস (আঃ) কে মাছের পেট থেকে উদ্ধার করে বলেছিলেন,
{فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ نُنجِي الْمُؤْمِنِينَ} (۸۸) سورة الأنبياء
“অতঃপর আমি তার (ইউনুসের) ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিয়েছিলাম। আর এভাবেই আমি বিশ্বাসীদেরকে মুক্তি দিয়ে থাকি।” (আম্বিয়াঃ ৮৮)
ঈমানের ফলে মানুষ দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা লাভ করে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ} (١) سورة المؤمنون
“অবশ্যই মু’মিনরা সফলকাম হয়েছে।” (মু’মিনূনঃ ১)
ঈমানের ফলে মানুষ জান্নাত লাভ করবে, যা সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। মহান আল্লাহ বলেন, {وَالَّذِينَ آمَنُواْ وَعَمِلُواْ الصَّالِحَاتِ أُولَئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} (۸۲) سورة البقرة
“আর যারা ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে, তারাই জান্নাতের অধিবাসী হবে এবং সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।” (বাক্বারাহঃ ৮২)
ঈমানের ফলে মু’মিন ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে ধন্য হবে। মহান আল্লাহ বলেন, {وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ أَكْبَرُ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ} (۷۲) سورة التوبة
“আর আল্লাহর সন্তুষ্টি হচ্ছে সর্বাপেক্ষা বড় (নিয়ামত)। এটাই হচ্ছে অতি বড় সফলতা।” (তওবাহঃ ৭২)
ঈমান হল সমস্ত আমল কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত। ঈমান ছাড়া কোন আমলই কবুল হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
{وَمَن يَعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتِ مِن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُوْلَـئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلاَ يُظْلَمُونَ نَقِيراً} (١٢٤) سورة النساء
“পুরুষই হোক অথবা নারীই হোক, যে কেউ বিশ্বাসী হয়ে সৎকাজ করবে, তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি (খেজুরের অাঁটির পিঠে) বিন্দু পরিমাণও যুলুম করা হবে না।” (নিসাঃ ১২৪)
আল্লাহ তাআলা বলেন, {مَنْ عَمِلَ صَالِحاً مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُواْ يَعْمَلُونَ} (۹۷) سورة النحل
“পুরুষ ও নারী যে কেউই মু’মিন হয়ে সৎকর্ম করবে, তাকে আমি নিশ্চয়ই সুখী জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের কর্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।” (নাহলঃ ৯৭)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, {وَمَنْ أَرَادَ الآخِرَةَ وَسَعَى لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَئِكَ كَانَ سَعْيُهُم مَّشْكُوراً} (۱۹) سورة الإسراء
“আর যারা বিশ্বাসী হয়ে পরলোক কামনা করে এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে, তাদেরই চেষ্টা স্বীকৃত হয়ে থাকে।” (বানী ইসরাঈলঃ ১৯)
ঈমান ছাড়া কোন আমলই গ্রহণীয় নয়; যদিও তা ভাল আমল হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
{وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاء مَّنثُوراً} (۲۳) سورة الفرقان
“আমি তাদের কৃতকর্মের প্রতি লক্ষ্য করব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব।” (ফুরক্বানঃ ২৩) তিনি আরো বলেন,
{مَّثَلُ الَّذِينَ كَفَرُواْ بِرَبِّهِمْ أَعْمَالُهُمْ كَرَمَادٍ اشْتَدَّتْ بِهِ الرِّيحُ فِي يَوْمٍ عَاصِفٍ لاَّ يَقْدِرُونَ مِمَّا كَسَبُواْ عَلَى شَيْءٍ ذَلِكَ هُوَ الضَّلاَلُ الْبَعِيدُ} (۱۸) سورة إبراهيم
“যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে, তাদের উপমা হল, তাদের কর্মসমূহ ভস্মসদৃশ, যা ঝড়ের দিনে বাতাস প্রচন্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। যা তারা উপার্জন করে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারে না। এটাই তো ঘোর বিভ্রান্তি।” (ইব্রাহীমঃ ১৮)
অতএব জানা গেল যে, ঈমান ছাড়া নাজাত পাওয়া সম্ভব নয়। দুনিয়ার ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি কোন কিছুই কাজে আসবে না। মহান আল্লাহ বলেন, {يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ (۸۸) إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ} (۸۹) سورة الشعراء
“যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে না; সে দিন উপকৃত হবে কেবল সে, যে আল্লাহর নিকট সুস্থ অন্তঃকরণ নিয়ে উপস্থিত হবে।” (শুআরাঃ ৮৮-৮৯)
আর সুস্থ অন্তঃকরণ হল, শিরক-বিদআত এবং পাপ ও সন্দিগ্ধতা থেকে পবিত্র অন্তঃকরণ।
ঈমান, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। ঈমানের একটি ক্ষুদ্রতম অংশ, যার অন্তরে বিদ্যমান থাকবে সেও এক সময় জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
ঈমানের মর্যাদা ও উপকারিতা অপরিসীম। ঈমান মানুষের ইহকাল ও পরকালের সৌভাগ্যের চাবিকাঠি। ঈমানের কল্যাণেই একজন মানুষ দুনিয়াতে উন্নত ও সুন্দর জীবন-যাপন করে এবং পরকালেও লাভ করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও চিরশান্তির জায়গা জান্নাত।
📄 প্রাণরক্ষার সফলতা
মহান সৃষ্টিকর্তা সারা সৃষ্টি রচনার পর মানব সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য। তাঁর সেই উদ্দেশ্য সফল হতে হলে অবশ্যই মানবের প্রাণ রক্ষার অতি প্রয়োজন আছে, প্রয়োজন আছে তার বংশ রক্ষার।
প্রাণই তো আসল। তা না হলে ঈমান-জ্ঞান-মান-ধন কিসের ভিত্তিতে অবশিষ্ট থাকবে? সুতরাং প্রাণ রক্ষার তাকীদে বিধান এসেছে ইসলামে।
{مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ كَتَبْنَا عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنَّهُ مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الأرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا وَلَقَدْ جَاءَتْهُمْ رُسُلُنَا بِالبَيِّنَاتِ ثُمَّ إِنَّ كَثِيرًا مِّنْهُم بَعْدَ ذَلِكَ فِي الْأَرْضِ لَمُسْرِفُونَ} (۳۲) سورة المائدة
"এ কারণেই বনী ইস্রাঈলের প্রতি এ বিধান দিলাম যে, যে ব্যক্তি নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করার দন্ডদান উদ্দেশ্য ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষকেই হত্যা করল। আর কেউ কারো প্রাণরক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করল। তাদের নিকট তো আমার রসূলগণ স্পষ্ট প্রমাণ এনেছিল, কিন্তু এর পরও অনেকে পৃথিবীতে সীমালংঘনকারীই রয়ে গেল।” (মায়িদাহঃ ৩২)
মহানবী বলেছেন, لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّى رَسُولُ اللَّهِ إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ الثَّيِّبُ الزَّانِ وَالنَّفْسُ بِالنَّفْسِ وَالتَّارِكُ لِدِينِهِ الْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ .. "তিন ব্যক্তি ছাড়া 'আল্লাহ ব্যতীত কেউ সত্য উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর রসূল' এ কথায় সাক্ষ্যদাতা কোন মুসলিমের খুন (কারো জন্য) বৈধ নয়; বিবাহিত ব্যভিচারী, খুনের বদলে হত্যাযোগ্য খুনী এবং দ্বীন ও জামাআত ত্যাগী।” (বুখারী ৬৮-৭৮, মুসলিম ৪৪৬৮-৪৪৭০নং আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ)
একান্ত অনিবার্য কারণ ব্যতীত মায়ের পেটে ভ্রূণ হত্যা করাও নিষিদ্ধ ইসলামে। প্রাণ ও দ্বীন বাঁচানোর তাকীদেই জিহাদ ফরয করা হয়েছে ইসলামে। যেমন খুনের বদলে খুন (কিস্বাস) এ রয়েছে মানুষের জীবন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ يَا أُولِي الأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ} (۱۷۹) سورة البقرة "হে বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! তোমাদের জন্য ক্বিস্বাসে (প্রতিশোধ গ্রহণের বিধানে) জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা সাবধান হতে পার।” (বাক্বারাহঃ ১৭৯)
জীবনের ব্যথা-বেদনা যতই হোক, আত্মহত্যাকে ইসলাম বৈধ করেনি। যেহেতু প্রাণ দেওয়ার ক্ষমতা যার নেই, প্রাণ নষ্ট করার অধিকারও তার নেই।
মহানবী বলেছেন,
((مَنْ تَرَدَّى مِنْ جَبَلٍ فَقَتَلَ نَفْسَهُ فَهُوَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ يَتَرَدَّى فِيهِ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا وَمَنْ تَحَسَّى سُمَّا فَقَتَلَ نَفْسَهُ فَسُمُّهُ فِي يَدِهِ يَتَحَسَّاهُ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا وَمَنْ قَتَلَ نَفْسَهُ بِحَدِيدَةٍ فَحَدِيدَتُهُ فِي يَدِهِ يَجَأْ بِهَا فِي بَطْنِهِ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا)).
“যে ব্যক্তি কোন পাহাড় হতে নিজেকে ফেলে আত্মহত্যা করবে, সে ব্যক্তি জাহান্নামেও সর্বদা ও চিরকালের জন্য নিজেকে ফেলে অনুরূপ শাস্তিভোগ করবে। যে ব্যক্তি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করবে, সে ব্যক্তি জাহান্নামেও সর্বদা চিরকালের জন্য বিষ পান করে যাতনা ভোগ করবে। আর যে ব্যক্তি কোন লৌহখন্ড (ছুরি ইত্যাদি) দ্বারা আত্মহত্যা করবে, সে ব্যক্তি জাহান্নামেও ঐ লৌহখন্ড দ্বারা সর্বদা ও চিরকালের জন্য নিজেকে আঘাত করে যাতনা ভোগ করতে থাকবে।” (বুখারী ৫৭৭৮, মুসলিম ৩/১৩নং প্রমুখ)
প্রাণ রক্ষার তাকীদেই এমন সকল জিনিস ভক্ষণ নিষিদ্ধ হয়েছে ইসলামে যার ফলে বিলম্বে বা অবিলম্বে মানুষকে মরণের দিকে টেনে নিয়ে যায়। মাদকদ্রব্যাদি সেবন নিষিদ্ধ হওয়ার অন্যতম কারণ হল প্রাণ বাঁচানোর পরোক্ষ তাকীদ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا} (২৯) سورة النساء "তোমরা আত্মহত্যা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।" (নিসাঃ ২৯)
প্রাণকে হিফাযত করার তাকীদেই ইসলাম মুসলিমকে সংক্রামক ব্যধিগ্রস্ত রোগীর কাছে যেতে বারণ করে। মহানবী বলেছেন,
...... وَفِرَّ مِنْ الْمَجْدُّومِ كَمَا تَفِرُّ مِنْ الْأَسَدِ)). "তোমরা কুষ্ঠরোগী হতে দূরে থেকো; যেমন বাঘ হতে দূরে পলায়ন কর।” (বুখারী ৫৭০৭নং)
তিনি আরো বলেছেন,
((لَا يُورِدَنَّ مُمْرِضْ عَلَى مُصِح)). "চর্মরোগাক্রান্ত উটের মালিক যেন সুস্থ উট দলে তার উট না নিয়ে যায়।” (বুখারী ৫৭৭১, মুসলিম ৫৯২২নং)
আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ} (১৯৫) سورة البقرة "তোমরা নিজেরা নিজেদের সর্বনাশ করো না।” (বাক্বারাহঃ ১৯৫)
ব্যভিচার নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে যেমন রয়েছে সম্ভ্রম বাঁচানোর তাকীদ, তেমনিই তাতে রয়েছে প্রাণ বাঁচানোর তাকীদ। যেহেতু তাতে নানা সর্বনাশী রোগ হয়।
তালাক ও বৈধব্যের জন্য ইদ্দত পালনে রয়েছে তারই তাকীদ। নচেৎ সাথে সাথে বিবাহ ও স্বামী-সহবাস হলে নারীর ক্ষতির আশঙ্কা আছে।
মহিলার জন্য একাধিক স্বামী নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে রয়েছে তারই তাকীদ। অনেকটা যেন কম্পিউটারের মতো; তার ইউএসবিতে অপরিচিত ফ্লাশ দিলেই ভাইরাস-আক্রান্ত হয়!
প্রাণ রক্ষার তাকীদেই ইসলাম নিষিদ্ধ বস্তু ভক্ষণ করাকেও বৈধতা দান করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَا لَكُمْ أَلا تَأْكُلُوا مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللهِ عَلَيْهِ وَقَدْ فَصَّلَ لَكُم مَّا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ إِلَّا مَا اضْطُرِرْتُمْ إِلَيْهِ وَإِنَّ كَثِيرًا لَّيُضِلُّونَ بِأَهْوَائِهِم بِغَيْرِ عِلْمٍ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِالْمُعْتَدِينَ}
"তোমাদের কী হয়েছে যে, যার যবেহকালে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে, তোমরা তা ভক্ষণ করবে না? অথচ তোমরা নিরুপায় না হলে যা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ, তা তিনি বিশদভাবেই তোমাদের নিকট বিবৃত করেছেন। অনেকে অজ্ঞানতাবশতঃ নিজেদের খেয়াল-খুশী দ্বারা অবশ্যই অন্যকে বিপথগামী করে। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক সীমা লংঘনকারীদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।” (আনআমঃ ১১৯)
{إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَالدَّمَ وَلَحْمَ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ بِهِ لِغَيْرِ اللَّهِ فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغِ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ} (۱۷۳) سورة البقرة
"নিশ্চয় (আল্লাহ) তোমাদের জন্য শুধু মৃত জীব, রক্ত, শূকরের মাংস এবং যে সব জন্তুর উপরে (যবেহ কালে) আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম উচ্চারণ করা হয়ে থাকে তা তোমাদের জন্য অবৈধ করেছেন। কিন্তু যে অনন্যোপায় অথচ অন্যায়কারী কিংবা সীমালংঘনকারী নয়, তার কোন পাপ হবে না। আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।” (বাক্বারাহঃ ১৭৩)
কেবল প্রাণ রক্ষাই বিরাট সাফল্য নয়। বরং সুস্থ ও নিরাপদ জীবন লাভ করাই বিরাট সাফল্য。
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, مَنْ أَصْبَحَ مِنْكُمْ آمِنًا فِي سِرْبهِ مُعَافَى فِي جَسَدِهِ عِنْدَهُ قُوتُ يَوْمِهِ فَكَأَنَّمَا حِيزَتْ لَهُ الدُّنْيَا (بحذافيرها).
“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার ঘরে অথবা গোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপদে ও সুস্থ শরীরে সকাল করেছে এবং তার কাছে প্রতি দিনের খাবার আছে, তাকে যেন পার্থিব সমস্ত সম্পদ দান করা হয়েছে।” (তিরমিযী ২৩৪৬, ইবনে মাজাহ ৪১৪১নং)
নিরাপদ জীবন না হলে, সে জীবনের সুখ কোথায়? নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়, এমন জীবনের সাফল্য কোথায়? তাই প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যে অন্য মুসলিমকে নিরাপদে বাস করতে দেয়। মহানবী বলেছেন,
((أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِالْمُؤْمِنِ؟ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ عَلَى أَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ، وَالْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ، وَالْمُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ فِي طَاعَةِ اللَّهِ، وَالْمُهَاجِرُ مَنْ هَجَرَ الْخَطَايَا وَالذُّنُوبَ)).
"আমি কি তোমাদেরকে 'মুমিন' কে---তা বলে দেব না? (প্রকৃত মুমিন হল সেই), যার (অত্যাচার) থেকে লোকেরা নিজেদের জান-মালের ব্যাপারে নিরাপত্তা লাভ করতে পারে। (প্রকৃত) মুসলিম হল সেই ব্যক্তি, যার জিব ও হাত হতে লোকেরা শান্তি লাভ করতে পারে। (প্রকৃত) মুজাহিদ হল সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর আনুগত্য করতে নিজের মনের বিরুদ্ধে জিহাদ করে। আর (প্রকৃত) মুহাজির (হিজরতকারী) হল সেই ব্যক্তি, যে সমস্ত পাপাচরণকে হিজরত (বর্জন) করে।” (আহমাদ ৬/২১, হাকেম ২৪, ত্বাবারানী ১৫১৯১, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান, সিলসিলাহ সহীহহাহ ৫৪৯নং)
প্রাণটা রক্ষা না পেলে ঈমানই বা থাকবে কোত্থেকে? জ্ঞান, মান, ধনই বা আসবে কোন কাজে?
উল্লেখ্য যে, দীর্ঘ জীবন লাভ করাই সাফল্য নয়। সাফল্য হল কল্যাণময় নিরাপদ দীর্ঘ জীবন লাভ করা। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
(( خَيْرُ النَّاسِ مَنْ طَالَ عُمُرهُ ، وَحَسُنَ عَمَلُهُ )).
"সর্বোত্তম মানুষ সেই ব্যক্তি, যার বয়স দীর্ঘ হয় এবং আমল সুন্দর হয়।” (তিরমিযী ২৩২৯নং)