📄 আবু তালিব মৃত্যুর সময়ও ইসলাম গ্রহণ করেননি
[৩৭১.] সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, 'আবূ তালিবের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে, আল্লাহর রাসূল তার কাছে এসে দেখেন-আবূ জাহল ও আবদুল্লাহ ইবনু আবী উমাইয়া ইবনিল মুগীরা [৫] সেখানে উপস্থিত। তখন আল্লাহর রাসূল বলেন-
يَا عَمَّ قَلْ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، كَلِمَةً أَشْهَدُ لَكَ بِهَا عِنْدَ اللَّهِ
"চাচা! [১] আপনি বলুন-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ্ নেই)। এ-কথার ভিত্তিতে আমি আল্লাহর কাছে আপনার পক্ষে সাক্ষ্য দেবো। [২] [৩] [৪]"
এ-কথা শুনে আবূ জাহল ও আবদুল্লাহ ইবনু আবী উমাইয়া বলেন, "আবূ তালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের রীতিনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে?!” এরপর আল্লাহর রাসূল তার সামনে সেই কালিমা পেশ করতে থাকেন, আর সেও সেই কথার পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। [৬] [৭] একপর্যায়ে আবূ তালিব তার শেষ কথা তাদের জানিয়ে দেন যে, তিনি আবদুল মুত্তালিবের রীতিনীতির ওপরই অটল আছেন [৮], এবং তিনি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলতে অস্বীকৃতি জানান। [৯] তখন আল্লাহর রাসূল বলেন-
أَمَا وَاللَّهِ، لَأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ مَا لَمْ أَنْهَ عَنْكَ
"শপথ আল্লাহর! আমি আপনার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে যাব, যতক্ষণ-না আমাকে আপনার ব্যাপারে [১০] নিষেধ করা হচ্ছে।"
এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা নাযিল করেন-
(مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ)
"নবি ও ঈমানদারদের জন্য শোভনীয় নয় যে-তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করবে, এরা নিকটাত্মীয় হলেও, যখন তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে-এরা জাহান্নামী।” (সূরা আত-তাওবা ১১৩) [১]
আল্লাহ তাআলা আবু তালিব সম্পর্কে আয়াত নাযিল করে রাসূলুল্লাহ -কে বলেন-
(إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ)
"তুমি যাকে পছন্দ করো, তাকে হিদায়াত দিতে পারবে না, তবে আল্লাহ যাকে চান তাকে হিদায়াত দেন; কারা হিদায়াত লাভের উপযুক্ত, তা তিনি ভালো জানেন।” (সূরা আল-কাসাস ৫৬)'
মুসলিম ১৩২/৩৯ (২৪), ১৩৩/৪০ (...), ১৩৪/৪১ (২৫), ১৩৫/৪২ (...); বুখারি ১৩৬০, ৩৮৮৪, ৪৬৭৫, ৪৭৭২, ৬৬৮১; তিরমিযি ৩১৮৮; নাসাঈ ২০৩৫; আহমাদ ২/৪৩৪ (৯৬১০), ৫/৪৩৩ (২৩৬৭৪); নাসাঈ, কুবরা ২১৭৩; আবূ আওয়ানা ২২, ২৩, ২৪; আবদুর রাযযাক, তাফসীর ১/২৮৮; তাবারি, তাফসীর ১১/৪১, ১১/৪২, ২০/৯২; তাবারানি, কাবীর ২০/৩৪৯ (৮২০); তাবারানি, মুসনাদুশ শামিয়্যীন ৪/১৭৩ (৩০৩৩); ইবনু হিব্বান ৩/২৬২-২৬৩ (৯৮২), ১৪/১৬৭ (৬২৭০); ইবনু আবী আসিম, আহাদ ২/৪২ (৭২০), ২/৪৩ (৭২১); ইবনু মানদাহ, ঈমান ৩৭, ৩৮, ৩৯; বাইহাকি, দালাইল ২/৩৪২-৩৪, ২/৩৪৩, ২/৩৪৪, ২/৩৪৪-৩৪৫; ওয়াহিদি ৫৩০, ৬৬১, ৬৬২; ইবনু সাদ ১/১২২; তহাভি, শারহু মুশকিল ৬/২৮৩-২৮৪ (২৪৮৪), ৬/২৮৪ (২৪৮৫), ৬/২৮৫ (২৪৮৬); বাগাবি, শারহুস সুন্নাহ ১২৭৪।
টিকাঃ
[৫] 'তারা দুজনও' (মুসলিম ১৩৩/৪০ (...))।
[১] إِنَّكَ أَعْظَمُ النَّاسِ عَلَيَّ حَقًّا، وَأَحْسَنُهُمْ عِنْدِي يَدًا، وَلَأَنْتَ أَعْظَمُ عَلَيَّ حَقًّا مِنْ وَالِدِي، فَقُلْ كَلِمَةً تَجِبُ لِي بِهَا الشَّفَاعَةُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ “আপনি আমার কাছে সবচেয়ে বেশি অধিকার রাখেন, আপনিই আমার সর্বোত্তম শক্তি, আর আমার ওপর আপনার অধিকার আমার পিতার চেয়েও বেশি; সুতরাং এমন একটি বাক্য বলুন যার ভিত্তিতে কিয়ামাতের দিন (আপনার জন্য) সুপারিশ করা আমার ওপর বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে।” (তাবারি, তাফসীর ১১/৪২)।
[২] مَعِي "আমার সঙ্গে সঙ্গে” (ওয়াহিদি ৫৩০)।
[৩] يَوْمَ الْقِيَامَةِ “কিয়ামাতের দিন” (আহমাদ ২/৪৩৪ (১৯১০))।
[৪] أَحَاجُّ "যুক্তি-প্রমাণ পেশ করব” (বুখারি ৩৮৮৪); أَشْفَعُ "সুপারিশ করব” (ইবনু হিববান ১৪/১৬৭ (৬২৭০))।
[৬] 'আল্লাহর রাসূল তার সামনে সেই কালিমা পেশ করে বলতে থাকেন- يَا عَمَّ قُلْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ أَشْهَدْ لَكَ بِهَا عِنْدَ اللَّهِ “চাচা! বলুন-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, তা হলে এর ভিত্তিতে আমি আল্লাহর কাছে আপনার পক্ষে সাক্ষ্য দেবো।" আর তারাও বলতে থাকে, "আবূ তালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের রীতিনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে?!" (ইবনু সাদ ১/১২২)।
[৭] 'আবূ তালিব বলেন, "(ভাতিজা!) কুরাইশ (নারীরা) আমাকে এ-কথা বলে তিরস্কার করবে-সে (মৃত্যুর) ভয়ে এ কাজ করেছে! এ-আশঙ্কা না থাকলে আমি এ বাক্য বলে তোমার চোখ শীতল করে দিতাম।” (মুসলিম ১৩৫/৪২ (...); তাবারি ২০/১২; ইবনু হিব্বান ১৪/১৬৭ (৬২৭০); ইবনু মানদাহ, ঈমান ৩৮)।
[৮] 'আবূ তালিবের সর্বশেষ কথা ছিল "আমি আবদুল মুত্তালিবের রীতিনীতির অনুসারী” (ইবনু সাদ ১/১২২)।
[৯] 'এরপর তিনি মারা যান' (ইবনু সাদ ১/১২২); 'তিনি কাফির অবস্থায় মারা যান।' (বাইহাকি ২/৩৪২-৩৪২)।
[১০] عَنْهُ "এ-ব্যাপারে” (বুখারি ৩৮৮৪)।
[১] 'আবূ তালিবের মৃত্যুর পর এ-আয়াত নাযিল হওয়ার আগ-পর্যন্ত আল্লাহর রাসূল তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেন-' (ইবনু সাদ ১/১২২)।
📄 তবে, নবি ﷺ-এর সঙ্গে সুসম্পর্কের ওসিলায় তার শাস্তি কিছুটা কমানো হয়েছে
[৩৭২,] [উম্মু সালামা থেকে বর্ণিত, 'বিদায় হজের বছর হারিস ইবনু হিশাম নবি -এর কাছে এসে বলেন,
"আল্লাহর রাসূল! আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো আচরণ করা, ইয়াতীমকে আশ্রয় দেওয়া, মেহমানকে আপ্যায়ন করা, অভাবী লোকদের খাবার খাওয়ানো-এসব কাজ আমি করে চলেছি [১]। আর এ সবগুলোই করতেন হিশাম ইবনুল মুগীরা। [৪] আল্লাহর রাসূল, তার (পরিণতি) সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?"
নবি বলেন-
(كُلُّ قَبْرٍ لَا يَشْهَدُ صَاحِبُهُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ فَهُوَ حَذْوَةٌ مِنَ النَّارِ، وَقَدْ وَجَدْتُ عَنِّي أَبَا طَالِبٍ فِي طَمُطَامٍ مِنَ النَّارِ فَأَخْرَجَهُ اللهُ بِمَكَانِهِ مِنِّي وَإِحْسَانِهِ إِلَيَّ فَجَعَلَهُ فِي ضَحْضَاحِ مِنَ النَّارِ
"যে-কবরের বাসিন্দা এ-সাক্ষ্য দেয়নি যে-আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ্ নেই, সে জাহান্নামের একটি জ্বলন্ত লাকড়ি। আমার চাচা আবূ তালিবকে দেখেছিলাম জাহান্নামের মাঝখানে; আমার সঙ্গে তার সম্পর্ক ও আমার প্রতি তার সদাচরণ-এসবের ভিত্তিতে আল্লাহ তাকে সেখান থেকে বের করে এনে, জাহান্নামের অগভীর অংশে রেখেছেন।"'
তাবারানি, কাবীর ২৩/৪০৫ (৯৭২), বর্ণনাসূত্রের আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি আকীলের হাদীস মুনকার, মুহাদ্দিসগণ তার হাদীস দিয়ে প্রমাণ পেশ করেন না, তবে (কারও কারও পক্ষ থেকে) তাকে বিশ্বস্ত আখ্যায়িত করা হয়েছে (হাইসামি), হাইসামি একাধিকবার তার হাদীসকে হাসান বলেছেন (দারানি); তাবারানি, আওসাত ৫/২১৭ (৭৩৮৯); কানযুল উম্মাল ১২/১৫১ (৩৪৪৩৬); মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১১৮ (৪৭১)।
টিকাঃ
[১] 'বিদায় হজের বছর হারিস ইবনু হিশাম নবি -এর কাছে এসে বলেন' (তাবারানি, আওসাত ৫/২৯৭ (৭৩৮৯))।
[২] নবি -এর স্ত্রী (তাবারানি, আওসাত ৫/২১৭ (৭৩৮৯))।
[৩] 'একবার' (তাবারানি, আওসাত ৫/২৯৭ (৭৩৮৯))।
[৪] "আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো আচরণ করা, ইয়াতীমকে আশ্রয় দেওয়া, মেহমানকে আপ্যায়ন করা, অভাবী লোকদের খাবার খাওয়ানো-এসব কাজে আপনি উৎসাহ দিয়ে থাকেন। এ সবগুলোই হিশাম ইবনুল মুগীরা পালন করতেন।” (তাবারানি, আওসাত ৫/২৯৭ (৭৩৮৯))।
📄 হাতিম তাই
[৩৭৩.] সাহল ইবনু সাদ সাইদি বলেন, 'আদি ইবনু হাতিম আল্লাহর রাসূল-এর কাছে এসে বলেন, "আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন, অসহায় লোকদের বোঝা কাঁধে তুলে নিতেন, (মানুষকে) খাবার খাওয়াতেন [১]।” নবি বলেন, هَلْ أَدْرَكَ الْإِسْلَامَ "তিনি কি ইসলামের নাগাল পেয়েছিলেন?" আদি বলেন, “না।” নবি বলেন-
إِنَّ أَبَاكَ كَانَ يُحِبُّ أَنْ يُذْكَرَ فَذُكِرَ
"তোমার পিতা (লোকমুখে) আলোচিত হতে চেয়েছিলেন, ইতোমধ্যে তিনি আলোচিত হয়ে গিয়েছেন [২]।”
তাবারানি, কাবীর ৬/১৯৭ (৫৬৮৭), বর্ণনাসূত্রে রিশদীন ইবনু সাদ পরিত্যাজ্য (হাইসামি), ১৭/১০৪ (২৫০); আহমাদ ৪/২৫৮ (১৮২৬২, প্রথম অংশ), হাসান (আরনাউত); বাযযার (কাশফ) ১/৬৪ (৯২); কানযুল উম্মাল ৬/৪৫১ (১৬৪৯৫, ১৬৪৯৬), ১৪/৩৫ (৩৭৮৬৭); মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১১৯ (৪৭৪, ৪৭৫, ৪৭৬)।
টিকাঃ
[১] "আর এই এই কাজ করতেন” (তাবারানি, কাবীর ১৭/১০৪ (২৫০))।
[২] إِنَّ أَبَاكَ أَرَادَ أَمْرًا، فَأَدْرَكَهُ "তোমার পিতা একটি জিনিস চেয়েছিলেন, আর তিনি তা পেয়ে গিয়েছেন।” অর্থাৎ তিনি আলোচিত হতে চেয়েছিলেন। (তাবারানি, কাবীর ১৭/১০৪ (২৫০)); ذَاكَ رَجُلٌ أَرَادَ أَمْرًا فَأَدْرَكَهُ "তিনি এমন এক ব্যক্তি, যিনি যা চেয়েছিলেন তা পেয়ে গিয়েছেন।” (বাযযার (কাশফ) ১/৬৪ (৯২))।
📄 আমির দব্বি
[৩৭৪.] সালমান ইবনু আমির দব্বি বলেন, 'আমি নবি -এর কাছে এসে বলি, "আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতেন, মেহমানদের আপ্যায়ন করতেন, এবং কোনোকিছুর দায়িত্ব পেলে তা সুন্দরভাবে পালন করতেন।” নবি বলেন, وَلَمْ يُدْرِكِ الْإِسْلَامَ "তবে তিনি ইসলামের (যুগ) নাগাল পাননি [১]?” তিনি বলেন, “না।” আমি ফেরার জন্য রওয়ানা হলে, তিনি বলেন عَلَيَّ بِالشَّيْخِ "বয়স্ক লোকটিকে ডাকো।” (এরপর) তিনি বলেন-
يَكُوْنُ ذَلِكَ فِي عَقِبِكَ، فَلَنْ يَذِلُّوا أَبَدًا، وَلَنْ يَفْقُرُوْا أَبَدًا
"তিনি তোমার পেছনে থাকবেন, ফলে তারা কখনও অপদস্থ হবে না, নিঃস্বও হবে না।"
তাবারানি, কাবীর ৬/২৭৬ (৬২১৩), বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত (হাইসামি), ইসনাদটি হাসান (দারানি); বুখারি, তারীখ ৪/১৩৬; মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১১৯ (৪৭৭)।
টিকাঃ
[১] "তিনি ইসলামের (যুগ শুরু হওয়ার) আগে মারা গিয়েছেন।” (বুখারি, তারীখ ৪/১৩৬)।