📘 সবার ওপরে ঈমান > 📄 নবি ﷺ-এর একটি স্বপ্ন

📄 নবি ﷺ-এর একটি স্বপ্ন


[৩২৪.] আবূ উমামা বাহিলি বলেন, 'ফজরের নামাজের পর আল্লাহর রাসূল বেরিয়ে আমাদের কাছে এসে বলেন-

إِنِّي رَأَيْتُ رُؤْيَا هِيَ حَقٌّ فَاعْقِلُوهَا أَتَانِي رَجُلٌ فَأَخَذَ بِيَدِي، فَاسْتَتْبَعَنِي حَتَّى أَتَى بِي جَبَلًا طَوِيلًا وَعْرًا، فَقَالَ لِي: ارْقَهُ، فَقُلْتُ: لَا أَسْتَطِيعُ، فَقَالَ: إِنِّي سَأُسَهِّلُهُ لَكَ، فَجَعَلْتُ كُلَّمَا رَقِيَتْ قَدَمَيَّ وَضَعْتُهَا عَلَى دَرَجَةٍ، حَتَّى اسْتَوَيْنَا عَلَى سَوَاءِ الْجَبَلِ فَانْطَلَقْنَا فَإِذَا نَحْنُ بِرِجَالٍ وَنِسَاءٍ مُشَقَّقَةٍ أَشْدَاقُهُمْ، فَقُلْتُ: مَنْ هَؤُلَاءِ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ الَّذِينَ يَقُولُونَ مَا لَا يَعْلَمُونَ
ثُمَّ انْطَلَقْنَا فَإِذَا نَحْنُ بِرِجَالٍ وَنِسَاءٍ مُسَمَّرَةٍ أَعْيُنُهُمْ وَآذَانُهُمْ قُلْتُ: مَا هَؤُلَاءِ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ الَّذِينَ يَرُونَ أَعْيُنَهُمْ مَا لَا يَرَوْنَ، وَيُسْمِعُونَ آذَانَهُمْ مَا لَا يَسْمَعُونَ ثُمَّ انْطَلَقْنَا فَإِذَا نَحْنُ بِنِسَاءٍ مُعَلَّقَاتٍ بِعَرَاقِيبِهِنَّ، مُصَوَّبَةٍ رُءُوسُهُنَّ، تَنْهَشُ تُدْيَانَهُنَّ الْحَيَّاتُ قُلْتُ: مَا هَؤُلَاءِ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ الَّذِينَ يَمْنَعُونَ أَوْلَادَهُنَّ مِنْ أَلْبَانِهِنَّ، ثُمَّ انْطَلَقْنَا فَإِذَا نَحْنُ بِرِجَالٍ وَنِسَاءٍ مُعَلَّقَاتٍ بِعَرَاقِيبِهِنَّ، مُصَوَّبَةٍ رُءُوسُهُنَّ، يَلْحَسْنَ مِنْ مَاءٍ قَلِيلٍ وَحَمَا، قُلْتُ: مَا هَؤُلَاءِ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ الَّذِينَ يَصُومُونَ وَيُفْطِرُونَ قَبْلَ تَحِلَّةِ صَوْمِهِمْ ثُمَّ انْطَلَقْنَا فَإِذَا نَحْنُ بِرِجَالٍ وَنِسَاءٍ أَقْبَح شَيْءٍ مَنْظَرًا، وَأَقْبَحِهِ لَبُوسًا، وَأَنْتَنِهِ رِيحًا، كَأَنَّمَا رِيحُهُمُ الْمَرَاحِيضُ. قُلْتُ: مَا هَؤُلَاءِ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ الزَّانُونَ وَالزُّنَاةُ
ثُمَّ انْطَلَقْنَا فَإِذَا نَحْنُ بِمَوْتَى أَشَدَّ شَيْءٍ انْتِفَانًا، وَأَنْتَنِهِ رِيحًا، قُلْتُ: مَا هَؤُلَاءِ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ مَوْتَى الْكُفَّارِ
ثُمَّ انْطَلَقْنَا فَإِذَا نَحْنُ نَرَى دُخَانًا وَنَسْمَعُ عُوَاءً. قُلْتُ: مَا هَذَا؟ قَالَ: هَذِهِ جَهَنَّمُ فَدَعْهَا، ثُمَّ انْطَلَقْنَا فَإِذَا نَحْنُ بِرِجَالٍ نِيَامٍ تَحْتَ ظِلَالِ الشَّجَرِ. قُلْتُ: مَا هَؤُلَاءِ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ مَوْتَى الْمُسْلِمِينَ ثُمَّ انْطَلَقْنَا فَإِذَا نَحْنُ بِجَوَارٍ وَغِلْمَانٍ يَلْعَبُونَ بَيْنَ نَهْرَيْنِ. قُلْتُ: مَا هَؤُلَاءِ؟ قَالَ: ذُرِّيَّةُ الْمُؤْمِنِينَ,
ثُمَّ انْطَلَقْنَا فَإِذَا نَحْنُ بِرِجَالٍ أَحْسَنِ شَيْءٍ وَجْهَا، وَأَحْسَنِهِ لَبُوسًا، وَأَطْيَبِهِ رِيحًا، كَأَنَّ وُجُوهَهُمُ الْفَرَاطِيسُ قُلْتُ: مَا هَؤُلَاءِ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ الصِّدِّيقُونَ وَالشُّهَدَاءُ وَالصَّالِحُونَ ثُمَّ انْطَلَقْنَا فَإِذَا نَحْنُ بِثَلَاثَةِ نَفَرٍ يَشْرَبُونَ خَمْرًا وَيُغَنُّونَ، فَقُلْتُ: مَا هَؤُلَاءِ؟ قَالَ: ذَاكَ زَيْدُ بْنُ حَارِئَةً، وَجَعْفَرُ، وَابْنُ رَوَاحَةَ، فَمِلْتُ قِبَلَهُمْ، فَقَالُوا: قَدْ نَالَكَ، قَدْ نَالَكَ، ثُمَّ رَفَعْتُ رَأْسِي فَإِذَا بِثَلَاثَةِ نَفَرٍ تَحْتَ الْعَرْشِ قُلْتُ: مَا هَؤُلَاءِ؟ قَالَ: ذَاكَ أَبُوكَ إِبْرَاهِيمُ، وَمُوسَى، وَعِيسَى، وَهُمْ يَنْتَظِرُونَكَ - صَلَوَاتُ اللهِ عَلَيْهِمْ أَجْمَعِينَ

"আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি, স্বপ্নটি সত্য, ভালো করে বুঝে নাও- একব্যক্তি [১] এসে আমার হাতায় ধরে [২] আমাকে তার পেছনে পেছনে যেতে বলেন। একপর্যায়ে আমাকে নিয়ে একটা উঁচু দুর্গম পাহাড়ের কাছে এসে আমাকে বলেন, 'এর ওপর ওঠুন।' আমি বলি, 'আমার পক্ষে সম্ভব নয়। [৩] তিনি বলেন, 'আপনার জন্য সহজে ওঠার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।' প্রত্যেকবার দু পা উঠিয়ে একটা স্তরে গিয়ে পা নামাতে থাকি। এভাবে একপর্যায়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে যাই।

এরপর চলতে চলতে কিছু পুরুষ ও নারীর কাছে গিয়ে হাজির হই, যাদের মুখের চোয়াল ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে [৩]। আমি বলি, 'এরা কারা?' তিনি বলেন, 'এরা সেসব লোক, যারা যা জানে না, তা বলে বেড়ায়।'

এরপর চলতে চলতে কিছু পুরুষ ও নারীর কাছে পৌঁছুই, যাদের চোখ ও কানে পেরেক ঠুকানো হচ্ছে। আমি বলি, 'এরা কারা?' তিনি বলেন, 'এরা সেসব লোক, যারা নিজেদের চোখকে তা দেখায়, যা তাদের দেখার কথা না, আর নিজেদের কানকে তা শোনায়, যা তাদের শোনার কথা না।'

এরপর চলতে চলতে কিছু নারীর কাছে উপস্থিত হই, যাদের মাথা নিচু করে হাঁটুর পেছনের তন্তর সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, আর তাদের স্তনগুলোতে সাপ দংশন করছে [১]। আমি বলি, 'এগুলো কী?' [২] তিনি বলেন, 'এরা সেসব নারী, যারা তাদের বুকের দুধ থেকে নিজেদের সন্তানদের বঞ্চিত রাখে।'

এরপর চলতে চলতে কিছু পুরুষ ও নারীর কাছে উপস্থিত হই, যাদের মাথা নিচু করে হাঁটুর পেছনের তন্তুর সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, আর তারা অল্প কিছু কাদাযুক্ত পানি চেটে চেটে খাচ্ছে। আমি বলি, 'এগুলো কী?' তিনি বলেন, 'এরা সেসব লোক, যারা রোযা রেখে ইফতারের সময় হওয়ার আগে রোযা ভেঙ্গে ফেলে।'

এরপর চলতে চলতে কিছু পুরুষ ও নারীর কাছে উপস্থিত হই, এদের দৃশ্য ছিল খুবই বিদঘুটে, পোশাক ভীষণ খারাপ, [৪] গন্ধ অত্যন্ত বাজে—অনেকটা টয়লেটের গন্ধ। আমি বলি, 'এগুলো কী?' তিনি বলেন, 'এরা ব্যভিচারী পুরুষ ও নারী।'

এরপর চলতে চলতে কিছু মৃত লোকের কাছে পৌঁছুই, যেগুলো ভীষণভাবে ফুলে ওঠেছে [৫] এবং অত্যন্ত বাজে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আমি বলি, 'এগুলো কী?' তিনি বলেন, 'এরা হলো কাফিরদের মৃত লোকজন [৬] [৭] ।'

এরপর চলতে চলতে একপর্যায়ে ধোঁয়া দেখতে পাই, আর বিকট গর্জন ও চিৎকার আমাদের কানে আসে [৮]। আমি বলি, 'এটা কী?' তিনি বলেন, 'এটা জাহান্নাম, একে (এর অবস্থায়) ছেড়ে দিন।'

এরপর চলতে চলতে কিছু লোকের কাছে পৌঁছুই, যারা গাছের ছায়ায় ঘুমাচ্ছিলেন। আমি বলি, 'এরা কী?' তিনি বলেন, 'এরা মুসলিমদের মৃত লোকজন।'

এরপর চলতে চলতে কিছু ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়ের কাছে হাজির হই, ওরা দু ঝরনাধারার মাঝখানে খেলা করছিল। আমি বলি, 'এগুলো কী?' তিনি বলেন, 'মুমিনদের শিশু-সন্তান [১]।'

এরপর চলতে চলতে কিছু লোকের কাছে উপস্থিত হই, যাদের চেহারা ও পোশাক ছিল খুবই সুন্দর, ঘ্রাণ অত্যন্ত উন্নত মানের, তাদের চেহারা ছিল কাগজের মতো (ফর্সা)। আমি বলি, 'এরা কী?' তিনি বলেন, 'এরা হলেন সিদ্দীক, শহীদ ও সৎ বান্দা।'

এরপর চলতে চলতে তিন ব্যক্তির কাছে পৌঁছুই, যারা শরাব পান করছিল ও গান গাচ্ছিল। আমি বলি, 'এরা কী?' তিনি বলেন, 'এরা হলেন যাইদ ইবনু হারিসা, জাফর ও ইবনু রাওয়াহা।' আমি তাদের দিকে ধাবিত হলে, তারা বলে ওঠেন, 'আপনার নাগাল পেয়ে গিয়েছে! আপনার নাগাল পেয়ে গিয়েছে!' তখন আমার মাথা ওপরের দিকে তুলে দেখি, আরশের নিচে তিনজন লোক। আমি বলি, 'এরা কারা?' তিনি বলেন, 'ইনি আপনার পিতা ইবরাহীম, (আর এরা হলেন) মূসা ও ঈসা (তাঁদের সবার ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক)। তাঁরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।'"

তাবারানি, কাবীর ৮/১৮২-১৮৩ (৭৬৬৬), এর বর্ণনাকারীগণ বুখারি ও মুসলিমেও হাদীস বর্ণনা করেছেন (হাইসামি); তাবারানি, কাবীর ৮/১৮৪ (৭৬৬৭); নাসাঈ, কুবরা ৩২৭৩; ইবনু খুযাইমা ১৯৮৬; ইবনু হিব্বান ১৬/৫৩৬ (৭৪৯১); হাকিম ১/৪৩০ (১৫৬৮); বাইহাকি, আস-সুনানুল কুবরা ৪/২১৬ (৮০৮৬); কানযুল উম্মাল ১১/৩৯৬-৩৯৭ (৩১৮৫১); মাজমাউয যাওয়াইদ ১/৭৬-৭৭ (২৪১)।

টিকাঃ
[১] رَجُلَانِ “দু ব্যক্তি” (ইবনু খুযাইমা ১৯৮৬)।
[২] بِضَبْعَيَّ "আমার দু বাহু” (ইবনু খুযাইনা ১৯৮৬)।
[৩] إِنِّي لَسْتُ أَسْتَطِيْعُ الصُّعُوْدَ “এর ওপর ওঠা আমার পক্ষে সম্ভব বলে মনে হয় না।” (তাবারানি, কাবীর ৮/১৮৪ (৭৬৬৭)।
[৩] مُشَقَّقَةٍ أَشْدَاقُهُمْ نَسِيْلُ أَشْدَاقُهُمْ دَمًا “তাদের মুখের চোয়াল ছিঁড়ে রাখা হয়েছে, (আর) তাদের চোয়াল থেকে রক্ত ঝরছে” (ইবনু খুযাইমা ১৯৮৬)।
[১] بِأَقْدَامِهِنَّ "তাদের স্তনের সঙ্গে" (তাবারানি, কাবীর ৮/১৮৪ (৭৬৬৭))।
[২] مَا بَالُ هُؤُلَاءِ “এদের এ দশা কেন?” (ইবনু খুযাইমা ১৯৮৬)।
[৪] এরপর তিনি বলেন, خَابَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى “ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা ব্যর্থ হোক!” (বর্ণনাকারী) সুলাইমান বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি না—আবূ উমামা কি এ (বাক্য)টি আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছ থেকে শুনেছিলেন, নাকি এটি তার নিজের বক্তব্য।’ (ইবনু খুযাইমা ১৯৮৬)।
[৫] أَشَدُّ انْتِفَاجًا “(এদের দেহ) ভয়ানক রকম ফুলে ওঠেছে,” (ইবনু খুযাইমা ১৯৮৬)।
[৬] وَأَسْوَأَهُ مَنْظَرًا “আর দেখতেও ছিল অত্যন্ত বীভৎস” (ইবনু খুযাইমা ১৯৮৬)।
[৭] تُثْلَى “(যুদ্ধক্ষেত্রে) নিহত” (ইবনু খুযাইমা ১৯৮৬)।
[৮] حَتَّى إِذَا كُنْتُ فِي سَوَاءِ الْجَبَلِ إِذَا بِأَصْوَاتٍ شَدِيدَةٍ ، قُلْتُ مَا هَذِهِ الْأَصْوَاتُ ؟ قَالُوا هَذَا عُوَاءُ أَهْلِ النَّارِ “পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার পর বিকট আওয়াজ শুনতে পাই। আমি বলি, ‘এ আওয়াজ কীসের?’ তারা বলেন, ‘এ হলো জাহান্নামীদের আর্তচিৎকার।’ ” (ইবনু খুযাইমা ১৯৮৬)।
[১] يَحْضُنُهُمْ إِبْرَاهِيمُ "ইবরাহীম তাদের দেখাশোনা করছেন” (তাবারানি, কারীর ৮/১৮৪ (৭৬৬৭))।

📘 সবার ওপরে ঈমান > 📄 ইসরা থেকে ফেরার পর নবি ﷺ-কে মক্কার মুশরিকদের পরীক্ষা

📄 ইসরা থেকে ফেরার পর নবি ﷺ-কে মক্কার মুশরিকদের পরীক্ষা


[৩৩৬.] ইবনু আব্বাস বলেন, 'আল্লাহর রাসূল বলেছেন-

لَمَّا كَانَ لَيْلَةً أُسْرِيَ بِي ، وَأَصْبَحْتُ بِمَكَّةَ ، فَظِعْتُ بِأَمْرِي ، وَعَرَفْتُ أَنَّ النَّاسَ مُكَذِّبِيَّ

"যে রাতে আমাকে ইসরায় নিয়ে যাওয়া হলো, এর পরদিন সকালে মক্কায় আমার (সফরের) বিষয়টি নিয়ে [১] উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়ে যাই; আমি বুঝতে পারছিলাম-লোকজন আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে।"

এরপর তিনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে বিচ্ছিন্নভাবে বসে থাকেন। আল্লাহর দুশমন আবু জাহল পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নবি-এর পাশে এসে বসে। তারপর ঠাট্টার ছলে বলে, "কিছু হয়েছে?" আল্লাহর রাসূল বলেন, نعم "হ্যাঁ।” সে বলে, "কী সেটা?" রাসূল বলেন-

إِنَّهُ أُسْرِيَ بِيَ اللَّيْلَةَ

"গতরাতে আমাকে সফরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।" আবু জাহল বলে, "কোথায়?" নবি বলেন, إِلَى بَيْتِ الْمَقْدِسِ "বাইতুল মাকদিসে।” আবু জাহল বলে, "তারপর সকালে আমাদের মাঝে চলে এসেছ?" নবি বলেন, نعم "হ্যাঁ।” আবু জাহল এমন কোনও ভাব দেখায়নি যে, সে নবি-এর কথাকে মিথ্যা মনে করে, কারণ তার আশঙ্কা হচ্ছিল-সে তার জাতির লোকদের ডেকে আনলে নবি-এর কথা অস্বীকার করে বসবেন! সে বলে- "আচ্ছা, তুমি আমাকে যা বললে, তোমার জাতির লোকদের ডেকে আনলে তা তাদের বলবে [২]?" আল্লাহর রাসূল বলেন, نعم "হ্যাঁ।” তখন সে বলে [৩]-

"ওহে বানু কা'ব ইবনি লুআই-এর লোকজন! একটু এদিকে আসো।" আওয়াজ শুনে বিভিন্ন মজলিসের লোকজন মজলিস থেকে দ্রুত এসে তাদের দুজনের কাছে বসে। আবু জাহল বলে, "আমাকে যে-কথা বলেছিলে, তা তোমার জাতির লোকদের বলো।" তখন আল্লাহর রাসূল বলেন-

إِنَّهُ أُسْرِيَ بِيَ اللَّيْلَةَ

"গতরাতে আমাকে সফরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।"

আবূ জাহল বলে, "কোথায়?" নবি বলেন, إِلَى بَيْتِ الْمَقْدِسِ "বাইতুল মাকদিসে।” তারা বলে, "তারপর সকালে আমাদের মাঝে চলে এসেছ?" নবি বলেন, نَعَمْ “হ্যাঁ।” এতে বিস্মিত হয়ে কেউ কেউ হাততালি দেয়, আবার কেউ দেয় মাথায় হাত, কারণ তারা মনে করেছিল কথাটা মিথ্যা! [১] তারা বলে, "আমাদের সামনে মাসজিদটির বিবরণ দিতে পারবে?" তাদের মধ্যে একব্যক্তি ছিল, যে ইতঃপূর্বে ওই অঞ্চলে গিয়ে মাসজিদটি দেখেছিল। তারপর আল্লাহর রাসূল বলেন-

فَذَهَبْتُ أَنْعَتُ ، فَمَا زِلْتُ أَنْعَتُ حَتَّى الْتَبَسَ عَلَيَّ بَعْضُ النَّعْتِ فَجِيْءَ بِالْمَسْجِدِ وَأَنَا أَنْظُرُ حَتَّى وُضِعَ دُوْنَ دَارٍ عَقِيلٍ - أَوْ عُقَيْلٍ - فَنَعَتُهُ وَأَنَا أَنْظُرُ إِلَيْهِ وَكَانَ مَعَ هَذَا نَعْتُ لَمْ أَحْفَظْهُ

"তারপর আমি বিবরণ দিতে শুরু করি। বিবরণীর একপর্যায়ে এমন কিছু বিষয় চলে আসে, যা আমার কাছে স্পষ্ট ছিল না। তখন আমার চোখের সামনে মাসজিদটিকে এনে আকীল (অথবা উকাইল [২])-এর ঘরের পাশে রাখা হয়। এরপর তা দেখে দেখে বিবরণ দিই [৩] [২]।” এর সঙ্গে এমন কিছু বিবরণী ছিল, যা আমার স্মরণে নেই [৪]। (নবি -এর) বিবরণী শুনে লোকজন বলে ওঠে, “শপথ আল্লাহর! সে যে বিবরণ দিল, তা অবশ্য সঠিক!”

আহমাদ ১/৩০৯ (২৮১৯), বর্ণনাকারীগণ বুখারি ও মুসলিমেও হাদীস বর্ণনা করেছেন (হাইসামি), ৩/৩৭৭ (১৫০৩৪); বুখারি ৩৮৮৬, ৪৭১০; মুসলিম ৪২৮/২৭৬ (১৭০); নাসাঈ, কুবরা ১১২২১; ইবনু আবী শাইবা ১১/৪৬১-৪৬২ (৩২৩৫৮); বাযযার (কাশফ) ১/৪৫-৪৬ (৫৬); তাবারানি, কাবীর ১২/১৬৭-১৬৮ (১২৭৮২); বাইহাকি, দালাইল ২/৩৬৩-৩৬৪; তুহফাতুল আশরাফ ৪/৩৮৯ (৫৪৩০); মাজমাউয যাওয়াইদ ১/৬৪-৬৫ (২৩০)।

[৩৩৭.] উম্মু হানি বলেন, ‘যে-রাতে আল্লাহর রাসূল -কে ইসরায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সে-রাতে তিনি ছিলেন আমার ঘরে। রাতের বেলা তাঁকে খুঁজে না পাওয়ায় আমার ঘুম উবে যায়; আমার আশঙ্কা হচ্ছিল-কুরাইশের কেউ তাঁকে ঝামেলায় ফেলল কিনা। এরপর আল্লাহর রাসূল বলেন-

إِنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ أَتَانِي فَأَخَذَ بِيَدِي ، فَأَخْرَجَنِي ، فَإِذَا عَلَى الْبَيْتِ دَابَّةُ دُوْنَ الْبَعِيرِ وَفَوْقَ الحِمَارِ ، فَحَمَلَنِي عَلَيْهِ ، ثُمَّ انْطَلَقَ حَتَّى انْتَهَى إِلَى بَيْتِ الْمَقْدِسِ ، فَأَرَانِي إِبْرَاهِيمَ يُشْبِهُ خَلْقُهُ خَلْقِي وَيُشْبِهُ خُلُقِي خُلُقَهُ ، وَأَرَانِي مُوسى آدَمَ ، طَوِيلًا ، سَبْطَ الشَّعْرِ ، يُشَبِّهُ بِرِجَالِ أَزْدِ شَنُوْءَةَ ، وَأَرَانِي عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَبْعَةً ، أَبْيَضَ ، يَضْرِبُ إِلَى الْحُمْرَةِ، شَبَّهْتُهُ بِعُرْوَةَ بْنِ مَسْعُودٍ الثَّقَفِيَّ، وَأَرَانِي الدَّجَّالَ مَمْسُوحَ الْعَيْنِ الْيُمْنَى ، شَبَّهْتُهُ بِقَطَنِ بْنِ عَبْدِ الْعُزَّى، وَأَنَا أُرِيدُ أَنْ أَخْرُجَ إِلَى قُرَيْشٍ فَأُخْبِرُهُمْ بِمَا رَأَيْتُ

"জিবরীল এসে আমার হাত ধরে আমাকে (ঘর থেকে) বের করে আনেন। সে-সময় ঘরের ওপর ছিল একটি জন্তু, উটের চেয়ে ছোটো আর গাধার চেয়ে বড়ো। তিনি আমাকে সেটির ওপর উঠিয়ে দেন। একপর্যায়ে সেটি বাইতুল মাকদিসে পৌঁছুয়। সেখানে আমাকে দেখানো হলো-ইবরাহীম-এর আকার-আকৃতি ও আচার-আচরণ আমার আকার-আকৃতি ও আচার-আচরণের মতো। মূসা-কে দেখানো হলো-মেটে রঙের, দীর্ঘদেহী, মাথার চুল লেপ্টানো, আর দেখতে অনেকটা শানুআ'র আযদ গোত্রের পুরুষদের মতো। ঈসা ইবনু মারইয়াম-কে দেখানো হলো-মাঝারি উচ্চতার, গায়ের রঙ লালচে ফর্সা, বলতে পারি- দেখতে অনেকটা উরওয়া ইবনু মাসউদ সাকাফি'র মতো। আর দাজ্জালকে দেখানো হলো-তার ডান চোখ পুরোপুরি মুছে দেওয়া হয়েছে, বলতে পারি-সে দেখতে অনেকটা কাতান ইবনু আবদিল উযযা'র মতো।

আমি (এখন) বের হয়ে কুরাইশদের কাছে যেতে চাই। যা দেখলাম, তা তাদের জানাব।" আমি তাঁর কাপড় ধরে বলি, "আমি আপনাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি! আপনি এমন কিছু লোকের কাছে যাচ্ছেন, যারা আপনাকে মিথ্যুক সাব্যস্ত করবে, আপনার কথা প্রত্যাখ্যান করবে; আমার আশঙ্কা হচ্ছে-তারা আপনাকে আক্রমণ করবে।”

তিনি আমার হাত থেকে তাঁর কাপড় ছাড়িয়ে নিয়ে, তাদের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। গিয়ে দেখেন, তারা সেখানে বসে আছে। আমাকে যা বলেছিলেন, তিনি তাদের তা বলেন। তা শুনে জুবাইর ইবনু মুত'ইম দাঁড়িয়ে বলে,

"মুহাম্মাদ! আমার যদি আগের যৌবন থাকত, তা হলে তুমি যা বললে তা আমাদের সামনে বলতে পারতে না।"

তখন তাদের একলোক বলে, "আপনি কি অমুক অমুক জায়গায় আমাদের উটের পাশ দিয়ে গিয়েছিলেন?" নবি বলেন-

نَعَمْ وَاللَّهِ قَدْ وَجَدْتُهُمْ، قَدْ أَضَلُّوا بَعِيرًا لَهُمْ فَهُمْ فِي طَلَبِهِ

“হ্যাঁ, শপথ আল্লাহর, আমি তাদের (দেখা) পেয়েছি; তাদের একটি উট হারিয়ে ফেলায় তারা সেটা খুঁজছিল।"

সে বলে, "আপনি কি অমুক গোত্রের উটের পাশ দিয়ে গিয়েছিলেন?" নবি বলেন-

نَعَمْ وَجَدْتُهُمْ فِي مَكَانِ كَذَا وَكَذَا، قَدِ انْكَسَرَتْ لَهُمْ نَاقَةُ حَمْرَاءُ ، فَوَجَدْتُهُمْ وَعِنْدَهُمْ قَصْعَةٌ مِنْ مَاءٍ فَشَرِبْتُ مَا فِيهَا

"হ্যাঁ, আমি তাদের অমুক অমুক জায়গায় পেয়েছি; তাদের একটি লাল উট দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আমি যখন তাদের নাগাল পাই, তখন তাদের কাছে পানির একটি পাত্র ছিল; ওই পাত্রে যে পানি ছিল, আমি তা পান করেছি।"

তারা বলে, "বলুন দেখি, সেখানে কয়টি উট ছিল? আর সেগুলোর রাখাল ছিল কে?" নবি বলেন-

قَدْ كُنْتُ عَنْ عِدَّتِهَا مَشْغُولًا

"অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায় তাদের সংখ্যার দিকে খেয়াল করিনি।" এ-কথা বলে তিনি উঠে দাঁড়ান। এমন সময় তাঁর সামনে (সেসব) উট হাজির করা হলে, তিনি উটের সংখ্যা গণনা করেন ও সেগুলোর রাখাল সম্পর্কে জেনে নেন। এরপর কুরাইশদের কাছে এসে বলেন-

سَأَلْتُمُونِي عَنْ إِبِلِ بَنِي فُلَانٍ، فَهِيَ كَذَا وَكَذَا، وَفِيهَا مِنَ الرِّعَاءِ فُلَانٌ وَفُلَانٌ، وَسَأَلْتُمُونِي عَنْ إبل بَنِي فُلَانٍ، فَهِيَ كَذَا وَكَذَا، وَفِيهَا مِنَ الرِّعَاءِ ابْنُ أَبِي قُحَافَةَ وَفُلَانٌ وَفُلَانٌ، وَهِيَ مُصَبِّحَتُكُمْ بِالْغَدَاةِ عَلَى الثَّنِيَّةِ

"তোমরা আমাকে অমুক গোত্রের উট সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলে, সেগুলোর অবস্থা ছিল এই এই, আর এগুলোর রাখাল হিসেবে ছিল অমুক ও অমুক। আর তোমরা আমাকে অমুক গোত্রের উট সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলে, সেগুলোর অবস্থা ছিল এই এই, আর এগুলোর রাখাল হিসেবে ছিল আবূ কুহাফা'র ছেলে, অমুক ও অমুক; তারা আগামীকাল সকালে এ গিরিপথে তোমাদের কাছে এসে হাজির হবে।"

তিনি তাদের সঙ্গে সত্য কথা বলছেন কি না, তা দেখার জন্য তারা গিরিপথের কাছে গিয়ে বসে থাকে। একপর্যায়ে (কাফেলা এলে) তারা উটের কাফেলাকে স্বাগত জানিয়ে জিজ্ঞেস করে, "তোমাদের কোনও উট হারিয়ে গিয়েছিল?" তারা বলে, "হ্যাঁ।” তারা অপর দলকে জিজ্ঞেস করে, "তোমাদের কোনও লাল উট কি দুর্বল হয়ে পড়েছিল?" তারা বলে, "হ্যাঁ।” তারা জিজ্ঞেস করে, "তোমাদের কাছে পানির কোনও পাত্র আছে?" আবূ বকর বলেন, "শপথ আল্লাহর! আমি সেই পাত্রটি রাখার পর, না কেউ তা পান করেছে, আর না এর কোনও ফোঁটা মাটিতে পড়েছে! (অর্থাৎ, তার পরেও সেই পাত্রের পানি কোথাও যেন উধাও হয়ে গিয়েছে!)"

আবূ বকর নবি-এর কথা সত্যায়ন করেন এবং তা মনেপ্রাণে মেনে নেন, তাই সেদিন তাঁর উপাধি দেওয়া হয় 'আস-সিদ্দীক (মহাসত্যায়নকারী)'।'

তাবারানি, কাবীর ২৪/৪৩২-৪৩৪ (১০৫৯), বর্ণনাকারী আবদুল আ'লা ইবনু আবিল মুসাবির পরিত্যক্ত মিথ্যুক (হাইসামি); কানযুল উম্মাল ১১/৩৯৬-৩৯৭ (১৩১৫১); মাজমাউয যাওয়াইদ ১/৭৫-৭৬ (২৪০)।

টিকাঃ
[১] অর্থাৎ, রাত্রিকালীন সফরে।
[২] 'নবি-এর সামনে' (তাবারানি, কাবীর ১২/১৬৭-১৬৮ (১২৭৮২))
[৩] 'তাদের সামনে' (তাবারানি, কাবীর ১২/১৬৭-১৬৮ (১২৭৮২))
[১] 'কেউ কেউ একে সত্য বলে মেনে নেয়' (নাসাঈ, কুবরা ১১২২১)।
[২] "অথবা ইকাল” (বাযযার (কাশফ) ১/৪৫-৪৬ (৫৯))।
[৩] জাবির ইবনু আবদিল্লাহ থেকে বর্ণিত, 'তিনি আল্লাহর রাসূল -কে বলতে শুনেছেন- لَمَّا كَذَّبَنِي قُرَيْشُ حِينَ أُسْرِيَ بِي إِلَى بَيْتِ الْمَقْدِسِ قُمْتُ فِي الْحِجْرِ فَجَلَا اللَّهُ لِيْ بَيْتَ الْمَقْدِسِ ، فَطَفِقْتُ أُخْبِرُهُمْ عَنْ آيَاتِهِ ، وَأَنَا أَنْظُرُ إِلَيْهِ "আমাকে ইসরা'র রাতে বাইতুল মাকদিসে নিয়ে যাওয়ার পর (আহমাদ ৩/৩৭৭ (১৫০৩৪))] কুরাইশরা আমাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করলে, আমি (কা'বার) হাতীমে দাঁড়িয়ে যাই। তখন আল্লাহ আমার সামনে বাইতুল মাকদিসকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। আর আমি সেটি দেখে দেখে, এর নিদর্শনগুলো তাদের বলে দিই।"' (বুখারি ৩৮৮৬)।
[২] أَعْلِمْتُ "তুমি কি জানো?” (তাবারানি, কাবীর ৭/২৮২-২৮৩ (৭১৪২))।
[৩] مرآة "একটি আয়না” (তাবারানি, কাবীর ৭/২৮২-২৮৩ (৭১৪২))।
[৪] 'এর সঙ্গে এমন কিছু কথা ছিল, যা (বর্ণনাকারী) আউফ মনে রাখতে পারেননি' (বাইহাকি, দালাইল ২/৩৬৩-৩৬৪); 'এর সঙ্গে এমন কিছু কথা ছিল, যা আমি ভুলে গিয়েছি' (নাসাঈ, কুবরা ১১২২১)।
[৫] إِنَّ مِنْ آيَةٍ مَا أَقُوْلُ لَكُمْ "আমি আপনাদের যা বলছি, তার একটি প্রমাণ হলো-" (তাবারানি, কাবীর ৭/২৮২-২৮৩ (৭১৪২))।
[৬] شَيْخٌ أَسْوَدُ “এক কৃষ্ণাঙ্গ বয়স্ক ব্যক্তি” (তাবারানি, মুসনাদুশ শামিযীন ১৮৯৪)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00