📄 নবি ﷺ যে-কারণে মুনাফিকদের হত্যা করেননি
[২৯১.] হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান বলেন, (তাবুক থেকে ফেরার পথে) আমি আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর উটের লাগাম ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলাম, আর আম্মার পেছন থেকে উট হাঁকাচ্ছিলেন। অথবা আম্মার উট টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন, আর আমি সেটিকে পেছন থেকে হাঁকাচ্ছিলাম। এমন সময় মুখোশ-পরিহিত বারোজন ব্যক্তি আচমকা আমাদের মুখোমুখি হলে নবি ﷺ বলেন-
"এরা কিয়ামাত পর্যন্ত মুনাফিক (থাকবে)।”[২]
هؤُلَاءِ الْمُنَافِقُوْنَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ
আমরা বলি, “আল্লাহর রাসূল! লোক পাঠিয়ে এদের প্রত্যেককে হত্যা করবেন না?”
নবি ﷺ বলেন-
أَكْرَهُ أَنْ يَتَحَدَّثَ النَّاسُ أَنَّ مُحَمَّدًا يَقْتُلُ أَصْحَابَهُ، وَعَسَى اللَّهُ أَنْ يَكْفِيَنِيْهِمْ بِالدُّبَيْلَةِ
“লোকজন বলাবলি করবে, মুহাম্মাদ তাঁর সঙ্গীদের হত্যা করে-এটা আমার অপছন্দ। আশা করা যায়, দুবাইলা'[১] দিয়ে তাদের মোকাবিলা করার জন্য আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট।”
আমরা বলি, "দুবাইলা কী?"
নবি ﷺ বলেন-
شِهَابٌ مِنْ نَارٍ، يُوْضَعُ عَلَى نِيَاطِ قَلْبٍ أَحَدِهِمْ فَيَقْتُلُهُ
"এক অগ্নিশিখা, যা তাদের হৃৎপিণ্ডে রাখা হবে, যা তাদের মৃত্যু ঘটিয়ে ছাড়বে।”'
তাবারানি, আওসাত ৬/৮৭ (৮১০০), বর্ণনাসূত্রের আবদুল্লাহ ইবনু সালামাকে একদল 'বিশ্বস্ত' আখ্যায়িত করেছেন, আর বুখারি বলেন 'তার হাদীসের অনুসমর্থক নেই' (হাইসামি), ইসনাদটি হাসান (দারানি), ৩/৪৯ (৩৮৩১); মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১০৯-১১০ (৪২৯), ১/১১০ (৪৩০)।
টিকাঃ
[২] হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান বলেন, 'আল্লাহর রাসূল ﷺ উপত্যকা দিয়ে অগ্রসর হন, আর লোকজন অগ্রসর হয় গিরিখাত দিয়ে। একপর্যায়ে মুখোশ-পরিহিত সাত ব্যক্তি এগিয়ে আসে। সে-সময় হুযাইফা (নবি ﷺ-এর উটটিকে) সামনে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন, আর সেটিকে পেছন থেকে হাঁকাচ্ছিলেন আম্মার। সেসব লোককে দেখতে পেয়ে আল্লাহর রাসূল ﷺ (হুযাইফা ও আম্মার-কে) বলেন, سِدًّا مَا يَلِيْكُمَا “তোমাদের যার যার পাশের রাস্তা আটকে ফেলো!" যার ফলে সেসব লোক কিছুই করতে পারেনি। তারপর আল্লাহর রাসূল ﷺ তাদের দিকে তাকিয়ে বলেন, يَا حُذَيْفَةُ، هَلْ تَدْرِي مَنِ الْقَوْمُ “হুযাইফা! এরা কারা, চিনতে পারছো?” আমি বলি, “লাল উটের আরোহী ছাড়া তাদের আর কাউকে চিনতে পারছি না; ওকে আমি ভালো করেই চিনি, সে হলো অমুক।” (তাবারানি, আওসাত ৩/৪১ (৩৮৩১))|
[১] বড়ো আকারের টিউমার, যা সাধারণত নিরাময় হয় না。
📄 হামলা-চেষ্টায় অংশগ্রহণকারী কয়েকজনের পরিচয়
[২৯২.] যুবাইর ইবনু বাক্কার বলেন, 'গিরিপথে অংশগ্রহণকারীদের একজন হলো বানু আমর ইবনি আউফ গোত্রের মু'তিব ইবনু কুশাইর ইবনি মুলাইল। সে বদরে উপস্থিত ছিল। সে-ই বলেছিল- "মুহাম্মাদ আমাদের কিসরা ও কাইসারের ভাণ্ডার-লাভের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, আর এদিকে আমাদের কারোর ফসলেরই নিরাপত্তা নেই!"
আর (উহুদ যুদ্ধের বিপর্যয় সম্পর্কে) সে-ই বলেছিল- "আমাদের হাতেও যদি কিছুটা কর্তৃত্ব থাকত, তা হলে এখানে আমাদের (লোকদের) নিহত হওয়া লাগত না।”[২]
এসব কথার ভিত্তিতে যুবাইর তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন। (গিরিপথে অংশগ্রহণকারী আরেকজন হলো) ওয়াদিয়া ইবনু সাবিত ইবনি আমর ইবনি আউফ। সে-ই বলেছিল- "আমরা তো একটু হাসিতামাশা করছিলাম।”[৩]
আর সে-ই বলেছিল- "ব্যাপার কী! আমাদের এসব কুরআন-বিশেষজ্ঞদের দেখছি-পেটপূর্তির ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী, আর শত্রু-মোকাবিলার সময় সবচেয়ে ভীরু।”
(আরেকজন হলো) বানু আমর ইবনি আউফ গোত্রের জিদ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনি নাবীল ইবনিল হারিস। তার ব্যাপারে জিবরীল বলেছিলেন-
"মুহাম্মাদ! ঘন চুলবিশিষ্ট এই কালো লোকটি কে? তার চোখ-দুটি যেন তামার দুটি ডেকচি, সে দেখে শয়তানের দু চোখ দিয়ে, তার কলিজা হলো গাধার কলিজা, সে আপনার খবর মুনাফিকদের কাছে পাচার করে, আর নিজের পেশাব পান করে।"
বানু আমর ইবনি আউফ গোত্রের মিত্র হারিস ইবনু ইয়াযীদ তাঈ। আল্লাহর রাসূল ﷺ যে-পানি স্পর্শ করতে সবাইকে নিষেধ করেছিলেন, সে আগেভাগে গিয়ে ওই পানি পান করে ফেলে।
বানু হারিসার আউস ইবনু কাইযি। সে ছিল ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ ইবনি কাইসের দাদা। (খন্দক যুদ্ধের সময়) সে-ই বলেছিল- "আমাদের ঘরবাড়িগুলো অরক্ষিত।"[১]
বানূ আমর ইবনি আউফের জালাস ইবনু সুওয়াইদ ইবনিস সামিত। আমাদের কাছে এ-মর্মে সংবাদ পৌঁছেছে যে, তিনি পরবর্তী সময়ে তাওবা করেছিলেন।
বানু মালিক ইবনিন নাজ্জারের সাদ ইবনু যুরারা। সে আল্লাহর রাসূল-কে ধোঁয়া দিয়েছিল। তাদের মধ্যে সে ছিল সবার চেয়ে ছোটো ও সবচেয়ে নোংরা।
বানু মালিক ইবনিন নাজ্জারের কাইস ইবনু কাহদ। বানু বালহুবলা গোত্রের সুওয়াইদ ও দায়িস। ইবনু উবাই যাদের প্রস্তুত করে তাবৃকে নিয়ে গিয়েছিল, এ-দুজন তাদের অন্তর্ভুক্ত। এরা জিহাদ না-করার জন্য লোকদের উৎসাহ দিত।
কাইস ইবনু আমর ইবনি সাহল ও যাইদ ইবনুল লাসীত। সে ছিল কাইনুকা'র ইহুদিদের একজন। পরবর্তী সময়ে সে তার ইসলাম-গ্রহণের কথা প্রকাশ করে। তার মধ্যে ছিল ইহুদিদের প্রতারণা ও মুনাফিকির বৈশিষ্ট্য।
বানূ কাইনুকা'র সালামা ইবনুল হুমাম। পরবর্তী সময়ে সে তার ইসলাম-গ্রহণের কথা প্রকাশ করেছিল।'
তাবারানি, কাবীর ৩/১৬৬ (৩০১৭), ইসনাদে দুই বা ততোধিক বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ করা হয়নি (দারানি); মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১১০-১১১ (৪৩৩)।
টিকাঃ
[২] বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: সূরা আল ইমরান ৩:১৫৩-১৫৪。
[৩] বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: সূরা আত-তাওবা ৯:৬২-৬৮。
[১] বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: সূরা আল-আহযাব ৩৩:১৩。
📄 এক মুনাফিককে হত্যা করার জন্য রাসূল ﷺ-এর কাছে অনুমতি-প্রার্থনা
[২৯৩.] উবাইদুল্লাহ ইবনু আদি ইবনিল খিয়ার বলেন, 'আল্লাহর রাসূল ﷺ লোকজনের মাঝখানে বসে আছেন। এমন-সময় একব্যক্তি এসে তাঁর সঙ্গে চুপিচুপি কথা বলে। তাঁকে চুপিচুপি কী বলা হয়েছিল তা বোঝা যায়নি। এরপর একপর্যায়ে আল্লাহর রাসূল ﷺ স্পষ্ট আওয়াজে কথা বলেন। তখন বোঝা গেল, লোকটি এক মুনাফিককে হত্যা করার জন্য রাসূল ﷺ-এর কাছে অনুমতি চাচ্ছে। স্পষ্ট ভাষায় কথা বলার সময় আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন, [১]
أَلَيْسَ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ
"সে কি এ সাক্ষ্য দেয় না—আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল?”
লোকটি বলে, "অবশ্যই! কিন্তু তার এ সাক্ষ্য অর্থহীন।"
রাসূল ﷺ বলেন,
أَلَيْسَ يُصَلِّي
"সে কি নামাজ আদায় করে না?"
লোকটি বলে, "অবশ্যই! তবে তার নামাজ প্রকৃত অর্থে নামাজ নয়।”
তখন আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন,
أُولَئِكَ الَّذِينَ نَهَانِي اللَّهُ عَنْهُمْ
"এরা সেসব লোক, যাদের (হত্যা করার) ব্যাপারে আল্লাহ আমাকে নিষেধ করেছেন।"'
মালিক ৪২৪, মুরসাল; শাফিয়ি, মুসনাদ ১৪৯৬; আবদ ইবনু হুমাইদ ৪৯০; আহমাদ ৫/৪৩২-৪৩৩ (২৩৬৭০) মুত্তাসিল ও সহীহ; আবদুর রাযযাক ১০/১৬৩ (১৮৬৮৮); বাযযার (কাশফ) ৪/১২১ (৩৩৪৫); বাইহাকি, কুবরা ৩/৩৬৭ (৬৫৭৬); ইবনু আসাকির ৮/১১২; আত-তামহীদ ১০/১৫০, ১০/১৬৪; উসদুল গবাহ ৩/৩৩৫-৩৩৬; ৩/৫২৬-৫২৭; আল-ইসাবা ৬/১৪৬; আল-মাতালিবুল আলিয়া ৩/৪৫ (২৮৩৭); কানযুল উম্মাল ১/৩০৮ (১৪৫৮); জামিউল উসূল ৪১; মাজমাউয যাওয়াইদ ১/২৪ (৪৪, ৪৫, ৪৬); জামউল ফাওয়াইদ ৮২।
টিকাঃ
[১] জাবির বলেন, 'একব্যক্তি নবি ﷺ-এর কাছে এসে বলে, "আমার এক মুনাফিক প্রতিবেশী এমন এমন কাজ করে।" তখন আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন...' (বাযযার (কাশফ) ৪/১২১ (৩৩৪৫)。