📘 সবার ওপরে ঈমান > 📄 নামাজ, রোযা ও যাকাতের গুরুত্ব

📄 নামাজ, রোযা ও যাকাতের গুরুত্ব


[৯৬.] তালহা ইবনু উবাইদিল্লাহ রা. বলেন, 'নাজদ এলাকার এক অধিবাসী আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে আসে। তার মাথার চুল ছিল অপরিপাটি। আমরা তার উচ্চ আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম, কিন্তু সে কী বলছে তা বোঝা যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে কাছে এলে বুঝতে পারি-সে ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। জবাবে আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন,
خَمْسُ صَلَوَاتٍ فِي الْيَوْمِ وَاللَّيْلَةِ
"দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ (আদায় করতে হবে)।"
লোকটি জিজ্ঞেস করে, “এর বাইরে আমার ওপর আর কোনও ফরজ (নামাজ) আছে কি?”
নবি ﷺ বলেন, لَا إِلَّا أَنْ تَطَوَّعَ “না, তবে নফল হিসেবে পড়তে পারবে।"
এরপর নবি ﷺ বলেন,
وَصِيَامُ رَمَضَانَ
"রমজানের রোযা (রাখতে হবে)।"
লোকটি জানতে চায়, "এর বাইরে আমার ওপর আর কোনও ফরজ (রোযা) আছে কি?”
নবি ﷺ বলেন, لَا إِلَّا أَنْ تَطَوَّعَ “না, তবে নফল রোযা রাখতে পারবে।”
এরপর নবি ﷺ তাকে যাকাতের কথা বললে, সে জিজ্ঞেস করে, "এর বাইরে আমার ওপর আর কোনও ফরজ (দান) আছে কি?"
নবি ﷺ বলেন, لَا إِلَّا أَنْ تَطَوَّعَ "না, তবে নফল হিসেবে দান করতে পারবে।”
[১] এরপর লোকটি এ কথা বলে চলে যায়, “শপথ আল্লাহর! আমি এর বেশিও করব না, কমও করব না।”[২]
আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন,
“তার কথা সত্য হলে সে সফল হবে।”
أَفْلَحَ إِنْ صَدَقَ
বুখারি ৪৬, ১৮৯১, ২৬৭৮, ৬৯৫৬; মুসলিম ১০০/৮ (১১), ১০১/৯ (...); মুওয়াত্তা ৪৩৫; আহমাদ ১/১৬২ (১৩৯০); আবূ দাউদ ৩৯১, ৩২৫২; নাসাঈ ৪৫৮, ২০৯০, ৫০২৮; নাসাঈ, কুবরা ৩১৫, ২৪১১; দারিমি ১৬০৪; জামিউল উসূল ৭; জামউল ফাওয়াইদ ৪৯।

টিকাঃ
[১] ‘এরপর আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁকে ইসলামের বিধিবিধানগুলো জানিয়ে দেন’ (বুখারি ৬৯৫৬)।
[২] “শপথ সেই সত্তার, যিনি আপনাকে সম্মানিত করেছেন! আমি নফল কিছু করব না এবং আল্লাহ যা-কিছু আমার ওপর ফরজ করেছেন তাতে কোনও কমতি করব না” (বুখারি ১৮৯১)।
[৩] ‘অথবা دَخَلَ الْجَنَّةَ إِنْ صَدَقَ “তার কথা সত্য হলে সে জান্নাতে যাবে”’ (বুখারি ১৮৯১)।
[৪] তিনি ছিলেন দিমাম ইবনু সা'লাবা ।

📘 সবার ওপরে ঈমান > 📄 নামাজ পড়ার উত্তম সময়

📄 নামাজ পড়ার উত্তম সময়


[৯৭.] আমর ইবনু আবাসা রা. বলেন, ‘আমি আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে এসে বলি, “আল্লাহর রাসূল! আপনার সঙ্গে আর কারা এ দ্বীনের ওপর অবিচল আছে?”
তিনি বলেন, حُرُّ وَعَبْدٌ “একজন স্বাধীন আর একজন কৃতদাস।”
আমি জিজ্ঞেস করি, “ইসলাম কী?”
তিনি বলেন, طَيِّبُ الْكَلَامِ، وَإِطْعَامُ الطَّعَامِ “ভালো কথা বলা ও খাবার খাওয়ানো।”
আমি জানতে চাই, “ঈমান কী?”
তিনি বলেন, الصَّبْرُ وَالسَّمَاحَةُ “ধৈর্য ও সহনশীলতা।”
আমি জিজ্ঞেস করি, “ইসলামে কোন (ব্যক্তি)টি সবচেয়ে উত্তম?”
তিনি বলেন, مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُوْنَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ “যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।”
আমি বলি, “ঈমানের কোন কাজটি সর্বোত্তম?”
তিনি বলেন, خُلُقٌ حَسَنٌ “সুন্দর আচরণ।”
আমি জানতে চাই, “নামাজের কোন অংশটি সর্বোত্তম?”
তিনি বলেন, طُوْلُ الْقُنُوْتِ “দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা।”
আমি জিজ্ঞেস করি, “কোন ধরনের ত্যাগ (হিজরত) সর্বোত্তম?”
তিনি বলেন, أَنْ تَهْجُرَ مَا كَرِهَ رَبُّكَ عَزَّ وَجَلَّ “যা-কিছু তোমার মহান অধিপতির অপছন্দ, তা ত্যাগ করা।”
আমি বলি, "কোন ধরনের জিহাদ সর্বোত্তম?”
তিনি বলেন, مَنْ عُقِرَ جَوَادُهُ وَأُهْرِيقَ دَمُهُ "যার তেজি ঘোড়া (শত্রুর আঘাতে) অচেতন হয়ে পড়ে এবং যার শরীর থেকে রক্ত প্রবাহিত হয়।"
আমি জানতে চাই, “কোন সময়টি উত্তম?”
তিনি বলেন, جَوْفُ اللَّيْلِ الآخِرُ، ثُمَّ الصَّلاةُ مَكْتُوبَةٌ مَشْهُودَةٌ حَتَّى يَطْلُعَ الْفَجْرُ، فَإِذَا طَلَعَ الْفَجْرُ، فَلَا صَلَاةَ إِلَّا الرَّكْعَتَيْنِ حَتَّى تُصَلِّيَ الْفَجْرَ، فَإِذَا صَلَّيْتَ صَلَاةَ الصُّبْحِ، فَأَمْسِكْ عَنِ الصَّلَاةِ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ، فَإِذَا طَلَعَتِ الشَّمْسُ - فَإِنَّهَا تَطْلُعُ فِي قَرْنَيْ شَيْطَانٍ، وَإِنَّ الْكُفَّارَ يُصَلُّوْنَ لَهَا، فَأَمْسِكْ عَنِ الصَّلَاةِ حَتَّى تَرْتَفِعَ، فَإِذَا ارْتَفَعَتْ، فَالصَّلَاةُ مَكْتُوْبَةٌ مَشْهُودَةٌ حَتَّى يَقُوْمَ الظَّلُّ قِيَامَ الرُّمْحِ، فَإِذَا كَانَ كَذلِكَ، فَأَمْسِكُ عَنِ الصَّلَاةِ حَتَّى تَمِيلَ، فَإِذَا مَالَتْ، فَالصَّلَاةُ مَكْتُوْبَةٌ مَشْهُودَةٌ حَتَّى تَغْرُبَ الشَّمْسُ، فَإِذَا كَانَ عِنْدَ غُرُوبِهَا ، فَأَمْسِكْ عَنِ الصَّلَاةِ؛ فَإِنَّهَا تَغْرُبُ أَوْ تَغِيْبُ فِي قَرْنَيْ شَيْطَانٍ، وَإِنَّ الْكُفَّارَ يُصَلُّوْنَ لَهَا
"রাতের শেষভাগ। তখন থেকে ফজর শুরু হওয়া পর্যন্ত নামাজ আদায় করলে তা লিখে রাখা হয় এবং তার সাক্ষী রাখা হয়।
» ফজরের সময়ক্ষণ শুরু হলে, ফজরের নামাজ আদায়ের আগ পর্যন্ত কেবল দু রাকআত নামাজ আদায় করা যাবে।
» ফজরের নামাজ আদায় হলে, সূর্য ওঠার আগ পর্যন্ত (অন্য) নামাজ আদায় থেকে বিরত থেকো।
» সূর্য ওঠা শুরু হলে, ওপরে-উঠে-যাওয়া পর্যন্ত নামাজ আদায় থেকে বিরত থেকো, কারণ এটি শয়তানের দু শিঙের মাঝখান দিয়ে উদিত হয় আর কাফিররা তখন এর উদ্দেশে প্রার্থনা করে।
» সূর্য ওপরে উঠে যাওয়ার পর থেকে ছায়া দণ্ডায়মান বর্শার সমান হওয়ার আগ পর্যন্ত, নামাজ আদায় করলে তা লিখে রাখা হয় এবং তার সাক্ষী রাখা হয়।
» ওই অবস্থা থেকে নিয়ে সূর্য ঢলে পড়ার আগ পর্যন্ত নামাজ আদায় থেকে বিরত থেকো।
» সূর্য ঢলে পড়ার পর থেকে অস্ত যাওয়ার আগ পর্যন্ত, নামাজ আদায় করলে তা লিখে রাখা হয় এবং তার সাক্ষী রাখা হয়।
» সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় নামাজ আদায় থেকে বিরত থেকো, কারণ তা শয়তানের দু শিঙের মাঝখান দিয়ে অস্তমিত বা অদৃশ্য হয় আর কাফিররা (তখন) এর উদ্দেশে প্রার্থনা করে।"
আহমাদ ৪/৩৮৫ (১৯৪৩৫), ইসনাদটি হাসান (দারানি); তাবারানি, আত-তিওয়াল ২৫/২১৪ (১১); তাবারানি, আওসাত ১/৫৭৩ (২১০৬); আবূ ইয়া'লা ৩/৩৮০ (১৮৫৪); বাইহাকি, শুআব ৭/১২২ (৯৭১১); আল-মাতালিবুল আলিয়া ৩/১৫১ (৩১২২); কানযুল উম্মাল ১/২৮৭ (১৩৯২); মাজমাউয যাওয়াইদ ১/৫৪ (১৬৮), ১/৫৬ (১৮০), ১/৫৯ (১৯৯), ১/৬০-৬১ (২১১); জামউল ফাওয়াইদ ৮৪।

টিকাঃ
[৪] “ঈমানের কোন অংশটি সর্বোত্তম?” (আসকালানি, মাতালিব ৩/১৫১ (৩১২২))।

📘 সবার ওপরে ঈমান > 📄 নামাজ আদায়ের সময় এবং ওজুর মহত্ব

📄 নামাজ আদায়ের সময় এবং ওজুর মহত্ব


[৯৮.] আবূ উমামা[১] থেকে বর্ণিত, আমার ইবনু আবাসা বলেন, 'জাহিলি যুগেও আমার মনে হচ্ছিল-লোকজন পথভ্রষ্টতার মধ্যে পড়ে আছে, এদের আচার-অনুষ্ঠানের কোনও ভিত্তি নেই, এরা মূর্তিপূজা করে! এক পর্যায়ে শুনলাম, মক্কায় একব্যক্তি নানা বিষয়ে আগাম সংবাদ দিচ্ছেন।[৩] অতঃপর আমি আমার সওয়ারিতে চড়ে[৪] তাঁর কাছে আসি। আল্লাহর রাসূল ﷺ তখন গোপনে কার্যক্রম চালাচ্ছেন; তাঁর জাতির লোকেরা তাঁর ওপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত। মক্কায় অতি সাধারণ বেশে ঘুরাফেরা করে, একপর্যায়ে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করে বলি,[৫] 'আপনি কী?'
তিনি বলেন, "আমি নবি।"
أَنَا نَبِيٌّ
আমি জিজ্ঞেস করি, 'নবি কী?'
তিনি বলেন,[৮] "আল্লাহ আমাকে (মানুষের কাছে) পাঠিয়েছেন।”
أَرْسَلَنِي اللهُ
আমি জানতে চাই, 'তিনি আপনাকে কী (বার্তা) দিয়ে পাঠিয়েছেন?'
তিনি বলেন,
أَرْسَلَنِي بِصِلَةِ الْأَرْحَامِ وَكَسْرِ الْأَوْثَانِ وَأَنْ يُوَحَدَ اللَّهُ لَا يُشْرَكَ بِهِ شَيْئً
"তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন-
» আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে, [১]
» মূর্তি ভাঙতে, এবং
» [আল্লাহর একত্ব ঘোষণা করতে, যেন তাঁর সঙ্গে কোনোকিছু শরীক করা না হয়।"
[জিজ্ঞেস করি, 'আপনার সঙ্গে এ দ্বীনের অনুসারী আর কে আছে?'[৪] তিনি বলেন,
"একজন স্বাধীন ব্যক্তি ও একজন ক্রীতদাস।”
حُرُّ وَعَبْدُ
সে-সময় আবূ বকর ও বিলাল তাঁর প্রতি ঈমান এনেছিলেন।
আমি বলি, 'আমি আপনার অনুসারী হব।'['তিনি বলেন,
إِنَّكَ لَا تَسْتَطِيعُ ذَلِكَ يَوْمَكَ هَذَا أَلَا تَرَى حَالِي وَحَالَ النَّاسِ وَلَكِنْ ارْجِعْ إِلَى أَهْلِكَ فَإِذَا سَمِعْتَ بِي قَدْ ظَهَرْتُ فَأْتِنِي
"এ-মুহূর্তে তুমি তা বরদাশত করতে পারবে না; তুমি কি আমার ও অন্যদের অবস্থা দেখছো না? তুমি বরং তোমার পরিবার-পরিজনদের কাছে ফিরে যাও;[১] যখন শুনবে আমি জয়লাভ করেছি, ১ তখন আমার কাছে চলে এসো।”
আমি আমার পরিবারের নিকট ফিরে আসি।
সেখানে থাকাকালেই আল্লাহর রাসূল ﷺ মদীনায় হিজরত করেন। আমি প্রতিনিয়ত খোঁজ-খবর রাখতে থাকি। তিনি মদীনায় আসার পর আমি লোকদেরকে তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি। একপর্যায়ে ইয়াস্রিব (অর্থাৎ মদীনা) থেকে একদল লোক আমার নিকট এলে, আমি জানতে চাই-'মদীনায় আসা এই লোকটির খবর কী?'
তারা বলল, '(তাঁর অনুসারী হওয়ার জন্য) লোকজন তাঁর দিকে দৌড়ে যাচ্ছে; তাঁর গোত্রের লোকেরা তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি।'
আমি মদীনায় এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করে বলি, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে চিনতে পারছেন?'
তিনি বলেন, "হ্যাঁ! তুমিই তো আমার সঙ্গে মক্কায় দেখা করেছিলে!”[৬]
نَعَمْ أَنْتَ الَّذِي لَقِيْتَنِي بِمَكَّةَ
আমি বলি, 'জি হ্যাঁ!' তারপর বলি, 'হে আল্লাহর নবি! আল্লাহ আপনাকে শিখিয়েছেন, অথচ আমি জানি না-এমন কিছু বিষয় আমাকে জানান।[৭] আমাকে নামাজ সম্পর্কে কিছু বলুন।[৮]
তিনি বলেন,
صَلِّ صَلَاةَ الصُّبْحِ ثُمَّ أَقْصِرْ عَنِ الصَّلاةِ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ حَتَّى تَرْتَفِعَ فَإِنَّهَا تَطْلُعُ حِيْنَ تَطْلُعُ بَيْنَ قَرْنَيْ شَيْطَانٍ وَحِينَئِذٍ يَسْجُدُ لَهَا الْكُفَّارُ ثُمَّ صَلَّ فَإِنَّ الصَّلَاةَ مَشْهُودَةً مَحْضُورَةٌ حَتَّى يَسْتَقِلُّ الظَّلُّ بِالرُّمْحِ ثُمَّ أَقْصِرْ عَنِ الصَّلَاةِ فَإِنَّ حِينَئِذٍ تُسْجَرُ جَهَنَّمُ فَإِذَا أَقْبَلَ الْغَيْءُ فَصَلَّ فَإِنَّ الصَّلَاةَ مَشْهُودَةٌ مَحْضُورَةٌ حَتَّى تُصَلِّيَ الْعَصْرَ ثُمَّ أَقْصِرْ عَنِ الصَّلَاةِ حَتَّى تَغْرُبَ الشَّمْسُ فَإِنَّهَا تَغْرُبُ بَيْنَ قَرْنَيْ شَيْطَانٍ وَحِينَئِذٍ يَسْجُدُ لَهَا الْكُفَّارُ
"ভোরের নামাজ আদায় কোরো। এরপর সূর্য উদিত হয়ে ওপরে ওঠা পর্যন্ত নামাজ আদায় করা থেকে বিরত থেকো;[১] কারণ উদয়ের সময় এটি শয়তানের দু শিংয়ের মাঝখান দিয়ে উদিত হয়, আর তখন কাফিররা একে সাজদা করে। এরপর থেকেখি নামাজ আদায় কোরো, কারণ তখনকার নামাজের সময় ফেরেশতারা সাক্ষী ও পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত থাকে। (নামাজ আদায় কোরো) যতক্ষণ-না বল্লমের ছায়া উধাও হয়ে যাচ্ছে।[৩] এরপর (ভরদুপুরে) নামাজ আদায় থেকে বিরত থেকো; কারণ তখন জাহান্নামের আগুনে ইন্ধন জোগানো হয়। তারপর ছায়া বাড়তে শুরু করলে, [৩] নামাজ আদায় কোরো; কারণ তখনকার নামাজের সময় ফেরেশতারা সাক্ষী ও পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত থাকে। এরপর আসরের নামাজ আদায় করার পর, সূর্যাস্ত পর্যন্ত নামাজ আদায় থেকে বিরত থাকো; কারণ শয়তানের দু শিংয়ের মাঝখান দিয়ে সূর্য অস্তমিত হয়, আর তখন কাফিররা একে সাজদা করে।"
আমি বললাম, 'হে আল্লাহর নবি! এবার আমাকে ওজু সম্পর্কে কিছু বলুন।'
তিনি বলেন,
مَا مِنْكُمْ رَجُلٌ يُقَرِّبُ وَضُوْءَهُ فَيُمَضْمِضُ وَيَسْتَنْشِقُ فَيَنْتَثِرُ إِلَّا خَرَّتْ خَطَايَا وَجْهِهِ وَفِيْهِ وَخَيَا شِيْمِهِ ثُمَّ إِذَا غَسَلَ وَجْهَهُ كَمَا أَمَرَه اللهُ إِلَّا خَرَّتْ خَطَايَا وَجْهِهِ مِنْ أَطْرَافِ لِحِيَتِهِ مَعَ الْمَاءِ ثُمَّ يَغْسِلُ يَدَيْهِ إِلَى الْمِرْفَقَيْنِ إِلَّا خَرَّتْ خَطَايَا يَدَيْهِ مِنْ أَنَامِلِهِ مَعَ الْمَاءِ ثُمَّ يَمْسَحُ رَأْسَهُ إِلَّا خَرَّتْ خَطَايَا رَأْسِهِ مِنْ أَطْرَافِ شَعْرِهِ مَعَ الْمَاءِ ثُمَّ يَغْسِلُ قَدَمَيْهِ إِلَى الْكَعْبَيْنِ إِلَّا خَرَّتْ خَطَايَا رِجْلَيْهِ مِنْ أَنَامِلِهِ مَعَ الْمَاءِ فَإِنْ هُوَ قَامَ فَصَلَّى فَحَمِدَ اللهَ وَأَتَى عَلَيْهِ وَعَجَّدَهُ بِالَّذِي هُوَ لَهُ أَهْلُ وَفَرَّغَ قَلْبَهُ لِلَّهِ إِلَّا انْصَرَفَ مِنْ خَطِيئَتِهِ كَهَيْئَتِهِ يَوْمَ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ
"তোমাদের কেউ যখন ওজুর পানি এনে মুখ ধোয়, নাকে পানি দেয় আর কুলি করে, তখন তার চেহারা, মুখ ও নাকের ছিদ্রের গোনাহগুলো ঝরে যায়। তারপর সে যখন আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক চেহারা ধৌত করে, তখন তার চেহারার গোনাহসমূহ দাড়ির প্রান্তভাগ দিয়ে পানির সঙ্গে ঝরে পড়ে। তারপর কনুই পর্যন্ত দু হাত ধৌত করার সময়, দু হাতের গোনাহগুলো আঙুলের পানির সঙ্গে ঝরে পড়ে; তারপর মাথা মাসাহ করার সময় মাথার গোনাহ চুলের প্রান্তভাগ দিয়ে পানির সঙ্গে ঝরে যায়। তারপর যখন টাখনু পর্যন্ত দু পা ধৌত করে, তখন দু পায়ের গোনাহ আঙ্গুলের পানির সঙ্গে ঝরে যায়। তারপর যখন দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করে, আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি প্রকাশ করে, যথাযথভাবে তাঁর মহিমা বর্ণনা করে, এবং আল্লাহর জন্য অন্তর খালি করে, তখন সে এমনভাবে গোনাহমুক্ত হয়ে যায়, যেভাবে সে জন্মের দিন গোনাহমুক্ত ছিল।”
আমর ইবনু আবাসা এ হাদীসটি আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর সাহাবি আবু উমামা-এর কাছে বর্ণনা করলে, আবূ উমামা রা. তাকে বলেন, "আমর ইবনু আবাসা! আপনি কী বলছেন, তা ভেবে দেখুন। এক কাজের জন্যই একজনকে এ (বিরাট) প্রতিদান দেওয়া হবে?"
জবাবে আমর রা. বলেন, “আবু উমামা! আমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে, হাড়গুলো নরম হয়ে গিয়েছে, মৃত্যুর সময়ক্ষণও ঘনিয়ে এসেছে; এমতাবস্থায় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নামে মিথ্যা বলার তো আমার কোনও প্রয়োজন নেই। আমি যদি আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছ থেকে এটি একবার বা দুবার অথবা তিনবার" এভাবে তিনি সাত পর্যন্ত গণনা করেন "না শুনতাম, তা হলে এটি কখনও বর্ণনা করতাম না; বাস্তবতা হলো, আমি নবি ﷺ-এর কাছ থেকে এটি এর চেয়েও বেশি বার শুনেছি।"
মুসলিম ১৯৩০/২৯৪ (৮৩২); আহমাদ ৪/১১১ (১৭০১৪), ৪/১১১ (১৭০১৬), ৪/১১১-১১২ (১৭০১৮), ৪/১১২ (১৭০১৯), ৪/১১৪ (১৭০২৮); উসদুল গবাহ ৪/২৫১-২৫২।

টিকাঃ
[১] বাহিলি (আহমাদ ১৭০১৬)।
[২] 'তিনি বলেন, "আমর ইবনু আবাসা! আপনি তো বুদ্ধিমান, আল্লাহ-প্রদত্ত বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ও বানু সুলাইম গোত্রের একজন। কীসের ভিত্তিতে আপনি দাবি করছেন যে, আপনি ছিলেন ইসলামের এক চতুর্থাংশ?” ' (আহমাদ ১৭০১৯)।
[৩] 'আমার এসব কথা শুনে একব্যক্তি বলল-"আমর! মক্কায় একব্যক্তি তোমার মতোই কথা বলছেন।' (উসদুল গবাহ ৪/২৫১-২৫২)।
[৪] 'মক্কায়' (আহমাদ ১৭০১৯)।
[৫] 'তাঁর সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য মক্কার উদ্দেশে রওয়ানা হই। (মক্কায় পৌঁছার পর) আমাকে জানানো হলো-তিনি গোপনে কার্যক্রম চালাচ্ছেন; রাতের বেলা তিনি যখন বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করেন, তখনই কেবল আমি তাঁর নাগাল পাব। এ কথা শুনে আমি কা'বা ও এর পর্দার মাঝখানে ঘুমিয়ে পড়ি। নবি ﷺ-এর "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"-ধ্বনিতে আমার ঘুম ভেঙে যায়। তখন তাঁর কাছে গিয়ে বলি...' (উসদুল গবাহ ৪/২৫১-২৫২)।
[৬] نبي الله "আল্লাহর নবি” (আহমদ ১৭০১৯); رَسُولُ اللهِ "আল্লাহর বার্তাবাহক” (উসদুল গবাহ ৪/২৫১-২৫২)।
[৭] 'আল্লাহর নবি মানে কী?' (আহমাদ ১৭০১১)।
[৮] رَسُولُ اللهِ “আল্লাহর বার্তাবাহক।” [আমি বলি, 'আপনাকে কে পাঠিয়েছে?' তিনি বলেন, اللهُ عَزَّ وَجَلَّ "আল্লাহ তাআলা।” (আহমাদ ১৭০১৬)] আমি বলি, 'আল্লাহ আপনাকে পাঠিয়েছেন?' তিনি বলেন, نعم "হ্যাঁ!" (আহমাদ ১৭০১১)।
]১[ وَتُحْفَنَ الدِّمَاءُ وَتُؤْمَنَ السُّبُلُ "খুনখারাবি বন্ধ করতে, রাস্তাঘাটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে,” (আহমাদ ১৭০১৬)।
]1[ بِأَنْ يُعْبَدَ اللَّهُ “আল্লাহর দাসত্ব করতে” (উসদুল গবাহ ৪/২৫১-২৫২)।
[৩] 'আমি বলি, "তিনি আপনাকে যে বার্তা দিয়ে পাঠিয়েছেন, তা তো অত্যন্ত চমৎকার! আপনাকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আপনার প্রতি ঈমান আনলাম, আপনাকে সত্য বলে মেনে নিলাম।"' (আহমাদ ১৭০১৬)|
[৪] 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার সঙ্গে আর কারা কারা ইসলাম গ্রহণ করেছে?' (আহমাদ ১৭০১৮)।
[৫] 'আবূ বকর রা. -এর আযাদকৃত দাস' (আহমাদ ১৭০১৯)।
[৬] 'আপনার হাত বাড়ান, আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ নেব।' নবি ﷺ হাত বাড়ালে আমি তাঁর কাছে ইসলামের ব্যাপারে শপথবদ্ধ হই। তখন দেখতে পাই-আমি হলাম ইসলামের (অনুসারীদের) এক চতুর্থাংশ। (উসদুল গবাহ ৪/২৫১-২৫২)।
[৭] 'আমি কি আপনার সঙ্গে থেকে যাব, নাকি আপনার ভিন্ন কোনও মত আছে?' (আহমদ ১৭০১৬)।
]৮[ قَدْ تَرَى كَرَاهَةَ النَّاسِ لِمَا جِئْتُ بِهِ "তুমি তো দেখতেই পাচ্ছো-আমি যে বার্তা নিয়ে এসেছি, লোকজন তা কতটা অপছন্দ করছে।” (আহমাদ ১৭০১৬)।
]۵[ فَامْكُتْ فِي أَهْلِكَ “তুমি বরং তোমার পরিবারের লোকদের সঙ্গে থাকো” (আহমাদ ১৭০১৬(; حَتَّى يُمَكِّنَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لِرَسُوْلِهِ “যতক্ষণ-না আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে প্রতিষ্ঠিত করে দিচ্ছেন” (আহমাদ ১৭০২৮)।
[১] ফَاذَا سَمِعْتُمْ بِي قَدْ خَرَجْتُ مَخْرَجِي “যখন তোমরা শুনতে পাবে, আমি (মক্কা থেকে) চূড়ান্তভাবে বেরিয়ে পড়েছি” (আহমাদ ১৭০১৬)।
[২] فَأَلْحِقُ بِي "তখন আমার সঙ্গে যোগ দিয়ো” (আহমাদ ১৭০১১)।
[৩] 'ইসলাম গ্রহণ করে' (আহমাদ ১৭০১৯)।
[৪] 'মক্কা থেকে তোমাদের কাছে যে লোকটি এসেছিলেন, তাঁর কী খবর?' (আহমাদ ১৭০১১)।
[৫] 'আমার বাহনে চড়ে' (আহমাদ ১৭০১৯)।
[৬] أَلَسْتَ أَنْتَ الَّذِي أَتَيْتَنِي بِمَكَّةَ "তুমি কি ওই ব্যক্তি নও, যে মক্কায় আমার কাছে গিয়েছিলে?" (আহমদ ১৭০১৯)|
[৭] 'শেখান' (আহমাদ ১৭০১৯)।
[৮] (আমি জিজ্ঞেস করি) 'কোনও সময় কি এমন আছে, যা অন্য সময়ের চেয়ে উত্তম?' নবি ﷺ বলেন, جَوْفُ اللَّيْلِ الْآخِرُ أَفْضَلُ فَإِنَّهَا مَشْهُودَةٌ مُتَقَبَّلَةٌ حَتَّى تُصَلِّيَ الْفَجْرَ “রাতের শেষভাগ হলো উত্তম সময়, সে সময় (নামাজ আদায় করলে) ফেরেশতারা পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকে এবং তা কবুল হয়; এ অবস্থা চলতে থাকে ফজরের নামাজ আদায় করা পর্যন্ত।” (আহমাদ ১৭০১৮)।
[১] فَإِذَا ظَلَعَتْ فَلَا تُصَلِّ حَتَّى تَرْتَفِعَ “সূর্য উদিত হলে নামাজ আদায় কোরো না, যতক্ষণ-না তা ওপরে উঠে যাচ্ছে” (আহমাদ ১৭০১৪, ১৭০১৯(; ثُمَّ انْهَهُ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مَا دَامَتْ كَالْحَجَفَةِ حَتَّى تَنْتَشِرٌ "সূর্য উদিত হওয়ার পর যতক্ষণ এটি গোল থালা/ ঢালের মতো থাকছে, ততক্ষণ নামাজ আদায় থেকে বিরত থেকো, যতক্ষণ-না এর আলোকচ্ছটা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ছে” (আহমাদ ১৭০১৮)।
]2[ فَإِذَا ارْتَفَعَتْ قِيْدَ رُمْجٍ أَوْ رُمْحَيْنِ "যখন সূর্য এক বল্লম অথবা দু বল্লম পরিমাণ ওপরে উঠে যায়, তখন থেকে” (আহমাদ ১৭০১৯)।
]*[ حَتَّى يَسْتَوِيَ الْعَمُوْدُ عَلَى ظِلَّهِ "যতক্ষণ-না খুঁটি ও তার ছায়া পরস্পরের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে” (আহমাদ ১৭০১৮)। অর্থাৎ ঠিক দুপুরবেলা পর্যন্ত।
]8[ فَإِذَا زَالَتْ “সূর্য ঢলে পড়লে” (আহমাদ ১৭০১৮)।
[১] “দু রাকআত" (আহমাদ ১৭০১৯)।
[২] "আপনি কি এটি আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছ থেকে শুনেছেন?” (আহমাদ ১৭০১৯)。

📘 সবার ওপরে ঈমান > 📄 যাকাত দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি ও আত্মশুদ্ধির মর্মকথা

📄 যাকাত দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি ও আত্মশুদ্ধির মর্মকথা


[৯৯.] আবদুল্লাহ ইবনু মুআবিয়া গাদিরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবি ﷺ বলেছেন,
ثَلَاثُ مَنْ فَعَلَهُنَّ فَقَدْ طَعِمَ طَعْمَ الْإِيمَانِ، مَنْ عَبَدَ الله وَحْدَهُ، وعلم أنه لا إله إلا الله، وَأَعْطَى زَكَاةَ مَالِهِ طَيِّبَةً بِهَا نَفْسُهُ رَافِدَةً عَلَيْهِ كُلَّ عَامٍ وَلَا يعطى الْهَرِمَةَ وَلَا الدَّرِنَةَ وَلَا الْمَرِيضَةَ وَلَا الشَّرَطَ اللَّئِيمَةَ، وَلَكِنْ مِنْ وَسَطِ أَمْوَالِكُمْ، فَإِنَّ الله لَمْ يَسْأَلْكُمْ خَيْرَهُ، وَلَمْ يَأْمُرْكُمْ بِشَرِّهِ
"যে-ব্যক্তি তিনটি কাজ করবে, সে অবশ্যই ঈমানের স্বাদ পাবে:
> যে-ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহর দাসত্ব করবে;
> ভালোভাবে জেনে নেবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ্ নেই; এবং
> প্রতি বছর খুশিমনে ও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে নিজের সম্পদের যাকাত দেবে-(ওই যাকাতে) কোনও বুড়ো বা ত্রুটিযুক্ত বা রোগা অথবা দুধ-দেয়-না-এমন নিম্নমানের পশু দেবে না, বরং তোমাদের মাঝারি মানের সম্পদ দেবে; কারণ আল্লাহ তোমাদের কাছে সর্বোত্তম সম্পদ চাননি, আবার সবচেয়ে নিকৃষ্ট জিনিস দেওয়ার নির্দেশ দেননি'"।"'
আবূ দাউদ ১৫৮২, সহীহ; ইবনু সাদ, আত-তবাকাত ৭/৪২১; বুখারি, তারীখ ৫/৩১-৩২ (৫৪); তাবারানি, সগীর ৫৫৫; ইবনু আবী আসিম, আল-আহাদ ২/৩০০ (১০৬২); বাইহাকি, কুবরা ৪/৯৫-৯৬ (৭৩৫১); জামিউল উসূল ১৫; জামউল ফাওয়াইদ ৫৪; আলবানি, আস-সহীহাহ ১০৪৬।

টিকাঃ
]১[ وَزَكَّى نَفْسَهُ “এবং যে-ব্যক্তি নিজেকে শুদ্ধ করে নেবে।” একব্যক্তি বলল, "নিজেকে শুদ্ধ করার মানে কী?” নবি ﷺ বললেন, أَنْ يَعْلَمَ أَنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ مَعَهُ حَيْثُ كَان "এ-কথা ভালোভাবে জেনে নেওয়া যে-সে যেখানেই থাকুক, আল্লাহ তাআলা তার সঙ্গে আছেন।”' (তাবারানি, সগীর ৫৫৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00