📄 এ-তত্ত্ব প্রচার করতে গেলে আবু হুরায়রা (রাঃ)-কে উমর (রাঃ)-এর বাধা
[৪৬.] আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, 'আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর পাশে আমরা একদল লোক বসা। সঙ্গে আছেন আবূ বকর ও উমর রা.। একপর্যায়ে আল্লাহর রাসূল ﷺ আমাদের সামনে থেকে উঠে যান। অনেকক্ষণ পরও তিনি ফিরে আসেননি! আমরা ভয় পেয়ে যাই-একলা পেয়ে তাঁর ওপর কেউ আক্রমণ করে বসল না তো! আমাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় আমরা উঠে যাই। সর্বপ্রথম আমি আঁতকে উঠি; তাই আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর খোঁজে বেরিয়ে পড়ি। একপর্যায়ে বানুন নাজ্জারের আনসারদের একটি প্রাচীর-বেষ্টিত বাগানের কাছে আসি। চারপাশে চক্কর দিয়ে দেখি (ভেতরে ঢুকার) কোনও রাস্তা পাওয়া যায় কি না। না, কোনও রাস্তা পেলাম না। হঠাৎ নজরে পড়ে-বাইরের একটি কুয়ো থেকে পানির একটি স্রোতধারা দেওয়ালের ছিদ্র দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। খ্যাঁকশিয়ালের মতো নিজেকে গুটিয়ে নিই। এরপর ভেতরে ঢুকে আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে যাই। তিনি বলেন, أَبُوْهُرَيْرَةَ؟ "আবূ হুরায়রা?” আমি বলি, 'হ্যাঁ! হে আল্লাহর রাসূল!' তিনি জিজ্ঞেস করেন, مَا شَأْتُكَ "তোমার কী অবস্থা?” বলি-'আপনি আমাদের সামনে ছিলেন। তারপর যে উঠে এলেন, আর তো ফিরলেন না! তাই আমরা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, একলা পেয়ে কেউ আপনার ক্ষতি করে বসল কি না! আমরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। সর্বপ্রথম আমি আঁতকে উঠেছিলাম। তাই এই দেওয়ালের কাছে আসি। এরপর খ্যাঁকশিয়ালের মতো নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করি। এসব লোক (অর্থাৎ অন্যান্য সাহাবি) আমার পেছনে আছেন।' তিনি বলেন, أَبُوهُرَيْرَةَ "আবূ হুরায়রা!” (এ কথা বলে) তিনি তাঁর জুতা-দুটি আমাকে দেন। তারপর বলেন,
اذْهَبْ بِنَعْلَيَّ هَاتَيْنِ فَمَنْ لَقِيتَ مِنْ وَرَاءِ هُذَا الْحَائِطِ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُسْتَيْقِنَا بِهَا قَلْبُهُ فَبَشِّرْهُ بِالْجَنَّةِ
"আমার এই জুতা-জোড়া নিয়ে যাও। এ দেওয়ালের ওপাশে যাকে দেখবে-অন্তরে অটল বিশ্বাস রেখে সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ্ নেই, তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে দাও।"
আমার সঙ্গে প্রথমে দেখা হয় উমরের। তিনি বলেন, 'এই জুতা-জোড়া কী (জন্য)?' আমি বলি, 'এগুলো আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর জুতা। তিনি আমাকে এগুলো দিয়ে পাঠিয়েছেন; যাকে দেখব অন্তরে অটল বিশ্বাস রেখে সাক্ষ্য দিচ্ছে-আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ্ নেই, তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দেবো!' এ কথা শুনে উমর আমার বুকে এত জোরে ধাক্কা দেন যে, আমি নিতম্বের ওপর পড়ে যাই। তিনি বলেন, 'আবূ হুরায়রা! ফিরে যাও!' আমি কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর নিকট ফিরে যাই। উমর আমার পিছু পিছু আসেন।
আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন, يَا أَبَا هُرَيْرَةَ আবূ হুরায়রা! তোমার কী হলো?” আমি বলি, 'আমার সঙ্গে উমরের দেখা হলে আমি তাকে তাই বলি, যা বলার জন্য আপনি আমাকে পাঠিয়েছিলেন। কথা শুনে তিনি আমার বুকে এত জোরে ধাক্কা দেন যে, আমি নিতম্বের ওপর পড়ে যাই। তারপর বলেন, 'ফিরে যাও'।' আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন, مَا حَمَلَكَ عَلَى مَا فَعَلْتَ مَا رَلَ তুমি এ কাজ করেছ কেন?" তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসূল! আপনার প্রতি আমার পিতামাতা কুরবান হোক! আপনি কি আবূ হুরায়রাকে আপনার জুতা-জোড়া দিয়ে এজন্য পাঠিয়েছেন, যাকে দেখবে-অন্তরে অটল বিশ্বাস রেখে সাক্ষ্য দিচ্ছে, আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ্ নেই, তাকে সে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে দেবে?' তিনি বলেন," উমর বলেন, 'এমনটি করবেন না; আমার আশঙ্কা হচ্ছে, লোকজন এর ওপর ভরসা করে বসে থাকবে; বরং তাদেরকে আমল করার জন্য ছেড়ে দিন!' এরপর আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন, তবে তাদের ছেড়ে দাও।” (১)
মুসলিম ১৪৭/৫ জায়েজ ফাওয়াইদ ৮।
টিকাঃ
]১[ مْ تَرَكُوا م্ ছেড়ে দাও, তারা আমল করুক" (আহমাদ ৫/২৩২ (২২০২৮), সহীহ)।
📄 আবু বকর (রাঃ)-কে উমর (রাঃ)-এর বাধা
[৪৭.] আবূ বকর রা. বলেন, 'আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন,
أُخْرُجْ فَنَادٍ فِي النَّاسِ مَنْ شَهِدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ
"যাও! মানুষের মধ্যে ঘোষণা দিয়ে দাও-যে-ব্যক্তি সাক্ষ্য দেবে 'আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ্ নেই', তার জন্য জান্নাত অবধারিত।"
আমি বেরিয়ে পড়ি। উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর সঙ্গে দেখা হলে, তিনি বলেন "আবূ বকর! আপনার কী খবর?” আমি বলি, "আল্লাহর রাসূল ﷺ আমাকে বলেছেন। মানুষের মধ্যে ঘোষণা দিয়ে দাও-যে-ব্যক্তি সাক্ষ্য দেবে "আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ নেই", তার জন্য জান্নাত অবধারিত।' উমর রা. বলেন, "আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে ফিরে যান, কারণ আমার আশঙ্কা হচ্ছে-লোকজন এর ওপর ভরসা করে বসে থাকবে।" আমি আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে ফিরে গেলে, তিনি জিজ্ঞেস করেন-
"ফিরে এলে কেন?"
আমি নবি ﷺ-কে উমর রা.-এর মন্তব্যটি জানালে, তিনি বলেন-
"তার কথা সত্য।"
আবু ইয়া'লা ১/১০০-১০১ (১০৫), ইসনাদের একজন বর্ণনাকারী মাতরূক/পরিত্যাজ্য (হাইসামিয়; যাওয়াইদ উম্মাল ১/২৯১ (১৪০৭)।
📄 আবু মুসা (রাঃ)-কে রাসূল ﷺ-এর কাছে কে দ্রুত পাঠাতো
[৪৮.] আবূ মূসা রা. থেকে বর্ণিত, 'আমার গোত্রের একদল লোকের সঙ্গে আমি নবি ﷺ-এর কাছে আসি। আমাদের দেখে নবি ﷺ বলেন,
أَبْشِرُوا وَبَشِّرُوا مَنْ وَرَاءَكُمْ إِنَّهُ مَنْ شَهِدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ صَادِقًا بِهَا دَخَلَ الْجَنَّةَ
"সুসংবাদ লও এবং তোমাদের পেছনের লোকদের সুসংবাদ দাও! যে-ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে সাক্ষ্য দেয়-আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ্ নেই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।" [১] লোকদের এ সুসংবাদ দেওয়ার জন্য আমরা নবি ﷺ-এর কাছ থেকে বেরিয়ে আসি। উমরের সঙ্গে দেখা হলে, তিনি আমাদের নিয়ে আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে এসে বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে তো লোকেরা এর ওপর নির্ভর করে বসে থাকবে, কাজ করবে না!'[৩] এ কথা শুনে আল্লাহর রাসূল ﷺ চুপ থাকেন।'
আহমাদ ৪/৪০২ (১৯৫৯৭), বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত (হাইসামি), ৪/৪১১ (১৯৬৮৯), সহীহ; তাহাতি, শারহু মুশকিল ১০/১৬৮ (৪০০৩); তাবাবানি, কাবীর, অনাবিষ্কৃত খণ্ড, সূত্র: মাজমাউয যাওয়াইদ ৭; কানযুল উম্মাল ১/৪৭-৪৮ (১৩১); মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১৬ (৭); জামউল ফাওয়াইদ ৯।
টিকাঃ
[১] অর্থাৎ 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর সাক্ষ্য থেকে যেসব দায়দায়িত্ব আসে, সেগুলো পালন করে (তহাভি, শারহু মুশকিল ১০/১৬৯)।
[২] 'তারা বেরিয়ে এসে লোকদের এ সুসংবাদ দিতে থাকেন' (আহমদ ৪/৪১১ (১৯৬৮৯))。
[৩] 'তারা উমর-কে এ সুসংবাদ দিলে, তিনি তাদের ফিরিয়ে দেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ জিজ্ঞেস করেন, مَنْ رَبُّكُمْ "কে তোমাদের ফিরিয়ে দিয়েছে?" তারা বলেন, 'উমর।' রাসূল ﷺ জিজ্ঞেস করেন, وَهُمْ يَا عُمَرُ তুমি তাদের ফিরিয়ে দিয়েছ কেন?" উমর বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে তো লোকেরা এর ওপর নির্ভর করে বসে থাকবে, কাজ করবে না!' (আহমদ ৪/৪১১ (১৯৬৮৯); তহাভি, শারহু মুশকিল ১০/১৬৮ (৪০০৩))。
📄 মুআয (রাঃ)-কে বাধা প্রদান
[৪৯.] আবু সাঈদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, কোনও একদিন আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছিলেন,
مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ
"যে-ব্যক্তি বলবে—আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ নেই, তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়ে যাবে।"
এ কথা শুনে মুআয রা. বাইরে গিয়ে লোকদের এ সুসংবাদ দেওয়ার জন্য নবি ﷺ -এর কাছে অনুমতি চান। নবি ﷺ তাকে অনুমতি দিলে, তিনি খুশিমনে দ্রুত বেরিয়ে পড়েন। উমর রা. -এর সঙ্গে দেখা হলে তিনি বলেন, 'তোমার কী অবস্থা?' তিনি তাকে বিষয়টি জানালে, উমর রা. বলেন, 'যেভাবে আছেন সেভাবেই থাকুন, তাড়াহুড়া করবেন না!' এরপর তিনি আল্লাহর রাসূল ﷺ -এর কাছে গিয়ে বলেন, 'হে আল্লাহর নবি! সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে আপনিই সর্বোত্তম। (তবে) এ কথা শুনলে তো লোকেরা এর ওপর নির্ভর করে বসে থাকবে, আমল (কাজ) করবে না!' নবি ﷺ বলেন, "তাহলে তাকে ফিরিয়ে আনো।" এরপর তিনি তাকে ফেরত আনেন।'
বাযযার (দ্রষ্টব্য: কাশফুল আস্তার) ১/১২ (৮), হাইসামির মতে একজন বর্ণনাকারী দুর্বল, ইবনু হাজার আসকালানির মতে (ফাতহুল বারী, আল-মাকতাবাতুস সালাফিয়্যা সংস্করণ, ১/২২৭) ইসনাদটি হাসান; মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১৭ (১৫); জামউল ফাওয়াইদ ১০।