📄 তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেওয়াই কি মুক্তির জন্য যথেষ্ট?
উপরি উক্ত হাদীসের মানে এ নয় যে-শুধু সাক্ষ্য দিলেই জাহান্নাম থেকে রেহাই পাওয়া যাবে, আর কোনও বিধান পালন করতে হবে না। হাদীসবিশেষজ্ঞগণ বিভিন্নভাবে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন:
>> ইমাম যুহরি-কে এর তাৎপর্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, 'এটি ইসলামের শুরুর দিকে প্রযোজ্য ছিল, যখন ফরজ বিধিবিধান ও আদেশ-নিষেধ নাযিল হয়নি।' (তিরমিযি ২৬৩৮)।
> কোনও কোনও বিদ্বানের মতে এর অর্থ হলো-যারা তাওহীদ বা আল্লাহর একত্বকে মেনে নেয়, তারা জান্নাতে যাবে; অর্থাৎ গোনাহের জন্য জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করলেও, সেখানে তাদের চিরস্থায়ীভাবে রাখা হবে না। ইবনু মাসউদ, আবূ যার, ইমরান ইবনু হুছাইন, জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ, ইবনু আব্বাস, আবূ সাঈদ খুদরি ও আনাস রা. থেকে বর্ণিত, 'নবি ﷺ বলেছেন,
سَيَخْرُجُ قَوْمٌ مِنَ النَّارِ مِنْ أَهْلِ التَّوْحِيدِ وَيَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ
"তাওহীদবাদীদের কিছু লোক জাহান্নাম থেকে বের হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।মিথি ২৬৩৮)।
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর সাক্ষ্য দেওয়ার মানে শুধু মুখে উচ্চারণ করা নয়, বরং এ সাক্ষ্যের ফলে যেসব দায়িত্ব পালন অপরিহার্য হয়ে পড়ে, সেগুলোর প্রতি যত্নবান থাকাও সাক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত। ইমাম তহাভি (মৃত্যু ৩২১ হি.) বলেন-
إِذَا كَانَ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ، قَدْ قَالَهَا عَارِفًا بِمَا يَجِبُ عَلَى أَهْلِهَا فَقَدْ قَالَهَا وَهُوَ عَارِفٌ بِمَقَامِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ وَبِمَا يَرْجُوهُ أَهْلُهَا عِنْدَ خَوْفِهِمْ خِلَافَهُ وَالْخُرُوجَ عَنْ أَمْرِهِ
"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার দরুন যেসব বিষয় জরুরি হয়ে পড়ে, সেগুলো জেনেবুঝে যখন কেউ এ-কথা বলে, তখন এর মানে দাঁড়ায়-আল্লাহ তাআলার মর্যাদা কী, তাঁর বিরুদ্ধাচরণ ও তাঁর আদেশের বাইরে গেলে কী পরিণতির আশঙ্কা রয়েছে এগুলো জেনেবুঝেই সে এ-কথা বলেছে।” (তহাতি, শারহু মুশকিল ১০/১৬৮।)
টিকাঃ
[১] আবদুর রহমান (তিরমিযি ২৬৩৮)।
]2[ حُرِّمَ عَلَى النَّارِ “তাকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দেওয়া হবে” (আহমাদ ৫/৩১৮ (২২৭১১১)।
📄 এক সফরে নবি ﷺ-এর ভাষণ
[৪৫.] সুহাইল ইবনুল বাইদা থেকে বর্ণিত, 'এক সফরে আমরা আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর সঙ্গে ছিলাম। আমি ছিলাম তাঁর পেছনে তখন আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন,
يَا سُهَيْلَ ابْنَ الْبَيْضَاءِ
"সুহাইল ইবনুল বাইদা!”
তিনি উচ্চ আওয়াজে দু-তিনবার ডাক দেন। তাঁর প্রত্যেকটি ডাকে সুহাইল সাড়া দেন। 'আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কণ্ঠ শুনে। লোকজনের ধারণা হয়, তিনি তাদের চাচ্ছেন। ফলে তাঁর সামনের লোকদের আটকে দেওয়া হয়, [৮] আর পেছনের লোকেরা এসে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন। লোকজন সমবেত হলে আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন,
إِنَّهُ مَنْ شَهِدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، حَرَّمَهُ اللَّهُ عَلَى النَّارِ، وَأَوْجَبَ لَهُ الْجَنَّةَ
"যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয়। আল্লাহ্ ছাড়া কোনও ইলাহ্ নেই, [১০] আল্লাহ তাকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দেবেন এবং তার জন্য জান্নাত অবধারিত করে দেবেন।"
আহমাদ ৩/৪৫১ (১৫৭৩৮) সহীহ লি-গাইরিহী, ৩/৪৫১ (১৫৭৩৯), ৩/৪৬৬-৪৬৭ (১৫৮৩৯), ৩/৪৬৭ (১৫৮৪০); আব্দ ইবনু হুমাইদ, আল-মুনতাখাব মিন মুসনাদ ৪৭২; ইবনু আবী আসিম, আল-আহাদ ওয়াল মাসানী ২/১৩৪-১৩৫ (৮৫৪); তাবারানি, আল-মু'জামুল কাবীর ৬/২১০ (৬০৩৩), ৬/২১০ (৬০৩৪); ইবনু হিব্বান ১/৪২৮ (১৯৯); মাওয়ারিদুয যমআন ৩; হাকিম ৩/৬৩০ (৬৬৪৬); আল- ইসাবা ৪/২৮৩; মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১৫-১৬ (৬); কানযুল উম্মাল ১/৬৮ (২৩২); জামউল ফাওয়াইদ ৪।
টিকাঃ
[১] বানু আব্দিদ দার গোত্রের (আহমাদ ৩/৪৫১ (১৫৭৩৯))。
[২] 'আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর উটের ওপর, পেছনের সহ-আরোহী হিসেবে' (তাবারানি, কাবীর ৬০৩৩)।
[৩] 'এক রাতে' (আহমাদ ৩/৪৬৬-৪৬৭ (১৫৮৩৯))。
[৪] 'বেশ কয়েকবার' (আহমদ ৩/৪৬৬-৪৬৭ (১৫৮৩৯))。
[৫] 'সুহাইল বলেন, "জি, আমি হাজির!”' (তাবারানি, কাবীর ৬০৩৩)。
[৬] 'আওয়াজ শুনে আমাদের পেছনের ও সামনের লোকজন সমবেত হন' (আহমাদ ৩/৪৬৬-৪৬৭ (১৫৮৩৯))。
[৭] 'তিনি কোনও একটি বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছেন' (আহমাদ ৩/৪৬৬-৪৬৭ (১৫৮৩৯))。
[৮] 'ফলে তাঁর সামনের লোকজন বসে যান' (তাবারানি, কাবীর ৬০৩৪)。
[৯] J "বলে” (আহমাদ ৩/৪৬৬-৪৬৭ (১৫৮৩৯))。
[১০] "এর বিনিময়ে" (আহমাদ ৩/৪৬৮-৪৬৭ (১৫৮৩৯))。
📄 যেসব হাদীসে এক-দুটি কাজের জন্য জান্নাত অবধারিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে সেগুলোর ব্যাপারে মূলনীতি
যেসব হাদীসে এক-দুটি কাজের জন্য জান্নাত অবধারিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেসব হাদীসের তাৎপর্য বোঝার ক্ষেত্রে ইমাম ইবনু হিব্বান একটি মূলনীতি উল্লেখ করেছেন:
هذَا خَبَرٌ خَرَجَ خِطَابُهُ عَلَى حَسْبِ الْحَالِ وَهُوَ مِنَ الضَّرْبِ الَّذِي ذَكَرْتُ فِي كِتَابٍ فُصُولِ السُّنَنِ أَنَّ الْخَبَرَ إِذَا كَانَ خِطَابُهُ عَلَى حَسْبِ الْحَالِ لَمْ يَجُزْ أَنْ يُحْكَمَ بِهِ فِي كُلِّ الْأَحْوَالِ وَكُلُّ خِطَابٍ كَانَ مِنَ النَّبِيِّ عَلَى حَسْبِ الْحَالِ فَهُوَ عَلَى ضَرْبَيْنِ أَحَدُهُمَا وُجُودُ حَالَةٍ مِنْ أَجْلِهَا ذُكِرَ مَا ذُكِرَ لَمْ تُذْكَرْ تِلْكَ الْحَالَةُ مَعَ ذَلِكَ الْخَبَرِ وَالثَّانِي أَسْئِلَةٌ سُئِلَ عَنْهَا النَّبِيُّ فَأَجَابَ عَنْهَا بِأَجُوبَةٍ فَرُوِيَتْ عَنْهُ تِلْكَ الْأَجْوِبَةُ مِنْ غَيْرِ تِلْكَ الْأَسْئِلَةِ فَلَا يَجُوزُ أَنْ يُحْكَمَ بِالْخَبَرِ إِذَا كَانَ هُذَا نَعْتُهُ فِي كُلِّ الْأَحْوَالِ دُوْنَ أَنْ يُضَمَّ مُجْمَلُهُ إِلَى مُفَسَّرِهِ وَمُخْتَصَرُهُ إِلَى مُتَقَصَّاهُ
"নবি ﷺ-এর এ ভাষণটি একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে দেওয়া হয়েছে। এটি সেই শ্রেণির হাদীসের অন্তর্ভুক্ত, যার ব্যাপারে আমি 'ফুসূলুস সুনান' গ্রন্থে আলোচনা করেছি। নবি ﷺ বিশেষ পরিস্থিতিতে কোনও ভাষণ দিলে, এর বিধান সর্বাবস্থায় প্রয়োগ করা বৈধ নয়। নবি ﷺ-এর বিশেষ-পরিস্থিতিতে-দেওয়া ভাষণগুলো দু ধরনের: (১) একটি বিশেষ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, যার দরুন নবি ﷺ সেই কথাটি বলেছিলেন, তবে হাদীসের এ বর্ণনায় পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়নি; (২) নবি ﷺ-কে কিছু প্রশ্ন করা হয়েছিল, যার জবাব তিনি দিয়েছেন, কিন্তু হাদীসের বর্ণনায় নবি ﷺ-এর জবাবগুলো উল্লেখ করা হলেও প্রশ্নগুলো উল্লেখ করা হয়নি। সুতরাং, ঘটনা এরূপ হয়ে থাকলে, সেই হাদীসের বিধান সর্বাবস্থায় প্রয়োগ করা বৈধ নয়, যতক্ষণ-না সংক্ষিপ্ত বিবরণীর সেই হাদীসটিকে সেসব হাদীসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে, যেখানে এর বিস্তৃত রূপ উল্লেখ করা হয়েছে।” (ইবনু হিব্বান, সহীহ, বাইতুল আফকার সংস্করণ, পৃ. ৮২-৮৩)।
📄 আল্লাহর উলুহিয়াতের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে জান্নাত: বিষয়টি উমর (রাঃ) যেভাবে বুঝেছেন
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।