📘 সবার ওপরে ঈমান > 📄 কল্পনাসর্বস্ব ইলাহ

📄 কল্পনাসর্বস্ব ইলাহ


আল্লাহ তাআলা বলেন, أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ "তুমি কি তার বিষয়টি ভেবে দেখেছ, যে কিনা নিজের কামনাকে ইলাহ্ বানিয়ে নিয়েছে?” (সূরা আল-ফুরকান ২৫:৪৩; সূরা আল-জাসিয়াহ্ ৪৫:২৩) অর্থাৎ এরা আল্লাহ তাআলার বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করে, নিজেদের মন যা চায় তারই অনুসরণ করে।

📘 সবার ওপরে ঈমান > 📄 ইলাহ ও রবের আসনে নেতা

📄 ইলাহ ও রবের আসনে নেতা


ইহুদি-খ্রিষ্টানদের ব্যাপারে বলা হয়েছে اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهَا إِلَ وَاحِدًا لَّا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ (۳۱) "এরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের গুরু-সন্ন্যাসী ও মারইয়াম-পুত্র মাসীহ-কে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে, অথচ এদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এরা যেন শুধু একজন ইলাহ্'র দাসত্ব করে। এরা যে শির্ক করছে, তা থেকে আল্লাহ মুক্ত।” (সূরা আত-তাওবাহ্ ৯:৩১) আয়াতটির মর্ম ইমাম ইবনু জারীর তাবারি (মৃত্যু ৩১০ হি.) বুঝেছেন এভাবে:
سَادَةً لَهُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ ، يُطِيعُوْنَهُمْ فِي مَعَاصِي اللَّهِ
“তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে (গুরু-সন্ন্যাসীদেরকে) নিজেদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করেছিল; যেসব কাজে আল্লাহর অবাধ্যতা হয়, সেসব ক্ষেত্রে তারা তাদের আনুগত্য করত।” (তাবারি, তাফসীর ৫/৮৬৩)।
গুরু-সন্ন্যাসীদের সামনে অবনত না হয়েও, ইহুদি-খ্রিষ্টানরা কীভাবে তাদেরকে রব বানিয়ে নিয়েছিল, কীভাবে তারা তাদের ইবাদাত করার দায়ে অভিযুক্ত হলো, রব ও ইলাহের তাৎপর্য কী এবং শির্ক কীভাবে হয়-এসব বিষয় স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠেছে নিচের হাদীস ও আসারগুলোতে:
'আদি ইবনু হাতিম' বলেন, "আমি নবি ﷺ-এর কাছে এসে দেখি, তিনি সূরা আত-তাওবাহ্-এর (উপরিউক্ত) ৩১ নং আয়াত পাঠ করছেন। পাঠ-শেষে তিনি বলেন,
أَمَا إِنَّهُمْ لَمْ يَكُونُوا يَعْبُدُوْنَهُمْ وَلَكِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا أَحَلُّوا لَهُمْ شَيْئًا اسْتَحَلُّوهُ وَإِذَا حَرَّمُوْا عَلَيْهِمْ شَيْئًا حَرَّمُوهُ
'মনে রেখো-এরা যে তাদের (গুরু-সন্ন্যাসীদের) সামনে অবনত হয়ে থাকত, তা কিন্তু নয়; বরং তারা এদের জন্য কোনোকিছুকে বৈধ ঘোষণা করলে, এরা সেটাকে বৈধ হিসেবে মেনে নিত, আর তারা এদের জন্য কোনোকিছু অবৈধ করে দিলে, এরা সেটাকে অবৈধ হিসেবে মানত।'"' (তিরমিযি ৩৩৫২; তাবাবি; মাওসূআতুত তাফসীর) |
অপর এক বর্ণনায় আদি ইবনু হাতিম রা. বলেন, 'আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তো তাদের ইবাদাত করতাম না!" এর পরিপ্রেক্ষিতে রাসূল ﷺ বলেন,
أَلَيْسَ يُحَرِّمُوْنَ مَا أَحَلَّ اللهُ فَتُحَرِّمُوْنَهُ وَيُحِلُّوْنَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ فَتُحِلُّوْنَهُ
"আল্লাহ যা বৈধ করেছেন তারা সেটা অবৈধ ঘোষণা করলে তোমরা সেটাকে অবৈধ হিসেবে মেনে নিতে, আবার আল্লাহ যা অবৈধ ঘোষণা করেছেন তারা সেটা বৈধ বললে তোমরা সেটাকে বৈধ হিসেবে মানতে-বিষয়টা এমন নয়?" আমি বলি, “অবশ্যই!” রাসূল ﷺ বলেন, تِلْكَ عِبَادَتُهُمْ "সেটিই হলো তাদের ইবাদাত।”'
আবুল বাখতারি বলেন,
انْطَلَقُوا إِلَى حَلَالِ اللهِ فَجَعَلُوهُ حَرَامًا ، وَانْطَلَقُوا إِلَى حَرَامِ اللهِ فَجَعَلُوهُ حَلَالًا ، فَأَطَاعُوْهُمْ فِي ذلِكَ . فَجَعَلَ اللهُ طَاعَتَهُمْ عِبَادَتَهُمْ ، وَلَوْ قَالُوْا لَهُمْ : اعْبُدُوْنَا . لَمْ يَفْعَلُوا .
"আল্লাহ যা বৈধ করেছেন তারা গিয়ে সেটাকে অবৈধ করে ফেলতেন, আবার আল্লাহ যা অবৈধ করেছেন তারা গিয়ে সেটাকে বৈধ করে ফেলতেন, আর লোকজন সে-বিষয়ে তাদের কথা মেনে নিত। আল্লাহ তাদের এ মেনে-নেওয়াকে তাদের ইবাদাত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন; তারা যদি অনুসারীদের (স্পষ্ট ভাষায়) বলতেন- 'আমাদের ইবাদাত করো', তা হলে তারা তা করত না।” (তাবারি ৫/৮৬৫ (১৬৬৪৬))।
হুযাইফা রা. বলেন, لَمْ يَعْبُدُوهُمْ ، وَلَكِنَّهُمْ أَطَاعُوْهُمْ فِي الْمَعَاصِيْ "এরা তাদের সামনে অবনত হয়ে থাকেনি বটে, কিন্তু (আল্লাহর) বিধান-লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে এরা তাদের আনুগত্য করেছিল।” (তাবাবি ৫/৮৬৬ (১৬৬৫২))|
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. বলেন, زَيَّنُوا لَهُمْ طَاعَتَهُمْ . لَمْ يَأْمُرُوهُمْ أَنْ يَسْجُدُوا لَهُمْ ، وَلَكِنْ أَمَرُوْهُمْ بِمَعْصِيَةِ اللَّهِ ، فَأَطَاعُوْهُمْ ، فَسَمَّاهُمُ اللَّهُ بِذَلِكَ أَرْبَابًا "তারা এদের আনুগত্যকে সুশোভিত করে দেখিয়েছিল। তারা তাদের সাজদা করার জন্য অনুসারীদের নির্দেশ দেয়নি, বরং আল্লাহর বিধান লঙ্ঘনের জন্য এদের নির্দেশ দিয়েছিল, আর এরা তাদের নির্দেশ পালন করেছে; এজন্য আল্লাহ তাদেরকে 'রব' নামে অভিহিত করেছেন।” (তাবারি ৫/৮৬৫ (১৬৬৪৯, ১৬৬৫০)) |
Huযাইফা রা.-কে উপরিউক্ত আয়াতের রুবুবিয়্যাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, أَمَا إِنَّهُمْ لَمْ يَكُونُوا يَصُوْمُوْنَ لَهُمْ ، وَلَا يُصَلُّوْنَ لَهُمْ وَلَكِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا أَحَلُّوْا لَهُمْ شَيْئًا اسْتَحَلُّوْهُ ، وَإِذَا حَرَّمُوا عَلَيْهِمْ شَيْئًا أَحَلَّهُ اللهُ لَهُمْ حَرَّمُوْهُ ، فَتِلْكَ كَانَتْ رُبُوْبِيَّتَهُمْ "মনে রাখবে-এরা তাদের উদ্দেশে রোযা রাখত না, তাদের জন্য নামাজও পড়ত না; কিন্তু তারা এদের জন্য কোনোকিছু বৈধ ঘোষণা করলে এরা সেটাকে বৈধ বলে মানত, আর আল্লাহ এদের জন্য বৈধ করে দিয়েছেন এমনকিছু এদের জন্য অবৈধ করলে, এরা সেটাকে অবৈধ হিসেবে মানত। এটিই ছিল তাদের রুবুবিয়্যাত বা কাউকে রব হিসেবে গ্রহণ।” (তাবারি ৫/৮৬৫ (১৬৬৪৫))।
Hasan বসরি এ বলেন, اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا فِي الطَّاعَةِ "আনুগত্যের ক্ষেত্রে এরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের গুরু-সন্ন্যাসীদের 'রব' বানিয়ে নিয়েছিল।” (তাবারি ৫/৮৬২ (১৬৬৪৮))|
আবূ বকর-এর সময় ইসলাম-গ্রহণ-করা প্রখ্যাত তাবিয়ি আবুল আলিয়াহ্ সম্পর্কে রবী ইবনু আনাস বলেন, قُلْتُ لِأَبِي الْعَالِيَةِ : كَيْفَ كَانَتِ الرُّبُوبِيَّةُ الَّتِي كَانَتْ فِي بَنِي إِسْرَائِيلَ ؟ قَالَ : قَالُوا : مَا أَمَرُوْنَا بِهِ ائْتَمَرْنَا ، وَمَا نَهَوْنَا عَنْهُ انْتَهَيْنَا لِقَوْلِهِمْ . وَهُمْ يَجِدُوْنَ فِي كِتَابِ اللَّهِ مَا أُمِرُوا بِهِ وَمَا نُهُوا عَنْهُ ، فَاسْتَنْصَحُوا الرِّجَالَ ، وَنَبَذُوا كِتَابَ اللَّهِ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ 'আমি আবুল আলিয়াহ্-কে জিজ্ঞেস করি, “বানু ইসরাঈলের লোকজন কীভাবে (তাদের গুরু-সন্ন্যাসীদের) রব বানিয়ে নিয়েছিল।” তিনি বলেন, "এরা বলেছিল-তারা যে-কাজের আদেশ দেবেন আমরা তা পালন করব, আর যে-কাজ করতে নিষেধ করবেন আমরা তা বর্জন করব। এরা গুরু-সন্ন্যাসীদের কথাকে ভিত্তি বানিয়েছিল, অথচ এদের করণীয়-বর্জনীয় কী এরা তা আল্লাহর কিতাবে পেত; এরা আল্লাহর কিতাবকে পেছনে ছুড়ে ফেলে, মানুষকে কল্যাণের মানদণ্ডে পরিণত করেছিল।” (তাবারি ৫/৮৬৫ (১৬৬৫১))

টিকাঃ
[১] বিখ্যাত দাতা হাতিম তাঈ ছিলেন তাঁর পিতা। পারিবারিকভাবে তারা ছিলেন খ্রিষ্টান। পরবর্তী পর্যায়ে আদি ইবনু হাতিম রাসূল ﷺ-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন।

📘 সবার ওপরে ঈমান > 📄 মনগড়া ইলাহদের অসারতা

📄 মনগড়া ইলাহদের অসারতা


[৩৫.] মুজাহিদ থেকে বর্ণিত, 'আমার অভিভাবক (সাইব ইবনু আবিস সাইব) আমাকে বলেছেন, "আমার পরিবারের লোকজন আমাকে একপাত্র দুধ ও মাখন দিয়ে তাদের দেবতাদের উদ্দেশ্যে পাঠালে, আমি সেগুলো নিয়ে যাই। সেখান থেকে কিছু খেতে আমার ভয় হয়, তাই সেগুলো রেখে দিই। এমন সময় এক কুকুর এসে দুধ পান করে, মাখন খেয়ে ফেলে, আর মূর্তির ওপর প্রস্রাব করে দেয়।"'
তাবারানি, কাবীর ৭/১৩৯ (৬৬১৭), বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত (হাইসামি); দারিমি ৩ (প্রথম অংশ); মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১১৫ (৪৫৭)।
[৩৬.] মুজাহিদ থেকে বর্ণিত, তার অভিভাবক (সাইব ইবনু আবিস সাইব) তাকে বলেছেন যে, জাহিলি যুগে কা'বা নির্মাণকারীদের একজন ছিলেন তিনি। তিনি বলেন, 'আমার একটি পাথর ছিল, যেটিকে আমি নিজের হাতে খোদাই করে বিশেষ আকৃতি দিয়েছিলাম। মহামহিম আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমি সেটির ইবাদাত করতাম। আমার খুবই প্রিয় দই এনে সেটির ওপর ঢেলে দিতাম। পরে কুকুর এসে তা চেটে খেয়ে নিত, তারপর পেছনের পা উঁচিয়ে প্রস্রাব করে দিত। কা'বা নির্মাণ করতে করতে আমরা হাজরে আসওয়াদের কাছে পৌঁছে যাই। প্রথমে সেটি কারও নজরে পড়েনি। পরে দেখা গেল, সেটি আমাদের (অন্যান্য) পাথরের মাঝখানে পড়ে রয়েছে, অনেকটা মানুষের মাথার মতো, তাতে মানুষের চেহারাও দেখা যায়। তখন কুরাইশদের একটি গোত্র বলে ওঠে, "এটি আমরা স্থাপন করব।” অন্যরা বলল, "আমরা এটি স্থাপন করব।" পরিশেষে তারা বলে, "তোমরা একজন সালিশ নিয়োগ করো।” এরা বলে, "এ-পথ দিয়ে প্রথম যে আসবে, সে-ই সালিশ।” কিছুক্ষণ পর নবি ﷺ এলে তারা বলে, "তোমাদের কাছে আল-আমীন (বিশ্বস্ত ব্যক্তি) চলে এসেছে!" তারা নবি ﷺ-কে (বিষয়টি) জানালে, তিনি হাজরে আসওয়াদকে একটি কাপড়ে রেখে তাদের গোত্রগুলোকে ডাকেন। তারা এসে নবি ﷺ-এর সঙ্গে কাপড়ের বিভিন্ন প্রান্ত ধরে। এরপর নবি ﷺ সেটি (যথাস্থানে) স্থাপন করেন।'
আহমাদ ৩/৪২৫ (১৫৫০৪), ইসনাদটি সহীহ (আরনাউত); মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১১৫ (৪৫৮)।

টিকাঃ
[১] "দেবতাদের ভয়ে আমি সেখান থেকে কিছু খাইনি” (দাবিনি ৩)।
[২] "সেটি ছিল ইসাফ ও নাইলা'র মূর্তি” (দারিমি ৩)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00