📄 আবু হুরায়রা ও আবু যার (রাঃ)-এর বিবরণী
[৫.] আবু হুরায়রা ও আবু যার রা. থেকে বর্ণিত, তারা বলেন, 'আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর সাহাবিদের মধ্যে বসতেন। ফলে কোনও অচেনা লোক এসে জিজ্ঞেস করার আগে বুঝতে পারত না-তাদের মধ্যে কে তিনি (অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল)। তাই আমরা আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে দাবি জানাই যে, আমরা তাঁর জন্য একটি আসন বানিয়ে দিতে চাই, যাতে তাঁর কাছে কোনও অচেনা লোক এলে তাঁকে চিনতে পারে। এরপর আমরা তাঁর জন্য মাটির একটি টিবি বানিয়ে দিলে, তিনি সেটার ওপর বসতেন।
একদিন আমরা বসে আছি। আর আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর আসনে বসা। এমন-সময় সর্বোত্তম সুগন্ধিমাখা ও অত্যন্ত সুন্দর চেহারাবিশিষ্ট একব্যক্তি আসেন, দেখে মনে হলো তার কাপড়ে কখনও ময়লা লাগেনি। লোকটি উপস্থিত জনতার এক প্রান্ত থেকে সালাম দিয়ে বলেন, "মুহাম্মাদ! আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক!” নবি ﷺ তার সালামের জবাব দেওয়ার পর লোকটি বলে, "মুহাম্মাদ! আমি কি কাছে আসতে পারি?" নবি ﷺ বলেন, "কাছে আসুন!” তিনি বেশ কয়েকবার বলতে থাকেন, "আমি কি কাছে আসতে পারি?" নবি ﷺ বলেন, "কাছে আসুন!" একপর্যায়ে তিনি এসে আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর দু হাঁটুর ওপর তার হাত রেখে বলেন, "মুহাম্মাদ! আমাকে বলুন, ইসলাম কী?" নবি ﷺ বলেন,
الْإِسْلَامُ أَنْ تَعْبُدَ الله وَلَا تُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا، وَتُقِيمَ الصَّلَاةَ، وَتُؤْتِي الزَّكَاةَ، وَتَحُجَّ الْبَيْتَ، وَتَصُومَ رَمَضَانَ
"ইসলাম হলো-
» তুমি আল্লাহর গোলামি করবে, তাঁর সঙ্গে কোনোকিছুকে শরীক করবে না,
» [৪] নামাজ কায়েম রাখবে,
» [যাকাত আদায় করবে,
» বাইতুল্লাহর হজ করবে, এবং
» রমজান মাসে রোযা রাখবে।"
তিনি বলেন, “এসব করলে বোঝা যাবে, আমি (আল্লাহর সামনে) আত্মসমর্পণ করেছি?” নবি ﷺ বলেন, نعم "হ্যাঁ!!” তিনি বলেন, “আপনার কথা সত্য।” লোকটির “আপনার কথা সত্য”-এ কথা শুনে বিষয়টি আমাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। খি
তিনি বলেন, “মুহাম্মাদ! আমাকে বলুন, ঈমান কী?” নবি ﷺ বলেন,
الْإِيْمَانُ بِاللهِ، وَمَلَائِكَتِهِ، وَالْكِتَابِ، وَالنَّبِيِّينَ، وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ
"(ঈমান হলো-)
> আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, গ্রন্থ ও নবিগণকে সত্য বলে মেনে নেওয়া, [৪] এবং
> তাকদীরের প্রতি বিশ্বাস রাখা।"[৬]
তিনি বলেন, “এসব করলে বোঝা যাবে, আমি বিশ্বাস স্থাপন করেছি?” নবি ﷺ বলেন, نعم "হ্যাঁ!!" তিনি বলেন, "আপনার কথা সত্য।"
তিনি বলেন, “মুহাম্মাদ! আমাকে বলুন, ইহসান বা আন্তরিকতা কী?” নবি ﷺ বলেন,
أَنْ تَعْبُدَ الله كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ، فَإِنَّهُ يَرَاكَ
"(ইহসান বা আন্তরিকতা হলো-) তুমি এমনভাবে আল্লাহর গোলামি করবে, যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছ; যদি তুমি তাঁকে দেখার পর্যায়ে না হও, তাহলে তিনি তোমাকে নিশ্চিত দেখছেন!”
তিনি বলেন, "আপনার কথা সত্য।" এরপর বলেন, "মুহাম্মাদ! আমাকে বলুন, (মহাপ্রলয়ের) চূড়ান্ত সময় কখন?” নবি ﷺ মাথা নুইয়ে রাখেন, তার প্রশ্নের কোনও জবাব দেননি। তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলে, নবি ﷺ কোনও জবাব দেননি। তিনি আবারও প্রশ্ন করলে, নবির কোনও জবাব দেননি। এরপর মাথা তুলে বলেন,
مَا الْمَسْئُولُ عَنْهَا بِأَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ، وَلَكِنْ لَهَا عَلَامَاتٌ تُعْرَفُ بِهَا، إِذَا رَأَيْتَ الرِّعَاءَ الْبُهُمَ يَتَطَاوَلُوْنَ فِي الْبُنْيَانِ، وَرَأَيْتَ الحُفَاةَ الْعُرَاةَ مُلُوكَ الْأَرْضِ، وَرَأَيْتَ الْمَرْأَةَ تَلِدُ رَبَّهَا، خَمْسٌ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا الله:
"এ বিষয়ে যাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তিনি জিজ্ঞাসকারীর চেয়ে বেশি জানেন না; তবে এর কিছু আলামত আছে, যা দিয়ে তা চেনা যাবে; যখন দেখবে-
> ছাগল-ভেড়ার রাখালরা উঁচু উঁচু ভবন নির্মাণ করার জন্য প্রতিযোগিতায় নামছে,
> যখন বস্ত্রহীন ও খালি-পায়ে-থাকা লোকজন দেশের শাসক হয়ে গিয়েছে, এবং
> নারী জন্ম দিচ্ছে তার মনিবকে।
পাঁচটি বিষয়ের সঠিক জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছে:
إِنَّ اللَّهَ عِندَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضِ تَمُوتُ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ (৩৪)
“আল্লাহর কাছেই আছে (কিয়ামাতের) চূড়ান্ত সময়ক্ষণের জ্ঞান। তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন। তিনিই জানেন মাতৃগর্ভে কী (লালিত হচ্ছে)। কোনও প্রাণসত্তা জানে না আগামীকাল সে কী উপার্জন করবে এবং কোনও ব্যক্তির জানা নেই তার মৃত্যু হবে কোন জমিনে। আল্লাহই সকল জ্ঞানের অধিকারী এবং তিনি সবকিছু জানেন। (সূরা লুকমান ৩১:৩৪)”
এরপর নবি ﷺ বলেন,
لَا وَالَّذِي بَعَثَ مُحَمَّدًا بِالْحَقِّ هُدًى وَبَشِيْرًا، مَا كُنْتُ بِأَعْلَمَ بِهِ مِنْ رَجُلٍ مِنْكُمْ، وَإِنَّهُ لَجِبْرَئِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ نَزَلَ فِي صُورَةٍ دِحْيَةَ الْكَلْبِيِّ
"না; শপথ সেই সত্তার, যিনি মুহাম্মাদ-কে সত্য দিয়ে পাঠিয়েছেন, পথপ্রদর্শক ও সুসংবাদদাতা হিসেবে! (কিয়ামাতের সময়ক্ষণ)-এর ব্যাপারে আমি তোমাদের কারও চেয়ে বেশি কিছু জানি না।[১] আর তিনি ছিলেন জিবরাঈল, দিহইয়া কালবি'র রূপ ধরে এসেছিলেন।”
নাসাঈ ৪৯৯১; বুখারি ৫০, ৪৭৭৭; মুসলিম ১৭/৫ (৯), ১৮/৬ (...), ১৯/৭ (১০); আবু দাউদ ৪৬৯৮; ইবনু মাজাহ ৬৪, ৪০৪৪; আহমাদ ১/৩১৯ (২৯২৪), ২/৩৯৪-৩৯৫ (৯১২৮), ২/৪২৬ (৯৫০১), ৪/১২৯ (১৭১৬৭) ৪/১৬৪ (১৭৫০২); বাযযার (কাশফ) ১/২০ (২২), ১/২১ (২৩), ১/২১-২২ (২৪); কানযুল উম্মাল ১/৩২ (৩৯); জামিউল উসূল ৩; মাজমাউয যাওয়াইদ ১/৩৮-৩৯ (১১৩), ১/৩৯-৪০ (১১৪), ১/৪০ (১১৫); জামউল ফাওয়াইদ ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১, ৪২, ৪৩।
টিকাঃ
[১] 'আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন, سُلُوني "আমাকে প্রশ্ন করো।" কিন্তু তারা তাঁকে এতটা ভয় করতেন যে, তাঁকে প্রশ্ন করতে পারছিলেন না।' (মুসলিম ১৯/৭ (১০))।
[২] 'জিবরীল' (বুখারি ৫০); 'জিবরীল ছদ্মবেশে তাঁর কাছে এলে, তিনি তাকে মুসলিমদের একজন হিসেবে ধরে নেন' (আহমদ ১৭১৬৭); 'গায়ের-রঙ-বদলে-যাওয়া এক মুসাফিরের বেশে একব্যক্তি নবি ﷺ-এর কাছে আসেন।' (বাযযার (কাশফ) ১/২১-২২ (২৪))|
[৩] 'তাঁর হাঁটুর পাশে বসে' (মুসলিম ১৯/৭ (১০))।
[৪] الْمَفْرُوْضَةَ “ফরজ” (মুসলিম ৯৭/৫ (৯))।
[৫] الْمَفْرُوْضَةً “ফরজ” (মুসলিম ৯৭/৫ (৯))。
]۵[ إِذَا فَعَلْتَ ذَلِكَ فَقَدْ أَسْلَمْتَ "এসব করলে (বোঝা যাবে), তুমি আত্মসমর্পণ করেছ” (আহমাদ ১/৩১৯ (২৯২৪))|
[২] অর্থাৎ, 'তার কথায় আমরা বিস্মিত হই—তিনি প্রশ্নও করছেন, আবার সত্যায়নও করছেন!' (মুসলিম ১৩/১ (৮))।
]৩[ وَلِقَائِهِ “ও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ" (মুসলিম ১৭/৫ (৯))।
]8[ وَتُؤْمِنَ بِالْبَعْثِ الْآخِرِ "এবং (মৃত্যু)-পরবর্তী পুনরুজ্জীবনকে সত্য বলে মেনে নেওয়া” (মুসলিম ১৭/৫ (১))।
]৫[ وَالْقَدْرِ كُلِّهِ “এবং তাকদীরের সবটুকুর প্রতি” (নাসাঈ ৪১১০)। أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَالْمَوْتِ وَالْحَيَاةِ بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْجَنَّةِ وَالنَّارِ وَالْحِسَابِ وَالْمِيزَانِ وَالْقَدَرِ كُلِّهِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ ")এসব বিষয়কে) সত্য বলে মেনে নেওয়ার নাম ঈমান-আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, নবি, মৃত্যু, মৃত্যু-পরবর্তী জীবন, জান্নাত, জাহান্নাম, হিসাব, দাঁড়িপাল্লা, এবং তাকদীরের পুরো বিষয়টি, ভালো-মন্দ যাই হোক।” (আহমদ ১৭১৬৭, ১৭৫০২)।
]৯[ إِذَا فَعَلْتَ ذَلِكَ فَقَدْ آمَنْتَ "এসব করলে (বোঝা যাবে), তুমি ঈমান এনেছ” (আহমাদ ১/৩১৯ (২১২৪))。
]৮[ أَنْ تَخْشَى اللَّهَ “তুমি আল্লাহকে এমনভাবে ভয় করবে" (মুসলিম ১১/৭ (১০১)।
[১] 'তিনি বলেন, "এরূপ করলে বোঝা যাবে, আমি আন্তরিকতার সঙ্গে আমল করেছি?" নবি ﷺ বলেন, “নআ’ম, ‘হ্যাঁ’!” (আহমাদ ১৭১৬৭, ১৭৫০২) |
[২] 'আল্লাহর রাসূল ﷺ তাকে যে জবাব দিচ্ছেন, আমরা তা শুনতে পাই; কিন্তু তিনি যার সঙ্গে কথা বলছেন তাকে দেখা যাচ্ছিল না, তার কথাও শোনা যাচ্ছিল না' (আহমাদ ১৭১৬৭, ১৭৫০২)।
]0[ وَلَكِنْ سَأُحَدِّثُكَ عَنْ أَشْرَاطِهَا “তবে আমি তোমাকে এর কিছু আলামত বলে দিচ্ছি” (মুসলিম ১৭/৫ (৯))। 'তখন প্রশ্নকারী বলেন, "আল্লাহর রাসূল! আপনি চাইলে আমি আপনাকে দুটি আলামতের কথা বলতে পারি, যা কিয়ামাতের আগে ঘটবে।" নবি ﷺ বলেন, حدثني "আমাকে বলুন (তা হলে)।” তখন তিনি বলেন, "যখন দেখবেন-দাসী তার মনিবকে জন্ম দিচ্ছে, প্রাসাদের মালিকরা প্রাসাদ-নির্মাণে প্রতিযোগিতায় নামছে এবং পায়ে-জুতা-নেই-এমন অভাবী লোকেরা মানুষের নেতা হয়ে গিয়েছে।" এরপর তিনি জানতে চান, "আল্লাহর রাসূল! এ লোকগুলো কারা (হবে)?" নবি ﷺ বলেন, الغريب "বেদুইনরা।” (আহমাদ ১৭১৬৭( |
]8[ الصُّمَّ الْبُكْمَ “বধির ও বোবা” (মুসলিম ১১/৭ (১০))।
]৫[ رُؤُوْسَ النَّاسِ "মানুষের নেতা” (মুসলিম ১৭/৫ (১))।
]৬[ بَعْلَهَا "তার কর্তাকে” (মুসলিম ১৮/৮ (...)।
]۹[ سُبْحَانَ اللَّهِ، خَمْسُ مِنَ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ “সুবহানাল্লাহ (আল্লাহ পবিত্র)! পাঁচটি বিষয় গাইব বা অদৃশ্যের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ তাআলা ছাড়া কেউ জানে না:” (আহমদ ১৭১৬৭, ১৭৫০২)।
]১] 'এরপর লোকটি চলে যায়। তখন নবি ﷺ বলেন, رُدُّوا عَلَيَّ الرَّجُل “লোকটিকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনো।" ]التي "লোকটিকে খুঁজে বের করো।” (আহমদ ৩৭৪)] তারা তাকে ফিরিয়ে আনতে যান, কিন্তু কিছুই দেখতে পাননি। তখন নবি ﷺ বলেন...' (মুসলিম ১৯/৭ (১০))|