📄 উমর (রাঃ)-এর বিবরণী
[৪.] ইয়াহইয়া ইবনু ইয়া'মার বলেন, 'বসরায় সর্বপ্রথম তাকদীর নিয়ে কথা তোলেন মা'বাদ জুহানি। [৪] এরপর[৫] আমি ও হুমাইদ ইবনু আব্দির রহমান (হিময়ারি) হজ্জ বা উমরার উদ্দেশে রওয়ানা হই। আমরা বলি-নবি ﷺ-এর কোনও সাহাবির সঙ্গে আমাদের দেখা হলে, এ লোকগুলো তাকদীর সম্পর্কে যা বলছে সে-সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করব। সৌভাগ্যক্রমে আবদুল্লাহ ইবনু উমর রা.-এর সঙ্গে।আমাদের দেখা হয়ে যায়। তিনি তখন মাসজিদে ঢুকছেন। আমরা তাকে দু'দিক থেকে ঘিরে ধরি; একজন তার ডানদিক থেকে, অপরজন বাম দিক থেকে। মনে হলো, কথা বলার দায়িত্ব আমার সঙ্গী আমার ওপর ন্যস্ত করতে যাচ্ছে। তখন আমি বলি, "আবূ আব্দির রহমান! আমাদের ওদিকে একদল লোকের আবির্ভাব হয়েছে, যারা কুরআন পাঠ করে এবং জ্ঞানের পেছনে লেগে থাকে। (এরপর তিনি তাদের অবস্থা তুলে ধরেন।) আর তাদের দাবি-তাকদীর বলে কিছু নেই, সবকিছুই নতুন ও আনকোরা, আগে থেকে কিছুই লেখা নেই। খি"
এসব শুনে ইবনু উমর রা. বলেন, “সেসব লোকের সঙ্গে তোমার দেখা হলে তুমি তাদের বলে দেবে-আমি তাদের ব্যাপারে দায়মুক্ত, তারাও আমার ব্যাপারে দায়মুক্ত। [৩] শপথ সেই সত্তার, যাঁর নামে আবদুল্লাহ ইবনু উমর শপথ নেয়! তাদের কারও কাছে যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকে, আর সে তা (আল্লাহর রাস্তায়) খরচ করে, আল্লাহ তা গ্রহণ করবেন না, যতক্ষণ-না সে তাকদীরের [৪] ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে।"
এরপর তিনি বলেন, "আমার পিতা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. আমাকে বলেছেন- 'আমরা একদিন আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে বসা। এমন-সময় আচমকা একব্যক্তি এসে হাজির। পরনের পোশাক ধবধবে সাদা, চুল লিকলিকে কালো, [৫] শরীরে সফরের কোনও ছাপ নেই, [৬] আমাদের কেউ তাকে চিনতেও পারছে না! 'একপর্যায়ে লোকটি নবি ﷺ-এর কাছে গিয়ে বসে। এরপর তার হাঁটু-দুটি নবি ﷺ-এর দু হাঁটুর সঙ্গে লাগায় এবং তার হাতের তালু-দুটি তাঁর রানের ওপর রাখে। এরপর বলে, "মুহাম্মাদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে কিছু জানান।" নবি ﷺ বলেন,
الْإِسْلَامُ أَنْ تَشْهَدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا الله، وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ الله وَتُقِيمَ الصَّلَلاةَ، وَتُؤْتِي الزَّكَاةَ، وَتَصُومَ رَمَضَانَ، وَتَحُجَّ الْبَيْتَ إِنِ اسْتَطَعْتَ إِلَيْهِ سَبِيلًا
"ইসলাম হলো-
> তুমি 'সাক্ষ্য দেবে আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল,
> নামাজ কায়েম রাখবে,
> যাকাত আদায় করবে,
> রমজান মাসে রোযা রাখবে, এবং
> আল্লাহর ঘরে পৌঁছার সামর্থ্য থাকলে হজ্জ করবে।"
লোকটি বলে, "আপনি সত্য বলেছেন।” তার কথায় আমরা বিস্মিত হই-সে প্রশ্নও করছে, আবার সত্যায়নও করছে![৪] এরপর সে বলে, "তাহলে আমাকে ঈমান সম্পর্কে কিছু বলুন।” নবি ﷺ বলেন,
"(ঈমান হলো-)
أَنْ تُؤْمِنَ بِالله، وَمَلَائِكَتِهِ، وَكُتُبِهِ، وَرُسُلِهِ، وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ
> তুমি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর (পাঠানো) কিতাব ও রাসূল এবং পরকালকে[৫] সত্য বলে মেনে নেবে, এবং
> তাকদীরকে সত্য হিসেবে মানবে, ভালো হোক আর মন্দ হোক[৬]।”
সে বলে, "আপনি সত্য বলেছেন। আমাকে ইহসান(১) সম্পর্কে কিছু বলুন।” নবি ﷺ বলেন,
أَنْ تَعْبُدَ الله كَأَنَّكَ تَرَاهُ فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ
"(ইহসান বা আন্তরিকতা হলো-)
> তুমি এমনভাবে আল্লাহর গোলামি করবে, [৮] যেন তাঁকে দেখতে পাচ্ছ;
>> আর যদি তাঁকে দেখার পর্যায়ে না হও, তাহলে (মনে রেখো) তিনি তোমাকে নিশ্চিত দেখছেন!"
সে বলে, “কিয়ামাত সম্পর্কে আমাকে কিছু বলুন।” নবি ﷺ বলেন,
مَا الْمَسْئُولُ عَنْهَا بِأَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ
"এ বিষয়ে যাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তিনি জিজ্ঞাসাকারীর চেয়ে বেশি জানেন না।[১]" সে বলে, “তাহলে আমাকে এর কিছু আলামত বলে দিন।" নবি ﷺ বলেন,
أَنْ تَلِدَ الْأَمَةُ رَبَّتَهَا، وَأَنْ تَرَى الْحُفَاةَ الْعُرَاةَ رِعَاءَ الشَّاءِ يَتَطَاوَلُونَ فِي الْبُنْيَانِ
"(কিছু আলামত হলো-)
> দাসীর গর্ভে জন্ম নেবে তার মহিলা-মনিব, আর
> তুমি দেখবে-পায়ে জুতা নেই, পরনে (পর্যাপ্ত) কাপড় নেই এমন কিছু ভেড়ার রাখাল উঁচু উঁচু ভবন নির্মাণ করার জন্য প্রতিযোগিতায় নামছে!"
এরপর লোকটি চলে যায়। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর নবি ﷺ বলেন,
يَا عُمَرُ، أَتَدْرِي مَنِ السَّائِلُ
"উমর! তুমি কি জানো, (প্রশ্নকারী কে ছিলেন?” আমি বলি, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।” তিনি বলেন,
فَإِنَّهُ جِبْرِيلُ أَتَاكُمْ يُعَلِّمُكُمْ دِينَكُمْ
“তিনি ছিলেন জিবরীল! তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীন শেখানোর জন্য এসেছিলেন! [৬]"",
মুসলিম ৯৩/১ (৮), ৯৪/২ (...), ৯৫/৩ (...), ৯৬/৪ (...); আহমাদ ১/২৭ (১৮৪), ১/২৮ (১৯১), ১/৫১-৫২ (৩৬৭), ১/৫২ (৩৬৮), ১/৫২-৫৩ (৩৭৪), ১/৩১৯ (২৯২৪); ইবনু আবী আসিম, আস-সুন্নাহ ১২৩; আবু দাউদ ৪৬৯৫, ৪৬৯৭; তিরমিযি ২৬১০; নাসাঈ ৪৯৯০; নাসাঈ, কুবরা ৫৮৫২; তাবারানি, কাবীর ১২/৪৩০-৪৩১ (১৩৫৮১); জামিউল উসূল ২; মাজমাউয যাওয়াইদ ১/৩৮-৩৯ (১১৩), ১/৪০-৪১ (১১৬); জামউল ফাওয়াইদ ৩৬, ৩৭ (প্রথমাংশ)।
টিকাঃ
[৩] অর্থাৎ, তাকদীরকে অস্বীকার করেন। (আবদুল কাদীর আবনাউত, জামিউল উসূলের টীকা, ১/১৩৮)।
[৪] আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর সাহাবিদের জীবদ্দশায় সর্বপ্রথম তাকদীর নিয়ে কথা তোলেন মা'বাদ জুহানি। তিনি ইমরান ইবনু হুছাইন, মুআবিয়া, ইবনু আব্বাস, ইবনু উমর রা. এ-সহ আরও অনেক সাহাবি থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন কাতাদা ও মালিক ইবনু দীনার-সহ আরও অনেক বিদ্বান। হাদীসশাস্ত্রে ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন ও আবূ হাতিম তাকে 'বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য' আখ্যায়িত করেছেন। তাকদীর প্রসঙ্গে তিনি ছিলেন 'কাদার (free will বা স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিবাদ)'-এর প্রবক্তা। তার ব্যাপারে হাসান বসরি বলেছিলেন, 'মা'বাদ জুহানির ব্যাপারে সাবধান! সে নিজে পথভ্রষ্ট, অন্যদেরও পথভ্রষ্ট করে ছাড়বে।' তাউস বলেছিলেন, 'তোমরা মা'বাদের বক্তব্যের ব্যাপারে সতর্ক থেকো, কারণ সে হলো কাদারি (স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির প্রবক্তা)।' ইবনুল আশআছের সঙ্গে বিদ্রোহে জড়িত থাকার দরুন ৮০ হিজরিতে হাজ্জাজ তাকে হত্যা করেন। (দেখুন: যাহাবি, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, রিসালাহ সংস্করণ, ৪/১৮৫-১৮৭)।
[৫] 'তাকদীরের ব্যাপারে মা'বাদ তার বক্তব্য তুলে ধরলে, আমাদের কাছে তা খারাপ লাগে। তখন' (মুসলিম ৯৪/২ (...))1
[৬] 'মদীনায় এসে' (তিরমিযি ২৬১০)।
[১] 'মাসজিদের বাইরে' (তিরমিযি ২৬১০)।
[২] "আমরা দিগ্-দিগন্তে সফর করি; সেখানে এমন কিছু লোকের দেখা পাই, যারা বলে-তাকদীর বলে কিছু নেই।” (আহমাদ ৩৭৪)।
[৩] 'এ কথাটি ইবনু উমর তিনবার বলেছিলেন' (আহমাদ ১৮৪)।
[৪] "ভালো-মন্দ সবটুকুর” (তিরমিযি ২৬১০)।
[৫] 'সুন্দর চেহারা ও সুন্দর চুলবিশিষ্ট' (আহমাদ ১৮৪)।
[৬] '(লোকটির পরিচয় জানার জন্য) সাহাবিগণ পরস্পরের দিকে তাকান।' (আহমাদ ১৮৪)।
[৭] 'তখন তিনি বলেন, "আস-সালামু আলাইকুম! আল্লাহর রাসূল! আমি কি আপনার কাছে আসতে পারি?” নবি ﷺ বলেন, "আসুন”। তিনি খানিকটা অগ্রসর হয়ে একই কথার পুনরাবৃত্তি করতে থাকেন...' (তাবারানি, কাবীর ১২/৪৩০-৪৩১ (১৩৫৮১))।
[১] أَنْ تُسْلِمَ وَجْهَكَ لِلَّهِ "নিজেকে আল্লাহর কাছে পুরোপুরি সোপর্দ করবে এবং” (আহমাদ ১৭২৬৭, ১৭৫০১)।
[২] عَبْدُهُ "তাঁর বান্দা ও” (আহমদ ১/৩১৯ (২৯২৪))।
[৩] وَالْإِغْتِسَالُ مِنَ الْجَنَابَةِ "এবং শরীর অপবিত্র হলে গোসল করা” (আহমদ ৩৯৪; আবু দাউদ ৪৬৯৭)।
[৪] "আমরা এমন কাউকে দেখিনি, যে আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে এ লোকের চেয়ে বেশি সম্মান দেখিয়েছে। লোকটি যেন আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে (ইসলামের বিভিন্ন বিষয়) শেখাচ্ছিলেন।” (আহমাদ ৩৯৪)।
[৫] অর্থাৎ وَالْبَعْثِ بَعْدَ الْمَوْتِ 'মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবিত হওয়াকে' (আহমাদ ১৮৪)।
[৬] وَحُلْوِهِ وَمُرَّ “হোক তা মিঠা কিংবা তিতা” (নাসাঈ, কুবরা ৫৮৫২)। অর্থাৎ وَالْقَدَرِ كُلِّهِ "তাকদীরের পুরো বিষয়টিকে।” (আহমাদ ১৮৪) |
[৭] ইহসান শব্দটি এখানে ইখলাস বা আন্তরিকতা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যা না থাকলে ঈমান ও ইসলাম শুদ্ধ বলে গণ্য হয় না (খাত্তাবি'র উদ্ধৃতি দিয়ে ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল ১/১৪১)।
[৮] تَخْشَى اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ "আল্লাহকে এমনভাবে ভয় পাবে, যেন তাঁকে দেখতে পাচ্ছ” (নাসাঈ, কুবরা ২৮২২); অর্থাৎ أَنْ تَعْمَلَ اللَّهِ "(সকল) কাজ করবে আল্লাহর উদ্দেশে।” (আহমাদ ১৮৪)।
[১] لْكِنْ إِنْ شِئْتَ حَدَّثْتُكَ بِمَعَالِمٌ لَهَا دُوْنَ ذَلِكَ; "তবে তুমি চাইলে, আমি সেটি (অর্থাৎ সময়ক্ষণের বিষয়টি) বাদ দিয়ে এর নিদর্শনগুলো তোমাকে বলতে পারি।" (আহমদ ১/৩১৯ (২৯২৪))।
[২] الْجِيَاعُ "অভুক্ত” (আহমাদ ১/৩১৯ (২৯২৪)) ১১। "দারিদ্র্যপীড়িত" (আহমাদ ১৮৪)।
[৩] 'তিন (দিন) পর আমার সঙ্গে নবি ﷺ-এর দেখা হলে' (তিরমিযি ২৬১০); 'দু-তিনদিন যাওয়ার পর' (আহমাদ ১৮৪)।
[৪] عَنْ كَذَا وَكَذَا “অমুক অমুক বিষয়ে” (আহমাদ ১৮৪)।
[৫] مَعَالِمَ دِيْنِكُمْ “তোমাদের দ্বীনের বড়ো বড়ো নিদর্শনগুলো” (আহমদ ১৯১); مَنَاسِكَ دِيْنِكُمْ “তোমাদের দ্বীনের রীতিনীতি” (তাবারানি, কাবীর ১২/৪৩০-৪৩১ (১৩২৮১))。
[৬] هُذَا جِبْرِيلُ أَرَادَ أَنْ تَعَلَّمُوْا إِذَا لَمْ تَسْأَلُوْا “ইনি জিবরীল! তোমরা কোনও প্রশ্ন না করায় তিনি এসেছিলেন, যাতে তোমরা শিখতে পার।” (মুসলিম ৯৯/৭ (১০)); আবূ আমির আশআরি রা. থেকে বর্ণিত, নবি ﷺ তিনবার সুবহানাল্লাহ (আল্লাহ পবিত্র!) বলার পর বলেন, هُذَا جِبْرِيلُ جَاءَ لِيُعَلِّمَ النَّاسَ دِينَهُمْ وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ مَا جَاءَنِي قَطْ إِلَّا وَأَنَا أَعْرِفُهُ إِلَّا أَنْ يَكُونَ هَذِهِ الْمَرَّةُ "ইনি জিবরীল! তিনি এসেছিলেন লোকদেরকে তাদের দ্বীন শেখাতে। শপথ সেই সত্তার যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, তিনি আমার কাছে যখনই এসেছেন, তখনই আমি তাকে চিনতে পেরেছি, তবে এবার এর ব্যতিক্রম হলো।” (আহমাদ ১৭১৬৭ (শেষাংশ); তাবারানি ১২/৪৩০ (১৩৫৮১))।
📄 আবু হুরায়রা ও আবু যার (রাঃ)-এর বিবরণী
[৫.] আবু হুরায়রা ও আবু যার রা. থেকে বর্ণিত, তারা বলেন, 'আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর সাহাবিদের মধ্যে বসতেন। ফলে কোনও অচেনা লোক এসে জিজ্ঞেস করার আগে বুঝতে পারত না-তাদের মধ্যে কে তিনি (অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল)। তাই আমরা আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে দাবি জানাই যে, আমরা তাঁর জন্য একটি আসন বানিয়ে দিতে চাই, যাতে তাঁর কাছে কোনও অচেনা লোক এলে তাঁকে চিনতে পারে। এরপর আমরা তাঁর জন্য মাটির একটি টিবি বানিয়ে দিলে, তিনি সেটার ওপর বসতেন।
একদিন আমরা বসে আছি। আর আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর আসনে বসা। এমন-সময় সর্বোত্তম সুগন্ধিমাখা ও অত্যন্ত সুন্দর চেহারাবিশিষ্ট একব্যক্তি আসেন, দেখে মনে হলো তার কাপড়ে কখনও ময়লা লাগেনি। লোকটি উপস্থিত জনতার এক প্রান্ত থেকে সালাম দিয়ে বলেন, "মুহাম্মাদ! আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক!” নবি ﷺ তার সালামের জবাব দেওয়ার পর লোকটি বলে, "মুহাম্মাদ! আমি কি কাছে আসতে পারি?" নবি ﷺ বলেন, "কাছে আসুন!” তিনি বেশ কয়েকবার বলতে থাকেন, "আমি কি কাছে আসতে পারি?" নবি ﷺ বলেন, "কাছে আসুন!" একপর্যায়ে তিনি এসে আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর দু হাঁটুর ওপর তার হাত রেখে বলেন, "মুহাম্মাদ! আমাকে বলুন, ইসলাম কী?" নবি ﷺ বলেন,
الْإِسْلَامُ أَنْ تَعْبُدَ الله وَلَا تُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا، وَتُقِيمَ الصَّلَاةَ، وَتُؤْتِي الزَّكَاةَ، وَتَحُجَّ الْبَيْتَ، وَتَصُومَ رَمَضَانَ
"ইসলাম হলো-
» তুমি আল্লাহর গোলামি করবে, তাঁর সঙ্গে কোনোকিছুকে শরীক করবে না,
» [৪] নামাজ কায়েম রাখবে,
» [যাকাত আদায় করবে,
» বাইতুল্লাহর হজ করবে, এবং
» রমজান মাসে রোযা রাখবে।"
তিনি বলেন, “এসব করলে বোঝা যাবে, আমি (আল্লাহর সামনে) আত্মসমর্পণ করেছি?” নবি ﷺ বলেন, نعم "হ্যাঁ!!” তিনি বলেন, “আপনার কথা সত্য।” লোকটির “আপনার কথা সত্য”-এ কথা শুনে বিষয়টি আমাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। খি
তিনি বলেন, “মুহাম্মাদ! আমাকে বলুন, ঈমান কী?” নবি ﷺ বলেন,
الْإِيْمَانُ بِاللهِ، وَمَلَائِكَتِهِ، وَالْكِتَابِ، وَالنَّبِيِّينَ، وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ
"(ঈমান হলো-)
> আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, গ্রন্থ ও নবিগণকে সত্য বলে মেনে নেওয়া, [৪] এবং
> তাকদীরের প্রতি বিশ্বাস রাখা।"[৬]
তিনি বলেন, “এসব করলে বোঝা যাবে, আমি বিশ্বাস স্থাপন করেছি?” নবি ﷺ বলেন, نعم "হ্যাঁ!!" তিনি বলেন, "আপনার কথা সত্য।"
তিনি বলেন, “মুহাম্মাদ! আমাকে বলুন, ইহসান বা আন্তরিকতা কী?” নবি ﷺ বলেন,
أَنْ تَعْبُدَ الله كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ، فَإِنَّهُ يَرَاكَ
"(ইহসান বা আন্তরিকতা হলো-) তুমি এমনভাবে আল্লাহর গোলামি করবে, যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছ; যদি তুমি তাঁকে দেখার পর্যায়ে না হও, তাহলে তিনি তোমাকে নিশ্চিত দেখছেন!”
তিনি বলেন, "আপনার কথা সত্য।" এরপর বলেন, "মুহাম্মাদ! আমাকে বলুন, (মহাপ্রলয়ের) চূড়ান্ত সময় কখন?” নবি ﷺ মাথা নুইয়ে রাখেন, তার প্রশ্নের কোনও জবাব দেননি। তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলে, নবি ﷺ কোনও জবাব দেননি। তিনি আবারও প্রশ্ন করলে, নবির কোনও জবাব দেননি। এরপর মাথা তুলে বলেন,
مَا الْمَسْئُولُ عَنْهَا بِأَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ، وَلَكِنْ لَهَا عَلَامَاتٌ تُعْرَفُ بِهَا، إِذَا رَأَيْتَ الرِّعَاءَ الْبُهُمَ يَتَطَاوَلُوْنَ فِي الْبُنْيَانِ، وَرَأَيْتَ الحُفَاةَ الْعُرَاةَ مُلُوكَ الْأَرْضِ، وَرَأَيْتَ الْمَرْأَةَ تَلِدُ رَبَّهَا، خَمْسٌ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا الله:
"এ বিষয়ে যাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তিনি জিজ্ঞাসকারীর চেয়ে বেশি জানেন না; তবে এর কিছু আলামত আছে, যা দিয়ে তা চেনা যাবে; যখন দেখবে-
> ছাগল-ভেড়ার রাখালরা উঁচু উঁচু ভবন নির্মাণ করার জন্য প্রতিযোগিতায় নামছে,
> যখন বস্ত্রহীন ও খালি-পায়ে-থাকা লোকজন দেশের শাসক হয়ে গিয়েছে, এবং
> নারী জন্ম দিচ্ছে তার মনিবকে।
পাঁচটি বিষয়ের সঠিক জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছে:
إِنَّ اللَّهَ عِندَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضِ تَمُوتُ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ (৩৪)
“আল্লাহর কাছেই আছে (কিয়ামাতের) চূড়ান্ত সময়ক্ষণের জ্ঞান। তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন। তিনিই জানেন মাতৃগর্ভে কী (লালিত হচ্ছে)। কোনও প্রাণসত্তা জানে না আগামীকাল সে কী উপার্জন করবে এবং কোনও ব্যক্তির জানা নেই তার মৃত্যু হবে কোন জমিনে। আল্লাহই সকল জ্ঞানের অধিকারী এবং তিনি সবকিছু জানেন। (সূরা লুকমান ৩১:৩৪)”
এরপর নবি ﷺ বলেন,
لَا وَالَّذِي بَعَثَ مُحَمَّدًا بِالْحَقِّ هُدًى وَبَشِيْرًا، مَا كُنْتُ بِأَعْلَمَ بِهِ مِنْ رَجُلٍ مِنْكُمْ، وَإِنَّهُ لَجِبْرَئِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ نَزَلَ فِي صُورَةٍ دِحْيَةَ الْكَلْبِيِّ
"না; শপথ সেই সত্তার, যিনি মুহাম্মাদ-কে সত্য দিয়ে পাঠিয়েছেন, পথপ্রদর্শক ও সুসংবাদদাতা হিসেবে! (কিয়ামাতের সময়ক্ষণ)-এর ব্যাপারে আমি তোমাদের কারও চেয়ে বেশি কিছু জানি না।[১] আর তিনি ছিলেন জিবরাঈল, দিহইয়া কালবি'র রূপ ধরে এসেছিলেন।”
নাসাঈ ৪৯৯১; বুখারি ৫০, ৪৭৭৭; মুসলিম ১৭/৫ (৯), ১৮/৬ (...), ১৯/৭ (১০); আবু দাউদ ৪৬৯৮; ইবনু মাজাহ ৬৪, ৪০৪৪; আহমাদ ১/৩১৯ (২৯২৪), ২/৩৯৪-৩৯৫ (৯১২৮), ২/৪২৬ (৯৫০১), ৪/১২৯ (১৭১৬৭) ৪/১৬৪ (১৭৫০২); বাযযার (কাশফ) ১/২০ (২২), ১/২১ (২৩), ১/২১-২২ (২৪); কানযুল উম্মাল ১/৩২ (৩৯); জামিউল উসূল ৩; মাজমাউয যাওয়াইদ ১/৩৮-৩৯ (১১৩), ১/৩৯-৪০ (১১৪), ১/৪০ (১১৫); জামউল ফাওয়াইদ ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১, ৪২, ৪৩।
টিকাঃ
[১] 'আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন, سُلُوني "আমাকে প্রশ্ন করো।" কিন্তু তারা তাঁকে এতটা ভয় করতেন যে, তাঁকে প্রশ্ন করতে পারছিলেন না।' (মুসলিম ১৯/৭ (১০))।
[২] 'জিবরীল' (বুখারি ৫০); 'জিবরীল ছদ্মবেশে তাঁর কাছে এলে, তিনি তাকে মুসলিমদের একজন হিসেবে ধরে নেন' (আহমদ ১৭১৬৭); 'গায়ের-রঙ-বদলে-যাওয়া এক মুসাফিরের বেশে একব্যক্তি নবি ﷺ-এর কাছে আসেন।' (বাযযার (কাশফ) ১/২১-২২ (২৪))|
[৩] 'তাঁর হাঁটুর পাশে বসে' (মুসলিম ১৯/৭ (১০))।
[৪] الْمَفْرُوْضَةَ “ফরজ” (মুসলিম ৯৭/৫ (৯))।
[৫] الْمَفْرُوْضَةً “ফরজ” (মুসলিম ৯৭/৫ (৯))。
]۵[ إِذَا فَعَلْتَ ذَلِكَ فَقَدْ أَسْلَمْتَ "এসব করলে (বোঝা যাবে), তুমি আত্মসমর্পণ করেছ” (আহমাদ ১/৩১৯ (২৯২৪))|
[২] অর্থাৎ, 'তার কথায় আমরা বিস্মিত হই—তিনি প্রশ্নও করছেন, আবার সত্যায়নও করছেন!' (মুসলিম ১৩/১ (৮))।
]৩[ وَلِقَائِهِ “ও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ" (মুসলিম ১৭/৫ (৯))।
]8[ وَتُؤْمِنَ بِالْبَعْثِ الْآخِرِ "এবং (মৃত্যু)-পরবর্তী পুনরুজ্জীবনকে সত্য বলে মেনে নেওয়া” (মুসলিম ১৭/৫ (১))।
]৫[ وَالْقَدْرِ كُلِّهِ “এবং তাকদীরের সবটুকুর প্রতি” (নাসাঈ ৪১১০)। أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَالْمَوْتِ وَالْحَيَاةِ بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْجَنَّةِ وَالنَّارِ وَالْحِسَابِ وَالْمِيزَانِ وَالْقَدَرِ كُلِّهِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ ")এসব বিষয়কে) সত্য বলে মেনে নেওয়ার নাম ঈমান-আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, নবি, মৃত্যু, মৃত্যু-পরবর্তী জীবন, জান্নাত, জাহান্নাম, হিসাব, দাঁড়িপাল্লা, এবং তাকদীরের পুরো বিষয়টি, ভালো-মন্দ যাই হোক।” (আহমদ ১৭১৬৭, ১৭৫০২)।
]৯[ إِذَا فَعَلْتَ ذَلِكَ فَقَدْ آمَنْتَ "এসব করলে (বোঝা যাবে), তুমি ঈমান এনেছ” (আহমাদ ১/৩১৯ (২১২৪))。
]৮[ أَنْ تَخْشَى اللَّهَ “তুমি আল্লাহকে এমনভাবে ভয় করবে" (মুসলিম ১১/৭ (১০১)।
[১] 'তিনি বলেন, "এরূপ করলে বোঝা যাবে, আমি আন্তরিকতার সঙ্গে আমল করেছি?" নবি ﷺ বলেন, “নআ’ম, ‘হ্যাঁ’!” (আহমাদ ১৭১৬৭, ১৭৫০২) |
[২] 'আল্লাহর রাসূল ﷺ তাকে যে জবাব দিচ্ছেন, আমরা তা শুনতে পাই; কিন্তু তিনি যার সঙ্গে কথা বলছেন তাকে দেখা যাচ্ছিল না, তার কথাও শোনা যাচ্ছিল না' (আহমাদ ১৭১৬৭, ১৭৫০২)।
]0[ وَلَكِنْ سَأُحَدِّثُكَ عَنْ أَشْرَاطِهَا “তবে আমি তোমাকে এর কিছু আলামত বলে দিচ্ছি” (মুসলিম ১৭/৫ (৯))। 'তখন প্রশ্নকারী বলেন, "আল্লাহর রাসূল! আপনি চাইলে আমি আপনাকে দুটি আলামতের কথা বলতে পারি, যা কিয়ামাতের আগে ঘটবে।" নবি ﷺ বলেন, حدثني "আমাকে বলুন (তা হলে)।” তখন তিনি বলেন, "যখন দেখবেন-দাসী তার মনিবকে জন্ম দিচ্ছে, প্রাসাদের মালিকরা প্রাসাদ-নির্মাণে প্রতিযোগিতায় নামছে এবং পায়ে-জুতা-নেই-এমন অভাবী লোকেরা মানুষের নেতা হয়ে গিয়েছে।" এরপর তিনি জানতে চান, "আল্লাহর রাসূল! এ লোকগুলো কারা (হবে)?" নবি ﷺ বলেন, الغريب "বেদুইনরা।” (আহমাদ ১৭১৬৭( |
]8[ الصُّمَّ الْبُكْمَ “বধির ও বোবা” (মুসলিম ১১/৭ (১০))।
]৫[ رُؤُوْسَ النَّاسِ "মানুষের নেতা” (মুসলিম ১৭/৫ (১))।
]৬[ بَعْلَهَا "তার কর্তাকে” (মুসলিম ১৮/৮ (...)।
]۹[ سُبْحَانَ اللَّهِ، خَمْسُ مِنَ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ “সুবহানাল্লাহ (আল্লাহ পবিত্র)! পাঁচটি বিষয় গাইব বা অদৃশ্যের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ তাআলা ছাড়া কেউ জানে না:” (আহমদ ১৭১৬৭, ১৭৫০২)।
]১] 'এরপর লোকটি চলে যায়। তখন নবি ﷺ বলেন, رُدُّوا عَلَيَّ الرَّجُل “লোকটিকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনো।" ]التي "লোকটিকে খুঁজে বের করো।” (আহমদ ৩৭৪)] তারা তাকে ফিরিয়ে আনতে যান, কিন্তু কিছুই দেখতে পাননি। তখন নবি ﷺ বলেন...' (মুসলিম ১৯/৭ (১০))|