📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 প্রবন্ধ : নিয়ন্ত্রণাধীন শয়তান

📄 প্রবন্ধ : নিয়ন্ত্রণাধীন শয়তান


আরব কিংবা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নজর দিলেই আমরা দেখতে পাই, ইরান-আমেরিকা উত্তেজনার খবরাখবর তারা খুব আয়োজন করে প্রকাশ করছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হবে, এই বুঝি ইরানের ওপর আমেরিকার সামরিক হামলা শুরুই হয়ে গেল। কারণ, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে; আর জর্জ ডাব্লিউ বুশের মতে এটি একটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, যার মাশুল 'বিপথগামী ইরান'-কে দিতেই হবে।

অনেকেই বলাবলি করেন, আমেরিকা কি সত্যিই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে? ইরাক অভিযানে অর্জিত তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলে কি এখন ইরানের পরমাণু প্রকল্পে বাধা দিতে যাবে? বর্তমান বিশ্বে আমেরিকার কল্যাণে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া কি আবশ্যক? আমার মনে হয়, আমেরিকা কখনই ইরানের ওপর হামলা করবে না; এর কোনো সম্ভাবনাই নেই। কেন নেই? চলুন কয়েকটি কারণ জানা যাক।

প্রথমত: আমেরিকা মোটেও এতটা নির্বোধ নয় যে, পা-য়ে পাড়া দিয়ে ইরানের সাথে যুদ্ধ বাধাবে। এ কথা সকলেরই জানা, মার্কিন সেনারা ইরাকেই মারাত্মক সঙ্কটের ভেতর দিয়ে গেছে; সেখানে তারা কল্পনাতীত সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে; এমনকি যুদ্ধ শেষে নিজেদেরকেই ক্ষতিগ্রস্ত মনে করতে হয়েছে। এসব কারণে অসংখ্য মার্কিন নাগরিক ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে। সর্বশেষ, আমেরিকার দুই প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী, অর্থাৎ ওবামা এবং জন সিডনি ম্যাককেইন তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ইরাক-সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে।

দ্বিতীয়ত: আমেরিকা খুব ভালোভাবেই জানে, ইরানে হামলার ফলে শিয়া ও সুন্নীদের মাঝে অন্তত রাজনৈতিকভাবে ঐক্য তৈরি হবে। তখন তারা উভয়ে মিলে আমেরিকার পেছনে উঠেপড়ে লাগবে। এতে করে ইরাকী সুন্নীদের বিরুদ্ধে শিয়াদের আক্রমণ বন্ধ হয়ে যাবে, যা আমেরিকার জন্য সুখকর হবে না। কারণ, ইরাক অভিযানে তাদের মূল লক্ষ্যই ছিল সুন্নী দমন। তা ছাড়া, ইরানে হামলা হলে স্বাভাবিকভাবেই তারা ইরাকী শিয়াদের সাহায্য করা বন্ধ করে দেবে। ফলে সুন্নীরা আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে; যা অচিরেই আমেরিকার জন্য মাথাব্যথার কারণ হবে।

তৃতীয়ত: ১৯৮০ সালের কথা। আমেরিকার একমাত্র ইরান অভিযানের অভিজ্ঞতা। উদ্দেশ্য ছিল ইরানী বিপ্লবের সেনাদের হাতে আটককৃত মার্কিন কূটনীতিকদের মুক্ত করা। এই সুবাদে আমেরিকা এক তিক্ত বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছিল। হামলা করতে এসে খোয়াতে হয়েছিল একাধিক যুদ্ধবিমান, নিহত হয়েছিল অনেক মার্কিন সেনা, ক্ষুণ্ণ হয়েছিল তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা। আসলে ইরানের মরু ও পার্বত্য অঞ্চলে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা আমেরিকার জন্য মোটেও সহজ কিছু ছিল না।

চতুর্থত: পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। আর আমেরিকা খুব ভালোভাবেই জানে, ইরাকের মতো ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প মোটেও কাল্পনিক নয়। সুতরাং এই দেশে হামলার মানেই হলো আমেরিকার আয়ত্তাধীন কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পারমাণবিক বোমাহামলার ঝুঁকি গ্রহণ করা। উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড়ো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে কাতারে; ওদিকে ফিলিস্তিনে দখলদার ইহুদীরাও ইরান থেকে অদূরে; আর ইরাক-কুয়েতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের বিপুল উপস্থিতির কথা তো বলাই বাহুল্য।

পঞ্চমত: দূর কিংবা অদূর অতীতের ইতিহাসে এমন কোনো ঘটনা উল্লেখিত হয়নি যাতে কোনো শিয়া রাষ্ট্র মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধরত অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে। শিয়া রাষ্ট্রগুলো স্বভাবত কোনো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে চোখও রাঙায় না। তবে হ্যাঁ, কেউ যখন তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাদের হুঙ্কার দেখে কে! বলতে দ্বিধা নেই, পার্শ্ববর্তী সুন্নী রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে ব্যয়ের জন্যই মূলত শিয়া রাষ্ট্রগুলো শক্তি সঞ্চয় করে রাখে।

বুওয়াইহিয়া শিয়া সাম্রাজ্যের কথা মনে আছে? খ্রিষ্টীয় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ছিল তাদের একেবারে নিকটে। এরপরও কিন্তু তাদের সঙ্গে কোনো রকম সংঘর্ষ হয়নি। অপরদিকে আব্বাসী খেলাফতের বিরুদ্ধে তারা ঠিকই যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। একই আচরণ করেছে উবাইদিয়া শিয়া সাম্রাজ্য। উত্তর স্পেনে বসবাসকারী ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে তো কিছু বলেনি, বরং দক্ষিণ স্পেনের সুন্নী শাসক আবদুর রহমান আন-নাসিরের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করেছে। ক্রুসেডাররা যখন শাম ও ফিলিস্তিনে আগ্রাসন চালিয়েছিল, এই মিশরে থাকা উবাইদিয়া শিয়ারা কেবল চেয়ে চেয়ে দেখেছে। বরং বিভিন্ন অঞ্চলে সুন্নী সেলজুক শাসকদের বিপক্ষে খ্রিষ্টানদের সাহায্য করেছে। এমনকি সুন্নীদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলগুলো ভাগ-বণ্টনের রূপরেখা তারাই তৈরি করেছে। সাফাভিদ শিয়া সাম্রাজ্য খ্রিষ্টান দেশ ফ্রান্স, ইংল্যান্ড এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করলেও সুন্নী উসমানী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ঠিকই যুদ্ধ করেছে। শিয়া রাষ্ট্র ইরান ধর্মত্যাগী রাশিয়ার ব্যাপারে বরাবরই নিশ্চুপ থেকেছে; অপরদিকে আফগান মুজাহিদদের ঠিকই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আমেরিকা বা ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে না জড়ালেও ইরাকের সঙ্গে ঠিকই আট-আটটি বছর যুদ্ধ চালিয়ে গেছে।

এসব ইতিহাস সামনে রেখে খুব সহজেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, ইরান কোনো অবস্থায়ই আমেরিকা কিংবা ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবে না, যদি না তারা হামলার শিকার হয়। তাদের ওপর সামান্য আঘাত এলেও তারা তার সমুচিত জবাব দেবে। ঠিক যেমনটি আমরা দেখেছি দক্ষিণ লেবাননে হিযবুল্লাহর আচরণ ও উচ্চারণে।

ষষ্ঠত: কয়েক মাস যাবৎ আমরা দেখতে পাচ্ছি, ইরানের রাষ্ট্রপতি আহমাদি নেজাদ যখনই ইরাক সফরে যান, আমেরিকা তাকে নিরাপত্তার চাদরে জড়িয়ে রাখে। এ থেকে স্পষ্ট হয়, ইরান-আমেরিকা দ্বন্দ্বের কথা মিডিয়া যেভাবে প্রচার করে, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। যদি ভিন্ন কিছু হয়েই থাকে, তাহলে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে এই যে চিল্লা-পাল্লা, হুমকি-ধামকি এসব অনর্থক নয় কি?

পরিশেষে সম্ভাব্য যে দিকটি থাকে তা হলো, আমেরিকা বিশ্ববাসীর সামনে ইরানে থাকা এমন এক 'জুজু'-র সংবাদ পেশ করতে চায়, যা শুনে আশপাশের রাষ্ট্রগুলো ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং তাদের কাছে ইরাক ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি যৌক্তিক মনে হয়।

অর্থাৎ, ইরান অচিরেই তেমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে, যেমনটি ইতঃপূর্বে হয়েছিল সাদ্দাম হুসাইন। সাদ্দাম পূর্ণ তেরো বছর ইরাক শাসন করেছেন। দীর্ঘ এ সময়ে আমেরিকা তার কোনো রকম বিরোধিতা করেনি। কিন্তু হঠাৎ তারা এমন উদ্ভট পরিস্থিতি তৈরি করল যে, অনেকেই সাদ্দাম হুসাইনের হাত থেকে ইসলামী দেশগুলো হেফাজতের জন্য আমেরিকার মতো ত্রাণকর্তার উপস্থিতি খুশি মনে মেনে নিল।

এরপর যখন সাদ্দাম হুসাইন অধ্যায়ের অবসান ঘটল, ক্ষমতাসীনদের কাতারে তিনি আর উল্লেখযোগ্য কেউ রইলেন না, তখন সকল রহস্য উন্মোচিত হলো; জানা গেল, ধ্বংসাত্মক অস্ত্র তৈরির অপবাদ এবং তার ওপর ভিত্তি করে ইরাকে চালানো মার্কিন সেনাদের আগ্রাসন সবই ছিল আমেরিকার সাজানো নাটক। ইরাকে আদৌও কোনো বিধ্বংসী অস্ত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

কিন্তু মানুষ বরাবরই খুব দ্রুত সব ভুলে যায়। এবারও তাই হলো। এই সুবাদে আমেরিকা এখন আবার নতুন জুজুর সন্ধানে নেমেছে। তবে এবারের জুজু তাদেরই নিয়ন্ত্রণাধীন। সুতরাং কোনো রকম ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা নেই, কিংবা নেই কোনো সংঘাত ও সংঘর্ষের সম্ভাবনা। এ ক্ষেত্রে আমেরিকার জন্য ইরানের চেয়ে উত্তম বিকল্প আর হতেই পারে না। এজন্য বিশ্ববাসীর চোখে ধুলো দিতে তারা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সুপরিকল্পিতভাবে ‘মিডিয়া সন্ত্রাস’ চালিয়ে যাচ্ছে।

তবে হ্যাঁ, ইরানের পালাও বছর কয়েক পরে শেষ হয়ে যাবে। তখন আমেরিকা আবার নতুন কোনো জুজুর অন্বেষণে বেরিয়ে পড়বে। নির্বোধ ও নির্লজ্জের মতো এই খেলা তারা চালিয়েই যাবে, যতদিন না মুসলমান নিজের পায়ে দাঁড়ায় এবং এই অঞ্চলের সকল জুজুকে উচিত শিক্ষা দিতে সক্ষম হয়—হোক সেটা মার্কিন, ইরানী কিংবা ইহুদী।

ফন্ট সাইজ
15px
17px