📄 সংস্কারপন্থি ও সনাতনপন্থি : মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ
৭৫% ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে যদি শীর্ষ নেতার চোখের ইশারায় পদচ্যুত হতে হয়, তবে এত খরচ করে নির্বাচন অনুষ্ঠান করার কী দরকার?! কী প্রয়োজন এত প্রচার-প্রচারণার?! কী প্রয়োজন সংবাদ মাধ্যমগুলোতে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তোলার?
১৯৮১ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ইরানের রাষ্ট্রপতি ছিলেন জনাব আলী খামেনেয়ী। তিনি একবার খোমেনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত অভিভাবক পরিষদের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে 'শ্রম আইন'-সংশ্লিষ্ট একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেন। এতে খোমেনী তার প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় একটি চিঠি লিখেন। তাতে তিনি তাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, 'বিলায়াতুল ফাকীহ' মূলত 'বিলায়াতুর রাসূল' এর সমার্থক। কেননা তিনি আত্মগোপনে থাকা সেই নিষ্পাপ ইমামের পক্ষ থেকেই নির্বাচিত। একপর্যায়ে আলী খামেনেয়ী নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন। যদিও খোমেনীর মৃত্যুর পর তিনিই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদ অলঙ্কৃত করেন। এবং এ পদের বলে তিনি নিষ্পাপ হয়ে যান, উঠে যান সকল সমালোচনার ঊর্ধ্বে।
আমরা সংস্কারপন্থি রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ খাতেমিকে দেখেছি, তিনি ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। দীর্ঘ এ শাসনামলে নতুন কিছুই আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি। আচ্ছা, ক্ষমতার পালাবদলে ইরানে কি কোনো পরিবর্তন ঘটে? নাকি দিনশেষে ওই শীর্ষ নেতার ইশারাই যাবতীয় কলকাঠি নড়ে?
আমরা স্পষ্ট করেই বলতে চাই, একজন ইরানী নেতা, তিনি যে-পন্থিই হোন না-কেন, বস্তুত তিনি কোনো দলের প্রতিনিধিত্ব করেন না। আক্ষরিক অর্থে ইরানে কোনো রাজনৈতিক দলও নেই, নেই কোনো দলপতি।
আহমাদি নেজাদের কথাই ধরুন! নির্বাচনে তিনি কেবল নিজ ব্যক্তিসত্তার প্রতিনিধিত্বই করেন, কোনো দলের নয়। মীর হুসাইন মুসাভীর অবস্থাও একই। ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মতোও নয়। যেমনটা আমরা দেখেছি, ওবামা ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধিত্ব করেছে, আর জন ম্যাককেইন প্রতিনিধিত্ব করেছে রিপাবলিকানদের। সে তুলনায় ইরানের নির্বাচন নিতান্তই ফালতু। বস্তুত, এসব নাটকীয় নির্বাচনের কী মূল্য থাকতে পারে?!
এজন্য ইরানের রাজপথে যখন পদপ্রার্থীদের সমর্থকরা সংঘাতে লিপ্ত হয়, সংবাদ-মাধ্যমগুলোতে তর্কযুদ্ধের অবতারণা হয়, তখন ধর্মীয় নেতারা সেসব দেখেও না দেখার ভান করেন, নীরবতা অবলম্বন করেন। তাদের এই নীরবতা কিন্তু অনিচ্ছাকৃত নয়।
এ বিষয়ে পরাজিত প্রার্থী মীর হুসাইন মুসাভী বলেন, 'অধিকার আদায়ের সকল পথ বন্ধ হয়ে আছে। অবশ্যই ইরানের জনগণ ধর্মীয় নেতাদের নীরবতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে।' তিনি এই নীরবতাকে জালিয়াতির চেয়েও ভয়ংকর আখ্যায়িত করেন।
ধর্মীয় নেতারা জনগণের উত্তেজনা দেখেও নির্বাক থাকেন; ভাবখানা এমন, যেন অতিব গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদ ঘিরে এই উত্তেজনা। চুপ থেকে তারা বোঝাতে চান—দেশে গনতন্ত্র বিদ্যমান, আন্দোলনকারীরাও স্বাধীন এবং প্রার্থীরাও জনগণের সমর্থনে নির্বাচিত হন। কিন্তু এসব লম্ফঝম্প দিনশেষে কেবলই নাটক, যাতে জনগণের পছন্দের অভিনেতারা শীর্ষ নেতার লেখা স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী অভিনয় করেন মাত্র।
📄 ইরানের প্রতি মুগ্ধতার কারণ
বাস্তবতা যদি এমনই হয়ে থাকে, তবে কেন আমরা এই দুরবস্থার প্রতি মুগ্ধ হই? অনেক লেখক, এমনকি অনেক ইসলামী লেখকও কেন জোরগলায় ইরানের পদাঙ্ক অনুসরণের কথা বলেন?!
আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী যেসব কারণে মুসলমানরা ইরানের প্রতি আকৃষ্ট হয়, সেগুলো হলো:
এক. ইরানের সংবিধান, শাসনব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রপ্রধান ও শীর্ষ নেতার মাঝে সম্পর্কের ধরন সম্বন্ধে আমাদের অজ্ঞতা। তা ছাড়া, সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অধিকাংশ সময়ই আমরা বিবেকের ওপর আবেগকে প্রাধান্য দিই; নামমাত্র ইসলামের ঝান্ডা যে উঁচু করে ধরে, তার দিকেই ধাবিত হই; যদিও সে হয়ে থাকে ভ্রান্ত, পথভ্রষ্ট।
দুই. ইসলামের 'হাকিকত' আমাদের সামনে স্পষ্ট না থাকা। আমরা অনেকেই হয়তো জানি না, ইসলাম হযরত আবু বকর ও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমার মতো মহান খলীফাদের ওপরও যৌক্তিক আপত্তি তোলার সুযোগ দিয়েছে। এমনকি, স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে আমল ওহীনির্ভর নয়, তা নিয়েও আলোচনা-পর্যালোচনার অনুমতি দিয়েছে।
তিন. আমরা আসলে আরব দেশগুলোতে স্বৈরশাসন, প্রহসনের নির্বাচন এবং অরাজকতা দেখতে দেখতে অভ্যন্ত। তাই বাহ্যত ভালো কিছু দেখতেই আমাদের ভালো লাগে, যদিও তার ভেতরটা হয় ভঙ্গুর। এজন্য অনেক খোঁজাখুঁজি করে যখন কিছু একটা পেয়ে যাই, অমনি বলে ফেলি, 'আলহামদুলিল্লাহ, এই তো পাওয়া গেছে শুরা-ভিত্তিক "ইসলামিক স্টেট", বাহ!'
চার. ইরাক, বাহরাইন, সৌদি আরব, সিরিয়া, মিশর, লেবাননের পরিস্থিতি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, সে বিষয়ে আমরা একেবারেই বে-খবর; এমনকি আমরা হয়তো এও জানি না যে, ইরানের সুন্নী মুসলিমদের ওপরও শীর্ষ ধর্মীয় নেতার ক্ষমতার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে; তারা একটু একটু করে 'বিলায়াতুল ফাকীহ' চিন্তাধারার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এও ভাবতে শুরু করেছে যে, 'সুন্নীরা দীনের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত। কেননা, গায়েবী ইমাম তো শীর্ষ নেতাকে পরিস্থিতি অনুকূলে আনার দায়িত্ব দিয়েছেন মাত্র, যেন তিনি আগমনের সময় তাকে স্বাগত জানতে পারেন।'
পাঁচ. আমেরিকা ও ইসরায়েলের জুলুম ও অত্যাচারে আমরা পিষ্ট। এজন্য কেউ তাদের বিরুদ্ধে বললে আমরা এতটাই উল্লসিত হই যে, তার সম্পর্কে আর ঘাঁটাঘাঁটির প্রয়োজন মনে করি না: এমনকি, ইতিহাসের পাতায় একটু নজর বুলাতেও চাই না। অথচ একটু চিন্তা করলেই আমরা বুঝতে পারব ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা আসার সম্ভাবনা শূন্যের কোটায়।
প্রিয় ভাইয়েরা, আমাদের অবশ্যকর্তব্য হলো, মুসলিম উম্মাহকে সুস্থ চেতনা ও বিশুদ্ধ নীতির ওপর গড়ে তোলা; যা প্রাচ্য কিংবা পশ্চিমা মতাদর্শ অবলম্বনে সম্ভব নয়: শিয়া কিংবা খারেজি মতবাদের দিকে গেলে তো আরও অসম্ভব। আমাদেরকে অবশ্যই কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে যেতে হবে, শেকড়ের সন্ধান করতে হবে। যাবতীয় পরিবর্তন ও পরিবর্ধনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পথনির্দেশনা সামনে রাখতে হবে, ইতিহাসের পাতায় অমর সালাফে সালেহীনের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে। তাঁদের চেয়ে উত্তম আর কারা হতে পারে?! ভ্রষ্টদের প্রতি ভক্তি নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক নয় কি?