📄 নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানের পদচ্যুতি
খোমেনীর ক্ষমতার তৃষ্ণা এতেও মেটেনি; রাষ্ট্রের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদের কলকাঠি নিজের কব্জায় রেখেই তবে তিনি ক্ষান্ত হয়েছেন। সংবিধানের ১১০ নং ধারায় উল্লিখিত হয়েছে, বিপ্লবের সর্বাধিনায়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাখবেন; বিশেষত সংস্কৃতি, রীতিনীতি এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে যে-কোনো রদবদল করতে পারবেন। তিনিই সশস্ত্রবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ এবং তার ইচ্ছায়ই রাষ্ট্রীয় সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও পরিষদের প্রধানদের নিয়োগ-বিয়োগ কার্যকর হবে। তিনিই প্রধান বিচারপতি, রেডিও-টেলিভিশন সংস্থার প্রধানের নিয়োগ দেবেন। তার সিদ্ধান্তেই সামরিক বাহিনীর প্রধান এবং বিপ্লবের প্রধান কমান্ডার নির্ধারিত হবে। এর চেয়েও গুরুতর বিষয় হলো, তিনি চাইলেই জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দিতে পারবেন।
আসলে খোমেনী সকল ক্ষমতা এমনভাবে কুক্ষিগত করে রেখেছেন যে, আরব-একনায়কতন্ত্রের কেউ তা কখনো কল্পনাও করতে পারেননি। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, আপনি জেনে অবাক হবেন, খোমেনী যা কিছু করেন, এর সবই নাকি ইমাম মাহদীর দেওয়া ক্ষমতাবলেই করেন। তাই সাধারণ কেউ সেসবের বিরুদ্ধাচরণ করল, তো সে যেন শিরক করে ফেলল! কারণ সে নিষ্পাপ ইমামের ওপর আপত্তি তুলেছে, যে ইমামের কাছে স্বয়ং আল্লাহর ইলহাম আসে।
এই ভ্রান্ত আকীদাটিকে তারা ইমাম জাফর আস-সাদিকদের নামে চালিয়ে দেয়। তিনি নাকি বলেছেন: 'কোনো বিষয়ে ফয়সালা দেওয়ার পরও যদি কেউ তা অগ্রাহ্য করে, তবে যেন সে আল্লাহর বিধানের প্রতিই তাচ্ছিল্য প্রকাশ করল এবং আমাদের বিরুদ্ধাচরণ করল। আর আমাদের বিরুদ্ধাচরণ মানে তো আল্লাহরই বিরুদ্ধাচরণ। সুতরাং তা শিরক।'
এহেন পরিস্থিতিতে খোমেনীর প্রতি আপনার ক্ষোভ আসতে পারে। কিন্তু তিনি বড়ো বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন; ক্ষমতার এই লীলাখেলা তিনি খুব সহজেই লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে গেছেন। তিনি যে একজন প্রতাপশালী সর্বাধিনায়ক, কাউকে তা বুঝতেই দেননি।
খোমেনী 'রাঈসুল জামহুরিয়াহ' বা 'প্রজাতন্ত্রের প্রধান' নামে একটি পদ সৃষ্টি করেছেন; যদিও সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাই সেখানে সর্বেসর্বা। এবার এই 'প্রজাতন্ত্রের প্রধান' বা 'রাষ্ট্রপ্রধান'-কে নির্বাচনের ক্ষমতা দিয়ে দিয়েছেন জনগণের হাতে। যাতে তারা একটু হলেও সান্ত্বনা পায়, ধরে নেয় তাদের ভোটেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হচ্ছে, যিনি তাদের আশা- আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে। কিন্তু আসলেই কি তাই? নাকি ইরানের প্রেসিডেন্ট নিয়ে বোঝার আছে আরও অনেক কিছু?
টিকাঃ
১. মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াকুব আল-কুলাইনি কৃত কাফি; খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৬৭
২. President of the Republic (رئيس الجمهورية)
📄 প্রেসিডেন্ট নির্বাচনপ্রক্রিয়া
জনাব খোমেনী 'মাজলিসু সিয়ানাতিল দাসতুর' বা 'সংবিধান সংরক্ষণ পরিষদ', ভিন্ন অর্থে 'অভিভাবক পরিষদ' নামে একটি নতুন বোর্ড গঠন করেন। এ বোর্ডের প্রধান কাজ হলো প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া। বারো সদস্যবিশিষ্ট এ বোর্ডের ছয়জনকে খোমেনী নিজে মনোনীত করেন। বাকিরা সংসদ সদস্যদের পরামর্শে বিচারব্যবস্থার প্রধান কর্তৃক নির্বাচিত হয়। উল্লেখ্য, বিচারব্যবস্থার প্রধানের নিয়োগ কিন্তু সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার মর্জিমাফিকই হয়ে থাকে।
বলাবাহুল্য, কথিত এই অভিভাবক পরিষদের প্রত্যেক সদস্যকে হয়তো সর্বোচ্চ নেতা নিজে মনোনীত করবেন, কিংবা তার মর্জিমতে নির্বাচত হবে। এবার এই বোর্ড প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদের মাঝে যে কারও মনোনয়নপত্র বাতিল কিংবা কবুল করতে পারবে। সন্দেহ নেই, বোর্ড কেবলই ওই সকল প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রই গ্রহণ করবে, সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে যাদের রয়েছে দহরম-মহরম।
সুতরাং ফলাফল এই দাঁড়াল যে, শীর্ষ নেতার অপছন্দের কেউ প্রার্থীই হতে পারবে না, পদ পাওয়া তো বহুদূরের কথা। আর 'সংস্কারপন্থি' এবং 'সনাতনপন্থি' নামে যে দুটি দলের অস্তিত্বের কথা আমরা জানি, বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মাঝে মতবিরোধ দেখা দিলে যে শীর্ষ নেতাকে চুপ থাকতে দেখি, এর সবই লোকদেখানো।
বিষয়টি ভালোভাবে বোঝার জন্য একটি উদাহরণ পেশ করছি। দেখুন, সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মোট ৪৭১ জন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেয়। কিন্তু অভিভাবক পরিষদ মাত্র চারজনের আবেদন গ্রহণ করে। যাদের দুইজন সনাতনপন্থি, দুইজন সংস্কারপন্থি। তবে সকলেই ছিলেন শাসকগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত এবং সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার অনুগত। উদাহরণস্বরূপ, আহমাদি নেজাদের সঙ্গে শীর্ষ নেতা আলী খামেনেয়ীর সম্পর্ক তো অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তিনি 'বিলায়াতুল ফাকীহ' চিন্তাধারার অন্ধভক্ত এবং সনাতনপন্থি রক্ষণশীল দলের সদস্য।
তার সঙ্গে চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল মীর হুসাইন মুসাভী। মুসাভী সংস্কারপন্থি দলের সদস্য। তার আরও একটি পরিচয় হলো, তিনি ইরানী বিপ্লবের একজন সক্রিয় সমর্থক। বিপ্লবের সময় তিনি প্যারিস থেকে তেহরানে চলে আসেন। শুধু তা-ই নয়, খোমেনীর শাসনামলে ১৯৮১ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। উল্লেখ্য, এ পদটি বিলুপ্ত হওয়ার আগে তিনিই ছিলেন সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী।
তৃতীয় প্রার্থী ছিলেন সংস্কারপন্থি দলের সদস্য জনাব মাহদী কাররুবী। তিনি ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ইরানী পার্লামেন্টের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আর চতুর্থ প্রার্থী ছিলেন জনাব মুহসিন রিজায়ী। সনাতনপন্থি রক্ষণশীল দলের সদস্য জনাব মুহসিন ইরান-ইরাক যুদ্ধে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দায়িত্বরত ছিলেন।
নিঃসন্দেহে তাদের প্রত্যেকেই ছিলেন শাসকগোষ্ঠীর প্রতিনিধি এবং সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার মনোবাসনা পূরণকারী।
কখনো কখনো এমনও ঘটে যে, জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান উল্লিখিত বিষয়গুলো বেমালুম ভুলে গিয়েছেন এবং এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন যা শীর্ষ নেতার মতের বিরুদ্ধে চলে যায়। কিন্তু এরপর কী ঘটতে পারে বলে আপনার মনে হয়?
এ নিয়ে ভবিষ্যদ্বক্তা হওয়ার কিছু নেই; সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরতে পারে এমন বাস্তব ঘটনাই আছে। যেমন, আবুল হাসান বনীসদর। তিনি ছিলেন ইরানী বিপ্লব উত্তর প্রথম রাষ্ট্রপধান; ক্ষমতায় আসেন ১৯৮০ সালে খোমেনীর শাসনামলে। প্রথমে তিনি নিজেকে অন্যসব রাষ্ট্রপতির মতো যথেষ্ট স্বাধীন ও ক্ষমতাবান ভাবতে শুরু করেন। তিনি যেহেতু পঁচাত্তর শতাংশ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন—যাকে বলা যায় বিপুল ভোটে বিজয়ী—সুতরাং তার এ ভাবনা মোটেও অমূলক ছিল না।
কিন্তু কিছুকাল পরই নিজেকে তিনি নিছক 'কাঠের পুতুল' হিসেবে আবিষ্কার করেন। কারণ, রাষ্ট্রপতি হয়েও তার হাতে তার সরকারের জন্য প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না, ছিল না মন্ত্রিত্ব বণ্টনে কোনো রকম পরামর্শ দেওয়ার অধিকার, খোমেনীর অনুমতি ছাড়া কিচ্ছুটি বলার অধিকার; সহজ কথায়, তিনি ছিলেন একটি 'রোবট', যার 'রিমোট' শীর্ষ নেতা খোমেনীর হাতে।
এই অবরুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর একসময় তিনি আপত্তি তোলেন। কিন্তু ফলাফল দাঁড়াল এই যে, খোমেনী সাহেব আস্তে করে তাকে সরিয়ে দিলেন এবং তার স্থলে অন্যজনকে বসালেন।
টিকাঃ
৩. Guardian Council (مجلس صيانة الدস্তুর)
📄 সংস্কারপন্থি ও সনাতনপন্থি : মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ
৭৫% ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে যদি শীর্ষ নেতার চোখের ইশারায় পদচ্যুত হতে হয়, তবে এত খরচ করে নির্বাচন অনুষ্ঠান করার কী দরকার?! কী প্রয়োজন এত প্রচার-প্রচারণার?! কী প্রয়োজন সংবাদ মাধ্যমগুলোতে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তোলার?
১৯৮১ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ইরানের রাষ্ট্রপতি ছিলেন জনাব আলী খামেনেয়ী। তিনি একবার খোমেনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত অভিভাবক পরিষদের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে 'শ্রম আইন'-সংশ্লিষ্ট একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেন। এতে খোমেনী তার প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় একটি চিঠি লিখেন। তাতে তিনি তাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, 'বিলায়াতুল ফাকীহ' মূলত 'বিলায়াতুর রাসূল' এর সমার্থক। কেননা তিনি আত্মগোপনে থাকা সেই নিষ্পাপ ইমামের পক্ষ থেকেই নির্বাচিত। একপর্যায়ে আলী খামেনেয়ী নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন। যদিও খোমেনীর মৃত্যুর পর তিনিই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদ অলঙ্কৃত করেন। এবং এ পদের বলে তিনি নিষ্পাপ হয়ে যান, উঠে যান সকল সমালোচনার ঊর্ধ্বে।
আমরা সংস্কারপন্থি রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ খাতেমিকে দেখেছি, তিনি ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। দীর্ঘ এ শাসনামলে নতুন কিছুই আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি। আচ্ছা, ক্ষমতার পালাবদলে ইরানে কি কোনো পরিবর্তন ঘটে? নাকি দিনশেষে ওই শীর্ষ নেতার ইশারাই যাবতীয় কলকাঠি নড়ে?
আমরা স্পষ্ট করেই বলতে চাই, একজন ইরানী নেতা, তিনি যে-পন্থিই হোন না-কেন, বস্তুত তিনি কোনো দলের প্রতিনিধিত্ব করেন না। আক্ষরিক অর্থে ইরানে কোনো রাজনৈতিক দলও নেই, নেই কোনো দলপতি।
আহমাদি নেজাদের কথাই ধরুন! নির্বাচনে তিনি কেবল নিজ ব্যক্তিসত্তার প্রতিনিধিত্বই করেন, কোনো দলের নয়। মীর হুসাইন মুসাভীর অবস্থাও একই। ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মতোও নয়। যেমনটা আমরা দেখেছি, ওবামা ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধিত্ব করেছে, আর জন ম্যাককেইন প্রতিনিধিত্ব করেছে রিপাবলিকানদের। সে তুলনায় ইরানের নির্বাচন নিতান্তই ফালতু। বস্তুত, এসব নাটকীয় নির্বাচনের কী মূল্য থাকতে পারে?!
এজন্য ইরানের রাজপথে যখন পদপ্রার্থীদের সমর্থকরা সংঘাতে লিপ্ত হয়, সংবাদ-মাধ্যমগুলোতে তর্কযুদ্ধের অবতারণা হয়, তখন ধর্মীয় নেতারা সেসব দেখেও না দেখার ভান করেন, নীরবতা অবলম্বন করেন। তাদের এই নীরবতা কিন্তু অনিচ্ছাকৃত নয়।
এ বিষয়ে পরাজিত প্রার্থী মীর হুসাইন মুসাভী বলেন, 'অধিকার আদায়ের সকল পথ বন্ধ হয়ে আছে। অবশ্যই ইরানের জনগণ ধর্মীয় নেতাদের নীরবতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে।' তিনি এই নীরবতাকে জালিয়াতির চেয়েও ভয়ংকর আখ্যায়িত করেন।
ধর্মীয় নেতারা জনগণের উত্তেজনা দেখেও নির্বাক থাকেন; ভাবখানা এমন, যেন অতিব গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদ ঘিরে এই উত্তেজনা। চুপ থেকে তারা বোঝাতে চান—দেশে গনতন্ত্র বিদ্যমান, আন্দোলনকারীরাও স্বাধীন এবং প্রার্থীরাও জনগণের সমর্থনে নির্বাচিত হন। কিন্তু এসব লম্ফঝম্প দিনশেষে কেবলই নাটক, যাতে জনগণের পছন্দের অভিনেতারা শীর্ষ নেতার লেখা স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী অভিনয় করেন মাত্র।
📄 ইরানের প্রতি মুগ্ধতার কারণ
বাস্তবতা যদি এমনই হয়ে থাকে, তবে কেন আমরা এই দুরবস্থার প্রতি মুগ্ধ হই? অনেক লেখক, এমনকি অনেক ইসলামী লেখকও কেন জোরগলায় ইরানের পদাঙ্ক অনুসরণের কথা বলেন?!
আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী যেসব কারণে মুসলমানরা ইরানের প্রতি আকৃষ্ট হয়, সেগুলো হলো:
এক. ইরানের সংবিধান, শাসনব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রপ্রধান ও শীর্ষ নেতার মাঝে সম্পর্কের ধরন সম্বন্ধে আমাদের অজ্ঞতা। তা ছাড়া, সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অধিকাংশ সময়ই আমরা বিবেকের ওপর আবেগকে প্রাধান্য দিই; নামমাত্র ইসলামের ঝান্ডা যে উঁচু করে ধরে, তার দিকেই ধাবিত হই; যদিও সে হয়ে থাকে ভ্রান্ত, পথভ্রষ্ট।
দুই. ইসলামের 'হাকিকত' আমাদের সামনে স্পষ্ট না থাকা। আমরা অনেকেই হয়তো জানি না, ইসলাম হযরত আবু বকর ও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমার মতো মহান খলীফাদের ওপরও যৌক্তিক আপত্তি তোলার সুযোগ দিয়েছে। এমনকি, স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে আমল ওহীনির্ভর নয়, তা নিয়েও আলোচনা-পর্যালোচনার অনুমতি দিয়েছে।
তিন. আমরা আসলে আরব দেশগুলোতে স্বৈরশাসন, প্রহসনের নির্বাচন এবং অরাজকতা দেখতে দেখতে অভ্যন্ত। তাই বাহ্যত ভালো কিছু দেখতেই আমাদের ভালো লাগে, যদিও তার ভেতরটা হয় ভঙ্গুর। এজন্য অনেক খোঁজাখুঁজি করে যখন কিছু একটা পেয়ে যাই, অমনি বলে ফেলি, 'আলহামদুলিল্লাহ, এই তো পাওয়া গেছে শুরা-ভিত্তিক "ইসলামিক স্টেট", বাহ!'
চার. ইরাক, বাহরাইন, সৌদি আরব, সিরিয়া, মিশর, লেবাননের পরিস্থিতি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, সে বিষয়ে আমরা একেবারেই বে-খবর; এমনকি আমরা হয়তো এও জানি না যে, ইরানের সুন্নী মুসলিমদের ওপরও শীর্ষ ধর্মীয় নেতার ক্ষমতার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে; তারা একটু একটু করে 'বিলায়াতুল ফাকীহ' চিন্তাধারার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এও ভাবতে শুরু করেছে যে, 'সুন্নীরা দীনের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত। কেননা, গায়েবী ইমাম তো শীর্ষ নেতাকে পরিস্থিতি অনুকূলে আনার দায়িত্ব দিয়েছেন মাত্র, যেন তিনি আগমনের সময় তাকে স্বাগত জানতে পারেন।'
পাঁচ. আমেরিকা ও ইসরায়েলের জুলুম ও অত্যাচারে আমরা পিষ্ট। এজন্য কেউ তাদের বিরুদ্ধে বললে আমরা এতটাই উল্লসিত হই যে, তার সম্পর্কে আর ঘাঁটাঘাঁটির প্রয়োজন মনে করি না: এমনকি, ইতিহাসের পাতায় একটু নজর বুলাতেও চাই না। অথচ একটু চিন্তা করলেই আমরা বুঝতে পারব ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা আসার সম্ভাবনা শূন্যের কোটায়।
প্রিয় ভাইয়েরা, আমাদের অবশ্যকর্তব্য হলো, মুসলিম উম্মাহকে সুস্থ চেতনা ও বিশুদ্ধ নীতির ওপর গড়ে তোলা; যা প্রাচ্য কিংবা পশ্চিমা মতাদর্শ অবলম্বনে সম্ভব নয়: শিয়া কিংবা খারেজি মতবাদের দিকে গেলে তো আরও অসম্ভব। আমাদেরকে অবশ্যই কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে যেতে হবে, শেকড়ের সন্ধান করতে হবে। যাবতীয় পরিবর্তন ও পরিবর্ধনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পথনির্দেশনা সামনে রাখতে হবে, ইতিহাসের পাতায় অমর সালাফে সালেহীনের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে। তাঁদের চেয়ে উত্তম আর কারা হতে পারে?! ভ্রষ্টদের প্রতি ভক্তি নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক নয় কি?