📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 খোমেনীর একনায়কতন্ত্র

📄 খোমেনীর একনায়কতন্ত্র


১৯৭৯ সালে জনাব খোমেনী বিপ্লবের ডাক দেন। এর মাধ্যমে তিনি ইরানের সাবেক রাষ্ট্রনায়ক শাহ পাহলভীকে পদচ্যুত করেন। ইরানের ইতিহাসে শাহ পাহলভী ছিলেন অসামান্য ক্ষমতার অধিকারী; কাঙ্ক্ষিত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনে বিশেষ পারদর্শী।

তার পতনের পর খোমেনীর শাসন আরম্ভ হয়। কিন্তু তিনি কী করেছিলেন? বলাবাহুল্য, একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় তিনি ছিলেন শাহ পাহলভীর চেয়েও কয়েক ধাপ এগিয়ে; ক্ষমতা কুক্ষিগত করার বিবেচনায় শাহকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন বহুদূরে। শাহের শাসনামলে জনগণ তবু একটু-আধটু আলোচনা-সমালোচনার সুযোগ পেত। কিন্তু খোমেনীর জমানায় এসে তা যেন একেবারে নিশ্চিহ্নই হয়ে গেল।

তাহলে আমরা যে মাঝেমধ্যে তর্ক-বিতর্ক, প্রতিরোধ-প্রতিবাদ দেখি এসব তাহলে কীভাবে সম্ভব? বস্তুত, এসব নিতান্তই লোকদেখানো, যার আসল উদ্দেশ্য শাসকগোষ্ঠী ও শাসনব্যবস্থার প্রতি সকলের সুদৃষ্টি লাভ করা; বোঝাতে চাওয়া—দেশে সুশাসনের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে, জনগণের প্রতিটি মত সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে।

📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 এই পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হলো?

📄 এই পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হলো?


শিয়াদের ইতিহাস সামনে রেখে জনাব খোমেনী প্রথমে 'বিলায়াতুল ফাকীহ' নামে একটি নতুন আকীদা বা চিন্তাধারা প্রবর্তন করেন। সেই সুবাদে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন।

শিয়া মতাদর্শের মূলনীতি হলো, 'বিলায়াত' তথা 'সমগ্র জাতির নেতৃত্ব বা অভিভাবকত্ব' কেবল একজন নিষ্পাপ ইমামের কাঁধেই অর্পিত হতে পারে। তাদের বিশ্বাস হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু, তাঁর পুত্র হযরত হাসান ও হুসাইন রাযিয়াল্লাহu আনহুমা এবং পর্যায়ক্রমে হযরত হুসাইনের উত্তরসূরিরা সকলে নিষ্পাপ। আর তাদের থেকেই তারা বারোজনকে নিজেদের ইমাম নির্ধারণ করে নিয়েছে।

তাদের এগারোতম ইমাম হলেন হাসান আল-আসকারী; যিনি ২৬০ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে উত্তরসূরি হিসেবে তিনি কাউকে কথিত 'নিষ্পাপ ইমাম' নির্ধারণ করে যাননি। এ নিয়ে বড়োসড়ো এক সমস্যার সৃষ্টি হয়; যার সমাধান করতে গিয়ে তারা হয় শতধাবিভক্ত।

এ সময় ইসনা আশারিয়া দলের নেতারা দাবি করে বসেন, ইমাম আসকারী তার পাঁচ বছরের শিশুপুত্রের ব্যাপারে ওসিয়ত করে গেছেন; কিন্তু এই শিশুটি কোনো এক অজানা গুহায় আত্মগোপন করে আছে। লেবানন, ইরানসহ আরও যত দেশে ইসনা আশারিয়া শিয়া আছে সকলেরই একই বিশ্বাস—সেই শিশুটি এখনো গুহাভ্যন্তরে লুকিয়ে আছে; একদিন-না-একদিন সে বেরিয়ে আসবে এবং সমগ্র দুনিয়া শাসন করবে। এ শিশুই তাদের কাছে প্রতিশ্রুত ইমাম, মাহদী।

শিয়াদের আকীদা অনুযায়ী শাসনভার গ্রহণ করা, সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা, শরীয়তের বিধান বাস্তবায়ন করা, সংঘবদ্ধ হওয়া, জিহাদ করা, হুদুদ কায়েম করা ইত্যাদি আমলগুলো নিষ্পাপ ইমামের উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। তাদের কল্পনাপ্রসূত ওই ইমাম যতদিন অনুপস্থিত থাকবে, ততদিন এ আমলসমূহ রহিত থাকবে। কী অদ্ভুত!

📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 বিলায়াতুল ফাকীহ

📄 বিলায়াতুল ফাকীহ


'বিলায়াতুল ফাকীহ' কথাটির অর্থ হলো 'আত্মগোপনে থাকা নিষ্পাপ সেই ইমাম মাহদী অচিরেই আত্মপ্রকাশ করবেন; তার অনুপস্থিতির সময়টুকুর জন্য তিনি একজন "ফকীহ" বা "ধর্মীয় নেতা"-র হাতে যাবতীয় দায়দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, যিনি যে-কোনো বিধিনিষেধ জারি করার অধিকার রাখেন, যা সর্বজনীন এবং স্বয়ং নিষ্পাপ ইমাম উপস্থিত থাকলে এটিই করতেন।'

এ দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধর্মীয় নেতা জাতির সর্বোচ্চ অভিভাবক, কথিত নিষ্পাপ ইমামের সমমর্যাদার ধারক। ইমামের মতো তিনিও নিষ্পাপ, তার কাছেও আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নির্দেশনা (ইলহাম) আসে এবং তার মর্যাদাও নবীদের থেকে বেশি। কারণ, তাদের মতে নবীদের আগমন একটি নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য ছিল; পক্ষান্তরে নিষ্পাপ ইমামের জিম্মাদারি আজও বহাল।

ইতঃপূর্বে আমরা দেখিয়েছি, খোমেনী তার আল-হুকুমাতুল ইসলামিয়া গ্রন্থে বলেছেন: 'আমাদের মতাদর্শের ইমামরা মর্যাদার যে স্তরে উন্নীত হয়েছেন, কোনো ফেরেশতা কিংবা নবী-রাসূলও সে স্তরে পৌঁছতে পারেননি।'

ইরানের জনগণ এই মতাদর্শ গ্রহণ করে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবকের ওপর কোনো রকমে আপত্তি উত্থাপনের সুযোগ আর নেই। তিনি এখন 'সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা', 'বিপ্লবী নেতা', 'নেতা'-সহ বিভিন্ন উপাধিতে জর্জরিত। ইরানের নতুন নীতি অনুযায়ী এ সবগুলো উপাধি সমার্থবোধক এবং শুধু একজনের জন্যই প্রযোজ্য।

নিঃসন্দেহে এটি একটি ভয়ংকর ব্যাপার। এর ভয়াবহতা আরব দেশগুলোর নষ্ট রাষ্ট্রনীতির চেয়েও অনেক বেশি। কেননা, আরব দেশগুলোতে যে শাসকগোষ্ঠী একনায়কতন্ত্র কায়েম করে রেখেছে, তারা কিন্তু এই দাবি করে না যে তারা আল্লাহর নামে শাসন করছে বা তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহামপ্রাপ্ত হয়, বা তারা নিষ্পাপ।

তা ছাড়া, সেসব দেশের জনগণের কাছে শাসকের বিরুদ্ধাচরণ শরীয়তের সীমালঙ্ঘন বলে গণ্য নয়। বরং তাদের অনেকেই মনে করেন, অন্যায় আর কর্তৃত্ববাদের মোড়কে আবৃত একনায়কতন্ত্রের এ শাসনব্যবস্থা ছুড়ে ফেলতে পারাই কল্যাণকর। অপরদিকে, ইরানে শাসক বা শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধাচরণ করা ধর্মদ্রোহিতার অন্তর্ভুক্ত।

খোমেনী ক্ষমতায় আসার পর নতুন সংবিধান প্রণয়ন করেন। তাতে তিনি এ একনায়কতন্ত্র নিজের এবং ইসনা আশারিয়া সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষিত করে দেন। এই মর্মে তিনি সংবিধানে একটি ধারা যুক্ত করেন যে, ইরানী বিপ্লবের অগ্রদূত আজীবন এই পদে বহাল থাকবেন।

এরপর তিনি 'মাজলিসুল খুবারা' বা 'বিশেষজ্ঞ কমিটি' নামে একটি বোর্ড গঠন করেন। এই বোর্ডের সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবে। কিন্তু পদপ্রার্থীকে অবশ্যই ফকীহ হতে হবে, ইসনা আশারিয়া মতাদর্শের হতে হবে এবং 'বিলায়াতুল ফকীহ' চিন্তাধারায় বিশ্বাসী হবে।

এই বোর্ডই খোমেনীর মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত নির্বাচন করবে, যিনি আবার আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকবেন। এই বোর্ডের সিদ্ধান্তমতে ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ আল-খামেনেয়ী বিপ্লবের পথপ্রদর্শক নির্বাচিত হন এবং এখন পর্যন্ত তিনিই ওই পদে অধিষ্ঠিত আছেন।

টিকাঃ
১. খোমেনী কৃত আল-হুকুমাতুল ইসলামিয়া; পৃষ্ঠা: ৫২
১. Assembly of Experts (مجلس الخبراء)

📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানের পদচ্যুতি

📄 নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানের পদচ্যুতি


খোমেনীর ক্ষমতার তৃষ্ণা এতেও মেটেনি; রাষ্ট্রের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদের কলকাঠি নিজের কব্জায় রেখেই তবে তিনি ক্ষান্ত হয়েছেন। সংবিধানের ১১০ নং ধারায় উল্লিখিত হয়েছে, বিপ্লবের সর্বাধিনায়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাখবেন; বিশেষত সংস্কৃতি, রীতিনীতি এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে যে-কোনো রদবদল করতে পারবেন। তিনিই সশস্ত্রবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ এবং তার ইচ্ছায়ই রাষ্ট্রীয় সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও পরিষদের প্রধানদের নিয়োগ-বিয়োগ কার্যকর হবে। তিনিই প্রধান বিচারপতি, রেডিও-টেলিভিশন সংস্থার প্রধানের নিয়োগ দেবেন। তার সিদ্ধান্তেই সামরিক বাহিনীর প্রধান এবং বিপ্লবের প্রধান কমান্ডার নির্ধারিত হবে। এর চেয়েও গুরুতর বিষয় হলো, তিনি চাইলেই জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দিতে পারবেন।

আসলে খোমেনী সকল ক্ষমতা এমনভাবে কুক্ষিগত করে রেখেছেন যে, আরব-একনায়কতন্ত্রের কেউ তা কখনো কল্পনাও করতে পারেননি। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, আপনি জেনে অবাক হবেন, খোমেনী যা কিছু করেন, এর সবই নাকি ইমাম মাহদীর দেওয়া ক্ষমতাবলেই করেন। তাই সাধারণ কেউ সেসবের বিরুদ্ধাচরণ করল, তো সে যেন শিরক করে ফেলল! কারণ সে নিষ্পাপ ইমামের ওপর আপত্তি তুলেছে, যে ইমামের কাছে স্বয়ং আল্লাহর ইলহাম আসে।

এই ভ্রান্ত আকীদাটিকে তারা ইমাম জাফর আস-সাদিকদের নামে চালিয়ে দেয়। তিনি নাকি বলেছেন: 'কোনো বিষয়ে ফয়সালা দেওয়ার পরও যদি কেউ তা অগ্রাহ্য করে, তবে যেন সে আল্লাহর বিধানের প্রতিই তাচ্ছিল্য প্রকাশ করল এবং আমাদের বিরুদ্ধাচরণ করল। আর আমাদের বিরুদ্ধাচরণ মানে তো আল্লাহরই বিরুদ্ধাচরণ। সুতরাং তা শিরক।'

এহেন পরিস্থিতিতে খোমেনীর প্রতি আপনার ক্ষোভ আসতে পারে। কিন্তু তিনি বড়ো বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন; ক্ষমতার এই লীলাখেলা তিনি খুব সহজেই লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে গেছেন। তিনি যে একজন প্রতাপশালী সর্বাধিনায়ক, কাউকে তা বুঝতেই দেননি।

খোমেনী 'রাঈসুল জামহুরিয়াহ' বা 'প্রজাতন্ত্রের প্রধান' নামে একটি পদ সৃষ্টি করেছেন; যদিও সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাই সেখানে সর্বেসর্বা। এবার এই 'প্রজাতন্ত্রের প্রধান' বা 'রাষ্ট্রপ্রধান'-কে নির্বাচনের ক্ষমতা দিয়ে দিয়েছেন জনগণের হাতে। যাতে তারা একটু হলেও সান্ত্বনা পায়, ধরে নেয় তাদের ভোটেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হচ্ছে, যিনি তাদের আশা- আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে। কিন্তু আসলেই কি তাই? নাকি ইরানের প্রেসিডেন্ট নিয়ে বোঝার আছে আরও অনেক কিছু?

টিকাঃ
১. মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াকুব আল-কুলাইনি কৃত কাফি; খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৬৭
২. President of the Republic (رئيس الجمهورية)

ফন্ট সাইজ
15px
17px