📄 হুথিদের ক্ষমতার উৎস
বিষয়টি ভালোভাবে বোঝার জন্য যদিও অনেকগুলো কারণ উল্লেখ করা সম্ভব; কিন্তু সঙ্গত কারণেই কয়েকটি উল্লেখ করছি মাত্র। আশা করি, এতেই স্পষ্ট হয়ে যাবে।
প্রথমত: এ বিষয়টি কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয় যে, ইয়েমেনের ছোট্ট একটি জেলায় অবস্থানরত কিছু লোক কোনো রকম বহিস্থ সহায়তা ছাড়াই বছরের পর বছর রণাঙ্গনে টিকে থাকতে সক্ষম হবে। এর সঠিক কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে দেখা যাবে, হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে কেবল একটি দেশেরই লাভ; দেশটি হলো ইরান।
ইরান একটি ইসনা আশারিয়া শিয়া রাষ্ট্র; তাই যে-কোনো মূল্যেই হোক সমগ্র বিশ্বে তারা এ মতবাদ ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট। সুতরাং যদি তাদের পক্ষে কোনোভাবে ইয়েমেনে হুথিদের ক্ষমতায়ন সম্ভব হয়, তবে সেটি তাদের জন্যও একটি বড়ো অর্জন বলে গণ্য হবে। বিশেষত, এর মাধ্যমে তাদের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র সৌদি আরবকে কোণঠাসা করতে পারবে। কেননা তখন উত্তরে ইরাক, পূর্বে সৌদি-পূর্বাঞ্চল, কুয়েত, বাহরাইন এবং দক্ষিণে ইয়েমেন দ্বারা বেষ্টিত সৌদি আরব একরকম অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে; যা আমেরিকা কিংবা সুন্নী ইসলামী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে ইরানের জন্য সৃষ্টি করবে এক বিশাল সুযোগ।
এটি কেবল ধারণাপ্রসূত কিংবা কোনো কাল্পনিক বক্তব্য নয়; এই দাবির পক্ষে একাধিক দলীলও রয়েছে। প্রথমেই উল্লেখ করা যায়, রহস্যজনকভাবে জনাব বদরুদ্দীন হুথির মধ্যপন্থি যায়দিয়া মতাদর্শ ছেড়ে উগ্রপন্থি ইসনা আশারিয়া মতবাদে যোগদানের বিষয়টি। তিনি চকিত মতাদর্শ পরিবর্তন করে ফেললেন, অথচ ইয়েমেনের ইতিহাসজুড়ে কোথাও ইসনা আশারিয়া মতাদর্শের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না।
মতাদর্শ পরিবর্তনের পর ইরান তাকে একেবারে কোলে তুলে নিল; কয়েক বছর পর্যন্ত তেহরানে তাকে মেহমানদারিও করল। এ সময় বদরুদ্দীন হুথি দেখতে পান—ক্ষমতার মসনদে আরোহণের জন্য খোমেনী কর্তৃক প্রবর্তিত 'বিলায়াতুল ফাকীহ' আকীদা চমৎকার এক সিঁড়ি, যাতে রয়েছে ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহার বংশধর না হয়েও ক্ষমতাপ্রাপ্তির সহজ ব্যবস্থা; অথচ যায়দিয়া মতাদর্শে এমন কিছু কখনই ছিল না।
এসব ছাড়াও একটি ক্ষমতাধর রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের জন্য কোনো ভিন্নদেশি রাষ্ট্রদ্রোহীকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামরিক সহায়তা প্রদান করা কোনো ব্যাপারই ছিল না। সর্বোপরি হুথি ইস্যুতে ইরানের পক্ষ থেকে বিদ্রোহীদের সাহায্যপ্রাপ্তির ব্যাপারে ইরানের বিভিন্ন শিয়া সংবাদসংস্থা এবং 'আল-আলাম' ও 'আল-কাউছারে'-র মতো টেলিভিশন চ্যানেলের প্রচারণার মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া গেছে।
তা ছাড়া ইসনা আশারিয়া শিয়া মতাদর্শের অনুসারী, ইরাকের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সিসতানীর কাছে হুথিরা মধ্যস্থতা কামনা করেছিল। এমনকি একটা সময় তিনি ইয়েমেনীদের কাছেও ছিলেন বিস্ময়-পুরুষ; যার হেতু ছিল বিদ্রোহাত্মক মানসিকতার পক্ষাবলম্বন।
এরপর কথা হলো, ইয়েমেন সরকার একবার তাদের অস্ত্রভান্ডারের উৎস সম্পর্কে তথ্য প্রদান করেছিল; বিশেষত হুথিদের ব্যাপারে; তখন দেখা গেছে সেগুলো সব ইরানের তৈরি। এরপর ইয়েমেন সরকার প্রচ্ছন্নভাবে হলেও হুথিদেরকে সাহায্য করার ব্যাপারে ইরানের দিকে আঙুল তুলতে শুরু করেছিল; কিন্তু ইরান সরকার অকৃত্রিমভাবেই সেটি অস্বীকার করেছে।
এটি যে তাদের রাজনৈতিক চাল, তা কি আর বলে বোঝাতে হয়!? আর ইসনা আশারিয়া শিয়াদের 'তাকিয়া' আকীদা প্রয়োগের সুযোগ তো থাকছেই—যা তাদেরকে মিথ্যা বলার অনুমতি দিয়েই রেখেছে। তো, আর চিন্তা কী!?
দ্বিতীয়ত: হুথিদের এই বিদ্রোহ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে আরও যে বিষয়টি ইন্ধন জুগিয়েছে তা হলো, আন্দোলনের প্রতি অধিকাংশ ইয়েমেনীদের ব্যাপক সমর্থন। দুঃখজনক হলেও সত্য, ওই এলাকার মানুষ হুথিদের ভ্রান্ত মতাদর্শে বিশ্বাসী না হয়েও কেবল সেখানকার রাজনৈতিক সঙ্কট এবং সামাজিক অস্থিতিশীলতা থেকে মুক্তি পেতেই তাদের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেছিল।
তা ছাড়া ইয়েমেনের অবকাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়টি অনস্বীকার্য। সেখানকার অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র—এটাও সত্য; কিন্তু ওই অঞ্চলের মানুষেরা যেন হতদরিদ্র। সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ছোটো ও বড়ো শহরগুলোর মাঝে যে বৈষম্য, তা-ও লক্ষণীয়।
২০০৮ সালে কাতারের মধ্যস্থতায় ইয়েমেন সরকার ও হুথিদের মাঝে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, ইয়েমেন সরকার অচিরেই সা'দার উন্নয়নে সার্বিক পদক্ষেপ নেবে, এবং কাতার উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নও করবে; কিন্তু যুদ্ধ চলাকালে সকল পরিকল্পনা স্থগিত থাকে। সর্বোপরি প্রত্যক্ষদর্শন হলো, নানাভাবে বৈষম্যের শিকার এবং উপেক্ষিত জনগোষ্ঠী প্রতিরোধ গড়ে তোলায় জন্য একসময় এমন সম্প্রদায়ের সঙ্গে হাত মেলায়, যাদের সঙ্গে তাদের নৈতিক, আদর্শিক এবং বিশ্বাসগত কোনো মিল নেই।
তৃতীয়ত: এই বিদ্রোহ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে ইয়েমেনজুড়ে বিরাজমান সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিকেও দায়ী করা যায়। কেননা ইয়েমেন মানেই অসংখ্য সম্প্রদায় ও অগণিত গোষ্ঠীর সহাবস্থান; আর যেখানে সাম্প্রদায়িক বৈচিত্র্য থাকবে সেখানে সাদৃশ্য নিরূপণের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, হুথি বিদ্রোহীরা বরাবরই সরকার-বিরোধী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়ে আসছে। কোনো রকম নৈতিক ও আদর্শিক সম্পর্ক ছাড়াই হুথিদের প্রতি তাদের এই দুর্বলতার একমাত্র কারণ ছিল প্রচলিত শাসনব্যবস্থা, যা তাদের মনে ক্ষোভ তৈরি করেছিল।
চতুর্থত: ইয়েমেনের পাহাড়ি ভূ-প্রকৃতিও বিদ্রোহীদের জন্য ছিল যথেষ্ট সহায়ক; অপরদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে ওই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে আনা ছিল অনেকটা অসম্ভব। কারণ, একদিকে হুথিদের ছিল অসংখ্য গোপন আস্তানা ও গুহা; অপরদিকে সেনাবাহিনীর ছিল ত্রুটিপূর্ণ পদক্ষেপ, পাহাড়ি পথঘাট সম্পর্কে অপর্যাপ্ত জ্ঞান এবং সূক্ষ্মভাবে অবস্থান নির্ণয়কারী বৈজ্ঞানিক 'ডিভাইস' ও 'স্যাটেলাইট' এর অনুপস্থিতি।
পঞ্চমত: ইয়েমেন সরকারের বড়ো একটি ভুল ছিল এই যে, তারা ইয়েমেনকে উত্তর-দক্ষিণে দ্বিখণ্ডিত করতে চাওয়ার ইস্যুতে সমাধানের দিকে না গিয়ে বরং জিইয়ে রেখেছে। এই দাবির পক্ষে সংঘটিত বিক্ষোভ সমাবেশের বিরুদ্ধে তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি; এমনকি ইয়েমেনের সাবেক রাষ্ট্রপতি জনাব আলী সালিম আল-বাইদ—যিনি ছিলেন দক্ষিণ ইয়েমেনের অধিবাসী—লন্ডনে বসে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেও তার ব্যাপারে তারা নিশ্চুপই থেকেছে।
বলাবাহুল্য, এ সিদ্ধান্ত ইয়েমেনের সরকার, সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিক্ষিপ্ত করে রেখেছে; যে কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই হুথিদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে।
ষষ্ঠত: এই বিদ্রোহ দীর্ঘায়ত হওয়ার পেছনে আরও কিছু কারণ উল্লেখ করা যায়। যেমন, ইয়েমেন সরকার নিজেই চাচ্ছিল এই বিদ্রোহ অব্যাহত থাকুক। তাদের পরিকল্পনা ছিল, এই ইস্যু দেখিয়ে তারা বিভিন্নভাবে আন্তর্জাতিক সহায়তা লাভ করবে। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আমেরিকার সামরিক হস্তক্ষেপ লাভ, যা তারা 'সন্ত্রাস দমনের' নামে বিভিন্ন দেশে করে থাকে। এ লক্ষ্যে আমেরিকা আল-কায়েদা ও হুথিদের মাঝে সম্পর্ক রয়েছে বলে ইঙ্গিতও করে।
আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হলো, নৈতিক ও আদর্শিক দিক থেকে আল-কায়েদা ও হুথিদের অবস্থান পৃথিবীর দুই মেরুতে। কারণ, আল-কায়েদার মতাদর্শ ইসনা আশারিয়া মতবাদের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। সুতরাং এদের মাঝে কোনো রকম সম্পর্ক বিদ্যমান থাকার সম্ভাবনা অমাবস্যার রাতে চাঁদ উদিত হওয়ার মতো। উপরন্তু এ কথা তো সকলেরই জানা, ইসলামী বিশ্বের সবখানে নাক গলানো আমেরিকার আজন্ম স্বভাব; এসব কুবাসনা পূরণে সব ধরনের দলীল-প্রমাণ পেশ করতেও তারা সদা প্রস্তুত।
এদিকে ইয়েমেন কামনা করছিল, এই সুযোগে তারা তাদের থেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে; সেটা যদি সম্ভব না-ও হয়, অন্তত স্বৈরশাসন, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা এমন কোনো 'ট্যাগ' যেন পশ্চিমারা তাদের প্রতি না লাগায় সেই বন্দবস্ত হয়ে যাবে।
তা ছাড়া আমেরিকার সঙ্গে ভালো সম্পর্কের দরুন সৌদি আরবের সঙ্গেও বন্ধুত্ব তৈরি হবে; হুথি-দমন পরিকল্পনায় ইয়েমেনকে তারা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক সহায়তা প্রদান করবে। এতেও যদি সমস্যার সমাধান না হয়, তবে হয়তো সৌদি আরবের পাশাপাশি কাতার, দুবাইসহ অন্যান্য রাষ্ট্রও তাদের দিকে সাহায্যের প্রসারিত করে দেবে।
এসব বিষয় যদি আমরা ভুলেও যাই, তবু আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, ইয়েমেনের সমস্যা এখনো বিদ্যমান এবং পরিস্থিতি যথেষ্ট নাজুক। এমতাবস্থায় ইয়েমেন সরকারের কর্তব্য হলো, সবকিছুতে অত্যন্ত দৃঢ়তা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দেওয়া; বিশেষত, ভ্রান্ত মতবাদ প্রতিহত করার লক্ষ্যে বিশুদ্ধ ইসলামী চেতনার প্রসারে কাজ করে যাওয়া এবং সব ধরনের বৈষম্য দূর করে ওই অঞ্চলের মানুষের উন্নতি ও অগ্রগতির দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া।
এ ক্ষেত্রে ইসলামী বিশ্বেরও কিছু করণীয় রয়েছে। তাদের উচিত এই বিপদে ইয়েমেনের পাশে দাঁড়ানো। নয়তো সেদিন খুব দূরে নয়, যেদিন সমগ্র ইসলামী বিশ্ব শিয়াদের হাতের মুঠোয় চলে যাবে।
এরচেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইয়েমেন জাতির উচিত নিজেদের হিসেব নিজেরাই কষা; স্বদেশের কল্যাণ কোন পথে—সেই চিন্তা করা। মনে রাখতে হবে, এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হলো ঐক্যবদ্ধ হওয়া, বিশুদ্ধ চেতনা ধারণ করা, কুরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা। এ ছাড়া অন্যকোনো উপায়ে এই সমস্যা আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব না।