📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 যায়দিয়ারা সুন্নীদের খুব কাছের

📄 যায়দিয়ারা সুন্নীদের খুব কাছের


যায়দিয়া সম্প্রদায়কে যদিও শিয়া আখ্যায়িত করা হয়; কিন্তু শিয়াদের চেয়ে সুন্নীদের সঙ্গেই তাদের অধিক সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। সুন্নীদের সঙ্গে তাদের এতটাই মিল যে, জিজ্ঞেস না করে বোঝার উপায় নেই। আমি ইয়েমেনে তাদের অনেকের সঙ্গে উঠাবসা করেছি। দেখেছি, তারা সাহাবীদের প্রতি ভক্তি রাখেন, তাদেরকে সম্মান করেন। তারা সুন্নীদের মসজিদেই জামাআতের সঙ্গে নামাজ আদায় করেন। ইসনা আশারিয়া শিয়াদের বিদআতী কার্যক্রম তাদের মাঝে একদম অনুপস্থিত।

এসব বিষয়ে আমি 'শিয়াদের গোড়ার কথা' এবং 'শিয়াদের প্রভাব-প্রতিপত্তির বিস্তার' প্রবন্ধগুলোতে আলোচনা করে এসেছি। আনন্দের ব্যাপার হলো, তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য এমন অনেক ইসলামিক স্কলারও রয়েছেন, যাদের কাছে অসংখ্য সুন্নী শিক্ষার্থী ইলমে দীনের পাঠ গ্রহণ করেছে। ইয়েমেনী যায়দিয়া আলেমদের মাঝে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন নাইলুল আওতার গ্রন্থের প্রণেতা আল্লামা শাওকানী রহিমাহুল্লাহ।

ফিরছি খলীফা আবদুল্লাহ আল-মামুনের যুগে... মুহাম্মদ ইবনু ইব্রাহীম তবাতবা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন এবং তিনি তা কঠোর হস্তে দমন করতে সক্ষমও হয়েছিলেন; কিন্তু ইয়েমেনে ইবরাহীম ইবনু মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। সম্ভবত বাগদাদ থেকে ইয়েমেনের দূরত্ব এবং দুর্গম পাহাড়ে ঘেরা ভৌগোলিক পরিবেশ তার সামনে স্বয়ংক্রিয় প্রতিরোধ তৈরি করেছিল। তা ছাড়া ইয়েমেনে বিচ্ছিন্ন শাসনব্যবস্থার প্রচলন থাকায় কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ক্ষমতা বিস্তার যথেষ্টই কষ্টসাধ্য ছিল।

সার্বিক পরিস্থিতি মাথায় রেখে খলীফা আল-মামুন কূটনীতিক কৌশল অবলম্বন করেন; ইবরাহীম ইবনু মুহাম্মাদের হাতে ইয়েমেনের ক্ষমতা হস্তান্তর করেন এই শর্তে যে, তিনি খলীফার অনুগত থাকবেন। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়। তার এই পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় একশ বছর পর্যন্ত ইয়েমেন আব্বাসীয় খেলাফতের অধীনে শাসিত হতে থাকে; পাশাপাশি এই সুদীর্ঘ সময়ে যায়দিয়া মতাদর্শের প্রচার-প্রসার ঘটতে থাকে আপন গতিতে।

এসব ঘটনার কয়েক দশক পরে, ২৮৪ হিজরীর দিকে আব্বাসী খেলাফত দুর্বল হয়ে এলে ইয়াহইয়া ইবনুল হাসান আল-রাসসী ইয়েমেনে স্বাধীন যায়দিয়া সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন; যার নাম দেওয়া হয় 'বনু রাসসী' সাম্রাজ্য বা আইম্মা সাম্রাজ্য। উত্তর ইয়েমেনের সা'দায় অবস্থিত এই রাজ্যটি আব্বাসী খেলাফতের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যায়। আব্বাসী খেলাফতকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণাকারী রাজ্যগুলোর মাঝে এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২৩০ হিজরীতে 'বনু ইআফুর' বা 'ইআফুরীরা' সানআকে রাজধানী করে স্বাধীন সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল; যদিও তারা সুন্নীই ছিল।

টিকাঃ
১. (بنو الرسي) .2 Rasside

📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 ইয়েমেনে ইসমাইলিয়া মতবাদ

📄 ইয়েমেনে ইসমাইলিয়া মতবাদ


ইয়েমেনে যায়দিয়া মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে 'রাসসী' সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পাশাপাশি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে ইসমাঈলিয়া শিয়া সম্প্রদায়। তাদের অবস্থান ছিল দক্ষিণ ইয়েমেনে। ইতঃপূর্বে আমরা 'শিয়াদের গোড়ার কথা' এবং 'শিয়াদের প্রভাব-প্রতিপত্তির বিস্তার' শিরোনামে এসব বিষয়ে সবিস্তারে আলোচনা করে এসেছি। সেখানে বলেছি, ইসমাঈলিয়া শিয়ারা যারপরনাই ভ্রষ্ট ও উগ্র। তাদের সীমালঙ্ঘন এতটাই খতরনাক যে, অনেক আলেমই তাদেরকে অমুসলিম পর্যন্ত বলেছেন। দক্ষিণ ইয়েমেনজুড়ে ছিল তাদের ক্ষমতার বিস্তার। কিন্তু ২৯০ হিজরীতে হুটহাট অস্তিত্বে আসা এই সাম্রাজ্য অল্প কয়েক বছর পর ৩০৪ হিজরীতে মুখ থুবড়ে পড়ে। এভাবেই ইয়েমেন দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। ফলে সানআয় গেড়ে ওঠে সুন্নীদের ইআফুরী সাম্রাজ্য, এবং সা'দায় যায়দিয়া শিয়াদের রাসসী সাম্রাজ্য। এ অবস্থায় কেটে যায় পুরো চতুর্থ শতাব্দী।

হিজরী পঞ্চম শতাব্দীতে এসে ইআফুরী সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। ফলে যায়দিয়ারা একেবারে দুর্বল হয়ে পড়ে; যদিও এরপরও মতাদর্শের মশাল নিভু নিভু করে জ্বলতে থাকে। এমন সময় হঠাৎ চারদিক প্রকম্পিত করে ক্ষমতায় আসে সুন্নীদের 'বনু নাজাহ', বা 'নাজাহিদ' সম্প্রদায়। পশ্চিম ইয়েমেনে যাবিদ অঞ্চলে গড়ে ওঠা 'নাজাহিদ' বা 'নাজাহী' সাম্রাজ্য, স্থায়িত্ব লাভ করে ৪০২ হিজরী থেকে ৫৫৫ হিজরী পর্যন্ত।

নাজাহিদ সাম্রাজ্যের চারপাশে একের-পর-এক গড়ে উঠে ভয়ংকর সব ইসমাঈলিয়া সাম্রাজ্য। এক. সুলাইহ বা সুলাইহিদ সাম্রাজ্য; শাসনাঞ্চল: সানআ; স্থায়িত্ব ৪৩৯ হিজরী থেকে ৫৩২ হিজরী। দুই. যুরাইয় বা যুরাইডস সাম্রাজ্য; শাসনাঞ্চল: অ্যাডেন; স্থায়িত্ব: ৪৬৭ হিজরী থেকে ৫৬৯ হিজরী। তিন. হাতিম বা হামদানী সাম্রাজ্য; শাসনাঞ্চল: সানআ; স্থায়িত্ব: ৫৩৩ হিজরী থেকে ৫৬৯ হিজরী পর্যন্ত।

ইসমাঈলিয়া শিয়াদের সাম্রাজ্যগুলোর প্রত্যেকটিই কথিত ফাতিমী সাম্রাজ্য তথা, উবাইদিয়া সাম্রাজ্যের কাছ থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত হতো।

ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, উবাইদিয়ারা একসময় ভয়ংকর ক্ষমতাধর ছিল। তাদের ক্ষমতা বিস্তৃত ছিল মিশরজুড়ে; কখনো-বা শামে। যেহেতু ইসমাঈলিয়া সাম্রাজ্যগুলো উবাইদিয়াদের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল ছিল, তাই তাদের পতনের পর একে-একে সবগুলোর পতন ঘটতে থাকে। আর ঐহিতাসিক এ ঘটনাগুলোর সূত্রপাত হয়েছিল ইসলামী ইতিহাসের সুমহান ও সুপ্রসিদ্ধ বীর সিপাহসালার সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ূবীর নেতৃত্বে; ৫৬৭ হিজরীতে।

ইসমাঈলিয়া শাসনামল সমগ্র ইয়েমেনবাসীর জন্য ছিল ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের মতো। যদিও পতন-পরবর্তী ইয়েমেন খুব দ্রুত সেই ঘোর কাটিয়ে ওঠে। সুন্নীদের আইয়ূবী সাম্রাজ্যের অধীনে একটি সুন্দর-সুশৃঙ্খল শাসনামলের সূচনা ঘটে। আইয়ূবী শাসনামলে সময়কাল ছিল ৫৬৯ হিজরী থেকে ৬২৬ হিজরী। তারপর ক্ষমতায় আসে সুন্নীদের 'বনু রাসূল' বা 'রাসূলিদ সম্প্রদায়'। সময়কাল ৬২৬ হিজরী থেকে ৮৫৮ হিজরী।

এতকিছুর পরও ইয়েমেন থেকে যায়দিয়া সম্প্রদায়ের বিলুপ্তি ঘটেনি। সকল প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ইতিহাসের সকল যুগে তারা সা'দায় টিকে থেকেছে। এমনকি একটা সময়কে তাদের সোনালি যুগ অভিহিত করা যায়। ইতিহাসের পাতায় তা 'দ্বিতীয় রাসসী শাসনামল' নামে উল্লেখিত হয়েছে। যার সময়কাল ছিল ৫৯৩ হিজরী থেকে ৬৯৭ হিজরী। মূলত আইয়ূবী ও রাসূলিদ শাসনামলের মধ্যবর্তী সময়টি।

টিকাঃ
১. Yu firids (بنو يعفر)
২. Najahid dynasty (বনু نجاح)

📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 সানআর আইম্মা সাম্রাজ্য

📄 সানআর আইম্মা সাম্রাজ্য


হিজরী দশম শতাব্দীতে এসে সমগ্র ইয়েমেন উসমানী ও যায়দিয়া শাসকদের মাঝে বণ্টিত হয়। এই সুবাদে উসমানী শাসকরা ৯৪৫ হিজরী থেকে ১৩৩৩ হিজরী পর্যন্ত, অর্থাৎ ৩৮৮ বছর সেখানে শাসনকার্য পরিচালনা করে। তাদের শাসনাঞ্চল ছিল মূলত দক্ষিণ ইয়েমেন। অপরদিকে যায়দিয়া রাসসী শাসকরা স্বাভাবিকভাবে সা'দায় তাদের শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকে; সঙ্গে যুক্ত করে সানআ অঞ্চলটিও। এ কারণে এই সময়ে এসে এই সাম্রাজ্যের নাম পড়ে যায় 'সানআর আইম্মা সাম্রাজ্য'। এর সময়কাল ছিল ৯৭৩ হিজরী থেকে ১৩৮২ হিজরী পর্যন্ত মোট ৪০৯ বছর। যদিও উসমানী খেলাফতের সঙ্গে এক সংঘর্ষের পর ১৩৩৩ হিজরীতে যায়দিয়াদের যথাযথ পদক্ষেপ ইয়েমেনজুড়ে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

ইয়েমেনে যায়দিয়া শাসকদের শাসনক্ষমতা চলতে থাকে ১৩৮২ হিজরী মুতাবেক ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। এরপর ইয়েমেনী বিপ্লবের সূচনা ও পরিসমাপ্তির মধ্য দিয়ে প্রথমবার ২৮৪ হিজরীতে ক্ষমতায় আসা যায়দিয়া শাসনামলের পরিসমাপ্তি ঘটে, যা টিকে ছিল এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে।

সংক্ষিপ্ত এ আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারলাম যায়দিয়া মতাদর্শের শেকড় ইয়েমেন সমাজের অত্যন্ত গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। সুদীর্ঘকাল ধরে সেখানে তাদের ক্ষমতা কোনো-না-কোনোভাবে বিদ্যমান ছিল। তাদের আশপাশে গড়ে উঠেছে কখনো সুন্নী সাম্রাজ্য, কখনো-বা ইসমাঈলিয়া সাম্রাজ্য।

ওদিকে ইসমাঈলিয়ারা ইয়েমেনে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। তাদের শাসনামল ছিল মাত্র ১৩০ বছর। এবং এ সময়ে তারা কখনো সমগ্র ইয়েমেনে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়নি।

বর্তমানে আমরা দেখতে পাই, ইয়েমেনে ইসনা আশারিয়া শিয়াদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। অপরদিকে যায়দিয়া সম্প্রদায়ের লোকসংখ্যা শতকরা প্রায় ৩০ জন। এই তুলনায় ইয়েমেন সমাজে ইসনা আশারিয়া মতাদর্শের অনুসারী একবারেই তুচ্ছ। যদিও এ ব্যাপারে কোনো নিরেট পরিসংখ্যান রয়েছে বলে আমার জানা নেই।

এ পর্যায়ে আমরা 'হুতি' বা 'হুথি' সম্প্রদায় সম্পর্কে জানব। এদের অবস্থান দক্ষিণ ইয়েমেনে; আরও নির্দিষ্ট করে বললে, সা'দায়। উল্লেখ্য, এরা ইসনা আশারিয়া মতাদর্শের অনুসারী এবং ইরান তাদের সাহায্যকারী।

টিকাঃ
১. Houthis (الحوثيون)

ফন্ট সাইজ
15px
17px