📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 সফলতা শুদ্ধতার মাপকাঠি নয়

📄 সফলতা শুদ্ধতার মাপকাঠি নয়


তৃতীয়ত: কারও সফলতা কিংবা সুপরিণতি কখনো তার শুদ্ধতা ও সঠিকতার মাপকাঠি হতে পারে না। কেননা, অতীতে কত বিদআতীকে আমরা বিজয়ী হতে দেখেছি। কারমাতি শিয়াদেরকে আমরা দেখেছি তারা যুগের পর যুগ রাজত্ব করছে। অথচ এরাই কিন্তু আবার হাজিদের হত্যা করেছে, হাজরে আসওয়াদকে স্থানচ্যুত করেছে, বছরের পর বছর আল্লাহর জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে রেখেছে।

আমরা দেখেছি অসংখ্য ভ্রান্তি ও বিচ্যুতি সত্ত্বেও পারস্য, রোমান, তাতার, ইংরেজ ও মার্কিনীরা জয়লাভ করেছে, করছে। দেখেছি অত্যাচারী, অহংকারী এবং ইসলামের বিধান অমান্যকারী মুসলিম শাসকের দম্ভ, যে বছরের পর বছর তার অধীনস্থদের প্রতি জুলুম করে গেছে।

মোটকথা, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সফলতা কিংবা বিফলতা কখনো তাদের কর্মপন্থার শুদ্ধাশুদ্ধির ব্যাপারে সুনিশ্চিত তথ্য বহন করে না। বরং এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তার বা তাদের প্রতিটি আচরণ-উচ্চারণ সামনে রেখে; দেখতে হবে কুরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে তাদের কাজকর্ম, উঠাবসা কতটা সামঞ্জস্যতা রাখে।

আমরা জানি, এমন কত বীরও আছে, যারা যুদ্ধের ময়দানে বিরাট অবদান রেখেও হবে জাহান্নামি। কারণ তাদের বীরত্ব আল্লাহর ওয়াস্তে ছিল না।

হাদীসগ্রন্থে বর্ণিত রয়েছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এক লোক মুশরিকদের একেবারে কচুকাটা করেছিল। এটা দেখে লোকেরা তাকে মহান মুসলিম মুজাহিদ মনে করতে লাগল। অথচ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জাহান্নামি হওয়ার ঘোষণা দিলেন। লোকেরা দৌড়ে গিয়ে তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় পেল। তখন সে তাদেরকে বলল, আমি তো কেবল আমার গোত্রের জন্যই যুদ্ধ করেছিলাম।

হাদিসে উল্লেখিত ঘটনায় লোকটি যেহেতু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যুদ্ধে যায়নি, সুতরাং তার লড়াই হবে স্বার্থের লড়াই; তার বিজয় ও সফলতার ভিত্তি হবে মিথ্যা ও বাতিল।

মনের কথা যেহেতু আল্লাহর ছাড়া আর কারও জানা নেই, তাই আমরা হিযবুল্লাহর নিয়তের ব্যাপারে আগে বেড়ে কিছু বলব না। তাই বলে আমরা তাদের ভ্রান্ত আকীদা ও প্রকাশ্য বিদআত সম্পর্কেও কিছু বলব না, তা কিন্তু নয়। 'শিয়াদের প্রভাব-প্রতিপত্তির বিস্তার' শিরোনামের লেখাটি আরও একবার পাঠ করা যেতে পারে। আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে, সেখানে আমি দেখিয়েছি, বিভিন্ন যুদ্ধে তারা বিজয় লাভ করেছে তো ঠিক, কিন্তু বরাবরই তাদের কর্মপদ্ধতি ছিল ভ্রান্ত, সিরাতে মুস্তাকিম থেকে বিচ্যুত।

টিকাঃ
১. সিরাতু ইবনে হিশাম (দারুল মা'রিফা, বৈরুত থেকে প্রকাশিত, শায়খ মুস্তফা কর্তৃক তাহকীককৃত।) খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৫২৪, ৫২৪

📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 সুন্নীদের অবস্থান

📄 সুন্নীদের অবস্থান


চতুর্থ: সুন্নীদের অবস্থান। হিযবুল্লাহর ও ইহুদীদের মধ্যকার যুদ্ধ যেহেতু স্বার্থের খেলা, তাই সুন্নীদের এক্ষেত্রে কোনো মতামত থাকতে পারে না, বিষয়টি আমার কাছে মোটেও এমন মনে হয় না। এ নিয়ে অবশ্য আমার অনেক শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকের সঙ্গে আমার দ্বিমত দেখা দিয়েছে। কারণ, উভয় দল ভ্রান্ত হওয়ায় এ ক্ষেত্রে তাঁরা নীরব থাকার পক্ষে। কিন্তু প্রত্যেক মুসলিমেরই তো একটি সুস্পষ্ট ও সুনিশ্চিৎ দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। এবং সে সবকিছুর ভালো-মন্দ বিবেচনা করে একটি সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।

এই যুদ্ধের একপক্ষ ইহুদী সম্প্রদায় যারা অন্যায়ভাবে ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করে আছে। আর অপরপক্ষ হিযবুল্লাহ; যাদের দেশে ইহুদীরা অনুপ্রবেশ করেছে। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, যে-কোনো মূল্যে ইহুদীদের শক্তি খর্ব হওয়াই এখানে কাম্য। কেননা, তাদের অন্যায়-আগ্রাসন দিনের আলোর মতো সুস্পষ্ট। একইভাবে লেবানন থেকেও ইহুদীদের বিতাড়িত করা আবশ্যক। আরও আবশ্যক হলো, মুসলিম উম্মাহর নিজেদের হক সম্পর্কে সচেতন হওয়া; হিযবুল্লাহ কিংবা ইহুদীদের অবৈধ হস্তক্ষেপ থেকে তা রক্ষা করা।

১৯৯৭ সালে লেবানন থেকে ইহুদীদের বিতাড়নের উদ্দেশ্যে যে আন্দোলন গড়ে ওঠেছিল, তাতে সুন্নীদের বিপুল অংশগ্রহণ আমার কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে; যদিও এর নেতৃত্বে ছিল হিযবুল্লাহ এবং তারা বিশ্বাসঘাতকতা করে সুন্নীদের সকল অবদান অস্বীকার করেছিল। কিন্তু সবশেষে মুসলিম উম্মাহর একটি সুস্পষ্ট পর্যবেক্ষণ ও অবস্থান কিন্তু আছে।

আমরা অনেকেই জানি, আবু জাহেল জনৈক মুশরিকের মাল আত্মসাৎ করলে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকের পক্ষ নেন। তখন কিন্তু নবীজি এ কথা বলেননি, মুশরিক তো তার মাল দেবতার জন্য উৎসর্গ করবে, তাই থাক—তার পক্ষ আমি নেব না। বরং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মুশরিকের পক্ষ নিলেও পরবর্তী সময়ে তার ধর্মের বিপক্ষে গিয়ে তাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন।

সুতরাং এ বিষয়গুলো আমাদের কাছে মোটেও সংশয়পূর্ণ নয়। এই অঞ্চলে শিয়া মতাদর্শ বাস্তবায়নে হিযবুল্লাহর যাবতীয় পরিকল্পনা সম্পর্কেও আমরা অনবগত নই। কিন্তু হাল-জমানায় ইহুদীদের প্রতিহত করার বিষয়টি বেশিই গুরুত্বপূর্ণ।

📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 হাসান নাসরুল্লাহ

📄 হাসান নাসরুল্লাহ


পঞ্চম: হাসান নাসরুল্লাহ। হাসান নাসরুল্লাহ নিঃসন্দেহে ক্যারিশমাটিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর মাঝে এমন অনন্যসাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যে, তিনি আশপাশের সকলকে অনায়াসে মুগ্ধ করতে পারেন, নেতৃত্ব দিতে পারেন সুবিশাল এক জামাআতকে। তিনি একাধারে বিদগ্ধ রাজনীতিক, তুখোড় মেধাবি এবং অনুপম প্রত্যুৎপন্নমতি।

তাঁর সুনিপুণ রাজনীতি এবং চাতুর্যময় নেতৃত্ব দেখে যে কেউ মুগ্ধ হবে; রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং অসাধারণ বাগ্মিতার প্রতিও মানুষ আকর্ষিত হবে খুব সহজে। মুসলিম উম্মাহর কাছে যদি তাঁর এ সকল গুণ পছন্দনীয় হয়েও থাকে, তাতে দোষের কিছু দেখি না। বরং ক্ষেত্রবিশেষে তাঁর অনুসরণও করা যেতে পারে। কিন্তু যে কাজটি করার কোনো অবকাশ নেই তা হলো, তাঁকে জাতির কর্ণধার ভেবে বসে থাকা, আল্লাহর মহান আদেশ জিহাদের মতো আমলে নেতৃত্ব প্রদানের যোগ্য মনে করা।

তিনি কোনোভাবেই এই স্তরে উপনীত হতে পারেন না। কেননা, সেজন্য তাঁকে বিশুদ্ধ আমল ও আকীদার অধিকারী হতে হবে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাহর অনুসারী হতে হবে, আল্লাহ আদেশ-নিষেধের সামনে হতে হবে বিনয়াবনত। আর এর কোনটিই তাঁর মাঝে নেই।

📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 হাসান নাসরুল্লাহর আকীদা-বিশ্বাস

📄 হাসান নাসরুল্লাহর আকীদা-বিশ্বাস


আমাদের খুব ভালো করে মনে রাখতে হবে যে, একজন হাসান নাসরুল্লাহ আপাদমস্তক ইসনা আশারিয়া শিয়া মতাদর্শের অনুসারী। তিনি মনে-প্রাণে এই মতবাদই লালন করেন। ফলে, তিনি বিশ্বাস করেন সাহাবীরা যোগ্যতা সত্ত্বেও হযরত আলীকে উপেক্ষা করে পর্যায়ক্রমে হযরত আবু বকর, উমর ও উসমানের হাতে খেলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন; তিনি বিশ্বাস করেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথিত বারো ইমামের নাম ধরে ওসিয়ত করে গেছেন; তাদের সকল ইমাম নিষ্পাপ, পূত-পবিত্র; তাদের সর্বকনিষ্ঠ ইমাম এখনো কোনো গুহায় আত্মগোপন করে আছেন যিনি একদিন-না-একদিন বেরিয়ে আসবেন; তিনি বিশ্বাস করেন তাকিয়া দীনের নয়-দশমাংশ—যার অর্থ: মুখে এক অন্তরে আরেক।

তিনি আরও বিশ্বাস করেন যে, সুন্নীরা আহলে বাইতের প্রতি ভীষণ শত্রুতা পোষণ করে; অথচ বাস্তবতা হলো, সুন্নীরা তাঁদের প্রতি শিয়াদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি ভক্তি-শ্রদ্ধা লালন করে; যার সবটুকু আবেগ-বর্জিত এবং সুন্নাহ-সম্মত। তার মতে, নেতৃত্বস্থানীরা অধীনস্থদের উপার্জন থেকে এক-পঞ্চমাংশ গ্রহণ করার অধিকার রাখে; কোনো পুরুষ চাইলে কিছু সময় কিংবা কিছুদিনের প্রয়োজনে কোনো নারীকে বিয়ে করতে পারবে, এবং প্রয়োজন শেষে ত্যাগও করতে পারবে, শরীয়তের পরিভাষায় যাকে বলে 'নিকাহে মুত'আ'। তিনি 'বিলায়াতুল ফাকীহ' চিন্তাধারায় বিশ্বাসী। তাই তার কাছে কোনো বিষয়ে ইরানী বিপ্লবের নেতা আলী খামেনেয়ীর বিরুদ্ধাচরণ মারাত্মক অপরাধ। তার এমন আরও অসংখ্য অসঙ্গত আকীদা রয়েছে, যা বলতে গেলে আলোচনা দীর্ঘ হয়ে যাবে।

এখানে যে আকীদাগুলো উল্লেখ করা হলো, এর সবগুলো জনাব হাসান নাসরুল্লাহর অন্তরাত্মার সঙ্গে মিশে রেয়েছে। কারও এ কথা বলার সুযোগ নেই যে, আমরা তো আর তাকে কখনো সাহাবীদের গালাগাল করতে দেখিনি, কিংবা তিনি তো আমাদের সামনে কখনো উম্মুল মুমিনীনদের ওপর অপবাদ আরোপ করেননি।

এমন সরলমনা ভাইদের উদ্দেশে বলতে চাই, আসলেই তার আকীদা এমন কি না, তা নিজ কানে শুনে যাচাই করার প্রয়োজন নেই। কেননা, এসব আকীদা ইসনা আশারিয়া মতাদর্শের একদম মৌলিক বিষয়।

আচ্ছ্, আপনি কি কখনো আপনার প্রতিবেশী মুসলিম ভাইকে তাওহীদের কালিমা পড়তে শুনেছেন? হা শুনলেও তো আপনি জানেন যে, অবশ্যই সে একত্ববাদে বিশ্বাসী, তাই না? কারণ, সে মুসলিম। ইসনা আশারিয়া মতাদর্শের একজন অনুসারীর বিষয়টিও তেমনই। কোনো সন্দেহ-সংশয় ছাড়াই তাকে উল্লিখিত সকল আকীদার ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। নয়তো সে ওই মতাদর্শের অনুসারী বলেই গণ্য হবে না।

আর যদি হাসান নাসরুল্লাহ সাহাবীদেরকে সম্মান করেন, তবে তো তিনি ইসনা আশারিয়া মতাদর্শের নীতিবিরোধী বলেই গণ্য হবেন; বিচ্যুত হবেন হযরত আলী ও তাঁর দুই পুত্রসহ তাদের সকল ইমামের (নামে তাদের বানোয়াট) আদর্শ থেকে।

তাহলে যে ব্যক্তির মাঝে এমন ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতা রয়েছে, আমরা কি কোনোভাবেই তার অন্ধভক্ত হতে পারি? কিংবা তাকে মুসলিম উম্মাহর অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে গ্রহণ করতে পারি? কখনই পারি না। তবে হ্যাঁ, তার মাঝে ভালো কিছু থেকে থাকলে আমরা গ্রহণ করতে পারি। কিন্তু সেটা এই অর্থে নয় যে তিনি মুসলমান। বরং এই অর্থে যে তিনি একজন বুদ্ধিমান ও প্রতিভাবান।

ইতিহাস পড়ে আমরা জানতে পারি, ক্রুসেডাররা যখন শাম ও ফিলিস্তিনে আগ্রাসন চালিয়েছিল, তখন ছিল শিয়াদের জয়জয়কার; মিশর ছিল উবাইদিয়া সাম্রাজ্যের অধীনে। নিজেদের এমন দুরবস্থায়ও কিন্তু তৎকালীন মুসলিম উম্মাহ কোনো শিয়া নেতাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেনি; যদিও তারা তখন রাজনীতি, অর্থনীতি, সমরনীতি—সবকিছুতেই চরম উৎকর্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। বরং সুন্নী মুসলিম সেনানীরাই সাহাসিকতা ও শৌর্যবীর্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন; তাদের মাঝেই জন্ম নিয়েছেন ইমামুদ্দীন জিনকী, নুরুদ্দীন মাহমুদ এবং সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর মতো মহান সিপাহসালারগণ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px