📄 হাসান নাসরুল্লাহ এবং সরকার বিরোধিতা
২০০৬ সালে ইহুদীদের বিরুদ্ধে হিযবুল্লাহর বিজয় বেশ বড়োসড়ো ব্যাপার ছিল। এতে তাদের মনোবল অনেকখানি বৃদ্ধি পায় এবং তারা এটাকে কাজে লাগিয়ে অগ্রসর হতে চায়। এই ভাবনা থেকে নিজেদের শরিক সরকারের বিরুদ্ধেই তারা অভ্যুত্থান ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর তারা এক বিশাল প্রস্তুতি নিয়ে সরকারি সদর দফতরের সামনে অবস্থান গ্রহণ শুরু করে। দীর্ঘদিন এ আন্দোলন টিকিয়ে রাখতে তারা সেখানে ছয় শতাধিক তাঁবু স্থাপন করে। তাদের দাবি ছিল 'সুন্নী' রাষ্ট্রপতি ফুয়াদ সিনিওরার পদত্যাগ। যদিও লেবাননের সংবিধান অনুযায়ী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবে সুন্নীদেই একজন।
হিযবুল্লাহ লেবাননে যাচ্ছেতাই করতে পারে, দাবি আদায়ের মাধ্যমে তারা মূলত এটাই দেখাতে চাচ্ছিল। তবে তার স্থলাভিষিক্ত যিনি হবেন তাকে অবশ্যই লেবাননের প্রত্যাশিত নেতৃত্ব এবং হাসান নাসরুল্লাহর আদর্শের অনুগামী হতে হবে। কিন্তু সরকার হাসান নাসরুল্লাহর এই খামখেয়ালিপনা মেনে নেয়নি। ফলে লাগাতার প্রায় আঠারো মাস পর্যন্ত অবরোধ অব্যাহত থাকে।
হিযবুল্লাহ সামরিক আন্দোলন শুরু করলে পরিস্থিতি খুবই খারাপ আকার ধারণ করে। বৈরুতের পশ্চিম প্রান্তজুড়ে ছিল সুন্নীদের বসবাস। হিযবুল্লাহ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এই এলাকাটি অবরোধ করে বসে এবং হুমকি দিতে থাকে সরকার তাদের দাবি না মেনে নিলে হয়তো সদর দপ্তরের সামনের অবরোধ অব্যাহত থাকবে, আর নয়তো সুন্নীদের ওপর হামলা করা হবে। সময়টি ছিল ২০০৮ সালের ৯ই মে।
📄 দোহা চুক্তি এবং নাসরুল্লাহর পতন
লেবাননের রাজধানী বৈরুত ঘিরে সেই অবরোধ ১৩ দিন পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এরপর কাতারের রাজধানী দোহায় একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলে তা তুলে নেওয়া হয়; সঙ্গে তুলে নেওয়া হয় সরকারি সদর দপ্তরের সামনে চলা অবস্থান ধর্মঘটও। কিন্তু এর সঙ্গে ভেঙে যায় তাদের সেই চারদলীয় ঐক্যজোট। দলগুলো বুঝতে পেরেছিল যে, এ ধরনের জোট পরিশেষে আসল লক্ষ্য পূরণেই জটিলতা তৈরি করে। বিশেষত সুন্নী ও শিয়াদের গন্তব্য কোনোভাবেই এক হতে পারে না।
জোট ভেঙে যাওয়ার পর থেকে উভয় দল একে-অপরের প্রতি বিভিন্ন রকম অভিযোগ আরোপ করতে থাকে। একদিকে তাইয়ারুল মুসতাকবাল বা ১৪ই মার্চের সমাবেশে যোগদানকারীরা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিল যে, শিয়ারা সমগ্র লেবানন একটু একটু করে গ্রাস করে নেবে। অপরদিকে হিযবুল্লাহর অভিযোগ আমেরিকার সঙ্গে তাইয়ারুল মুসতাকবালের গোপন সম্পর্ক রয়েছে। এ অভিযোগের একমাত্র কারণ ছিল লেবাননী জাতির কাছে তাইয়ারুল মুসতাকবালকে ছোটো করা এবং জাতীয় আন্দোলনে তাদের অবদানের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রকাশ করা।
অভিযোগ ও অনুযোগ সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। আর এ অবস্থা চলতে থাকে ২০০৯ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত। নির্বাচনে সাদ আল-হারীরীর নেতৃত্বাধীন '১৪ই মার্চ আন্দোলনে'-র বিরুদ্ধে হাসান নাসরুল্লাহর নেতৃত্বাধীন হিযবুল্লাহ অংশগ্রহণ করেন। প্রত্যেক দলই তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রচার করতে থাকে। এ সময়ও একের বিরুদ্ধে অপরের অভিযোগ-অপবাদ ছিল অব্যাহত।
মজার ব্যাপার হলো, এই নির্বাচনে হাসান নাসরুল্লাহর ভরাডুবি হয়; যা তার মতো একজন বিদগ্ধ রাজনীতিকের বেলায় ছিল নিতান্তই অকল্পনীয়। আসলে 'ব্যালটবক্সে' তার সঙ্গে যা ঘটেছে, তা যে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছাই ছিল।
২০০৯ সালের ২৯ মে। নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগের কথা। এ দিন জনাব নাসরুল্লাহ জাতির উদ্দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। ভাষণটি হিযবুল্লাহর ওয়েবসাইটে সংরক্ষিত আছে। তিনি তাতে বলেন, হিযবুল্লাহ নির্বাচনে বিজয়ী হলে সিরিয়া ও ইরান থেকে লেবাননে প্রচুর অস্ত্র আনা হবে। তার এমন খোলামেলা কথাবার্তায় শিয়াদের আসল রূপ প্রকাশ পেয়ে যায়। সেদিন তিনি একবাক্যে বলে দিয়েছিলেন, ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্র বিশেষত, জনাব খামেনেয়ী লেবাননকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছেন।
লেবাননীদের সামনে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তিনি বলেন, তাদের জান-মাল ও মান-মর্যাদা রক্ষার্থে যত অর্থ প্রয়োজন, সব শিয়াদের তরফ থেকে খরচ করা হবে। তার এই আশ্বাস লেবাননীদের মনে একই সঙ্গে আশা ও আশঙ্কার জন্ম দেয়; বহির্বিশ্বের সঙ্গে হিযবুল্লাহর সম্পর্ক এবং তাদের সক্ষমতার পরিধি নিয়ে ভাবায়।
হাসান নাসরুল্লাহর বার্তা লেবানন জাতির কাছে পৌঁছে যায়; যদিও তারা তার কামনার ঠিক উল্টোটি বুঝে নেয়। তাদের সামনে শিয়াদের বিভৎস রূপ প্রকাশ পেয়ে যায়। তারা বুঝতে পারে, হিযবুল্লাহর হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার মানে, হিযবুল্লাহর শক্তিই বৃদ্ধি করা, লেবাননের নয়। এবং সিরিয়া-ইরান-অনুগত শিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও খুব বেশি দূরে নয়।
এসব ভাবনা থেকে লেবানন জাতি যথেষ্ট ভয় পেয়ে যায়। যার প্রতিফলন ঘটে নির্বাচনী ব্যালটবক্সে। নির্বাচনের দিন লেবাননীরা দলমত নির্বিশেষে '১৪ই মার্চ আন্দোলনে' ভোট দেয়। যদিও সাদ আল-হারীরী রফিক আল-হারীরীর সমপর্যায়ের নেতা ছিলেন না, কিন্তু অমন আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে তাদের হাতে আর কোনো বিকল্পও ছিল না।
বলার অবকাশ রাখে না, এমন একটি ফলাফল প্রকাশের পেছনে মার্কিন চাপও ছিল যথেষ্ট। নির্বাচন হয়েছিল খুবই স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ। কেউ এর স্বচ্ছতা নিয়ে আপত্তি তুলতে পারেনি। এতে ১৪ই মার্চ আন্দোলন ১৪ আসনের ব্যবধানে জয়লাভ করে। লেবাননের নির্বাচনে এটি চাট্টিখানি কথা নয়। আর এর মাধ্যমে সবকিছু স্পষ্টভাবে ও বড়ো পরিসরে প্রকাশ পেতে শুরু করে।
টিকাঃ
১. সুন্নিদের তাইয়ারুল মুসতাকবাল, শিয়াদের হিযবুল্লাহ ও হারকাতু আমাল এবং দ্রুজদের কুতলাতু লিকা আদ-দিমুকরাতী।
📄 হিযবুল্লাহ নিয়ে আমাদের ভাবনা
এই দীর্ঘ আলোচনার পর এবার আমি একজন পাঠক হিসেবে কয়েকটি বিষয়ে কিছু মন্তব্য করতে চাই। আশা করি তাতে মুসলিম ভাইদের মনে জাগা অনেক প্রশ্নের উত্তর থাকবে। আর এতে হয়তো অনেকে আমাকে বাহবা দেবে, আবার অনেকে বিরোধিতাও করবে; কিন্তু সকলের উদ্দেশে আমি বলতে চাই, কোনো বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করতে চাইলে আমাদের উচিত নিজেরদের আবেগানুভূতি একপাশে রাখা এবং বিবেক-বিবেচনা থেকেই কথা বলা। প্রতিটা বিষয় খুব ভালোভাবে বিশ্লেষণ করা, একদম গোড়ার খবর নেওয়া; ইতিহাস, ঐতিহ্য, অতীত, বর্তমান—কোনোকিছু যেন জানাশোনা থেকে বাদ না পড়ে, সেই খেয়াল রাখা। আলোচ্য দল বা সংগঠনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, পটভূমি, আকীদা, বিশ্বাস, বিভক্তি—সবকিছু নখদর্পণে রাখা। এভাবে চুলচেরা বিশ্লেষণ সম্ভব হলে অনেক সময়ই দেখা যায় সঠিক জেনে আসা বিষয় নিয়ে আমাদের আবার নতুন করে ভাবতে হচ্ছে; এতদিন যাদের পক্ষে আমরা ছিলাম, এখন তারাই আমাদের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে, কিংবা এতদিন যাদের বিরোধিতা আমরা করে এসেছি, এখন তাদেরই পক্ষ নিতে হচ্ছে।
📄 লেবাননে শিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
প্রথমত: লেবাননের ভূখণ্ডে একটি আলাদা শিয়া রাষ্ট্র গড়ে উঠার প্রবল সম্ভাবনা এখনো রয়েছে। এমনকি অদূর ভবিষ্যতে তেমনটি ঘটে যেতেও পারে। আর এটি মোটেও হিযবুল্লাহর মতো একটি একক দল বা গোষ্ঠীর ব্যাপার নয়, বরং পুরোদস্তুর রাষ্ট্রের বিষয়। কেননা, সিরিয়া ও ইরান খুব করে চাচ্ছিল যেন লেবাননে তাদের অনুগত একটি শিয়া রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। এজন্য তাদের সমর্থন ও সহায়তা ছিল অব্যাহত, যা মোটেও ছোটখাটো ব্যাপার নয়। তাদের পরিকল্পনা লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলকে কেন্দ্র করে, পূর্ব-দক্ষিণের বিকা অঞ্চল নিয়ে এ রাষ্ট্রটি গঠিত হবে এবং উত্তর লেবাননের সুন্নী অঞ্চল পর্যন্ত এর বিস্তৃতি ঘটবে।
একইভাবে তারা পশ্চিম ও দক্ষিণ বৈরুতও দখল করে নেবে। খ্রিষ্টান অধ্যুষিত এলাকাগুলো নিয়ে যদিও কিছুটা দ্বিমত থাকতে পারে। তবে এমনটা মোটেও অসম্ভব নয় লেবাননের ভূমিতে খ্রিষ্টান ও শিয়াদের স্বতন্ত্র দুটি রাষ্ট্র কায়েম হলে হিযবুল্লাহ তা স্বাচ্ছ্যন্দেই গ্রহণ করবে। কেননা, আজ থেকে হাজার বছর পূর্বে সুন্নী অধ্যুষিত শামে ক্রুসেডারদের আগমন ঘটলে কীভাবে এই ভূমি ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়া যায়, ক্রুসেডারদের কাছে সেই প্রস্তাব পেশ করেছিল ইসমাঈলিয়া শিয়া সম্প্রদায়।
কথা ছিল ক্রুসেডাররা দখল করবে বর্তমান সিরিয়া ও লেবানন, আর শিয়ারা নেবে ফিলিস্তিন ও জর্ডান। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ক্রুসেডাররা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং সমগ্র শাম দখল করতে চায়।
লেবাননে শিয়া রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা সুন্নীদের বিবেচনায় মোটেও সহজ ও সুন্দর কিছু নয়। কেন নয় তা জানতে চাইলে নজর বুলিয়ে নেওয়া যেতে পারে ইরান-ইরাকের সুন্নীদের দিকে, সুন্নীদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া প্রথমে হারকাতু আমাল এবং পরে হিযবুল্লাহর ঘটনাপ্রবাহের দিকে। পাশাপাশি শিয়াদের বুওয়াইহিয়া, উবাইদিয়া, হামদানী, সাফাভিদ ইত্যাদি সাম্রাজ্যের আচরণ সুন্নীদের সঙ্গে কেমন ছিল, সেই ইতিহাসও জেনে নেওয়া যেতে পারে।
এসব ইতিহাস পাঠ করলে আপনা-আপনিই জেনে যাবেন শক্তিশালী প্রতিটি শিয়া সাম্রাজ্য সবচেয়ে বেশি আগ্রাসন চালিয়েছে সুন্নীদের বিরুদ্ধে। আর আকীদাগত বিরোধ ছিল সর্বাগ্রে— শুরু থেকে শেষ সম্পূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ কেবল তা-ই প্রমাণ করে।
টিকাঃ
১. 'শাম' বলতে সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন ও জর্ডান নিয়ে গঠিত ঐতিহাসিক 'বিলাদুশ শাম' উদ্দেশ্য। -অনুবাদক