📄 হিযবুল্লাহর সঙ্কট এবং ২০০৬ সালের যুদ্ধ
সিরীয় সেনারা লেবানন ছেড়ে গেলে হিযবুল্লাহ বহুমুখী সঙ্কটের সম্মুখীন হয়; বিশেষত হারীরীর মৃত্যুর পর সাম্প্রদায়িক কলহ বৃদ্ধি পেলে তারা দিশেহারা হয়ে যায়। তাই এ পর্যায়ে তারা বিভিন্ন শক্তিশালী দলের সাথে মিলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে ২০০৫ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।
এ লক্ষ্যে তারা তিনটি দলের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়। সেগুলো হলো সুন্নীদের তাইয়ারুল মুসতাকবাল, দ্রুজদের তাইয়ারু জুমবালাত এবং হারকাতু আমাল। এদের মাঝে প্রথম দুটি দলের সাথে শত্রুতার বিষয়টি তো সকলেরই জানা। অতঃপর তাদের এ জোট ‘চারদলীয় ঐক্যজোট’ নামে লোকমুখে প্রসিদ্ধি পেতে থাকে। চারদলীয় এই জোটের প্রার্থীরা জাতীয় নির্বাচনে ১২৮টি আসনের ৭২টিতে জয়ী হওয়ার মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং ফুয়াদ সিনিওরার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে।
মতের চরম অমিল থাকা সত্ত্বেও একরকম নিরুপায় হয়েই হিযবুল্লাহ সুন্নীদের নৌকায় পা রেখেছিল। উদ্দেশ্য ছিল নিজেদেরকে জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে পেশ করা। কিন্তু এরপরও হাসান নাসরুল্লাহ সাধারণত কোনো সভা-সমাবেশে উপস্থিত না হয়ে কেবলই প্রতিনিধি পাঠাতেন। ভাবটা ছিল এমন, যেন তিনি অন্যান্য নেতাদের সমকক্ষের কেউ নন, বা তিনি তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা রাখেন।
তার এই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণ সম্ভবত ছিল ২০০৬ সালের ১২ জানুয়ারি ইহুদীদের ওপর সামরিক অভিযান চালিয়ে দুজনকে বন্দি ও আটজনকে হত্যা করতে পারা। এই অভিযানে হিযবুল্লাহ রাষ্ট্রের কারও কাছে কোনো রকম সাহায্য কামনা করেনি, না প্রত্যক্ষভাবে, না পরোক্ষভাবে। আর যাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তারা পার্লামেন্ট পর্যন্ত পৌঁছেছে, তাদের কাছেও যেতে হয়নি কোনো প্রয়োজন নিয়ে। যদিও বাস্তবতা হলো এই অভিযানে একসময় সম্পূর্ণ রাষ্ট্র জড়িয়ে পড়ে, ইহুদীদের বিরুদ্ধে কেবল হিযবুল্লাহই নয়, অন্যরাও লড়ে।
প্রসিদ্ধ এ যুদ্ধটি ঘটে ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসে। টানা ৩৩ দিন পর্যন্ত ইহুদীরা লেবাননে বোমাবর্ষণ করতে থাকে। তাদের লক্ষ্য ছিল প্রথমে হিযবুল্লাহ এবং পরে লেবাননের সম্পূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া। জবাবে হিযবুল্লাহও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে শুরু করে। লেবাননের ভূখণ্ডে অসংখ্য মানুষের লাশ পড়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত ইহুদীরা হিযবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ করতে সক্ষম হয়নি। এটিকে হিযবুল্লাহর জন্য অনেক বড়ো অর্জন হিসেবে দেখা হয়। কেননা, হিযবুল্লাহর হামলা বন্ধের পূর্বেই ইহুদীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল; বন্দি সৈন্যদের মুক্ত করতেও ছিল অক্ষম।
যুদ্ধ শেষ হলো; ক্ষতি যা হওয়ার হয়েই গেল, লেবাননী জাতিকে স্বদেশের ছিন্নভিন্ন রূপ দেখতে হলো। দেখতে হলো, হিযবুল্লাহরূপী শিয়াদের উত্থান, যারা তখন উন্নত ইরানী অস্ত্রেশস্ত্রে সুসজ্জিত ছিল এবং যাদের পক্ষে ছিল সিরিয়ার সর্বাত্মক সমর্থন। এসব দেখে খুব সহজেই আন্দাজ করা যাচ্ছিল লেবাননের ভবিষ্যৎ-নেতৃত্ব শিয়াদের হাতেই। বিশেষত, হিযবুল্লাহকে ইহুদীদের বিরুদ্ধে লড়তে ও জয়ী হতে দেখে মুসলিম উম্মাহর আবেগী সমর্থন তখন ছিল তাদের পক্ষেই।