📄 রফিক আল-হারীরীর দাবি এবং শিয়াদের তোড়জোড়
ইহুদীরা লেবানন ছেড়ে যাওয়ার বছরই রফিক আল-হারীরী নতুন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। তিনি তার অধীনস্থদের নিয়ে সর্বজনবিদিত সুন্নী প্রতিনিধি হিসেবে নতুনভাবে এমন এক আদর্শিক অবস্থানে উন্নীত হন, যা বাস্তবিকভাবেই লেবাননী শিয়াদের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে গৃহীত হয়।
এদিকে হিযবুল্লাহর শক্তি দিনদিন বেড়েই যাচ্ছিল; আর তারা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল, কীভাবে ইরান-সিরিয়া সমর্থিত কাঙ্ক্ষিত সেই শিয়া রাষ্ট্র গড়ে তোলা যায়। কিন্তু রফিক আল-হারীরী ও তারা যাবতীয় প্রয়াসের কারণে বিষয়গুলো লেবাননী জনসাধারণের কাছে সমতুল মনে হতে থাকে।
২০০৪ সালের কথা। লেবাননে তখন বিপুলসংখ্যক সিরীয় সৈন্যের অবস্থান। হঠাৎ রফিক আল-হারীরী এই সৈন্যবাহিনী সরিয়ে নেওয়ার দাবি তোলেন। দাবি উপেক্ষিত হলে তিনি পদত্যাগ করে বসেন। এরপর ২০০৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আকস্মিকভাবে বৈরুতে নিজ গাড়িতে রফিক আল-হারীরী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
লেবাননে তখন অনেকগুলো গোয়েন্দা সংস্থার লোক কাজ করছিল। তার মধ্যে মার্কিন, ফরাসী, সিরীয়, ইরানী, ইরাকী সংস্থার কথা উল্লেখযোগ্য। এদের সকলের টার্গেট ছিল সুন্নীদেরকে রফিক আল-হারীরীর মতো একজন সুযোগ্য ও মহান নেতার নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করা।
হারীরী হত্যাকাণ্ডের পর লেবাননের পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের আঙুল উত্থিত হয় সিরিয়ার দিকে। এজন্য সিরিয়াকে লেবানন থেকে সরে আসার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও চাপ প্রয়োগ করা হয়। হিযবুল্লাহ তখন এ সম্মিলিত সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। এমনকি লেবাননে সিরীয় সেনাদের অবস্থানের পক্ষে তারা ২০০৫ সালের ৮ই মার্চ এক বিরাট লংমার্চের আয়োজন করে।
তাদের প্রতিরোধকল্পে গড়ে ওঠে ‘তাইয়্যারুল মুসতাকবাল’ বা ‘ভবিষ্যৎ আন্দোলন’। এটি ছিল সাদ আল-হারীরী নেতৃত্বাধীন হারীরী পরিবারের আন্দোলন। উপরন্তু দ্রুজ নেতা ওয়ালীদ জুমবলাত নেতৃত্বাধীন ‘গণতান্ত্রিক ঐক্য জোট’ এবং ম্যারোনাইট খ্রিষ্টান নেতা সামির জায়জায় নেতৃত্বাধীন ‘লেবানন বাহিনী’-র সমর্থন লাভ করে। এরপর ২০০৫ সালের ১৪ই মার্চ সিরীয় সেনাদের বিতাড়নের দাবি নিয়ে এক বিরাট বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। মার্চের ১৪ তারিখে হওয়ায় বিশাল এই জনসমাগমকে ‘১৪ই মার্চ’ নামে অভিহিত করা হয়। এ বিক্ষোভের তোপে চলতি মাসেই সিরীয় সেনাবাহিনী লেবানন ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।
টিকাঃ
১. Future Movement (تيار المستقبل)
২. كتلة اللقاء الديمقরাطي
৩. Lebanese Forces (القوات اللবنانية)
📄 হিযবুল্লাহর সঙ্কট এবং ২০০৬ সালের যুদ্ধ
সিরীয় সেনারা লেবানন ছেড়ে গেলে হিযবুল্লাহ বহুমুখী সঙ্কটের সম্মুখীন হয়; বিশেষত হারীরীর মৃত্যুর পর সাম্প্রদায়িক কলহ বৃদ্ধি পেলে তারা দিশেহারা হয়ে যায়। তাই এ পর্যায়ে তারা বিভিন্ন শক্তিশালী দলের সাথে মিলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে ২০০৫ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।
এ লক্ষ্যে তারা তিনটি দলের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়। সেগুলো হলো সুন্নীদের তাইয়ারুল মুসতাকবাল, দ্রুজদের তাইয়ারু জুমবালাত এবং হারকাতু আমাল। এদের মাঝে প্রথম দুটি দলের সাথে শত্রুতার বিষয়টি তো সকলেরই জানা। অতঃপর তাদের এ জোট ‘চারদলীয় ঐক্যজোট’ নামে লোকমুখে প্রসিদ্ধি পেতে থাকে। চারদলীয় এই জোটের প্রার্থীরা জাতীয় নির্বাচনে ১২৮টি আসনের ৭২টিতে জয়ী হওয়ার মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং ফুয়াদ সিনিওরার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে।
মতের চরম অমিল থাকা সত্ত্বেও একরকম নিরুপায় হয়েই হিযবুল্লাহ সুন্নীদের নৌকায় পা রেখেছিল। উদ্দেশ্য ছিল নিজেদেরকে জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে পেশ করা। কিন্তু এরপরও হাসান নাসরুল্লাহ সাধারণত কোনো সভা-সমাবেশে উপস্থিত না হয়ে কেবলই প্রতিনিধি পাঠাতেন। ভাবটা ছিল এমন, যেন তিনি অন্যান্য নেতাদের সমকক্ষের কেউ নন, বা তিনি তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা রাখেন।
তার এই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণ সম্ভবত ছিল ২০০৬ সালের ১২ জানুয়ারি ইহুদীদের ওপর সামরিক অভিযান চালিয়ে দুজনকে বন্দি ও আটজনকে হত্যা করতে পারা। এই অভিযানে হিযবুল্লাহ রাষ্ট্রের কারও কাছে কোনো রকম সাহায্য কামনা করেনি, না প্রত্যক্ষভাবে, না পরোক্ষভাবে। আর যাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তারা পার্লামেন্ট পর্যন্ত পৌঁছেছে, তাদের কাছেও যেতে হয়নি কোনো প্রয়োজন নিয়ে। যদিও বাস্তবতা হলো এই অভিযানে একসময় সম্পূর্ণ রাষ্ট্র জড়িয়ে পড়ে, ইহুদীদের বিরুদ্ধে কেবল হিযবুল্লাহই নয়, অন্যরাও লড়ে।
প্রসিদ্ধ এ যুদ্ধটি ঘটে ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসে। টানা ৩৩ দিন পর্যন্ত ইহুদীরা লেবাননে বোমাবর্ষণ করতে থাকে। তাদের লক্ষ্য ছিল প্রথমে হিযবুল্লাহ এবং পরে লেবাননের সম্পূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া। জবাবে হিযবুল্লাহও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে শুরু করে। লেবাননের ভূখণ্ডে অসংখ্য মানুষের লাশ পড়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত ইহুদীরা হিযবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ করতে সক্ষম হয়নি। এটিকে হিযবুল্লাহর জন্য অনেক বড়ো অর্জন হিসেবে দেখা হয়। কেননা, হিযবুল্লাহর হামলা বন্ধের পূর্বেই ইহুদীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল; বন্দি সৈন্যদের মুক্ত করতেও ছিল অক্ষম।
যুদ্ধ শেষ হলো; ক্ষতি যা হওয়ার হয়েই গেল, লেবাননী জাতিকে স্বদেশের ছিন্নভিন্ন রূপ দেখতে হলো। দেখতে হলো, হিযবুল্লাহরূপী শিয়াদের উত্থান, যারা তখন উন্নত ইরানী অস্ত্রেশস্ত্রে সুসজ্জিত ছিল এবং যাদের পক্ষে ছিল সিরিয়ার সর্বাত্মক সমর্থন। এসব দেখে খুব সহজেই আন্দাজ করা যাচ্ছিল লেবাননের ভবিষ্যৎ-নেতৃত্ব শিয়াদের হাতেই। বিশেষত, হিযবুল্লাহকে ইহুদীদের বিরুদ্ধে লড়তে ও জয়ী হতে দেখে মুসলিম উম্মাহর আবেগী সমর্থন তখন ছিল তাদের পক্ষেই।