📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 আল-মুসাভী, নাসরুল্লাহ এবং ইরানী পরিকল্পনা

📄 আল-মুসাভী, নাসরুল্লাহ এবং ইরানী পরিকল্পনা


লেবাননী শিয়াদের এমন সঙ্কটাপন্ন অবস্থা দেখে ইরাকের নাজাফ থেকে শিয়া আকীদায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী দুজনকে সেখানে পাঠানো হয়। মূসা আস-সদরের মতাদর্শ ও পদাঙ্ক অনুসরণে তাদের একনিষ্ঠতা ছিল সর্বাগ্রে। তারা হলেন আব্বাস আল-মুসাভী এবং হাসান নাসরুল্লাহ। লেবাননে গিয়ে তারা অতিদ্রুত হারকাতু আমালে যোগ দেন এবং কেন্দ্রীয় দায়দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। তখন হাসান নাসরুল্লাহর বয়স ছিল মাত্র আঠারো বছর।

জনাব খোমেনী ১৯৭৮ সালে ইরাক থেকে বহিষ্কৃত হয়ে প্যারিসে আশ্রয় নেন। ১৯৭৯ সালে ইরানী বিপ্লবের সময় ইরানের শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং জনাব খোমেনী প্যারিস থেকে তেহরানে ফিরে এসে ইরানের ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ক্ষমতা পাওয়ার পর তিনি সবকিছু ঢেলে সাজাতে শুরু করেন। এ সময় তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা তার পথ থেকে সরে দাঁড়ায় এবং তিনিও পরবর্তী বিপ্লবে সহযোগী হতে পারে এমন লোকদের কাছে ভালো সাজতে চেষ্টা করেন। এভাবে একটু একটু করে তিনি ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে নেন। এরপর আর তিনি পবিত্র নগরী কুমে ফিরে যাননি, যেমনটি জনসাধারণের প্রত্যাশা ছিল; বরং ইরানের রাজধানী তেহরানেই থেকে গেছেন।

ইরানের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে খোমেনী নজর দেন লেবানন ও ইরাকের দিকে। এ দুটি ভূখণ্ডে তখন শিয়াদের বসবাস ছিল চোখে পড়ার মতো। এজন্য রাষ্ট্রদুটি এই অঞ্চলে বৃহত্তর শিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অবশিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিণত হয়।

ইরাকে তখন মারাত্মক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল; যদিও প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসাইন সবকিছু শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছিলেন। এ ব্যাপারগুলো ঘটছিল খোমেনীর চোখের সামনেই; কারণ তাকে ইরাক ছেড়ে প্যারিস যেতে বাধ্য করার পূর্বে তিনি পূর্ণ চৌদ্দটি বছর ইরাকেই কাটিয়েছেন। এ কারণে খুব ভালো করে জানা ছিল ইরাকে অভ্যন্তরীণ শিয়া আন্দোলন সাদ্দাম সরকারের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না; তাই তিনি সামরিক উপায়ে সমাধানের পথ বেছে নেন।

এরপর ১৯৮০ সালে ইরানী বিপ্লবের পর মাত্র এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি ইরাক-সরকারের বিরুদ্ধে সম্মিলিত হামলা চালাতে নির্দেশ দেন। উদ্দেশ্য ছিল সাদ্দাম সরকারের পতন ঘটানো এবং ইরাকী শিয়াদেরকে ক্ষমতায় বসানো, যাতে খোমেনীর বৃহত্তর শিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণের পথ সুগম হবে।

অপদিকে দূরবর্তী দেশ লেবানন বিচিত্র ধর্মীয় সম্প্রদায়ে ভরা। সুতরাং সেখানে এমন কিছু লোক প্রস্তুত করতে হবে, যারা হবে খোমেনীর প্রতি পরিপূর্ণ অনুগত এবং তার চিন্তাধারায় আপাদমস্তক প্রভাবিত। এ দৃষ্টিকোণ থেকেই জনাব খোমেনী সেখানে থাকা দুই শিয়া নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যারা ছিলেন ইসনা আশারিয়া মতাদর্শের অনুসারী এবং খোমেনীর ক্ষমতায় আরোহণের সিঁড়ি তথা, ‘বিলায়াতুল ফাকীহ’ আকীদায় বিশ্বাসী। এরা হলেন আব্বাস আল-মুসাভী এবং হাসান নাসরুল্লাহ।

এরপর থেকে ইরান তাদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা আরম্ভ করে। যদিও তখন হারকাতু আমালের নেতৃত্ব ছিল নাবীহ বারির হাতে, যিনি ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের পক্ষপাতি।

১৯৮১ সালে হারকাতু আমালের চতুর্থ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনের বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যার সমাধান করা। সমস্যাগুলো বেধেছিল শিয়া নিয়ন্ত্রিত দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষমতার বিস্তার নিয়ে। এই সম্মেলনে নাবীহ বারিকে হারকাতু আমালের প্রধান ঘোষণা করা হয় এবং আব্বাস আল-মুসাভীকে করা হয় তার নায়েব বা সহকারী। দক্ষিণ লেবাননে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

টিকাঃ
১. বিলায়াতুল ফাকীহ (ولاية الفقيه): বর্তমান ইসনা আশারিয়া শিয়াদের একটি বিশেষ আকীদা বা চিন্তাধারা। এ বিষয়ে বক্ষ্যমাণ গ্রন্থেই সবিস্তার আলোচনা করা হয়েছে। - অনুবাদক
২. Islamic Hope Movement (حركة أمل الإسلامية)
৩. ‘হারকাতু আমালিল কুওমিয়া’ (حركة أمل القومية) দ্বারা সম্ভবত ‘হারকাতু আমালিল ইসলামিয়া’ গঠিত হওয়ার পর ‘হরকাতু আমাল’-এর বাকি অংশকে বোঝানো হয়েছে, যা ছিল নাবীহ বারির নেতৃত্বাধীন। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। -অনুবাদক

📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 ইহুদীদরে আক্রমণ এবং শিয়াদের অবস্থান

📄 ইহুদীদরে আক্রমণ এবং শিয়াদের অবস্থান


১৯৮২ সালে বিশেষত, জানুয়ারি মাসের ৬ তারিখে লেবাননে যা ঘটে সেজন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। সেদিন সমগ্র দক্ষিণ লেবানন ইহুদী হামলার শিকার হয়। এমনকি রাজধানী বৈরুত পর্যন্ত গিয়ে তারা অবরোধ আরম্ভ করে। তাদের এ অরাজকতার উদ্দেশ্য ছিল ইয়াসির আরাফাত ও ফাতাহের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ এবং ফিলিস্তিনী সামরিক বাহিনীকে দক্ষিণ লেবানন থেকে বের করে দেওয়া।

লেবানন সমাজে ফিলিস্তিনীরা যেহেতু একটু সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল—যা ম্যারোনাইট খ্রিষ্টানদের কাছে ভালো লাগেনি—তাই ইহুদীদের এই উৎখাত অভিযানের প্রতি তাদের পূর্ণ সম্মতি ছিল। এ সময় ফিলিস্তিনীরা দফায় দফায় ইহুদীদের দ্বারা গণহত্যার শিকার হয়। তার মধ্যে ‘সাবিরা ও শাতিলা গণহত্যা’ ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর। এতে প্রায় তিন হাজার ফিলিস্তিনীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এভাবে ম্যারোনাইট খ্রিষ্টানদের সম্মতি ও অংশগ্রহণে ইহুদীরা ফিলিস্তিনীদেরকে দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুত থেকে উৎখাত করতে সক্ষম হয়।

এই উৎখাত অভিযানে শিয়াদেরও মৌন সম্মতি ছিল। কেননা এই অঞ্চলে শিয়া রাষ্ট্র কায়েমের প্রস্তুতিস্বরূপ ফিলিস্তিনীদের সরিয়ে দেওয়ার চিন্তা তারা করছিল দীর্ঘদিন ধরে। তাদের সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হয়েছে তৃতীয় পক্ষ তথা ইহুদীদের অভিযানে। কিন্তু বিপত্তি দেখা দেয় তখন, যখন ফিলিস্তিনীদের বের করে দিয়ে ইহুদীরা ফিরে যাওয়ার কথা বেমালুম ভুলে যায়। এমনকি লেবাননের বুকে তারা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে এবং একপর্যায়ে সমগ্র দক্ষিণ লেবাননে সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

ইহুদীদের এ ‘উপস্থিতি’ হয়ে যায় শিয়াদের ‘আশার গুড়ে বালি’। কারণ, ইহুদীদের বর্তমানে শিয়া রাষ্ট্র কায়েম করা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। তা ছাড়া শিয়াদের আরও একটি জটিল সমস্যা ছিল—ধার্মিক ও ধর্মনিরপেক্ষ দলে নিজেদের বিভক্তি।

পরিস্থিতির বিবেচনায় ধার্মিক দলটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এক. হারকাতু আমাল থেকে বেরিয়ে আসা। দুই. ইরানী নেতাদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের সমর্থন লাভ করা। এ লক্ষ্যে তারা তেহরান সফরের উদ্দেশ্যে নয় সদস্যবিশিষ্টি একটি কমিটি গঠন করে; যারা ইরানে গিয়ে খোমেনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং ‘বিলায়াতুল ফাকীহ’ এর ওপর নিজেদের বিশ্বাসের কথা বলে। আর এই সুবাদে খোমেনী ইরানের মতো লেবাননের শিয়াদের সর্বোচ্চ জিম্মাদার হয়ে যান।

জনাব খোমেনীর সম্মতি ও সমর্থন নিয়ে উল্লিখিত কাফেলা লেবানন ফিরে আসে। এসেই তারা হারকাতু আমালের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং আব্বাস আল-মুসাভীর নেতৃত্বে নতুন দল তথা, ‘হারকাতু আমালিল ইসলামিয়া’ বা ‘ইসলামী আশার আন্দোলন’ গঠন করে।

টিকাঃ
১. সাবিরা ও শাতিলা গণহত্যা (مذبحة صابرا أو صبرا وشاتيلا): Sabra and Shatila massacre. - অনুবাদক

📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 হিযবুল্লাহর প্রতিষ্ঠা এবং দক্ষিণাঞ্চলের বিশৃঙ্খলা

📄 হিযবুল্লাহর প্রতিষ্ঠা এবং দক্ষিণাঞ্চলের বিশৃঙ্খলা


একদিকে লেবাননে গৃহযুদ্ধের অগ্নি দিন-কে-দিন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে থাকে; অপরদিকে বৃদ্ধি পেতে থাকে হারকাতু আমালিল ইসলামিয়ার শক্তি ও সক্ষমতা। একপর্যায়ে দলটির প্রধান দায়িত্বশীল আব্বাস আল-মুসাভী ১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘হারকাতু আমালিল ইসলামিয়া’-র পরিবর্তে ‘হিযবুল্লাহ’ নামে একটি নতুন দল গঠনের ঘোষণা দেন। এর তিন মাস পর ১৯৮৫ সালের মে মাসে নাবীহ বারির নেতৃত্বাধীন হারকাতু আমাল ফিলিস্তিনীদের ওপর এক জঘন্য হত্যাকাণ্ড চালায়। যাতে শত শত ফিলিস্তিনী প্রাণ হারায়। এ হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ লেবানন থেকে ফিলিস্তিনীদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া।

শিয়া অধ্যুষিত দক্ষিণ লেবানন ও বিকা অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হারকাতু আমাল ও হিযবুল্লাহর মাঝে মারাত্মক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এই দ্বন্দ্ব একসময় সংঘাতে রূপ নেয়। পরিশেষে ১৯৮৮ সালে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে হিযবুল্লাহ বিজয় লাভ করলে সকল দ্বন্দ্বের অবসান ঘাটে। যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর হারকাতু আমালের শতকরা ৯০ জন সদস্য হিযবুল্লাহয় যোগদান করে। আর হিযবুল্লাহ ছিল ইরানের প্রতি অনুগত, সিরিয়ার মদদপুষ্ট। এসব কারণে হারকাতু আমাল যাবতীয় সামরিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি নিয়ে নিছক রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

এতে হিযবুল্লাহর পথের কাঁটা অনেকটাই পরিষ্কার যায়। কিন্তু ঝামেলা একটা রয়ে যায় ইহুদীদের জন্য। কেননা ইহুদীরা শিয়াদের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু দক্ষিণ লেবানন দখল করে আছে। এ কারণে তারা বৈরুতের কিছু এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। যাতে সেখান থেকে ইহুদীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা সহজ হয়।

বৈরুতের পূর্বাঞ্চল খ্রিষ্টান অধ্যুষিত হওয়ায় সেদিকে না গিয়ে, হিযবুল্লাহ রওনা করে পশ্চিম দিকে, বিশেষত দক্ষিণ দিকে। এরপর অস্ত্রের জোরে একটু একটু করে সেসব এলাকা দখল করতে থাকে। দখলকৃত অঞ্চলগুলো যে ছিল সুন্নী অধ্যুষিত, সে কথা তো বলাই বাহুল্য। সেখানে তারা সাধারণ জমির পাশাপাশি সুন্নীদের মালিকানাধীন জমিতেও স্থাপনা নির্মাণ শুরু করে। এ ব্যাপারে লেবানন সরকার ছিল একেবারেই নিশ্চুপ।

এভাবে ধীরে ধীরে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল শিয়াদের দখলে চলে যায় এবং সেখানে হিযবুল্লাহর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

টিকাঃ
১. Islamic Hope Movement (حركة أمل الإسلامية)
২. Islamic Revolutionary Guard Corps (IRGC) (الحرس الثوري الإيراني)
৩. ‘হারকাতু আমালিল কুওমিয়া’ (حركة أمل القومية) দ্বারা সম্ভবত ‘হারকাতু আমালিল ইসলামিয়া’ গঠিত হওয়ার পর ‘হরকাতু আমাল’-এর বাকি অংশকে বোঝানো হয়েছে, যা ছিল নাবীহ বারির নেতৃত্বাধীন। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। -অনুবাদক

📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 ইহুদীদের দমন এবং সুন্নীদের প্রতি অকৃতজ্ঞতা

📄 ইহুদীদের দমন এবং সুন্নীদের প্রতি অকৃতজ্ঞতা


১৯৮৯ সালে জনাব খোমেনী মৃত্যুবরণ করেন। তার স্থলাভিষিক্ত হন ইরানী বিপ্লবের পথপ্রদর্শক আলী খামেনেয়ী। নেতার পরিবর্তন ঘটলেও হিযবুল্লাহর আনুগত্যে কোনো পরিবর্তন আসে না। অর্থাৎ, হিযবুল্লাহর কাছে আলী খামেনেয়ীও সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে গৃহীত হন।

১৯৮৯ সালেই সৌদি সরকারের উদ্যোগে লেবাননে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত দলগুলো তায়েফে সমবেত হয় এবং সকলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘাটে। একই বছর লেবাননী সুন্নীদের বিশিষ্ট মুরুব্বি শায়খ হাসান খালিদ রহিমাহুল্লাহকে হত্যা করা হয়। যিনি ১৯৬৬ সাল থেকে লেবাননের প্রধান মুফতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে সুন্নীরা অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়ে। অপরদিকে লেবাননের ভূমিতে ‘ইসলামী’ দল হিসেবে হিযবুল্লাহর নাম উঠে আসতে থাকে।

যেসব এলাকা নিয়ে শিয়ারা স্বতন্ত্র রাষ্ট্র কায়েম করতে চেয়েছিল সেগুলো ছিল ইহুদীদের দখলে। তাই তারা সেসব এলাকা স্বাধীন করার লক্ষ্যে ইহুদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। সিরিয়ার প্রত্যক্ষ সমর্থন ও সহযোগিতা তো ছিলই, সেই সঙ্গে ইরান থেকে আসে অঢেল সম্পদ। এসব দেখে ইহুদীরা বেশ চিন্তায় পড়ে যায়। একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ১৯৯২ সালে হিযবুল্লাহর মহাসচিব আব্বাস আল-মুসাভীকে হত্যা করে ফেলে। এরপর হিযবুল্লাহর মহাসচিব পদে আসীন হন জনাব হাসান নাসরুল্লাহ।

একই বছর সুন্নীরা নতুন নেতৃত্বের সন্ধান পেয়ে তার চারপাশে ভিড় জমাতে শুরু করে। নতুন এই নেতার নাম রফিক আল-হারীরী। তিনি ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। সব সময় তিনি লেবাননকে দু-হাতে ঢেলে সাজাতে চেষ্টা করেছেন। তার প্রতি লেবাননের অসংখ্য মানুষ আস্থা রাখছে অনায়াসে।

১৯৯৬ সালে ইহুদীরা লেবাননে ‘ক্রোধের আঙুর অভিযান’ নামে এক পাশবিক হত্যাযজ্ঞ চালায়। যার ফলে লেবাননীদের হৃদয়ে ইহুদীদের দখলদারত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা জাগে।

এজন্য ইহুদীদের প্রতিরোধকল্পে হিযবুল্লাহ ‘লেবাননী প্রতিরক্ষা ব্রিগেড’ গঠনের ঘোষণা দেয়। এই বাহিনীতে দলমত নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ যোগদান করে। তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী সুন্নীদের অংশগ্রহণ ছিল সবচেয়ে বেশি তথা, ৩৮ শতাংশ। এ ছাড়া শিয়া ছিল ২৫ শতাংশ, দ্রুজ ২০ শতাংশ এবং খ্রিষ্টান ১৭ শতাংশ।

২০০০ সালে সম্মিলিত হামলার ফলে ইহুদীরা ‘মাযারিউ শিবা’ বা ‘শিবা খামার’ নামক অঞ্চল বাদে দক্ষিণ লেবাননের অধিকাংশ অঞ্চল থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। সঙ্গে সঙ্গে হিযবুল্লাহ এই এলাকাগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এমনকি লেবাননী সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপও তারা প্রত্যাখ্যান করে।

টিকাঃ
১. Operation Grapes of Wrath (عملية عناقيد الغضب)
১. Lebanese Resistance Brigades
২. Shebaa Farms (মাজারিউ শিমা)

ফন্ট সাইজ
15px
17px