📄 একজন মূসা এবং বহুমুখী শত্রুতা
মূসা আস-সদর 'সর্বোচ্চ শিয়া পরিষদ' এবং 'হারকাতু আমাল' প্রতিষ্ঠার পর সর্বেসর্বা হয়ে উঠেন; যা অনেকের মনেই তার প্রতি ঘৃণার জন্ম দেয়। যদিও এর পেছনের মূল কারণ ছিল অকুতোভয় মূসার ক্ষমতার প্রদর্শনী। নিজ ইচ্ছার প্রতিকূলে কিছু ঘটলে কিংবা অনকূলে না ঘটলেই মূসা তার বাহিনীকে রাষ্ট্রের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার হুমকি দিতেন। একপর্যায়ে তিনি জনাব আয়াতুল্লাহ খোমেনীর কিছু কাজের সমালোচনা পর্যন্ত করেন। এমনকি, যে মুরুব্বিরা তাকে লেবানন পাঠিয়েছিলেন তাদের উপেক্ষা করে তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উঠাবসা শুরু করেন। এতে তারা তার ওপর অসন্তুষ্ট হন, বিশেষত যখন তিনি ইরানের শাহের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতে মিলিত হন এবং ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত বারোজন ধর্মীয় নেতার মুক্তি কামনা করেন। জনাব খোমেনী এ কারণে তাকে আন্তর্জাতিক শিয়া নীতি ভঙ্গ করা এবং ইরানী বিপ্লবের শত্রু শাহের সঙ্গে আঁতাতের দায়ে অভিযুক্ত করেন।
১৯৭৮ সালে সিরিয়া-সদর সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। মূল কারণ হলো, ১৯৭৭ সালে সিরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান ইসরায়েল সফর করেন। এ কারণে তিনি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ও আমেরিকার চক্ষুশূলে পরিণত হন। সিরীয় সৈন্যরা যেহেতু তখনও লেবাননে অবস্থান করছিল, তাই তিনি চাচ্ছিলেন লেবানন যেন তার পাশে দাঁড়ায়। পাশাপাশি এ-ও কামনা করছিলেন যে, লেবানন যেন সিরিয়া ছাড়া ভিন্ন কোনো মিত্র গ্রহণ না করে।
কিন্তু সিরিয়ার সক্ষমতা ও দুর্বলতার বিষয়-আশয় মাথায় থাকায় মূসা আস-সদর তার এই আহ্বান উপেক্ষা করে আরববিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার উদ্যোগ নেয়। সুতরাং মূসা আস-সদর প্রথমে কুয়েত এবং পরে আলজেরিয়া সফর করেন। অতঃপর ১৯৭৮ সালের আগস্ট মাসে লিবিয়ার উদ্দেশে বের হন। এরই মধ্যে ঘটে যায় এক মহাকাণ্ড। লিবিয়া সরকার ঘোষণা করে যে মূসা আস-সদর ২৫ আগস্ট লিবিয়া ছেড়ে গেছেন; অথচ এরপর পৃথিবীর কোথাও আর তার অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দেওয়ার মতো ঘটনা। মূসা আস-সদর তো কোনো শিশু নন যে তিনি বিমানবন্দরে দিকভ্রান্ত হবেন, কোনো আগন্তুকও নন যে দেশের পথঘাট না চিনে হারিয়ে যাবেন। বস্তুত তাকে গুম করে হত্যার কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছিল খুবই সন্তর্পণে, লোকচক্ষুর আড়ালে।
সে সময় মূসার জন্য ওত পেতে থাকা শত্রুর অভাব ছিল না। তাই নিখোঁজের পরপরই সন্দেহের আঙুল ওঠে অনেকের দিকে। তাদের সর্বাগ্রে ছিল এ ঘটনার এক বছর পর ঘটা ইরানী বিপ্লবের নেতৃবৃন্দ। কেননা, তারা এমন কোনো ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্বকে সহ্য করতে পারত না, যে তাদেরকে বাদ দিয়ে বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে একটি নতুন শিয়া রাষ্ট্র কায়েম করবে এবং খোমেনীর প্রতিদ্বন্দ্বীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। এ ছাড়া সিরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানকে ক্ষুব্ধ করার বিষয়টিও ছিল তার জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক। কেননা, তিনি তার প্রতিপক্ষের সঙ্গে রক্ত নিয়ে খেলতে ভালোবাসেন, যা সকলেরই জানা। তা ছাড়া, খোদ লিবিয়ার সঙ্গেই ইরানী বিপ্লবের নেতৃবৃন্দের গভীর সম্পর্ক ছিল। ইরাক-ইরান যুদ্ধে ইরানের প্রতি লিবিয়ার সমর্থনই তা প্রমাণ করে।
মূসা আস-সদরের ইন্তেকালে লেবাননের অভ্যন্তরীণ শক্তিগুলো যার যার হিসসা বুঝে নেয়। অতঃপর চলমান গৃহযুদ্ধ ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। আকস্মিকভাবে মূসা আস-সদরের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি সকলকে মারাত্মক ধাঁধায় ফেলে দেয়; রাজনীতিকরা এর উত্তর খুঁজতে মরিয়া হয়ে ওঠেন; কিন্তু নিশ্চিত করে কারও পক্ষেই কিছু বলা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। ভাবনার বিষয় হলো, মূসা আস-সদর চলে গেলেও তার পেছনে রেখে গেছেন এক অগ্নিগর্ভ ভূমি। রেখে গেছেন নিজস্ব সশস্ত্রবাহিনী, যেটি তার স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যাবে। আরও রেখে গেছেন সর্বোচ্চ শিয়া পরিষদে একটি শূন্য পদ।
এর ঠিক এক বছর পর ইরানী বিপ্লব সংঘটিত হয়; যাতে ইরানী শাহ ক্ষমতাচ্যুত হন। এবং চার বছর পর ইহুদীরা দক্ষিণ লেবাননে আক্রমণ করে। এতসব উত্থান-পতন পেরিয়ে, কালের গর্ভ থেকে জন্ম নেয় প্রসিদ্ধ শিয়া সংগঠন হিযবুল্লাহ। উদ্দেশ্য, মূসা আস-সদরের অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করা। তবে সেটা নিশ্চয় ইরানের সমর্থন ও সহায়তায়।