📄 সুন্নী শাসনের বিরুদ্ধে শিয়াদের বিদ্রোহ
সমসাময়িক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহাত্মক চেতনা থেকেই মূলত শিয়া মতবাদের উৎপত্তি। শুরু থেকেই শিয়াদের মৌলিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল প্রভাব-প্রতিপত্তির বিস্তার এবং শাসনক্ষমতার সুপ্রতিষ্ঠা। এতে সুন্নীদের সঙ্গে তাদের যতই সংঘাত হোক না কেন। ইতিহাসের নানান বাঁকে ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের এ স্বপ্ন পূরণও হয়েছে। তখন অধীনস্থরা দেখেছে এ সম্প্রদায়ের ধ্বংসাত্মক লীলাখেলা কতটা জঘন্য হতে পারে। যদিও খ্রিষ্টীয় আঠারো শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সাফাভিদ শাসনের পতনের মধ্য দিয়ে দুনিয়া থেকে তাদের স্বৈরশাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে; দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকে তাদের সকল প্রকল্প ও পরিকল্পনা।
কিন্তু পঞ্চাশের দশকে তাদের সেই আগ্রাসি মনোভাব আবার জাগ্রত হয়। আবার তারা একটি আলাদা সাম্রাজ্যে তাদের ভ্রান্ত ও বিকৃত মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সচেষ্ট হয়। বরাবরের মতো এবারও তাদেরকে বেশ বেপরোয়া দেখা যায়। প্রয়োজনে তারা সামরিক শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্তও নেয়। কাঙ্ক্ষিত সাম্রাজ্যের জন্য তিনটি রাষ্ট্রের নাম প্রস্তাবনায় উঠে আসে। সেগুলো হলো ইরান, ইরাক ও লেবানন। এ দেশগুলোতে শিয়াদের বসবাস আগে থেকেই ছিল চোখে পড়ার মতো। যা ছিল তাদের জন্য অন্যতম ইতিবাচক দিক।
শিয়া লবি এই তিনটির কোনোটি কিংবা সবকটিতেই শিয়া শাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা শুরু করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্বাচিত কিছু লোককে উল্লিখিত দেশসমূহে প্রেরণ করা হয়। এদিকে ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে শাসনব্যবস্থার কেন্দ্র ইরানে কিছু লোক কাজ শুরু করে; ওদিকে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ইরাকে একই উদ্দেশ্যে আরও কিছু লোক কাজে লেগে যায়; আর লেবাননে পাঠানো হয় মূসা আস-সদরকে।
এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা ছিল বেশ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে কয়েক দশক পরে হলেও যে তা সফলতার মুখ দেখবে, তা ছিল অনেকটা নিশ্চিত। সময় যতই লাগুক, গুরুত্বপূর্ণ তো হলো সফলতা। তা ছাড়া শিয়াদের পূর্ববর্তী সাম্রাজ্য তথা, বুওয়াইহিয়া, উবাইদিয়া বা কথিত ফাতিমীসহ অন্যান্য সাম্রাজ্যগুলো তো এভাবেই গড়ে উঠেছিল।
এসব সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাকালে সাধারণত নিপীড়িত ও অত্যাচারিত জনগোষ্ঠীকে ব্যবহার করা হয়েছে। শিয়া নেতারা প্রথমে ধনী ও সম্পদশালীদের বিরুদ্ধে নিঃস্ব ও দরিদ্রদের মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বেলে দিয়েছে। এরপর সেই আগুনে ঘি ঢেলে উভয় শ্রেণিকে নিয়ে গেছে সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে। অবশেষে শিয়াজনতার আবেগানুভূতি কাজে লাগিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে প্রতিটি শিয়া রাষ্ট্র।
ইতিহাসের পাতায় বারবার পাঠ করে আসা ঘটনা আমরা ইরানের ভূমিতে ঘটতেই দেখলাম। সে বিষয়ে আল্লাহ চাইলে সময়মতো সবিস্তার আলোচনা করব। এখন লক্ষ করার বিষয় হলো, ইদানীং ইরাক ও লেবাননে অতীতের সেই পদক্ষেপগুলোই নিতে দেখা যাচ্ছে স্পষ্টভাবে। সন্দেহ নেই, এ দুটি দেশে তাদের পরিকল্পনা সফল হলে পরবর্তী টার্গেট হবে সিরিয়া, কুয়েত, বাহরাইন ও সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল। চারপাশে কী ঘটছে এবং ঘটতে যাচ্ছে তা মুসলিম উম্মাহর সামনে তুলে ধরতেই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।
📄 শিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা
ফিরছি লেবানন-প্রসঙ্গে... পূর্ণাঙ্গ শিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা থেকেই মূসা আস-সদরকে লেবাননে পাঠানো হয়। তাকে নির্বাচনের পেছনে বেশকিছু যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল। উল্লেখযোগ্য একটি হলো লেবাননীদের সঙ্গে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং আরবী ও ফার্সী ভাষায় তার পাণ্ডিত্য। তা ছাড়া ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা জনাব খোমেনীর সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল নিরবচ্ছিন্ন। এমনকি তাদের মাঝে রাজনৈতিক সম্পর্কের চেয়ে পারিবারিক সম্পর্কই ছিল অধিক ঘনিষ্ঠ। একদিকে খোমেনীপুত্র আহমাদ খোমেনী বিয়ে করেছেন মূসা আস-সদরের ভাগ্নীকে; অপরদিকে মূসাপুত্র বিয়ে করেছেন খোমেনীর নাতিনকে। আবার মুস্তফা খোমেনী ও মূসা আস-সদরের মাঝে ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব।
লেবানের দক্ষিণাঞ্চলে শিয়াদের ঘনবসতি। এজন্য মূসা আস-সদর সেখানেই বসবাস শুরু করেন। শুরুতে তিনি খোলামেলাভাবে ধর্মীকর্মের দিকে না গিয়ে নিছক উন্নয়নমূলক সামাজিক কার্মকাণ্ডের দিকে অগ্রসর হন। হতদরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন নানা রকম সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। গড়ে তোলেন একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসাকেন্দ্র। এরপর তিনি একটু একটু অগ্রসর হতে থাকেন মূল লক্ষ্যের দিকে; প্রকাশ করতে থাকেন হৃদয়ে ধারণকৃত চিন্তা-চেতনা ও আকীদা-বিশ্বাস।
প্রথমে তিনি শিয়াদের মাঝে ইসনা আশারিয়া মতাদর্শ অনুযায়ী বিচারকার্য প্রতিষ্ঠার জন্য 'জাফরী আদালত' নামে এক বিশেষ বিচারালয় প্রতিষ্ঠা করেন। লেবাননের সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতা এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুবাদে এ কাজটি তিনি খুব সহজেই করতে সক্ষম হন। তা ছাড়া সরকার ও সামরিক বাহিনীর সীমাহীন উদাসীনতা ও দুর্বলতাও তার ইচ্ছা পূরণে সঙ্গ দিয়েছিল সমানভাবে।
মূসা আস-সদর ছিলেন অসামান্য চাতুর্যের অধিকারী; স্বার্থ হাসিলের জন্য ঝোঁপ বুঝে কোপ মারায় পারদর্শী। শুরুতেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, লেবাননে এখন সবচেয়ে ক্ষমতাধর সম্প্রদায় ম্যারোনাইট খ্রিষ্টান। আর তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সুন্নী মুসলমান। তিনি এ-ও জানতেন, এ যুগে অল্প কিছু ছাড়া অধিকাংশ সুন্নীদের অবস্থান আহলুস সুন্নাহর নীতি-আদর্শ এবং দীনের বিধি-বিধান থেকে বহু দূরে। মুসলিমরা এখন নিজেদের স্বকীয়তা বিকিয়ে দিয়ে সমাজবাদ, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের তীরে তরি ভেড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে মূসা আস-সদর খ্রিষ্টান ম্যারোনাইটদের গা ঘেঁষলেন। এতে অবশ্য আশ্চর্যের কিছু ছিল না। কেননা শিয়া মতবাদের জন্মই হয়েছিল সুন্নী মতাদর্শের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য, ইসলামী খেলাফতের সোনালি অতীত প্রত্যাখ্যান করার জন্য, ইসলামী বিশ্বের সকল সুন্নী শাসকদের বিরুদ্ধাচরণ করার জন্য। এ কারণে তাদের মৌলিক চিন্তাধারাই আহলুস সুন্নাহর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
মূসা আস-সদর লেবাননের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ম্যারোনাইট খ্রিষ্টান চার্লস হিলোর দারস্থ হন। মুসলিম দাবিদার হয়েও তিনি খ্রিষ্টানদের কাছে যান; অথচ মুসলিম উম্মাহর শক্তি বৃদ্ধির জন্য সুন্নী নেতাদের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ তিনি করেননি। সুন্নীদের বিপক্ষে চার্লস হিলোর জন্য মূসা আস-সদর উপযুক্ত মিত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।
চার্লস হিলো মূসা আস-সদরকে কাছে টেনে নেন, উৎসাহিত করেন। এবং ১৯৬৭ সালে তিনি লেবাননী শিয়াদের কল্যাণে 'ইসলামী শিয়া সর্বোচ্চ পরিষদ' গঠনের অনুমতি প্রদান করেন। শুধু তাই নয়, চার্লস হিলো ৭২/৭৬ ধারায় একটি নতুন আইন প্রণয়নের ব্যাপারে সম্মত হন; যাতে উল্লেখ করা হয় যে শিয়া পরিষদ তাদের নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধান ও ফতোয়ার ব্যাপারে অন্যান্য শিয়া রাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারবে। এ ক্ষেত্রে লেবাননে বিধি-নিষেধ জারির প্রয়োজন পড়বে না।
পর্যায়ক্রমে ১৯৬৯ সালে এই পরিষদ গঠিত হয়। এবং মহাসচিবের দায়িত্ব অর্পিত হয় মূসা আস-সদরের কাঁধে। ১৯৭০ সালে পরিষদটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ করে। সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের শিয়াদের কল্যাণার্থে দশ মিলিয়ন ডলার খরচের সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়। মূসা আস-সদর আমেরিকার কাছেও নিজেকে সঁপে দেন। উদাহরণত, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে উল্লেখ করেন যে, লেবাননের শিয়া যুবসমাজকে নাসিরবাদ থেকে বিমুখ রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
আমেরিকার সাথে তার এই দহরম-মহরমের খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে খোমেনীর কাছের লোকেরা তার ওপর বিভিন্ন অপবাদ আরোপ করে। আসলে খোমেনীর সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ছিল তখন দা-মাছ। কারণ, আমেরিকা তখন ছিল ইরানী শাহের কট্টর সমর্থক।
১৯৭০ সালের ঘটনার জন্য মূসা আস-সদর মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। সে সময় আকস্মিকভাবে জর্ডানে আশ্রিত ফিলিস্তিনী শরণার্থীরা গণহত্যার শিকার হয়। নৃশংস এ ঘটনাটি 'কালো সেপ্টেম্বর' নামে পরিচিত। এরপর 'ফাতাহ'-র উদ্যোগে বেঁচে যাওয়া শরণার্থীদের লেবাননে পাঠানো হয়। তাদেরকে জায়গা দেওয়া হয় ফিলিস্তিন সীমান্ত ঘেঁষে দক্ষিণ লেবাননে। শিয়াদের কাছে এ বিষয়টি মোটেও ভালো লাগেনি। কেননা, ফিলিস্তিনীরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর অনুসারী। আর এজন্য হয়তো দেখা যাবে তাদের কাঙ্ক্ষিত শিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিলম্ব হচ্ছে। জেনে রাখা ভালো, 'ফাতাহ'-ও ছিল ইসলামী শিক্ষা ও দীক্ষা থেকে বিচ্যুত, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের রোগে রোগাক্রান্ত।
এমতাবস্থায়ও মূসা আস-সদর ফাতাহ থেকে ঠিকই উপকৃত হয়েছেন; স্বার্থসিদ্ধির জন্য কৌশলে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছেন। যেন পরবর্তী সময়ে ফাতাহ শিয়াদের সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করে। আর এর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল এমন এক সশস্ত্রবাহিনী গড়ে তোলা, যা লেবানন নিয়ে তার সকল স্বপ্ন পূরণে সহায়ক হয়। অপরদিকে ফাতাহও সে সময় এমন এক মিত্রের সন্ধানে ছিল, যে কি-না কম্যুনিস্ট ও তাদের মাঝে মধ্যস্থতা করবে। সব মিলিয়ে উভয়ের মাঝে স্বার্থের ভিত্তিতে এক দারুণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
১৯৭১ সালে সিরিয়ার ক্ষমতা গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি হাফিজ আল-আসাদ। তিনি ছিলেন আলাওয়ী নুসায়েরী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে এ সম্প্রদায়টিকে মুসলিম বলা হয় ঠিক, কিন্তু তারা মুসলিম নয়। কারণ, হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তারা ইলাহা বা প্রভু জ্ঞান করে। এ সময় মূসা আস-সদর তড়িঘড়ি করে একটি ফতোয়া জারি করেন; যাতে আলাওয়ী সম্প্রদায়কে শিয়া আখ্যায়িত করা হয়। এই সুবাদে প্রেসিডেন্ট হাফিজ আল-আসাদকে মুসলিম মনে করা শুরু হয়। মূসা আস-সদরের এই ফতোয়া তাকে সিরিয়া সরকারের কাছে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন করে তোলে। এরপর তিনি হাফিজ আল-আসাদ ও ইরানী বিপ্লবের নেতৃবৃন্দের মাঝে মধ্যস্থতার দায়িত্ব পালন করেন। এবার হাফিজ আল-আসাদ ইরানী শাহের বিরুদ্ধে চলা বিদ্রোহের পক্ষে অবস্থান নেন। এমনকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে শত্রুতার জের ধরে তিনি ইরানী বিপ্লবের পর ইরাক-ইরান যুদ্ধে ইরানের পক্ষাবলম্বন করেন।
এভাবেই মূসা আস-সদর একটি নতুন শিয়া রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে সক্ষম হন। আর এ কাজে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় (শিয়া) নেতৃবৃন্দ তাকে সাহায্য করেন, সমর্থন জানান। তাদের মাঝে জনাব আয়াতুল্লাহ খোমেনীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার সমর্থনে আরও ছিল লেবাননের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়, সিরীয় ও মার্কিন সরকার; এমনকি সুন্নী নামধারী ফাতাহও।
১৯৭৫ সালে মূসা আস-সদর 'হারকাতুল মাহরূমীন' বা 'সুবিধা- বঞ্চিতদের সংগ্রাম' নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এ সংগঠনের মূল এজেন্ডায় সুবিধাবঞ্চিতদের স্বার্থে কাজ করে যাওয়ার কথা বলা হয়। এ জন্য দক্ষিণাঞ্চলের বহু খ্রিষ্টান তাতে যোগ দেয়। তাদের ধারণা ছিল, সংগঠনটি হয়তো সত্যিই দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন দেখা যায়, শিয়াদের স্বার্থরক্ষাই এর একমাত্র লক্ষ্য, তখন তারা কেটে পড়ে। এরপর এ সংগঠনের কর্মীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিতে মূসা আস-সদর নতজানু লেবানন সরকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ফাতাহের মহাসচিব ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন।
১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে মূসা আস-সদর হরকাতুল মাহরূমীনের অধীনে একটি সামরিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। সংগঠনের নাম দেন 'আফওয়াজুল মুকাওয়ামাহ আল-লুবনানিয়া' বা 'লেবানন প্রতিরক্ষা বাহিনী'। সংক্ষেপে এটি 'হারকাতু আমাল' বা 'আশার আন্দোলন' নামে পরিচিত হতে থাকে। সঙ্গত কারণে মূসা আস-সদর নিজেই ছিলেন এর প্রধান। এসব সংগঠন প্রতিষ্ঠার পর মূসা আস-সদর ফিলিস্তিনী শরণার্থীদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেন; শিয়া অধ্যুষিত দক্ষিণ লেবানন থেকে সুন্নীদেরকে উৎখাত করতে উঠেপড়ে লাগেন। একপর্যায়ে হারকাতু আমাল ফিলিস্তিনীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত যুদ্ধের নামে চলতে থাকা এ নির্যাতন 'শিবিরের যুদ্ধ' নামে প্রসিদ্ধ।
টিকাঃ
১. Jaafari Tribunal - Courts (المحاكم الجعفرية)
২. Charles Helou
৩. Supreme Islamic Shia Council (المجلس الإسلامি শিয়ি الأعلى)
৪. নাসিরবাদ (التيار الناصري): মিশরের জামাল আবদুন নাসিরের চিন্তাধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত সমাজতান্ত্রিক আরব জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শ। -অনুবাদক
৫. Black September (أيلول الأسود)
৬. ফাতাহ বা فتح এর পূর্ণ নাম: حركة التحرير الوطني الفلسطيني বা ফিলিস্তিনি স্বাধীনতা আন্দোলন। এটি ফিলিস্তিনী নেতা ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে ১৯৫৯ সালে গঠিত হয়। -অনুবাদক
৭. আলাওয়ী নুসায়েরী (العلوية النصيرة)
৮. Movement of the Dispossessed (حركة المحرومين)
৯. Lebanese Resistance Regiments (أفواج المقاومة اللبنانية)
১০. Hope Movement (حركة أمل)
১১. War of the Camps (حرب المخيمات)
📄 একজন মূসা এবং বহুমুখী শত্রুতা
মূসা আস-সদর 'সর্বোচ্চ শিয়া পরিষদ' এবং 'হারকাতু আমাল' প্রতিষ্ঠার পর সর্বেসর্বা হয়ে উঠেন; যা অনেকের মনেই তার প্রতি ঘৃণার জন্ম দেয়। যদিও এর পেছনের মূল কারণ ছিল অকুতোভয় মূসার ক্ষমতার প্রদর্শনী। নিজ ইচ্ছার প্রতিকূলে কিছু ঘটলে কিংবা অনকূলে না ঘটলেই মূসা তার বাহিনীকে রাষ্ট্রের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার হুমকি দিতেন। একপর্যায়ে তিনি জনাব আয়াতুল্লাহ খোমেনীর কিছু কাজের সমালোচনা পর্যন্ত করেন। এমনকি, যে মুরুব্বিরা তাকে লেবানন পাঠিয়েছিলেন তাদের উপেক্ষা করে তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উঠাবসা শুরু করেন। এতে তারা তার ওপর অসন্তুষ্ট হন, বিশেষত যখন তিনি ইরানের শাহের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতে মিলিত হন এবং ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত বারোজন ধর্মীয় নেতার মুক্তি কামনা করেন। জনাব খোমেনী এ কারণে তাকে আন্তর্জাতিক শিয়া নীতি ভঙ্গ করা এবং ইরানী বিপ্লবের শত্রু শাহের সঙ্গে আঁতাতের দায়ে অভিযুক্ত করেন।
১৯৭৮ সালে সিরিয়া-সদর সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। মূল কারণ হলো, ১৯৭৭ সালে সিরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান ইসরায়েল সফর করেন। এ কারণে তিনি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ও আমেরিকার চক্ষুশূলে পরিণত হন। সিরীয় সৈন্যরা যেহেতু তখনও লেবাননে অবস্থান করছিল, তাই তিনি চাচ্ছিলেন লেবানন যেন তার পাশে দাঁড়ায়। পাশাপাশি এ-ও কামনা করছিলেন যে, লেবানন যেন সিরিয়া ছাড়া ভিন্ন কোনো মিত্র গ্রহণ না করে।
কিন্তু সিরিয়ার সক্ষমতা ও দুর্বলতার বিষয়-আশয় মাথায় থাকায় মূসা আস-সদর তার এই আহ্বান উপেক্ষা করে আরববিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার উদ্যোগ নেয়। সুতরাং মূসা আস-সদর প্রথমে কুয়েত এবং পরে আলজেরিয়া সফর করেন। অতঃপর ১৯৭৮ সালের আগস্ট মাসে লিবিয়ার উদ্দেশে বের হন। এরই মধ্যে ঘটে যায় এক মহাকাণ্ড। লিবিয়া সরকার ঘোষণা করে যে মূসা আস-সদর ২৫ আগস্ট লিবিয়া ছেড়ে গেছেন; অথচ এরপর পৃথিবীর কোথাও আর তার অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দেওয়ার মতো ঘটনা। মূসা আস-সদর তো কোনো শিশু নন যে তিনি বিমানবন্দরে দিকভ্রান্ত হবেন, কোনো আগন্তুকও নন যে দেশের পথঘাট না চিনে হারিয়ে যাবেন। বস্তুত তাকে গুম করে হত্যার কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছিল খুবই সন্তর্পণে, লোকচক্ষুর আড়ালে।
সে সময় মূসার জন্য ওত পেতে থাকা শত্রুর অভাব ছিল না। তাই নিখোঁজের পরপরই সন্দেহের আঙুল ওঠে অনেকের দিকে। তাদের সর্বাগ্রে ছিল এ ঘটনার এক বছর পর ঘটা ইরানী বিপ্লবের নেতৃবৃন্দ। কেননা, তারা এমন কোনো ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্বকে সহ্য করতে পারত না, যে তাদেরকে বাদ দিয়ে বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে একটি নতুন শিয়া রাষ্ট্র কায়েম করবে এবং খোমেনীর প্রতিদ্বন্দ্বীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। এ ছাড়া সিরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানকে ক্ষুব্ধ করার বিষয়টিও ছিল তার জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক। কেননা, তিনি তার প্রতিপক্ষের সঙ্গে রক্ত নিয়ে খেলতে ভালোবাসেন, যা সকলেরই জানা। তা ছাড়া, খোদ লিবিয়ার সঙ্গেই ইরানী বিপ্লবের নেতৃবৃন্দের গভীর সম্পর্ক ছিল। ইরাক-ইরান যুদ্ধে ইরানের প্রতি লিবিয়ার সমর্থনই তা প্রমাণ করে।
মূসা আস-সদরের ইন্তেকালে লেবাননের অভ্যন্তরীণ শক্তিগুলো যার যার হিসসা বুঝে নেয়। অতঃপর চলমান গৃহযুদ্ধ ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। আকস্মিকভাবে মূসা আস-সদরের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি সকলকে মারাত্মক ধাঁধায় ফেলে দেয়; রাজনীতিকরা এর উত্তর খুঁজতে মরিয়া হয়ে ওঠেন; কিন্তু নিশ্চিত করে কারও পক্ষেই কিছু বলা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। ভাবনার বিষয় হলো, মূসা আস-সদর চলে গেলেও তার পেছনে রেখে গেছেন এক অগ্নিগর্ভ ভূমি। রেখে গেছেন নিজস্ব সশস্ত্রবাহিনী, যেটি তার স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যাবে। আরও রেখে গেছেন সর্বোচ্চ শিয়া পরিষদে একটি শূন্য পদ।
এর ঠিক এক বছর পর ইরানী বিপ্লব সংঘটিত হয়; যাতে ইরানী শাহ ক্ষমতাচ্যুত হন। এবং চার বছর পর ইহুদীরা দক্ষিণ লেবাননে আক্রমণ করে। এতসব উত্থান-পতন পেরিয়ে, কালের গর্ভ থেকে জন্ম নেয় প্রসিদ্ধ শিয়া সংগঠন হিযবুল্লাহ। উদ্দেশ্য, মূসা আস-সদরের অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করা। তবে সেটা নিশ্চয় ইরানের সমর্থন ও সহায়তায়।