📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 মূসা আস-সদর

📄 মূসা আস-সদর


এবার আমরা ঘটনার মূলে চলে যাচ্ছি... লেবাননে ফ্রান্স ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থনপুষ্ট ম্যারোনাইট খ্রিষ্টানদের তুলনায় শিয়া ও সুন্নীরা একরকম প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবেই বসবাস করে আসছিল। কিন্তু হঠাৎ করে এ উভয় সম্প্রদায়ের মাঝে আত্মপরিচয় ও আত্মোন্নতি-বিধানের ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি হয়। বিশেষত পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে এ ব্যাপারে তাদের উদ্দীপনা ছিল চোখে পড়ার মতো।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সে সময় সুন্নীদের হাল ধরার মতো কেউ ছিল না। বিশেষত সমগ্র আরববিশ্ব যখন সমাজতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছিল, এরা ছিল তখন নেতৃত্বহারা। ঠিক একই সময়ে শিয়াদের অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। ভাগ্যক্রমে তারা তখন এমন একজনকে পেয়ে যায়, যিনি তাদের উন্নতি ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি লেবাননে এসে একজন প্রভাবশালী শিয়া হিসেবে লেবানন-মানচিত্রে আপন স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হন। তিনি হলেন মূসা আস-সদর। সময়টি ছিল ১৯৫৯ সালের দিকে।

মূসা আস-সদর ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের কুম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। সেখানে তিনি 'ইসনা আশারিয়া মতাদর্শ' বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে কুম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিকহ ও তর্কশাস্ত্রে অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আরও পড়াশোনার উদ্দেশে ইরাকের নাজাফ শহরে গমন করেন। সেখানে বিশিষ্ট শিয়া পণ্ডিত মুহসিন আল-হাকিম ও আবুল কাসিম আল খুইর কাছে উচ্চতর পাঠ সমাপ্ত করেন। এরপর ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে চলে যান লেবাননে। এবং সেখানেই বাকি জীবন অতিবাহিত করেন।

📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 লেবানন গমনকালে মূসার সঙ্গী

📄 লেবানন গমনকালে মূসার সঙ্গী


লেবানন গমনের সময় দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মূসা আস-সদরের সফরসঙ্গী ছিল। প্রথমটি হলো বিশেষ ধর্মীয় প্রকল্প অর্থাৎ, ইসনা আশারিয়া মতাদর্শের বিকৃত চেতনা, ভ্রান্ত বিশ্বাস ও নিকৃষ্ট বিদআত ছড়িয়ে লেবাননকে একটি পূর্ণাঙ্গ শিয়া রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করা। 'শিয়াদের গোড়ার কথা' প্রবন্ধে আমরা তাদের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ, আকীদা ও চিন্তাধারা নিয়ে আলোচনা করে এসেছি। আসলে, লেবাননী শিয়ারা তখন পর্যন্ত সেই অর্থে ধার্মিক ছিল না। ধর্মকর্ম খুব একটা বুঝতও না। যাকে বলে নামমাত্র শিয়া। তারা এ মতাদর্শের প্রকৃতি ও পদ্ধতি সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণাই রাখত না।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো অঢেল সম্পদ, যা তার প্রথম প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ মসৃণ করার ক্ষেত্রে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর জানা কথা, নেতৃস্থানীয় শিয়ারা বিপুল পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হয়ে থাকেন। কেননা সাধারণ শিয়ারা তাদের আয়ের বিশ-শতাংশ আহলে বাইতের সদস্য ভেবে তাদের হাতে অর্পণ করে। প্রদত্ত এ সম্পদ নেতারা যাচ্ছেতাই করতে পারেন। বস্তুত, এই অর্থ ব্যবহার করেই তারা যাবতীয় কলকাঠি নাড়েন, গড়েন দৈত্যাকার অর্থনৈতিক ক্ষমতা।

📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 সুন্নী শাসনের বিরুদ্ধে শিয়াদের বিদ্রোহ

📄 সুন্নী শাসনের বিরুদ্ধে শিয়াদের বিদ্রোহ


সমসাময়িক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহাত্মক চেতনা থেকেই মূলত শিয়া মতবাদের উৎপত্তি। শুরু থেকেই শিয়াদের মৌলিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল প্রভাব-প্রতিপত্তির বিস্তার এবং শাসনক্ষমতার সুপ্রতিষ্ঠা। এতে সুন্নীদের সঙ্গে তাদের যতই সংঘাত হোক না কেন। ইতিহাসের নানান বাঁকে ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের এ স্বপ্ন পূরণও হয়েছে। তখন অধীনস্থরা দেখেছে এ সম্প্রদায়ের ধ্বংসাত্মক লীলাখেলা কতটা জঘন্য হতে পারে। যদিও খ্রিষ্টীয় আঠারো শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সাফাভিদ শাসনের পতনের মধ্য দিয়ে দুনিয়া থেকে তাদের স্বৈরশাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে; দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকে তাদের সকল প্রকল্প ও পরিকল্পনা।

কিন্তু পঞ্চাশের দশকে তাদের সেই আগ্রাসি মনোভাব আবার জাগ্রত হয়। আবার তারা একটি আলাদা সাম্রাজ্যে তাদের ভ্রান্ত ও বিকৃত মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সচেষ্ট হয়। বরাবরের মতো এবারও তাদেরকে বেশ বেপরোয়া দেখা যায়। প্রয়োজনে তারা সামরিক শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্তও নেয়। কাঙ্ক্ষিত সাম্রাজ্যের জন্য তিনটি রাষ্ট্রের নাম প্রস্তাবনায় উঠে আসে। সেগুলো হলো ইরান, ইরাক ও লেবানন। এ দেশগুলোতে শিয়াদের বসবাস আগে থেকেই ছিল চোখে পড়ার মতো। যা ছিল তাদের জন্য অন্যতম ইতিবাচক দিক।

শিয়া লবি এই তিনটির কোনোটি কিংবা সবকটিতেই শিয়া শাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা শুরু করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্বাচিত কিছু লোককে উল্লিখিত দেশসমূহে প্রেরণ করা হয়। এদিকে ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে শাসনব্যবস্থার কেন্দ্র ইরানে কিছু লোক কাজ শুরু করে; ওদিকে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ইরাকে একই উদ্দেশ্যে আরও কিছু লোক কাজে লেগে যায়; আর লেবাননে পাঠানো হয় মূসা আস-সদরকে।

এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা ছিল বেশ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে কয়েক দশক পরে হলেও যে তা সফলতার মুখ দেখবে, তা ছিল অনেকটা নিশ্চিত। সময় যতই লাগুক, গুরুত্বপূর্ণ তো হলো সফলতা। তা ছাড়া শিয়াদের পূর্ববর্তী সাম্রাজ্য তথা, বুওয়াইহিয়া, উবাইদিয়া বা কথিত ফাতিমীসহ অন্যান্য সাম্রাজ্যগুলো তো এভাবেই গড়ে উঠেছিল।

এসব সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাকালে সাধারণত নিপীড়িত ও অত্যাচারিত জনগোষ্ঠীকে ব্যবহার করা হয়েছে। শিয়া নেতারা প্রথমে ধনী ও সম্পদশালীদের বিরুদ্ধে নিঃস্ব ও দরিদ্রদের মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বেলে দিয়েছে। এরপর সেই আগুনে ঘি ঢেলে উভয় শ্রেণিকে নিয়ে গেছে সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে। অবশেষে শিয়াজনতার আবেগানুভূতি কাজে লাগিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে প্রতিটি শিয়া রাষ্ট্র।

ইতিহাসের পাতায় বারবার পাঠ করে আসা ঘটনা আমরা ইরানের ভূমিতে ঘটতেই দেখলাম। সে বিষয়ে আল্লাহ চাইলে সময়মতো সবিস্তার আলোচনা করব। এখন লক্ষ করার বিষয় হলো, ইদানীং ইরাক ও লেবাননে অতীতের সেই পদক্ষেপগুলোই নিতে দেখা যাচ্ছে স্পষ্টভাবে। সন্দেহ নেই, এ দুটি দেশে তাদের পরিকল্পনা সফল হলে পরবর্তী টার্গেট হবে সিরিয়া, কুয়েত, বাহরাইন ও সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল। চারপাশে কী ঘটছে এবং ঘটতে যাচ্ছে তা মুসলিম উম্মাহর সামনে তুলে ধরতেই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 শিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা

📄 শিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা


ফিরছি লেবানন-প্রসঙ্গে... পূর্ণাঙ্গ শিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা থেকেই মূসা আস-সদরকে লেবাননে পাঠানো হয়। তাকে নির্বাচনের পেছনে বেশকিছু যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল। উল্লেখযোগ্য একটি হলো লেবাননীদের সঙ্গে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং আরবী ও ফার্সী ভাষায় তার পাণ্ডিত্য। তা ছাড়া ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা জনাব খোমেনীর সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল নিরবচ্ছিন্ন। এমনকি তাদের মাঝে রাজনৈতিক সম্পর্কের চেয়ে পারিবারিক সম্পর্কই ছিল অধিক ঘনিষ্ঠ। একদিকে খোমেনীপুত্র আহমাদ খোমেনী বিয়ে করেছেন মূসা আস-সদরের ভাগ্নীকে; অপরদিকে মূসাপুত্র বিয়ে করেছেন খোমেনীর নাতিনকে। আবার মুস্তফা খোমেনী ও মূসা আস-সদরের মাঝে ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব।

লেবানের দক্ষিণাঞ্চলে শিয়াদের ঘনবসতি। এজন্য মূসা আস-সদর সেখানেই বসবাস শুরু করেন। শুরুতে তিনি খোলামেলাভাবে ধর্মীকর্মের দিকে না গিয়ে নিছক উন্নয়নমূলক সামাজিক কার্মকাণ্ডের দিকে অগ্রসর হন। হতদরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন নানা রকম সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। গড়ে তোলেন একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসাকেন্দ্র। এরপর তিনি একটু একটু অগ্রসর হতে থাকেন মূল লক্ষ্যের দিকে; প্রকাশ করতে থাকেন হৃদয়ে ধারণকৃত চিন্তা-চেতনা ও আকীদা-বিশ্বাস।

প্রথমে তিনি শিয়াদের মাঝে ইসনা আশারিয়া মতাদর্শ অনুযায়ী বিচারকার্য প্রতিষ্ঠার জন্য 'জাফরী আদালত' নামে এক বিশেষ বিচারালয় প্রতিষ্ঠা করেন। লেবাননের সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতা এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুবাদে এ কাজটি তিনি খুব সহজেই করতে সক্ষম হন। তা ছাড়া সরকার ও সামরিক বাহিনীর সীমাহীন উদাসীনতা ও দুর্বলতাও তার ইচ্ছা পূরণে সঙ্গ দিয়েছিল সমানভাবে।

মূসা আস-সদর ছিলেন অসামান্য চাতুর্যের অধিকারী; স্বার্থ হাসিলের জন্য ঝোঁপ বুঝে কোপ মারায় পারদর্শী। শুরুতেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, লেবাননে এখন সবচেয়ে ক্ষমতাধর সম্প্রদায় ম্যারোনাইট খ্রিষ্টান। আর তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সুন্নী মুসলমান। তিনি এ-ও জানতেন, এ যুগে অল্প কিছু ছাড়া অধিকাংশ সুন্নীদের অবস্থান আহলুস সুন্নাহর নীতি-আদর্শ এবং দীনের বিধি-বিধান থেকে বহু দূরে। মুসলিমরা এখন নিজেদের স্বকীয়তা বিকিয়ে দিয়ে সমাজবাদ, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের তীরে তরি ভেড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে মূসা আস-সদর খ্রিষ্টান ম্যারোনাইটদের গা ঘেঁষলেন। এতে অবশ্য আশ্চর্যের কিছু ছিল না। কেননা শিয়া মতবাদের জন্মই হয়েছিল সুন্নী মতাদর্শের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য, ইসলামী খেলাফতের সোনালি অতীত প্রত্যাখ্যান করার জন্য, ইসলামী বিশ্বের সকল সুন্নী শাসকদের বিরুদ্ধাচরণ করার জন্য। এ কারণে তাদের মৌলিক চিন্তাধারাই আহলুস সুন্নাহর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

মূসা আস-সদর লেবাননের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ম্যারোনাইট খ্রিষ্টান চার্লস হিলোর দারস্থ হন। মুসলিম দাবিদার হয়েও তিনি খ্রিষ্টানদের কাছে যান; অথচ মুসলিম উম্মাহর শক্তি বৃদ্ধির জন্য সুন্নী নেতাদের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ তিনি করেননি। সুন্নীদের বিপক্ষে চার্লস হিলোর জন্য মূসা আস-সদর উপযুক্ত মিত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।

চার্লস হিলো মূসা আস-সদরকে কাছে টেনে নেন, উৎসাহিত করেন। এবং ১৯৬৭ সালে তিনি লেবাননী শিয়াদের কল্যাণে 'ইসলামী শিয়া সর্বোচ্চ পরিষদ' গঠনের অনুমতি প্রদান করেন। শুধু তাই নয়, চার্লস হিলো ৭২/৭৬ ধারায় একটি নতুন আইন প্রণয়নের ব্যাপারে সম্মত হন; যাতে উল্লেখ করা হয় যে শিয়া পরিষদ তাদের নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধান ও ফতোয়ার ব্যাপারে অন্যান্য শিয়া রাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারবে। এ ক্ষেত্রে লেবাননে বিধি-নিষেধ জারির প্রয়োজন পড়বে না।

পর্যায়ক্রমে ১৯৬৯ সালে এই পরিষদ গঠিত হয়। এবং মহাসচিবের দায়িত্ব অর্পিত হয় মূসা আস-সদরের কাঁধে। ১৯৭০ সালে পরিষদটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ করে। সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের শিয়াদের কল্যাণার্থে দশ মিলিয়ন ডলার খরচের সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়। মূসা আস-সদর আমেরিকার কাছেও নিজেকে সঁপে দেন। উদাহরণত, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে উল্লেখ করেন যে, লেবাননের শিয়া যুবসমাজকে নাসিরবাদ থেকে বিমুখ রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

আমেরিকার সাথে তার এই দহরম-মহরমের খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে খোমেনীর কাছের লোকেরা তার ওপর বিভিন্ন অপবাদ আরোপ করে। আসলে খোমেনীর সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ছিল তখন দা-মাছ। কারণ, আমেরিকা তখন ছিল ইরানী শাহের কট্টর সমর্থক।

১৯৭০ সালের ঘটনার জন্য মূসা আস-সদর মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। সে সময় আকস্মিকভাবে জর্ডানে আশ্রিত ফিলিস্তিনী শরণার্থীরা গণহত্যার শিকার হয়। নৃশংস এ ঘটনাটি 'কালো সেপ্টেম্বর' নামে পরিচিত। এরপর 'ফাতাহ'-র উদ্যোগে বেঁচে যাওয়া শরণার্থীদের লেবাননে পাঠানো হয়। তাদেরকে জায়গা দেওয়া হয় ফিলিস্তিন সীমান্ত ঘেঁষে দক্ষিণ লেবাননে। শিয়াদের কাছে এ বিষয়টি মোটেও ভালো লাগেনি। কেননা, ফিলিস্তিনীরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর অনুসারী। আর এজন্য হয়তো দেখা যাবে তাদের কাঙ্ক্ষিত শিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিলম্ব হচ্ছে। জেনে রাখা ভালো, 'ফাতাহ'-ও ছিল ইসলামী শিক্ষা ও দীক্ষা থেকে বিচ্যুত, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের রোগে রোগাক্রান্ত।

এমতাবস্থায়ও মূসা আস-সদর ফাতাহ থেকে ঠিকই উপকৃত হয়েছেন; স্বার্থসিদ্ধির জন্য কৌশলে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছেন। যেন পরবর্তী সময়ে ফাতাহ শিয়াদের সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করে। আর এর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল এমন এক সশস্ত্রবাহিনী গড়ে তোলা, যা লেবানন নিয়ে তার সকল স্বপ্ন পূরণে সহায়ক হয়। অপরদিকে ফাতাহও সে সময় এমন এক মিত্রের সন্ধানে ছিল, যে কি-না কম্যুনিস্ট ও তাদের মাঝে মধ্যস্থতা করবে। সব মিলিয়ে উভয়ের মাঝে স্বার্থের ভিত্তিতে এক দারুণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

১৯৭১ সালে সিরিয়ার ক্ষমতা গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি হাফিজ আল-আসাদ। তিনি ছিলেন আলাওয়ী নুসায়েরী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে এ সম্প্রদায়টিকে মুসলিম বলা হয় ঠিক, কিন্তু তারা মুসলিম নয়। কারণ, হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তারা ইলাহা বা প্রভু জ্ঞান করে। এ সময় মূসা আস-সদর তড়িঘড়ি করে একটি ফতোয়া জারি করেন; যাতে আলাওয়ী সম্প্রদায়কে শিয়া আখ্যায়িত করা হয়। এই সুবাদে প্রেসিডেন্ট হাফিজ আল-আসাদকে মুসলিম মনে করা শুরু হয়। মূসা আস-সদরের এই ফতোয়া তাকে সিরিয়া সরকারের কাছে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন করে তোলে। এরপর তিনি হাফিজ আল-আসাদ ও ইরানী বিপ্লবের নেতৃবৃন্দের মাঝে মধ্যস্থতার দায়িত্ব পালন করেন। এবার হাফিজ আল-আসাদ ইরানী শাহের বিরুদ্ধে চলা বিদ্রোহের পক্ষে অবস্থান নেন। এমনকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে শত্রুতার জের ধরে তিনি ইরানী বিপ্লবের পর ইরাক-ইরান যুদ্ধে ইরানের পক্ষাবলম্বন করেন।

এভাবেই মূসা আস-সদর একটি নতুন শিয়া রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে সক্ষম হন। আর এ কাজে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় (শিয়া) নেতৃবৃন্দ তাকে সাহায্য করেন, সমর্থন জানান। তাদের মাঝে জনাব আয়াতুল্লাহ খোমেনীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার সমর্থনে আরও ছিল লেবাননের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়, সিরীয় ও মার্কিন সরকার; এমনকি সুন্নী নামধারী ফাতাহও।

১৯৭৫ সালে মূসা আস-সদর 'হারকাতুল মাহরূমীন' বা 'সুবিধা- বঞ্চিতদের সংগ্রাম' নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এ সংগঠনের মূল এজেন্ডায় সুবিধাবঞ্চিতদের স্বার্থে কাজ করে যাওয়ার কথা বলা হয়। এ জন্য দক্ষিণাঞ্চলের বহু খ্রিষ্টান তাতে যোগ দেয়। তাদের ধারণা ছিল, সংগঠনটি হয়তো সত্যিই দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন দেখা যায়, শিয়াদের স্বার্থরক্ষাই এর একমাত্র লক্ষ্য, তখন তারা কেটে পড়ে। এরপর এ সংগঠনের কর্মীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিতে মূসা আস-সদর নতজানু লেবানন সরকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ফাতাহের মহাসচিব ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন।

১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে মূসা আস-সদর হরকাতুল মাহরূমীনের অধীনে একটি সামরিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। সংগঠনের নাম দেন 'আফওয়াজুল মুকাওয়ামাহ আল-লুবনানিয়া' বা 'লেবানন প্রতিরক্ষা বাহিনী'। সংক্ষেপে এটি 'হারকাতু আমাল' বা 'আশার আন্দোলন' নামে পরিচিত হতে থাকে। সঙ্গত কারণে মূসা আস-সদর নিজেই ছিলেন এর প্রধান। এসব সংগঠন প্রতিষ্ঠার পর মূসা আস-সদর ফিলিস্তিনী শরণার্থীদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেন; শিয়া অধ্যুষিত দক্ষিণ লেবানন থেকে সুন্নীদেরকে উৎখাত করতে উঠেপড়ে লাগেন। একপর্যায়ে হারকাতু আমাল ফিলিস্তিনীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত যুদ্ধের নামে চলতে থাকা এ নির্যাতন 'শিবিরের যুদ্ধ' নামে প্রসিদ্ধ।

টিকাঃ
১. Jaafari Tribunal - Courts (المحاكم الجعفرية)
২. Charles Helou
৩. Supreme Islamic Shia Council (المجلس الإسلامি শিয়ি الأعلى)
৪. নাসিরবাদ (التيار الناصري): মিশরের জামাল আবদুন নাসিরের চিন্তাধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত সমাজতান্ত্রিক আরব জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শ। -অনুবাদক
৫. Black September (أيلول الأسود)
৬. ফাতাহ বা فتح এর পূর্ণ নাম: حركة التحرير الوطني الفلسطيني বা ফিলিস্তিনি স্বাধীনতা আন্দোলন। এটি ফিলিস্তিনী নেতা ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে ১৯৫৯ সালে গঠিত হয়। -অনুবাদক
৭. আলাওয়ী নুসায়েরী (العلوية النصيرة)
৮. Movement of the Dispossessed (حركة المحرومين)
৯. Lebanese Resistance Regiments (أفواج المقاومة اللبنانية)
১০. Hope Movement (حركة أمل)
১১. War of the Camps (حرب المخيمات)

ফন্ট সাইজ
15px
17px