📄 হিযবুল্লাহর উৎপত্তি
হিযবুল্লাহর উৎপত্তি লেবাননে। জেনে অবাক হবেন, পৃথিবীর বুকে লেবাননের মতো সাম্প্রদায়িক দেশ দ্বিতীয়টি আর নেই। লেবাননে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত ধর্মীয় সম্প্রদায়ই রয়েছে আঠারোটি। সম্ভবত সেখানকার পার্বত্য প্রকৃতির সুবাদে সকল সম্প্রদায় অনায়াসে নিজ নিজ অবস্থানে টিকে থাকতে পারে।
লেবাননে খ্রিষ্টান, শিয়া, দ্রুজসহ আরও অনেক সম্প্রদায়ের বসবাস। তবে সমগ্র লেবানন জাতি তিনটি প্রধান সম্প্রদায়ে বিভক্ত। সেগুলো হচ্ছে, সুন্নী মুসলিম, ইসনা আশারিয়া শিয়া ও ম্যারোনাইট খ্রিষ্টান। চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে দ্রুজরা; মুসলিম হিসেবে গণ্য হলেও তারা মূলত অমুসলিম।
১৯২০ সালে ফরাসীরা লেবাননে উপনিবেশ স্থাপন করে। শুরু থেকে তাদেরকে এই সাম্প্রদায়িকতা সুপ্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বেশ অনুরাগী দেখা যায়। অপরদিকে তারা রাষ্ট্রের বড়ো বড়ো পদগুলো রাখতে চাচ্ছিল তাদের মিত্র ম্যারোনাইট খ্রিষ্টানদের হাতে।
১৯৪৩ সালে লেবানন পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন হয়; সঙ্গে সম্পন্ন হয় তাদের সংবিধান প্রণয়ণের কাজ। নতুন সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের দায়িত্ব অর্পণ করা হয় যথাক্রমে ম্যারোনাইট খ্রিষ্টান, সুন্নী মুসলিম ও শিয়া সম্প্রদায়কে। আইনটি ১৯৪৩ সালে প্রণিত হলেও প্রয়োগ আরম্ভ হয় ১৯৫৭ সাল থেকে। এর আগে রাষ্ট্রীয় সকল পদে ম্যারোনাইটরাই ছিল সর্বেসর্বা।
এমন সংবেদনশীল সাম্প্রদায়িকতার কারণেই সম্ভবত লেবাননীরা একটি নির্মোহ আদমশুমারি থেকে সব সময় পিছিয়ে থেকেছে; জনসংখ্যার সঠিক হিসেব বের করতে কখনো আগ্রহী হয়নি। তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী লেবাননের মোট জনসংখ্যার শতকরা ২৬ জন সুন্নী, ২৬ জন শিয়া এবং ২২ জন ম্যারোনাইট। এরপর রয়েছে দ্রুজদের অবস্থান; তারা সংখ্যায় শতকরা ৫ জন বা ৬ জন।
এমতাবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যেক সম্প্রদায় পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট এলাকায় কেন্দ্রীভূত হয়ে শক্তি সঞ্চয়ে সচেষ্ট। উপরন্তু শিয়াদের অবস্থান দক্ষিণ লেবানন ও বিকা উপত্যকায়; সুন্নীদের বসবাস উত্তরাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল এবং উপকূলীয় শহর তথা, বৈরুত, ত্রিপলি ও সাইদাতে; আর ম্যারোনাইট খ্রিষ্টানদের আধিপত্য জাবালু লুবনান বা মাউন্ট লেবানন ও পূর্ব বৈরুতে।
গত কয়েক দশক ধরে ইহুদীদের সঙ্গে শিয়াদের সংঘাত। কিন্তু কেন? সম্ভবত দক্ষিণাঞ্চলে তাদের বসবাসের বিষয়টি বিবেচনায় নিলেই এই প্রশ্নের জবাব স্পষ্ট হয়ে যাবে। আল্লাহ চাইলে খুব সহজেই আমরা বুঝতে পারব, এটি মোটেও বিশ্বাসগত সংঘর্ষ ছিল না; এতে ছিল না আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার ন্যূনতম উদ্দেশ্য; কিংবা ফিলিস্তিনীদের স্বাধীন করার লক্ষ্য। বরং উদ্দেশ্য ছিল কেবল নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন শহরগুলোকে রক্ষা করা। তাই নিরুপায় হয়েই তাদেরকে প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তা না হলে, ঘটনা একদম 'ইউটার্ন' নিয়ে ফেলত। আর এ বিষয়ে আমারা নিশ্চিত যে, ইহুদীরা হামলাটা সুন্নীদের ওপর করলে শিয়ারা নিজেদের জায়গা থেকে এক চুলও নড়ত না।
📄 মূসা আস-সদর
এবার আমরা ঘটনার মূলে চলে যাচ্ছি... লেবাননে ফ্রান্স ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থনপুষ্ট ম্যারোনাইট খ্রিষ্টানদের তুলনায় শিয়া ও সুন্নীরা একরকম প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবেই বসবাস করে আসছিল। কিন্তু হঠাৎ করে এ উভয় সম্প্রদায়ের মাঝে আত্মপরিচয় ও আত্মোন্নতি-বিধানের ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি হয়। বিশেষত পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে এ ব্যাপারে তাদের উদ্দীপনা ছিল চোখে পড়ার মতো।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সে সময় সুন্নীদের হাল ধরার মতো কেউ ছিল না। বিশেষত সমগ্র আরববিশ্ব যখন সমাজতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছিল, এরা ছিল তখন নেতৃত্বহারা। ঠিক একই সময়ে শিয়াদের অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। ভাগ্যক্রমে তারা তখন এমন একজনকে পেয়ে যায়, যিনি তাদের উন্নতি ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি লেবাননে এসে একজন প্রভাবশালী শিয়া হিসেবে লেবানন-মানচিত্রে আপন স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হন। তিনি হলেন মূসা আস-সদর। সময়টি ছিল ১৯৫৯ সালের দিকে।
মূসা আস-সদর ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের কুম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। সেখানে তিনি 'ইসনা আশারিয়া মতাদর্শ' বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে কুম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিকহ ও তর্কশাস্ত্রে অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আরও পড়াশোনার উদ্দেশে ইরাকের নাজাফ শহরে গমন করেন। সেখানে বিশিষ্ট শিয়া পণ্ডিত মুহসিন আল-হাকিম ও আবুল কাসিম আল খুইর কাছে উচ্চতর পাঠ সমাপ্ত করেন। এরপর ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে চলে যান লেবাননে। এবং সেখানেই বাকি জীবন অতিবাহিত করেন।
📄 লেবানন গমনকালে মূসার সঙ্গী
লেবানন গমনের সময় দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মূসা আস-সদরের সফরসঙ্গী ছিল। প্রথমটি হলো বিশেষ ধর্মীয় প্রকল্প অর্থাৎ, ইসনা আশারিয়া মতাদর্শের বিকৃত চেতনা, ভ্রান্ত বিশ্বাস ও নিকৃষ্ট বিদআত ছড়িয়ে লেবাননকে একটি পূর্ণাঙ্গ শিয়া রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করা। 'শিয়াদের গোড়ার কথা' প্রবন্ধে আমরা তাদের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ, আকীদা ও চিন্তাধারা নিয়ে আলোচনা করে এসেছি। আসলে, লেবাননী শিয়ারা তখন পর্যন্ত সেই অর্থে ধার্মিক ছিল না। ধর্মকর্ম খুব একটা বুঝতও না। যাকে বলে নামমাত্র শিয়া। তারা এ মতাদর্শের প্রকৃতি ও পদ্ধতি সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণাই রাখত না।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো অঢেল সম্পদ, যা তার প্রথম প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ মসৃণ করার ক্ষেত্রে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর জানা কথা, নেতৃস্থানীয় শিয়ারা বিপুল পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হয়ে থাকেন। কেননা সাধারণ শিয়ারা তাদের আয়ের বিশ-শতাংশ আহলে বাইতের সদস্য ভেবে তাদের হাতে অর্পণ করে। প্রদত্ত এ সম্পদ নেতারা যাচ্ছেতাই করতে পারেন। বস্তুত, এই অর্থ ব্যবহার করেই তারা যাবতীয় কলকাঠি নাড়েন, গড়েন দৈত্যাকার অর্থনৈতিক ক্ষমতা।
📄 সুন্নী শাসনের বিরুদ্ধে শিয়াদের বিদ্রোহ
সমসাময়িক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহাত্মক চেতনা থেকেই মূলত শিয়া মতবাদের উৎপত্তি। শুরু থেকেই শিয়াদের মৌলিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল প্রভাব-প্রতিপত্তির বিস্তার এবং শাসনক্ষমতার সুপ্রতিষ্ঠা। এতে সুন্নীদের সঙ্গে তাদের যতই সংঘাত হোক না কেন। ইতিহাসের নানান বাঁকে ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের এ স্বপ্ন পূরণও হয়েছে। তখন অধীনস্থরা দেখেছে এ সম্প্রদায়ের ধ্বংসাত্মক লীলাখেলা কতটা জঘন্য হতে পারে। যদিও খ্রিষ্টীয় আঠারো শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সাফাভিদ শাসনের পতনের মধ্য দিয়ে দুনিয়া থেকে তাদের স্বৈরশাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে; দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকে তাদের সকল প্রকল্প ও পরিকল্পনা।
কিন্তু পঞ্চাশের দশকে তাদের সেই আগ্রাসি মনোভাব আবার জাগ্রত হয়। আবার তারা একটি আলাদা সাম্রাজ্যে তাদের ভ্রান্ত ও বিকৃত মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সচেষ্ট হয়। বরাবরের মতো এবারও তাদেরকে বেশ বেপরোয়া দেখা যায়। প্রয়োজনে তারা সামরিক শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্তও নেয়। কাঙ্ক্ষিত সাম্রাজ্যের জন্য তিনটি রাষ্ট্রের নাম প্রস্তাবনায় উঠে আসে। সেগুলো হলো ইরান, ইরাক ও লেবানন। এ দেশগুলোতে শিয়াদের বসবাস আগে থেকেই ছিল চোখে পড়ার মতো। যা ছিল তাদের জন্য অন্যতম ইতিবাচক দিক।
শিয়া লবি এই তিনটির কোনোটি কিংবা সবকটিতেই শিয়া শাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা শুরু করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্বাচিত কিছু লোককে উল্লিখিত দেশসমূহে প্রেরণ করা হয়। এদিকে ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে শাসনব্যবস্থার কেন্দ্র ইরানে কিছু লোক কাজ শুরু করে; ওদিকে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ইরাকে একই উদ্দেশ্যে আরও কিছু লোক কাজে লেগে যায়; আর লেবাননে পাঠানো হয় মূসা আস-সদরকে।
এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা ছিল বেশ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে কয়েক দশক পরে হলেও যে তা সফলতার মুখ দেখবে, তা ছিল অনেকটা নিশ্চিত। সময় যতই লাগুক, গুরুত্বপূর্ণ তো হলো সফলতা। তা ছাড়া শিয়াদের পূর্ববর্তী সাম্রাজ্য তথা, বুওয়াইহিয়া, উবাইদিয়া বা কথিত ফাতিমীসহ অন্যান্য সাম্রাজ্যগুলো তো এভাবেই গড়ে উঠেছিল।
এসব সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাকালে সাধারণত নিপীড়িত ও অত্যাচারিত জনগোষ্ঠীকে ব্যবহার করা হয়েছে। শিয়া নেতারা প্রথমে ধনী ও সম্পদশালীদের বিরুদ্ধে নিঃস্ব ও দরিদ্রদের মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বেলে দিয়েছে। এরপর সেই আগুনে ঘি ঢেলে উভয় শ্রেণিকে নিয়ে গেছে সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে। অবশেষে শিয়াজনতার আবেগানুভূতি কাজে লাগিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে প্রতিটি শিয়া রাষ্ট্র।
ইতিহাসের পাতায় বারবার পাঠ করে আসা ঘটনা আমরা ইরানের ভূমিতে ঘটতেই দেখলাম। সে বিষয়ে আল্লাহ চাইলে সময়মতো সবিস্তার আলোচনা করব। এখন লক্ষ করার বিষয় হলো, ইদানীং ইরাক ও লেবাননে অতীতের সেই পদক্ষেপগুলোই নিতে দেখা যাচ্ছে স্পষ্টভাবে। সন্দেহ নেই, এ দুটি দেশে তাদের পরিকল্পনা সফল হলে পরবর্তী টার্গেট হবে সিরিয়া, কুয়েত, বাহরাইন ও সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল। চারপাশে কী ঘটছে এবং ঘটতে যাচ্ছে তা মুসলিম উম্মাহর সামনে তুলে ধরতেই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।