📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 সাহাবীদের প্রতি অপবাদ ও অভিযোগ

📄 সাহাবীদের প্রতি অপবাদ ও অভিযোগ


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল সাহাবী তথা, হযরত আবু বকর সিদ্দীক, উমর ফারুক, উসমান যিন-নূরাইন, উম্মাহাতুল মুমিনীন, বিশেষত হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে নিয়ে সাহাবীদের এ পুরো প্রজন্মের প্রতি শিয়াদের অবস্থান কী, তা কারো অজানা নয়। তাদের প্রামাণ্যগ্রন্থ, তথ্যসূত্র ও আকীদা-বিশ্বাস ঘাটলে দেখা যায়, এই মহান প্রজন্মের সকলকে ঢালাওভাবে তারা হয়তো ফাসেক সাব্যস্ত করেছে, আর নয়তো মুরতাদ বলেছে। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী ইসলামের বিধান গোপন ও বিকৃত করার অপরাধে তাঁরা সকলেই গোমরাহ!

পাঠক! এবার আপনাকে প্রশ্ন করতে চাই, এরপরও কি আপনার কাছে উদারপন্থিদের কথা অনুযায়ী ফিতনার ভয়ে চুপ থাকাই শ্রেয় মনে হয়? বলুন তো, সাহাবীদের মতো শ্রেষ্ঠ প্রজন্মের প্রতি এমন জঘন্য ও মিথ্যা অপবাদ আরোপ করার চেয়ে ভয়ংকর ফিতনা আর কী হতে পারে? চলুন, মাঝে আমরা একজন গুরুত্বপূর্ণ সাহাবীর বক্তব্য শুনে আসি-এসব বিষয়ে তিনি কী বলেন। হযরত জাবির ইবনু আবদুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

إِذَا لَعَنَ آخِرُ هَذِهِ الْأُمَّةِ أَوَّلَهَا، فَمَنْ كَانَ عِنْدَهُ عِلْمٌ فَلْيُظْهِرُهُ، فَإِنَّ كَاتِمَ الْعِلْمِ يَوْمَئِذٍ كَكَاتِهِ مَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ

'এই উম্মতের পশ্চাৎবর্তীরা যখন অগ্রবর্তীদের অভিশাপ করবে, তখন যার যা জানা থাকবে, তা যেন সে প্রকাশ করে দেয়। কেননা তখন তা গোপন রাখা, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অবতীর্ণ ওহী গোপন রাখার নামান্তর।'

সাহাবীদের প্রতি অপবাদ আরোপের বিষয়টি বিগত অন্য কোনো প্রজন্মের প্রতি অপবাদ আরোপের মতো নয়। বিষয়টি এমনও নয়, যেমনটি কেউ কেউ বলে থাকে, 'তাঁরা তো এসব সমালোচনা উপেক্ষা করে জান্নাতের মেহমান হয়ে আছেন, এতে তাঁদের কী এসে যায়।' কিন্তু চিন্তা করলে দেখতে পাবেন, তাদের অপবাদে কেবল সাহাবীরাই আক্রান্ত হচ্ছেন না; বরং এতে খোদ দীন-ইসলাম নিয়েই সমালোচনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আমরা তো সাহাবীদের মাধ্যমেই দীন পেয়েছি। তো, যাদের মাধ্যমে আমরা দীন পেলাম, যদি তাঁদেরকেই সন্দেহের চোখে দেখা হয়, তাঁদের আমল-আখলাক নিয়ে আপত্তি তোলা যায়, তাহলে আমরা কেমন দীনের অনুসরণ করছি? সহজ কথায় শিয়াদের ওইসব আপত্তি মেনে নেওয়ার অর্থ দাঁড়ায় দ্বীন-ইসলামের বিকৃতি স্বীকার করে নেওয়া, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ-নিষেধ তথা হাদীসসমূহ সংরক্ষিত না থাকার স্বীকারোক্তি দেওয়া।

আমরা বরং শিয়াদেরকে প্রশ্ন করতে চাই, 'আপনারা কোন কুরআন পাঠ করেন? এই কুরআনই কি সাহাবীরা তাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেননি? অথচ এখন তাদের ওপরই আপত্তি!? এটাই কি সেই কুরআন নয়, যা প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পৃষ্ঠপোষকতায় সংকলিত করা হয়েছিল? অথচ আপনারা তাঁর খেলাফত নিয়েও বাজে কথা বলেন! আচ্ছা, আপনাদের দাবি অনুযায়ী হাদীস বিকৃত হয়ে থাকলে কুরআন সংরক্ষিত থাকে কীভাবে?! নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

عليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين من بعدي

'তোমরা অবশ্যই যেন আমার সুন্নাহ আঁকড়ে ধরে রাখো এবং আমার পর আমার সুপথপ্রাপ্ত খলীফাদের সুন্নাহও আঁকড়ে ধরে রাখো।'

এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয়, চার খলীফার সুন্নাহ ইসলামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে, যা থেকে দীনের বিচ্ছিন্নতা কল্পনাই করা যায় না। শুধু তাই নয়, হযরত আবু বকর থেকে শুরু করে হযরত উমর, উসমান ও আলী পর্যন্ত খলীফাগণ যে সকল রীতিনীতি ও বিধি-বিধানের ওপর খেলাফত পরিচালনা করেছেন কিয়ামত পর্যন্ত সকল যুগের, সকল স্থানের, সকল মুসলমানের জন্য তা অনুসরণীয়, দলীলযোগ্য। তাহলে কোনোভাবেই কি তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো রকম বিষোদগার মেনে নেওয়া যেতে পারে? এজন্য আমাদের মহান পূর্বসূরি আলেমদের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, সাহাবীদের বিরুদ্ধে একটি শব্দও তারা বরদাশত করতেন না; কঠোর প্রতিবাদ করতেন। যেমন:

এক. ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যদি কাউকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে দেখো, তবে তার ইসলাম নিয়ে সন্দিহান থেকো।'
দুই. কাজি আবু ইয়ালা রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'ফকিহগণের সর্বসম্মত মত এই যে, হালাল মনে করে সাহাবীদের গালি দেওয়া কুফুরি এবং হারাম মনে করে গালি দেওয়া ফাসেকি।'
তিন. আবু যুরআ রাযি. রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'সাহাবীদের যে গালমন্দ করে, সে যিন্দীক।'
চার. শায়খুল ইসলাম আল্লামা ইবনু তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'কেউ যদি এই বিশ্বাস রাখে যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর সাহাবীরা মুরতাদ হয়ে গিয়েছেন—হ্যাঁ গুটিকয়েক বাদে, যাদের সংখ্যা বিশের বেশি হবে না—অথবা কেউ এই দাবি করে যে তাঁদের সকলে ফাসেক, তাহলে ওই লোকের কুফুরির ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহই থাকে না।'

কথাগুলো যদিও বেশ কঠিন, কিন্তু সাহাবী-বিদ্বেষী সকলের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য হবে। কারণ, যে সাহাবীদের মাধ্যমেই আমরা দীন পেয়েছি, তাঁরা সমালোচিত হলে তো গোটা দীনই প্রশ্নবিদ্ধ। তা ছাড়া তাঁদের শানে কুরআন ও হাদীসে অসংখ্য সুসংবাদ এসেছে, তাই তাঁদের শানে এসব অভিযোগ মেনে নিলে তো স্বয়ং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকেই মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে হবে। (নাউজুবিল্লাহ)

যারা বলেন চান আমরা তো কোনো শিয়াকে প্রকাশ্যে সাহাবীদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে দেখি না; তিনটি বিষয়ের দিকে আমি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।

এক. ইসনা আশারিয়া শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস এই যে, 'সাহাবীরা সকলে মিলে হযরত আলী, আহলে বাইত ও তাদের ইমামদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলেন।' এজন্য ইরান, ইরাক ও লেবাননে এই মতবাদের অনুসারী এমন কাউকে পাওয়া যাবে না, যে সাহাবীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে না। বলতে গেলে, সাহাবী-বিদ্বেষ ব্যতিরেকে এ মতবাদের অস্তিত্বই কল্পনা করা যায় না। আর সর্বসম্মত কথা হলো, ইসনা আশারিয়া শিয়াদের কেউই সাহাবীদের প্রতি কোনো রকম সম্মান-মর্যাদা প্রদর্শন করে না।

দুই. শিয়া নেতারা সব সময়ই এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলেন, যেখানে সাহাবীদের প্রতি তাদের মনে চেপে রাখা বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়ে যায়। যদিও মাঝে মাঝে মুখের কথায় মনের ভাব ফুটে ওঠে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَلَتَعْرِ فَنَّهُمْ فِي لَحْنِ الْقَوْلِ * 'আর আপনি কথার ধরনেই তাদেরকে চিনে ফেলবেন।' আল-জাজিরা চ্যানেলে প্রচারিত ড. ইউসুফ কারযাবী ও আকবর হাশিমী রাফসানজানীর 'টক-শো' তো আমরা সকলে দেখেছি। আল্লামা কারযাবী সেখানে সাহাবী ও উম্মাহাতুল মুমিনীনের সম্পর্কে তার মুখ থেকে একটু 'ভালো কথা' বের করতে কী চেষ্টাই না করলেন; কিন্তু তিনি কেবল এড়িয়েই গেলেন। এ ছাড়া একবার যখন ইরানী বিপ্লবের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা খামেনীর কাছে সাহাবীদের গালমন্দ করার হুকুম জানতে চাওয়া হয়েছিল, তখন তিনি অস্পষ্ট জবাব দিয়েছেন; বলেছেন, মুসলিম উম্মাহর মাঝে ঐক্য বিনষ্টকারী সকল কথাই তো শরীয়তে হারাম। তো, জনাব খামেনীর কাছে সাহাবীদের গালমন্দ করা মৌলিকভাবে হারাম নয়; মুসলিম উম্মাহর মাঝে ঐক্য বিনষ্টকারী হিসেবে হারাম।

তিন. শিয়ারা তাদের অন্যতম আকীদা 'তাকিয়া'-র ব্যাপারে সর্বদা সতর্ক থাকে। তাকিয়া তাদের কাছে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, এটা তাদের কাছে ধর্মের নয়-দশমাংশ। তাকিয়ার অর্থ হলো, নিজেদের আকীদা-বহির্ভূত কোনোকিছু সামনে এলে অবশ্যই তা ঘৃণা করা এবং প্রকাশে সক্ষম হলে তা প্রকাশও করা, তবে অক্ষম হলে মনেই চেপে রাখা। শিয়াদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস আমরা আলোচনা করেছি; সেখানে দেখেছি, ইরাকে বিদ্যমান উসমানী খেলাফত থেকে শুরু করে মিশর, মরোক্ক ও অন্যান্য সুন্নী অধ্যুষিত অঞ্চলে ক্ষমতা বিস্তারকালে সাহাবীদের বিরুদ্ধে কীভাবে তারা প্রকাশ্যে বিষোদগার করেছে।

টিকাঃ
১. আল-মুজামুল আওসাত: হাদীস নং ৪৩০; সুনানু ইবনু মাজাহ হাদীস নং ২৬৩
১. সুনানে তিরমিযী: হাদীস নং ২৬৭৬
১. ইবনু তাইমিয়া রহ. কৃত আস-সারিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসূল, পৃষ্ঠা: ৫৬৮
২. আস-সারিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসূল, পৃষ্ঠা: ৫৬৯
৩. খতীব বাগদাদী কৃত আল-কিফায়াহ ফি ইলমিল রিওয়ায়াহ, পৃষ্ঠা: ৪৯
১. ইবনু তাইমিয়া রহ. কৃত আস-সারিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসূল, পৃষ্ঠা: ৫৮৬

📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 শিয়া মতবাদ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

📄 শিয়া মতবাদ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা


সন্দেহ নেই, ইসলামী বিশ্বে ঝড়ের বেগে শিয়া মতবাদ ছড়িয়ে পড়ছে। ইতিহাস ও ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে এ মতবাদ আর এখন ইরাক, ইরান ও লেবাননেই সীমাবদ্ধ নেই; যথেষ্ট উদ্যম নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিরিয়া, জর্ডান, সৌদি আরব, মিশর, আফগানিস্তান, পাকিস্তানের মতো মুসলিম দেশগুলোতেও। এর চেয়েও আশঙ্কার কথা এই যে, ইদানীং অনেক মুসলিমই শিয়াদের আকীদা-বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণায় প্রভাবিত হয়ে যাচ্ছে; কিন্তু সে মনে করছে, আমি তো শিয়া নই।

এই প্রবন্ধগুলো প্রকাশের পর এমন অসংখ্য চিঠিপত্র আমাদের হস্তগত হয়েছে, সেগুলোর প্রেরকরা নিজেদেরকে আহলুস সুন্নাহর অনুসারী দাবি করলেও নিঃসেন্দেহে তারা শিয়া চিন্তাধারায় মারাত্মকভাবে প্রভাবিত। তা ছাড়া, সুন্নী দেশগুলোতে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলে যেভাবে সাহাবীদের ওপর নগ্ন হামলা ও নোংরা আক্রমণ করা হয়, তাই-বা আমরা ভুলে যাই কী করে!

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এসব জঘন্য ঘটনাগুলোর মাঝে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ সম্ভবত এক মিশরীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার বিরুদ্ধে অপবাদ; আর অপরটি ভিন্ন আরেক পত্রিকায় ইমাম বুখারী রহিমাহুল্লাহর বিরুদ্ধে বিষোদগার। ওদিকে এক টেলিভিশন চ্যানেলের জনৈক প্রসিদ্ধ উপস্থাপককে দেখা যায়, প্রতিটি অনুষ্ঠানেই সে সাহাবীদের দোষচর্চায় লিপ্ত হয়।

এরচেয়ে আরও কঠিন বিষয়—যাতে চুপ থাকার কোনো সুযোগই নেই—তা হলো, আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসার সুবাদে শিয়াবাদ-সুফিবাদ মিলে মিলে একাকার হয়ে যাওয়া। আমরা জানি, ইসলামী বিশ্বের অনেক দেশেই সুফিবাদের চর্চা রয়েছে, যদিও এসবে রয়েছে বিদআত ও কুসংস্কারের ছড়াছড়ি। আশঙ্কার কথা হলো, শিয়াবাদ ও সুফিদের মাঝে বেশকিছু বিষয়ে গভীর মিল রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, আহলে বাইতের কবরে গিয়ে সম্মান প্রদর্শন করার বিষয়টি। এ থেকে বোঝা যায়, সুফিবাদের মোড়কে ইসলামী বিশ্বে খুব সহজে শিয়াবাদ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

টিকাঃ
১. ১০ই মুহাররম এলে বোঝা যায়, বাংলাদেশেও শিয়াদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। - অনুবাদক

📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 ইরাকের বিরাজমান ভয়ংকর পরিস্থিতি

📄 ইরাকের বিরাজমান ভয়ংকর পরিস্থিতি


ইরাকে তারা একাধিকবার সুন্নী মুসলিমদের ওপর হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এসব যেন শখের বশে কিংবা ভালো লাগে বলেই তারা করে। 'জাবহাতু উলামায়িল মুসলিমিন আস-সুন্নাহ'-র মহাসচিব হারেস আদ-দারির দেওয়া তথ্যমতে শুধু ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত শিয়াদের হাতে এক লাখেরও বেশি সুন্নী মুসলমান প্রাণ হারিয়েছে। শিয়া-শাসনের পথ মসৃণ করতে বিভিন্ন স্থানে তারা লাগাতার উচ্ছেদ অভিযানও চালিয়েছে। উপরন্তু এসব অভিযানে ইরাকের বাইরেও বিতাড়িতদের অধিকাংশই সুন্নী মুসলমান। নিঃসন্দেহে এ কারণে জনসংখ্যার গঠনে বিরূপ পরিবর্তন সৃষ্টি করবে; যার পরিণতি হবে খুবই ভয়াবহ।

আচ্ছা, এই সুন্নীদের ওপর এমন হত্যাকাণ্ড চালানোর চেয়ে শিয়াদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ কি তুলনামূলক বড়ো ফিতনা? যদি তা না হয়, তাহলে কতদিন আর আমরা এভাবে চুপ থাকব? এসব হত্যাকাণ্ডে যে ইরানের পূর্ণ সমর্থন আছে তা কি কারও অজানা?

📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 ইরাক নিয়ে ইরানের প্রত্যাশা যথেষ্ট পরিষ্কার

📄 ইরাক নিয়ে ইরানের প্রত্যাশা যথেষ্ট পরিষ্কার


ইতঃপূর্বে ইরান ও ইরাকের মাঝে দীর্ঘ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, যা চলমান থেকেছে লাগাতার আট-আটটি বছর। এখন তো একের জন্য অপরের দরোজা খোলা। বিশেষত শিয়াদের তীর্থস্থান হিসেবে ইরাক ধর্মীয়ভাবে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ইরাকে রয়েছে শিয়াদের ছয়জন ইমামের সমাধি। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর সমাধি নাজাফে: হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুর সমাধি কারবালায়: মুসা আল-কাজিম ও মুহাম্মদ আল-জাওয়াদের কবর বাগদাদে: মুহাম্মদ আল-হাদী ও হুসাইন আল-আসকারীর কবর রয়েছে সামাররায়। এ ছাড়া নিতান্তই ধারণাপ্রসূত বলা হয় যে, ইরাকে হযরত আদম, নূহ, হুদ, সালেহ আলাইহিমুস সালামের মতো অসংখ্য নবী-রাসূলের সমাধি রয়েছে। কিন্তু এ তথ্যটি মোটেও সত্য নয়।

ইরাক নিয়ে শিয়াদের যে প্রত্যাশা তাতে ঝুঁকিপূর্ণ আরেকটি দিক হলো, স্বয়ং আমেরিকা তাদের স্বপ্ন পূরণে সমর্থন দিচ্ছে, সাহায্য করছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমেরিকা বরাবরই শিয়াদের পাশে আছে। আর ইরান-আমেরিকা যে হুমকি-ধমকির বিনিময় দেখা যায়, তা কেবলই সাজানো নাটক। কেননা, ইরানে হামলার ব্যাপারে আমেরিকার আদৌ কোনো পরিকল্পনা নেই।

মারাত্মক উদ্বেগের বিষয় হলো, তাদের লোভ কেবল ইরাকের পেট্রোল ও অন্যান্য সম্পদের প্রতিই নয়; এমনকি, শিয়াদের সাম্রাজ্যের বিস্তারও এখানে উপলক্ষ্যই মাত্র; বস্তুত, এসব জুলুম অত্যাচার তাদের ধর্মীয় এজেন্ডার অন্তর্ভুক্ত, যা হয়তো আমরা আঁচও করতে পারিনি। তো, শিয়াদের বিশ্বাস অনুযায়ী যে সকল সাহাবী ও তাঁদের অনুসারী আহলে বাইতের প্রতি শত্রুতা পোষণ করত বা করে, তারাই সুন্নী। শিয়ারা তাঁদের নাম দিয়েছে 'নাসিব' বা 'নাওয়াসিব'। অথচ বাস্তবতা হলো, তাঁরা আহলে বাইতের প্রতি তাদের চেয়ে অনেক বেশি ভক্তি-ভালোবাসা লালন করেন। কিন্তু ওই মিথ্যার ওপর ভিত্তি করেই তারা সুন্নী-দমন নীতি প্রণয়ন করেছে; বৈধ করে নিয়েছে তাদের জান-মাল, ইজ্জত-আবরু।

যেমন দেখুন, শিয়াদের বর্তমান সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা জনাব খোমেনী বলেন, 'শক্তিশালী মত হলো, গনিমতের বৈধতা ও খুমুস আবশ্যক হওয়ার দিক থেকে নাসিবরা আহলে হারবের মতোই। বরং আরও নির্ভরযোগ্য মত হলো, তাদের ধন-সম্পদ যেখানে যেভাবে পাওয়া যাবে সেখানে সেভাবেই লুটে নেওয়ার বৈধতা রয়েছে এবং তা থেকে যথারীতি খুমুসও আদায় করতে হবে।'

শিয়াদের আরেক নেতা মুহাম্মদ সাদিক রুহানীকে ইমাম দ্বাদশের ইমামত অস্বীকারকারী ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাস করা হলে এক অদ্ভুত জবাব দেন। তিনি বলেন, 'নিশ্চই ইমামত নবুওয়তের চেয়েও শ্রেষ্ঠতর। আমিরুল মুমিনীনকে ইমাম নিযুক্ত করার মাধ্যমে দীন-ইসলাম পূর্ণতা পেয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ "আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম।" সুতরাং, যে ব্যক্তি ইমাম দ্বাদশের ইমামতের প্রতি বিশ্বাস রাখবে না সে কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে।'

জনাব খোমেনী তার আল-হুকুমাতুল ইসলামিয়া গ্রন্থে আলোচনা করেছেন, তাদের ইমামরা মর্যাদার যে স্তরে উন্নীত হয়েছেন, কোনো ফেরেশতা কিংবা নবী-রাসূলও সে স্তরে পৌঁছতে পারেননি। তাই ইমামদের অস্বীকার করা স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অস্বীকার করার চেয়েও গুরুতর অপরাধ। এ বিশ্বাস থেকেই সুন্নীরা তাদের চোখে কাফের সাব্যস্ত হয়। ফলে ইরাকী সুন্নীদের রক্ত তাদের কাছে হালাল হয়ে যায়; আবশ্যক হয়ে যায় ইরাকের ভূখণ্ড নিজেদের অধীনে নিয়ে আসা। কেননা ইরাকে রয়েছে অসংখ্য পবিত্র স্থান, যা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী কাফেরদের কবলে।

টিকাঃ
১. ঘুমুস: এক-পঞ্চমাংশ। যুদ্ধসংক্রান্ত বিশেষ পরিভাষা। সূরা আল-আনফাল এর ৪১ নং আয়াত দ্রষ্টব্য। -অনুবাদক
২. আহলে হারব: এমন অমুসলিম সম্প্রদায়, যাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা বৈধ। -অনুবাদক
৩. ইমাম খোমেনী কৃত তাহরীরুল ওসিলাহ; ১/৩৫২
৪. সূরা আল-মায়েদা; আয়াত: ৩
৫. জনাব রুহানীর ফতোয়াটি www.imamrohani.com সাইটে পাওয়া যাবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px