📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 প্রবন্ধ : শিয়াদের প্রভাব-প্রতিপত্তির বিস্তার

📄 প্রবন্ধ : শিয়াদের প্রভাব-প্রতিপত্তির বিস্তার


'শিয়াদের গোড়ার কথা' প্রবন্ধটি অধ্যয়নে পাঠক বেশ অবাক হয়েছেন; তাদের মন্তব্য থেকে সে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই, ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে কেবল ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা বলে যাওয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়; বরং ইতিহাস থেকে উপদেশ গ্রহণের নিমিত্তে এর শিক্ষণীয় দিকগুলোও আমরা তুলে ধরতে চাই; যাতে করে আমাদের পক্ষে সমসাময়িক সমস্যার সমাধানে সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়।

এ কারণে মুসলিম উম্মাহর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস থেকে বর্তমান প্রজন্মের বিমুখতা অপরাধ বলেই গণ্য করা যায়। কেননা, ইতিহাস অধ্যয়ন থেকে বিরত থেকে আমরা নিজেদের কেবল বঞ্চিতই করছি। অথচ পূর্ববর্তী উম্মতের ঘটনাবলি জানার ব্যাপারে আমরা আদিষ্ট হয়েছি, যেন তা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা আমরা আমাদের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারি। কুরআন কারীমে এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, فَاقْصُصِ الْقَصَصَ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ '(হে নবী) আপনি (তাদের কাছে পূর্ববর্তীদের) ঘটনাসমূহ বর্ণনা করুন; হয়তো তারা চিন্তাভাবনা করে দেখবে।'

সুতরাং, ইতিহাসের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকা ঘটনাগুলো কেবল আলোচনার মাঝেই নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না; বরং তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করতে হবে; খুঁজে বের করতে হবে জ্ঞানের এমন উপাদান, যা বর্তমানের জন্য হবে উপকারী, ভবিষ্যতের জন্য হবে সঠিক পথের দিশারি।

প্রিয় পাঠক, শিয়াদের নিয়ে আমার এবারের আলোচনার প্রারম্ভে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে রাখতে চাই :
এক. এই আলোচনাটি যথাযথভাবে বুঝতে হলে 'শিয়াদের গোড়ার কথা' শীর্ষক প্রবন্ধটি অবশ্যই আপনার পাঠে থাকতে হবে। কারণ, সেখানে শিয়াদের উৎপত্তির ইতিহাসের পাশাপাশি আকীদাগত দিকও কিছুটা আলোচিত হয়েছে, যার ওপর নির্ভর করছে আগত ঘটনাপ্রবাহ বোঝার বিষয়টি।
দুই. এখানে আমরা কেবল বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত ঘটনাগুলোই যথাযথভাবে উল্লেখ করতে চেষ্টা করব। শিয়াদের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান এবং তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ধরন নিয়ে চূড়ান্ত কিছু বলব না।

ফিরে আসি শিয়াদের গল্পে... শিয়াদের এগারোতম ইমাম হযরত হাসান আল-আসকারীর ইন্তেকালে পর তারা মারাত্মক সংকটের সম্মুখীন হয়। ইতিহাসের পাতায় এ সময়টি 'হায়রাতুশ শিয়া' বা 'শিয়াদের কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা' শিরোনামে উল্লেখিত হয়েছে। এ সময়ে তারা অনেক দল ও উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং নিজেদের পছন্দমতো ধর্মীয় মতাদর্শ ঠিক করে নেয়। তবে সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক উৎকর্ষতা লাভের বিষয়টি সবার কাছেই ছিল সর্বাগ্রে।

শিয়াদের দলগুলোর মাঝে 'ইসনা আশারিয়া' বা 'বারো ইমাম পন্থি' দলটি ছিল সবচেয়ে প্রসিদ্ধ। বিগত প্রবন্ধে তাদের আলোচনা কিছুটা করা হয়েছে। তবে মাঠে তারা একাই সক্রিয় ছিল না; তাদের সাথে আরও একটি খতরনাক দল মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। 'ইসমাঈলিয়া' নামের এ দলটির আত্মপ্রকাশ মুসলিম উম্মাহর মাঝে মারাত্মক ভীতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

ইসমাঈলিয়া শিয়ারা ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের পথভ্রষ্ট। অধিকাংশ আলেম-ওলামার মতেই তারা মুসলিম নয়। জনৈক ধূর্ত ইহুদীর মাধ্যমে এ দলটির উৎপত্তি ঘটে। ইসলামের বিরুদ্ধে ভয়ংকর চক্রান্তের পরিকল্পনা নিয়ে মাইমুন আল-কাদ্দাহ নামের সে লোকটি প্রথমে ইসলাম প্রকাশ করে মুসলিম সমাজে আশ্রয় গ্রহণ করে। কিন্তু তার মুখে ইসলামপ্রীতি থাকলেও অন্তরজুড়ে ছিল সীমাহীন মুসলিমবিদ্বেষ।

খুব কায়দা করে সে জাফর আস-সাদিকের পৌত্র মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈলের সংস্পর্শে আসে এবং কিছুকাল তার কাছে অবস্থান করে। উল্লেখ্য, মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈল ছিলেন ইসনা আশারিয়াদের ষষ্ঠ ইমাম জাফর আস-সাদিকের নাতি এবং সপ্তম ইমাম মুসা আল-কাজিমের ভাতিজা; সর্বোপরি আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত।

মাইমুন আল-কাদ্দাহ এক অদ্ভুত বিষয়ের অবতারণা করে—যা ছিল মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা অংশ। আমল- আকীদা বিধ্বংসী এ পরিকল্পনা তার মৃত্যুর কয়েক দশক হলেও বাস্তবতার মুখ দেখেছিল। মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈলের ছেলের নাম ছিল আব্দুল্লাহ। মাইমুন নিজেও তার ছেলের নাম আব্দুল্লাহ রাখে, সঙ্গে তার উত্তরসূরিদের নাম মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈলের উত্তরসূরিদের নামানুসারে রাখার ব্যাপারে ওয়াসিয়ত করে। তার ইচ্ছা ছিল কয়েক দশক পর তার উত্তরসূরিরা নিজেদেরকে মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈল ইবনু জাফর আস-সাদিকের বংশধর হিসেবে আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত দাবি করবে।

শুধু তাই নয়, তারা এ দাবিও করবে যে, 'মুসলিম উম্মাহর সর্বোচ্চ নেতা' মুসা আল-কাজিম ইবনু জাফর আস-সাদিকের বংশ থেকে নয়, বরং ইসমাঈল ইবনু জাফর আস-সাদিকের বংশ থেকেই হওয়া আবশ্যক। ওদিকে ইসনা আশারিয়াদের দাবি এর ঠিক উল্টো। ইহুদী মাইমুন আল-কাদ্দাহর সকল ইচ্ছা একের-পর-এক বাস্তবায়িত হয়। তার পরিকল্পনা অনুসারে একসময় প্রতিষ্ঠা পায় ইসমাঈলিয়া সম্প্রদায়। মাইমুনের উত্তরসূরিরা এ সম্প্রদায়ের মতাদর্শ নিজেদের পছন্দমতো সাজিয়ে নেয়—যাতে স্থান পায় ইসলামবিরোধী যত আকীদা-বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনার। মৌলিক কিংবা সামগ্রিক—কোনো বিবেচনায়ই তাতে ইসলামের কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।

তাদের ভ্রান্ত মতবাদ ও মতাদর্শের মাঝে সবচেয়ে মারাত্মক বিষয়টি ছিল শাসকদের মাঝে আল্লাহর অবতরণের বিশ্বাস। এর ওপর ভিত্তি করে তারা শাসককে খোদা মনে করত। পুনর্জীবনের প্রতিও ছিল তাদের অগাধ বিশ্বাস। তাদের ধারণা, মৃত্যুর পর সকল মানুষের আত্মা বিশেষত শাসকদের আত্মা অন্য কারও দেহে নতুন জীবন নিয়ে ফিরে আসে; সুতরাং বিগত সকল ইমাম অবশ্যই পৃথিবীতে পুনরায় আগমন করবেন।

এখানেই শেষ নয়, স্বেচ্ছাচারিতা ও নৈরাজ্যতার সকল সীমা ছাড়িয়ে তারা সাহাবীদের প্রতি জঘন্য অপবাদ আরোপ করতে থাকে। এমনকি, তাদের বিষোদগার থেকে রক্ষা পাননি স্বয়ং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম; অথচ এরাই আবার দিনশেষে তাঁর উত্তরসূরি হওয়ার দাবিদার! তাদের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল সমগ্র বিশ্বে আহলুস সুন্নাহর অনুসারী শাসকদের পরাস্ত করা—যাতে করে তাদের সামনে আর কারও দাঁড়ানোর সুযোগ না থাকে। এ বিষয়ে অচিরেই আমরা সবিস্তার আলোচনা করব।

ইসমাঈলিয়া সম্প্রদায়ের ধ্বংসাত্মক মতাদর্শ ব্যাপক উদ্যোমের সাথে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বরাবরের মতো অজ্ঞ ও মূর্খদের মাঝেই এ জঘন্য মতবাদ জনপ্রিয়তা লাভ করে। এ ক্ষেত্রে আহলে বাইতের প্রতি জনসাধারণের ভক্তি ও দুর্বলতার দিকটি তারা সুকৌশলে কাজে লাগায়। এভাবে একপর্যায়ে তাদের দলের লোকেরা সত্যি সত্যিই তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তরসূরি ভেবে নেয়।

তাদের এই আহ্বানে পারসিকরা ব্যাপকভাবে সাড়া দেয়। যারা ছিল মুখে মুখে ইসলামপ্রেমী এবং মনে মনে অগ্নিপূজারি। এদের মাঝে একজনের নাম ছিল হুসাইন আল-আহওয়াযী। এ লোকটি ছিল ইসমাঈলিয়া মতবাদের প্রসিদ্ধ আহ্বায়ক ও প্রথম সারির নেতা। বসরায় বসবাসকারী এ লোকটির সাথে সাক্ষাৎ হয় ইসলামের ইতিহাসের আরেক নিকৃষ্ট ব্যক্তির সাথে, যার নাম ছিল হামদান ইবনু আশয়াস। এ হতভাগার পূর্বসূরিরা ছিল পারস্যের অগ্নিপূজারি বা বাহরাইনের ইহুদী।

হামদান ইবনু আশয়াস সুযোগ বুঝে 'কারমাত' উপাধি গ্রহণ করে। এরপর সময়ের ব্যবধানে 'কারমাতি' (বহুবচনে কারামিতা) নামে একটি আলাদা দল গঠন করে। যদিও এরা ইসমাঈলিয়া মতবাদের অনুসারী উপদল ছিল; কিন্তু আচরণ ও উচ্চারণে ছিল তাদের চেয়েও ভয়ংকর। তাদের কাছে যেমন সম্পদের নির্দিষ্ট মালিকানা ছিল না, তেমনই নারী সম্ভোগেরও ছিল না সাধারণ কোনো নীতিমালা। জিনা-ব্যভিচার, চুরি-ডাকাতি, খুন-লুণ্ঠনের মতো জঘন্য ও অমানবিক কাজ-কর্মও তাদের কাছে ছিল বৈধ। এই সুবাদে চারপাশের চোর, ডাকাত, বিদ্রোহী ও সন্ত্রাসীরা দলে দলে তাদের মতাদর্শ গ্রহণ করতে থাকে। এভাবে ধীরে ধীরে ইসলামের ইতিহাসে এক ভয়ংকর সন্ত্রাসী সম্প্রদায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ঐতিহাসিক এমন আরও অসংখ্য উত্থান-পতনের ঘটনা ঘটেছে, যার সবগুলো এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। এ সময়ে শিয়ারা বড়ো বড়ো তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রতিটি দলই নিজেদেরকে সর্বাধিক সত্যানুসারী বলে দাবি করত। কিন্তু আকীদা-বিশ্বাস থেকে শুরু করে সাধারণ বিধি-বিধানেও তাদের মাঝে যথেষ্ট মতপার্থক্য বিদ্যমান ছিল। শিয়াদের সে প্রধান তিনটি দল হলো ইসনা আশারিয়া, ইসমাঈলিয়া ও কারামাতিয়া। সামগ্রিকভাবে এই তিন দলের সঙ্গে যেমন আহলুস সুন্নাহর বিরোধ ছিল, তেমনই তাদের নিজেদের মাঝেও ছিল সম্পর্কের টানাপোড়েন। তাদের এক দল অপর দলকে খুব একটা দেখতে পারত না। সর্বপরি শিয়াদের এ তিন দলের প্রত্যেকটিই ছিল প্রবৃত্তির পূজারি ও বিদআতের অনুসারী।

ইতিহাসের এই পর্যন্ত শিয়ারা যা কিছু ঘটিয়েছে, তাতে কেবল মুসলিম উম্মাহর মাঝে অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠাই বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও তখন শিয়াদের হাতে শাসনক্ষমতা ছিল না, তবু চলমান কিছু বিষয় ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। এরপর হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর শেষ ও চতুর্থ শতাব্দীর শুরুর দিকে একের-পর-এক মহাপ্রলয়ঙ্করী ঘটনা ঘটতে থাকে; যা মুসলিম উম্মাহকে ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়।

উল্লিখিত তিনটি দলের মাঝে কারমাতিরা সবার আগে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়। কারণ তাদের দলে ছিল অসংখ্য দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। তাদের প্রথম সারির এক নেতার নাম ছিল রুস্তম ইবনুল হুসাইন। সে ইয়েমেনে গিয়ে স্বতন্ত্র কারমাতি সাম্রাজ্য কায়েম করে। অতঃপর বিভিন্ন রাজ্যের মানুষের কাছে পয়গাম পাঠাতে শুরু করে। এই সুবাদে একসময় কারমাতি মতাদর্শের বার্তা মরক্কো পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কিন্তু কিছুদিন যেতে-না-যেতেই তাদের এই সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। যদিও এর পাশাপাশি 'জাজিরাতুল আরব' বা 'আরব উপদ্বীপ' এবং বিশেষভাবে এর পূর্বাংশে কারমাতিদের ব্যাপক উত্থান ঘটে। একপর্যায়ে এই অঞ্চলেও তারা একটি সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। যাতে মুসলমানদের জান-মালের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। কারমাতিদের হাতে হাজিদের প্রাণ হারানোর ঘটনা থেকে সে পরিস্থিতির ভয়াবহতা কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যায়।

তাদের যাবতীয় কুকীর্তির মাঝে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুতর ছিল ৩১৭ হিজরীতে 'তারবিয়া দিবস' তথা: জিলহজ মাসের ৮ তারিখে মসজিদুল হারামে অবস্থানরত সকল হাজিকে হত্যা করা এবং মারাত্মক অসম্মানপূর্বক 'হাজরে আসওয়াদ' চুরি করা। চুরিকৃত হাজরে আসওয়াদকে তারা তাদের রাজধানী পূর্ব-জাজিরায় প্রেরণ করে। সেখানে পূর্ণ ২২ বছর থাকার পর ৩৩৯ হিজরীতে পবিত্র এ প্রস্তরটি আপন স্থান ফিরে পায়।

এদিকে ইসমাঈলিয়ারা মরক্কোর ভূমি নিজেদের অনুকূলে পেয়ে যায়। সেখানে রুস্তম ইবনুল হুসাইন ইয়েমেন থেকে কারমাতি মতাদর্শের বার্তা ছড়িয়ে রেখেছিল। এটি সে করেছিল আবু আবদুল্লাহ আশ-শিয়ী নাম্নী এক লোকের মাধ্যমে। উল্লেখ্য, ইসমাঈলিয়া ও কারমাতি উভয় দলই ইসমাঈল ইবনু জাফর আস-সাদিকের ইমামাত বা নেতৃত্বে বিশ্বাসী। এই সুবাদে মাইমুন আল-কাদ্দাহের উত্তরসূরি উবাইদুল্লাহ ইবনুল হুসাইন নামের এক লোক মরক্কোতে স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য কায়েমের অভাবনীয় সুযোগ পেয়ে যায়। এবং সুযোগটি সে যথাযথভাবে কাজেও লাগায়। প্রথমে সে তার অনুসারীদের নিয়ে ইসমাঈলিয়া সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ঘোষণাই দেয়। কিন্তু এরপর সে 'মাহদী' উপাধি ধারণ করে এবং নিজেকে ইসমাঈলী পয়গামের ইমাম দাবি করে। তারপর দাবি করে যে, সে মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈল ইবনু জাফর আস-সাদিকের উত্তরসূরি এবং তার আগে মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈল পর্যন্ত তার পূর্বপুরুষদের সকল ইমাম সুপ্ত ছিলেন।

এমন নাটকীয় ইমামত ও সাম্রাজ্যের প্রতি জনসাধারণের সমর্থন পাওয়া মুশকিল। তাই তাদেরকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে এর নাম দেওয়া হয় 'ফাতিমী সাম্রাজ্য'। নামকরণটি ছিল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্যা হযরত ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহার নামানুসারে। অথচ ওই হতভাগার পূর্বসূরিরা ছিল ইহুদী। মূর্খদের আবেগকে পুঁজি করে তাদের এই মতাদর্শ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে; সাথে হতে থাকে তাদের ক্ষমতার বিস্তার। কিছুদিনের মধ্যে সমগ্র উত্তর আফ্রিকা তাদের আয়ত্তে চলে যায়। নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে তারা ছড়িয়ে দেয় নানা রকম বিদআত, কুসংস্কার ও সাহাবা-বিদ্বেষ। এ ছাড়া স্রষ্টার অবতরণ, শাসকদের পুনর্জনম ইত্যাদি ভ্রান্ত আকীদা তো ছিলই।

কথিত এই ফাতিমী সাম্রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধি পেতে পেতে একসময় মিশরকেও গ্রাস করে নেয়। ঘটনাটি ঘটে ৩৫৯ হিজরী সালে 'মুইয লি-দ্বীনিল্লাহ আল-উবাইদী'র শাসনামলে সেনাপতি জাওহার সিসিলি ইসমাঈলীর হাতে। এরপর মুইয মিশরে গিয়ে কায়রো শহর ও আল- আযহার মসজিদ প্রতিষ্ঠা করে। আল-আযহার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল ইসমাঈলি শিয়া মতাদর্শের প্রসার ঘটানো। কিন্তু এসব কাজে একমাত্র অন্তরায় ছিল আহলুস সুন্নাহর আলেমগণ। তাই তারা অন্যায়ভাবে তাঁদেরকে হত্যা করে; জনসম্মুখে প্রকাশ করে ভয়ংকর সাহাবা-বিদ্বেষ।

মুইয-পরবর্তী শাসকরা তার পথেই হেঁটেছে। কেউ কেউ আবার এতটাই উদ্ভ্রান্ত ছিল যে, নিজেকে খোদা পর্যন্ত দাবি করে ফেলেছে। এদের মাঝে প্রসিদ্ধ হলো আল-হাকিম বি-আমরিল্লাহ। নিজেদের মতাদর্শ প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে তারা অসংখ্য মসজিদ নির্মাণ করে। মিশর, সিরিয়া ও হিজাজের পবিত্র ভূমি দুইশ বছর পর্যন্ত পরাধীন করে রাখে। অবশেষে ৫৬৭ হিজরীতে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম মুসলিম বীর সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী তাঁদের বিতাড়িত করতে সক্ষম হন। তিনি ইসমাঈলিয়াদের কবল থেকে মিশরকে মুক্ত করেন।

শিয়াদের তৃতীয় দল ইসনা আশারিয়া। এরাও অসংখ্য বিদআতে নিমজ্জিত। কিন্তু তাদের ভ্রান্তি উল্লিখিত দুই দলের তুলনায় কিছুটা কম। তারা আল্লাহ তাআলা, তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও পারলৌকিক জীবনের প্রতি বিশ্বাস রাখে। কিন্তু সমস্যা হলো, ধর্মকে তারা নানা রকম বিদআত ও কুসংস্কার দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে। তাদের নেতৃস্থানীয় কয়েকজন লোক পারস্য ও ইরাকের বিভিন্ন এলাকার ক্ষমতাসীন পরিবারের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলে। এই সুযোগে পরবর্তী সময়ে তারা বেশ কয়েকটি অঞ্চলের মসনদ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

শিয়া নেতারা পারসিক বংশোদ্ভূত বনু সামান পরিবারের সুদৃষ্টি লাভে সমর্থ হয়। এই সুযোগে নেতারা তাদের মাঝে শিয়া মতাদর্শের বীজ বপন করে। তৎকালীন পারস্য তথা বর্তমান ইরানের বিশাল অঞ্চল ছিল বনু সামান সাম্রাজ্যের অধীনে। এ সাম্রাজ্য ২৬১ হিজরী থেকে ৩৮৯ হিজরী পর্যন্ত স্থায়িত্ব লাভ করে। দীর্ঘ সময়ে তাদের মাঝে শিয়া মতবাদ ছড়িয়ে পড়ে; কিন্তু প্রকাশ্য চর্চা আরম্ভ হয় চতুর্থ শতাব্দীর শুরুর দিকে।

একইভাবে তারা বনু হামদান পরিবারের সঙ্গেও সখ্যতা গড়তে সক্ষম হয়। এরা ছিল আরব বংশোদ্ভূত বনু তাগলিবের শাখা। তারা ৩১৭ হিজরী থেকে ৩৬৭ হিজরী পর্যন্ত ইরাকের মুসেল শহর শাসন করে। ৩৩৩ হিজরী থেকে ৩৯২ হিজরী পর্যন্ত সিরিয়ার আলেপ্পো শহরটিও তাদের আওতাধীন ছিল। তাদের মিত্রদের মধ্যে সবচেয়ে খতরনাক ছিল পারসিক বংশোদ্ভূত বনু বুওয়াই পরিবার। পারস্যে তারা স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য কায়েম করতে সক্ষম হয়। ৩৩৪ হিজরীতে আব্বাসী খেলাফতের ওপর আগ্রাসন চালিয়ে নামমাত্র খলীফাকে বহাল রাখে; উদ্দেশ্য ছিল, সান্ত্বনা প্রদানপূর্বক সুন্নী মুসলিমদের অভ্যুত্থান এড়িয়ে যাওয়া। এভাবে ৩৩৪ হিজরী থেকে ৪৪৭ হিজরী পর্যন্ত এক শতাব্দীর বেশি সময়কাল তারা আব্বাসীদের পরাধীন করে রাখে। অবশেষে সেলজুক সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হলে তাদের সাহায্যে ইরাকের ভূমি শিয়াদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।

দীর্ঘ এ শাসনামলে শিয়ারা সাহাবায়ে কেরাম ও আহলুস সুন্নাহর অনুসারী আলেম-ওলামা ও খলীফাদের প্রতি যারপরনাই বিদ্বেষ প্রকাশ করেছে। এমন কোনো নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য আচরণ নেই যা তারা তাঁদের সঙ্গে করেনি। সাহাবীদের নামে গালমন্দ লিখে তারা মসজিদের দরজায় ঝুলিয়ে রেখেছে; হযরত আবু বকর ও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমার মতো মহান সাহাবীদের বিরুদ্ধে জুমার খুতবায় বিষোদগার করেছে। সত্যি, ইসলামের ইতিহাসে মুসলিম উম্মাহর এমন দুঃসময় খুব কমই এসেছে।

ইতিহাস অধ্যয়ন করে আমরা জানতে পারি, হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর পুরোটা জুড়ে ছিল শিয়াদের জয়জয়কার। ইরানের কিয়দংশ ও সম্পূর্ণ ইরাক ছিল বনু বুওয়াইর দখলে; ইরানের পূর্বাঞ্চল, আফগানিস্তানের কিছু অংশ এবং তৎকালীন ইসলামী বিশ্বের পূর্বাংশ ছিল বনু সামানের অধীনে; মুসেলের কিয়দংশ এবং আলেপ্পো ছিল বুন হামদানের নিয়ন্ত্রণে। ওদিকে কারমাতিদের রাজত্ব বিস্তৃত ছিল আরব উপদ্বীপের পূর্বাংশে। তাদের হিংস্র থাবা কখনো পড়ত গিয়ে হিজাজ, দামেশক ও ইয়েমেনে।

এদিকে আফ্রিকার সকল মুসলিম রাজ্যগুলো ছিল কথিত ফাতিমী তথা, উবাইদিয়া সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন। আফ্রিকার রাজ্যগুলোর পাশাপাশি তাদের কব্জায় ছিল সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিন। হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর শেষের দিকে কারমাতি সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে। বনু বুওয়াইর শাসনামল সমাপ্ত হয় ৪৪৭ হিজরীতে। আর উবাইদিয়া সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যায় ৫৬৭ হিজরীতে। অতঃপর সমগ্র ইসলামী বিশ্বে সুন্নী মুসলিমদের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর যদিও পারস্য ও ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসনা আশারিয়া চিন্তাধারা বিদ্যমান ছিল, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আর তাদের হাতে ছিল না।

৯০৭ হিজরী পর্যন্ত এভাবেই কেটে যায়। এরপর ইসনা আশারিয়া মতাদর্শের অনুসারী ইসমাঈল আস-সাফাভী নামের এক ব্যক্তি ইরানে 'সাফাভিদ' সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। তাবরিজ শহরকে রাজধানী করে শিয়াদের এ নতুন সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করতে থাকে; এমনকি, একপর্যায়ে উসমানী সাম্রাজ্যের অন্তর্গত পাশ্ববর্তী সুন্নীদের ওপর হামলে পড়ে; উসমানীদের নিঃশেষ করে দেওয়ার লক্ষ্যে পর্তুগিজদের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তিও করে। তারা উসমানী সাম্রাজ্যের আওতাধীন ইরাকের কিছু এলাকা দখল করে সেখানে শিয়া মতাদর্শ প্রচার করতে শুরু করে।

এরপর ৯২০ হিজরীতে সাফাভিদ ও উসমানীদের মাঝে ঐতিহাসিক 'চালডিরেন যুদ্ধ' সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে সুলতান প্রথম সালিম সাফাভিদদের বিরুদ্ধে লড়েন এবং যুদ্ধে জয়লাভ করে তাদেরকে ইরাক থেকে বিতাড়িত করেন। দিন অতিবাহিত হতে থাকে; চলতে থাকে সাফাভিদ-উসমানী সংঘর্ষ। অধিকাংশ সময় এ সংঘর্ষগুলো হতো ইরাকের শহরগুলোতে। সাফাভিদ শাসনামল তথা, ৯০৭ হিজরী থেকে ১১৪৭ হিজরী পর্যন্ত পরিস্থিতি এমনই ছিল।

তাদের পতনমাত্রই সমগ্র ইরান খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়; বিভক্ত অঞ্চলগুলো নিয়ে উসমানী, রুশ, আফগান এবং সাফাভিদ শেষ সুলতান তৃতীয় আব্বাসের সেনাদের লড়াই চলতে থাকে। এরপর উসমানী সাম্রাজ্য দিনদিন নিস্তেজ হতে থাকে। ইউরোপীয় ও রুশরা তাদের ওপর কুকুরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফলে পশ্চিম ইরানের বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ তারা অনেকটাই হারিয়ে ফেলে। দুর্ভাগ্যবশত এসব অঞ্চলের এমন শাসকরা ক্ষমতায় আসে, যারা সুসম্পর্কের আড়ালে পশ্চিমাদের কাছে নিজেদের আত্মসম্মান বিসর্জন দিত অনায়াসে। এরা কখনো ইংরেজদের কাছে ধরনা দিত, কখনো ফরাসীদের সামনে হাত পাতত, কখনো-বা ভীক্ষার থালা বাড়িয়ে দিত রুশদের দিকে।

১১৯৩ হিজরী মুতাবেক ১৭৭৯ খ্রিষ্টাব্দে পারসিক বংশোদ্ভূত আগা মুহাম্মদ কাজার ইরানের ক্ষমতায় আসেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি শিয়া মতাবলম্বী হলেও ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের প্রতি দুর্বল ছিলেন। এজন্য ইসনা আশারিয়া মতবাদের দিকে কাউকে আহ্বান করতেন না; রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও এই মতাদর্শ সামনে রাখতেন না। আগা মুহাম্মাদের অবর্তমানে তার উত্তরসূরিরা শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকে। তাদের শাসনামলে মাঝে মাঝেই ইরানী সাম্রাজ্যের হ্রাস- বৃদ্ধির ঘটনা ঘটত। আগা-পরিবারের শাসকদের উপাধি ছিল 'শাহ'।

১৩৪২ হিজরী মুতাবেক ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দ সালে রেজা পাহলভী আগা- পরিবারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং নিজেকে 'শাহে ইরান' দাবি করেন। এ কাজটি তিনি করেছিলেন ইংরেজদের সহযোগিতায়। ইংরেজদের সাহায্য নিয়ে ক্ষমতায় এলেও পরবর্তী সময়ে বিরোধের জের ধরে ইংরেজরা ১৯৪১ সালে তাকে ঠিকই দেখে নিয়েছে। ফলস্বরূপ তার মসনদে বসিয়েছে তারই ছেলে মুহাম্মদ রেজা বিহলভীকে। বিহলভী ১৩৯৯ হিজরী মুতাবেক ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের নীতিতে ইরান শাসন করেন। অতঃপর ইরানে ইসনা আশারিয়া মতাদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে আয়াতুল্লাহ খোমেনীর নেতৃত্বে ইরানী বিপ্লব সংঘঠিত হয়।

এই হলো শিয়াদের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ ও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হওয়া থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ইসলামী বিশ্বে তাদের শাসনক্ষমতা পরিচালনার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। আশা করি এ আলোচনা থেকে আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, শিয়াদের উত্থান ছিল সুন্নী শাসনের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত এক বিদ্রোহস্বরূপ। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তারা ধর্মের মুখোশ পরে আহলে বাইতের প্রতি জনমানুষের ভক্তি ও বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে গেছে। সুদীর্ঘ এ সময়ে আমরা কখনই দেখিনি যে, শিয়াদের কোনো একটি দলের সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর চিরশত্রু ক্রুসেডার, রুশ, ইংরেজ, ফ্রান্স বা পর্তুগিজদের সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে; এমনকি তাতারিদের মতো দুর্ধর্ষ ত্রাসদের সঙ্গেও কখনো তাদের সংঘর্ষ হয়নি। উল্টো আমরা প্রত্যক্ষ করেছি যে, কীভাবে তারা ধাপে ধাপে একে অপরের দিকে সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

কিন্তু এরপরও আমরা বিনা বিচারে অতীত শিয়াদের আচরণের দায় বর্তমান শিয়াদের দেব না। আমরা বরং সমসাময়িক শিয়াদের আকীদা-বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা, পথ ও পদ্ধতি যাচাই করে দেখব। অতঃপর পূর্বসূরিদের আকীদা-মানহাজ যখন উত্তরসূরিদের মাঝে হুবহু পাওয়া যাবে, তখনই কেবল আমরা তাদেরকে চিহ্নিত করব, ত্রুটিযুক্ত বলব। তো, যখন আমরা দেখতে পাই অতীত-বর্তমান সকল শিয়া ইমামত তথা নেতৃত্বের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বংশের শর্ত আরোপ করছে, ইমামকে নিষ্পাপ বলছে, হযরত আবু বকর, উমর ও উম্মুল মুমিনীনসহ অন্যান্য সাহাবীদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে, তখন আর কোনোভাবেই তাদের প্রতি সুধারণা বহাল রাখা যায় না; এবং বাধ্য হয়ে বলতে হয়, উত্তরসূরিরা তাদের পূর্বসূরিদের পদাঙ্কই অনুসরণ করছে।

প্রিয় পাঠক, এবার বলুন তো! শিয়াদের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান কী হতে পারে? তাদের সাথে আমাদের আচরণ-উচ্চারণ কেমন হওয়া উচিত? কিছু বলা, নাকি না বলা? কোনটি শ্রেয়? কিছু জানা, নাকি না জানা? কোনটি ভালো?

টিকাঃ
১. সূরা আল-আরাফ: ১৭৬
১. পূর্ণাঙ্গ বংশ পরম্পরা: উবাইদুল্লাহ ইবনুল হুসাইন ইবনু আহমাদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু মাইমুন আল-কাদ্দাহ।
২. মুইযের উপাধি ফাতিমী নয় বরং উবাইদুল্লাহ আল-মাহদীর দিকে সম্পৃক্ত করে 'উবাইদি' হওয়াই সঙ্গত। -লেখক
১. এই নামকরণ ছিল তার প্রপিতামহ সফিউদ্দীন আল-আরদাবিলীর নামানুসারে। সে ছিল পারসিক বংশোদ্ভূত। মৃত্যু ৭২৯ হিজরীতে। -লেখক
২. Chaldiran (চালদিরান)

📘 শিয়া মতবাদঃ ধারণা ও বাস্তবতা 📄 প্রবন্ধ : নিয়ন্ত্রণাধীন শয়তান

📄 প্রবন্ধ : নিয়ন্ত্রণাধীন শয়তান


আরব কিংবা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নজর দিলেই আমরা দেখতে পাই, ইরান-আমেরিকা উত্তেজনার খবরাখবর তারা খুব আয়োজন করে প্রকাশ করছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হবে, এই বুঝি ইরানের ওপর আমেরিকার সামরিক হামলা শুরুই হয়ে গেল। কারণ, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে; আর জর্জ ডাব্লিউ বুশের মতে এটি একটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, যার মাশুল 'বিপথগামী ইরান'-কে দিতেই হবে।

অনেকেই বলাবলি করেন, আমেরিকা কি সত্যিই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে? ইরাক অভিযানে অর্জিত তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলে কি এখন ইরানের পরমাণু প্রকল্পে বাধা দিতে যাবে? বর্তমান বিশ্বে আমেরিকার কল্যাণে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া কি আবশ্যক? আমার মনে হয়, আমেরিকা কখনই ইরানের ওপর হামলা করবে না; এর কোনো সম্ভাবনাই নেই। কেন নেই? চলুন কয়েকটি কারণ জানা যাক।

প্রথমত: আমেরিকা মোটেও এতটা নির্বোধ নয় যে, পা-য়ে পাড়া দিয়ে ইরানের সাথে যুদ্ধ বাধাবে। এ কথা সকলেরই জানা, মার্কিন সেনারা ইরাকেই মারাত্মক সঙ্কটের ভেতর দিয়ে গেছে; সেখানে তারা কল্পনাতীত সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে; এমনকি যুদ্ধ শেষে নিজেদেরকেই ক্ষতিগ্রস্ত মনে করতে হয়েছে। এসব কারণে অসংখ্য মার্কিন নাগরিক ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে। সর্বশেষ, আমেরিকার দুই প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী, অর্থাৎ ওবামা এবং জন সিডনি ম্যাককেইন তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ইরাক-সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে।

দ্বিতীয়ত: আমেরিকা খুব ভালোভাবেই জানে, ইরানে হামলার ফলে শিয়া ও সুন্নীদের মাঝে অন্তত রাজনৈতিকভাবে ঐক্য তৈরি হবে। তখন তারা উভয়ে মিলে আমেরিকার পেছনে উঠেপড়ে লাগবে। এতে করে ইরাকী সুন্নীদের বিরুদ্ধে শিয়াদের আক্রমণ বন্ধ হয়ে যাবে, যা আমেরিকার জন্য সুখকর হবে না। কারণ, ইরাক অভিযানে তাদের মূল লক্ষ্যই ছিল সুন্নী দমন। তা ছাড়া, ইরানে হামলা হলে স্বাভাবিকভাবেই তারা ইরাকী শিয়াদের সাহায্য করা বন্ধ করে দেবে। ফলে সুন্নীরা আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে; যা অচিরেই আমেরিকার জন্য মাথাব্যথার কারণ হবে।

তৃতীয়ত: ১৯৮০ সালের কথা। আমেরিকার একমাত্র ইরান অভিযানের অভিজ্ঞতা। উদ্দেশ্য ছিল ইরানী বিপ্লবের সেনাদের হাতে আটককৃত মার্কিন কূটনীতিকদের মুক্ত করা। এই সুবাদে আমেরিকা এক তিক্ত বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছিল। হামলা করতে এসে খোয়াতে হয়েছিল একাধিক যুদ্ধবিমান, নিহত হয়েছিল অনেক মার্কিন সেনা, ক্ষুণ্ণ হয়েছিল তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা। আসলে ইরানের মরু ও পার্বত্য অঞ্চলে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা আমেরিকার জন্য মোটেও সহজ কিছু ছিল না।

চতুর্থত: পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। আর আমেরিকা খুব ভালোভাবেই জানে, ইরাকের মতো ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প মোটেও কাল্পনিক নয়। সুতরাং এই দেশে হামলার মানেই হলো আমেরিকার আয়ত্তাধীন কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পারমাণবিক বোমাহামলার ঝুঁকি গ্রহণ করা। উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড়ো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে কাতারে; ওদিকে ফিলিস্তিনে দখলদার ইহুদীরাও ইরান থেকে অদূরে; আর ইরাক-কুয়েতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের বিপুল উপস্থিতির কথা তো বলাই বাহুল্য।

পঞ্চমত: দূর কিংবা অদূর অতীতের ইতিহাসে এমন কোনো ঘটনা উল্লেখিত হয়নি যাতে কোনো শিয়া রাষ্ট্র মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধরত অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে। শিয়া রাষ্ট্রগুলো স্বভাবত কোনো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে চোখও রাঙায় না। তবে হ্যাঁ, কেউ যখন তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাদের হুঙ্কার দেখে কে! বলতে দ্বিধা নেই, পার্শ্ববর্তী সুন্নী রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে ব্যয়ের জন্যই মূলত শিয়া রাষ্ট্রগুলো শক্তি সঞ্চয় করে রাখে।

বুওয়াইহিয়া শিয়া সাম্রাজ্যের কথা মনে আছে? খ্রিষ্টীয় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ছিল তাদের একেবারে নিকটে। এরপরও কিন্তু তাদের সঙ্গে কোনো রকম সংঘর্ষ হয়নি। অপরদিকে আব্বাসী খেলাফতের বিরুদ্ধে তারা ঠিকই যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। একই আচরণ করেছে উবাইদিয়া শিয়া সাম্রাজ্য। উত্তর স্পেনে বসবাসকারী ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে তো কিছু বলেনি, বরং দক্ষিণ স্পেনের সুন্নী শাসক আবদুর রহমান আন-নাসিরের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করেছে। ক্রুসেডাররা যখন শাম ও ফিলিস্তিনে আগ্রাসন চালিয়েছিল, এই মিশরে থাকা উবাইদিয়া শিয়ারা কেবল চেয়ে চেয়ে দেখেছে। বরং বিভিন্ন অঞ্চলে সুন্নী সেলজুক শাসকদের বিপক্ষে খ্রিষ্টানদের সাহায্য করেছে। এমনকি সুন্নীদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলগুলো ভাগ-বণ্টনের রূপরেখা তারাই তৈরি করেছে। সাফাভিদ শিয়া সাম্রাজ্য খ্রিষ্টান দেশ ফ্রান্স, ইংল্যান্ড এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করলেও সুন্নী উসমানী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ঠিকই যুদ্ধ করেছে। শিয়া রাষ্ট্র ইরান ধর্মত্যাগী রাশিয়ার ব্যাপারে বরাবরই নিশ্চুপ থেকেছে; অপরদিকে আফগান মুজাহিদদের ঠিকই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আমেরিকা বা ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে না জড়ালেও ইরাকের সঙ্গে ঠিকই আট-আটটি বছর যুদ্ধ চালিয়ে গেছে।

এসব ইতিহাস সামনে রেখে খুব সহজেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, ইরান কোনো অবস্থায়ই আমেরিকা কিংবা ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবে না, যদি না তারা হামলার শিকার হয়। তাদের ওপর সামান্য আঘাত এলেও তারা তার সমুচিত জবাব দেবে। ঠিক যেমনটি আমরা দেখেছি দক্ষিণ লেবাননে হিযবুল্লাহর আচরণ ও উচ্চারণে।

ষষ্ঠত: কয়েক মাস যাবৎ আমরা দেখতে পাচ্ছি, ইরানের রাষ্ট্রপতি আহমাদি নেজাদ যখনই ইরাক সফরে যান, আমেরিকা তাকে নিরাপত্তার চাদরে জড়িয়ে রাখে। এ থেকে স্পষ্ট হয়, ইরান-আমেরিকা দ্বন্দ্বের কথা মিডিয়া যেভাবে প্রচার করে, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। যদি ভিন্ন কিছু হয়েই থাকে, তাহলে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে এই যে চিল্লা-পাল্লা, হুমকি-ধামকি এসব অনর্থক নয় কি?

পরিশেষে সম্ভাব্য যে দিকটি থাকে তা হলো, আমেরিকা বিশ্ববাসীর সামনে ইরানে থাকা এমন এক 'জুজু'-র সংবাদ পেশ করতে চায়, যা শুনে আশপাশের রাষ্ট্রগুলো ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং তাদের কাছে ইরাক ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি যৌক্তিক মনে হয়।

অর্থাৎ, ইরান অচিরেই তেমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে, যেমনটি ইতঃপূর্বে হয়েছিল সাদ্দাম হুসাইন। সাদ্দাম পূর্ণ তেরো বছর ইরাক শাসন করেছেন। দীর্ঘ এ সময়ে আমেরিকা তার কোনো রকম বিরোধিতা করেনি। কিন্তু হঠাৎ তারা এমন উদ্ভট পরিস্থিতি তৈরি করল যে, অনেকেই সাদ্দাম হুসাইনের হাত থেকে ইসলামী দেশগুলো হেফাজতের জন্য আমেরিকার মতো ত্রাণকর্তার উপস্থিতি খুশি মনে মেনে নিল।

এরপর যখন সাদ্দাম হুসাইন অধ্যায়ের অবসান ঘটল, ক্ষমতাসীনদের কাতারে তিনি আর উল্লেখযোগ্য কেউ রইলেন না, তখন সকল রহস্য উন্মোচিত হলো; জানা গেল, ধ্বংসাত্মক অস্ত্র তৈরির অপবাদ এবং তার ওপর ভিত্তি করে ইরাকে চালানো মার্কিন সেনাদের আগ্রাসন সবই ছিল আমেরিকার সাজানো নাটক। ইরাকে আদৌও কোনো বিধ্বংসী অস্ত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

কিন্তু মানুষ বরাবরই খুব দ্রুত সব ভুলে যায়। এবারও তাই হলো। এই সুবাদে আমেরিকা এখন আবার নতুন জুজুর সন্ধানে নেমেছে। তবে এবারের জুজু তাদেরই নিয়ন্ত্রণাধীন। সুতরাং কোনো রকম ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা নেই, কিংবা নেই কোনো সংঘাত ও সংঘর্ষের সম্ভাবনা। এ ক্ষেত্রে আমেরিকার জন্য ইরানের চেয়ে উত্তম বিকল্প আর হতেই পারে না। এজন্য বিশ্ববাসীর চোখে ধুলো দিতে তারা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সুপরিকল্পিতভাবে ‘মিডিয়া সন্ত্রাস’ চালিয়ে যাচ্ছে।

তবে হ্যাঁ, ইরানের পালাও বছর কয়েক পরে শেষ হয়ে যাবে। তখন আমেরিকা আবার নতুন কোনো জুজুর অন্বেষণে বেরিয়ে পড়বে। নির্বোধ ও নির্লজ্জের মতো এই খেলা তারা চালিয়েই যাবে, যতদিন না মুসলমান নিজের পায়ে দাঁড়ায় এবং এই অঞ্চলের সকল জুজুকে উচিত শিক্ষা দিতে সক্ষম হয়—হোক সেটা মার্কিন, ইরানী কিংবা ইহুদী।

ফন্ট সাইজ
15px
17px