📄 প্রবন্ধ : শিয়াদের গোড়ার কথা
'একটি মতাদর্শ কখনই নির্দিষ্ট কোনো দেশ ও জাতির মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে না; সাধারণত এর কিছু-না-কিছু প্রতিক্রিয়া থেকেই থাকে, যা ধীরে ধীরে পার্শ্ববর্তী দেশ ও জনপদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। সঙ্গত কারণে প্রতিটি মতাদর্শের ভিত্তিমূলে থাকে বিশ্বাসগত, ফিকহ-সংক্রান্ত ও ইতিহাস-সম্পৃক্ত বিষয়-আশয়। কোনো মতাদর্শের যথাযথ উপলব্ধি নির্ভর করে এসব জানার ওপর।'
শিয়া মতবাদের সূচনা কখন, কীভাবে হয়েছিল তা নিয়ে ইতিহাসজ্ঞদের মাঝে দ্বিমত রয়েছে; শোনা যায়, হযরত আলী ও মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুমার মাঝে বিরোধ চলাকালে যারা হযরত আলীর পক্ষ নিয়েছিল তারা শিয়া; আর যারা বিপক্ষে ছিল তারা সুন্নী। সহজ কথায় হযরত আলী ও মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুমার অনুসারীরাই যথাক্রমে শিয়া ও সুন্নী। কিন্তু বিজ্ঞ কেউ কখনো এমন দাবি করেনি।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর আকীদা অনুযায়ী হযরত আলী ও মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুমা ছিলেন প্রথম সারির সাহাবী। তাঁদের মাঝে বিরোধ দেখা দিলে হযরত আলী যে সিদ্ধান্ত নেন, তা ছিল যথাযথ; পক্ষান্তরে হযরত মুয়াবিয়ার 'ইজতিহাদ' এ ক্ষেত্রে সঠিক ছিল না। এ থেকে হযরত আলীর পক্ষে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর স্পষ্ট সমর্থন প্রমাণিত হয়। তা ছাড়া বর্তমান সময়ের অধিকাংশ শিয়া যে বিশ্বাস ও সংস্কৃতি মনে-প্রাণে লালন ও পালন করে, তা কোনোভাবেই হযরত আলীর জীবনাদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এজন্য 'হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর যুগেই শিয়া মতবাদের উৎপত্তি' কথাটি গ্রহণযোগ্য নয়।
ইতিহাসবেত্তাদের অনেকে বলেন, শিয়া মতবাদের উৎপত্তি ঘটে হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাত-পরবর্তী সময়ে। এ মতটি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট ও যুক্তিসঙ্গত। কারণ, হযরত হুসাইন যখন ইয়াযিদের খেলাফত অস্বীকার করেন তখন ইরাকের কিছু লোক তাঁকে সমর্থন জানায় এবং সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইরাকে আহ্বান করে। তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি ইরাকের উদ্দেশে যাত্রা করেন। প্রথমদিকে তারা তাঁকে সঙ্গ দিলেও শেষ পর্যায়ে গিয়ে পিঠটান দেয়। যার ফলে হযরত হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহু কারবালার প্রান্তরে নির্মমভাবে শাহাদাতবরণ করেন।
হযরত হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ফলে ইরাকীরা যারপরনাই লজ্জিত হয়, পাপবোধে জর্জরিত হতে থাকে। পাপের প্রায়শ্চিত্ত-স্বরূপ একপর্যায়ে তারা উমাইয়া খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত নেয়; সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে সংঘর্ষে তাদের অনেকেই প্রাণ হারায়। এই সুবাদে বিদ্রোহীদের উদ্দেশে ইতিহাসে প্রথমবার 'শিয়া' শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এ থেকে আরও প্রমাণিত হয়, হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর চেয়ে তাঁর পুত্র হযরত হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গেই শিয়াদের সম্পর্ক অধিক ঘনিষ্ঠ। এজন্যই হয়তো বর্তমান শিয়ারা হযরত হুসাইনের শাহাদাত-বার্ষিকী খুব জাঁকজমকভাবে পালন করে, অথচ হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা তারা স্মরণেই আনে না।
সর্বোপরি এ মতাদর্শের সূচনা হয়েছিল নিছক একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে, যাদের উদ্দেশ্য ছিল উমাইয়া খেলাফতের বিরুদ্ধাচরণ করা; খলীফার বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহ করবে তাদের সাহায্য করা। এমনকি প্রথম দিকে তাদের আকীদাগত নীতি এবং ফিকহ-সংক্রান্ত বিধির কোনোটিই আহলুস সুন্নাহর মতাদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল না। উপরন্তু, শিয়াদের কাছে যারা প্রথম সারির ইমাম তারা সকলেই ছিলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর পরিপূর্ণ অনুসারী।
হযরত হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাতের কয়েক মাস পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়; কিন্তু তাঁর ছেলে আলী যাইনুল আবিদীন রহিমাহুল্লাহর সময়ে আবার তা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তিনি ছিলেন এক মহান ব্যক্তিত্ব; দুনিয়াবিমুখ আলেম হিসেবে সুপ্রসিদ্ধ। তাঁর সম্পর্কে এমন কিছু কখনই শোনা যায়নি, যা সাহাবী ও তাবেয়ীদের আকীদা ও চিন্তাধারার পরিপন্থি।
আলী যাইনুল আবিদীনের ঘরেও দুজন মনীষীর জন্ম হয়। যাদের তাকওয়া ও পরহেযগারিতা ছিল সুউচ্চ; তারা হলেন—হযরত মুহাম্মদ আল-বাকির এবং হযরত যায়েদ রহিমাহুমাল্লাহ। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর তৎকালীন মুখপাত্র—সাহাবী ও তাবেয়ীদের সঙ্গে তাদের কোনো দ্বিমত বা বিরোধ ছিল বলে জানা যায় না। তবে হ্যাঁ, একটি বিষয়ে হযরত যায়েদ ইবনু আলী রহিমাহুল্লাহর ব্যক্তিগত দ্বিমত ছিল। তিনি বলতেন, হযরত আলীই ছিলেন প্রথম খলীফা হওয়ার সর্বাধিক যোগ্য।
এখানে দুটি বিষয় লক্ষণীয়। প্রথমত, তাঁর এই মত উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের পরিপন্থি; দ্বিতীয়ত, অসংখ্য হাদীসে হযরত আলীর তুলনায় হযরত আবু বকর, উমর ও উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুমের 'মর্যাদাধিক্য' প্রমাণিত; তথাপি, তাঁর এই দ্বিমত আকীদাগত না হওয়ায় তেমন গুরুতর কিছু ছিল না। আর তিনি তো প্রথম তিন খলীফার মর্যাদা অস্বীকার করেননি; শুধু হযরত আলীকে তাঁদের চেয়ে অগ্রগামী মনে করেছেন। মূলত তিনি অগ্রজের উপস্থিতিতে অনুজের 'ইমামত বা নেতৃত্ব' বৈধ মনে করতেন। তাই, দ্বিমত যদিও ছিল তবু তিনি প্রথম তিন খলীফার ইমামতের স্বীকৃতি দিয়েছেন অকুণ্ঠচিত্তে। মোটকথা, শুধু এই একটি প্রসঙ্গ ছাড়া শরীয়তের অন্য সকল মৌলিক ও শাখাগত বিষয়ে আহলুস সুন্নাহর সঙ্গে তার কোনো রকম দ্বিমত ছিল না।
হযরত যায়েদ রহিমাহুল্লাহ ছিলেন হযরত হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর পৌত্র। তিনি খলীফা হিশাম ইবনু মালিকের শাসনামলে দাদার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ভক্তদের নিয়ে উমাইয়া খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ১২২ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন। এতে ভক্তরা সাময়িকভাবে দমে গেলেও পরবর্তী সময়ে তাঁর আদর্শকে সামনে রেখে নতুন এক মতাদর্শ গড়ে তোলে। ইতিহাসের পাতায় সেটি 'যায়দিয়া' বা 'যায়েদী' মতবাদ নামে পরিচিত।
বর্তমানে যায়দিয়া সম্প্রদায়ের বসবাস ইয়েমেনে। তাদেরকে যদিও কথিত শিয়া মনে করা হয়, কিন্তু প্রথম তিন খলীফার ওপর হযরত আলীকে প্রাধান্য দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিষয়ে আহলুস সুন্নাহর সঙ্গে তাদের মতভেদ ছিল না। উপরন্তু নামমাত্র শিয়া এ দলটি আহলুস সুন্নাহর সঙ্গে এত বেশি সাদৃশ্য রাখে যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাহ ও তাদের মাঝে কোনো অমিলই খুঁজে পাওয়া যায় না।
উল্লেখ্য, হযরত যায়েদ রহিমাহুল্লাহর অনুসারীদের একটি দল একবার হযরত আবু বকর ও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমার ব্যাপারে তাঁর মনোভাব জানতে চায়। এ সময় তিনি তাঁদের নামে ভালো কথা বলেন ও রহমতের দোয়া করেন। এতে তারা বেশ ক্ষিপ্ত হয় এবং তাঁর দোয়া প্রত্যাখ্যান করে। এখানেই শেষ নয়, তারা এ মহান সাহাবীদ্বয়ের বিরুদ্ধে বিষোদগার পর্যন্ত করে; এমনকি শেষ পর্যন্ত হযরত যায়েদ রহিমাহুল্লাহর আনুগত্য থেকেই বেরিয়ে আসে।
সর্বোপরি এ দলটি একদিকে যেমন হযরত আবু বকর ও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমার শ্রেষ্ঠত্ব ও নেতৃত্ব অস্বীকার করেছে, অপরদিকে ত্যাগ করেছে হযরত যায়েদের আনুগত্যও। একের-পর-এক অস্বীকৃতি ও অবাধ্যতার কারণে ইতিহাসে তারা 'রাফিজী' (বিদ্রোহী) নামে অভিহিত হয়েছে। আর এ দলের এক অনুসারীর হাত ধরেই পরবর্তী সময়ে যাত্রা শুরু করেছে 'ইসনা আশারিয়া মতবাদ'; যা বর্তমানে শিয়াদের মাঝে সর্বাধিক চর্চিত।
যায়েদ ইবনু আলীর আট বছর পূর্বে (১১৪ হি.) তার ভাই মুহাম্মদ আল-বাকির মৃত্যুবরণ করেন; রেখে যান সাত জন সন্তান-সন্ততি। তাদের মাঝে জাফর আস-সাদিক ছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ আলেম ও ফকীহ। আকীদা-বিশ্বাসে তিনি ছিলেন সাহাবী, তাবেয়ী ও তৎকালীন আলেমদের পরিপূর্ণ অনুসারী।
দেখতে দেখতে উমাইয়া শাসনের অন্তিম মুহূর্ত ঘনিয়ে আসে। আব্বাসীরা তাদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান ঘটানোর জন্য ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে জনমত তৈরি করার কাজে নেমে পড়ে। ক্রমেই দ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। আর এতে ইন্ধন জোগায় যায়েদ ইবনু আলী রহিমাহুল্লাহর আদর্শ থেকে বিচ্যুত সেই অবাধ্য উপদলটি। ১৩২ হিজরীতে উমাইয়া খেলাফতের পতন ঘটে; যাত্রা শুরু করে আব্বাসী খেলাফত। প্রথম খলীফা আবুল আব্বাস আস-সাফফাহর পর সাম্রাজ্যের হাল ধরেন খলীফা আবু জাফর আল-মানসুর।
এদিকে আন্দোলনের সহযোগীরা সামগ্রিকভাবে লাভ-ক্ষতির হিসেব কষে দেখতে পায়-পরিশ্রমের তেমন কোনো মূল্যই তারা পায়নি। তাদের কামনা ছিল—নতুন শাসক হবে হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর খানদানের কেউ। কিন্তু খেলাফতের ঝান্ডা আব্বাসীদের হাতে গেলে তাদের সে আশার গুড়ে বালি। উপায়ান্ত না দেখে তারা নতুনোদ্যমে বিদ্রোহ আরম্ভ করে। এবার হযরত আলী ইবনু তালিবের নামানুসারে নাম ধারণ করে 'তালিবী'।
মুসলিম উম্মাহর সর্বাঙ্গে অস্থিরতা বিরাজ করলেও আকীদা ও ফিকহের মৌলিক বিষয়ে তেমন কোনো বিরোধ তখনও পর্যন্ত ছিল না। কিন্তু হঠাৎ হযরত যায়েদের অবাধ্য সেই দলটি আবু বকর ও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমার ব্যাপারে আপত্তি তোলে। এই দুর্ভাগারা মহান দুই খলীফার নেতৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করে বসে, তাঁদের নাম ধরে প্রকাশ্যে বদদোয়াও করতে শুরু করে। জাফর আস-সাদিক ১৪৮ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। উত্তরসূরি হিসেবে রেখে যান পুত্র মুসা আল-কাজিমকে। মুসাও বাবার মতো দীনি শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন; কিন্তু জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় পিতার সমপর্যায়ের ছিলেন না। মুসা আল-কাজিম ইন্তেকাল করেন ১৮৩ হিজরীতে। বড়ো একটি পরিবার রেখে যান তিনি। তাদের মধ্যে পুত্র আলী ইবনু মুসা রেজার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তালিবীরা যখন বিদ্রোহ শুরু করে তখন খেলাফতের দায়িত্বে ছিলেন আব্বাসী খেলাফতের সুপ্রসিদ্ধ খলীফা আবু জাফর আব্দুল্লাহ আল-মামুন। তিনি বিদ্রোহের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখেন এবং সকল সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেন। তালিবীদের দাবি ছিল হযরত আব্বাস ইবনু আব্দুল মুত্তালিবের নয়, বরং হযরত আলী ইবনু তালিবের বংশের কাউকে খলীফা নিযুক্ত করা। বিষয়টি সামনে রেখে খেলাফতের বায়আতের জন্য তিনি আলী ইবনু মুসা রেজাকে মনোনীত করেন। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত আব্বাসীদের মাঝে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি করে।
২০৩ হিজরীতে আকস্মিকভাবে হযরত আলী ইবনু মুসা মৃত্যুবরণ করেন। এ মৃত্যুর জন্য তাঁর সমর্থকরা খলীফা আল-মামুনকে দোষারোপ করে। একসময় তারা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে আব্বাসী খেলাফতের বিরুদ্ধে তুমুল বিদ্রোহের ডাক দেয়; ঠিক যেমনটি করেছিল উমাইয়া খেলাফতের বিরুদ্ধে।
কয়েক বছর এভাবে কেটে গেল। দ্রোহের আগুন কিছুটা নিষ্প্রভ হলো। দীর্ঘ এ সময়ে কত কী ঘটে গেছে, কিন্তু 'শিয়া মতবাদ' নামে স্বতন্ত্র কোনো ধর্মীয় মতবাদ তখনও অস্তিত্বে আসেনি। আর বিদ্রোহ-বিপ্লব বলতে যা ঘটেছে, সবই ছিল রাজনৈতিক বা ক্ষমতা-কেন্দ্রিক। এর পেছনে অবশ্য যথেষ্ট কারণও ছিল। তবে বর্তমান শিয়াদের সঙ্গে আহলুস সুন্নাহর যত আকীদাগত বিরোধ রয়েছে, তার কোনোটিই তখন ছিল না।
উল্লেখ্য, শাসকদের বিরুদ্ধে চলমান এসব সংগ্রামে সক্রিয় থাকার ক্ষেত্রে সর্বাধিক সুযোগ ছিল পারস্যবাসীর। তাদের বিশাল সাম্রাজ্য ইসলামী সালতানাতের অধীনে চলে গেলে অনেকে তা মেনে নিতে পারেনি; আফসোস করতে থেকেছে। কারণ, আরব মুসলিমদের তুলনায় নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কৌলীন্য তাদের কাছে অধিকতর সমৃদ্ধ ও উন্নত মনে হতো।
এসব ভাবনা থেকে পরবর্তী সময়ে তাদের মাঝে 'শুউবী' নামে একটি বিশেষ দল আত্মপ্রকাশ করে। যাদের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামবহির্ভূত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থে কাজ করা। তাদের অনেকেই পারসিক সভ্যতা- সংস্কৃতির প্রতি হৃদয়ে থাকা ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। পছন্দের সে তালিকায় স্থান পায় একসময়ের অন্যতম উপাস্য 'আগুন'।
একদিকে ইসলামী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র বিদ্রোহের সক্ষমতা শুউবী সম্প্রদায়ের ছিল না, অপরদিকে কয়েক দশক ধরে তাদের পরিচয় ছিল মুসলিম; তাই তালিবীদের বিদ্রোহ তাদের ভাগ্যবদলের মোক্ষম সুযোগ এনে দেয়। এজন্য তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, তাদের সুবিশাল সাম্রাজ্য ধ্বংসকারী ইসলামী খেলাফতের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে তারা 'তালিবী আন্দোলনে' যোগ দেবে; কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দিয়ে আসা মুসলিম পরিচয় তারা এখনই ত্যাগ করবে না। তারা আরও সিদ্ধান্ত নেয় যে, মুসলিম সমাজে পারসিক সভ্যতা- সংস্কৃতি ছড়িয়ে ইসলাম ধর্মকে বিকৃত করবে; দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিরাজমান অস্থিরতার সুবাদে ইসলামকে কুসংস্কারের মোড়কে আকর্ষণীয় করে তুলবে।
চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে তারা তালিবীদের সঙ্গে মিলে যাবে এজন্য যে, তারা নিজেদেরকে আলী ইবনু আবু তালিবের দলভুক্ত দাবি করে; তা ছাড়া তাদের একটি অংশ তো আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত; মানুষের মনেও তাদের প্রতি সীমাহীন ভক্তি। আসলে শুঊবীরা বুঝতে পেরেছিল, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার এ আন্দোলন হয়তো এভাবেই স্থায়িত্ব লাভ করবে। এভাবেই পারসিক শুউবীদের আন্দোলন আহলে বাইত তালিবীদের আন্দোলনের সাঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়; যদিও নতুন রূপ ও সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়ে এগিয়ে চলা এ সংগ্রামের শুধু রাজনৈতিক নয়, ছিল ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য।
ফিরে যাই তালিবী আন্দোলনের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায়। আমরা জেনেছি, আলী ইবনু মুসা রেজাকে বায়আতের জন্য মনোনীত করার পর তিনি মারা যান; তার মৃত্যুর পর সামনে আসেন তদীয় পুত্র মুহাম্মদ আল-জাওয়াদ। তিনি ইন্তেকাল করেন ২২০ হিজরীতে। তাঁর পর নেতৃত্ব দেন তদীয় পুত্র আলী ইবনু মুহাম্মদ আল-হাদী। আল-হাদী মারা যান ২৫৪ হিজরীতে। অবশেষে হাদীপুত্র হাসান ইবনু আলী তাদের নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন। হাসান ইবনু আলীর উপাধি ছিল 'আল-আসকারী'। ২৬০ হিজরীতে মুহাম্মদ নাম্নী পাঁচ বছরের এক শিশুসন্তান রেখে তিনিও পরকালে পাড়ি জমান।
বিগত এই বছরগুলোতে খেলাফতের বিরুদ্ধে চলমান বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে আহলে বাইত তালিবী ও পারসিক শুউবীরা সমানভাবে অংশগ্রহণ করে। তবে প্রত্যেক নেতার অবর্তমানে নেতৃত্বের ঝান্ডা তারা তুলে দিয়েছে সদ্যপ্রয়াত নেতার বড়োপুত্রের হাতে। আলী ইবনু মুসা রেজা থেকে হাসান আল-আসকারী পর্যন্ত নেতৃত্বের এই ধারা অব্যাহত ছিল। আলী ইবনু মুসার পূর্বে ঊর্ধ্বক্রম অনুসারে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁর বাবা মুসা আল-কাজিম, দাদা জাফর আস-সাদিক এবং পরদাদা মুহাম্মদ আল-বাকির। কিন্তু লক্ষ করার বিষয় হলো, উমাইয়া কিংবা আব্বাসী খেলাফতের বিরুদ্ধে এদের কেউ বিদ্রোহাত্মক নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হননি।
হাসান ইবনু আলী আল-আসকারী ২৬০ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর বিদ্রোহীরা মারাত্মক নেতৃত্ব সঙ্কটে পড়ে। কারণ, হাসান আল-আসকারীর পুত্র তখনও দুধের বাচ্চা। এরই মধ্যে শেষ ভরসা এ শিশুটির আকস্মিক মৃত্যুতে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। বিদ্রোহীরা সুযোগ বুঝে অসংখ্য দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে; ফলে দেখা দেয় নানা রকম মতবিরোধ। এসব বিরোধ যেমন ছিল রাজনৈতিক, তেমনই ছিল শরীয়তের বিধান ও আকীদা-কেন্দ্রিক।
বিদ্রোহীদের এতগুলো দল ও সম্প্রদায়ের মাঝে সর্বাধিক পরিচিতি ও প্রসিদ্ধি লাভ করে 'ইসনা আশারিয়া' সম্প্রদায়। বর্তমানে এ সম্প্রদায়ের অধিকাংশের বসবাস ইরান, ইরাক ও লেবাননে এবং এরাই শিয়াদের সকল দল ও উপদলের মাঝে জনসংখ্যায় সর্বাগ্রে।
তাদের এই বিভক্তি ভয়ংকর রূপ ধারণ করে তখন, যখন দলের নেতারা নিজেদের প্রয়োজনমতো ইসলামের বিধানের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়- আশয় সংযোজন করে; নিজ নিজ দলের সুযোগ-সুবিধার কথা মাথায় রেখে গ্রহণ করে নানান পদক্ষেপ; আর এর সবই সম্ভব হয়েছিল একজন সর্বজনীন নেতার অনুপস্থিতির সুবাদে। ইসলামের নামে তারা নিকৃষ্ট সব বিদআতের সূচনা করে। এরপর এসব বিদআতকে 'দীনের অপরিহার্য অংশ' বলে দাবি করে। একপর্যায়ে এগুলো তাদের আকীদা ও গঠনতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য হতে থাকে।
এসব বিদআতের মধ্যে 'ইমামত' তথা নেতৃত্ব-সংক্রান্ত বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর মাধ্যমে নেতৃত্ব সম্পর্কিত সকল সমস্যা সমাধানের ইচ্ছা পোষণ করে। তাই চারদিকে খুব জোর দিয়ে প্রচার করতে থাকে যে, ইমাম বা নেতা হওয়ার যোগ্য ছিলেন কেবল 'বারো জন মনীষী'; তাদের নাম যথাক্রমে: ১. আলী ইবনু আবু তালিব, ২. হাসান ইবনু আলী, ৩. হুসাইন ইবনু আলী, ৪. আলী যাইনুল আবিদীন ইবনু হুসাইন, ৫. মুহাম্মদ আল-বাকির ইবনু যাইনুল আবিদীন, ৬. জাফর আস-সাদিক ইবনু মুহাম্মদ আল-বাকির, ৭. মুসা আল-কাজিম, ৮. আলী আল-রিজা, ৯. মুহাম্মদ আল-জাওয়াদ, ১০. আলী আল-হাদী, ১১. হাসান ইবনু আলী আল-আসকারী, ১২. মুহাম্মদ ইবনু হাসান আল-আসকারী।
বারো ইমামের এ ধারণা থেকেই শিয়াদের একটি দল 'ইসনা আশারিয়া' নামে পরিচিত হতে থাকে। ইমামদের সংখ্যা সীমাবদ্ধ রাখতে তারা আরও একটি নতুন আকীদা প্রণয়ন করে। বলে, 'মুহাম্মদ ইবনু হাসান নামের শিশুটি এখনো মারা যায়নি; কোনো একটি পাহাড়ের গোহায় আত্মত্মগোপন করে হাজারও বছর ধরে বেঁচে আছে। যথাসময়ে ফিরে এসে সে উম্মাহর নেতৃত্বভার গ্রহণ করবে।'
কাল্পনিক এ শিশুটিই তাদের মতে প্রতিশ্রুত ইমাম 'মাহদী'। তারা এমন দাবিও করে যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বারোজন ইমামের ব্যাপারে নাম ধরে ওয়াসিয়ত করে গেলেও সাহাবায়ে কেরাম তা গোপন করেছেন। এ কারণেই তাদের মতে অধিকাংশ সাহাবী কাফের এবং বাকিরা ফাসেক। কেননা তারা জেনেশুনে ইমামদের প্রসঙ্গে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গোপন করেছেন। (নাউজুবিল্লাহ!)
এরপর তারা পারসিক চিন্তাধারা থেকে আনীত উত্তরাধিকারসূত্রে ক্ষমতা বণ্টনের বিষয়টি ইমামদের নামে চালিয়ে দেয়; দাবি করে, আলী ইবনু আবু তালিব থেকে নিয়ে পরবর্তী সময়ে যারাই নেতৃত্ব দিয়েছেন, প্রয়াণের পর তাদের জ্যেষ্ঠ পুত্রই ছিলেন অবিসংবাদিত নেতা। অথচ আমরা সকলেই জানি, ইসলামে এমন কিছুর কোনো ভিত্তি নেই। এমনকি ইসলামী সাম্রাজ্যগুলোতে সুন্নীদের দ্বারা গঠিত ও পরিচালিত খেলাফতব্যবস্থা তথা, উমাইয়া, আব্বাসী, সেলজুকী, আইউবী ও উসমানী খেলাফতে উত্তরাধিকারসূত্রে ক্ষমতাপ্রাপ্তির ধারা অব্যাহত থাকলেও তাদের কেউই কখনো এটিকে ধর্মীয় বিধান বলেননি বা তারা এটিকে বংশগত অধিকার বলে মনে করতেন না।
পারসিক মতাদর্শ থেকে আমদানিকৃত তাদের আরও একটি নিকৃষ্ট আকীদা হলো, শাসককে নিষ্পাপ জ্ঞান করা। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী ইমামরা নিষ্পাপ; উল্লিখিত সকল ইমাম সব গুনাহ থেকে পবিত্র। ফলে ইমামদের বক্তব্য তাদের কাছে কুরআন ও হাদীসের মতোই গ্রহণযোগ্য। এমনকি, এখনো পর্যন্ত তাদের কাছে শরীয়তের বিধান বলতে যা মান্য ও গ্রহণযোগ্য, এর প্রায় সবই নাকি ইমামদের বাণী থেকে গৃহীত; যদিও বাস্তবে সেগুলো হয়ে থাক ইমামদের মুখনিঃসৃত কিংবা তাঁদের নামে আরোপিত।
আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে ইরানী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা জনাব খোমেনী নিজ গ্রন্থ আল-হুকুমাতুল ইসলামীয়াতে বলেন, 'আমাদের মতবাদের একটি আবশ্যিক বিশ্বাস এই যে, আমাদের প্রত্যেক ইমাম এমন উচ্চ মর্যাদার অধিকারী যে, প্রথম সারির কোনো ফেরেশতা কিংবা নবী-রাসূলের পক্ষেও সে মর্যাদা লাভ করা সম্ভব হয়নি।'
এই সূত্রে তারা প্রায় সকল সাহাবীর প্রতি মারাত্মক বিদ্বেষ পোষণ করে। মাত্র কয়েকজন সাহাবী তাদের বিষোদগার থেকে রেহাই পেয়েছেন; যাঁদের সংখ্যা হবে সর্বোচ্চ তেরো। অত্যন্ত আফসোস ও পরিতাপের বিষয় এই যে, তাদের এ নগ্ন থাবা থেকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবারভুক্তরাও মুক্তি পাননি। নবীজির চাচা হযরত আব্বাস ও চাচাতো ভাই আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমার দিকেও নিক্ষেপিত হয়েছে শত্রুতার তির। অথচ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষায়, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস হলেন 'হিবরুল উম্মাহ' বা 'জ্ঞানে-গুণে উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব'।
এ কথা সকলেরই জানা, তারা এই মহান দুই সাহাবীর বিরুদ্ধে বিষোদগারে লিপ্ত হয়েছে, এমনকি তাদেরকে কাফের পর্যন্ত বলেছে কেবল এ কারণেই যে, আব্বাসী খলীফাদের সাথে ইসনা আশারিয়া সম্প্রদায়ের মতবিরোধ ছিল। অথচ আব্বাসী খেলাফত প্রতিষ্ঠার কতকাল আগেই তাঁরা দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। আরও একটি নিকৃষ্ট বিদআত ছিল সে সময়ের অধিকাংশ ইসলামী সাম্রাজ্যকে 'দারুল কুফুর' দাবি করা। এই দাবির আলোকে মক্কা, মদীনা, সিরিয়া ও মিশরের মুসলমানরা ছিল তাদের কাছে কাফের। এমন উদ্ভট দাবিকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে নির্জলা মিথ্যা বলতেও তাদের কোনো দ্বিধা ছিল না। এমনকি, এসব মিথ্যাই তাদের কাছে ধর্মীয় অপরিহার্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। তাদের মৌলিক গ্রন্থসমূহ যেমন: আল-কাফী, বিহারুল আনওয়ার, তাফসিরুল কুম্মী, তাফসিরুল আয়্যাশী, আল-বুরহান ইত্যাদিতে এখনো এসব নিকৃষ্ট মিথ্যা বিদ্যমান।
কেবল সাহাবীরাই নয়; আহলুস সুন্নাহর সকল মনীষীই তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য; উম্মাহর মহান ব্যক্তিদের রেখে যাওয়া জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থগুলোও তাদের কাছে প্রত্যাখ্যাত; 'সিহাহ সিত্তাহ' বা হাদীসের বিশুদ্ধ ছয় কিতাবসহ সকল হাদীসগ্রন্থই তাদের কাছে পরিত্যক্ত। ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম তিরমিযী, ইমাম নাসাঈ থেকে শুরু করে ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলের মতো মহান ইমামগণ যেমন তাদের কাছে তুচ্ছ; তেমনই খালিদ ইবনু ওয়ালীদ, সা'দ ইবনু আবু ওয়াক্কাস, উমর ইবনু আব্দুল আযিয, মুসা ইবনু নুসাইর, নুরুদ্দীন মাহমুদ, সালাহুদ্দীন, কুতুয এবং মুহাম্মদ আল-ফাতিহের মতো বীর সেনারাও অতি সামান্য।
সাহাবী ও তাবেয়ীদের থেকে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন এবং হাদীস ও তাফসীরের কিতাব-পত্র প্রত্যাখানের পাশাপাশি তারা গ্রহণ করেছিল উল্লিখিত ইমামদের দিকে সম্পৃক্ত এমন কিছু কথামালা— যেগুলো যারপরনাই দুর্বল সূত্রে বর্ণিত। ফলে তাদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে নানা রকমের বিদআত; যার কোনোটি আকীদাগত, কোনোটি ইবাদত সম্পর্কিত, কোনোটি পারিবারিক ও সামাজিক জীবনযাপনের রীতিনীতির অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া আরও বিভিন্ন প্রকারের বিদআত তাদের মাঝে চর্চিত হতে থাকে, যেসবের সঙ্গে ইসলামী শরীয়তের ন্যূনতম সম্পর্কও নেই।
এখানে এই স্বল্প পরিসরে তাদের সকল বিদআত নিয়ে আলোচনা উদ্দেশ্য নয়। কারণ সেজন্য একাধিক গ্রন্থ রচনার প্রয়োজন পড়বে। এজন্য এখানে কেবল সমস্যার মৌলিক দিকগুলো তুলে ধরব; যাতে শাখাগত বিষয়-আশয় খুব সহজেই অনুধাবন করা যায়। অন্যথায় তাকিয়া, পুনর্জনম, কুরআন বিকৃতি নিয়ে বিভ্রান্তি, আল্লাহর সম্পর্কে নিকৃষ্ট আকীদা, মাজারে নানা রকম কুসংস্কারের চর্চা, হযরত হুসাইনের শাহাদাত দিবস-কেন্দ্রিক নানা রকম অসারতা-এমন হাজারও বিদআত ইসনা আশারিয়াদের কাছে ধর্মীয় মৌলিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত—সেসব নিয়ে কথা বলতে গেলে আলোচনা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে।
উল্লিখিত বিষয়গুলো কেবল ইসনা আশারিয়া শিয়াদের মতাদর্শের একাংশ। সে যুগে ইসনা আশারিয়া ছাড়াও অনেক দল-উপদলের আবির্ভাব ঘটেছিল। ইতিহাসের পাতায় 'হাইরাতুশ শিয়া' বা 'শিয়াদের কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা' শিরোনামে যে সময়ের কথা আলোচিত হয়েছে, তা এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে স্মরণীয়। সে দুরবস্থার সূচনা হয়েছিল হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি, তাদের এগারোতম ইমাম হাসন আল-আসকারীর ইন্তেকাল-পরবর্তী সময়ে।
এ সময় শিয়ারা তাদের গ্রন্থরচনা ও প্রচারণার কাজ শুরু করে। এতে তাদের আকীদা ও চিন্তাধারা মানুষের মনে মজবুত হতে থাকে। এরপর বিশেষভাবে পারস্যাঞ্চলে এবং সাধারণভাবে সমগ্র ইসলামী বিশ্বে তাদের মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। যদিও তখনও পর্যন্ত এই মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে স্বতন্ত্র কোনো রাষ্ট্র গড়ে উঠেনি, কিন্তু হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর শেষ ও চতুর্থ শতাব্দীর শুরুর দিকে একের-পর-এক বিপর্যয় ঘটতে থাকে, যে কারণে বেশকিছু এলাকার শাসন-ক্ষমতা শিয়াদের হাতে চলে যায়। মুসলিম উম্মাহর মাঝে যার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া ছিল খুবই ভয়ংকর ও সুদূরপ্রসারী।
যে কথাটি পুনরুক্ত না করলেই নয় তা হলো, কোনো বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করা মূলত সে বিষয়ে রাখা ভাবনারই অংশ। তাই কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চাইলে অবশ্যই সে বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করতে হবে; খুব ভালোভাবে জেনেই কেবল কোনো প্রসঙ্গে বৈধতা-অবৈধতা ঘোষণা দেওয়া যাবে, কদর্য ও উত্তমতা নির্ণয় করা সম্ভব হবে। অন্যথায়, পড়াশোনা ও গবেষণা থেকে মুক্ত, আবেগতাড়িত কথামালা তো কেবল ক্ষতিই বয়ে আনবে।
টিকাঃ
১. দলছুট সম্প্রদায়।
১. বর্তমান ইরান
১. খোমেনি কৃত আল-হুকুমাতুল ইসলামিয়া, পৃষ্ঠা: ২৫
📄 প্রবন্ধ : শিয়াদের প্রভাব-প্রতিপত্তির বিস্তার
'শিয়াদের গোড়ার কথা' প্রবন্ধটি অধ্যয়নে পাঠক বেশ অবাক হয়েছেন; তাদের মন্তব্য থেকে সে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই, ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে কেবল ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা বলে যাওয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়; বরং ইতিহাস থেকে উপদেশ গ্রহণের নিমিত্তে এর শিক্ষণীয় দিকগুলোও আমরা তুলে ধরতে চাই; যাতে করে আমাদের পক্ষে সমসাময়িক সমস্যার সমাধানে সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
এ কারণে মুসলিম উম্মাহর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস থেকে বর্তমান প্রজন্মের বিমুখতা অপরাধ বলেই গণ্য করা যায়। কেননা, ইতিহাস অধ্যয়ন থেকে বিরত থেকে আমরা নিজেদের কেবল বঞ্চিতই করছি। অথচ পূর্ববর্তী উম্মতের ঘটনাবলি জানার ব্যাপারে আমরা আদিষ্ট হয়েছি, যেন তা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা আমরা আমাদের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারি। কুরআন কারীমে এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, فَاقْصُصِ الْقَصَصَ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ '(হে নবী) আপনি (তাদের কাছে পূর্ববর্তীদের) ঘটনাসমূহ বর্ণনা করুন; হয়তো তারা চিন্তাভাবনা করে দেখবে।'
সুতরাং, ইতিহাসের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকা ঘটনাগুলো কেবল আলোচনার মাঝেই নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না; বরং তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করতে হবে; খুঁজে বের করতে হবে জ্ঞানের এমন উপাদান, যা বর্তমানের জন্য হবে উপকারী, ভবিষ্যতের জন্য হবে সঠিক পথের দিশারি।
প্রিয় পাঠক, শিয়াদের নিয়ে আমার এবারের আলোচনার প্রারম্ভে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে রাখতে চাই :
এক. এই আলোচনাটি যথাযথভাবে বুঝতে হলে 'শিয়াদের গোড়ার কথা' শীর্ষক প্রবন্ধটি অবশ্যই আপনার পাঠে থাকতে হবে। কারণ, সেখানে শিয়াদের উৎপত্তির ইতিহাসের পাশাপাশি আকীদাগত দিকও কিছুটা আলোচিত হয়েছে, যার ওপর নির্ভর করছে আগত ঘটনাপ্রবাহ বোঝার বিষয়টি।
দুই. এখানে আমরা কেবল বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত ঘটনাগুলোই যথাযথভাবে উল্লেখ করতে চেষ্টা করব। শিয়াদের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান এবং তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ধরন নিয়ে চূড়ান্ত কিছু বলব না।
ফিরে আসি শিয়াদের গল্পে... শিয়াদের এগারোতম ইমাম হযরত হাসান আল-আসকারীর ইন্তেকালে পর তারা মারাত্মক সংকটের সম্মুখীন হয়। ইতিহাসের পাতায় এ সময়টি 'হায়রাতুশ শিয়া' বা 'শিয়াদের কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা' শিরোনামে উল্লেখিত হয়েছে। এ সময়ে তারা অনেক দল ও উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং নিজেদের পছন্দমতো ধর্মীয় মতাদর্শ ঠিক করে নেয়। তবে সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক উৎকর্ষতা লাভের বিষয়টি সবার কাছেই ছিল সর্বাগ্রে।
শিয়াদের দলগুলোর মাঝে 'ইসনা আশারিয়া' বা 'বারো ইমাম পন্থি' দলটি ছিল সবচেয়ে প্রসিদ্ধ। বিগত প্রবন্ধে তাদের আলোচনা কিছুটা করা হয়েছে। তবে মাঠে তারা একাই সক্রিয় ছিল না; তাদের সাথে আরও একটি খতরনাক দল মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। 'ইসমাঈলিয়া' নামের এ দলটির আত্মপ্রকাশ মুসলিম উম্মাহর মাঝে মারাত্মক ভীতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
ইসমাঈলিয়া শিয়ারা ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের পথভ্রষ্ট। অধিকাংশ আলেম-ওলামার মতেই তারা মুসলিম নয়। জনৈক ধূর্ত ইহুদীর মাধ্যমে এ দলটির উৎপত্তি ঘটে। ইসলামের বিরুদ্ধে ভয়ংকর চক্রান্তের পরিকল্পনা নিয়ে মাইমুন আল-কাদ্দাহ নামের সে লোকটি প্রথমে ইসলাম প্রকাশ করে মুসলিম সমাজে আশ্রয় গ্রহণ করে। কিন্তু তার মুখে ইসলামপ্রীতি থাকলেও অন্তরজুড়ে ছিল সীমাহীন মুসলিমবিদ্বেষ।
খুব কায়দা করে সে জাফর আস-সাদিকের পৌত্র মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈলের সংস্পর্শে আসে এবং কিছুকাল তার কাছে অবস্থান করে। উল্লেখ্য, মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈল ছিলেন ইসনা আশারিয়াদের ষষ্ঠ ইমাম জাফর আস-সাদিকের নাতি এবং সপ্তম ইমাম মুসা আল-কাজিমের ভাতিজা; সর্বোপরি আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত।
মাইমুন আল-কাদ্দাহ এক অদ্ভুত বিষয়ের অবতারণা করে—যা ছিল মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা অংশ। আমল- আকীদা বিধ্বংসী এ পরিকল্পনা তার মৃত্যুর কয়েক দশক হলেও বাস্তবতার মুখ দেখেছিল। মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈলের ছেলের নাম ছিল আব্দুল্লাহ। মাইমুন নিজেও তার ছেলের নাম আব্দুল্লাহ রাখে, সঙ্গে তার উত্তরসূরিদের নাম মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈলের উত্তরসূরিদের নামানুসারে রাখার ব্যাপারে ওয়াসিয়ত করে। তার ইচ্ছা ছিল কয়েক দশক পর তার উত্তরসূরিরা নিজেদেরকে মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈল ইবনু জাফর আস-সাদিকের বংশধর হিসেবে আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত দাবি করবে।
শুধু তাই নয়, তারা এ দাবিও করবে যে, 'মুসলিম উম্মাহর সর্বোচ্চ নেতা' মুসা আল-কাজিম ইবনু জাফর আস-সাদিকের বংশ থেকে নয়, বরং ইসমাঈল ইবনু জাফর আস-সাদিকের বংশ থেকেই হওয়া আবশ্যক। ওদিকে ইসনা আশারিয়াদের দাবি এর ঠিক উল্টো। ইহুদী মাইমুন আল-কাদ্দাহর সকল ইচ্ছা একের-পর-এক বাস্তবায়িত হয়। তার পরিকল্পনা অনুসারে একসময় প্রতিষ্ঠা পায় ইসমাঈলিয়া সম্প্রদায়। মাইমুনের উত্তরসূরিরা এ সম্প্রদায়ের মতাদর্শ নিজেদের পছন্দমতো সাজিয়ে নেয়—যাতে স্থান পায় ইসলামবিরোধী যত আকীদা-বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনার। মৌলিক কিংবা সামগ্রিক—কোনো বিবেচনায়ই তাতে ইসলামের কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।
তাদের ভ্রান্ত মতবাদ ও মতাদর্শের মাঝে সবচেয়ে মারাত্মক বিষয়টি ছিল শাসকদের মাঝে আল্লাহর অবতরণের বিশ্বাস। এর ওপর ভিত্তি করে তারা শাসককে খোদা মনে করত। পুনর্জীবনের প্রতিও ছিল তাদের অগাধ বিশ্বাস। তাদের ধারণা, মৃত্যুর পর সকল মানুষের আত্মা বিশেষত শাসকদের আত্মা অন্য কারও দেহে নতুন জীবন নিয়ে ফিরে আসে; সুতরাং বিগত সকল ইমাম অবশ্যই পৃথিবীতে পুনরায় আগমন করবেন।
এখানেই শেষ নয়, স্বেচ্ছাচারিতা ও নৈরাজ্যতার সকল সীমা ছাড়িয়ে তারা সাহাবীদের প্রতি জঘন্য অপবাদ আরোপ করতে থাকে। এমনকি, তাদের বিষোদগার থেকে রক্ষা পাননি স্বয়ং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম; অথচ এরাই আবার দিনশেষে তাঁর উত্তরসূরি হওয়ার দাবিদার! তাদের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল সমগ্র বিশ্বে আহলুস সুন্নাহর অনুসারী শাসকদের পরাস্ত করা—যাতে করে তাদের সামনে আর কারও দাঁড়ানোর সুযোগ না থাকে। এ বিষয়ে অচিরেই আমরা সবিস্তার আলোচনা করব।
ইসমাঈলিয়া সম্প্রদায়ের ধ্বংসাত্মক মতাদর্শ ব্যাপক উদ্যোমের সাথে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বরাবরের মতো অজ্ঞ ও মূর্খদের মাঝেই এ জঘন্য মতবাদ জনপ্রিয়তা লাভ করে। এ ক্ষেত্রে আহলে বাইতের প্রতি জনসাধারণের ভক্তি ও দুর্বলতার দিকটি তারা সুকৌশলে কাজে লাগায়। এভাবে একপর্যায়ে তাদের দলের লোকেরা সত্যি সত্যিই তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তরসূরি ভেবে নেয়।
তাদের এই আহ্বানে পারসিকরা ব্যাপকভাবে সাড়া দেয়। যারা ছিল মুখে মুখে ইসলামপ্রেমী এবং মনে মনে অগ্নিপূজারি। এদের মাঝে একজনের নাম ছিল হুসাইন আল-আহওয়াযী। এ লোকটি ছিল ইসমাঈলিয়া মতবাদের প্রসিদ্ধ আহ্বায়ক ও প্রথম সারির নেতা। বসরায় বসবাসকারী এ লোকটির সাথে সাক্ষাৎ হয় ইসলামের ইতিহাসের আরেক নিকৃষ্ট ব্যক্তির সাথে, যার নাম ছিল হামদান ইবনু আশয়াস। এ হতভাগার পূর্বসূরিরা ছিল পারস্যের অগ্নিপূজারি বা বাহরাইনের ইহুদী।
হামদান ইবনু আশয়াস সুযোগ বুঝে 'কারমাত' উপাধি গ্রহণ করে। এরপর সময়ের ব্যবধানে 'কারমাতি' (বহুবচনে কারামিতা) নামে একটি আলাদা দল গঠন করে। যদিও এরা ইসমাঈলিয়া মতবাদের অনুসারী উপদল ছিল; কিন্তু আচরণ ও উচ্চারণে ছিল তাদের চেয়েও ভয়ংকর। তাদের কাছে যেমন সম্পদের নির্দিষ্ট মালিকানা ছিল না, তেমনই নারী সম্ভোগেরও ছিল না সাধারণ কোনো নীতিমালা। জিনা-ব্যভিচার, চুরি-ডাকাতি, খুন-লুণ্ঠনের মতো জঘন্য ও অমানবিক কাজ-কর্মও তাদের কাছে ছিল বৈধ। এই সুবাদে চারপাশের চোর, ডাকাত, বিদ্রোহী ও সন্ত্রাসীরা দলে দলে তাদের মতাদর্শ গ্রহণ করতে থাকে। এভাবে ধীরে ধীরে ইসলামের ইতিহাসে এক ভয়ংকর সন্ত্রাসী সম্প্রদায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ঐতিহাসিক এমন আরও অসংখ্য উত্থান-পতনের ঘটনা ঘটেছে, যার সবগুলো এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। এ সময়ে শিয়ারা বড়ো বড়ো তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রতিটি দলই নিজেদেরকে সর্বাধিক সত্যানুসারী বলে দাবি করত। কিন্তু আকীদা-বিশ্বাস থেকে শুরু করে সাধারণ বিধি-বিধানেও তাদের মাঝে যথেষ্ট মতপার্থক্য বিদ্যমান ছিল। শিয়াদের সে প্রধান তিনটি দল হলো ইসনা আশারিয়া, ইসমাঈলিয়া ও কারামাতিয়া। সামগ্রিকভাবে এই তিন দলের সঙ্গে যেমন আহলুস সুন্নাহর বিরোধ ছিল, তেমনই তাদের নিজেদের মাঝেও ছিল সম্পর্কের টানাপোড়েন। তাদের এক দল অপর দলকে খুব একটা দেখতে পারত না। সর্বপরি শিয়াদের এ তিন দলের প্রত্যেকটিই ছিল প্রবৃত্তির পূজারি ও বিদআতের অনুসারী।
ইতিহাসের এই পর্যন্ত শিয়ারা যা কিছু ঘটিয়েছে, তাতে কেবল মুসলিম উম্মাহর মাঝে অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠাই বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও তখন শিয়াদের হাতে শাসনক্ষমতা ছিল না, তবু চলমান কিছু বিষয় ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। এরপর হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর শেষ ও চতুর্থ শতাব্দীর শুরুর দিকে একের-পর-এক মহাপ্রলয়ঙ্করী ঘটনা ঘটতে থাকে; যা মুসলিম উম্মাহকে ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়।
উল্লিখিত তিনটি দলের মাঝে কারমাতিরা সবার আগে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়। কারণ তাদের দলে ছিল অসংখ্য দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। তাদের প্রথম সারির এক নেতার নাম ছিল রুস্তম ইবনুল হুসাইন। সে ইয়েমেনে গিয়ে স্বতন্ত্র কারমাতি সাম্রাজ্য কায়েম করে। অতঃপর বিভিন্ন রাজ্যের মানুষের কাছে পয়গাম পাঠাতে শুরু করে। এই সুবাদে একসময় কারমাতি মতাদর্শের বার্তা মরক্কো পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কিন্তু কিছুদিন যেতে-না-যেতেই তাদের এই সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। যদিও এর পাশাপাশি 'জাজিরাতুল আরব' বা 'আরব উপদ্বীপ' এবং বিশেষভাবে এর পূর্বাংশে কারমাতিদের ব্যাপক উত্থান ঘটে। একপর্যায়ে এই অঞ্চলেও তারা একটি সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। যাতে মুসলমানদের জান-মালের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। কারমাতিদের হাতে হাজিদের প্রাণ হারানোর ঘটনা থেকে সে পরিস্থিতির ভয়াবহতা কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যায়।
তাদের যাবতীয় কুকীর্তির মাঝে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুতর ছিল ৩১৭ হিজরীতে 'তারবিয়া দিবস' তথা: জিলহজ মাসের ৮ তারিখে মসজিদুল হারামে অবস্থানরত সকল হাজিকে হত্যা করা এবং মারাত্মক অসম্মানপূর্বক 'হাজরে আসওয়াদ' চুরি করা। চুরিকৃত হাজরে আসওয়াদকে তারা তাদের রাজধানী পূর্ব-জাজিরায় প্রেরণ করে। সেখানে পূর্ণ ২২ বছর থাকার পর ৩৩৯ হিজরীতে পবিত্র এ প্রস্তরটি আপন স্থান ফিরে পায়।
এদিকে ইসমাঈলিয়ারা মরক্কোর ভূমি নিজেদের অনুকূলে পেয়ে যায়। সেখানে রুস্তম ইবনুল হুসাইন ইয়েমেন থেকে কারমাতি মতাদর্শের বার্তা ছড়িয়ে রেখেছিল। এটি সে করেছিল আবু আবদুল্লাহ আশ-শিয়ী নাম্নী এক লোকের মাধ্যমে। উল্লেখ্য, ইসমাঈলিয়া ও কারমাতি উভয় দলই ইসমাঈল ইবনু জাফর আস-সাদিকের ইমামাত বা নেতৃত্বে বিশ্বাসী। এই সুবাদে মাইমুন আল-কাদ্দাহের উত্তরসূরি উবাইদুল্লাহ ইবনুল হুসাইন নামের এক লোক মরক্কোতে স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য কায়েমের অভাবনীয় সুযোগ পেয়ে যায়। এবং সুযোগটি সে যথাযথভাবে কাজেও লাগায়। প্রথমে সে তার অনুসারীদের নিয়ে ইসমাঈলিয়া সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ঘোষণাই দেয়। কিন্তু এরপর সে 'মাহদী' উপাধি ধারণ করে এবং নিজেকে ইসমাঈলী পয়গামের ইমাম দাবি করে। তারপর দাবি করে যে, সে মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈল ইবনু জাফর আস-সাদিকের উত্তরসূরি এবং তার আগে মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈল পর্যন্ত তার পূর্বপুরুষদের সকল ইমাম সুপ্ত ছিলেন।
এমন নাটকীয় ইমামত ও সাম্রাজ্যের প্রতি জনসাধারণের সমর্থন পাওয়া মুশকিল। তাই তাদেরকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে এর নাম দেওয়া হয় 'ফাতিমী সাম্রাজ্য'। নামকরণটি ছিল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্যা হযরত ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহার নামানুসারে। অথচ ওই হতভাগার পূর্বসূরিরা ছিল ইহুদী। মূর্খদের আবেগকে পুঁজি করে তাদের এই মতাদর্শ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে; সাথে হতে থাকে তাদের ক্ষমতার বিস্তার। কিছুদিনের মধ্যে সমগ্র উত্তর আফ্রিকা তাদের আয়ত্তে চলে যায়। নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে তারা ছড়িয়ে দেয় নানা রকম বিদআত, কুসংস্কার ও সাহাবা-বিদ্বেষ। এ ছাড়া স্রষ্টার অবতরণ, শাসকদের পুনর্জনম ইত্যাদি ভ্রান্ত আকীদা তো ছিলই।
কথিত এই ফাতিমী সাম্রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধি পেতে পেতে একসময় মিশরকেও গ্রাস করে নেয়। ঘটনাটি ঘটে ৩৫৯ হিজরী সালে 'মুইয লি-দ্বীনিল্লাহ আল-উবাইদী'র শাসনামলে সেনাপতি জাওহার সিসিলি ইসমাঈলীর হাতে। এরপর মুইয মিশরে গিয়ে কায়রো শহর ও আল- আযহার মসজিদ প্রতিষ্ঠা করে। আল-আযহার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল ইসমাঈলি শিয়া মতাদর্শের প্রসার ঘটানো। কিন্তু এসব কাজে একমাত্র অন্তরায় ছিল আহলুস সুন্নাহর আলেমগণ। তাই তারা অন্যায়ভাবে তাঁদেরকে হত্যা করে; জনসম্মুখে প্রকাশ করে ভয়ংকর সাহাবা-বিদ্বেষ।
মুইয-পরবর্তী শাসকরা তার পথেই হেঁটেছে। কেউ কেউ আবার এতটাই উদ্ভ্রান্ত ছিল যে, নিজেকে খোদা পর্যন্ত দাবি করে ফেলেছে। এদের মাঝে প্রসিদ্ধ হলো আল-হাকিম বি-আমরিল্লাহ। নিজেদের মতাদর্শ প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে তারা অসংখ্য মসজিদ নির্মাণ করে। মিশর, সিরিয়া ও হিজাজের পবিত্র ভূমি দুইশ বছর পর্যন্ত পরাধীন করে রাখে। অবশেষে ৫৬৭ হিজরীতে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম মুসলিম বীর সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী তাঁদের বিতাড়িত করতে সক্ষম হন। তিনি ইসমাঈলিয়াদের কবল থেকে মিশরকে মুক্ত করেন।
শিয়াদের তৃতীয় দল ইসনা আশারিয়া। এরাও অসংখ্য বিদআতে নিমজ্জিত। কিন্তু তাদের ভ্রান্তি উল্লিখিত দুই দলের তুলনায় কিছুটা কম। তারা আল্লাহ তাআলা, তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও পারলৌকিক জীবনের প্রতি বিশ্বাস রাখে। কিন্তু সমস্যা হলো, ধর্মকে তারা নানা রকম বিদআত ও কুসংস্কার দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে। তাদের নেতৃস্থানীয় কয়েকজন লোক পারস্য ও ইরাকের বিভিন্ন এলাকার ক্ষমতাসীন পরিবারের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলে। এই সুযোগে পরবর্তী সময়ে তারা বেশ কয়েকটি অঞ্চলের মসনদ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
শিয়া নেতারা পারসিক বংশোদ্ভূত বনু সামান পরিবারের সুদৃষ্টি লাভে সমর্থ হয়। এই সুযোগে নেতারা তাদের মাঝে শিয়া মতাদর্শের বীজ বপন করে। তৎকালীন পারস্য তথা বর্তমান ইরানের বিশাল অঞ্চল ছিল বনু সামান সাম্রাজ্যের অধীনে। এ সাম্রাজ্য ২৬১ হিজরী থেকে ৩৮৯ হিজরী পর্যন্ত স্থায়িত্ব লাভ করে। দীর্ঘ সময়ে তাদের মাঝে শিয়া মতবাদ ছড়িয়ে পড়ে; কিন্তু প্রকাশ্য চর্চা আরম্ভ হয় চতুর্থ শতাব্দীর শুরুর দিকে।
একইভাবে তারা বনু হামদান পরিবারের সঙ্গেও সখ্যতা গড়তে সক্ষম হয়। এরা ছিল আরব বংশোদ্ভূত বনু তাগলিবের শাখা। তারা ৩১৭ হিজরী থেকে ৩৬৭ হিজরী পর্যন্ত ইরাকের মুসেল শহর শাসন করে। ৩৩৩ হিজরী থেকে ৩৯২ হিজরী পর্যন্ত সিরিয়ার আলেপ্পো শহরটিও তাদের আওতাধীন ছিল। তাদের মিত্রদের মধ্যে সবচেয়ে খতরনাক ছিল পারসিক বংশোদ্ভূত বনু বুওয়াই পরিবার। পারস্যে তারা স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য কায়েম করতে সক্ষম হয়। ৩৩৪ হিজরীতে আব্বাসী খেলাফতের ওপর আগ্রাসন চালিয়ে নামমাত্র খলীফাকে বহাল রাখে; উদ্দেশ্য ছিল, সান্ত্বনা প্রদানপূর্বক সুন্নী মুসলিমদের অভ্যুত্থান এড়িয়ে যাওয়া। এভাবে ৩৩৪ হিজরী থেকে ৪৪৭ হিজরী পর্যন্ত এক শতাব্দীর বেশি সময়কাল তারা আব্বাসীদের পরাধীন করে রাখে। অবশেষে সেলজুক সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হলে তাদের সাহায্যে ইরাকের ভূমি শিয়াদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।
দীর্ঘ এ শাসনামলে শিয়ারা সাহাবায়ে কেরাম ও আহলুস সুন্নাহর অনুসারী আলেম-ওলামা ও খলীফাদের প্রতি যারপরনাই বিদ্বেষ প্রকাশ করেছে। এমন কোনো নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য আচরণ নেই যা তারা তাঁদের সঙ্গে করেনি। সাহাবীদের নামে গালমন্দ লিখে তারা মসজিদের দরজায় ঝুলিয়ে রেখেছে; হযরত আবু বকর ও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমার মতো মহান সাহাবীদের বিরুদ্ধে জুমার খুতবায় বিষোদগার করেছে। সত্যি, ইসলামের ইতিহাসে মুসলিম উম্মাহর এমন দুঃসময় খুব কমই এসেছে।
ইতিহাস অধ্যয়ন করে আমরা জানতে পারি, হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর পুরোটা জুড়ে ছিল শিয়াদের জয়জয়কার। ইরানের কিয়দংশ ও সম্পূর্ণ ইরাক ছিল বনু বুওয়াইর দখলে; ইরানের পূর্বাঞ্চল, আফগানিস্তানের কিছু অংশ এবং তৎকালীন ইসলামী বিশ্বের পূর্বাংশ ছিল বনু সামানের অধীনে; মুসেলের কিয়দংশ এবং আলেপ্পো ছিল বুন হামদানের নিয়ন্ত্রণে। ওদিকে কারমাতিদের রাজত্ব বিস্তৃত ছিল আরব উপদ্বীপের পূর্বাংশে। তাদের হিংস্র থাবা কখনো পড়ত গিয়ে হিজাজ, দামেশক ও ইয়েমেনে।
এদিকে আফ্রিকার সকল মুসলিম রাজ্যগুলো ছিল কথিত ফাতিমী তথা, উবাইদিয়া সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন। আফ্রিকার রাজ্যগুলোর পাশাপাশি তাদের কব্জায় ছিল সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিন। হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর শেষের দিকে কারমাতি সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে। বনু বুওয়াইর শাসনামল সমাপ্ত হয় ৪৪৭ হিজরীতে। আর উবাইদিয়া সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যায় ৫৬৭ হিজরীতে। অতঃপর সমগ্র ইসলামী বিশ্বে সুন্নী মুসলিমদের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর যদিও পারস্য ও ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসনা আশারিয়া চিন্তাধারা বিদ্যমান ছিল, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আর তাদের হাতে ছিল না।
৯০৭ হিজরী পর্যন্ত এভাবেই কেটে যায়। এরপর ইসনা আশারিয়া মতাদর্শের অনুসারী ইসমাঈল আস-সাফাভী নামের এক ব্যক্তি ইরানে 'সাফাভিদ' সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। তাবরিজ শহরকে রাজধানী করে শিয়াদের এ নতুন সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করতে থাকে; এমনকি, একপর্যায়ে উসমানী সাম্রাজ্যের অন্তর্গত পাশ্ববর্তী সুন্নীদের ওপর হামলে পড়ে; উসমানীদের নিঃশেষ করে দেওয়ার লক্ষ্যে পর্তুগিজদের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তিও করে। তারা উসমানী সাম্রাজ্যের আওতাধীন ইরাকের কিছু এলাকা দখল করে সেখানে শিয়া মতাদর্শ প্রচার করতে শুরু করে।
এরপর ৯২০ হিজরীতে সাফাভিদ ও উসমানীদের মাঝে ঐতিহাসিক 'চালডিরেন যুদ্ধ' সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে সুলতান প্রথম সালিম সাফাভিদদের বিরুদ্ধে লড়েন এবং যুদ্ধে জয়লাভ করে তাদেরকে ইরাক থেকে বিতাড়িত করেন। দিন অতিবাহিত হতে থাকে; চলতে থাকে সাফাভিদ-উসমানী সংঘর্ষ। অধিকাংশ সময় এ সংঘর্ষগুলো হতো ইরাকের শহরগুলোতে। সাফাভিদ শাসনামল তথা, ৯০৭ হিজরী থেকে ১১৪৭ হিজরী পর্যন্ত পরিস্থিতি এমনই ছিল।
তাদের পতনমাত্রই সমগ্র ইরান খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়; বিভক্ত অঞ্চলগুলো নিয়ে উসমানী, রুশ, আফগান এবং সাফাভিদ শেষ সুলতান তৃতীয় আব্বাসের সেনাদের লড়াই চলতে থাকে। এরপর উসমানী সাম্রাজ্য দিনদিন নিস্তেজ হতে থাকে। ইউরোপীয় ও রুশরা তাদের ওপর কুকুরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফলে পশ্চিম ইরানের বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ তারা অনেকটাই হারিয়ে ফেলে। দুর্ভাগ্যবশত এসব অঞ্চলের এমন শাসকরা ক্ষমতায় আসে, যারা সুসম্পর্কের আড়ালে পশ্চিমাদের কাছে নিজেদের আত্মসম্মান বিসর্জন দিত অনায়াসে। এরা কখনো ইংরেজদের কাছে ধরনা দিত, কখনো ফরাসীদের সামনে হাত পাতত, কখনো-বা ভীক্ষার থালা বাড়িয়ে দিত রুশদের দিকে।
১১৯৩ হিজরী মুতাবেক ১৭৭৯ খ্রিষ্টাব্দে পারসিক বংশোদ্ভূত আগা মুহাম্মদ কাজার ইরানের ক্ষমতায় আসেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি শিয়া মতাবলম্বী হলেও ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের প্রতি দুর্বল ছিলেন। এজন্য ইসনা আশারিয়া মতবাদের দিকে কাউকে আহ্বান করতেন না; রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও এই মতাদর্শ সামনে রাখতেন না। আগা মুহাম্মাদের অবর্তমানে তার উত্তরসূরিরা শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকে। তাদের শাসনামলে মাঝে মাঝেই ইরানী সাম্রাজ্যের হ্রাস- বৃদ্ধির ঘটনা ঘটত। আগা-পরিবারের শাসকদের উপাধি ছিল 'শাহ'।
১৩৪২ হিজরী মুতাবেক ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দ সালে রেজা পাহলভী আগা- পরিবারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং নিজেকে 'শাহে ইরান' দাবি করেন। এ কাজটি তিনি করেছিলেন ইংরেজদের সহযোগিতায়। ইংরেজদের সাহায্য নিয়ে ক্ষমতায় এলেও পরবর্তী সময়ে বিরোধের জের ধরে ইংরেজরা ১৯৪১ সালে তাকে ঠিকই দেখে নিয়েছে। ফলস্বরূপ তার মসনদে বসিয়েছে তারই ছেলে মুহাম্মদ রেজা বিহলভীকে। বিহলভী ১৩৯৯ হিজরী মুতাবেক ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের নীতিতে ইরান শাসন করেন। অতঃপর ইরানে ইসনা আশারিয়া মতাদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে আয়াতুল্লাহ খোমেনীর নেতৃত্বে ইরানী বিপ্লব সংঘঠিত হয়।
এই হলো শিয়াদের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ ও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হওয়া থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ইসলামী বিশ্বে তাদের শাসনক্ষমতা পরিচালনার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। আশা করি এ আলোচনা থেকে আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, শিয়াদের উত্থান ছিল সুন্নী শাসনের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত এক বিদ্রোহস্বরূপ। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তারা ধর্মের মুখোশ পরে আহলে বাইতের প্রতি জনমানুষের ভক্তি ও বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে গেছে। সুদীর্ঘ এ সময়ে আমরা কখনই দেখিনি যে, শিয়াদের কোনো একটি দলের সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর চিরশত্রু ক্রুসেডার, রুশ, ইংরেজ, ফ্রান্স বা পর্তুগিজদের সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে; এমনকি তাতারিদের মতো দুর্ধর্ষ ত্রাসদের সঙ্গেও কখনো তাদের সংঘর্ষ হয়নি। উল্টো আমরা প্রত্যক্ষ করেছি যে, কীভাবে তারা ধাপে ধাপে একে অপরের দিকে সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
কিন্তু এরপরও আমরা বিনা বিচারে অতীত শিয়াদের আচরণের দায় বর্তমান শিয়াদের দেব না। আমরা বরং সমসাময়িক শিয়াদের আকীদা-বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা, পথ ও পদ্ধতি যাচাই করে দেখব। অতঃপর পূর্বসূরিদের আকীদা-মানহাজ যখন উত্তরসূরিদের মাঝে হুবহু পাওয়া যাবে, তখনই কেবল আমরা তাদেরকে চিহ্নিত করব, ত্রুটিযুক্ত বলব। তো, যখন আমরা দেখতে পাই অতীত-বর্তমান সকল শিয়া ইমামত তথা নেতৃত্বের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বংশের শর্ত আরোপ করছে, ইমামকে নিষ্পাপ বলছে, হযরত আবু বকর, উমর ও উম্মুল মুমিনীনসহ অন্যান্য সাহাবীদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে, তখন আর কোনোভাবেই তাদের প্রতি সুধারণা বহাল রাখা যায় না; এবং বাধ্য হয়ে বলতে হয়, উত্তরসূরিরা তাদের পূর্বসূরিদের পদাঙ্কই অনুসরণ করছে।
প্রিয় পাঠক, এবার বলুন তো! শিয়াদের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান কী হতে পারে? তাদের সাথে আমাদের আচরণ-উচ্চারণ কেমন হওয়া উচিত? কিছু বলা, নাকি না বলা? কোনটি শ্রেয়? কিছু জানা, নাকি না জানা? কোনটি ভালো?
টিকাঃ
১. সূরা আল-আরাফ: ১৭৬
১. পূর্ণাঙ্গ বংশ পরম্পরা: উবাইদুল্লাহ ইবনুল হুসাইন ইবনু আহমাদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু মাইমুন আল-কাদ্দাহ।
২. মুইযের উপাধি ফাতিমী নয় বরং উবাইদুল্লাহ আল-মাহদীর দিকে সম্পৃক্ত করে 'উবাইদি' হওয়াই সঙ্গত। -লেখক
১. এই নামকরণ ছিল তার প্রপিতামহ সফিউদ্দীন আল-আরদাবিলীর নামানুসারে। সে ছিল পারসিক বংশোদ্ভূত। মৃত্যু ৭২৯ হিজরীতে। -লেখক
২. Chaldiran (চালদিরান)
📄 প্রবন্ধ : নিয়ন্ত্রণাধীন শয়তান
আরব কিংবা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নজর দিলেই আমরা দেখতে পাই, ইরান-আমেরিকা উত্তেজনার খবরাখবর তারা খুব আয়োজন করে প্রকাশ করছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হবে, এই বুঝি ইরানের ওপর আমেরিকার সামরিক হামলা শুরুই হয়ে গেল। কারণ, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে; আর জর্জ ডাব্লিউ বুশের মতে এটি একটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, যার মাশুল 'বিপথগামী ইরান'-কে দিতেই হবে।
অনেকেই বলাবলি করেন, আমেরিকা কি সত্যিই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে? ইরাক অভিযানে অর্জিত তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলে কি এখন ইরানের পরমাণু প্রকল্পে বাধা দিতে যাবে? বর্তমান বিশ্বে আমেরিকার কল্যাণে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া কি আবশ্যক? আমার মনে হয়, আমেরিকা কখনই ইরানের ওপর হামলা করবে না; এর কোনো সম্ভাবনাই নেই। কেন নেই? চলুন কয়েকটি কারণ জানা যাক।
প্রথমত: আমেরিকা মোটেও এতটা নির্বোধ নয় যে, পা-য়ে পাড়া দিয়ে ইরানের সাথে যুদ্ধ বাধাবে। এ কথা সকলেরই জানা, মার্কিন সেনারা ইরাকেই মারাত্মক সঙ্কটের ভেতর দিয়ে গেছে; সেখানে তারা কল্পনাতীত সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে; এমনকি যুদ্ধ শেষে নিজেদেরকেই ক্ষতিগ্রস্ত মনে করতে হয়েছে। এসব কারণে অসংখ্য মার্কিন নাগরিক ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে। সর্বশেষ, আমেরিকার দুই প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী, অর্থাৎ ওবামা এবং জন সিডনি ম্যাককেইন তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ইরাক-সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত: আমেরিকা খুব ভালোভাবেই জানে, ইরানে হামলার ফলে শিয়া ও সুন্নীদের মাঝে অন্তত রাজনৈতিকভাবে ঐক্য তৈরি হবে। তখন তারা উভয়ে মিলে আমেরিকার পেছনে উঠেপড়ে লাগবে। এতে করে ইরাকী সুন্নীদের বিরুদ্ধে শিয়াদের আক্রমণ বন্ধ হয়ে যাবে, যা আমেরিকার জন্য সুখকর হবে না। কারণ, ইরাক অভিযানে তাদের মূল লক্ষ্যই ছিল সুন্নী দমন। তা ছাড়া, ইরানে হামলা হলে স্বাভাবিকভাবেই তারা ইরাকী শিয়াদের সাহায্য করা বন্ধ করে দেবে। ফলে সুন্নীরা আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে; যা অচিরেই আমেরিকার জন্য মাথাব্যথার কারণ হবে।
তৃতীয়ত: ১৯৮০ সালের কথা। আমেরিকার একমাত্র ইরান অভিযানের অভিজ্ঞতা। উদ্দেশ্য ছিল ইরানী বিপ্লবের সেনাদের হাতে আটককৃত মার্কিন কূটনীতিকদের মুক্ত করা। এই সুবাদে আমেরিকা এক তিক্ত বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছিল। হামলা করতে এসে খোয়াতে হয়েছিল একাধিক যুদ্ধবিমান, নিহত হয়েছিল অনেক মার্কিন সেনা, ক্ষুণ্ণ হয়েছিল তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা। আসলে ইরানের মরু ও পার্বত্য অঞ্চলে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা আমেরিকার জন্য মোটেও সহজ কিছু ছিল না।
চতুর্থত: পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। আর আমেরিকা খুব ভালোভাবেই জানে, ইরাকের মতো ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প মোটেও কাল্পনিক নয়। সুতরাং এই দেশে হামলার মানেই হলো আমেরিকার আয়ত্তাধীন কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পারমাণবিক বোমাহামলার ঝুঁকি গ্রহণ করা। উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড়ো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে কাতারে; ওদিকে ফিলিস্তিনে দখলদার ইহুদীরাও ইরান থেকে অদূরে; আর ইরাক-কুয়েতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের বিপুল উপস্থিতির কথা তো বলাই বাহুল্য।
পঞ্চমত: দূর কিংবা অদূর অতীতের ইতিহাসে এমন কোনো ঘটনা উল্লেখিত হয়নি যাতে কোনো শিয়া রাষ্ট্র মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধরত অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে। শিয়া রাষ্ট্রগুলো স্বভাবত কোনো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে চোখও রাঙায় না। তবে হ্যাঁ, কেউ যখন তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাদের হুঙ্কার দেখে কে! বলতে দ্বিধা নেই, পার্শ্ববর্তী সুন্নী রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে ব্যয়ের জন্যই মূলত শিয়া রাষ্ট্রগুলো শক্তি সঞ্চয় করে রাখে।
বুওয়াইহিয়া শিয়া সাম্রাজ্যের কথা মনে আছে? খ্রিষ্টীয় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ছিল তাদের একেবারে নিকটে। এরপরও কিন্তু তাদের সঙ্গে কোনো রকম সংঘর্ষ হয়নি। অপরদিকে আব্বাসী খেলাফতের বিরুদ্ধে তারা ঠিকই যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। একই আচরণ করেছে উবাইদিয়া শিয়া সাম্রাজ্য। উত্তর স্পেনে বসবাসকারী ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে তো কিছু বলেনি, বরং দক্ষিণ স্পেনের সুন্নী শাসক আবদুর রহমান আন-নাসিরের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করেছে। ক্রুসেডাররা যখন শাম ও ফিলিস্তিনে আগ্রাসন চালিয়েছিল, এই মিশরে থাকা উবাইদিয়া শিয়ারা কেবল চেয়ে চেয়ে দেখেছে। বরং বিভিন্ন অঞ্চলে সুন্নী সেলজুক শাসকদের বিপক্ষে খ্রিষ্টানদের সাহায্য করেছে। এমনকি সুন্নীদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলগুলো ভাগ-বণ্টনের রূপরেখা তারাই তৈরি করেছে। সাফাভিদ শিয়া সাম্রাজ্য খ্রিষ্টান দেশ ফ্রান্স, ইংল্যান্ড এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করলেও সুন্নী উসমানী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ঠিকই যুদ্ধ করেছে। শিয়া রাষ্ট্র ইরান ধর্মত্যাগী রাশিয়ার ব্যাপারে বরাবরই নিশ্চুপ থেকেছে; অপরদিকে আফগান মুজাহিদদের ঠিকই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আমেরিকা বা ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে না জড়ালেও ইরাকের সঙ্গে ঠিকই আট-আটটি বছর যুদ্ধ চালিয়ে গেছে।
এসব ইতিহাস সামনে রেখে খুব সহজেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, ইরান কোনো অবস্থায়ই আমেরিকা কিংবা ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবে না, যদি না তারা হামলার শিকার হয়। তাদের ওপর সামান্য আঘাত এলেও তারা তার সমুচিত জবাব দেবে। ঠিক যেমনটি আমরা দেখেছি দক্ষিণ লেবাননে হিযবুল্লাহর আচরণ ও উচ্চারণে।
ষষ্ঠত: কয়েক মাস যাবৎ আমরা দেখতে পাচ্ছি, ইরানের রাষ্ট্রপতি আহমাদি নেজাদ যখনই ইরাক সফরে যান, আমেরিকা তাকে নিরাপত্তার চাদরে জড়িয়ে রাখে। এ থেকে স্পষ্ট হয়, ইরান-আমেরিকা দ্বন্দ্বের কথা মিডিয়া যেভাবে প্রচার করে, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। যদি ভিন্ন কিছু হয়েই থাকে, তাহলে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে এই যে চিল্লা-পাল্লা, হুমকি-ধামকি এসব অনর্থক নয় কি?
পরিশেষে সম্ভাব্য যে দিকটি থাকে তা হলো, আমেরিকা বিশ্ববাসীর সামনে ইরানে থাকা এমন এক 'জুজু'-র সংবাদ পেশ করতে চায়, যা শুনে আশপাশের রাষ্ট্রগুলো ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং তাদের কাছে ইরাক ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি যৌক্তিক মনে হয়।
অর্থাৎ, ইরান অচিরেই তেমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে, যেমনটি ইতঃপূর্বে হয়েছিল সাদ্দাম হুসাইন। সাদ্দাম পূর্ণ তেরো বছর ইরাক শাসন করেছেন। দীর্ঘ এ সময়ে আমেরিকা তার কোনো রকম বিরোধিতা করেনি। কিন্তু হঠাৎ তারা এমন উদ্ভট পরিস্থিতি তৈরি করল যে, অনেকেই সাদ্দাম হুসাইনের হাত থেকে ইসলামী দেশগুলো হেফাজতের জন্য আমেরিকার মতো ত্রাণকর্তার উপস্থিতি খুশি মনে মেনে নিল।
এরপর যখন সাদ্দাম হুসাইন অধ্যায়ের অবসান ঘটল, ক্ষমতাসীনদের কাতারে তিনি আর উল্লেখযোগ্য কেউ রইলেন না, তখন সকল রহস্য উন্মোচিত হলো; জানা গেল, ধ্বংসাত্মক অস্ত্র তৈরির অপবাদ এবং তার ওপর ভিত্তি করে ইরাকে চালানো মার্কিন সেনাদের আগ্রাসন সবই ছিল আমেরিকার সাজানো নাটক। ইরাকে আদৌও কোনো বিধ্বংসী অস্ত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
কিন্তু মানুষ বরাবরই খুব দ্রুত সব ভুলে যায়। এবারও তাই হলো। এই সুবাদে আমেরিকা এখন আবার নতুন জুজুর সন্ধানে নেমেছে। তবে এবারের জুজু তাদেরই নিয়ন্ত্রণাধীন। সুতরাং কোনো রকম ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা নেই, কিংবা নেই কোনো সংঘাত ও সংঘর্ষের সম্ভাবনা। এ ক্ষেত্রে আমেরিকার জন্য ইরানের চেয়ে উত্তম বিকল্প আর হতেই পারে না। এজন্য বিশ্ববাসীর চোখে ধুলো দিতে তারা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সুপরিকল্পিতভাবে ‘মিডিয়া সন্ত্রাস’ চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে হ্যাঁ, ইরানের পালাও বছর কয়েক পরে শেষ হয়ে যাবে। তখন আমেরিকা আবার নতুন কোনো জুজুর অন্বেষণে বেরিয়ে পড়বে। নির্বোধ ও নির্লজ্জের মতো এই খেলা তারা চালিয়েই যাবে, যতদিন না মুসলমান নিজের পায়ে দাঁড়ায় এবং এই অঞ্চলের সকল জুজুকে উচিত শিক্ষা দিতে সক্ষম হয়—হোক সেটা মার্কিন, ইরানী কিংবা ইহুদী।