📄 আল্লাহ ও রাসূলকে কারা সপ্নে দেখতে পারেন?
আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে স্বপ্নে কেবল তারাই দেখতে পারেন যারা ঈমান ও 'আমলে সালেহ এর গুণে গুণান্বিত।৩৫৩ কিন্তু, যাদের অবস্থা উপরে বর্ণিত হয়েছে তারা কোনো দিন তাঁদেরকে জাগ্রত অবস্থায় দেখাতো দূরের কথা, কখনো স্বপ্নে দেখারও কথা নয়। তা ছাড়া আল্লাহ তা'আলাকে জাগ্রত অবস্থায় পৃথিবীতে থাকাকালে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও দেখেন নি। মে'রাজের রাতে কোনো এক স্থানে আল্লাহর সাথে তাঁর একান্ত কথা-বার্তা হওয়ার সময় তিনি কি আল্লাহ তা'আলাকে স্বচক্ষে দেখেছিলেন? এ নিয়ে মুসলিম মনীষীদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। কারো মতে স্বচক্ষে দেখেছেন। তবে অধিকাংশ মনীষীদের মতে স্বচক্ষে দেখেন নি। বরং অন্তর চক্ষু দিয়ে দেখেছিলেন।৩৫৪ এবং পর্দার অন্তরাল থেকেই উভয়ের মাঝে কথা-বার্তা হয়েছিল। কুরআনুল কারীম দ্বারা এ কথারই সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়। মহান আল্লাহ বলেন:
﴿ وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَن يُكَلِّمَهُ اللهُ إِلَّا وَحْيًا أَوْ مِن وَرَابٍ حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوحِيَ بِإِذْنِهِ مَا يَشَاءُ ﴾
"আর কোনো মানুষের পক্ষে এমনটি হওয়া সম্ভবপর নয় যে, আল্লাহ তার সাথে সরাসরি কথা বলবেন। তবে তিনি মানুষের সাথে ইলহাম বা পর্দার অন্তরাল থেকে কথা বলেন। অথবা (সে জন্য) তিনি কোনো দূত প্রেরণ করেন, অতঃপর সে দূত আল্লাহ যা চান তা তাঁর অনুমতিক্রমে পৌঁছে দেন”।৩৫৫ এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মহান আল্লাহ মানুষের সাথে মোট তিনভাবে কথা বলেন:
এক, ওহী অর্থাৎ গোপন পন্থায় ইলহাম বা স্বপ্নের মাধ্যমে। এ প্রক্রিয়ায় তিনি নবী-রাসূল ও সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলেন।
দুই, পর্দার অন্তরাল থেকে কথা বলেন।
তিন, রাসূল তথা ফেরেস্তা প্রেরণের মাধ্যমে কথা বলেন। মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী'ও উপর্যুক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।৩৫৬
আল্লাহ তা'আলা যখন মানুষের সাথে উপর্যুক্ত এ তিন মাধ্যমে কথা বলে থাকেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই এ-কথা প্রমাণিত হয় যে, মে'রাজের রজনীতে তিনি রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে পর্দার অন্তরাল থেকেই কথা বলেছিলেন। মূসাও আল্লাহ তা'আলাকে সরাসরি দেখার জন্য আবেদন করেছিলেন। আল্লাহ তাঁকে বলেছিলেন:
﴿قَالَ لَن تَرَنِي وَلَكِنِ انْظُرْ إِلَى الْجَبَلِ فَإِنِ اسْتَقَرَّ مَكَانَهُ، فَسَوْفَ تَرَنِي ۚ فَلَمَّا تَجَلَّى رَبُّهُ لِلْجَبَلِ جَعَلَهُ دَكًّا وَخَرَّ مُوسَىٰ صَعِقًا﴾
“তুমি আমাকে কস্মিনকালেও (সরাসরি) দেখতে পারবে না, তবে তুমি পাহাড়ের দিকে তাকাও সেটি যদি স্বস্থানে দাঁড়িয়ে থাকে, তা হলে তুমি আমাকে দেখতে পাবে। অতঃপর যখন তাঁর প্রভু পাহাড়ের উপর আপন জ্যোতির বিকিরণ ঘটালেন, তখন তিনি সেটাকে বিধ্বস্ত করে দিলেন এবং মূসা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন”।৩৫৭ এ আয়াত দ্বারাও প্রমাণিত হয় যে, এ দুনিয়াতে থাকাবস্থায় বা আখেরাতের পূর্বে আল্লাহ তা'আলাকে চর্মচক্ষে দেখা কোনো নবী-রাসূল ও ওলিদের পক্ষেও সম্ভবপর নয়।
যুক্তির দিক থেকে দুনিয়ায় আল্লাহ তা'আলাকে স্বচক্ষে দেখার সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তবে যখন মূসা এবং আমাদের রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষে আল্লাহ তা'আলাকে সরাসরি দেখা সম্ভব হয়নি, তখন অন্য কারো পক্ষে যে তা আদৌ সম্ভবপর হবে না, তা বলা-ই বাহুল্য। এর পরেও কেউ যদি এ দুনিয়ায় আল্লাহকে সরাসরি স্বচক্ষে দেখেছে বলে দাবী করে, তবে সে যে একজন মস্তবড় মিথ্যুক হবে, তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। যারা রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ব্যতীত অপর কারো জন্যে এ পৃথিবীতে আল্লাহ তা'আলাকে স্বচক্ষে দেখার কথাকে বিশ্বাস করে এদেরকে ইমাম কাওয়াশী অমুসলিম বলে আখ্যায়িত করেছেন।৩৫৮
আক্বীদা বিষয়ক কবিতায় জনৈক কবি বলেন:
و من قال في الدنيا يراه بعينه ** فذاك زنديق طغا و تمردا
و خالف كتاب الله والرسل كلها ** و زاغ عن الشرع الشريف وأبعدا
"যে বলে আল্লাহকে দুনিয়ায় স্বচক্ষে দেখা যায়, সে হলো যিন্দীক, সে তো সীমালঙ্ঘন করেছে। আল্লাহর কিতাব এবং সকল রাসূলদের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। আর শরী'আত থেকে বিপথগামী হয়ে বহু দূরে চলে গেছে"।৩৫৯
অপর দিকে রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাতের পর তাঁকেও তাঁর সাহাবীগণ কখনও জাগ্রত অবস্থায় দেখতে পায়নি। এমতাস্থায় যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে জাগ্রত অবস্থায় দেখার কথা বলে তারা আসলে শয়তানকেই দেখে।
"রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে যারা স্বপ্নে দেখে তারা তাঁকে জাগ্রত অবস্থায়ও দেখতে পাবে"৩৬০ এ মর্মে একটি হাদীস বর্ণিত হয়ে থাকলেও রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুখ নিঃসৃত মূল বাণীটি কী, এ নিয়ে এ হাদীসের বর্ণনাকারীদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মুসলিম এর বর্ণনায় বর্ণনাকারীগণ সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছেন: "যে আমাকে স্বপ্নে দেখলো সে আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখবে, অথবা সে যেন আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখলো”।৩৬১ রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মূল বাণী যদি "সে যেন আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখলো” এমনটি হয়, তা হলে এ হাদীস নিয়ে কোনো জটিলতা নেই। তা না হয়ে যদি রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মূল বাণী "সে আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখবে" হয়ে থাকে, তা হলে এ হাদীসের সঠিক অর্থ কী হবে, এ নিয়ে মনীষীগণ বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। এ প্রসঙ্গে তাঁরা বলেছেন:
যদি রাসূলুল্লাহ -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর মূল বাণী হয় “সে আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখবে”- তা হলে এ বাক্যটি তাঁদের মতে একটি জটিল বাক্য। এর সমাধানে তারা মোট ছয়টি মতামত ব্যক্ত করেছেন। যা সংক্ষিপ্তাকারে নিম্নে বর্ণিত হলো:
এক, এটি রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- একটি উপমা স্বরূপ বলেছেন। অর্থাৎ -যে তাঁকে স্বপ্নে দেখবে, তার এ দেখাটি তাঁকে জাগ্রত অবস্থায় দেখার মতই হবে।
দুই. যে এমনটি দেখবে সে জাগ্রত হয়ে তার এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা যথাযথভাবে দেখতে পাবে।
তিন. এ হাদীসটি তাঁর সমসাময়িক লোকদের সাথে সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ-তাঁর সময়কার যে ব্যক্তি তাঁকে না দেখে ইসলাম গ্রহণ করার পর এমন স্বপ্ন দেখবে, সে তাঁকে তাঁর জীবদ্দশায় কিছু দিন পরে হলেও দেখতে পারে।
চার. যে এমন স্বপ্ন দেখবে সে রাসূলের আয়নাতে তাঁকে দেখতে পাবে। যেমনটি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু দেখেছিলেন।
পাঁচ. যে এমনটি দেখবে, সে কেয়ামতের দিন তাঁকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের সাথে দেখতে পাবে।
ছয়. যে এমনটি দেখবে, সে বাস্তবে তাঁকে জাগ্রত অবস্থায় দেখতে পাবে। তবে এ অর্থ গ্রহণের ক্ষেত্রে বাস্তব কিছু সমস্যা রয়েছে যা তা গ্রহণের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে থাকে।৩৬২ হাদীসবিদ ইবনে হাজার 'আসক্বালানী উক্ত বাহ্যিক অর্থকে একটি জটিল ও অবিশ্বাস্য অর্থ বলে মন্তব্য করেছেন।৩৬৩
টিকাঃ
৩৫৩. যারা আহলুত তাওফীক কেবল তাঁরাই রাসূল কে স্বপ্নে দেখতে পারে। কিন্তু যারা তাদের দলভুক্ত নয়, তাদের স্বপ্নে দেখার বিষয়টি সত্য হতেও পারে, আবার মিথ্যাও হতে পারে। কেননা, শয়তানের চক্রান্তের মাধ্যমে একজন যিন্দিক তথা কাফিরের দ্বারাও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে পারে, যেমন তা হয়ে থাকে একজন সত্যবাদীর জন্য কারামতস্বরূপ। তবে উভয়ের মাঝে পার্থক্য অর্জিত হবে কিতাব ও সুন্নাতের অনুসরণের দিক বিবেচনা করে। যিনি কিতাব ও সুন্নাতের অনুসারী হবেন তাঁর স্বপ্ন সত্য হবে, আর যিনি কিতাব ও সুন্নাতের অনুসারী হবেন না, তার স্বপ্ন মিথ্যা হবে। দেখুন: ইবনে হাজার আসক্বালানী, ফতহুলবারী; ১২/৩৮৫।
ثم ذكر أنه عام في أهل التوفيق وأما غيرهم فعلى الاحتمال فان خرق العادة قد يقع للزنديق بطريق الإملاء والإغواء كما يقع للصديق تحصل التفرقة بينهما باتباع الكتاب والسنة انتهى.
৩৫৪. এ প্রসঙ্গে মুল্লা আলী ক্বারী হানাফী বলেন:
" إن أهل السنة والجماعة و إن أجازوا رؤية الله في الدنيا عقلا ، وواقعة و ثابتة في العقبى سمعا ونقلا ، لكنهم اختلفوا في جوازاها في الدنيا شرعا . والذين أثبتوها في الدنيا خصوا وقوعها له صلى الله عليه وسلم في ليلة الإسراء، على خلاف في ذلك بين السلف والخلف من العلماء والأولياء... ثم قال و الصحيح أنه صلى الله عليه وسلم إنما رأى ربه بفؤاده ، لا بعينه" --:দেখুন: ইবনু আবিল ইয্য আল-হানাফী, প্রাগুক্ত;পৃ. ১৮৪।
৩৫৫. মাওলানা মুহাম্মদ শফী'; প্রাগুক্ত; পৃ.১২২৬।
৩৫৬. তদেব; পৃ.১২২২।
৩৫৭. আল-কুরআন, সূরা আ'রাফ: ১৪৩।
৩৫৮. ইমাম কাওয়াশী সূরা নাজম এর তাফসীরে বলেন: "ومعتقد رؤية الله تعالى هنا بالعين لغير محمد صلى الله علية وسلم غير مسلم." :দেখুন:ইবনু আবিল ইয্য আল-হানাফী, প্রাগুক্ত;১৮৪।
৩৫৯. তদেব; পৃ.১৮৬।
৩৬০. বুখারী, প্রাগুক্ত; কিতাবুর রু'য়া, বাব নং ১০, হাদীস নং ৬৫৯২), ৬/২৫৬৭; ইবনে হাজার 'আসক্বালানী, ফতহুলবারী; ১২/৩৮৩; মুসলিম, প্রাগুক্ত; (কিতাবুর রু'য়া, হাদীস নং ২২৬৬), ৪/১৭৭৫।
৩৬১. ইমাম মুসলিম এর বর্ণনায় সন্দেহ প্রকাশ করে বলা হয়েছে ( فسيراني في اليقظة أو لكأنما رأني في اليقظة ) অথবা সে যেন আমাকে জাগ্রত অবস্থার মতই দেখলো"এ কথা বর্ণিত হয়েছে। ইমাম ইসমাঈলী উক্ত কথার বদলে বলেছেন: )فقد رأي في اليقظة( "যে আমাকে স্বপ্নে দেখলো সে যেন আমাকে জাগ্রত অবস্থায়ই দেখলো"। দেখুন:মুসলিম, প্রাগুক্ত; ৪/১৭৭৫।
৩৬২. তিনি বলেন: الحاصل من الأجوبة ستة أحدها أنه على التشبيه والتمثيل ودل عليه قوله في الرواية الأخرى فكأنما رأني في اليقظة ثانيها: أن معناها سيرى في اليقظة، ثالثها: أنه خاص بأهل آلاف ممن آمن به قبل أن يراه، رابعها أنه يراه في المرآة التي كانت له إن أمكنه ذلك ، وهذا من أبعد المحامل، خامسها أنه يراه يوم القيامة يمزيد الخصوصية لا مطلق من يراه حينئذ ممن لم يره في المنام، سادسها: أنه يراه في الدنيا حقيقة و يخاطبه ، و فيه ما تقدم من الإشكال দেখুন: ইবনে হাজার, ফাতহুলবারী, ১২/৩৮৫।
৩৬৩. এক দল সালেহীন থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখার পর পুনরায় তারা তাঁকে জাগ্রত অবস্থায়ও দেখেছেন। কিছু বিষয় সম্পর্কে তারা তাঁকে জিজ্ঞাসাও করেছেন। এবং জিজ্ঞাসার ফলাফলও সঠিকমত পেয়েছেন। ইবনে হাজার এ-কথা উল্লেখ করে বলেন: তাদের এ দাবী যদি সত্যি হয়, তা হলে তা একটি জটিল বিষয় হিসেবে গণ্য হবে। কেননা, এতে তারা সাহাবী হওয়ার মর্যাদা পাবেন, এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা এভাবে রাসূলকে দেখেছে বলে দাবী করবে, তারাও সাহাবী হওয়ার মর্যাদা পাবে। অপর পক্ষে এমনও কিছু মনীষী রয়েছেন, যাঁরা রাসূলকে স্বপ্নে দেখেছেন বলে বর্ণানা করেছেন, কিন্তু তারা তাঁকে জাগ্রত অবস্থায় দেখার কথা বলেন নি। সে-জন্য যারা রাসূলকে জাগ্রত দেখার কথা বলেন তাদের কথাকে বাহ্যিক অর্থে গ্রহণ করলে তা একটি জটিল অর্থ বলেই প্রতীয়মান হয়। দেখুন: তদেব।
📄 খিযির আলাইহিস সালাম-এর সাক্ষাৎ
খিযির আলাইহিস সালাম জীবিত আছেন কি না, এটি একটি বিতর্কিত বিষয়। যদি তিনি জীবিত থাকতেন, তা হলে রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও তাঁর সাহাবীদের সাথে কম হলেও দু'একবার সাক্ষাৎ করতেন। কিন্তু তাঁদের সাথে কখনও তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়না। এমতাবস্থায় বেলায়তের দাবীদার ও পাগলদের সাথে তাঁর সাক্ষাতের কথা কী করে সত্য হতে পারে? এতে প্রমাণিত হয় যে, বেলায়তের দাবীদারগণ শর'য়ী দৃষ্টিতে কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর ওলি নয়, তারা শয়তানের অলি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে সাধারণ মানুষের কাছে এরাই হলো আল্লাহর বড় অলি। শয়তান এদের মাধ্যমেই সমাজে তার ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে রেখেছে। বড় বড় ওলিদের কবরে আস্তানা গেড়ে বসে থেকে সেখানে নিবেদনকারীদের যে-সব মনোবাঞ্ছা তার পক্ষে পূর্ণ করা সম্ভব, তা সে পূর্ণ করে দিচ্ছে। আর এর দ্বারা সাধারণ লোকদেরকে সহজেই তার শিকারে পরিণত করছে। সাধারণ লোকেরা এ-গুলোকে সে-সব ওলি ও বেলায়তের মিথ্যা দাবীদারদের রূহানী শক্তির বলে প্রকাশিত কারামত হিসেবে মনে করছে।
📄 প্রকৃত ওলির পরিচয়
যারা ঈমান ও তাক্বওয়ার গুণে গুণান্বিত মহান আল্লাহর দৃষ্টিতে তাঁরাই যে সত্যিকারের ওলি সে কথা আমরা এ পরিচ্ছেদের মধ্যেই একটু পূর্বে বর্ণনা করে এসেছি। সে অনুযায়ী যারাই এ'দুটি গুণ অর্জন করতে সক্ষম হবে তাঁরাই হবে আল্লাহর ওলি। মানব সমাজে তাদের পরিচিতি আলেম, ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, কৃষক, ক্ষেতমজুর, ঝাড়ুদার ও মুচি যা-ই থাকুক না কেন, তারা প্রত্যেকেই একেকজন আল্লাহর ওলি হয়ে থাকবে। তাদের প্রত্যেকের জন্যেই আখেরাতে শান্তিময় জীবন লাভের অভয়বাণী থাকবে। প্রত্যেক মুসলিমকে নিজের পরকালীন মুক্তির জন্য ঈমান ও তাক্বওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতেই হবে। যারা এ যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করেন, তারা কস্মিনকালেও নিজেদেরকে আল্লাহর ওলি হয়েছেন বলে দাবী করতে পারেন না। ওলিদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে আখেরাতে যে অভয়বাণীর কথা বলা হয়েছে, তারা বেশী হলে সেই সুসংবাদ প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হতে পারেন। কোনো অবস্থাতেই এর জন্য তাঁরা নিশ্চিত হতে পারেন না। কেননা, তাদের ধর্ম-কর্ম আল্লাহর কাছে গৃহীত হচ্ছে কি না, তা তো কেবল আল্লাহ ব্যতীত আর কেউই সঠিক করে বলতে পারেনা। তাঁরা নিজের ধর্ম-কর্ম স্রেফ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যেই করে থাকেন বলে কোনো দিনই তাঁরা নিজের ব্যাপারে 'আমি আল্লাহর ওলি হয়ে গেছি' বলে এ ধরনের কোনো দাবী করতে এবং এ নিয়ে কোনো আত্মতৃপ্তিও অনুভব করতে পারেন না। এ ধরনের দাবী করা কোনো সুস্থ মস্তিষ্ক ও প্রকৃত মু'মিনের কাজ হতে পারে বলেও তাঁরা মনে করতে পারেন না। তাঁদের দ্বারা কোনো কারামত প্রকাশিত হয়ে থাকলে কারো কাছে তাঁরা তা বলে বেড়াতেও পারেন না।