📘 শিরক কি ও কেন > 📄 শাফা'আতের দ্বিতীয় পর্যায় : জাহান্নামীদের জাহান্নামে প্রবেশের পর যারা শাফা'আতের অনুমতি পাবেন

📄 শাফা'আতের দ্বিতীয় পর্যায় : জাহান্নামীদের জাহান্নামে প্রবেশের পর যারা শাফা'আতের অনুমতি পাবেন


হাশরের ময়দানে মহান আল্লাহ যখন তাঁর বান্দাদের মাঝে ন্যায় ও ইনসাফের সাথে ফয়সালা করবেন, তখন তাঁর অনুমতিক্রমে জান্নাতবাসীরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর জাহান্নামবাসীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এ পর্যায়ে আল্লাহ তা'আলা পুনরায় শাফা'আতের অনুমতি প্রদান করবেন।
দ্বিতীয় পর্যায়ে জান্নাতবাসীদের জন্য রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শাফা'আত:
এ পর্যায়ে জান্নাতবাসীদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি শাফা'আত থাকার বর্ণনা আক্বীদা বিষয়ক কিতাবাদিতে পাওয়া যায়। তবে কোনো কিতাবেই এর পিছনে কী দলীল রয়েছে, অনেক চেষ্টা করেও আমি এর কোনো দলীল খোঁজে পাই নি।৩২৩
জাহান্নামবাসীদের জন্য শাফা'আত:
হাশরের ময়দানে যারা শির্কের অপরাধে দন্ডিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ না করে অন্যান্য অপরাধজনিত কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করবে, তাদের জন্য এ পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তিন থেকে চারটি শাফা'আতের কথা আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু ও আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত শাফা'আত সংক্রান্ত সুদীর্ঘ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এ পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-তাঁর জাহান্নামী উম্মতদের জন্য আল্লাহর নিকট কান্নাকাটি ও অনুনয় বিনয় করে বলবেন:
رَبِّي أُمَّتِي أُمَّتِي، فَيُحِدُّ لَهُ حَدًّا فَيُدْخِلُهُمُ الْجَنَّةَ "...
"...প্রভু আমার উম্মত! আমার উম্মত! তখন আল্লাহ তাঁকে (কিছু লোকদের) শাফা'আতের জন্য একটি সীমারেখা নির্ধারণ করে দেবেন, ফলে তিনি তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন"।৩২৪ আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস অনুযায়ী এ-ভাবে রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- পরপর তিনবার আমার উম্মত আমার উম্মত এ-কথা বলে আল্লাহ তা'আলাকে ডাকতে থাকবেন এবং প্রতিবারেই আল্লাহ তা'আলা তাঁকে নির্দিষ্ট কিছু লোকদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে এনে জান্নাতে প্রবেশ করানোর অনুমতি দেবেন। তবে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এ ধরনের শাফা'আত চার বার হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে।৩২৫ হাদীস দু'টি খুবই দীর্ঘ হওয়ার কারণে এখানে তা বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকলাম।

জাহান্নামীদের জন্য ফেরেস্তা, নবী ও মু'মিনদের শাফা'আত:
রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর পর তিন থেকে চার বার শাফা'আতে তাঁর উম্মতের মধ্যকার শির্ক ব্যতীত অন্যান্য অপরাধে জাহান্নামবাসী অসংখ্য মু'মিন নর-নারী মুক্তি পাওয়ার পরেও তাঁর উম্মতের মধ্যকার কিছু লোক জাহান্নামে থেকে যাবে। তখন জান্নাতবাসী মু'মিনরা তাদের পরিচিত অনেককে শেষ পর্যন্ত জান্নাতে দেখতে না পেয়ে তারা সে-সব লোকদের জন্যে আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ জানাবে। তখন আল্লাহ তাদেরকে সে-সব লোকদের জন্য শাফা'আতের অনুমতি প্রদান করবেন। আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এ কথাগুলো এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
... حَتَّى إِذَا خَلَّصَ الْمُؤْمِنُوْنَ مِنَ النَّارِ فَوَ الَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ بِأَشَدَّ مُنَا شَدَةً لِلَّهِ فِي اسْتِقْصَاءِ الحَقِّ ، مِنَ الْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لِإِخْوَانِهِمُ الَّذِينَ فِي النَّارِ. يَقُولُونَ : رَبَّنَا : كَانُوا يَصُومُونَ مَعَنَا ، وَ يُصَلُّوْنَ وَ يَحُجُّوْنَ. فَيُقَالُ لَهُمْ : أَخْرِجُوا مَنْ عَرَفْتُمْ . فَتُحْرَمُ صُوَرُهُمْ عَلَى النَّارِ فَيُخْرِجُونَ خَلْقًا كَثِيرًا قَدْ أَخَذَتِ النَّارُ إِلى نِصْفِ سَاقَيْهِ وَإِلى رُكْبَتِهِ. ثُمَّ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا : مَا بَقِيَ فِيهَا أَحَدٌ مِمَّنْ أَمَرْتَنَا بِهِ فَيَقُولُ : ارْجِعُوا فَمَنْ وَجَدتُّمْ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ دِينَارٍ مِنْ خَيْرٍ فَأَخْرِجُوهُ. فَيُخْرِجُونَ خَلْقًا كَثِيرًا. ثُمَّ يَقُولُونَ رَبَّنَا : لَمْ نَذَرُ فِيهَا أَحَدًا مِمَّنْ أَمَرْتَنَا. ثُمَّ يَقُولُ اللهُ : ارْجِعُوا فَمَنْ وَجَدْتُمْ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ فَأَخْرِجُوهُ. فَيُخْرِجُوْنَ خَلْقًا كَثِيرًا. ثُمَّ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا لَمْ نَذَرُ فِيهَا خَيْرًا. فَيَقُولُ اللهُ تَعَالَى : شَفَعَتِ الْمَلَائِكَةُ وشَفَعَ النَّبِيُّونَ وَالْمُؤْمِنُوْنَ وَ لَمْ يَبْقَ إِلَّا أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ ، فَيَقْبِضُ اللهُ قَبْضَةً مِنَ النَّارِ فَيُخْرِجُ مِنْهَا قَوْمًا لَمْ يَعْمَلُوا خَيْرًا قط
"...অবশেষে যখন (নির্দিষ্ট সময়সীমার জন্য জাহান্নামে প্রবেশকারী) মু'মিনরা (রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর শাফা'আতে) নাযাত পাবে, তখন আল্লাহর শপথ যার হাতের মধ্যে আমার আত্মা! তোমাদের প্রত্যেকেই কেয়ামতের দিন তার অধিকার পরিপূর্ণভাবে আদায়ের লক্ষ্যে তাদের জাহান্নামবাসী ভাইদের মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে অধিকভাবে অনুনয়-বিনয় করতে থাকবে। তারা বলবে:প্রভু হে! তারা আমাদের সাথে রোযা পালন করতো, নামায আদায় করতো ও হজ্জ করতো। তখন তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা যাদের চিনতে পারো, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে নিয়ে এসো। এ-সময়ে তাদের পরিচিত জনদের মুখমণ্ডল জাহান্নামের উপর হারাম করা হবে, তখন তারা তাদের চিনতে পেরে অসংখ্য লোকদের বের করে নিয়ে আসবে এমতাবস্থায় যে, তাদের কারো উভয় পায়ের জঙ্ঘার অর্ধ পর্যন্ত, কারো হাঁটু পর্যন্ত আগুনে পুড়ে গেছে। এরপর তারা বলবেঃ প্রভু হে! যাদের আপনি বের করে নিয়ে আসার জন্য আমাদেরকে আদেশ করেছিলেন, তাদের কাউকেই আমরা রেখে আসিনি। তখন আল্লাহ তা'আলা পুনরায় বলবেন; ফিরে যাও, যাদের অন্তরে এক দীনার পরিমাণ ওজনের কল্যাণ পাও তাদেরকে বের করে নিয়ে এসো। এবারও তারা অনেক লোককদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। অতঃপর বলবেঃ আল্লাহ আপনি যাদেরকে বের করে নিয়ে আসতে আদেশ করেছিলেন, তাদের একজনকে ও আমরা সেখানে রেখে আসিনি। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে আবার বলবেনঃ ফিরে যাও, যাদের অন্তরে অণু পরিমাণ কল্যাণ পাও, তাদেরকেও বের করে নিয়ে এসো। এবারও তারা অনেক লোককে বের করে নিয়ে এসে বলবেঃ প্রভু হে! কল্যাণ আছে এমন কাউকে আমরা জাহান্নামে রেখে আসিনি। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ ফেরেস্তা, নবীগণ ও মু'মিনরা শাফা'আত করলো, শুধুমাত্র রহমানুর রাহীম ব্যতীত আর কারো শাফা'আত অবশিষ্ট। থাকেনি। এ-কথা বলে আল্লাহ একমুষ্টি আগুন তাঁর হাতে নেবেন এবং সেখান থেকে এমন কিছু লোকদের বের করে আনবেন যারা কখনও কোনো ভাল কাজ করেনি"।৩২৬
আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসের এ অংশ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ফেরেস্তা, নবী, ওলি ও সালেহীনদের শাফা'আত হবে সে সকল অপরাধীদের জাহান্নাম থেকে বের করে আনার ক্ষেত্রে, যারা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জাহান্নামে প্রবেশ করেছে। কাউকে জাহান্নামে প্রবেশ করতে না দেয়ার জন্য তাঁদের কোনো শাফা'আত হবে-এ জাতীয় কোনো কথার প্রমাণ নেই। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, পীর ও মাশায়েখগণ আখেরাতে কারো জন্যে শাফা'আতের অনুমতি পাবেন কি না, তা নিশ্চিতভাবে না জানা সত্ত্বেও তারা তাদের ভক্তদেরকে তাদের শাফা'আতের ব্যাপারে আশ্বস্ত করে থাকেন। মু'মিন ও অলিগণের শাফা'আত জাহান্নামবাসীদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনার ক্ষেত্রে হয়ে থাকলেও তারা হাশরের ময়দানেই তাদের মুরীদদেরকে জাহান্নামে যেতে না দেবার জন্যে শাফা'আত করবেন বলে প্রচার করেন। অথচ আমরা দেখতে পাই যে, আখেরাতের ব্যাপারে কুরআনের বক্তব্য হচ্ছে- এ দিনে কারো রক্তের সম্পর্ক কারো কোনো উপকারে আসবে না।৩২৭ সে দিন কোনো পিতা তার সন্তানের এবং কোনো সন্তান তার পিতার কোনো কাজে আসবে না।৩২৮ যেখানে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-তাঁর নিকটাত্মীয়দেরকে এই বলে সাবধান করে দিয়েছিলেন:
«لَا أُغْنِي عَنْكُمْ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا»
'আমি (আখেরাতে আল্লাহর পাকড়াও থেকে রক্ষার জন্য) তোমাদের কোনই উপকার করতে পারবো না”,৩২৯ সেখানে পীর ও মাশায়েখগণ তাঁদের নিকটাত্মীয় ও ভক্তদের জন্য কিভাবে শাফা'আত করার আশ্বাস দিতে পারেন, সত্যিই তা হতবাক করার মত বিষয়।
আখেরাতে ওলিগণকে অভয় প্রদানের তাৎপর্য: কুরআনুল কারীমে মহান আল্লাহ অলিগণের সংজ্ঞা প্রদান পূর্বক তাঁদেরকে একটি অভয় বাণী এ মর্মে দান করেছেন যে, ﴿ أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ الَّذِينَ ءَامَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ ﴾
“জেনে রেখো! নিশ্চয় আল্লাহর ওলিগণের কোনো ভয় নেই, তাঁরা চিন্তিতও হবেনা। ওলিগণ তাঁরাই যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে”।৩৩০ অনেক সাধারণ লোকেরা এ আয়াতের বাহ্যিক অর্থের প্রতি লক্ষ্য করে মনে করেন যে, যেহেতু ওলিগণের আখেরাতে কোনো ভয় ও ভীতি নেই, সুতরাং আখেরাতে তারা শুধু তাঁদের ভক্তদের মুক্তির জন্য সুপারিশ নিয়েই ব্যস্ত থাকবেন। এমনকি এ আয়াতের ভিত্তিতে একদিন আমি নিজেই একজনের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিলাম। আসলে আখেরাতের ভয়াবহ অবস্থা সম্পর্কে তাদের যথার্থ জ্ঞান না থাকার কারণেই তারা মূলত এ ধরনের উক্তি করে থাকেন। এ আয়াতের সারকথা হচ্ছে: যারা মু'মিন ও মুত্তাক্বী, তারাই হলো আল্লাহর ওলি। আর তাঁদের জন্যেই রয়েছে আখেরাতে এ অভয়বাণী। এ জন্যে কারো আব্দুল কাদির জীলানী ও মঈনুদ্দীন চিন্তীর মত সর্বজনের নিকট ওলি হিসেবে পরিচিত হওয়া কোনো জরুরী ব্যাপার নয়। বরং আল্লাহ তা'আলার দৃষ্টিতে যারাই মু'মিন ও মুত্তাক্বী বলে বিবেচিত হবে, তারাই হবে আল্লাহর ওলি এবং এ অভয়বাণী পাওয়ার যোগ্য। এ অভয়বাণী মূলত সে রকমেরই একটি অভয়বাণী যেমনটি কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন আয়াতে অন্যান্য সৎকর্মশীলদেরকেও দান করা হয়েছে।৩৩১ যেমন আল্লাহ তা'আলা অপর আয়াতে বলেন:
﴿يَبَنِي ءَادَمَ إِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ رُسُلٌ مِّنكُمْ يَقُصُّونَ عَلَيْكُمْ ءَايَاتِي فَمَنِ اتَّقَى وَأَصْلَحَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ﴾
“হে আদম সন্তানরা! যদি তোমাদের কাছে তোমাদেরই মধ্য থেকে রাসূলগণ আগমন করে তোমাদেরকে আমার আয়াতসমূহ বর্ণনা করে, তবে যে ব্যক্তি তাক্বওয়ার পথ অবলম্বন করে এবং নিজেকে সংশোধন করে নেয়, তাদের কোনো আশঙ্কা নেই এবং তারা দুঃখিত হবেনা"।৩৩২ এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, যারা তাক্বওয়ার পথ অবলম্বন করবে এবং নিজেকে সংশোধন করে নিবে তাদের জন্যেও ওলিদের ন্যায় সমান অভয়বাণী প্রদান করা হয়েছে। এতে বুঝা যাচ্ছে যে, যারাই এ আয়াতে বর্ণিত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবে তাঁরাই আল্লাহর ওলি হিসেবে গণ্য হবে। যদিও সাধারণ মানুষের নিকট তাঁরা ওলি হিসেবে পরিচিত নাও হতে পারেন। এ জাতীয় আয়াতসমূহে এ অভয়বাণী প্রদানের অর্থ হচ্ছে- মু'মিন, মুত্তাক্বী তথা সৎকর্মশীলদেরকে এ মর্মে আশ্বস্ত করা যে, আখেরাতে তাঁদের ভয়ের কোনো কারণ নেই, তাঁদেরকে অবশ্যই সে-দিন তাঁদের কর্মের বিনিময় স্বরূপ সম্মানজনক স্থানে পৌঁছে দেয়া হবে।
এর অর্থ এ-নয় যে, তাঁরা আল্লাহর ওলি হয়েছেন বলে আখেরাতে হিসাব-নিকাশের পূর্বে তাঁরা যেমন খুশী তেমন করে ঘুরে বেড়াবেন। নিজের পরিণতির ব্যাপারে কোনো চিন্তা না করে কেবল পরের চিন্তায় ব্যস্ত থাকবেন। আখেরাতে যেখানে রাসূলুল্লাহ -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- ব্যতীত অন্যান্য সকল নবীগণ নিজের চিন্তায় মগ্ন থাকবেন, সেখানে কী করে ওলিগণ পরের চিন্তায় ব্যস্ত থাকবেন?
তা ছাড়া কে সত্যিকারের অলি, তা তো প্রমাণিত হবে হিসাব-নিকাশ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। তাই হিসাবের পূর্বে সাধারণ মানুষের ন্যায় তাঁরাও নিজের কী হয়, তা নিয়ে কম-বেশী উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকবেন। তাঁদের অন্তরে অন্যের চিন্তা আসলেও সে-দিনে আল্লাহর ক্রোধ ও প্রচণ্ড প্রতাপ দেখে জান্নাতে না যাওয়া পর্যন্ত মনের কথা মনের মধ্যেই থেকে যাবে। তা বের করার মত কারো সাহস হবে না।
এ অভয়বাণীকে একজন ভাল পরীক্ষা দানকারীর ভাল ফলাফল লাভের আশার সাথে তুলনা করা যায়। ভাল পরীক্ষা দানকারীর অন্তরে ভাল ফলাফল লাভের আশা থাকলেও ফলাফল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত তার অন্তরে সে আশার পাশাপাশি তার নিজের অজান্তে কোনো ভুল হয়ে যাওয়ার কারণে নম্বর কমে যায় কী না, তা নিয়ে অনেক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা থাকে, তেমনি ওলিগণ এ সুসংবাদ প্রাপ্ত হয়ে থাকলেও মানুষ হিসেবে তাঁদের ভুল-ভ্রান্তি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় হিসেব নিকাশের মাধ্যমে নিজেদের জান্নাতবাসী হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের অন্তর আল্লাহর শাস্তির ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত থাকবে এবং সে ভয়ই তাঁদেরকে অন্যের মুক্তির ব্যাপারে চিন্তা করা থেকে বিরত রাখবে। নবীগণ যেখানে আল্লাহর ভয়ে নফসী নফসী করবেন, সেখানে অলীগণ অন্যের চিন্তা করবেন, এটা কী করে সম্ভব হতে পারে!? তবে হ্যাঁ, নিজের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে জান্নাতে যাওয়ার পর তাঁরা অন্যের ব্যাপারে চিন্তা করবেন এবং শাফা'আতের সুযোগ আসলেই তাঁরা তাঁদের সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করবেন, তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কেননা, এটিই কুরআন, সুন্নাহ ও যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত।

টিকাঃ
৩২৩. শাইখ মুহাম্মাদ সালেহ আল-উসাইমীন বলেন, এগুলো মুমিনদের পক্ষ থেকে পরস্পরের দো'আ থেকে নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া বুখারীতে (হাদীস নং ৪০৬৭; মুসলিম, ২৪৯৮) এসেছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাইদ আবি আমেরের জন্য জান্নাতে উঁচু মর্যাদার দো'আ করেছিলেন। অনুরূপভাবে আবদুল্লাহ ইবন কাইস আবু মূসার জন্যও রাসূল সে রকম দো'আ করেছিলেন। তদ্রূপ আবু সালামার জন্য রাসূলের অনুরূপ দো'আ ছিল। (মুসলিম, হাদীস নং ৯২০) [সম্পাদক]
৩২৪. বুখারী, প্রাগুক্ত; (ঈমান অধ্যায়), ৩/৬/৪৩।
৩২৫. মুসলিম, প্রাগুক্ত; (কিতাবুল ঈমান, বাব:সবচেয়ে নিম্ন স্তরের জান্নাতির মর্যাদা), ১/১৮০-১৮১।
৩২৬. বুখারী, প্রাগুক্ত; (কিতাবুত তাওহীদ, বাব নং ২০, হাদীস নং ৭০০১), ৬/২৭০৭; মুসলিম, প্রগুক্ত; (কিতাবুল ঈমান, বাব নং ৮০, হাদীস নং ১৮২), ১/১৬৯; কুরত্ববী; প্রাগুক্ত; ৩/২৭৪।
৩২৭. আল্লাহ বলেন:
লَنْ তَنْফَعَكُمْ أَرْحَامُكُمْ وَ أَوْلَادُكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ. কেয়ামতের দিন তোমাদের বংশের সম্পর্ক ও সন্তানাদি কোনই কাজে আসবে না"। আল-কুরআন, সূরা মুমতাহিনাঃ: ২।
৩২৮. আল্লাহ বলেন:
يَتَأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ وَاخْشَوْا يَوْمًا لَّا يَجْزِى وَالِدٌ عَن وَلَدِهِ، وَلَا مَوْلُودٌ هُوَ جَازٍ عَن وَالِدِهِ شَيْئًا ) [لقمان: ٣٣] 'হে লোক সকল! তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, এবং এমন এক দিনকে ভয় কর যেদিন কোন পিতা তার সন্তান এবং কোন সন্তান তার পিতার কোন উপকারে আসবে না"। আল-কুরআন, সূরা লুক্বমান: ৩৩।
৩২৯. বুখারী, প্রাগুক্ত; (কিতাবুল ওয়াসায়া, বাব: নং ১১, হাল ইয়াদখুলুন নিসা-উ ওয়াল ওয়ালাদু ফিল আকারিব), ৩/১০১২; মুসলিম, প্রাগুক্ত; (কিতাবুল ঈমান, বাব:৮৯, হাদীস নং ২০৪), ১/১৯২।
৩৩০. আল-কুরআন, সূরা: ইউনুস: ৬২।
৩৩১. আমরা যে-সব সৎকর্মশীলদেরকে সাধারণত আল্লাহ তা'আলার ওলি বলে মনে করি না, সেরকম সৎকর্মশীলদের জন্য অনুরূপ অভয়বাণী উচ্চারণের বিষয়টি জানার জন্য প্রয়োজনে দেখুন: সূরায়ে বাক্বারাঃ এর ৩৮, ১১২, ২৬২, ২৭৭ নং আয়াত, সূরায়ে আলে ইমরানের ১৭০ নং আয়াত, সূরায়ে নিসা এর ৮৩ নং আয়াত, সূরায়ে আন'আমের ৪৮ নং আয়াত ও সূরায়ে আ'রাফের ৩৫ ও ৩৯ নং আয়াত। এ-সব আয়াত পাঠ করলে যে কেউই বুঝতে পারবে যে, 'আখেরাতে আল্লাহর অলিদের কোন ভয় ও চিন্তা নেই' এ অভয়বাণী শুধু তথাকথিত ওলি আল্লাহদের জন্যেই নয়, বরং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এরকম অভয়বাণী যে কোন মু'মিন ও সৎকর্মশীলদের জন্যেও রয়েছে। লেখক
৩৩২. আল-কুরআন, সূরা আ'রাফ:৩৫।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 সাধারণ মু'মিনরগণও শাফা'আত করবে

📄 সাধারণ মু'মিনরগণও শাফা'আত করবে


হিসাব-নিকাশের পর জান্নাতীগণ জান্নাতে চলে যাওয়ার পর জাহান্নামীদের জাহান্নাম থেকে বের করে আনার জন্য রাসূলুল্লাহ- সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরপর তিন থেকে চারটি শাফা'আতের পর যখন মু'মিনদের শাফা'আতের সুযোগ আসবে, উপর্যুক্ত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সে শাফা'আতের সুযোগ কেবল আমাদের কাছে পরিচিত ওলিদের জন্যেই হবে না, বরং তখন বেহেস্তবাসী যে কোনো সাধারণ মু'মিনরাও তাদের পরিচিতজনদের জন্য শাফা'আত করার সুযোগ পাবে। ولله الحمد والمنة

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 যারা কারো শাফা'আত পাবে না

📄 যারা কারো শাফা'আত পাবে না


মূলত শাফা'আত হচ্ছে জাহান্নামীদের উপর আল্লাহ তা'আলার করুণা নাযিলের একটি বিশেষ মাধ্যম। তবে এ করুণা লাভের সৌভাগ্য কেবল তাদেরই নসীব হবে যারা শির্কের মত মহা অপরাধে আল্লাহর বিচারে দন্ডিত না হয়ে অন্যান্য কবীরা গুনাহের অপরাধে দন্ডিত হয়ে জাহান্নামী হবে। আর যারা শির্কে আকবারের অপরাধে দন্ডিত হয়ে জাহান্নামী হবে তাদের জন্য সেদিন আল্লাহর কোনো করুণা নেই। কেননা, জান্নাত তাদের জন্য চিরতরে হারাম করে দেয়া হয়েছে। তাই তাদের যেমন রাসূলুল্লাহ- সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শাফা'আত পাওয়ার সৌভাগ্য হবেনা, তেমনি তাদের অপর কোনো মু'মিনদেরও শাফা'আত প্রাপ্ত হওয়ার সৌভাগ্য হবেনা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِيْ مَنْ قَالَ لا إله إِلَّا اللَّهُ خَالِصًا مِنْ قِبَلِ نَفْسِهِ».
“আমার শাফা'আত লাভে সে লোকই ধন্য হবে যে নিজ থেকে একনিষ্ঠভাবে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু এর স্বীকৃতি দান করেছে”।৩৩৩ এ কালিমার স্বীকৃতি একনিষ্ঠভাবে তারাই দিয়ে থাকবে, যারা শির্ক না করে মৃত্যুবরণ করবে। অপর হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«أتاني آت مِن عِنْدِ رَبِّي فَخَيَّرَنِي بَيْنَ أَنْ يُدْخَلَ نِصْفُ أُمَّتِي الْجَنَّةَ وَبَيْنَ الشَّفَاعَةِ، فَاخْتَرْتُ الشَّفَاعَةَ، وَهِيَ لِمَنْ لَا يُشْرِكْ بِاللَّهِ شَيْئًا»
“আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে একজন আগন্তুক আগমন করলেন এবং আমাকে আমার অর্ধেক উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করা আর শাফা'আত করার মধ্য থেকে যে কোনো একটিকে গ্রহণ করার জন্য এখতিয়ার দিলেন, তখন আমি শাফা'আতকেই বেছে নিলাম। এ শাফা'আত হবে কেবল তাদের জন্যেই যারা আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করেনি”।৩৩৪ যারা শির্কের অপরাধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাফা'আত থেকে বঞ্চিত হবে, তারা যে অন্যান্য সকল শাফা'আতকারীদের শাফা'আত পাওয়া থেকেও বঞ্চিত হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এমন ব্যক্তিদের জাহান্নামে যাওয়ার কারণ না জেনে কেউ তাদের জন্য সুপারিশ করলেও সে সুপারিশ তাদের জন্য কোনো কাজে আসবে না। তারা চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামের অধিবাসী হিসেবে সেখানে অনন্তকাল পর্যন্ত শাস্তির পর শাস্তি ভোগ করতেই থাকবে।
نعوذ بالله من الشرك ومن عذابه
উল্লেখ্য যে, হাশরের ময়দানে কোনো ওলি ও মু'মিনদের শাফা'আত করার সুযোগ না থাকা এবং জাহান্নামে প্রবেশকারীদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে নিয়ে আসার ব্যাপারে তাদের শাফা'আত হওয়া প্রসঙ্গে আমি উপরে যা বললাম, এটি আমার নিজস্ব কোনো ইজতেহাদী কথা নয়। এটি যেমন উপর্যুক্ত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, তেমনি তা মুসলিম মনীষীদের লেখনী দ্বারাও প্রমাণিত। আল্লামা ইবনু আবিল 'ইয্য আল-হানাফী (রহ.) ও তাঁর কিতাবে মু'মিনদের শাফা'আত প্রসঙ্গে উক্ত ধরনের কথাই বলেছেন।৩৩৫

টিকাঃ
৩৩৩. বুখারী, প্রাগুক্ত; (কিতাবুল ইলম, বাবুল হিরসি আলাল হাদীস, হাদীস নং-৪০), ১/১/৫৯।
৩৩৪. তিরমিযী, প্রাগুক্ত; (কিতাবু সিফাতিল কিয়ামাঃ, বাব: মা জা-আ ফীশ শাফা'আতি); পৃ.৬২৭-৬২।
৩৩৫. তিনি রাসূল এর শাফা'আতের আট নং শাফা'আতের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন: النوع الثامن : شفاعته في أهل الكبائر من أمته ، ممن دخل النار ، فيخرجون منها ، و قد تواترت بهذا النوع الأحاديث ... وهذه الشفاعة تشاركه فيها الملائكة والنبيون و المؤمنون أيضا - ". দেখুন : ইবনু আবিল ইয্য আল- হানাফী, প্রাগুক্ত; পৃ. ২৫৪-২৫৯।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 আখেরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শাফা'আতের সংখ্যা

📄 আখেরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শাফা'আতের সংখ্যা


আখেরাতে রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কতবার শাফা'আত করবেন, এ-নিয়ে মুসলিম মনীষীদের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। ইবন আবিল ইয্য আল-হানাফীর (রহ.) মতে রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-মোট আটবার শাফা'আত করবেন।৩৩৬ ইমাম নববী (রহ.) এর মতে মোট পাঁচবার ৩৩৭ এবং 'তাইসীরুল আযীযিল হামীদ' এর গ্রন্থকার মোট ছয়বারের কথা বলেছেন।৩৩৮ তাঁরা সংখ্যা বর্ণনার ক্ষেত্রে মতবিরোধের পাশাপাশি উভয় পর্যায়ের শাফা'আতকে একত্রিত করে বর্ণনা করেছেন। কতটি হাশরের ময়দানে এবং কতটি পরে হবে, তা ভিন্নভাবে উল্লেখ করেন নি। ফলে এ বিষয়ে যাদের গভীর জ্ঞান থাকবে না, তারা তা অধ্যয়ন করলে এ-কথা ভাবতে পারেন যে, রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-বোধ হয় হাশরের ময়দানে তাঁর শাফা'আতের মাধ্যমে সকল অপরাধীদেরকে মুক্ত করে নেবেন। ফলে মুশরিক নয় এমন সকল অপরাধী মু'মিনরাই জাহান্নামে প্রবেশের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যাবে। অনুরূপভাবে তাদের আরো মনে হবে যে, মু'মিনগণ তাঁদের ভক্তদের জন্য রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মতই হাশরের ময়দানে শাফা'আত করবেন। অথচ এ ধারণা যে আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসদ্বয়ের পরিপন্থী, তা সে হাদীস অধ্যয়ন করলে যে কেউই বুঝতে পারবে।

টিকাঃ
৩৩৬. তদেব।
৩৩৭. ইমাম নববী, শরহু সহীহ মুসলিম; (স্থান বিহীন: ১ম সংস্করণ, ১৯২৯ খ্রি.), ১/৩/৩৫।
৩৩৮. শেখ সুলাইমান ইবনে আব্দিল্লাহ, প্রাগুক্ত; পৃ. ২৯৪-২৯৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00