📄 কোন কোনো শরী'আতী পীরদের দৃষ্টিতে শাফা'আত
শরী'আত পালন করেন এমন এক শ্রেণীর পীরগণকেও শয়তান তাঁদের নিজেদের এবং তাদের শাফা'আতের ব্যাপারে তাদেরকে মারাত্মক বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে রেখেছে। তাদের নিজেদের ব্যাপারে তাদেরকে এমন ধারণা দিয়েছে যে, তারা আল্লাহর উপাসনা ও তাকওয়ার পথ অবলম্বন করার ফলে আল্লাহর ওলিতে পরিণত হয়েছেন। যার ফলে আখেরাতে তাদের নিজেদের মুক্তির বিষয়ে তাদের কোনো চিন্তা নেই। সে দিন তারা শুধু নিজেদের মুরীদদের মুক্তির ব্যাপার নিয়েই ব্যতিব্যস্ত থাকবেন। হাশরের ময়দানে হিসাব-নিকাশ চলাকালে তাদের কোনো ভক্তের পা পিছলে গেলে তাঁরা তাকে হাত ধরে টেনে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। উদাহরণস্বরূপ চরমোনাইর পীর মাওলানা মুহাম্মদ এছহাক মরহুমের কথাই বলা যায়, তিনি একাধিক পীরের হাতে বায়'আত করা বৈধ হওয়া ও এর উপকারিতা বর্ণনা প্রসঙ্গে স্বীয় পীর মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী (রহ.) সাহেবের একটি বক্তব্য উপস্থাপন করেন। মাওলানা কারামত আলী বলেন:
"একদা আমার পীর মাওলানা সৈয়দ আহমদ সাহেব-এর কাছে কোনো এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিলেন যে, হুজুর যেসব লোক দুই তিন পীরের কাছে মুরীদ হন, কেয়ামতের দিন পীরগণ ঐ মুরীদকে আপন আপন দিকে টানাটানি করিয়া ছিঁড়িয়া ফেলিবে নাকি? তখন উত্তর করিলেন, কেয়ামতের দিন পা পিছলাইয়া যাওয়ার দিন; টানাটানি করিয়া ছিঁড়িয়া ফাড়িয়া ফেলিবার দিন নহে। যখন কোনো ব্যক্তির পা পিছলাইয়া যায়, তখন একা এক ব্যক্তি হাত ধরিয়া তাহাকে সাহায্য করিলে তাহার খুব শক্তি হয়, কিন্তু যখন দুই-তিন ব্যক্তি তাহার হাত ধরে, তখন তাহার শক্তি আরও বাড়িয়া যায়। মাওলানা কারামত আলী মরহুম সাহেব এই কথার উত্তরে বলেন, ছোবহানাল্লাহ! কি সুন্দর দেল আকর্ষণীয় উত্তর দিয়াছেন। সত্যই কেয়ামতের অবস্থা এইরূপ হইবে এবং আল্লাহর হুকুমে সেই দিন নিঃসন্দেহে পীরগণ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশা করা যায় এবং তিনি দো'আ করিয়া বলেন, আল্লাহ পাক হক্কানী পীরদের উপর মুরীদদের এ'তেকাদ ঠিক রাখুন"।২৯৩
হাশরের ময়দানে পীরদের কর্তৃক মুরীদদের সাহায্য ও সহযোগিতা সংক্রান্ত, কোন কোনো পীরগণের উক্ত বিশ্বাসের প্রতি লক্ষ্য করলে কয়েকটি বিষয় প্রমাণিত হয়। যেমন:
১. ওলি ও পীরগণ নিজেদেরকে একেকজন কামিল মানুষ বলে মনে করেন। অথচ কুরআনের শিক্ষানুযায়ী কারো পক্ষে নিজের ব্যাপারে এমন ধারণা করা সঠিক নয়।
২. হাশরের ময়দানের ভয়াবহ অবস্থা দৃশ্যে তাদের মনে নিজেদের মুক্তির ব্যাপারে কোনো ভয়-ভীতির উদ্রেক হবে না। অথচ কুরআন শরীফে হাশরের ময়দানে সকল মানুষের যে অবস্থার কথা বর্ণিত হয়েছে, তা সে বর্ণনার পরিপন্থী।
৩. তারা হাশরের ময়দানে বিচার চলাকালীন সময়ে তাদের বিপদগ্রস্ত মুরীদদের ব্যাপারে সুপারিশ করার অনুমতি পাবার ব্যাপারে নিশ্চিত। অথচ হাদীসের বর্ণনানুযায়ী হাশরের ময়দানে কোনো ওলির এ-জাতীয় শাফা'আত স্বীকৃত নয়। বরং তাঁদের শাফা'আত স্বীকৃত হয়েছে কেবল জাহান্নামীদের জাহান্নাম থেকে বের করে আনার ব্যাপারে। যা আমরা পরবর্তী আলোচনার দ্বারা জানতে পারবো।
টিকাঃ
২৯৩. মাওলানা মুহাম্মদ এছহাক, ভেদে মা'রেফত; পৃ.২৫-২৬।
📄 কোনো মানুষই নিজেকে সৎ মানুষ হওয়ার সনদ দিতে পারে না
মানুষ যতই আল্লাহর উপাসনা ও তাকওয়ার পথ অবলম্বন করুক না কেন, বেশী হলে সে তার 'আমল আল্লাহর কাছে গৃহীত হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হতে পারে। কোনো অবস্থাতেই তা গৃহীত হয়েছে বলে নিশ্চিত হতে পারেনা। তার 'আমলের অবস্থা যা-ই হোক না কেন, তিনি এ নিয়ে কোনো প্রকার আত্মতৃপ্তিও বোধ করতে পারেন না। নিজেকে আল্লাহর কাছে অতি সম্মানী ও মর্যাদাবান বলেও মনে করতে পারেন না। কেননা, কে প্রকৃত মুত্তাকী ও পরহেজগার তা কেবল আল্লাহই ভাল করে জানেন। কেউই নিজেকে পরিশুদ্ধ মানুষ হওয়ার সনদ দিতে পারে না। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন:
﴿فَلَا تُزَكُّوا أَنفُسَكُمْ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَى ﴾
"অতএব তোমরা নিজেকে পরিশুদ্ধ মানুষ হওয়ার সনদ দান করো না, তোমাদের মধ্যে কে মুত্তাকী তা তিনিই ভাল করে জানেন"।২৯৪ একজন মু'মিন যখন এ-কথা বলতে পারে না যে, আমি একজন মুত্তাকী ও পরহেজগার হয়ে গেছি, তখন সে তো কখনও নিজেকে আল্লাহর কাছে বড় মর্যাদার অধিকারী বলেও ভাবতে পারে না। সে নিজের মর্যাদার ওসীলায় আখেরাতে মানুষের মুক্তির জন্য শাফা'আত করা নিয়ে ভাবা তো দুরের কথা, এ দুনিয়াতেও সে তার নিজের মর্যাদা ও সম্মানের দোহাই দিয়ে আল্লাহর কাছে তার নিজের বা পরের জন্য কিছু চাওয়াকেও বৈধ মনে করতে পারে না। বরং এ-জাতীয় চাওয়াকে সে আল্লাহর সমীপে বেআদবী ও অনধিকার চর্চা করা বলেই গণ্য করবে। এ-সব চিন্তা-ভাবনা করার বদলে একজন মু'মিনের অন্তর সর্বদা আল্লাহর কাছে বিনয়ী হয়ে থাকবে। আল্লাহর শাস্তির ভয়ে তার অন্তর সর্বদা আতঙ্কিত থাববে। কখনও নিজেকে আল্লাহর শাস্তি থেকে নিরাপদ ভাবতে পারবে না।
যেমন এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَالَّذِينَ يُصَدِّقُونَ بِيَوْمِ الدِّينِ وَالَّذِينَ هُم مِّنْ عَذَابِ رَبِّهِم مُّشْفِقُونَ * إِنَّ عَذَابَ رَبِّهِمْ غَيْرُ مَأْمُونٍ ﴾
"এবং যারা প্রতিফল দিবসকে সত্য বলে বিশ্বাস করে এবং যারা তাদের পালনকর্তার শাস্তি সম্পর্কে ভীত-সন্ত্রস্ত, নিশ্চয় তাদের পালনকর্তার শাস্তি থেকে শঙ্কাহীন থাকা যায় না"।২৯৫ এই যদি হয় একজন প্রকৃত মু'মিনের বৈশিষ্ট্য তখন একজন পীর আখেরাতে কীভাবে নিজেদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে এতো নিরাপদ ভাবতে পারেন। সত্যিই তা আশ্চর্যের বিষয়!
টিকাঃ
২৯৪. আল-কুরআন, সূরা: নাজম:৩২।
২৯৫. আলকুরআন, সূরা: মা'আরিজ: ২৭-২৯।
📄 কুরআন ও হাদীসের আলোকে শাফা'আতের মূলকথা
কুরআন ও হাদীস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ইসলাম শাফা'আত বা সুপারিশকে দু'ভাগে বিভক্ত করেছে:
এক. দুনিয়াবী বিষয়ে শাফা'আত।
দুই. পরকালীন বিষয়ে শাফা'আত।
📄 দুনিয়াবী বিষয়ে আল্লাহর কাছে শাফা'আত
কোন জীবিত মানুষের নিকট যেয়ে দুনিয়াবী কোনো বিষয়ে আল্লাহর কাছে সুপারিশ বা শাফা'আত করার জন্য তাকে বলা যেতে পারে। তিনিও দু'টি কথা বলে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তির জন্য শাফা'আত করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে শাফা'আতকারীর সবচেয়ে পরহেজগার হওয়া কোনো জরুরী ব্যাপার নয়। বরং অপেক্ষাকৃত কম পরহেজগার লোকের কাছেও এ-জাতীয় শাফা'আত চাওয়া যেতে পারে। কেননা, আল্লাহর কাছে শাফা'আতের ক্ষেত্রে মূল ওসীলা হচ্ছে ব্যক্তির মুখের দুটি কথা, ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, তার মর্যাদা ও সম্মান নয়। কোনো দুনিয়াবী বিষয়ে শাফা'আত করার জন্য কোনো অনুপস্থিত বা মৃত মানুষের কাছে কোনো আবদার করা যায়না। কেননা, জীবিতরা কোনো গায়েবের আওয়াজ শুনতে পারেন না। আর মৃতদের কবরের পার্শ্বে যেয়ে তাদের কাছে সুপারিশের জন্য কোনো আবেদন করলে কুরআনের কথানুযায়ী তারা কারো কোনো আবেদন শুনতে পান না, পেলেও তারা কারো আবেদনে সাড়া দিতে পারেন না।২৯৭ সকল মানুষই মরে যাওয়ার পর বরযখী জীবনে তারা নিজের বা পরের উপকারে আসতে পারে এমন কোনো কর্ম করতে পারেন না। তাদের রূহ স্বেচ্ছা প্রণোদিত হয়ে আমাদের জন্যে কোনো কল্যাণ কামনা করে দো'আ করলেও আল্লাহর নিকট এর কোনো কার্যকারিতা নেই। কেননা, কবরের জীবন সে রকম কোনো 'আমলের জীবন নয়। এ-জন্যই রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-বা কোনো ওলির কবরে গিয়ে বা দূর থেকে তাঁদের কাছে নিজের জন্য কোনো দো'আ করার আবেদন করা যায় না। সাহাবা ও তাবেঈগণের যুগে মুসলিমরা বহুবিধ সমস্যায় পতিত হয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা কখনও রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবর মুবারকে যেয়ে তাঁর নিকট সমস্যা সমাধানের জন্য আল্লাহর নিকট দো'আ করার ব্যাপারে কোনো আবেদন করেছেন বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।
টিকাঃ
২৯৭. এ সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে: إِن تَدْعُوهُمْ لَا يَسْمَعُوا دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُوا مَا اسْتَجَابُوا لَكُمْ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكْفُرُونَ بشرككُمْ [فاطر: ١٤] মৃত মানুষেরা উপকার করতে পারে এ ধারণার ভিত্তিতে তাদের নামে নির্মিত মূর্তিকে লক্ষ্য করে "তোমরা যদি তাদেরকে উপকারের জন্য আহবান কর, তা হলে তারা তোমাদের আহবান শ্রবণ করবে না, শুনলেও তারা তোমাদের আহবানে সাড়া দেবে না। (তাদেরকে আহবানজনিত কারণে তোমরা যে শির্ক করেছ) কেয়ামতের দিন তারা তোমাদের সে শির্ককে অস্বীকার করবে”। অর্থাৎ বলবে: আমরা তোমাদেরকে আমাদেরকে আহবানের কথা শিক্ষা দেই নি। এটি তোমাদের মনগড়া কাজ বৈ আর কিছুই নয়। আল-কুরআন, সূরা ফাত্বির :১৪।