📘 শিরক কি ও কেন > 📄 কুরআনে বর্ণিত ওসীলা শব্দের অপব্যাখ্যা

📄 কুরআনে বর্ণিত ওসীলা শব্দের অপব্যাখ্যা


কিন্তু কালের পরিক্রমায় এক শ্রেণীর মানুষেরা তাঁদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। ধর্মীয় জ্ঞানের অভাবের সুযোগে শয়তান তাদের মাঝে ওসীলা সম্পর্কে ভুল ধারণা দিতে সক্ষম হয়। একশ্রেণীর মানুষকে এ ধারণা দিতে সক্ষম হয় যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া ও আখেরাতে মুক্তি পাওয়ার জন্য শুধুমাত্র ঈমান ও 'আমলে সালেহ করাই যথেষ্ট নয়। এ জন্য প্রয়োজন রয়েছে একজন ওলির হাতে বায়'আত ও তাঁর ওসীলা গ্রহণ। যেমন একজন পীর বায়'আতের প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা প্রসঙ্গে উক্ত আয়াতে বর্ণিত ওসীলা শব্দের অর্থ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন:

"আমরা দুনিয়াতে দেখি কোনো কাজই ওসীলা ব্যতীত হয় না, আর সে জন্যই আল্লাহ বলেছেন: )وابتغوا إليه الوسيلة( "আল্লাহ পাকের মহববত অর্জন করার জন্য অছিলা তালাশ কর।" এ আয়াতের সরল অর্থ বর্ণনা করার পর এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ওসীলা অন্বেষণ করা দ্বারা যে আল্লাহ তা'আলা তাঁর উপর ঈমান ও 'আমলে সালেহ করার মাধ্যমেই তাঁর নৈকট্য অন্বেষণ করতে বলেছেন, তিনি এ কথা না বলে বলেছেন: আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য "একজন পীরের হাতে বায়'আত কর।" ভাবটা যেন এমন যে, কোনো পীরের হাতে বায়'আত করলেই যেন সাধারণ মানুষের জান্নাতে যাওয়ার পথ সুগম হয়ে গেল। একজন সাধারণ মানুষ একজন শরী'আতী পীরের হাতে বায়'আত করলে এতে তার পক্ষে শরী'আত সম্পর্কে জানা এবং সে অনুযায়ী 'আমল করা সহজ হবে- তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু পীর সাহেব যদি নিজেকে সাধারণ মানুষের ত্রাণকর্তা ভাবতে শুরু করেন, আর মুরীদ switch দরা যদি পীর ব্যতীত মুক্তির কোনো পথ নেই বলে ভাবতে থাকে, তা হলেই তো সমস্যার সৃষ্টি হয়। অপরাধীরা যতই অপরাধ করুক না কেন, তাদের ক্ষমা করে দেয়ার জন্য আল্লাহর দরজা সব সময়ই উন্মুক্ত। তাওবায়ে নাসূহা তথা খাঁটি তাওবা করলেই তিনি তাদের অপরাধ মার্জনা করেন। এ সত্যটি কুরআনের বিভিন্ন আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়ে থাকলেও পীর সাহেবগণ তা বেমালুম ভুলে যান। তারা বলেন-অনেক অপরাধ করলে না কি আল্লাহ অপরাধীদেরকে কোনো পীরের ওসীলা ব্যতীত মাফ করতে চান না। যেমন উক্ত পীর সাহেব এ সম্পর্কে বলেন:

"বান্দার গুনাহ যখন অধিক হয়ে যায়, তখন কোনো মাধ্যম ব্যতীত সরাসরি আল্লাহর কাছে তাওবা করলে আল্লাহ তা মাফ করতে চান না, কিন্তু যখন তার পীর এখলাসের সাথে তার জন্য আল্লাহর কাছে দো'আ করেন, তখন তিনি তার তাওবা কবুল করেন অথবা পীরের দো'আর বরকতে তার তাওবা কবুল হওয়ার আশা করা যায়।" পীরের হাতে বায়'আত ও পীরের ওসীলা ব্যতীত কারো মুক্তি নেই, এ কথা প্রমাণ করার জন্য তিনি তাঁর কিতাবে ইমাম ফখরুদ্দীন রাযীর মৃত্যুকালীন সময়ে ঘটিত ঈমান হননকারী একটি অদ্ভুত ঘটনারও উল্লেখ করেছেন।

শয়তান অপর এক শ্রেণীর লোকদেরকে ওসীলা সম্পর্কে এ ধারণা দিয়েছে যে, আল্লাহর নিকবর্তী হওয়া ও আখেরাতে মুক্তির জন্য শরী'আত পালনের খুব একটা আবশ্যকতা নেই। এ-জন্য মূলত প্রয়োজন ওলিদের সাহচর্য, তাঁদের সন্তুষ্টি ও ভালবাসা। এ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ওলিদের শিক্ষার অনুসরণ ও অনুকরণ করার বদলে সে তাদেরকে তাঁদের কবর ও কবরকে কেন্দ্র করে এমন সব কর্ম করতে লিপ্ত করেছে, যার কারণে তারা তাঁদেরকে উপাস্যে এবং নিজেদেরকে তাঁদের উপাসকে পরিণত করেছে। উদাহরণস্বরূপ কোনো ওলির কবর বা কবরের খেদমত করা, সেখানে নামায আদায় করা, কবরের পার্শ্বে অবস্থান গ্রহণ করা, ও এর চারপার্শ্বে প্রদক্ষিণ করার কথা উল্লেখ করা যায়। এগুলো কা'বা শরীফকে কেন্দ্র করে করলে তা আল্লাহর উপাসনা হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। কিন্তু কোনো কবর বা কবর আল্লাহর উপাসনার স্থান না হওয়ায় সেখানে এ সব কাজ করলে তা সংশ্লিষ্ট কবর বা কবরবাসীর সান্নিধ্য অর্জন ও তাঁর উপাসনা হিসেবে গণ্য হবে। কেননা, কোনো উপাসনা খালিসভাবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে হওয়ার জন্য পূর্ব শর্ত হচ্ছে তা শির্কমুক্ত স্থানে হতে হবে এবং তা এককভাবে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যেই হতে হবে, তা না হলে হাদীস অনুযায়ী তা শির্কী কর্ম হিসেবে গণ্য হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: আল্লাহ তা'আলা বলেন- مَنْ عَمِلَ عَمَلاً أَشْرَكَ فِيْهِ مَعِي غَيْرِي تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ وَجَعَلْتُ الْعَمَلَ لِلَّذِي أَشْرَكَهُ
"যে ব্যক্তি কোনো কাজে আমার সাথে অপরকে শরীক করে নিল, আমি তাকে ও তার কাজকে ছেড়ে দেই এবং সে কাজটি তার জন্যই দিয়ে দেই, যাকে সে উক্ত কাজে শরীক করেছে।"

টিকাঃ
২০২. মাওলানা মোহাম্মদ এছহাক (পীর চরমোনাই), ভেদে মা'রিফাত; পৃ. ১১।
২০৩. সম্ভবত: লেখক 'শরীয়তী পীর' বলে সত্যিকার আলেমদের বুঝিয়েছেন, নতুবা পীর শব্দটি ইসলামের কোনো গ্রহণযোগ্য শব্দ নয়। শরীয়তী পীর বলতে কিছু নেই। তাছাড়া আলেমের হাতেও বাই'আত হওয়ার অধিকার নেই; কারণ বাই'আত শরী'য়তের পরিভাষা, শরী'য়ত নির্ধারিত স্থানেই তা করতে হয়। শাসক ও যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা পরিচালকের নিকট ব্যতীত আরও কারও নিকট তা হওয়া জায়েয প্রমাণিত হয় নি। [সম্পাদক]
২০৪. তদেব; পৃ. ২৪।
২০৫. ঘটনাটি নিম্নরূপ: একদা ইমাম ফখরুদ্দিন রাযী একজন পীরের হাতে বায়'আত গ্রহণ করতে ইচ্ছা করে সে পীরের কাছে গমন করেন। পীর সাহেব বললেন: তোমার মধ্যে ইলমে মা'রেফাত প্রবেশ করাবার কোনো স্থান নেই বিধায়, আমি তোমার বায়'আত নিতে পারবো না। ফলে ইমাম রাযী হতাশ হয়ে ফিরে আসেন। পীর বিহীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যুর সময়ে শয়তান কুমন্ত্রণা দিতে আসলে পীর ছাড়া তাঁর কী অবস্থা হবে, এ নিয়ে তিনি খুব ভাবতে থাকলেন। অতঃপর তাঁর মৃত্যুকালীন সময়ে শয়তান এসে তাঁর নিকট আল্লাহর ব্যাপারে নানা প্রশ্ন উত্থাপন করতে থাকে, যার ফলে ঈমান বিহীন অবস্থায়ই তাঁর মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার উপক্রম হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক এমন সময় অযুরত অবস্থায় বহু দুর থেকে কশফের মাধ্যমে সে পীর সাহেব তাঁর এ অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হন, তখন তিনি ইমাম রাযী যে দিকে সেদিকে পানি ছিটিয়ে দিলেন এবং ইমাম রাযীকে লক্ষ্য করে বলেন: শয়তানকে বল, বিনা দলীলে আল্লাহ একজন, আল্লাহর এক হওয়ার জন্য কোন দলীলের প্রয়োজন নেই। তদেব; পৃ. ৩১-৩২। (বস্তুত: এটি একটি গাঁজাখুরি গল্প, ইমাম রাযীর জীবনে বা অন্য কারও জীবনে এটা ঘটে নি। [সম্পাদক])
২০৬. মুসলিম, প্রাগুক্ত; ৪/২২৮৯; ইবনে কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আজীম; ২/৪৯৫।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 ওসীলার মূলকথা

📄 ওসীলার মূলকথা


‘ওসীলা’ (وَسِيلَة) শব্দটি আভিধানিক দিক থেকে মাধ্যম (Media) ও নৈকট্য এর অর্থ প্রকাশ করে থাকে। উপরে বর্ণিত আয়াতে ‘ওসীলা’ শব্দেটিকে উভয় অর্থে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সাহাবা, তাবেঈন ও বিশিষ্ট মনীষীগণ অত্র আয়াতে এ শব্দটিকে ‘মাধ্যম’ অন্বেষণের অর্থে ব্যবহার না করে ‘নৈকট্য’ অন্বেষণের অর্থে ব্যবহার করেছেন। ফলে তাঁদের মতে এ আয়াতের অর্থ হচ্ছে- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং (ঈমান ও ‘আমলে সালেহ দ্বারা) তাঁর নৈকট্য অন্বেষণ কর”। বিশিষ্ট তাবেঈ ক্বাতাদাঃ (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:

"تقربوا إليه بطاعته والعمل بما يرضيه"

“তাঁর আনুগত্য এবং যে-সব কাজ তাঁকে সন্তুষ্ট করে সে- সব কাজের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য ও সান্নিধ্য অন্বেষণ কর”। যদি ‘ওসীলা’ শব্দটিকে ‘মাধ্যম’ অর্থে ব্যবহার করা হয় তা হলে উক্ত আয়াতের অর্থ হবে: “তাঁর নিকটবর্তী হওয়ার জন্য মাধ্যম অন্বেষণ কর”। যদি এই অর্থ করা হয় তা হলে প্রশ্ন দাঁড়াবে, মাধ্যম বলতে এখানে কী উদ্দেশ্য করা হয়েছে? এ প্রশ্নের স্বাভাবিক জবাব হচ্ছে- ঈমান ও ‘আমলে সালেহ করে এ দু’য়ের মাধ্যমে তাঁর নিকটবর্তী হতে চাও। ‘আমলে সালেহ এর মধ্যে জীবিত সৎ মানুষদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা, তাঁদের সান্নিধ্যে থাকা, নবী-রাসূল ও ওলিগণকে ভালবাসা, তাঁদের শিক্ষার অনুসরণ ও অনুকরণ করা ইত্যাদি বিষয়াদি থাকলেও মৃত বা জীবিত কোনো ওলিদের ব্যক্তিত্ব, তাঁদের মর্যাদা ও নামের মাধ্যম করে আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়ার অর্থটি এখানে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায় বা তাঁর ওফাতের পরেও তাঁর সাহাবীদের মাঝে তাঁর মর্যাদা ও নাম নিয়ে এমন ওসীলার কোনো প্রচলন ছিল না। যে সব সহীহ হাদীস দ্বারা বাহ্যত এমন কিছু বুঝা যায়, আসলে সে সবের দ্বারা তাঁর দো'আর ওসীলাই উদ্দেশ্য করা হয়েছে। ব্যক্তি রাসূল, তাঁর নাম ও মর্যাদার ওসীলা উদ্দেশ্য করা হয় নি। এ প্রসংগে কিছু মরফু' ও মাওকুফ হাদীস বর্ণিত হয়েছে ঠিকই, তবে হাদীস বিশেষজ্ঞদের মতে তা দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু তা সত্ত্বেও কিছু কিছু আলেম ও পীরদের মুখে এমনকি কোনো কোন তাফসীরকারকদের কলমেও এ আয়াতের ব্যাখ্যায় শয়তান এ অপ্রাসঙ্গিক অর্থটি জুড়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। যেমন মাওলানা মুফতী শফী' এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাঁর তাফসীর গ্রন্থে এ অর্থটি জুড়ে দিয়ে লিখেছেন:

“ওসীলা শব্দের আভিধানিক ব্যাখ্যা এবং ছাহাবী ও তাবেয়ীগণের তফসীর থেকে জানা গেল যে, যে বস্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের মাধ্যম হয়, তা-ই মানুষের জন্য আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার ওসীলা। ঈমান ও সৎ কর্ম যেমন এর অন্তর্ভুক্ত, তেমনি পয়গম্বর ও সৎ কর্মীদের সংসর্গ এবং মহববতও এর অন্তর্ভুক্ত। কেননা, এগুলোও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভেরই উপায়। এ কারণেই তাঁদেরকে ওসীলা করে আল্লাহর দরবারে দোয়া করা জায়েয।”

এখানে তিনি “তাঁদেরকে ওসীলা করে আল্লাহর দরবারে দোয়া করা জায়েয” এ মর্মে যে কথাটি বলেছেন এর দ্বারা তিনি যদি এ উদ্দেশ্য করে থাকেন যে, জীবিত ওলিদেরকে সাথে নিয়ে তাঁদের দো'আর ওসীলায় দো'আ করা জায়েয, তা হলে তাতে আপত্তির কিছু নেই। তবে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার ওসীলা হিসেবে পয়গাম্বর ও সৎ কর্মীদের সংসর্গ ও মহববতের কথা বলার পর এ কথাটি পৃথক করে বলাতে প্রমাণিত হয় যে, আসলে তিনি তাঁর এ কথার দ্বারা তা উদ্দেশ্য করেন নি। বরং মৃত নবী ও ওলিদের মর্যাদা এবং তাঁদের নামের ওসীলায় আল্লাহ তা'আলার নিকট দো'আ করার যে প্রচলন সমাজে রয়েছে, সে ওসীলার কথাই তিনি তাঁর এ কথার দ্বারা উদ্দেশ্য করেছেন। অথচ তা সম্পূর্ণ একটি ভ্রান্ত কথা। যার সাথে এ আয়াতে বর্ণিত নির্দেশের আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। এমন কি ওসীলা সম্পর্কে তিনি এ কথার পর যা বলেছেন তার সাথেও তাঁর এ কথার আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। কেননা, নেক মৃত মানুষের মহববত করা এক জিনিস আর তাঁদের নামের ওসীলায় দো'আ করা একটি ভিন্ন জিনিস। প্রথমটি মানুষের ঈমানের পরিচায়ক, আর অপরটি শরী'আত বহির্ভুত একটি বেদ'আতী কর্ম। কিন্তু তা সত্ত্বেও শয়তান তাঁর মত ব্যক্তি ও অন্যান্য পীরদের মুখ ও লেখনীতে এ কথাটিকে চালিয়ে দিয়ে অজ্ঞ ও মুর্খ মুসলিমদেরকে পথভ্রষ্ট করার একটি উত্তম সুযোগ করে নিয়েছে।

কুরআনে বর্ণিত 'ওসীলা' শব্দের অর্থ বর্ণনার ক্ষেত্রে তারা যদি তাদের সলফগণের পদাঙ্ক অনুসরণ করতেন, তা হলে সমাজে 'ওসীলা' ধরা নিয়ে শয়তান এতো বিভ্রান্তি ছড়াতে পারতো না।

'ওসীলা' শব্দটি কুরআনে করীমের মোট দু'স্থানে বর্ণিত হয়েছে। একটির কথা উপরে বর্ণিত হয়েছে। আর অপরটি বর্ণিত হয়েছে সূরা ইসরাতে। আল্লাহ তা'আলা বলেন :

أُوْلَبِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَى رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ وَيَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ [الاسراء: ٥٧]
"মুশরিকরা যাদেরকে (হিত সাধন বা অনিষ্ট রোধের জন্য) আহ্বান করে তারা নিজেরাই (এখন) তাদের রবের অধিক নিকটবর্তী হওয়ার ক্ষেত্রে ওসীলা অন্বেষণে প্রতিযোগিতা করে, তাঁর রহমত কামনা করে এবং তাঁর আযাবকে ভয় করে"।

এ আয়াতে বর্ণিত ‘ওসীলা’ শব্দটিকেও উপর্যুক্ত আয়াতে বর্ণিত ‘ওসীলা’ শব্দের ন্যায় ওসীলার উভয় অর্থেই ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ছাড়া সহীহ হাদীসে আজানের পর পঠিত দো'আর মধ্যেও ‘ওসীলা’ শব্দটি বর্ণিত হয়েছে। তবে সেখানে তা আভিধানিক অর্থে ব্যবহৃত না হয়ে একটি মর্যাদাপূর্ণ স্থানের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

سَلُوا الله لِي الْوَسِيلَةَ فَإِنَّهَا دَرَجَةً فِي الْجَنَّةِ لَا تَنْبَغِي إِلَّا لِعَبْدٍ مِنْ عِبَادِ اللَّهِ فَمَنْ سَأَلَ لِي الْوَسِيلَةَ حَلَّتْ لَهُ الشَّفَاعَةُ
“তোমরা আজানের পর আমার জন্য আল্লাহর নিকট ওসীলা কামনা কর। কেননা, তা এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ স্থান যা আল্লাহর বান্দাদের মধ্য থেকে কেবল একজন বান্দার জন্যেই শোভা পাবে। যে আমার জন্য ওসীলা কামনা করবে তার জন্য আমার শাফা'আত হালাল হয়ে যাবে।”

উক্ত বর্ণনার দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, 'ওসীলা' শব্দটি কুরআন ও হাদীসে মোট দু'টি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। একটি হচ্ছে- নৈকট্য বা নৈকট্যের মাধ্যম অর্থে। আর অপরটি হচ্ছে মর্যাদাপূর্ণ স্থান এর অর্থে। আর নৈকট্যের মাধ্যম এর অর্থে এটিকে গ্রহণ করলে এর অর্থ দাঁড়ায়- ঈমান, সৎকর্ম, মৃত নবী ও নেক মানুষদের ভালবাসা, তাঁদের আদর্শ অনুসরণ, জীবিত নেক মানুষের সাহচর্য গ্রহণ, তাঁদের দো'আ, ভালবাসা ও তাঁদের আদর্শ অনুসরণ ইত্যাদির ওসীলায় আল্লাহর নৈকট্য অন্বেষণ করা। স্রেফ তাঁদের নাম ও মর্যাদার ওসীলায় বা তাঁদের কবরের পার্শ্বে বসে আল্লাহর নৈকট্য অন্বেষণ ও এর ওসীলায় ইহ-পরকালীন কিছু চাওয়া নয়।

টিকাঃ
২০৭. এ অর্থটি প্রাচীন কোনো অভিধান দ্বারা সমর্থিত নয়। বরং অভিধানবিদদের মধ্যে যারাই এ অর্থ উল্লেখ করেছেন, তারাই শব্দটির সাথে নৈকট্য কথাটিও জুড়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ তারা বলেছেন, আমল বা কাজ করার মাধ্যমে নৈকট্য। সুতরাং ওসীলা শব্দের অর্থ শুধু ‘মাধ্যম’ বা ‘মিডিয়া’ করা পরবর্তী অনারব বা অনারবদের দ্বারা প্রভাবিত আরবদের সংযোজন। [সম্পাদক]
২০৮. ইবনুল আছীর, আন-নেহায়াতু ফী গারীবিল হাদীসি ওয়াল আছার; (বৈরুত: আল-মাকতাবাতুল ইলমিয়্যাহ, সংস্করণ বিহীন, সন বিহীন), ৫/১৮৫; ইবনে মানযূর আল-আফরীক্বী, লেসানুল আরব; ১১/৭২৪।
২০৯. বিশিষ্ট তাবেঈ আবু ওয়াইল, হাসান, মুজাহিদ, ক্বাতাদাহ, ‘আত্বা ও সুদ্দি এ আয়াতে বর্ণিত ‘ওসীলা’ শব্দটিকে ‘কুর্বাত’ তথা নৈকট্য অর্থে ব্যবহার করেছেন। দেখুন: কুরতবী, প্রাগুক্ত; ৬/১৫৯; ত্ববারী, প্রাগুক্ত; ৬/২২৫।
২১০. ইবনে কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল ‘আজীম; ২/৫৩।
২১১. ইবনে তাইমিয়্যাহ, আত-তাওয়াসসুলু ওয়াল ওয়াসীলাতু; পৃ.৪৭।
২১২. মাওলানা মুফতী শফী', প্রাগুক্ত; পৃ. ৩২৭।
২১৩. আল-কুরআন, সূরা ইসরা বা বনী ইসরাঈল: ৫৭।
২১৪. আমরা আগেই বলেছি যে, ওসীলা দ্বারা শুধু ‘মাধ্যম’ অর্থ নেওয়া কোনো গ্রহণযোগ্য অভিধানবিদের মত ছিল না। [সম্পাদক]
২১৫. ইবনে খুযায়মাহ, মুহাম্মদ, সহীহ; সম্পাদনা: ড. মুহাম্মদ মুস্তফা আল- আ'জমী, (বৈরুত: আল-মাকতবুল ইসলামী, সংস্করণ বিহীন, ১৯৭০ খ্রি.), ১/২১৮।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 আল্লাহর নিকট কোনো মানুষের নাম বা মর্যাদার ওসীলায় কিছু চাওয়া যায় না

📄 আল্লাহর নিকট কোনো মানুষের নাম বা মর্যাদার ওসীলায় কিছু চাওয়া যায় না


প্রকৃতকথা হচ্ছে- একজন মানুষ অপর কোনো মানুষের নিকট থেকে তার কোনো উদ্দেশ্য সহজে হাসিল করার জন্য তৃতীয় কোনো গণ্যমান্য ব্যক্তির নামের মাধ্যমে তার কাছে তা চাইতে পারে এবং দ্বিতীয় ব্যক্তিও তৃতীয় ব্যক্তির নাম শুনে তিনটি কারণে প্রথম ব্যক্তির চাহিদা ও আবদার পূর্ণ করতে পারেন। কারণগুলো হচ্ছে:
১. দ্বিতীয় ব্যক্তি তৃতীয় ব্যক্তির নাম শুনে তার মর্যাদার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তা করতে পারেন।
২. তৃতীয় ব্যক্তির সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কায় তিনি তা করে দিতে পারেন।
৩. তৃতীয় ব্যক্তির নিকট থেকে তার নিজের কোনো প্রয়োজন হাসিল করার জন্য তা করে দিতে পারেন।

মানুষ মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষী হয়, একে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয় বলে তাদের মাঝে এ ধরনের ওসীলা চলতে পারে। মহান আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী না হওয়ায় এবং কারো দ্বারা তিনি প্রভাবিত না হওয়ায় তাঁর কাছে কারো নাম ও মর্যাদার ওসীলায় দো'আ করা যেতে পারে না। নবী ও ওলিদের যে মর্যাদা রয়েছে তা তাঁরই দেয়া। সুতরাং তাঁদেরকে তাঁরই দেয়া জিনিষের ওসীলায় তাঁর কাছে কিছু আবদার করা তাঁর সাথে বেআদবী করারই নামান্তর। তিনি কারো কোনো উদ্দেশ্য পূর্ণ না করলে এতে তাঁর কোনো ক্ষতিরও আশঙ্কা নেই। এমতাবস্থায় তাঁর কাছে কারো নাম, মর্যাদা ও হুরমতের ওসীলায় কিছু চাওয়া আল্লাহর সাথে মানবীয় আচরণ করারই শামিল।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 জীবিত মানুষের দো'আর ওসীলা গ্রহণ

📄 জীবিত মানুষের দো'আর ওসীলা গ্রহণ


জীবিত মানুষের দো'আর ওসীলা দু'ভাবে গ্রহণ করা যেতে পারে:

এক, কোনো জীবিত মানুষের কাছে গিয়ে এ কথা বলা যেতে পারে যে, আমি অমুক সমস্যায় পতিত হয়েছি, আপনি আমার জন্য এ মুহূর্তে আল্লাহর কাছে একটু দো'আ করুন। এ ধরনের দো'আ কামনা করার বিষয়টি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যা আমরা একটু পরে বর্ণনা করবো।

দুই, কোনো জীবিত মানুষের নিকট গিয়ে এ মর্মে দো'আ কামনা করা যেতে পারে যে, আপনি আমার জন্য দো'আ করবেন। দো'আকারী যদি অসাক্ষাতে দো'আ করেন, তা হলে তার দো'আ আল্লাহ তা'আলার নিকট মঞ্জুর হওয়ার অধিক সম্ভাবনার কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। উম্মুদ দরদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

دَعْوَةُ الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ لِأَخِيهِ بِظَهْرِ الْغَيْبِ مُسْتَجَابَةٌ ...
“একজন মুসলিম ভাইয়ের জন্য তার অসাক্ষাতে মুসলিম ব্যক্তির দো'আ মকবুল হয়ে থাকে।”

তবে এ ধরনের দো'আ কামনা যে শুধু সাধারণ লোকেরাই কেবল সৎ লোকজনের নিকটেই চাইবে তা নয়, বরং একজন মর্যাদাবান ব্যক্তিও তাঁর চেয়ে কম মর্যাদাবান ব্যক্তির নিকটে তা চাইতে পারেন। এমন দো'আ চাওয়ার প্রচলন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেই প্রমাণিত। একদা 'উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু 'উমরা পালন উপলক্ষে মক্কায় যাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অনুমতি চাইলে তিনি তাঁকে অনুমতি দানপূর্বক বলেন: "ভাই! (সফরের অবস্থায় যখন তুমি দো'আ করবে তখন) তোমার নেক দো'আ থেকে আমাদের ভুলে যেও না।” এটি হচ্ছে জীবিত মানুষের দো'আর ওসীলা গ্রহণের একটি সঠিক পদ্ধতি। এতে প্রমাণিত হয় যে, একজন সাধারণ মানুষ যেমন একজন ওলি ও পীর সাহেবের নিকট দো'আ কামনা করতে পারে, তেমনি একজন পীর সাহেবও একজন সাধারণ মানুষের নিকট দো'আ চাইতে পারেন। কোনো পীর সাহেব যে মানুষের জন্য দো'আ করার এজেন্সী নিয়ে বসে থাকবেন বিষয়টি এমন নয়।

টিকাঃ
২১৬. মুসলিম, প্রাগুক্ত; (জিকির ও দু'আ অধ্যায়, বাব : ফদলিদ দু'আ লিল মুসলিমীনা বি জাহরিল গাইব, হাদীস নং- ২৭৩২), ৪/২০৯৪।
২১৭. আবু দাউদ, প্রাগুক্ত; সালাত অধ্যায়, বাবুদ দু'আ; ২/১৬৯; হাদীসটি ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহ থেকে বর্ণিত। কুরতুবী, প্রাগুক্ত; ১২/৩২১। (তবে হাদীসটির সনদ দুর্বল, [সম্পাদক])

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00