📘 শিরক কি ও কেন > 📄 কুসংস্কার

📄 কুসংস্কার


কুসংস্কার:
কুসংস্কার হলো এমন বিশ্বাস বা প্রথা যা যুক্তি, বিজ্ঞান বা ধর্মীয় শিক্ষার উপর ভিত্তি করে নয়, বরং অজ্ঞতা, ভয় বা অন্ধবিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। ইসলামে কুসংস্কারকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে, কারণ এটি মানুষকে শির্ক ও বেদ'আতের দিকে ধাবিত করে এবং আল্লাহর উপর ভরসা বিনষ্ট করে।

বাংলাদেশে প্রচলিত কিছু কুসংস্কার:

১. অশুভ লক্ষণ (তীরাহ): কোনো পাখি বা পশুর গতিবিধি দেখে বা কোনো ঘটনা দেখে অশুভ লক্ষণ মনে করা। যেমন: বিড়াল রাস্তা পার হলে অশুভ মনে করা, পেঁচার ডাককে অশুভ মনে করা, ১৩ সংখ্যাকে অশুভ মনে করা ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«لَا عَدْوَى وَلَا طِيَرَةَ وَلَا هَامَ»
"আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছার বাইরে কোনো রোগ নিজ থেকে অন্যত্র সংক্রমিত হয় না, কোনো পাখিও কারো ভাগ্যের মঙ্গল অমঙ্গল জেনে ডানে বা বামে উড়ে যায় না, পেঁচা বা নাম না জানা কোনো পাখি গাছের ডালে বা কারো ঘরের উপর বসে রাতের বেলায় ডাকলে তাতে কোন অমঙ্গল নেই।"

২. ভাগ্য গণনা: জ্যোতিষী, গণক বা কাহিনদের কাছে গিয়ে ভাগ্য জানার চেষ্টা করা। তারা হস্তরেখা, রাশিচক্র বা অন্য কোনো মাধ্যমে মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে। ইসলামে ভাগ্য গণনা সম্পূর্ণ হারাম এবং এটি শির্কের অন্তর্ভুক্ত।

৩. তাবিজ-কবজ: জিন বা অপর কোনো রোগের অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষার জন্য শরীরে তাবিজ-কবজ ব্যবহার করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مَنْ عَلَّقَ تَمِيمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ»
"যে তা'বীজ ঝুলালো সে শির্ক করলো।"

৪. ঝাড়ফুঁক ও জাদুবিদ্যা: শির্কযুক্ত কথা-বার্তা (মন্ত্রের ন্যায়) পাঠ করে রোগীদের ঝাড়ফুঁক করা বা জাদুবিদ্যা ও তন্ত্রমন্ত্রের আশ্রয় নেওয়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

﴿إِنَّ الرُّقَى وَالثَّمَائِمَ وَالتَّوْلَةَ شِرْكٌ﴾
"(শির্ক যুক্ত) ঝাড়ফুঁক, তা'বীজ ও জাদু শির্ক।"

৫. শুভ-অশুভ দিন: কোনো নির্দিষ্ট দিন বা মাসকে শুভ বা অশুভ মনে করা। যেমন: বুধবারকে অশুভ মনে করা বা কোনো বিশেষ দিনে যাত্রা করাকে অশুভ মনে করা।

৬. নজর লাগা: মানুষের অশুভ দৃষ্টি বা নজর লাগার ভয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকার করা। যেমন: শিশুদের কপালে কালো টিপ দেওয়া বা ঝিনুকের মুক্তা ঝুলিয়ে রাখা।

কুসংস্কারের পরিণতি:
কুসংস্কার মানুষকে আল্লাহর উপর ভরসা থেকে বিচ্যুত করে এবং শির্ক ও বেদ'আতের দিকে ধাবিত করে। এটি মানুষের ঈমানকে দুর্বল করে দেয় এবং তাকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে। মুসলিমদের উচিত সকল প্রকার কুসংস্কার থেকে বিরত থাকা এবং একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করা।

এ সব শির্কে আসগার ছাড়াও সমাজে প্রচলিত আরো কিছু বিষয়াদি রয়েছে যা বাহ্যত কুসংস্কারের মতই মনে হয়। কিন্তু এ সব ক্ষেত্রেও বস্তুর প্রতি অপকারের ধারণা থাকায় মানুষের মনের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তা শির্কে আকবার বা শির্কে আসগারে পরিণত হতে পারে। নিম্নে এর কিছু উদাহরণ তুলে হলো:
1. বাড়ীর খাদ্য দ্রব্যের বরকত কমে যাওয়া এবং মৃত আপনজনদের রূহের উপর পানি পড়ে যাওয়ার ভয়ে রাতের বেলা ঘরের ব্যবহৃত পানি বাইরে না ফেলা।
2. ভ্রমণের প্রাক্কালে কোনো গাভী বা কুকুর হাঁচি দিলে এতে দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা করা।
3. রবিবারে বাঁশ কাটাকে বাঁশ ঝাড়ের জন্য অশুভ মনে করা।
4. ভ্রমণের প্রাক্কালে বাড়ীর পিছনের দরজা দিয়ে বের হওয়াকে অশুভ বলে মনে করা।
5. কোন ভাল কাজের উদ্দেশ্যে বের হলে অকল্যাণ হতে পারে এ ভয়ে পিছনের দিকে ফিরে না তাকানো।
6. পরীক্ষায় শূন্য পাওয়ার ভয়ে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পূর্বে ডিম খাওয়া থেকে বিরত থাকা।
7. পেঁচা দেখলে বা এর আওয়াজ শুনলে এটাকে অশুভ মনে করা।
8. দিনের বেলা ঘরের চালে বসে কাক ডাকলে এটাকে কোনো মেহমান আগমনের পূর্বাভাস বলে মনে করা।
9. বরকত লাভের উদ্দেশ্যে নতুন বউ এর পিতার বাড়ী থেকে শাড়ীর আঁচলে বেঁধে কিছু চাউল এনে তা স্বামীর বাড়ীর গুদামে ছিটিয়ে দেয়া।
10. রাতের বেলা ঘরের চালে বসে পেঁচা ডাকলে এতে বিপদের আশঙ্কাবোধ করা।
11. নবজাত শিশুকে জিনের অশুভ দৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য বাচ্চার কানে ছিদ্র করা।
12. একই উদ্দেশ্যে বাচ্চার বালিশের নিচে জুতার টুকরা রাখা।
13. বাংলা বর্ষ পঞ্জিকার বর্ণনানুযায়ী সপ্তাহের শনিবার, মঙ্গলবার ও অমাবশ্যার দিনকে অশুভ মনে করা এবং তাতে কোনো বিবাহ অনুষ্ঠান না করা।
14. ব্যবসায়ে লোকসান হওয়ার ভয়ে বেলা ডুবার পর চিটাগুড় ও হলুদ বিক্রি করা থেকে বিরত থাকা।
15. সোমবার ও শুক্রবার ব্যতীত অন্যান্য দিনসমূহে কৃষিকাজ আরম্ভ করলে ভাল ফলন হয় না বলে মনে করা।
16. কলার চারা রোপণের পূর্বে ঘরের আঙ্গিণা অতিক্রম করলে কলার ফলন ভাল হয় বলে মনে করা।
17. কাঁচা মরিচের চারা লাগিয়ে হাতের দ্বারা আগুনের তাপ নেওয়া এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে যে, এতে কাঁচামরিচ অধিক ঝাল হবে।
18. হালুয়া বা মিষ্টি খেয়ে মিষ্টি কুমড়ার বীজ বপন করলে এতে কুমড়ায় মিষ্টি বেশী হয় বলে মনে করা।
19. রাতের বেলা কাউকে টাকা দিলে এতে ভাগ্য খারাপ হবে বলে মনে করা।
20. পৃথিবী একটি ষাঁড়ের শিং এর উপর রয়েছে, যখনই উহা শিং নাড়া দেয় তখনই ভূমিকম্প হয় বলে মনে করা।
21. ভ্রমণের সময় রাস্তায় কোনো বিধবা মহিলার সাথে সাক্ষাৎ হলে বিপদের ভয়ে ভ্রমণ বাতিল করা।
22. নতুন পোশাক পরিধান করার পর হাঁচি আসলে এটাকে অশুভ বলে মনে করা।
23. বৈশাখ মাসের প্রথম দিনে দোকানে মাল বাকী বিক্রি করাকে অশুভ মনে করা।
24. সকাল বেলা দোকান খুলে সারাদিন বিক্রি না হওয়ার ভয়ে প্রথমে কারো কাছে বাকীতে কিছু বিক্রি না করা।
25. চল্লিশা পালন না করলে মৃত ব্যক্তির কবরে আযাব হয় বলে মনে করা।
26. নবজাত শিশুকে জিনের কুদৃষ্টি থেকে বাঁচানোর লক্ষ্যে শিশুর মাথার চুল না কাটা।
27. শনিবার ও মঙ্গলবারকে অশুভ মনে করে ভ্রমণে না যাওয়া।
28. সন্তান বিকলাঙ্গ জন্ম হওয়ার ভয়ে স্ত্রী গর্ভবতী থাকাবস্থায় গরু ও ছাগল যবাই করা থেকে বিরত থাকা।
29. পেট ব্যথা হলে তা নিবারিত হওয়ার আশায় বিরিয়ানী পাক করে তিন রাস্তার মাথায় একটি পাত্রের মাঝে কিছু খাবার রেখে আসা।
30. কোনো কলাগাছের কাঁদি সঠিকভাবে বের না হলে গর্ভবতী মহিলার সন্তান প্রসবের সময় সমস্যা হবার আশঙ্কায় তাকে সে কাঁদির কলা খেতে না দেয়া।
31. জমজ সন্তান হবার ভয়ে যুক্ত কলা খাওয়া থেকে বিরত থাকা।
উপর্যুক্ত বিষয়াদি ছাড়াও দেশের মানুষের মাঝে আরো অনেক বিষয়াদি রয়েছে যা শুনতে কুসংস্কারের মত মনে হয়। তবে মানুষের অন্তরের অবস্থা বিচারে এ সব ধ্যান-ধারণা শির্কে আকবার বা আসগারে পরিণত হতে পারে।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 শির্কে আসগর এর কতিপয় উদাহরণ

📄 শির্কে আসগর এর কতিপয় উদাহরণ


এ পর্যন্ত দেশে প্রচলিত যত শির্কের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে, এর দু'একটি ব্যতীত অবশিষ্ট সবকয়টিই শির্কে আকবার এর অন্তর্গত। নিম্নে সমাজে প্রচলিত কতিপয় শির্কে আসগার এর উদাহরণ তুলে ধরা হলো:
1. কারো ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার সমতুল্য করা। যেমন কাউকে এ-কথা বলা যে, 'আল্লাহ এবং আপনি যা চান'। এ জাতীয় কথাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শির্ক হিসেবে গণ্য করেছেন। যার প্রমাণ আমরা প্রথম অধ্যায়ে বর্ণনা করেছি।
2. আল্লাহর নাম ব্যতীত পিতা-মাতা, সন্তানাদি ও আগুন ইত্যাদির নামে শপথ গ্রহণ করা।
3. আব্দুর রাসূল, আব্দুন্নবী, গোলাম রাসূল, গোলাম মুস্তফা ও গোলাম সাকলায়েন ইত্যাদি নাম রাখা।
4. পত্র লেখার সময় আল্লাহর রহমত ও পত্র প্রাপকের দো'আকে সম মর্যাদাবান করে এমনটি বলা যে, 'আমি আল্লাহর রহমতে ও আপনার দো'আয় ভাল আছি'। কথাটি এভাবে না বলে যদি বলা হয়: 'আমি আল্লাহর রহমতে অতঃপর আপনার দো'আয় ভাল আছি', তা হলে তাতে শির্ক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
5. চোখের অশুভ দৃষ্টি থেকে সন্তানকে রক্ষার জন্য সন্তানের ললাটে কালো টিপ বা দাগ দেয়া। এ-কাজটি আল্লাহর উপরে ভরসার পরিপন্থী বলে তা শির্কে আসগার।
6. একই ভাবে চোখের কুদৃষ্টি থেকে ক্ষেতের ফসল রক্ষার জন্য মাটির পাত্রের পিঠে চুনা লেপ দিয়ে তা ক্ষেতে রেখে দেয়া। এ-কাজটিও আল্লাহর উপর ভরসার পরিপন্থী।
7. লোক দেখানো ও তাদের প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করা।
8. ভ্রমণের প্রাক্কালে রাস্তায় খালি কলসি দেখলে এটাকে অশুভ লক্ষণ বলে মনে করা।
9. কলেরা, দাদ, একজিমা, এইডস, প্লেগ ও যক্ষা ইত্যাদি রোগকে 'আল্লাহর ইচ্ছায় সংক্রামক রোগ' হতে পারে এমনটি না বলে কথায় ও লেখনীতে এ-গুলোকে সংক্রামক রোগ বলা।
10. কোনো বস্তুকে আল্লাহর ইচ্ছায় ও তাঁর রহমতে কোনো রোগের ক্ষেত্রে উপকারী বা অপকারী এমনটি না বলে সরাসরি সে বস্তুকেই উপকারী বা অপকারী বলা। যেমন এমনটি বলা: নাপা ট্যাবলেট জ্বর সারানোর জন্য উপকারী।
11. কোনো ঔষধ খেয়ে আল্লাহর রহমতে রোগ সেরেছে এমনটি না বলে অমুক ঔষধ খেয়ে রোগ সেরেছে এমনটি বলা। যেমন এমনটি বলা যে, নাপা খেয়ে আমার জ্বর সেরে গেছে।
12. আল্লাহ অধিকাংশ জনগণের রায়ের মাধ্যমে ক্ষমতা দান ও তা ছিনিয়ে নেয়ার মালিক হওয়া সত্ত্বেও কথায় ও লেখনীতে দেশের জনগণকে ক্ষমতার মালিক ও উৎস বলে মনে করা।
13. কোনো কাজ সমাধা করার জন্য আল্লাহর উপর ভরসা না করে কোনো মানুষের উপর ভরসা করে এমনটি বলা যে, 'এ কাজে আপনি আমার একমাত্র ভরসা'।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00