📘 শিরক কি ও কেন > 📄 এ জাতীয় তা'বীজ হারাম হওয়ার কারণ

📄 এ জাতীয় তা'বীজ হারাম হওয়ার কারণ


এ জাতীয় তা'বীজ হারাম হওয়ার কারণ:
তা'বীজ হারাম হওয়ার প্রধান কারণ হলো, এটি শির্কের দিকে ধাবিত করে এবং আল্লাহর উপর ভরসা বিনষ্ট করে। ইসলামে সকল কল্যাণ ও অকল্যাণের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা'আলা। কোনো তা'বীজ বা জড়বস্তুর অলৌকিক ক্ষমতা নেই যে, তারা মানুষকে অনিষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারে বা তাদের কোনো উপকার করতে পারে।

১. শির্কের কারণ: তা'বীজ ব্যবহারকারীরা সাধারণত বিশ্বাস করে যে, তা'বীজের নিজস্ব ক্ষমতা রয়েছে যা তাদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারে। এই বিশ্বাসটি আল্লাহর একত্ববাদের পরিপন্থী এবং এটি আল্লাহর পাশাপাশি অন্যকে ক্ষমতাশীল মনে করার শামিল, যা শির্কের অন্তর্ভুক্ত।

২. আল্লাহর উপর ভরসা বিনষ্ট: তা'বীজ ব্যবহার করলে আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা থাকে না। মানুষ তা'বীজের উপর নির্ভর করে এবং আল্লাহর উপর ভরসা করা ছেড়ে দেয়। ইসলামে আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা করা ঈমানের অংশ।

৩. জাহেলী যুগের কুসংস্কার: তা'বীজ ব্যবহার জাহেলী যুগের কুসংস্কারের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। জাহেলী যুগে আরবের মুশরিকরা বিভিন্ন ধরনের তাবিজ-কবজ ব্যবহার করত এবং বিশ্বাস করত যে, এর অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে। ইসলাম এই ধরনের কুসংস্কারকে বাতিল করেছে।

৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিষেধাজ্ঞা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে তা'বীজ ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন এবং এটিকে শির্কের অন্তর্ভুক্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন:

«مَنْ عَلَّقَ تَمِيمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ»
"যে তা'বীজ ঝুলালো সে শির্ক করলো।"

তিনি আরো বলেন:

﴿إِنَّ الرُّقَى وَالثَّمَائِمَ وَالتَّوْلَةَ شِرْكٌ﴾
"(শির্ক যুক্ত) ঝাড়ফুঁক, তা'বীজ ও জাদু শির্ক।"

৫. বিপদ বৃদ্ধি: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, তা'বীজ রোগ বৃদ্ধি ছাড়া কোনো উপকার করবে না। এটি মানুষের বিপদ আরও বাড়াতে পারে, কারণ মানুষ আল্লাহর উপর ভরসা করা ছেড়ে দেয়।

সুতরাং, তা'বীজ হারাম হওয়ার প্রধান কারণ হলো এটি শির্কের দিকে ধাবিত করে, আল্লাহর উপর ভরসা বিনষ্ট করে, জাহেলী যুগের কুসংস্কারের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে তা নিষেধ করেছেন।

এতে গায়রুল্লাহের সাথে অন্তরের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। আল্লাহর উপর ভরসা না থেকে গায়রুল্লাহের উপর ভরসা হয়। যাবতীয় উপকারের মালিক আল্লাহ হওয়া সত্ত্বেও এতে গায়রুল্লাহকে উপকারের মালিক বানিয়ে নেয়া হয়। আর যে বস্তু আল্লাহর উপর থেকে মানুষের ভরসাকে নষ্ট করে এবং গায়রুল্লাহকে উপকারী নির্দিষ্ট করে, তা শির্ক। এ-জন্যেই এ-জাতীয় তা'বীজ ব্যবহার করা হারাম। এতে উপকার থাকলেও শর'য়ী দৃষ্টিতে সে উপকার গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন জাদু আল্লাহর ইচ্ছায় উপকারী হলেও সে উপকার গ্রহণ করা হারাম ও শির্ক।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 দুধের গাভী ও নতুন বাচ্চার গলায় তা'বীজ, জুতা ও জালের টুকরা ঝুলানো

📄 দুধের গাভী ও নতুন বাচ্চার গলায় তা'বীজ, জুতা ও জালের টুকরা ঝুলানো


দুধের গাভী ও নতুন বাচ্চার গলায় তা'বীজ, জুতা ও জালের টুকরা ঝুলানো:
দুধের গাভী ও নতুন বাচ্চার গলায় তা'বীজ, জুতা ও জালের টুকরা ঝুলানো শির্কের অন্তর্ভুক্ত। এই বিশ্বাসটি ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম, কারণ অনিষ্ট থেকে রক্ষা করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই। কোনো তা'বীজ, জুতা বা জালের টুকরার অলৌকিক ক্ষমতা নেই যে, তারা প্রাণী বা বাচ্চাকে অনিষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারে বা তাদের কোনো উপকার করতে পারে।

জাহেলী যুগে আরবের মুশরিকরা শিশুদের গায়ে তা'বীজ ব্যবহার করত এবং উটের গলায় ধাতু নির্মিত তারের মালা ঝুলিয়ে রাখত। তা'বীজ বা ধাতু নির্মিত তারের মালা আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল বিনষ্টকারী হওয়ায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«مَنْ عَلَّقَ تَمِيمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ»
"যে তা'বীজ ঝুলালো সে শির্ক করলো।"

কোনো উটের গলায় তার বা হার ঝুলানো দেখলে তা কেটে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি আলী (রা) কে বলেছিলেন:

«لاَ يَبْقَيَنَّ فِي رَقَبَةِ بَعِيرٍ قِلادَةٌ مِنْ وَتَرٍ، وَلَا قِلَادَةً إِلَّا قُطِعَتْ»
"কোনো উটের গলায় ধাতব দ্রব্য দ্বারা নির্মিত তারের হার অবশিষ্ট রাখবে না, গলায় ঝুলানো হার পেলেই তা কেটে দিবে।"

এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, প্রাণী বা বাচ্চার গলায় তা'বীজ, জুতা বা জালের টুকরা ঝুলানো শির্কের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, এতে আল্লাহর পাশাপাশি অন্য কারো ক্ষমতাকে বিশ্বাস করা হয় এবং জড়বস্তুর অলৌকিক ক্ষমতাকে বিশ্বাস করা হয়।

মানুষের উচিত একমাত্র আল্লাহর কাছেই অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দু'আ করা এবং তাঁর উপর ভরসা করা। কোনো তা'বীজ, জুতা বা জালের টুকরার উপর ভরসা করা শির্কের অন্তর্ভুক্ত।

সুতরাং, দুধের গাভী ও নতুন বাচ্চার গলায় তা'বীজ, জুতা ও জালের টুকরা ঝুলানো শির্কের অন্তর্ভুক্ত এবং তা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম।

দেশের কৃষকগণ মানুষের চোখের অশুভ দৃষ্টি থেকে দুধের গাভী ও তার নবজাত বাচ্চাকে রক্ষা করার জন্য গাভী ও বাচ্চার গলায় তা'বীজ ঝুলিয়ে রাখেন। অনেক সময় উক্ত উদ্দেশ্যে গলায় প্লাষ্টিকের সেন্ডেল ও জালের টুকরাও ঝুলিয়ে রাখেন। আরব সমাজে এ-জাতীয় উদ্দেশ্যে উটের গলায় তারের মালা ঝুলিয়ে রাখার প্রচলন ছিল। এতে ভরসাগত উপাসনায় শির্ক হয় বিধায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- তা কেটে দিতে নির্দেশ করেছিলেন।

টিকাঃ
175. আবু দাউদ, প্রাগুক্ত; ৩/৫২।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 স্বামীকে বাধ্য করার জন্য গোপনে ঘরের চুলা, বিছানা, বালিশ বা অন্য কোথাও তা'বীজ রাখা

📄 স্বামীকে বাধ্য করার জন্য গোপনে ঘরের চুলা, বিছানা, বালিশ বা অন্য কোথাও তা'বীজ রাখা


স্বামীকে বাধ্য করার জন্য গোপনে ঘরের চুলা, বিছানা, বালিশ বা অন্য কোথাও তা'বীজ রাখা:
স্বামীকে বাধ্য করার জন্য গোপনে ঘরের চুলা, বিছানা, বালিশ বা অন্য কোথাও তা'বীজ রাখা শির্কের অন্তর্ভুক্ত। এই বিশ্বাসটি ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম, কারণ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক আল্লাহর ইচ্ছাধীন এবং কোনো তা'বীজ বা জড়বস্তুর অলৌকিক ক্ষমতা নেই যে, তারা কাউকে বাধ্য করতে পারে বা তাদের সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।

এই ধরনের কর্মকাণ্ড জাদুবিদ্যা বা তন্ত্রমন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম এবং শির্কের শামিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

﴿إِنَّ الرُّقَى وَالثَّمَائِمَ وَالتَّوْلَةَ شِرْكٌ﴾
"(শির্ক যুক্ত) ঝাড়ফুঁক, তা'বীজ ও জাদু শির্ক।"

'তাওলা' (التولة) হলো এমন এক ধরনের জাদু, যা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা বা ঘৃণা সৃষ্টি করার জন্য ব্যবহার করা হয়। এই ধরনের কাজ শির্কের অন্তর্ভুক্ত, কারণ এতে আল্লাহর পাশাপাশি অন্য কারো ক্ষমতাকে বিশ্বাস করা হয় এবং জড়বস্তুর অলৌকিক ক্ষমতাকে বিশ্বাস করা হয়।

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক আল্লাহর রহমত ও বরকতের উপর নির্ভরশীল। যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো সমস্যা থাকে, তবে তাদের উচিত আল্লাহর কাছে দু'আ করা, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করা এবং শরী'আতসম্মত উপায়ে সমাধান খুঁজে বের করা। কোনো তা'বীজ বা জাদুবিদ্যার আশ্রয় নেওয়া শির্কের অন্তর্ভুক্ত।

সুতরাং, স্বামীকে বাধ্য করার জন্য গোপনে ঘরের চুলা, বিছানা, বালিশ বা অন্য কোথাও তা'বীজ রাখা শির্কের অন্তর্ভুক্ত এবং তা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম।

এ-জাতীয় কর্মকেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- শির্কের মধ্যে শামিল করে বলেছেন:
إِنَّ الرُّقَى وَ التَّمَائِمَ وَالتَّوْلَةَ شِرْكٌ
"মন্ত্রের ঝাড়ফুঁক, তা'বীজ ও তেওলা শির্ক।” 'তেওলা' হচ্ছে ঐজাতীয় জাদু-টোনা যা মহিলারা স্বামীকে বাধ্য করার জন্য করে থাকে। আমাদের দেশেও এর বহুল প্রচলন রয়েছে। মহিলারা হিন্দু জাদুকর, কবিরাজ ও জিন সাধকদের নিকট থেকে তা'বীজ এনে এ জাতীয় কর্ম করে থাকেন।

টিকাঃ
176. তদেব; ৪/২১২।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 আগুন, রক্ত, খাবার দ্রব্য, সন্তান ও মাটি ইত্যাদির নামে বা তাতে হাত রেখের শপথ গ্রহণ করা

📄 আগুন, রক্ত, খাবার দ্রব্য, সন্তান ও মাটি ইত্যাদির নামে বা তাতে হাত রেখের শপথ গ্রহণ করা


আগুন, রক্ত, খাবার দ্রব্য, সন্তান ও মাটি ইত্যাদির নামে বা তাতে হাত রেখে শপথ গ্রহণ করা:
আগুন, রক্ত, খাবার দ্রব্য, সন্তান ও মাটি ইত্যাদির নামে বা তাতে হাত রেখে শপথ গ্রহণ করা শির্কের অন্তর্ভুক্ত। এই বিশ্বাসটি ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম, কারণ শপথ একমাত্র আল্লাহর নামেই করতে হয়। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে শপথ করলে তাতে আল্লাহর ইবাদতের সাথে অন্যকে শরীক করা হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ أَشْرَكَ»
"যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর নামে শপথ করলো, সে শির্ক করলো।"

এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর পাশাপাশি অন্য কারো নামে শপথ করা শির্কের অন্তর্ভুক্ত। জাহেলী যুগে আরবের মুশরিকরা তাদের দেব-দেবীদের নামে শপথ করত এবং বিশ্বাস করত যে, তাদের নামে মিথ্যা শপথ করলে শপথকারীর পরিবার ও সহায় সম্পদে ক্ষতি হবার সমূহ আশঙ্কা করত।

কিছু মানুষ আগুন, রক্ত, খাবার দ্রব্য, সন্তান বা মাটির নামে শপথ করে। এই ধরনের শপথ শির্কের অন্তর্ভুক্ত, কারণ এতে আল্লাহর পাশাপাশি অন্য কারো ক্ষমতাকে বিশ্বাস করা হয় এবং জড়বস্তুর অলৌকিক ক্ষমতাকে বিশ্বাস করা হয়।

ইসলামে শপথের গুরুত্ব অপরিসীম। শপথ একমাত্র আল্লাহর নামেই করতে হয় এবং তা ভঙ্গ করা হারাম। যদি কেউ আল্লাহর নামে শপথ করে, তবে তাকে তা পূরণ করতে হবে। যদি কেউ গায়রুল্লাহের নামে শপথ করে, তবে তাকে তাওবা করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

সুতরাং, আগুন, রক্ত, খাবার দ্রব্য, সন্তান ও মাটি ইত্যাদির নামে বা তাতে হাত রেখে শপথ গ্রহণ করা শির্কের অন্তর্ভুক্ত এবং তা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম।

এ-জাতীয় কর্মের প্রচলনও সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে। অথচ শরী'আতে এ জাতীয় শপথ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :
مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ كَفَرَ أَوْ أَشْرَكَ
“যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহের নামে শপথ করলো, সে কুফরী অথবা শির্ক করলো।”

টিকাঃ
177. হাদীসটি হাসান সনদে ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহ থেকে বর্ণিত। তিরমিযী, প্রাগুক্ত; ৪/১১০; ইবনে হিববান, প্রাগুক্ত; ১০/২০০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00